বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

জাম্বুরা যখন ফুটবল

"ফ্যান্টাসি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Radiyah Ridhi (৪৬০ পয়েন্ট)



X তারা দুজন বসেছিল জাম্বুরা গাছটির মগডালে। নিঝুমরাত। জাম্বুরা গাছটির পাশে বিশাল একখানা মাঠ। মাঠের নাম ধ্যার ধ্যারা গোবিন্দপুরের মাঠ। এতটাই বিশাল সেই মাঠ, এপার ওপার দেখা যায় না। তেপান্তরের মাঠও এতবড় হবে না। মাঠের দুর্বাঘাসে ঝিঁঝিঁ ডাকছে। আর কোথাও কোনও শব্দ নেই। থাকবে কী করে, কাছে পিঠে তো লোক বসতিই নেই। গ্রামগুলো দূরে দূরে। আকাশে একচিলতে চাঁদ আছে। ম্যাটম্যাটে একটুখানি জ্যোৎস্না আছে। সেই জ্যোৎস্না ঢাকা পড়ে যাচ্ছে মেঘের আনাগোনায়। থেকে থেকে চাঁদের তলা দিয়ে চলে যাচ্ছে পালতোলা নৌকার মতো মেঘ। সঙ্গে সঙ্গে আবছা অন্ধকারে ভরে যাচ্ছে চারদিক। খানিক আগে তারা দুজন নিজেদের কাজকর্ম সেরে ফিরেছে। এখন জাম্বুরা গাছের মগডালে বসে গল্পগুজব করছে। জাম্বুরার সিজন চলছে। গাছভর্তি বিরাট বিরাট জাম্বুরা। এরকম নির্জন মাঠের ধারে জাম্বুরা গাছে ফলে আছে এত জাম্বুরা, মানুষ কেন জাম্বুরাগুলো ছিঁড়ে নেয় না? কারণ হলো চারপাশের গ্রামগুলো দূরে দূরে হলেও লোকে জানে ধ্যার ধ্যারা গোবিন্দপুরের মাঠখানির পাশে যে জাম্বুরা গাছ এই গাছে তেনাদের আস্তানা। দেশগ্রামের লোকেরা ভূত শব্দটা উচ্চারণ করে না। সম্মান করে ভূতদেরকে বলেন তিনি। তিনিটা পরিষ্কার উচ্চারণ করতে পারে না অনেকে, তারা বলে 'তেনা'। দিনে দিনে এই তেনাটাই চালু হয়ে গেছে।তেনাদের ভয় করে না এমন মানুষ নেই। যে গাছে তেনারা বসবাস করেন সেই গাছে জাম্বুরা ফলে থাকলে কে সাহস করে আসবে ছিঁড়তে? তবে এই গাছের জাম্বুরাগুলোর দিকে তেনারা কখনও ফিরে তাকান না। ফলগুলো নিজেদের মতো ফলে আর পেকে ঝরে পড়ে, পচে যায় গাছতলায়। যে দুজন গাছের মগডালে বসে গল্প করছে, তেনাদের একজন ছেলে আরেকজন মেয়ে। ছেলেটির নাম স্কন্ধকাটা, মেয়েটি শাকচুন্নি। স্কন্ধকাটা মানে যার কাঁধ কাটা। কাঁধ মাথা নেই, শুধু দেহ আছে। এই ভূতটাকে কেউ কেউ মামদো ভূতও বলে। মামদো ভূতের ধর থাকে, মুণ্ডু থাকে না। শরীর ভর্তি চোখ । একেবারে আনারসের মতো। শাকচুন্নি হচ্ছে যে শাক চুরি করে। চুন্নি অর্থ চোর। তেনারা শাক খান না। মেয়ে তেনাদের আরেক নাম পেত্নি। শাকচুন্নি এক প্রকারের পেত্নি। তাদের প্রধান খাদ্য মাছ। কাঁচা অথবা রান্না করা যে কোনও মাছ পেলেই তারা খুশি। গ্রামের লোকজন এসব জানে। এই কারণে তারা কখনও কখনও শাক আর মাছ একসঙ্গে রান্না করলে শাক