বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মৃন্ময়ী

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান ইকবাল (০ পয়েন্ট)



X ….মানবী কিছুটা এগিয়ে এসেছে। একে অপরের নিঃস্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। পাহাড়ি বিভিন্ন শব্দ ছাপিয়ে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দুজন মানব মানবীর ভারি নিঃস্বাসের গুঞ্জন……. এক রক্তিম সূর্য ডুবে গেছে বহু আগে, দিন চলে গেছে অন্ধকারের ভাগে। আসমান তারা সাক্ষি হয়ে রয়, আমার সাথে গোপন কথা কয়। কংকাল পাহাড়ে বসে আছি একা, অপেক্ষার প্রহর পাবে সকালের দেখা……. আস্মাৎ হাসির শব্দের আমি সম্বিত ফিরে পেছনে তাকাই। একটি আবছা অবয়ব দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ আমি ছাড়াও অন্য একজন আছে। আমি বসা থেকে তাৎক্ষনিক দাড়িয়ে পড়ি। স্ববিস্ময়ে প্রশ্ন করি। – কে, কে ওখানে? – এটা কংকাল নয়, কংলাক। উত্তরের বিনিময়ে জ্ঞানমুলক কথা ছুটে আসে। আমি আবারো প্রশ্ন করি। – কিন্তু কে আপনি? এখানে কি করছেন এখন? – আমি মানবী, আর এখানে আপনার কবিতার ভুল শুধরাচ্ছি। আপনি কবিতা ভালো আবৃতি করেন। আপনার লেখা হয়ে থাকলে বলা যায় লেখার হাতও ভালোই। কিন্তু আপনি আসলেইকি জানেননা এ জায়গাটার নাম কি? মানবী কথা বলতে বলতে আরেকটু এগিয়ে আসে। কথা শুনে অনুমেয় যে মানুষটা মেয়ে কিংবা মহিলা কিন্তু কাছে আসার পর গোধুলীর শেষ চুইয়ে যাওয়া ম্লান আলোয় বোঝা গেলো মানুষটার সাথে মানবী নামটা পুরোপুরি মিলেছে। হয়তো অতিমানবীও বলা যেতে পারতো। – আমি প্রথম থেকেই এর নাম কংকাল পাহাড় বলে বুঝে নিয়েছি। আজই জানলাম এর নাম কংকাল পাহাড় নয় এর নাম কংলাকপাড়া। এরি মধ্যে মানবী আরো কাছে এসেছে। সম্ভোত তার কাপড়টা কালো কিংবা দুসর। তাই তার অবয়ব আর চোখের হালকা জ্বলজ্বলে আভা ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছেনা। আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিলো। – এখানে অন্ধকারে একা একা কি করছেন? – তেমন কোন কারন নেই। শুনেছিলাম এখানে সন্ধ্যার পর কেই একা থাকার সাহস করে না। হঠাৎ আমার মতো সাহসহীন মানুষ সাহসটা করতে ইচ্ছে করলো। আর কোন কারন নেই। তাছাড়া সকল কোলাহল ছেড়ে আমরা সাজেক আসি কোলাহল মুক্ত পরিবেশে সময় কাটাতে অথচ সাজেক এখন সবচাইতে জনবহুল এবং গ্যাদারিং এলাকায় পরিনত হয়েছে। রাত কারোটায় সাজেকের হেলিপোর্ট আসলেও দেখবেন মানুষে গাদাগাদি। বলতে বলতে আমি আবারো পূর্বের জায়গায় বসে পরি। মেয়েটা একেবারে সাবলিল ভাবেই আমার পাশে এসে বসে। প্রশ্নের উত্তরগুলো পাবার আশায় আবারো পাশ ফিরে তাকালাম। মেয়েটি সামনে তাকিয়ে আছে। সামনের দিকটা একেবারেই খাড়া নেমে গেছে অন্তত ৪ হাজার ফুট নিচে। সেদিকে তাকালো ঘুটঘুটে অন্ধকার ছাড়া আর কিছু দেখা যায়না। অবশ্য বহুদুর পরপর বিন্দু বিন্দু আলো দেখা যায়। পাহাড়িরা অনেকেই ওখানে বিছিন্নভাবে তাদের ঘর তুলে থাকতে শুরু করেছে। আমি ছোট্ট করে একটা স্বাস ফেল্লাম। মেয়েটা আমাকে কিছুটা ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। একেতো এখানে সন্ধার পর আসা নিষেধ। দুই মানুষটা একটা মেয়ে মানুষ। আমার চিন্তার উত্তর দিতেই যেনো মেয়েটা কথা বলে উঠলো। – আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কোন কারন নেই। আমি মানুষ। আপনার মতোই আমার কৌতুহল আমাকে এখানে এসময়ে এনেছে। আমারো জানতে ইচ্ছে করছিলো এমন একটি বিচ্ছিন্ন এবং নিষিদ্ধ জায়গায় রাতের অন্ধকারে সময় কাটাতে কেমন লাগে। – তা, কেমন লাগছে? – যেমনটা ভেবেছিলাম তেমনি। কিন্তু একাতো থাকতে পারলাম না। আপনি থাকা মানেইতো একা না থাকা। তা, আপনার কেমন লাগছে? – ভালোই। সত্যি বলতে কি মনের ভেতরের ছোট্ট ভয় কাটাতেই আবৃত্তি করছিলাম। আসলে আমার একা থাকতে ভালো লাগে, অর্থাৎ কোলাহল মুক্ত পরিবেশ আমাকে খুব টানে। – আমি অবশ্য তেমন না, আমার হৌ-হোল্লর ভালো লাগে। কিন্তু তাই বলে সব সময় না। মাঝে মাঝে এমন ভয়ংকর চুপচাপ এবং নিরিবিলিও আমার ভালো লাগে। আমাদের কথা চলতে থাকলো। এরি মধ্যে তার পরিচয় দিয়েছে। সে এসেছে খুলনা থেকে। আমি অবশ্য এসেছি গাজিপুর থেকে। ব্যক্তিগত জীবনে আমি লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে