বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ফেলুদার শিক্ষক ত্রিলোকেশ্বর

"মজার গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Ridiyah Ridhi (০ পয়েন্ট)



X জন হেক্টরকে নিয়ে একটা কৌতূহল জাগছে মনের মধ্যে। জন হেক্টর মানে শ্যামবাজারের সেই লবণ ব্যবসায়ী, যিনি ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থকড়ি ঋণ করে কলকাতা থেকে হাওয়া হয়ে গেছেন। ফিরে গেছেন নিজ দেশ আয়ারল্যান্ডে। স্টেটসম্যান পত্রিকায় কয়েক দিন ধরে তাঁকে নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে। আমি অবশ্য স্টেটসম্যান পড়ি না। কোনো পত্রিকাই পড়ি না। সমকালীন জগৎ থেকে যতটা পারা যায় দূরে থাকার চেষ্টা করি আমি। তবু হেক্টরের ব্যাপারটা আমার কানে এল। আজ কলেজের টিচার্স কমনরুমে তাঁকে নিয়ে জোর আলোচনা চলছিল। দুপুরটায় আজ বেজায় গরম পড়েছিল। কলেজের পাশে হেদুয়াপুকুর থেকে উঠে আসা একটা ভ্যাপসা বাতাসে কেমন হাঁসফাঁস অবস্থা। আমি কমনরুমের জানালা দিয়ে নিচে পুকুরের নিস্তরঙ্গ জলতলের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, মাছেদের দেহে একটা বাড়তি ইন্দ্রিয় থাকার সম্ভাবনা কতটুকু। এমন সময় পাশে বসা সমাজবিজ্ঞানের তীর্থঙ্কর চ্যাটার্জি আমাকে উদ্দেশ করে বলে উঠলেন, ‘কী ত্রিলোকেশ্বর, কী বুঝলেন তাহলে?’ আমি সংবিৎ ফিরে পেয়ে কী বলব, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কারণ, তীর্থঙ্করবাবু ঠিক কী বিষয়ে আমার মন্তব্য চাইছেন, সেটা আমি ঠাহর করতে পারছিলাম না। আমি কিছু শুনছিলাম না। এমনিতে টিচার্স কমনরুম আমার সময় কাটানোর জায়গা নয়। দুই পিরিয়ডের মাঝখানে ফাঁক পেলে আমি মধ্যবর্তী সময়টা দোতলায় লাইব্রেরি রুমে কাটিয়ে দিতে পছন্দ করি। তবে আজ লাইব্রেরি রুমে ফ্যান চলছে না বলে গরমে সেখানে তিষ্ঠানো দায়। বাধ্য হয়ে আমি টিচার্স কমনরুমে এসেছি এবং কলেজের সবচেয়ে জুনিয়র শিক্ষক হিসেবে বসেছি দেয়াল ঘেঁষে পেতে রাখা চেয়ারগুলোর একটায়। শিক্ষকদের আলোচনায় আমার কান ছিল না। এ জন্য তীর্থঙ্করবাবুর প্রশ্নে আমি অপ্রস্তুত ভাব লুকানোর চেষ্টা করছিলাম। বললাম, কোন ব্যাপারটায়? ও মা, আপনি কিছুই শুনছিলেন না বুঝি! জন হেক্টর, যিনি টু ক্রোড় রুপি মেরে দিয়ে পগার পার। ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট নিয়ে আপনাদের এ যুগের ছেলেপেলেদের যে কোনো আগ্রহ নেই, এটা কি কোনো কাজের কথা ত্রিলোকেশ্বর? ইংরেজরা দেশটা স্বাধীন করে দিয়ে গেছে বটে, কিন্তু ধনসম্পদ লুটের পুরোনো অভ্যাস তারা ত্যাগ করতে পারল কই? এখানে একটা জাতীয় পুঁজির বিকাশ ওরা হতে দেবে না। ষড়যন্ত্র। কী নাম বললেন ভদ্রলোকের? জন হেক্টর। পরদিন আমি জন হেক্টরের বাসভবনে গেলাম। শ্যামবাজারে। লোকটা আমার কৌতূহল কেড়েছে। তাঁর অগাধ ধনসম্পদ বা প্রাসাদোপম বাড়ি কিংবা তাঁর অভিনব আর্থিক কেলেঙ্কারি নয়, আমার কৌতূহলের মূলে জন হেক্টরের চিড়িয়াখানা। পত্রপত্রিকায় কয়েক দিন ধরে এই আইরিশ ভদ্রলোককে ঘিরে যেসব কেচ্ছাকাহিনি লেখা হচ্ছে, তার মধ্যে টীকাটিপ্পনী আকারে খুবই অগুরুত্বপূর্ণভাবে এসেছে এই চিড়িয়াখানার প্রসঙ্গ। অমৃতবাজার-এর পঞ্চম পৃষ্ঠায় ছোট্ট একটা রিপোর্টে আমি চিড়িয়াখানার উল্লেখ পেয়েছি। জন হেক্টর মেছুয়াবাজারে একটা সিনেমা হল ও হাওড়ায় একটি ডিস্টিলারির পাশাপাশি অন্য আর যে একটি জিনিসের গর্বিত মালিক ছিলেন, তা হলো চিড়িয়াখানা। কলকাতা শহরের মর্মস্থলে একমাত্র প্রাইভেট চিড়িয়াখানা। আলীপুর চিড়িয়াখানার মতো অত বিশাল না হলেও তাতে একটি সিংহ, দুটি বেঙ্গল টাইগার, চারটি চিতা, দুটি হাতি, একটি জিরাফ এবং আরও বেশ কিছু পশুপাখি ছিল। এগুলোর খাঁচা ছড়ানো ছিল একটি বিস্তীর্ণ পারিবারিক উদ্যানে। ‘ছিল’ বলছি, কারণ জন হেক্টর আর তাঁর ধনসম্পদের পাশাপাশি চিড়িয়াখানাটিও হাওয়া। খাঁচা শূন্য। এই প্রাণীগুলো কোথায় গেল, এ নিয়ে কাউকে বেশি তটস্থ হতে দেখলাম না। যাওয়ার আগে হেক্টর প্রাণীগুলোকে ছেড়ে দিয়ে থাকলে সেটা যে কী ভয়ংকর একটা ব্যাপার হবে, ভেবে কারও রক্ত হিম হয়ে আসছে না। ডালহৌসি স্কয়ারে ট্রামলাইনের ওপর একটা আফ্রিকান সিংহকে বসে থাকতে দেখলে বা পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাতে বা শোভাবাজারের মোড়ে একটা রয়েল বেঙ্গলকে হাইড্র্যান্ট থেকে গড়িয়ে পড়া পানি চেটে খেতে দেখলে, এটা কারও মনে করার অবকাশ থাকবে না যে ওগুলো কুমারটুলীর কুমারদের বানানো স্ট্যাচু। কলকাতা শহরজুড়ে তখন একটা হুলুস্থুল অরাজকতা নেমে আসবে। ভদ্রলোক নিজে যেভাবে কলকাতা বন্দর থেকে জাহাজে চেপে চম্পট দিয়েছেন, অতিকায় জন্তুজানোয়ারদের নিয়ে সেভাবে সটকে পড়া যে সম্ভব নয়, এ চিন্তা কারও মাথায় আসছে না। আমি স্কটিশ চার্চ কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক। আমার যুক্তিবাদী মন বলল, এখানে ডালের মধ্যে আলবত কিছু কালা আছে। ফলে পরদিন বিডন স্ট্রিটে আমার ছোট্ট বাসা থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি হেঁকে বললাম, ‘শ্যামবাজার’। আমরা ট্যাক্সি থেকে নেমে দেখি একদল লোক ফিতা দিয়ে ভেতরে মাপামাপি করছে। তাদের