গল্পেরঝুড়ির এ্যাপ ডাউনলোড করুন - get google app
গল্পেরঝুড়ি ফানবক্স ! এখন গল্পের সাথেও মজাও হবে! কুইজ খেলুন , অংক কষুন , বাড়িয়ে নিন আপনার দক্ষতা জিতে নিন রেওয়ার্ড !

গল্পেরঝুড়িতে স্বাগতম ...

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ত্রাতিনা – দ্বিতীয় পর্ব(2.01) (ষোল বছর পর)

"সাইন্স ফিকশন" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Alyna (৩৫৩ পয়েন্ট)



দ্বিতীয় পর্ব (ষোল বছর পর) ২.০১ অনাথ আশ্রমের ডাইনিংরুমে ছেলে মেয়েরা হই চই করে রাতের খাবার খাচ্ছে। আশ্রমের ডিরেক্টর ক্লারা নিঃশব্দে ডাইনিং রুমের এক কোণায় দাঁড়িয়ে মুখে এক ধরনের কৌতুকের হাসি নিয়ে ছেলেমেয়েগুলোর দিকে তাকিয়েছিল। এই প্রাণোচ্ছল ছেলেমেয়েগুলোকে দেখে ডিরেক্টর ক্লারা মাঝে মাঝে এক ধরনের হিংসা অনুভব করে। এই কমবয়সী ছেলে মেয়েগুলোর কেমন করে এতো প্রাণশক্তি থাকতে পারে? কেমন করে এতো সহজে তারা জীবনটিকে এতো আনন্দময় করে ফেলতে পারে? ডিরেক্টর ক্লারার মাঝে মাঝেই মনে হয়, অনাথ আশ্রমের দায়িত্ব পাওয়াটি মনে হয় তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। শুধুমাত্র এজন্যেই বুঝি সারাটি জীবন ছোট ছোট শিশুদের সাথে কাটাতে পেরেছে। তাদেরকে কিশোর-কিশোরী হয়ে উঠতে দেখেছে। তারপর এক সময় তরুণ তরুণী হওয়ার পর বাইরের পৃথিবীতে যাওয়ার জন্যে অশ্রুসজল চোখে তাদের বিদায় দিয়ে এসেছে। এবারে আরো একটি মেয়েকে বিদায় দেবে। মেয়েটির নাম ত্রাতিনা। ষোল বছর আগে তার মহাকাশচারী মা ক্লারার হাতে এই মেয়েটিকে তুলে দিয়েছিল। এতো বছর পরেও ডিরেক্টর ক্লারা সেই দিনটির কথা ভুলতে পারে না। মহাকাশচারী রায়ীনা তার মেয়েকে রেখে চলে যাচ্ছে, ছোট মেয়েটি কী বুঝেছে কে জানে, সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। ডিরেক্টর ক্লারা তাকে বুকে চেপে ধরে রেখেছিল। মহাকাশচারী রায়ীনার কী হয়েছিল কে জানে, সে আর কোনোদিন ফিরে আসেনি। ত্রাতিনা অনাথ আশ্রমের অন্য দশজন ছেলেমেয়ের সাথে বড় হয়েছে। মেয়েটি কখনো তার বাবা মায়ের কথা জানতে চায়নি। হয়তো ধরেই নিয়েছে তার মা-বাবার কথা কেউ জানে না। তা না হলে কেন সে অনাথ আশ্রমে থাকবে? ডিরেক্টর ক্লারা ডাইনিং হলে ত্রাতিনাকে খুঁজে বের করল। মাঝামাঝি একটা টেবিলে আরও কয়েকজন ছেলেমেয়েকে নিয়ে খেতে বসেছে। মেয়েটি মায়ের মতো কালো চুল আর কালো চোখ নিয়ে বড় হয়েছে। হাসিখুশি প্রাণশক্তিতে ভরপুর একটি মেয়ে। ক্লারা লক্ষ্য করল, ড্রিংকিং স্ট্রয়ের ভেতর একটা মটরশুটি ঢুকিয়ে ত্রাতিনা ফুঁ দিয়ে সেই মটরশুটিটি পাশের টেবিলের একজন ছেলের ঘাড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে। ছেলেটি চমকে উঠে