অনলাইনে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর দেশীয় এডমিন হিসেবে কাজ করছি। আর মানবী বলেছে সে তেমন কিছু করেনা, কিন্তু পড়ালেখার পাঠ শেষ। আমি তাকে প্রশ্ন করলাম- – আপনারা কজন এসেছেন? – আমি একাই এসেছি। মানবীর উত্তরে আমি কিছুটা বিস্মিত হলাম। কারন এতদুর থেকে এমন একটি মেয়ে একা একা আসাটা স্বাভাবিক নয়। – একা কেনো? সঙ্গে কাউকে আনতে পারতেন? – আমি একাই আসি সব সময়। – অহ। – আপনারা কজন এসেছেন? – আমার সাথে ৩জন বন্ধু আছে। – কোথায় উঠেছেন? – লুসাই কটেজ। আপনি? – কাঠবিড়ালি। – এ নামতো শুনিনি! – প্রায় সাড়ে চারশ কটেজ এখানে। কয়টিকে চিনেন? – তা অবশ্য ঠিক। আমি তাকিয়ে আছি সামনের অন্ধকারের দিকে। নির্দিষ্ট কিছু দেখা নয় জাষ্ট তাকিয়ে থাকা। পাশে বসে আছে মানবী। কথাগুলো যদিও কিছুটা অন্যরকম কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বুঝতে পারছি কেউ একজন আছে তাই আমি এখনো এই অন্ধকারে নির্দিধায় সময় পার করছি। এতক্ষনে হয়তে ফিরে যাবার জন্য চঞ্চল হয়ে উঠতাম। কিন্তু মানবীর মধ্যে কোন তাড়া বোঝা যাচ্ছে না। যদিও তার মুখের অবয়ব দেখতে পেলেও তার মনের ভাব বোঝার জন্য যতটা স্পষ্ট দেখতে পাবার দরকার তা দেখতে পাচ্ছিনা। আমার মনের কথা কিভাবে যেনো টের পেয়ে যায় মেয়েটা। – না, আমার এখনই ফিরে যাবার কোন তাড়া নেই। আমি চাঁদ উঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করবো। জানেনতো আজ কিছুটা দেরিতে চাঁদ দেখা দিবে। আপনি চাইলে আমার সাথে থেকে যেতে পারেন, তবে তাড়া থাকলে চলে যাওয়াই ভালো। – না, আমারো কোন তাড়া নেই। – জানেন যখন ভাংগা চাঁদটা পাহাড়ে কোনাকুনি ভাবে আলো ছুড়ে দেয় দুর থেকে পাহাড়টাকে খুব একা আর ক্লান্ত মনে হয়, কিন্তু আপনি যদি পাহাড়ের গায়ে থাকেন তবে আপনার মনে হবে আপনি পাহাড়েরই একটি অংশ। পাহাড়কে নিজের মতো করে অনুভব করার শ্রেষ্ঠ পরিবেশ এই আলোছায়া। – আমি অবশ্য এমন করে কখনো ভাবিনি। অনেকবার দুর থেকে যদিও দেখেছি কিন্তু কাছ থেকে এই প্রথম। কিছুখন চুপচাপ সময় কেটে যায়। অনেকখন অন্ধকারে থাকায় রেটিনার ইনফ্রারেড ক্ষমতা বোধ হয় অনেকটা বেড়ে গেছে। অনেক কিছুই এখন অস্পষ্ট হলেও দেখতে পাচ্ছি। পাহাড়ে বড় কোন গাছ নেই। ছোটছোট ঝোপ থেকে বিভিন্ন পোকার ডাক ভেসে আসছে। প্রতিটা শব্দ কানে এসে বাজছে। হালকা বাতাসে পাহাড়ের ভিন্ন এক ঘ্রান বয়ে আসছে। মৃদু জোড়ে শ্বাস টেনে নিলাম বুকে। বুঝলাম অপরিচিত এই বাতাসে যুক্ত হয়েছে একটি সুক্ষ্ম ম্লান মাতাল ঘ্রান। বোঝা যায় আমার পাশে উপবিষ্ট মানুষটির পছন্দের পারফিউমটি ইউনিক। দুজনার মধ্যকার দুরত্ব যদিও হাত খানেকের কিন্তু বিভিন্ন অনুভুতি বাধা মানছেনা। বাতাসে তার চুলের হালকা আচ পেয়ে বুঝে নিলাম আধুনিক মেয়েদের মতো ছোট চুল পছন্দ নয় মেয়েটির। বেশ অনেকটা সময় পর মেয়েটি কিছুটা নড়েচড়ে বসলো। আমার দিকে আড় হয়ে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো? – ভয় করছেনাতো? – না, ভয় করবে কেনো? – একটি নির্জন জায়গায় অন্ধকারে লম্বা সময় একা থাকা যেমন ভয়ের, তেমনি সম্পুর্ণ অপরিচিত এবং বিপরীত লিংগের একজনের সাথে দীর্ঘ সময় কাটানোটাও অনেকটা ভিতিকর। আপনি একটা কাজ করেন যেভাবে চেষ্টা করছেন সেভাবে অর্থাৎ লম্বা লম্বা স্বাস-প্রশ্বাস নিতে থাকুন এবং অবস্থাটাকে স্বাভাবিক ভাবে নিন। তবেই আপনি সময়টা ভালোমতো উপলব্ধি করতে পারবেন। – আরে, আমাকে নিয়ে টেনশন করার কিছু নেই। আমি ঠিক আছি। ভাবছি আপনার কোন সমস্যা হচ্ছেনাতো? যদি এখানটায় ভালো না লাগে আসুন বাম পাশটায় লম্বা একটা পাথরের চাতাল আড় হয়ে আছে। সেখানে গিয়ে বসি। মানবী কিছু বল্লনা কিন্তু কিছুটা সময় নিয়ে উঠে দাড়ালো। মোবাইলের আলো জ্বেলে সাবধানে পা ফেলে পাথরের চাতালটার কাছে যাচ্ছি আমরা। নির্জন এ পাহাড়ের আশেপাশে কোথাও কোন মানুষ নেই। আমরা শুধু মাত্র দুজন পাশাপাশি হেটে যাচ্ছি। মাঝে মাঝে দুজন খুব কাছাকাছি চলি আসছি, এতোটা কাছে যেদুরত্বের সীমানা থাকেনা। পাহাড়ের উচুনিচু এবং ছোটবড় পাথর পেড়িয়ে আমরা পৌছলাম আমাদের ইপ্সিত জায়গায়। প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে ফার্নিচার সেটাপ করেছে। পাহাড়ের একেবারে ধারে বিশাল আকারের