ওপর খবরদারি করছেন যে পাঞ্জাবি পরা মধ্যবয়সী ভদ্রলোক, তিনি রাজেশ আগরওয়াল। জায়গাটা তিনি কিনেছেন হেক্টরের কাছ থেকে। ওই দিন শ্যামবাজার অভিযানে আমার সঙ্গে আরেকজন ছিল। তার নাম প্রদোষচন্দ্র মিত্র। তাকে আমি হাতিবাগান থেকে ট্যাক্সিতে তুলে নিয়েছিলাম। প্রদোষচন্দ্র সম্পর্কে এখানে কিছু বলে রাখা ভালো। প্রদোষ স্কটিশ চার্চ কলেজে আমার ছাত্র। ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ার। ১৯ থেকে ২০ বছর বয়সী এই তরুণের প্রখর বুদ্ধিমত্তা আর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আমাকে নিয়মিত বিস্মিত করে থাকে। এই তো সেদিন শ্রেণিকক্ষে আলোর ব্যতিচার পড়াতে গিয়ে আমি যখন দেখলাম, পকেটের চশমাটা খুঁজে পাচ্ছি না এবং স্মরণ করতে পারছি না সেটা কোথায় ফেলে এসেছি, তখন ছাত্রদের মধ্যে প্রদোষ দাঁড়িয়ে বলল, সেটা ডাফ স্ট্রিটে ওষুধের দোকানের কাউন্টারে পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, কেননা আমি বিডন স্ট্রিট থেকে বেরিয়ে হেঁটে সেখানে গেছি এবং ওষুধ কিনে হেঁটে কলেজে এসেছি। আমি কলেজের একজন পিয়ন পাঠিয়ে চশমাটা সেখান থেকে আনিয়ে ওই দিনই লাইব্রেরি কক্ষের নির্জনে তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমাকে সে ডাফ স্ট্রিটের ওষুধের দোকানে যেতে দেখেছে কি না। প্রদোষ বলল, সে দেখেনি। অনুমান করেছে। কীভাবে? কারণ, আশপাশে একমাত্র ডাফ স্ট্রিটে কয়েক দিন ধরে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলছে। ওখানকার ফুটপাতে যে লালচে রঙের কাদা লেগে থাকে, আমার জুতাতেও ওই একই কাদা লেগে ছিল, যেটা তখনো শুকায়নি। কিন্তু ডাফ স্ট্রিটে ওষুধের দোকানেই যে গেছি, সেটা কীভাবে নিশ্চিত হওয়া গেল? প্রদোষ বুঝিয়ে যা বলল, তার সারসংক্ষেপ হলো, ক্লাসে ঢুকে আমি পকেট থেকে একটা বাদামি রঙের প্যাকেট বের করে সেখান থেকে ওষুধ খেয়েছি। ওষুধ আগে কেনা থাকলে বাদামি প্যাকেটটা থাকত না। ওষুধের দোকানে ঢোকা পর্যন্ত যে আমার চোখে চশমা ছিল, সেটা নিশ্চিত, কেননা আমি প্রেসক্রিপশন পড়ে ওষুধের নাম বলেছি। ওষুধের দোকানে যাওয়ার কারণে আমার ক্লাসে ঢুকতে তিন মিনিট দেরি হয়েছে, যা সচরাচর হয় না। তার মানে দোকান থেকে হনহন করে সোজা ক্লাসে। তাতে ব্যাপার দাঁড়ায় এই যে অন্য কোথাও চশমা ফেলে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তো, এই হলো প্রদোষচন্দ্র মিত্র। ছিপছিপে সুদর্শন এক তরুণ, যে সায়েন্সে পড়ে, অথচ যার আগ্রহের বিষয় ইতিহাস। আমাদের মধ্যে বয়সের ব্যবধান খুব বেশি নয়। বড়জোর