দিয়ে মাছ ঢেকে রাখে। ওরকম এক বাড়ির রান্নাঘরে গভীররাতে গিয়ে ঢুকেছে এক পেত্নি। গিয়ে দেখি মাছের হাড়িতে শুধু শাক। মাছ নেই। সে ভাবলো, সকালবেলা কি বাড়ির লোকে শুধুমাত্র শাক দিয়ে পাস্তা খাবে? নাকি শাকের তলায় লুকানো আছে মাছ? শাকের হাড়ি নিয়ে পেত্নি এসে বসল বাড়ির তেঁতুল গাছের ডালে। বসে হাড়ি ঘেটে দেখে তার অনুমানই ঠিক, শাকের তলায় সুন্দর করে সাজানো আছে মাছ। মাছগুলো খেয়ে শাকসহ হাড়িটা সে উঠোনে ফেলে দিয়ে এলো। সকালবেলা বাড়ির লোকজন কাণ্ড দেখে মহাবিরক্ত। বুঝে গেল এটা পেত্নির কাজ। মাছচুন্নি নাম না দিয়ে পেত্নিটির নাম দিল তারা শাকচুন্নি। পুরো উল্টো। ভূতেদের মতো মানুষরাও মাঝে মাঝে উল্টোপাল্টা কাজ করে। আজ তেনারা দুজন পা ঝুলিয়ে বসেছেন মগডালে। পায়ের কাছে হাতের কাছে, বুকের কাছে পিঠের কাছে, শাকচুনিটির মাথার কাছে অতিকায় জাম্বুরাগুলো নিঝুমরাতের হাওয়ায় একটু একটু দুলছে। স্কন্ধকাটা বলল, আজ তুঁই কোঁথায় কোথায় গেলি রেঁ? তেনাদের প্রতিটি শব্দের ওপর চন্দ্রবিন্দু বসানো থাকে। স্কন্ধকাটার কথাশুনে শাকচুন্নি বলল, গ্রামের দিকে গিয়েছিলাম। নতুন একটা অভিজ্ঞতা ইয়েছে। কী অভিজ্ঞতা? ঘটনা হলো, কাঁচামাছ খেতে খেতে শাকচুন্নির মুখ প্রায় পচে গেছে। আজ তার ইচ্ছে হয়েছে রান্নাকরা মাছ খাবে। রান্নাকরা মাছ মানুষের বাড়ির রান্নাঘরে না গেলে পাওয়া যাবে না। এজন্য সন্ধ্যারাতের দিকেই সে গিয়ে বসেছিল এক গৃহস্থবাড়ির জামগাছে। রাত একটু নিঝুম হয়ে এলে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকবে। বাড়ির লোকজন রাতের রান্না করা ভাত খেয়ে যে ভাত থেকে যায় সেই ভাতের হাড়িতে পানি ঢেলে রাখে। ওই জিনিস সকালবেলা পান্ত 1। আর মাছ তরকারির হাড়ি যেমন আছে তেমনই থাকে। পান্তার সঙ্গে রাতের থেকে যাওয়া সামান্য মাছ তরকারি দিয়েই তারা নাশতার কাজটা সারে। গরিব বাড়ির মানুষরা পান্তার সঙ্গে একটা কাঁচামরিচ আর নয়তো একটা পেঁয়াজ দিয়ে নাশতা করে। এই বাড়ির লোকজন অবস্থাপন্ন। তাদের তরকারির হাড়িতে মাছ থাকেই। শাকচুন্নি বসে আছে কখন বাড়ির লোকজন খাওয়া দাওয়া শেষ করবে, কখন সে গিয়ে ঢুকবে রান্নাঘরে। কিন্তু লোকজন রান্নাঘরে খেতে আর ঢোকেই না। বাড়ির কাজের ঝি রান্নাঘরের দরজায় বসে ঝিমাচ্ছে। অন্য লোকজন সবাই বড়ঘরে একত্রিত হয়েছে। দরজা জানালা খোলা। শাকচুন্নি জামগাছের যেখানটায় বসে আছে সেখান থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে ঘরের ভিতর কী একটা যন্ত্র চলছে। হাত দুয়েক লম্বা যন্ত্র, হাত