একটি চ্যাপ্টা পাথর কিছূটা কাঁত হয়ে পড়ে আছে। দুজন বসে পড়লাম চাতাদের মাঝামাঝি স্থানে। এখান থেকে দক্ষিন আকাশটা আরো কাছে মনে হয়। হঠাৎই মানবী তার হাত দিয়ে আমার কাধেঁ মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলে- – ঐযে, চাঁদ উঠেছে। যদিও এখনো স্পষ্ট হয়নি কিন্তু আর কিছুখনের মধ্যেই আলো বাড়বে। আমি আমার হাত ঘড়িটা আমার দিকে ফেরাতেই ঘড়ির ডিসপ্লেতে হালকা আলো জ্বলে উঠলো। সেদিকে তাকিয়ে দেখলাম ১১:৫২। ঘড়ির দিকে এক নজর তাকিয়েই মানবী উঠে দাড়ালো। – সরি, আমি একটু ওদিক থেকে আসছি। বলেই হাটতে শুরু করলো। কোথায় যাচ্ছে, কেনো যাচ্ছে, আমি আসবো কিনা এযাতীয় কিছু জিজ্ঞেস করতে গিয়েও আমি চুপ করে রইলাম। হয়তো এমন কিছু কাজে যাচ্ছে যেকাজে অন্য কাউকে সাথে নেয়া যায় না। কিছু বল্লামনা। সময় বয়ে যেতে লাগলো। ৫/৬ মিনিট পর্যন্ত মনে হয়েছে স্বাভাবিক সময়। কিন্তু এরপরেও মেয়েটি যখন ফিরে আসছেনা তখন বিভিন্ন চিন্তা মাথায় আসতে লাগলো। প্রায় ৪০ মিনিটও যখন মেয়েটি আর ফিরে এলোনা তখন আমি চুড়ান্ত বিস্মিত এবং মন খারাপ করে ফেল্লাম। নিজেকে প্রবোধ দিতে থাকলাম। আমার কি? আবার পরোক্ষনে ভাবছি, মেয়েটি যদি জরুরি কাজে যাবে তবে কাধেঁর বেগটা বয়ে নিয়ে যাবার কি প্রয়োজন ছিলো? আর এতটা সময়তো লাগার কথাও নয়? তবেকি আর ফিরবেনা? এটা ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে গেলো। নিজের অবস্থা দেখে নিজেই হেসে ফেল্লাম। টিনএজারদের প্রেমে পরার মতো অবস্থা হলোনাতো আমার? এমনি হাজারো ভাবনা ভাবতে ভাবতে হঠাৎই একটা চিন্তা মাথায় এলো। আদৌ আমার সাথে কেউ ছিলো কি? নাকি সম্পুর্নটাই আমার মস্তিস্কের কল্পনা? একথা ভাবতেই আমি সোজা হয়ে বসলাম। রাত প্রায় ১টা। গভির রাত। যদিও চাঁদ ইতিমধ্যে তার ধুসর আলো ছড়িয়ে চারিপাশকে কিছুটা হলেও অন্ধকার মুক্ত করেছে। কিন্তু আমি নড়েচড়ে বসলাম। পরিবেশটা আমার মনের মধ্যে যে উষ্ণতা ছড়াচ্ছিলো তা হঠাৎই কালো মেঘে ছেয়ে গেলো। বুঝলাম আমি কল্পনার জগতেই ছিলাম। পেটের মধ্যে খাদ্যের অভাব জানান দিলো। আমার বেকপ্যাক থেকে এক টুকরো কেক আর জুসের বোতর হাতে নিলাম। মনে জমা অভিমানটা ঝেটিয়ে দুর করার চেষ্টা করছি কিন্তু খাবার মুখে দিতে ইচ্ছে হচ্ছেনা। আবারো সেগুলো ব্যাগে পুরে পাথরের চাতালে গা এলিয়ে দিলাম। চোখ বরাবর নিঃসীম আকাশের দিকে তাকালাম। সাথে সাথেই খুট করে শব্দ করে মানবী তার উপস্থিতি জানান দিলো। আমি লাফ দিয়ে উঠে দাড়ালাম। বিস্ময়ে এবং কিছুটা আনন্দে বলে উঠলাম- – এতখন ছিলেন? কোন সমস্যা? আমার দিকে তাকিয়ে কাধের ব্যাগটা নামিয়ে বসে পড়লো মানবী। এই প্রথম খেয়াল করলাম কালো রংগের জামার সাথে ধুসর রংয়ের একটি জিন্স পরে আছে মেয়েটি। পায়ের কের্ডসটিও কালো রংয়ের। – আসলে অন্ধকারে পথচলতে সমস্যা হয়, আবার সময়ও লাগে। আপনারতো সম্ভোবত ক্ষিধে পেয়েছে। বলেই তার ব্যাগ খুলে ভেতর থেকে একটি বক্স আর একটি পানির বোতল বের করলো। আমিও আমার ব্যাগ থেকে খাবার বের কলাম। দুজন মিলে সব খাবার শেষ করে ফেল্লাম। খাবার শেষে রিলাক্স হয়ে হাতের উপর মাথা রেখে ঢালু চাতালে গা এলিয়ে দিলাম। অনেকক্ষন কেউ কোন কথা বলছিনা। দুজনের মাঝে দুরত্ব খুব কম। দুটি ব্যাগ রাখা। হঠাৎই মানবী আমার দিকে কাত হয়ে ফিরে প্রশ্ন করলো- – আপনার পাহাড় কেমন লাগে? প্রশ্ন শুনে আমি মানবীর দিকে কাঁত হলাম। – আগে কখনো পাহাড়কে এমন ভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ হয়নি। প্রথম অনুভুতি হিসেবে বলবো, আমি যেমনটি চাই, ঠিক যেমন পরিবেশ, যেমন ভালোলাগে, যেমন ভালোবাসি ঠিক তেমনটিই যেনো এই পাহাড় আর এই পরিবেশ। – ভালো বলেছেন। আমারো খুব পছন্দ। তাইতো এভাবে পাহাড়ে ছুটে আসি। আপনি বললেন না, একা কেনো? আসলে এমন পরিবেশে কাউকে সঙ্গী হিসেবে পাওয়া যায়না। সবাই এখন ব্যস্ত। বাস্তবতার যাতাকলে পিষ্ট হচ্ছে আবার এর থেকে মুক্তি পাবার জন্য ভার্চুয়্যাল জগতের কানাগলি ঘুরে মরছে। – ঠিকই বলেছেন, আমার বন্ধুও যাদেরকে নিয়ে আমি ঘুড়ে বেড়াই তারা বেড়াতে এসেও ভার্চুয়্যার জগত থেকে বের হতে পারে না। মোবাইলে কথা বলছে, চ্যাটিং করছে, ছবি তুলছে। আরে বাবা চোখের বাস্তব রেটিনা দিয়ে দেখার অনুভুতির স্পর্শ কি ইলেকট্রনিক্স ডিসপ্লেতে