সাত থেকে আট বছর হবে। অতিশয় মেধাবী হওয়ার কারণে আমি অল্প বয়সে পড়ালেখা শেষ করে মাত্র ২০ বছর বয়সে স্কটিশ চার্চ কলেজে শিক্ষকতায় ঢুকেছি। শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই বয়সে আমার কাছাকাছি হলেও আমার চেহারায় একটা ভারিক্কি ব্যাপার থাকায় শ্রদ্ধাভক্তিতে ঘাটতি পড়ে না। আর তা ছাড়া অল্প বয়সে আমার মাথার চুল পড়ে যেভাবে একটা টাক উঁকি দিচ্ছে, তাতে আমাকে রীতিমতো বুজুর্গ ব্যক্তিদের মতো দেখায়। শিক্ষকতা করতে আমার ভালো লাগে না। আমি বড়জোর আর বছর দুয়েক এখানে ছাত্র পড়িয়ে গিরিডিতে ফিরে যাব। সেখানে একটা বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার গড়ে তোলা আমার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। বাবা ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কুও চিঠি লিখে তাগাদা দিয়ে চলেছেন। বলছেন কলকাতায় বিদেশ-বিভুঁইয়ে পড়ে না থেকে গিরিডিতে থাকতে। হাতিবাগান থেকে ট্যাক্সিতে চড়েই প্রদোষ বলল, জাহাজে জন হেক্টরের সঙ্গে দুটি বড় স্যুটকেস ছিল। সেগুলো তিনি সঙ্গেই রেখেছিলেন। লাগেজ কাউন্টারে দিয়েছিলেন একটা কাঠের বাক্স। লম্বাটে। পাঁচ ফুট বাই দুই ফুট। অনেকটা কফিনের মতো। তার সঙ্গে যাত্রাসঙ্গী আর কেউ ছিল না। তুমি এত সব জানলে কী করে? কাল আপনি বলার পর বন্দরে চলে গিয়েছিলাম, স্যার। আমার এক পরিচিত ওখানে কাজ করে। শাবাশ। আমি প্রদোষের পিঠ চাপড়ে দিলাম। ছেলেটা আমাকে মুগ্ধই করে যাচ্ছে। জন হেক্টরের বাড়িটা বাউন্ডারিঘেরা। ভেতরে একটা দোতলা ম্যানশন আর একটা উদ্যান। উদ্যানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পশুপাখির খাঁচা। আমরা ট্যাক্সি থেকে নেমে দেখি একদল লোক ফিতা দিয়ে ভেতরে মাপামাপি করছে। তাদের ওপর খবরদারি করছেন যে পাঞ্জাবি পরা মধ্যবয়সী ভদ্রলোক, তিনি রাজেশ আগরওয়াল। জায়গাটা তিনি কিনেছেন হেক্টরের কাছ থেকে। এখন মেপেটেপে নিচ্ছেন। কবে কিনেছেন? দিন সাতেক আগে। চিড়িয়াখানার কেয়ারটেকার মাধব মণ্ডল আর বাগানের মালি দীপঙ্কর সুতার জানাল, পশুপাখিগুলো কারও কাছে বিক্রি করা হয়েছে, তাদের এমন মনে হয়নি। হেক্টর যেদিন বিদায় নেন, তার আগের রাতেও কেয়ারটেকার কাজ করেছেন চিড়িয়াখানায়। বিকেলে পশুগুলোকে খাবার দিয়েছেন। মাধব জানাল, পশুগুলোকে হুট করে কোথাও নেওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে বাঘ আর সিংহকে খাঁচা থেকে বের করা রীতিমতো দুই দিনের একটা বিশেষ আয়োজনের বিষয়। জনা পাঁচেক প্রশিক্ষিত লোক লাগে। আর পুরো