তার ঘাড়ে হাত দিয়ে এদিক সেদিক তাকাচ্ছে। তার ঘাড়ে কী এসে আঘাত করছে বুঝতে না পেরে ছেলেটি ঘাড়ে হাত বুলাচ্ছে এবং পাশের টেবিলে অন্য বন্ধুদের নিয়ে ত্রাতিনা হেসে কুটি কুটি হচ্ছে। ডিরেক্টর ক্লারা আরো একটু এগিয়ে টেবিল থেকে একটা গ্লাস আর একটা চামুচ তুলে নেয়। তারপর চামুচ দিয়ে গ্লাসটাকে টোকা দিয়ে টুং টুং শব্দ করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ছেলেমেয়েরা ক্লারার এই শব্দটির সাথে পরিচিত। সবাই প্রথমে থেমে গেল, তারপর ক্লারার দিকে তাকিয়ে আনন্দের মতো একটি শব্দ করল। ডিরেক্টর ক্লারা বলল, “ছেলেমেয়েরা, আমি তোমাদের সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।” সবাই তখন চুপ করে উৎসুক চোখে তার দিকে তাকায়। ক্লারা হাসি হাসি মুখ করে বলল, “আমি তোমাদের একটা সুসংবাদ দিতে এসেছি।” সুসংবাদটি কী না শুনেই ছেলেমেয়েগুলো আনন্দে চিৎকার করতে থাকে। ডিরেক্টর ক্লারা হেসে বলল, “সুসংবাদটি না শুনেই তোমরা আনন্দে চিৎকার করছ, ব্যাপার কী?” একজন বলল, “সুসংবাদটি শুনে আমরা কীভাবে চিৎকার করব, সেটি একটু প্র্যাকটিস করে নিলাম।” অন্যেরা বলল, “বল, বল সুসংবাদটি বল। শুনতে চাই, আমরা শুনতে চাই।” ডিরেক্টর ক্লারা বলল, “কিন্তু তোমরা শান্ত না হলে আমি কীভাবে বলব?” সবাই তখন শান্ত হয়ে ক্লারার দিকে তাকিয়ে রইল। ক্লারা সবার দিকে এক নজর তাকিয়ে বলল, “তোমাদের ত্রাতিনা কেন্দ্রীয় মহাকাশ ইনস্টিটিউটে পুরো স্কলারশীপ পেয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। এই মাত্র আমি তার খবর পেয়েছি।” ক্লারা কথা শেষ করার আগেই ডাইনিং হলের ছেলেগুলো শুধু চিৎকার করে শান্ত হলো না। তারা ছুটে এসে ত্রাতিনাকে ধরে হুটোপুটি করতে লাগল। সবাই মিলে তাকে মাথার ওপরে তুলে নিয়ে নাচানাচি করতে থাকে। ক্লারা আনন্দোৎসবে বাধা দিল না। একটু শান্ত হওয়ার পর সে এগিয়ে গিয়ে ত্রাতিনার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “ত্রাতিনা মা, তোমাকে দুই সপ্তাহের মাঝে ইনস্টিটিউটে যোগ দিতে হবে।” ত্রাতিনা নিঃশব্দে ক্লারার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর নিচু গলায় বলল, “দুই সপ্তাহ?” “হ্যাঁ মা। তোমাকে আমাদের বিদায় দিতে হবে। আমরা সবাই তোমার অভাবটুকু অনুভব করব।” হঠাৎ করে ডাইনিং হলের সব ছেলেমেয়ে চুপ করে যায়। একটি আনন্দ সংবাদের সাথে সাথে যে এরকম একটি বেদনার সম্পর্ক থাকতে পারে সেটি আগে তারা কখনো অনুমান করেনি। দুই সপ্তাহ পর একটি শীতল, কুয়াশাচ্ছন্ন, বৃষ্টিভেজা দিনে ত্রাতিনা ডিরেক্টর ক্লারার কাছ থেকে বিদায় নিতে গেল। তার হাতে একটা ছোট ব্যাগ, অনাথ আশ্রমের গেটে একটা বাইভার্বাল তাকে পাতাল ট্রেন স্টেশনে নেওয়ার জন্যে