পাওয়া যায়? দেখবেন, কেউ খালি চোখে কিছু দেখছেনা, সবাই মোবাইল আর ক্যামেরা ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে ছবি তোলায় ব্যস্ত। এসব আমার ভালো লাগে না। মানবী মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনছে। চাদের আলোয় এখন বোঝা যাচ্ছে আমার সংগিটি কি অসম্ভব সুন্দর! এতটা জীবন দুর থেকে যে মানুষগুলোকে দেখে মনে হতো ওরাকি সত্যিই মানুষ নাকি মোম দিয়ে তৈরী কোন প্রকার পুতুল? এতো নিখূঁত মানুষগুলোকে ইচ্ছে হতো একটু ছুয়ে দেখি সত্যি সত্যিই ওরা আমাদের মতো রক্তে মাংশে গড়া মানুষ কিনা। তেমনি একজন আমার এতোটা কাছে রয়েছে যেখানে হাত বাড়ালেই ছুয়ে দেয়া যায়! হালকা আলোয় গোলাপী আভা ছড়িয়ে পড়ছে যেনো। আমি বিস্ময় গোপন করে তাকিয়ে আছি। এতোটা বছর পার হয়ে আসা পুরোনো আমার মনের ভেতর কিযেনো একটা ভালোলাগা খেলা করতে থাকে। – বয়স কতো আপনার? হঠাৎ এমন একটি অপ্রাসংগিক ও ব্যক্তিগত প্রশ্ন শুনে কিছুটা অপ্রস্তুত হলাম। কিন্তু আগ্রহের অতিসয্যায় বলে দিলাম- – এবার ছাব্বিশ হলো। – এতোগুলো বছর পেরিয়ে এলেন কিন্তু এখনো প্রেম হলোনা, এটা কেমন হলো? মানবীর এমন কথায় আমি বিস্ময়ে অবাক হলাম আবার আশ্চার্য হলাম। – আপনি কি করে জানলেন যে আমি এখনো প্রেমে পড়িনি? – প্রেমে পড়েননি সেটা বলিনি, বলেছি প্রেম হয়নি। – কি করে বুঝলেন আমার প্রেম হয়নি? – বোঝা যায়, প্রেমে পড়া মানুষগুলোর জীবনধারা আপনার সাথে মিলেনা। একে অপরকে সময়ে সময়ে স্মরন করাই প্রেমে পড়া মানুষগুলোর প্রধান দায়িত্ব। আমি দেখছি তেমন কোন দায়িত্ব আপনার নেই। আমি ফোস করে নিঃস্বাস ছাড়লাম। কি বলবো তার কোন জবাব আমার আপাতত নেই। কিন্তু মানবী ইতিমধ্যে তার ধারন ক্ষমতা এবং ধারনা ক্ষমতার প্রমান দিয়েছে। – আপনারওতো দেখি একই অবস্থা? আপনার অবস্থানে থাকার পরে যদি দীর্ঘ সময় কারো খোজখবর পাওয়া না যায় তবেতো এতখনে ফায়ারসার্ভিস চলে আসার কথা? আমার কথা শুনে খিলখিল করে হেসে উঠলো মানবী। পাহাড়ের বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়লো এক অপার্থীব হাসির ধ্বনি। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। কাঁধ নাড়িয়ে হাসছে মেয়েটা। শরীরের দুলনিতে কেপে উঠছে আমাদের মাঝে থাকা ব্যাগ। আর সে ব্যাগের মৃদু স্পর্শ আমার দেহ আর মনকে আন্দলিত করে তুলেছে। হঠাৎ মনে হলো ব্যাগটা নয় মানবীর হালকা কোমল দেহটা আমাকে স্পর্শ করে আছে। অনুভুতির আনন্দে চোখ মুদে এলো আমার। মেয়েটি হাসি থামিয়ে বলল- – আপনি কি জানেন আপনার কথা বলার ধরনটা খুব সুন্দর? – তাই? নাতো, এমন কিছু কেউ এর আগে বলেনিতো? – বলেনি! আশ্চার্য আমার আগে এ কথাটি আপনি জানতেন না? – না, জানতাম না। তাছাড়া কেউ যে বলেনি তাতো আপনি জানেনই? – কেউ বলেছে কিনা, আমি কি করে জানবো? – কেউ যদি এমন কথা বলতো তবেতো আমার যা এতোদিন হয়নি তা হয়ে যেতো? কথাটা শুনে কপোট রাগ দেখিয়ে মানবী আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো- – মানে কি? আমি বলেছি মানে কি এই যে, আমি আপনার প্রেমে পড়েছি? এবার আমি হেসে উঠলাম। আমি জানি আর কিছু আমার সুন্দর হোক বা না হোক, আমার হাসিটা অসুন্দর নয়। – তার মানে, তার মানে। আসলে তার কোন মানে নেই। সব কথার মানে থাকে না। আমার কথা শুনে নয়, আমার হাসি দেখে মানবী অপলক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার মুখে এখন হাসি নেই। আছে কৌতুহল। কিছুখন পর মৃদু অথচ ধীর কন্ঠে সে বলল- – আ-প-না-র হাসি দেখেও কেউ আপনার প্রেমে পড়েনি? – নাতো! আপনিতো জানেনই, পেড়েনি। আমি তাৎক্ষনিক অদ্ভুতভাবে সাহসী হয়ে উঠলাম। আমার আজীবন লালিত ভালোলাগা, অকুতোভয় বীর যাকে আমি সব সময় আগলে রাখি, তাকে জবান খুলতে দিলাম- – প্রেমটা সহজ নয়। তাছাড়া ভাগ্যের সহযোগিতা ছাড়া শুধু মাত্র হাঁসি-ফাসিঁ দিয়ে মানুষকে প্রেমে ফেলা যায় না। যদি যেতো তবে এতখনে আপনিই হয়তো প্রেমে পড়ে যেতেন। বলেই আমার গগনভোলানো হাসিতে মাতিয়ে তুল্লাম সমস্ত কংলাকপাড়া পাহাড়। আমি হাসছি আর তাকিয়ে আছি মানবীর দিকে। সে কিছুটা অপ্রস্তুত ভাবে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমার হাসির ফোয়ারা থেকে পানি ঝড়া দেখছে, কিন্তু সে পানি পান করবে কিনা সে নিয়ে