শহরকে না জাগিয়ে হাতি ও জিরাফ সরানো তো সম্ভবই নয়। তাহলে পশুগুলো গেল কোথায়—মাধবের কাছে তা এক রহস্য। আপনি থাকেন কোথায়? প্রদোষ জানতে চাইল। মাধব বলল, আগে বাগানের ভেতরে তাদের দুজনেরই দুটি থাকার ঘর ছিল। সপরিবার। সপ্তাহখানেক ধরে দুজনে থাকছেন সাতপুকুরের কাছে একটা বস্তিতে। কেন? সাহেব কেন যেন রাতে থাকতে দিচ্ছিলেন না। উনি ঘরভাড়ার টাকা দিয়ে দিয়েছেন। আমি আর প্রদোষ তাকালাম পরস্পরের দিকে। রাজেশ আগরওয়ালের কাছে অনুমতি নিয়ে আমরা হেক্টরের ম্যানশনে ঢুকলাম। তার স্টাডিরুম দেখা হলো। বইপত্র বিশেষ কিছু নেননি। কাগজপত্র পড়ে আছে পড়ার টেবিলে। বাড়ির পেছনের দিকে একটা এক্সটেনশন। সেখানে একটা লম্বা গুদামঘরের মতো কক্ষে গিয়ে আমার ভ্রু কুঁচকে গেল। লম্বা একটা টেবিলে যেসব যন্ত্রপাতি, সেগুলোর সঙ্গে লবণ ব্যবসার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। বিশেষ করে চুম্বকক্ষেত্র আর ইলেকট্রিক চার্জ পরিমাপের যন্ত্রপাতি দিয়ে তিনি কী করতেন, আমার মাথায় ঢুকল না। বাবা দর্শন দেন সন্ধ্যাবেলা। এই ভরদুপুরে তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ নেই। আমরা বললাম, একটা বিশেষ কাজে বাবার কাছে এসেছি। আমরা ঠিক দর্শনার্থী নই। ফেরার পথে ট্যাক্সিতে চেপে আমি প্রদোষকে বললাম, টেলিপোর্টেশন। প্রদোষ প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে থাকল। আমাদের এই আইরিশ সাহেব টেলিপোর্টেশন নিয়ে গবেষণা করছিলেন, আমি সেটা হলফ করে বলতে পারি। আমি কোটের পকেট থেকে কয়েকটা দুমড়ানো কাগজ তুলে দিলাম প্রদোষের হাতে। প্রদোষ সেগুলো খুলে চোখ বোলাতে লাগল। এগুলো আমি কুড়িয়ে নিয়েছি হেক্টরের স্টাডিরুমের মেঝে আর ওয়েস্টপেপার বিন থেকে। কাগজে দুর্বোধ্য ডায়াগ্রামের আঁকিবুঁকি আর গাণিতিক চিহ্ন। প্রদোষ কাগজগুলো ফিরিয়ে দিয়ে বলল, সে এসবের কিছুই বুঝতে পারছে না। আমি বললাম, পদার্থবিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক হিসেবে বলি, জন হেক্টর টেলিপোর্টেশন নিয়ে গবেষণা করছিলেন। বুঝলাম, কিন্তু জিনিসটা কী? একটা বস্তুকে এক জায়গা থেকে তড়িৎগতিতে আরেক জায়গায় স্থানান্তর। বস্তুটিকে বিদ্যুৎ কণায় রূপান্তর করে সেটাকে আরেক স্থানে পরিবাহিত করে আবার বস্তুতে রূপান্তর। ধরো একটা কাচের গ্লাসকে তুমি ইলেকট্রন-প্রোটন কণিকায় রূপান্তর করে সেটাকে আরেক স্থানে নিয়ে গেলে। তারপর সেখানে একটি রিসেপ্টরে এটাকে গ্রহণ করে আবার ইলেকট্রন-প্রোটনকে গ্লাসে রূপান্তর করে ফেললে। এটা সম্ভব? প্রায় অসম্ভব। কেউ সফল