দুয়েক চওড়া। যন্ত্রের ভিতর থেকে ছিটকে বেরুচ্ছে আলো আর শব্দ। জীবন্ত মানুষজন চলাফেরা করছে যন্ত্রের ভেতর। বাড়ির লোকজন উদগ্রিব হয়ে তাকিয়ে আছে সেই যন্ত্রের দিকে। থেকে থেকে চিৎকার দিয়ে উঠছে, গোল গোল। এই পর্যন্ত শুনে স্কন্ধকাটা খিকখিক করে হাসল। বুঝলি রেঁ শাঁকচুনি, ওই যন্ত্রকে বঁলে টেলিভিশন। শাকচুন্নি অবাক। কী বলে? টেলটিভিশন? আঁরে না, টেলিভিশন। বুঝেছি বুঝেছি। টেলিভিশন। আঁর ওই যে গোল গোল করছিল, ওটা হলো ফুটবল খেলা।বুঝেছি বুঝেছি। তাঁরপর কী হলো বল। পরের ঘটনা বেশ রসালো ভঙ্গিতে বর্ণনা করল শাকচুন্নি। আমি তো টেলিভিশন কোনওদিন দেখিনি। ওইটুকু যন্ত্রের ভেতর মানুষের চলাচল কথাবার্তা আর তোর গিয়ে ওই ফুটবল খেলা, এইসব কাণ্ড দেখে রান্নাকরা মাছ খাওয়ার কথা একদম ভুলে গেলাম। টেলিভিশন জিনিসটা ভালো করে দেখার জন্য জামগাছ থেকে নেমে ঘরের পিছন দিককার জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে টেলিভিশন দেখছি। বিশাল একখানা মাঠের চারদিকে বসে আছে হাজার হাজার লোক আর জাম্বুরার মতো একখানা জিনিস নিয়ে কুড়ি বাইশজন লোক মাঠে দৌড়াদৌড়ি করছে। ধামধাম করে জিনিসটায় লাথি দিচ্ছে, হুড়াহুড়ি মারামারির মতোও করছে। স্কন্ধকাটা আবার খিকখিক করে হাসল। ওঁই জাম্বুরাটাই হচ্ছে গিয়ে ফুটবল । কুঁড়িজন না, এঁকেক দঁলে এঁগারোজন করে মোট বাইশজনে ফুটবল খেলে। আর ওই যে তিনদিকে জাল দেঁয়া একদিক খোলা ওটাকে কী বলে? গোলপোস্ট। বঁলটা ওখানে ঢুকাতে পারলেই গেল। বুঝেছি বুঝেছি ৷ আঁচ্ছা বল তাঁরপর কী হলো? শাকচুন্নি আবার বলতে লাগল, টেলিভিশনে ওরকম হৈ চৈ করে ফুটবল খেলা ছলছে, বাড়ির লোক ঘরে বসে দেখছে। একবার একটা গোল হলো। ঘরে বসা লোকজন আনন্দে লাফিয়ে উঠল। সঙ্গে গোল গোল চিৎকার। লোকজনের চিৎকার হৈ হল্লা আর আনন্দ দেখে আমিও ভুল করে গোল গোল বলে একটা চিৎকার দিয়ে উঠলাম। আমাদের চিৎকার, তুই তো বুঝতেই পারছিস কী বিকট আর ভয়ংকর। তবু হৈ হল্লার মধ্যে অন্য কারও কানে সেই চিৎকার গেল না। অল্পবয়সি একটা মেয়ে বসেছিল জানালার কাছে। সে বোধহয় শুনতে পেল। মুখ ফিরিয়ে তাকিয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে আমি সরে গেছি। মেয়েটা বোধহয় কিছু সন্দেহ করল। তারপরও আগের ভঙ্গিতে খেলা দেখতে লাগল। কিন্তু বসল এমন করে, টেলিভিশনটা একদম আড়ালে পড়ে গেল। আমার তখন টেলিভিশন আর ওই ফুট খেলা খার নেশা ধরে গেছে। জানালার ফাঁক দিয়ে একটা হাত ঢুকিয়ে নিজের অজান্তেই মেয়েটিকে একটু সরিয়ে দিতে গেছি, সেই মেয়ে ভূত ভূত বলে এমন