তুমুল দীধা দন্ধে পড়েছে। আমি একসময় হেসে ক্লান্ত হই। কিছুটা সময় মায়া হরিনীর আবছা চোখে চোখ রাখার চেষ্টা করতে থাকি। হঠাৎই আমার একটা কবিতা মাথা বেয়ে নেমে আসে ঠোটেঁ। “যখন তোমায় বসন্ত কাল তখন আমায় গ্রীস্ম, তোমার যখন কচি পাতা তখন আমি ভস্ম। তুমি যখন জলজ থাকো আমি তখন মৃন্ময়, তোমার জলে ফুলতো ফোটে আমার শুধু চিন্ময়।” কবিতার শব্দগুলোর ভাংগা ভাংগা প্রতিশব্দ ইথারে বাসতে থাকে। হয়তো কিছু খনের জন্য মানবী বিসৃত হয় গভীর কোন ভাবনায়। কবিতার কিছু শব্দ তার হৃদপিন্ডের দেয়ালে বিক্ষিপ্ত ভাবে ধাক্কা দিতে থাকে অনবরত। “বসন্ত কাল, কচি পাতা, জলজ, ফুলতো ফোটে” শব্দগুলো মাথার মধ্যে অনবরত প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। চরম বিস্বয়ে সে তাকিয়ে থাকে সামনে অনতিদুরে কাত হয়ে থাকা অনিন্দ সুন্দর মানুষটার দিকে। চাঁদের গাড় আলোয় এতখনের অস্পষ্ট মানুষটাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। একটা মানুষ যতটা সুন্দর হওয়া উচিত, যতটুকু সুন্দর থাকলে তাকে সুন্দর বলা যায় এছেলে ঠিক ততটাই সুন্দর। একটু কমওনা বেশিওনা। ইশ্ কি সুন্দর করে কথা বলে, ভাংগা ভাংগা উচ্চারনে, নান্দনিক ছন্দে। আর হাসি দেয়াটা দেখলে ইচ্ছে হয় হাত বাড়িয়ে ছুয়েঁ দিতে। চাইলেই হয়তো ছুয়েঁ দেয়া যায়। দুজনার মাঝে থাকা ল্যাদারের তৈরী ব্যাগটা যতোই দামি হোক কিংবা যতই ভেতরের জিনষগুলোতে ঝড়-বৃষ্টিথেকে বাধা দিয়ে রাখুক, ছুতেঁ বাধা সে দেবার নয়। কারো মুখে কোন কথা নেই। মনে হচ্ছে কোন দিন কথা বলতে পারেইনি ওরা। দুজন দুজনার দিকে তাকিয়ে আছে। সেখানে খেলা করছে আগ্রহ, কৌতুহল, রোমাঞ্চ আর সবচাইতে বেশি যেটা তাহলো “প্রেম”। সময় চলে যাচ্ছে। কারো কোন কথা নেই যেনো। এভাবে অনেকটা সময় কেটে যেতে পারতো। কিন্তু সহসাই ছেলেটি উঠে বসে। ব্যাগ খুলে পানির বোতল থেকে পানি খায়। মেয়েটি তাকিয়ে ছেলেটির অপরিপক্কভাবে উত্তেজনা ঢেকে রাখার চেষ্টা দেখতে থাকে আর ঠোটেঁর কোনে একটা দুষ্ট হাসি ঝুলিয়ে রাখে। পানি খেয়ে উঠে দাড়ায় ছেলেটি। একটা আড়মোড়া ভাংগে কোমড় বাঁকিয়ে। হালকা পায়ে হেটে উচু ডিবিটার আড়ালে গিয়ে হালকা হয়ে আসে। মৃদু বাতাসে ছেলেটির ইস্মৎ বড় চুলগুলো নেচে উঠে। কাপাল থেকে চুলগুলো সরিয়ে নিজের জায়গায় এসে বসে। মানবী এখন দুহাত মাথার নিচে দিয়ে অনন্ত নক্ষত্রভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। ছেলেটা এসে তার জায়গায় শুয়ে পড়েছে টের পায় মানবী। আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেই কথা বলে মানবী- – হালকা ধুসর আকাশটার দিকে তাকালে মন থেমে থাকে না। মন ছুটে জায় মিল্কিওয়ে পেরিয়ে সুপারনোভা হয়ে আরো অজানায়। ইউনিভার্স, মাল্টিভার্স এর আকার আকৃতি নিয়ে ভাববার জন্য এগুলোর চাইতোও আকৃতিতে বড় “মন” প্রয়োজন হয়। আর সৌভাগ্যক্রমে আমরা সব্বাই বিলিয়ন বিলিয়ন নিউরন নামক ইউনিভার্স ভর্তি মন মাথায় নিয়ে বসে আছি। – আপনার কথাগুলো খুব ভারি। আমার বোঝার সাধ্য নাই। কিন্তু শুনতে ভালো লাগে। আপনার মতোই আপনার চিন্তাগুলো। আপনার জীবনের গুল্প শুনতে ইচ্ছে করছে। শোনাবেন? – সরললেখা যদি চিনে থাকেন, তবে ধরে নিন আমার জীবনটা সরল রেখার মতোই। বলার মতো কোন বিষয়ই আমার নেই। বরং আপনার কথা বলেন। আপনার নাম এখনো জানিনি। – আমার নাম আরিয়ান। আইটিতে পড়ালেখা শেষ করে একটা কোম্পানির সাইট এডমিন হিসেবে স্বাধীন কাজ করছি। মা ছাড়া আমার বলতে আর কিছু নেই। গাজীপুরে বাবা বেচে থাকতে তার উপার্জনের টাকা দিয়ে তৈরী করা বাড়ীতে থাকি। আর সময় পেলে ঘুড়ে বেড়াই। আমার জীবনটা অনেকটাই বৈশিষ্টহীন বলা যায়। – আরিয়ান, আপনি কি কিছু মনে করবেন, আমি যদি আমাদের মাঝের ব্যাগগুলো সড়িয়ে আপনার আরো কিছুটা কাছে আসি? মুহুর্তেই হার্টবিট বেড়ে যায় আরিয়ানের। অনেকখন পুষে রাখা তার একান্ত মনের কথাটা মেয়েটা নিজে থেকে বলাতে খুশি লাগছে। মুখে কিছু না বলে হাত বাড়িয়ে দুটি ব্যাগ নিয়ে নিজের পেছন রাখে সে। মনের মধ্যে অন্যরকম একটি অনুভুতি। পারিপার্শিক অবস্থা, পরিবেশ সবকিছু বিস্মৃত হয়ে এখন তার মন চাইছে শুধু মেয়েটাকে জানতে। এরি মধ্যে মানবী কিছুটা এগিয়ে এসেছে। একে অপরের নিঃস্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। পাহাড়ি