অপেক্ষা করছে। সেই বাইভার্বালকে ঘিরে অনাথ আশ্রমের অন্যান্য ছেলেমেয়েরা ত্রাতিনাকে বিদায় দেওয়ার জন্যে দাঁড়িয়ে আছে। ক্লারা ত্রাতিনার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল, “বস ত্রাতিনা।” ত্রাতিনা ক্লারার সামনে চেয়ারটিতে বসল। ডিরেক্টর ক্লারা বলল, “তোমার জন্যে আমার খুব অহংকার হচ্ছে ত্রাতিনা। কেন্দ্রীয় মহাকাশ ইনস্টিটিউট এই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ইনস্টিটিউট। এখানে পড়তে সুযোগ পাওয়া খুব ভাগ্যের কথা।” ত্রাতিনা কিছু না বলে হাসি হাসি মুখে মাথা নাড়ল। ক্লারা বলল, “তুমি অবশ্য ভাগ্যের জোরে এই সুযোগ পাওনি। তুমি সুযোগ পেয়েছ নিজের যোগ্যতায়।” ত্রাতিনা বলল, “তুমি আমাদের লেখাপড়ার সুযোগ করে দিয়েছ, আমাদের উৎসাহ দিয়েছ, আমরা সবাই তাই তোমার প্রতি অনেক কৃতজ্ঞ।” “ধন্যবাদ ত্রাতিনা। আমি আমার দায়িত্বটুকু শুধু পালন করেছি। তার বেশি কিছু করিনি।” ক্লারা এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে বলল, “তুমি ইনস্টিটিউটে কী নিয়ে পড়াশোনা করবে ঠিক করেছ?” ত্রাতিনা একটু লাজুক মুখে বলল, “আমি মহাকাশচারী হতে চাই। মহাকাশযানে করে মহাকাশে অভিযান করার আমার খুব ইচ্ছা।” ক্লারা এক মুহূর্ত ত্রাতিনার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর প্রায় ফিসফিস করে বলল, “কী আশ্চর্য!” ত্রাতিনা একটু অবাক হয়ে বলল, “আশ্চর্য! কেন এটি তোমার কাছে আশ্চর্য মনে হচ্ছে? আমি কী মহাকাশচারী হতে পারি না?” ক্লারা বলল, “অবশ্যই হতে পার। তুমি যেটা চাইবে, সেটাই হতে পারবে। আমি সেজন্যে আশ্চর্য হইনি। আমি আশ্চর্য হয়েছি অন্য কারণে।” ত্রাতিনা জিজ্ঞেস করল, “কী কারণে?”। ক্লারা তার চেয়ার থেকে উঠে ত্রাতিনার পাশে গিয়ে দাঁড়াল, একটু নিচু হয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে নরম গলায় বলল, “বাইরে এই অনাথ আশ্রমের ভাই বোনেরা তোমাকে বিদায় দেওয়ার জন্যে অপেক্ষা করছে। আমি তার মাঝে তোমাকে বলেছি আমার সাথে দেখা করে যাওয়ার জন্যে। সেটি শুধু আনুষ্ঠানিক বিদায় দেওয়ার জন্যে নয়। তার একটি কারণ আছে ত্রাতিনা।” ”কী কারণ?” “আমি তোমাকে একটি জিনিস দিতে চাই।” “কী জিনিস?” “তোমার মা যেদিন তোমাকে আমার হাতে তুলে দিয়েছিল, সেদিন আমাকে একটা ছোট ক্রিস্টাল দিয়ে বলেছিল, তুমি যখন বড় হবে তখন আমি যেন সেটা তোমার হাতে দিই।” ত্রাতিনা ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো চমকে উঠল, বলল, “মা? আমার মা? তুমি আমার মাকে দেখেছ?” “হ্যাঁ, দেখেছি।” “তুমি কখনো সেটি আমাকে বলনি–” “না, বলিনি। আমার বলার কথা না সেজন্য বলিনি। আমি অপেক্ষা করছিলাম, কখন তুমি বড় হবে-এখন বড় হয়েছ, তাই