চিৎকার দিল, এক চিৎকারে ফিট। বাড়ির লোকজন খেলা ফেলে তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল। আমি আর কী করি, হাঁটতে হাঁটতে এদিকপানে চলে এলাম। রান্নাকরা মাছ খাওয়াও হলো না, টেলিভিশন আর তোর গিয়ে ওই ফুটবল খেলাটাও আর দেখা হলো না। তবে যেটুকু দেখেছি, খেলাটা আমাকে বেজায় আনন্দ দিয়েছে। ভারি মজাদার খেলা। ইস জীবনে যদি ওই ফুটবল খেলাটা একবার খেলতে পারতাম? স্কন্ধকাটা বলল, ইচ্ছা করলেই পারিস। কী ভাবে রেঁ? মানুষ যা পারে আমরা কি তা পারব? অবশ্যই পারবো। তাঁহলে ব্যবস্থা কর না। একটা ফুটবল জোগাড় কর। ফুটবল লাগবে না। জাম্বুরা দিয়েই ফুটবলের কাজ চালানো যাবে। তাহলে তো হয়েই গেল। মাঠখানাও আছে। চল এখনই একটা জাম্বুরা নিয়ে নেমে যাই। ধুর বোঁকা। দুজনে এঁ খেলা হয় নাকি? তাহলে? আসল বুদ্ধিটা বের করল স্কন্ধকাটা। দেশ গ্রামের যেখানে তেনাদের যত জ্ঞাতি গোষ্ঠি আছে সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। তাদের মধ্য থেকে দুটো দল হবে। একদলে এগারোটি স্কন্ধকাটা, অন্যদলে এগারোটি শাকচুন্নি। ভূতে আর পেত্নিতে ফুটবল খেলা। বনের ওদিক থেকে ছখানা আস্তবাশ তুলে আনা হবে। বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হবে গোলপোস্ট। দুদিকে দুটো বাঁশ আর সেই দুই বাঁশের মাথায় বসানো হবে একটি বাঁশ। ব্যাস হয়ে গেল গোলপোস্ট। এরকম গোলপোস্ট মাঠের দুপ্রান্তে হবে দুখানা। তেনাদের মধ্যে যারা দর্শক তারা বসে থাকবেন মাঠের চারদিকে গোল হয়ে । স্কন্ধকাটার পরিকল্পনা শুনে মুগ্ধ শাকচুন্নি। কঁবে খেলা হবে রেঁ? সপ্তাহের দুটো দিন খুবই পছন্দ করেন তেনারা। শনি আর মঙ্গল। আজ শনিবার। সুতরাং খেলাটা সামনের মঙ্গলবার রাতে হতে পারে। ঠিক আঁছে। এটাই ফাইনাল। পরদিন থেকে দেশ গ্রামে যত ভূত আছে সবাইকে খবর দেয়া হলো। মঙ্গলবার রাতে তেনাদের ফুটবল খেলা হবে। স্থান, ধ্যার ধ্যারাগোবিন্দপুরের মাঠ। তেনাদের তো আর মোবাইল ফোন নেই, খবর দেয়া যায় কীভাবে? এই বুদ্ধিটাও স্কন্ধকাটা বের করল। কাল আমরা যখন চড়তে বেরুবো, তোর সঙ্গে যে শাকচুন্নিরই দেখা হোক তাকে তুই ফুটবল খেলার কথা বলবি। সেই শাকচুন্নি বলবে আরেক শাকচুন্নিকে, সেই আরেকজন বলবে আরেকজনকে। এইভাবে সারাদেশের শাকচুন্নিরা খবর পেয়ে যাবে। আমিও খবর দেব একই কায়দায়। যে স্কন্ধকাটার সঙ্গে দেখা হবে তাকেই বলবো খেলার কথা। সে বলবে তার পরিচিতদের পরিচিতরা বলবে অন্য পরিচিতদের। এইভাবে দেখবি সারাদেশের ভূতেরা খবর পেয়ে গেছে। অনেকদিন ভূতেদের কোনও মহোৎসব হয় না। এটা হবে সেরকম