বিভিন্ন শব্দ ছাপিয়ে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দুজন মানব মানবীর ভারি নিঃস্বাসের গুঞ্জন। কারো মুখে এখন কোন কথা নেই। মাত্র পাঁচ ইঞ্চি ব্যবধানে দুজনের চারটি চোখ অনবরত পড়ে যাচ্ছে একে অপরের সকল কথা। তাদের মুখয়বয়ব অনুভুতি বিনিময় করছে। কখন যেনো দুজনের দুটি হাত পরস্পরের আগুলের ভাঁজে জড়িয়ে নিয়েছে। বিদুৎ প্রবাহ চলতে থাকে হাতের কোমল স্পর্শে। হাতের মতো করে আরো কাছে আসার সুযোগ খুজতে থাকে দুটি চঞ্চল দেহ। জীবনে অর্জন করা সকল মনুষত্ব, জড়তা, হিতাহিত জ্ঞান, সংস্কার, পাপবোধগুলোকে উড়িয়ে দিয়ে দুজন একেবারেই কাছে চলে আসতে চাইলে এখনই সে সময়। একে অন্যের গরম ও ভারি নিঃস্বাস অনুভব করছে। দুহাত মাঝে রেখে দুজন কাছে চলে এলো। নাকেরা পরস্পরের স্পর্শ পেলো। দুজোড়া হাটু বাঁকা হয়ে লেগে আছে পরস্পরের সাথে। দুজনের চোখই বন্ধ হয়ে গেছে অনেকক্ষন হলো। সময় থেমে গেছে যে সময়কে মিনিট সেকেন্ড দিয়ে মাপা যায়। অনেকগুলো হৃদস্পন্দন তাদের ছন্দ হারালো কিছু জানান না দিয়েই। অনতি দুরে ঝোপের মধ্যে বন মোরগ ডানা ঝাপটিয়ে বললো যেনো “কি হচ্ছে!”। দুরের বাঁকা চাঁদ লজ্জায় নিজেকে ইসৎ মেঘের আড়ানে ঢেকে নিলো। কিছুখন আগের দুর্দান্ত মেয়েটি হঠাৎই যেনো লজ্জাবদি লতার মতো আত্মসমর্পন করলো প্রকৃতির কাছে। আরিয়ানের ২৫ বসন্ত পেরুনো তপ্ত মরুতে হঠাৎই যেনো বইতে লাগলো সাইবেরিয়া থেকে আসা উষ্ণ আর শীতল বাতাস। হৃদয়ে দুটি দেহ হঠাৎই করে দেখা আত্মার পাপ মোচনে তাড়া নেই যেনো, ভালোবাসা ভালোলাগায় তাড়া নেই যেনো, ভুলের সায়রে ডুবিয়ে চুবিয়ে যা হয় তাতো পাপ মোচনের রোজনামচা নয়। ওহে ভুল, তুমি ভুলে যেও ভুলে- ভুলকে কবে করেছো বাজিগর। দুই চোখে আলো পড়ায় হঠাৎই চোখ খুলে গেলো আরিয়ানের। শোয়া থেকে বসে পড়লো। বোঝার চেষ্টা করলো কোথায় আছে সে। পাথরের চাতালে বসে আছে ও। হঠাৎই সব কিছু মনে পড়ে গেলো। আশে পাশে চোখ বোলালো। কোথাও মানবীকি দেখতে পাচ্ছেনা। রাতে কখন কিভাবে ঘুমিয়ে পড়েছে মনে নেই, কিন্তু দেড়ি করে ঘুমানোতে অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুম ভাঙ্গেনি। কিন্তু মানবী কোথায়? তার ব্যাগটাও নেই। আড়মোড়া ভেঙ্গে কিছুখন এদিক সেদিক হাটাহাটি করলো আরিয়ান। রাতে মানবী কোথাও গিয়ে অনেকক্ষন পর এসেছিলো। তাই অপেক্ষা করতে লাগলো সে। নিজের জামাকাপড় ঝেড়ে লেগে থাকা ধুলো ময়লা পরিস্কার করলো। অবাক হয়ে গতরাতের সকল কিছু ভাবতে লাগলো। কি থেকে কি হয়ে গেলো। হাজার কিছু পেড়িয়ে এসে কিনা পাহাড়েই শেষ পর্যন্ত প্রেমে মজলো? অবাক হয়ে পাথরের সেদিকটায় তাকিয়ে রইলো যেখানে রাতে মানবীর সাথে জীবনের সুন্দরতম সময় কাটিয়েছে। দিনের আলোয় কথাগুলো ভাবতে কিছুটা সংকোচও হলো তার। এমন নির্লজ্জ কোনকালেই ছিলনা আরিয়ান। কিন্তু মেয়েটার মধ্যে অসম্ভব একটি আকর্ষন আছে, যাকে এভয়েড করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। অনেকটা অসহিষ্ণু হয়ে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে আরিয়ান। সকাল ৮:১৭ বাজে। প্রায় ১ ঘন্টা হলো মানবীর জন্য অপেক্ষা করছে আরিয়ান। তার আসার নাম গন্ধ নেই। অনেকটা আশাহত হয়ে ব্যাগটি কাধেঁ নিয়ে এদিক সেদিক খুজতে লাগলো। খুব বেশি বড় এলাকা নয় কংলাকপাড়া। অল্পক্ষনেই পুরোটা দেখা হয়ে গেছে। চিবুক ঝুকে পেড়েছে নিরাশায়। বারবারই মনে হচ্ছে এই হয়তো মানবী তার স্বভাবসুলব হাসি দিয়ে সামনে এসে দাড়াবে। কিন্তু না, এলোনা। আরো অনেকটা সময় কেটে গেলো অপেক্ষায়। একসময় গভির নিরাশায় আরিয়ান বুঝতে পারে মানবী এখানে নেই। কেনো নেই, কোথায় গেছে তা ভাবতে ভাবতে ধীরে ধীরে পাহাড় থেকে নামতে থাকে ও। পাহাড়ের খাড়া পথে নামতে গিয়েও বারবার এদিক সেদিক তাকাচ্ছে আরিয়ান। হয়তো কোথায় বসে কিংবা দাড়িয়ে আরিয়ানের সাথে মজা করছে মানবী। অনেকটা অভিমান করেই হাটতে থাকে। ফিরে আসে লুসাই কটেজে। বন্ধুদের হাজারে প্রশ্ন বানে জর্জরিত হলো। ওদেরকে যাবার আগে বলে গিয়েছিলো তার রাতে ফিরতে দেরি হবে। তাই কেউ কোন টেনশন করেনি। কিন্তু সকালে যখন দেখলো আরিয়ান ফিরেনি তখন কিছুটা টেনশনে পড়ে সবাই। ফোন দিয়ে দেখে ফোন বন্ধ। আরিয়ান জানালো রাতে বাইরে