হয়নি। আমার নিজের এ নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছিল এককালে। কিছু ঘাঁটাঘাঁটি করেছিলাম। নিজে গবেষণার যে ইচ্ছা জাগেনি, তা বলব না। কিন্তু সেটার জন্য গবেষণাগার দরকার। যন্ত্রপাতি দরকার। আমার এসব কিছুই নেই। লবণ ব্যবসায়ী কী করে পদার্থবিজ্ঞানের অগ্রসর বিষয়ে গবেষণা করেন? এ কথা ভাবছিলাম বিকেলবেলা দোতলার বারান্দায় আরামকেদারায় হেলান দিয়ে। নিচে বিডন স্ট্রিটের মৃদু কলরোল পাক খেয়ে উঠে আসছে ভ্যাপসা গরমের মতো। শানবাঁধানো রাস্তা দিয়ে মোটরগাড়ি ছুটে চলছে, তাদের এলোমেলো হর্ন বাজানোর শব্দ। দামি ঝকঝকে সব মোটরগাড়ি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দ্রুত একটা নতুন ধনিক শ্রেণি যে গড়ে উঠছে, এটা সবচেয়ে ভালো বোঝা যায় রাস্তায় মোটরগাড়ির দিকে তাকালে। আমি অবশ্য মোটরগাড়ি চিনি না। প্রদোষ এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। সে-ই আমাকে চিনিয়েছে কোনটা হাডসন জেট, কোনটা ওপেল আর কোনটা রেনল্ট। একদিন তো রাস্তায় একটা গাড়ি দেখে ও ‘ক্রাইসলার ইমপেরিয়াল’ বলে এমন চিৎকার করে উঠেছিল, আমি চমকে উঠেছি। জন হেক্টরের ঠিকুজি বলছে, তিনি কেমব্রিজে গণিত আর পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। লবণের ব্যবসা পারিবারিক সূত্রে পাওয়া এবং তাতে তাঁর মন ছিল না। স্টাডিরুমের বইপত্র জানান দেয়, পদার্থবিদ্যা তাঁর ধ্যানজ্ঞান ছিল। বিশেষ করে বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় বলের ব্যাপারে তাঁর ঝোঁক স্পষ্ট। কিন্তু কোনো বিষয়ে তাত্ত্বিক কৌতূহল এক জিনিস আর সে বিষয়ে ব্যবহারিক গবেষণাকর্ম আরেক। দ্বিতীয়টির জন্য যে অভিনিবেশ দরকার, সেটা হেক্টরের পক্ষে দেওয়া সম্ভব বলে কিছুতেই মনে হচ্ছে না। প্রদোষ পাকা খবর এনেছে, চিড়িয়াখানা ট্রান্সফার হয়ে গেছে আয়ারল্যান্ডের মফস্বল শহর কার্লিংফোর্ডে। স্টেটসম্যান-এর বেলফাস্ট প্রতিনিধি এটুকু জানাতে পেরেছে। কার্লিংফোর্ড হেক্টরের পূর্বপুরুষদের ভিটা। সেখানেই থিতু হয়েছেন তিনি। এত বড় চিড়িয়াখানা কী করে ওখানে গেল, কোথাও উল্লেখ নেই। ভোজবাজির মতো যেন প্রাণীগুলো এখানে গায়েব হয়ে ওখানে উদয় হয়েছে। টেলিপোর্টেশন ছাড়া আর কী? কিন্তু টেলিপোর্টেশন কি আদৌ সম্ভব? প্রদোষ প্রশ্ন করল। ও আমার পাশেই বসে দার্জিলিং চায়ে চুমুক দিচ্ছিল আর নিচে ফুটপাতের দিকে তাকিয়ে ছিল। অসম্ভব, আমি বললাম, আবার সম্ভবও। মানে তাত্ত্বিকভাবে টেলিপোর্টেশন তো ঘটেই চলেছে। এই ধরো টেলিফোন বা টেলিগ্রাফের ব্যাপারটা। তোমার ভয়েস