এক মহোৎসব। দেখবি একটা ভূতও বাদ থাকবে না। আন্ডাবাচ্চাসহ হাজির হবে সবাই। এই যে চার পাঁচমাইল আকৃতির মাঠখানি, ভূতে ভূতে একেবারে সয়লাপ হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত মাঠে জায়গা দিতে পারবো কি না এই ভয় পাচ্ছিরে শাকচুন্নি। স্কন্ধকাটাকে আশ্বস্ত করল শাকচুন্নি। আরে না, জায়গা নিয়ে তোকে ভয় পেতে হবে না। দেশে এত ভূত নেই। দেশ এখন বদলে গেছে। গ্রামগুলো গ্রাম নেই, আধা শহর হয়ে গেছে। বাড়ি বাড়ি বিজলীবাতি, ঘরে ঘরে টেলিভিশন, হাতে হাতে মোবাইল ফোন। এত আলো আর যন্ত্রপাতির মাঝখানে আমাদের টিকে থাকাই দায় হয়ে গেছে। ভূতেরা সব দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। যারা আছে তারাও চলে গেছে দূরে দূরে। বন পাহাড় আর নির্জন জায়গায় গিয়ে বাসা বেঁধেছে। তুই আর আমি এই ধ্যার ধ্যারা গোবিন্দপুরের মাঠের দিকটায় রয়ে গেছি মাঠখানা এখনও আছে বলে। এই মাঠের ওপর যেদিন মানুষ এসে ঘরবাড়ি তুলবে, চাষবাস শুরু করবে তখন আমাদেরকেও নেজ গুটিয়ে পালাতে হবে। সে যখনকারটা তখন দেখা যাবে। এখন চল খালের ওপারের বাঁশবন থেকে ছখানা বাঁশ এনে গোলপোস্ট বানিয়ে ফেলি। আরে তুই তো দেখি হদ্য বোকা রে। এখন গোলপোস্ট বানালে লোকের চোখে পড়ে যাবে। দিনেরবেলা এপথে যারা চলাচল করে তারা ভাববে কী না কী হচ্ছে। ভূতের মাঠে গোলপোস্ট কেন? ঠিকই বলেছিস। তাহলে আমরা গোলপোস্ট বানাবো মঙ্গলবার সন্ধ্যারাতে। ও তো আমাদের জন্য এক দুমিনিটের কাজ যে খেলোয়াড় দর্শকরা আসার আগেই প্রথমে গোলপোস্ট বানাবো, তারপর গাছ থেকে জাম্বুরাগুলো সব পেড়ে ফেলবো। এত জাম্বুরা পাড়বি কেন? খেলতে তো লাগবে একটা মাত্র জাম্বুরা। আরে না, একটা জাম্বুরা ফেটে গেলে আরেকটা নিতে হবে। আমাদের পা বলে কথা, আমাদের ফুটবল বলে কথা। শাকচুন্নি খ্যাক খ্যাক করে হাসল। বুঝেছি বুঝেছি। তোর মাথায় বেজায় বুদ্ধি। তাহলে এই কথা রইল। ওই দেখ আলো ফুটছে। রাত ফুরিয়ে গেছে। এখন চল ঘুমিয়ে পড়ি। মানুষের দিন হচ্ছে আমাদের রাত। দিনটা আমরা ঘুমিয়ে কাটাই। আর মানুষের রাতটা হচ্ছে আমাদের দিন। তখন আমরা বিষয়কর্মে নিয়োজিত হই। এসব আমি জানি। এবার ঘুমা। স্কন্ধকাটা আর শাকচুন্নি জাম্বুরা গাছের মগডালে পা ঝুলিয়ে বসেই ঘুমিয়ে পড়ল। [প্রিয় পাঠক, এই গল্পের প্রথম দিকে স্কন্ধকাটা আর শাকচুনি যখন কথা বলছিল তখন তাদের প্রতিটি শব্দের ওপর চন্দ্রবিন্দু দিয়েছি। একটা সময়ে এত কথা বলতে শুরু করল তারা, চন্দ্রবিন্দুর স্টক শেষ হয়ে গেল। এজন্য পরে আর দেয়া গেল না! দেখতে দেখতে