ঘুড়েছে। একসময় ক্লান্ত হয়ে একজায়গায় ঘুমিয়ে পড়েছিলো। সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়ে রুমে গিয়ে শুয়ে পড়েছে। দুপুরে খেতে যাবার জন্য ডাকতে আসলে বন্ধুদের সাফ জানিয়ে দিয়েছে এখন খিদে নেই, খাবেনা। যখন ঘুম ভাংলো তখন দুপুর পেড়িয়ে বিকেল। দ্রুত গোসল সেড়ে কাপড় পড়ে বাইরে বেরুলো। বন্ধুরা আগেই বেড়াতে চলে গেছে। ৩দিনের ট্যুারে প্রতিটা সময় কাজে না লাগালে ট্যুারটাই মাটি হয়ে যায়। আজ ট্যুরের দ্বিতীয় দিন। খুব বেশি মনখারাপ আরিয়ানের। অল্প সময়ের পরিচয় হলেও মনে হলো যুগযুগান্তর ধরে তাদের সম্পর্ক। মানবীর প্রতিটা কথা প্রতিটা নিঃস্বাস আর স্পর্শ স্বত্বায় যেনো মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। অথচ ফোন নম্বর কিংবা ঠিকানা কোন কিছুই জানা হয়নি। নাম আর কটেজের নামকে ভরসা করে খুজবে বলে ঠিক করলো আরিয়ান। লীলাবতি হোটেলেই ওরা খাবার খায়। এখানকার মালিকের নাম টিংটিং। খাবার খেতে বসে তাকে কাছে ডাকল আরিয়ান। জিজ্ঞেস করলো- – তোমাদের সাজেক ভ্যালিতে কতগুলো কটেজ আছে তুমি জানো? – সঠিক বলতে পারবো না, তবে তিনশর বেশি হবে। – তাদের নাম জানো? – সবগুলো জানিনা, তবে বেশিরভাগই জানি। – কাঠবিড়ালী কটেজটা কোন পাশে বলতে পারো? – কাঠবিড়ালী? এ নামে কোন কটেজের নামতো শুনিনি স্যার? – কি বলো? তুমি মনে করে দেখো। – না, এ নামে কোন কটেজ নেই। আর যদি নতুন হয়ে থাকে তবে আমার জানা নেই। কিছুটা নিরাশ হলো আরিয়ান। কিন্তু নিরাশ না হয়ে খাবার শেষ করে খুজতে লাগলো। প্রায় ঘন্টা খানেক খোজার পর যা জানলো তাহলো কাঠবিরালী নামে কোন কটেজ কিংবা হোটেল এই সাজেক ভ্যালীতে নেই। সর্বোচ্চ পরিমান হতাশ হয়ে রাস্তার পাশের একটি বেঞ্চে বসে পড়লো আরিয়ান। চোখ ভেঙ্গে কান্না আসছে তার। বুঝে উঠতে পারছেনা কি করবে এখন ও। কোথায় গেলো মানবী? কোন বিপদে পরলোনাতো? কিন্তু কটেজের নাম নিয়ে মিথ্যা বললো কেনো? এখানে বিপদের পড়ার মতো কোন কিছু হবার কথা নয়। তাহলে কোথায় মিলিয়ে গেলো মানবী? মাথায় হাত দিয়ে অনেকক্ষন বসে রইলো। বন্ধুদের কাছ থেকে ফোন এলো। ওরা সবাই মিলে কংলাকপাড়ায় যাবে। আরিয়ান উঠে দাড়ালো। তার মন বলছে ওখানে গেলে হয়তো মানবীর দেখা পাবে। বন্ধুদের সাথে কংলাকপাড়া পাহাড়ে উঠলো আরিয়ান। ছুটে গেলো যেখানটাতে ওদের দুজনের প্রথম দেখা হয়েছিলো। পাহাড়ের কংকর মাটিতে পরিচিত কোন চিহ্ন নেই। ছুটে গেলো পাথরের চাতালে যেখানে দুজনের পরিচয় পরিনয় পর্যন্ত গড়িয়েছে। না, সেখানেও কিচ্ছু নেই। বিকেলের এই সময়ে কয়েকশত মানুষ এখানে ভিড় করে। তাদের মধ্যে থেকে পরিচিত একটি মুখ খুজে বের করার জন্য পাগলের মতো ঘুড়েবেড়ালো। সন্ধ্যা হওয়াতে সকলের সাথে সেও নেমে এলো পাহাড় থেকে। অনেক চিন্তার পর সিদ্ধান্ত পৌছালো আরিয়ান। হয় কেউ একজনের সাথে রাতে তার দেখা হয়েছিলো কিন্তু সে কোন কারনে আর কোন যোগাযোগ রাখতে চাচ্ছেনা অথবা সম্পুর্ণ ব্যপারটাই একটা হেলুসিনেশন। হঠাৎ করে বিশাল কিছু পাওয়া যেমন খুশির জোয়ার বয়ে আনে তেমনি সে বিশাল জিনিশটা যদি হঠাৎ করে হাড়িয়ে যায় তবে জীবন-মন ভেংগে খান খান করে দেয়। ভাংগা মন নিয়ে লীলাবতি হোটেলে বসে কফি খাচ্ছে আরিয়ান। সামনে খফি কাফ থাকলেও তার দৃষ্টি ওখানে নেই। টিংটিং এগিয়ে এসে আরিয়ানের সামনের বেঞ্চটিতে বসলো। – স্যার, কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো স্যার? – হুম, বলো। – স্যার, আপনি কি কাউকে খুঁজছেন? – হুম, কেনো? – যাকে খুজছেন তার কোন ছবি কিংবা পরিচয় আছে আপনার কাছে? – শুধু নাম জানি, মানবী? আর কিছু জানিনা। – তার সাথে কোথায় পরিচয় আপনার? স্যার আপনাকে আমার ভালো মানুষ বলে মনে হয়েছে। এর আগেও যতবার এসেছেন আপনি আমার হোটেলে খাবার খেয়েছেন। আপনি অন্যদের চাইতে আলাদা। তাই আপনার মন খারাপের কারন জানতে চাচ্ছি। – আসলে, ব্যপারটা অনেকটাই ব্যক্তিগত। কিন্তু তুমি যেহেতু নিজ থেকে জানতে চাচ্ছ তাই বলছি। মেয়েটার সাথে গতকালই আমার দেখা হয়েছে। কংলাকপাড়ায়। সেখানে তার সাথে আমি অনেকটা সময় ছিলাম। অনেক কথা হয়েছে, কিন্তু তার কোন ঠিকানা কিংবা ফোন নম্বর নেইনি। – আমি গোপন রাখব এই শর্তে আপনার কাছে জানতে চাইবো আপনার সাথে মানবীর কখন দেখা হয়েছিলো? আরিয়ান