বা কণ্ঠস্বর বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে তারের ভেতর দিয়ে বাহিত হয়ে দূরবর্তী শ্রোতার কানে ঢোকার আগে আবার কণ্ঠস্বরে রূপান্তরিত হচ্ছে না? না হচ্ছে না, প্রদোষ মাথা নেড়ে বলে। আমার কণ্ঠস্বরটা বাহিত হচ্ছে না। বাহিত হচ্ছে কণ্ঠস্বরের যে এফেক্ট, সেটা। বাহিত হচ্ছে ইনফরমেশন। সে কথা যদি বলো প্রদোষ, তাহলে বস্তু আদতে ইনফরমেশনের এক একটা প্যাকেট ছাড়া কিছু নয়। বস্তু হলো ঘনীভূত ইনফরমেশন। আমরা কিছুক্ষণ তর্কে জড়িয়ে গেলাম। এই মেধাবী ছাত্রের সঙ্গে তর্ক করতে আমার ভালোই লাগে। বিজ্ঞানের বাইরে ওর এমন বেশ কিছু বিষয়ে আগ্রহ ও জানাশোনা আছে, যা আমার নেই। প্রদোষকে ভড়কে দেওয়ার জন্য আমি তাই পুরাণ থেকে উদাহরণ টানলাম। বললাম, টেলিপোর্টেশনের কথা এমনকি মহাভারত–এও পাবে তুমি। অনিরুদ্ধ আর উষার ঘটনাটা লক্ষ করো। কৃষ্ণের পুত্র প্রদ্যুম্নের ছেলে অনিরুদ্ধকে স্বপ্নে দেখেছিল অসুরকন্যা উষা। স্বপ্নেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল তাদের। দেবপুত্রের সঙ্গে অসুরকন্যার বিয়ে। কেউ মানবে কেন? আর তাদের দেখাই-বা হবে কীভাবে? দুজন থাকে দুই মুলুকে। পরে নারদের আশীর্বাদে উষার সখী চিত্রলেখা অনিরুদ্ধকে চোখের পলকে নিয়ে আসে উষার কাছে। মহাভারত–এ এই ঘটনার বিবরণ যদি পড়ো, তোমার মনে হবে টেলিপোর্টেশন ছাড়া এ আর কিছু নয়। আজ দুপুরে লাইব্রেরি কক্ষে বসে আমি কার্ট গার্ডেলের অন ফর্মালি আনডিসাইডেবল প্রোপোজিশনস অব প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেমেটিকা অ্যান্ড রিলেটেড সিস্টেমস বইটি পড়ছিলাম। বর্তমানে আমেরিকার প্রিন্সটনে বসবাসকারী এই গণিতবিদ বড়সড় একটা বিপ্লবই ঘটিয়ে ফেলেছেন গণিতের রাজ্যে, ঠিক যেমন বিপ্লব আইনস্টাইন ঘটিয়েছিলেন পদার্থবিদ্যায়। প্রিন্সটনে গিয়ে দুজনের বন্ধুত্বও হয়েছে শুনেছি—আইনস্টাইন আর গার্ডেলের মধ্যে। আমি তন্ময় হয়ে গার্ডেলের গাণিতিক যুক্তিশৃঙ্খলের অলিগলি ভ্রমণ করছিলাম, এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে সেখানে হাজির হলো প্রদোষ। আমাকে সে একপ্রকার জোর করে টেনে আনল কলেজের সামনের রাস্তায়। তারপর একটা ট্যাক্সি ডাকল। আমরা কোথায় যাচ্ছি বলবে তো? ভীষ্মবাবার ডেরায়। ভীষ্মবাবার ডেরা কী? ভীষ্মবাবা নামের এক তান্ত্রিক সাধু আস্তানা গেড়েছেন শিমুলতলা ঘাটে, শুনেছেন? আমাকে স্বীকার করতে হলো, আমি শুনিনি। আর এমন তথ্য আমার শোনারও কথা নয়। প্রদোষ বলল, বাবার অনেক কেরামতি। বেনারস থেকে ডাইরেক্ট সাঁতরে এসেছেন। স্রোতের অনুকূলে