মঙ্গলবার এসে গেল। স্কন্ধকাটা আর শাকচুন্নির প্রচার প্রচারণায় দেশের সব ভূতই খবরটা পেয়ে গেছে। বিশ্বকাপ ফুটবলের কায়দায় ধ্যার ধ্যারা গোবিন্দপুরের মাঠে অনুষ্ঠিত হবে ভূতেদের এক প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। আন্ডাবাচ্চাসহ সবভূত আমন্ত্রিত। তাগড়া জোয়ান স্কন্ধকাটা আর শাকচুন্নিদের মধ্য থেকে বাছাইকরা এগারোজন করে খেলতে নামবে। যদি স্কন্ধকাটারা জিতে তাহলে বউ থাকার পরও তারা প্রত্যেকে পাবে একটি করে নতুন পেত্নি বউ। বুড়িধুড়ি না যুবতী শাকচুন্নি। আর শাকচুন্নিরা জিতলে স্বামী থাকার পরও তারা পাবে একটি স্কন্ধকাটা স্বামী। তবে বুড়াধুড়া না, তাগড়া জোয়ান। পুরস্কারের কথাটা স্কন্ধকাটা আগে বলেনি। মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর খালের ওপারের বাঁশবন থেকে ছখানা অতিকায় বাঁশ এনে গোলপোস্ট বানাবার পর, গাছ থেকে জাম্বুরাগুলো ছিঁড়তে ছিঁড়তে পুরস্কারের কথাটা বলল। শুনে শাকচুন্নি কাঁদতে লাগল ।কী রে কাঁদছিস কেন? যদি তোদের দল জিতে যায় তাহলে তো তুই আরেকটা শাকচুন্নি বউ পাবি। তখন আমার কী হবে? তোদের দল জিতলে তো তুইও পাবি অন্য একটা স্কন্ধকাটা স্বামী, তখন আমার কী হবে? তাই তো। তাহলে কী করা যায়? সে যখনকারটা তখন দেখা যাবে। সে রাতে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ভূতেদের কাছে অন্ধকার হচ্ছে আলো। অন্ধকারের আলোয় দেখা গেল মাঠের চারদিক থেকে ধীরে ধীরে আসছে ভূতের দল। কেউ একা, কেউ সপরিবারে, কেউ বন্ধুবান্ধব নিয়ে। শাকচুন্নিরা আসছে কলকাকলি করতে করতে। কয়েক মিনিটের মধ্যে মাঠ প্রায় ভরে গেল। স্কন্ধকাটারা বাছাইকরা এগারোজনের একটা টিম করে ফেলল, শাকচুন্নিরাও ঠিক স্কন্ধকাটাদের স্টাইলেই করলো তাদের টিম। দুই টিমের দুই ক্যাপ্টেন হচ্ছে জাম্বুরা গাছের স্কন্ধকাটা আর শাকচুন্নি। এই সম্মান তাদেরকে দেয়া হলো একটাই কারণে, খেলার আয়োজনটি তারা করেছে। এক সময় খেলা শুরু হলো। ভূতেদের খেলা তো, এক গোলপোস্ট থেকে আরেক গোলপোস্টের দূরত্ব মাইল দেড়েক। দেড় মাইল দূরত্ব কভার করতে ভূতেদের অবশ্য পাঁচসাত সেকেন্ডের বেশি লাগে না। দু আড়াইশো জাম্বুরা থেকে বাছাই করা জাম্বুরাটি নিয়ে খেলা শুরু হয়েছে। মাঠের দুদিকে শয়ে শয়ে ভূত দর্শক। কিন্তু খেলতে নেমে দুই দলই ভুলে গেল কে কোন দিককার গোলপোস্টে বল ঢুকাবে। ফলে পায়ের কাছে যে গোলপোস্ট পাচ্ছে সেখানেই অতিকায় একেক শটে বল ঢুকাতে লাগল তারা। সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের হৈ চৈ, লম্ফঝম্ফ। গোল