বুঝতে পারছে মানবীর সাথে আর তার দেখা হবার সুযোগ নেই। কিন্তু মনের ভেতরকার আবেগ চেপে রাখতে পারছে না। চোখের কোনে হালকা পানি চিকচিক করে উঠলো। হাতের টিসু দিয়ে পানি মুছে নিয়ে আশে পাশে তাকালো আরিয়ান। তারপর মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে বলল- – গতকাল সন্ধ্যার পর হতে গভির রাত পর্যন্ত আমি তার সাথে ছিলাম কাংলাকপাড়া পাহাড়ে। কিছুটা অবাক হয়ে টিংটিং তাকিয়ে রইলো আরিয়ানের দিকে। কিছু একটা বলবে বলবে করেও শেষ পর্যন্ত চুপ করে গেলো। কিছু যেনো বোঝার চেষ্টা করছে টিংটিং। অবশেষে মুখ খুলল সে- – স্যার, আগামীকাল ভোর বেলা সুর্য উঠার আগে আপনি আমার হোটেলের সামনে আসবেন। আমি আপনাকে একটি জায়গায় নিয়ে যাবো। হয়তো আপনার মানবীকে আমি এনে দিতে পারবো না কিন্তু আপনার মনের মধ্যে জমে থাকা অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর পেতে সাহায্য করতে পারবো। বোবা দৃষ্টি দিয়ে আরিয়ান তাকিয়ে রইলো টিংটিং এর দিকে। হাত বাড়িয়ে টিংটিং এর হাতটা ধরলো আরিয়ান- – প্লিজ টিংটিং, তুমি আমাকে সাহায্য করো। আমি আর নিতে পারছি না। তাছাড়া আগামীকাল আমাদের ফিরে যাবার দিন। পুরো ব্যপারটা বুঝতে না পারলে আমিতো প্রতি মুহুর্তে মরে যাবো। – চিন্তা করবেন না, আগামীকাল সকালে দেখা হবে। তিন সুর্য এখানো উঠেনি। আমি আর টিংটিং দাড়িয়ে আছি একটা অস্পষ্ট কবরের পাশে। কেউ বলে না দিলে এটাকে কেউ কবর হিসেবে বুঝতে পারবে না। কংলাকপাড়ার একেবারে পশ্চিম পাশে যেখানটাতে ঝোপঝাড়ের কারনে কেউ যেতে পারেনা সেখানটায়। অনেক কসরত করে সেখানটায় যেতে হলো আমাদের। ছোট্ট একটা পাথরের প্লেট দাড় করানো আছে। তাতে একজনের নাম ও মৃত্যু তারিখ দেয়া। নামটা অস্পষ্ট কিন্তু তারিখটা ৪ বছর আগের। নিচু হয়ে নামটা পড়ার চেষ্টা করলাম। টিংটিকে জিজ্ঞেস করাতে নাম বলতে পারলোনা। জানালো কবছর আগে কোন এক বর্ষার সময় একটা মেয়ে উঠে যায় পাহাড়ে। বজ্রপাত হচ্ছিলো বলে আর কেউ ছিলনা পাহাড়ে। সেদিনই বজ্রপাতে মারা যায় মেয়েটি। অনেক খোজাখুজি করেও তার কোন পরিচয় জানতে পারেনি এখানকার মানুষ। তাছাড়া একেবাড়ে পুরে ছাই হয়ে যায় মানুষটা। তার চেহারাও চেনার উপায় থাকে না। আমাদের পাহাড়ী নিয়ম অনুযায়ী এমন বজ্রপাতে মারা যাওয়া মানুষদের আমরা মৃত্যুর স্থানেই করবস্থ করে থাকি। আতি প্রাকৃতিক কিছুতে আমার কোন বিশ্বাস ছিলোনা কোন কালে। কিন্তু এবার বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝে ব্যবধানটা কমে এলো। সকাল ৮টায় কটেজে ফিরে এলাম। বন্ধুরে সবাই চেপে ধরলো। গত দুদিনের আমার উল্টাপাল্টা আচরনের কৌফিত চাচ্ছে সবাই। “মন ভালো নেই”- এমন সোজা জবাব দিয়ে এড়িয়ে যেতে পারলাম না। কারন দর্শাতে হলো। আর দুঘন্টা পর আমাদের গাড়ি ছেড়ে যাবে। মন খারাপের মধ্যেই মনে হলো বন্ধুদের সাথে শেয়ার করি। সমস্ত ঘটনা খুলে বল্লাম। কেউ কেউ জড়িয়ে ধরে ইয়ার্কি করলো। কেউ অভিনয় করে দুঃখ প্রকাশ করলো। কেউ কেউ ভৌতিকতা ছোয়া ব্যপারটা শুনে চুপ করে গেলো। আমার বন্ধুদের মধ্যে রসিক বন্ধু ফাইমন বললো- – বন্ধু আমার জীবনের প্রথম প্রেমে পড়লো, তাও কিনা পরি’র সাথে। বলেই সবাই হাসতে লাগলো। হাসির সাথে আমি যদিও একাত্ব হতে পারিনি কিন্তু নিজেকে খুব অভাগা অভাগা মনে হতে লাগলো। ধীরে ধীরে দুরে সরে যাচ্ছে সাজেক ভ্যালী। ফোরহুইল জীপ গাড়িটা ছুটে চলেছে ফিরতি পথে। আরিয়ান তাকিয়ে আছে পেছনে ফেলে আসা সাজেরে উচু চুড়া কংলাকপাড়ার কাঠামোর দিকে। মনের কোনে পুঞ্জিভুত হতাশা আর নিরাশাগুলো নিঃশব্দের বেড়িয়ে এলো। না পাওয়া থেকে পেয়ে হারাবার অসহ্য কষ্ট আসলেই যে অসহ্য তা অনুভব করছে সে। দুআঙ্গুল দিয়ে চোখ মুছে জোড় করে সম্মুখে দৃষ্টি ঘুড়িয়ে নেয় আরিয়ান। দুমড়ে মুচড়ে ‍উঠা হৃদপিন্ডটার সহসাই যেনো বাধ ভেংগে যায়। মাথা নুইয়ে অশ্রু গোপন করলো সে। শেষ ———————— লেখকঃ গল্প এখানেই শেষ হতে পারতো যদি পরবর্তীতে আরিয়ানের সাথে আরো একবার মানবীর দেখা না হয়ে যেতো। কিন্তু সেটা অন্য এক গল্প। তার নাম দেয়া যাক “মৃন্ময়ীই”


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৯৯ জন


এ জাতীয় গল্প

→ প্রিয় মৃন্ময়ী

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...