যদিও, তবু প্রায় সাড়ে ৬০০ কিলোমিটার। যেকোনো বিচারে ওয়ার্ল্ড রেকর্ড। তো? তাঁর সঙ্গে আমাদের কী? আমাদের আইরিশ সাহেব এই সাধুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। আমার চোখ কপালে উঠল। বলো কী? শেষ মাসখানেক। অন্তর্ধানের আগের দিনও হেক্টর পা রেখেছিলেন তান্ত্রিকের ডেরায়। কিন্তু তাতে কী? সাহেবদের এ রকম ভীমরতি থাকতেই পারে। সাধু-সন্ন্যাসী, তন্ত্রমন্ত্র তাদের কাছে এক্সোটিক ব্যাপার। কেন, নারদ মুনি যদি চিত্রলেখাকে টেলিপোর্টেশন শেখাতে পারেন, ভীষ্মবাবা হেক্টরকে কেন নয়? প্রদোষের খোঁচা আমি গায়ে মাখলাম না। বললাম, এদের বুজরুকির বিরুদ্ধে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র যে আন্দোলন গড়ে তুলেছেন, সেটা এখনো চলছে। প্রদোষ বলল, আপনি লক্ষ করেননি সম্ভবত, জন হেক্টরের ঘরে আপনি যে কাগজপত্র কুড়িয়ে পেয়েছিলেন, সেখানে আঁকিবুঁকির জঙ্গলে গ্রিক অ্যালফাবেটে কিছু ভারতীয় তন্ত্রমন্ত্রও লেখা ছিল। আপনি গ্রিক বর্ণমালা দেখে সেগুলো গাণিতিক চিহ্ন ভেবেছেন। তুমি গ্রিক জানো নাকি? শিখছি। নিজে নিজে। আপনার মতো আমিও ডায়েরি লিখি। তবে সেটা গ্রিক বর্ণমালা ব্যবহার করে ইংরেজি ভাষায়। বোটে নদী পেরিয়ে শিমুলতলা ঘাটে নেমে রিকশাওয়ালাকে ভীষ্মবাবার ডেরার কথা বলতেই সে একটানে যে জায়গাটায় নিয়ে গেল, সেটা একটা তস্য গলির ভেতরে পুরোনো একটা চারতলা বাড়ি। মাঝখানে শানবাঁধানো উঠানের তিন পাশে উঠে গেছে ভবন। সংকীর্ণ সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠে বারান্দা ধরে এগিয়ে গেলে বাবার কক্ষ। আমাদের উঠানেই থামিয়ে দিল বাবার চ্যালারা। বাবা দর্শন দেন সন্ধ্যাবেলা। এই ভরদুপুরে তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ নেই। আমরা বললাম, একটা বিশেষ কাজে বাবার কাছে এসেছি। আমরা ঠিক দর্শনার্থী নই। এ নিয়ে নিচতলার উঠানে বাগ্‌বিতণ্ডা চলছে, এমন সময় পুরো ভবনকে কাঁপিয়ে দিয়ে একটা বজ্রপাতের মতো হুংকার ধ্বনিত হলো। আসতে দে! আমরা তাকিয়ে দেখি, তিনতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন একটা গেরুয়া পরা সন্ন্যাসী। পুরো শরীর কুচকুচে কালো। এমন ঘোর কৃষ্ণবর্ণ শরীর আফ্রিকার মাসাইদেরও হয় না। খোঁপা খোলা চুলের জট এমনভাবে মুখমণ্ডল আড়াল করে রেখেছে যে চেহারা প্রায় দেখা যায় না। বাবার হাতে কমণ্ডলু। তর্জনী আমাদের দিকে বাড়িয়ে ধরা। এই গল্পটার লেখক আমি না


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ১৩৯ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...