গোল। ওদিকে ভূতেদের এমন আজদাহা চার পাঁচখানা শট খেয়ে জাম্বুরা ফেটে গোলাপি রংয়ের কোয়াগুলো ছড়িয়ে যাচ্ছে মাঠময়। জাম্বুরা গাছের স্কন্ধকাটা আর শাকচুন্নি গলা ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করল। এইভাবে না, এইভাবে না। শাকচুন্নিরা জাম্বুরা ঢুকাবে ওপাশের গোলপোস্টে আর স্কন্ধকাটা ঢুকাবে এপাশের গোলপোস্টে। কে শোনে কার কথা। খেলা আগের মতোই চলতে লাগল। একটা জাম্বুরা ফেটে যাওয়ার পর আরেকটা নেয়া হচ্ছে। হৈ চৈ চিৎকার আর দাপড়াদাপড়ির মধ্য দিয়ে চলতে লাগল খেলা। পাঁচ সাত মিনিটের মধ্যে শখানেক গোল হয়ে গেল। একটা সময়ে দর্শক ভূতেরা মনে করল, আরে এতো সোজা খেলাটি আমরা সবাই তো খেলতে পারি! খেলছি না কেন? বসে আছি কেন? জিতে গেলেই তো একটা নতুন বউ আর নয়তো একটা নতুন স্বামী। যেমন ভাবা তেমন কাজ। মুহূর্তে দর্শকরা সবাই নেমে গেল মাঠে। জাম্বুরার স্তুপ থেকে একটা করে জাম্বুরা নিয়ে শটের পর শট, গোলের পর গোল। এমন কি আল্ডাবাচ্চাগুলো পর্যন্ত নেমে গেছে। মূল উদ্যোক্তা দুজন তখন ফ্যাল ফ্যাল করে একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে আছে। হচ্ছে কি এসব? এই অদ্ভুতুড়ে ফুটবল খেলা চললো ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগ পর্যন্ত। আলো ফুটলেই রাত শুরু হয় ভূতেদের। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসে। তখন যে যার আস্তানায় দৌড়ায়। আজও তাই করল। খেলায় কোন দল জিতেছে, কোন দল হেরেছে বা ফলাফল কী হয়েছে ওসবের খবর আর কে রাখে? কে নতুন বউ পাবে, কে নতুন বর, ওসব কথা কারও আর মনেই নেই। যে যার মতো দে ছুট। দিনেরবেলা পথচারী যারা ধ্যার ধ্যারা গোবিন্দপুরের মাঠ পাথালে হাঁটা দিয়েছিল, তারা অবাক। এ কী কাণ্ড রে বাবা! জাম্বুরা গাছটিতে একটিও জাম্বুরা নেই। বিশাল মাঠখানায় ছড়িয়ে আছে থেঁতলে যাওয়া জাম্বুরা, অবিরাম লাথি খাওয়া লতরপতর করা জাম্বুরা, ফেটে যাওয়া জাম্বুরার খোসা আর গোলাপি রংয়ের কোয়া। মাঠময় ভাসছে জাম্বুরার টকটক গন্ধ। কিছু অনাহারি নীল রংয়ের ভোমা সাইজ মাছি ভ্যান ভ্যান করছে চারদিকে। কোয়ার ওপর বসে জাম্বুরার রসে পেট ভরাচ্ছে। টক জাতিয় জিনিস মাছিরা সাধারণত খায় না। এই মাছিগুলো পেটের দায়ে খাচ্ছে। সবচাইতে অবাক হলো লোকে মাইল দেড়মাইল দূরে কাঁচা বাঁশের তৈরি গোলপোস্ট দুখানা দেখে। ঘটনা কী? কী হয়েছে এই মাঠে?


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ১৭৯ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...