তোমাকে বলছি।” “আমার মা দেখতে কেমন ছিল? কী করতো আমার মা? আমাকে নিজের কাছে না রেখে কেন অনাথ আশ্রমে রেখে গেল?” ক্লারা দুর্বলভাবে হাসার চেষ্টা করল। বলল, “আমার মনে হয় তুমি তোমার সব প্রশ্নের উত্তর এই ক্রিস্টালটিতে পেয়ে যাবে। তুমি এক সেকেন্ড অপেক্ষা কর।” ডিরেক্টর ক্লারা উঠে গেল। দেওয়ালে লাগানো সেফটি ভল্টে রেটিনা স্ক্যান করিয়ে খুলে নেয়। তারপর ওপরের তাক থেকে ভেলভেটে মোড়ানো ছোট একটা ধাতব বাক্স নিয়ে আসে। সেটি ত্রাতিনার হাতে তুলে দিয়ে বলল, “এই নাও। এর ভেতরে আমি ষোল বছর ধরে তোমার ক্রিস্টালটি বাঁচিয়ে রাখছি। আজকে আমার দায়িত্ব শেষ হল।” ত্রাতিনা বাক্সটি প্রথমে কিছুক্ষণ নিজের বুকে চেপে ধরে রাখে। তারপর খুব সাবধানে সেটি খোলে, বাক্সের মাঝখানে নিও পলিমারের ফ্রেমে ছোট একটা ক্রিস্টাল চকচক করছে। এই ক্রিস্টালটি ত্রাতিনার মা ত্রাতিনার জন্যে তৈরি করে রেখেছে। ঠিক কী কারণ জানা নেই, হঠাৎ করে ত্রাতিনার চোখ ঝাঁপসা হয়ে এলো। ডিরেক্টর ক্লারা ত্রাতিনার পাশে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বলল, “তুমি যখন বলেছ যে তুমি মহাকাশ ইনস্টিটিউটে মহাকাশচারী হবে, তখন আমি বলেছিলাম কী আশ্চর্য! কেন বলেছিলাম, জান?” “কেন?” “তার কারণ, তোমার মাও ছিলেন একজন মহাকাশচারী। মহাকাশচারী রায়ীনা। তোমার মা যেদিন তোমাকে আমার হাতে তুলে দিয়েছিল, সেদিন খুব জরুরি একটা কাজে তাকে চলে যেতে হয়েছিল। কী কাজ, সেটি আমি জানি না। আর কোনোদিন ফিরে আসেনি, তোমার মা নিশ্চয়ই জানতো আর ফিরে আসবে না।” ত্রাতিনা ফিসফিস করে বলল, “মা। আমার মা।” ডিরেক্টর ক্লারা ত্রাতিনার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “ত্রাতিনা সোনা তোমার যাবার সময় হয়েছে। বাইরে সবাই তোমাকে বিদায় দেওয়ার জন্যে অপেক্ষা করছে।” ত্রাতিনা তার ব্যাগটি খুলে সেখানে ভেলভেট দিয়ে মোড়ানো ধাতব বাক্সটি রেখে উঠে দাঁড়াল। ক্লারা ত্রাতিনাকে আলিঙ্গন করে বলল, “যাও মা। প্রার্থনা করি তোমার অপূর্ব একটি জীবন হোক।” ত্রাতিনা চোখ মুছে বলল, “আমার মায়ের কথা মনে নেই। মায়েরা কেমন করে সন্তানকে ভালোবাসে, সেটি আমি জানি না। কিন্তু তুমি আমাদের সবাইকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবেসেছ। আমরা সবাই তোমার কাছ থেকে সেই ভালোবাসাটা পেয়েছি। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ ক্লারা।” ত্রাতিনা ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। ডিরেক্টর ক্লারা হেঁটে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। গেটের সামনে একটা বাইভার্বাল দাঁড়িয়ে আছে। সেটি ঘিরে অনাথ আশ্রমের সব ছেলেমেয়ে নিঃশব্দে ত্রাতিনাকে বিদায় দেওয়ার জন্যে অপেক্ষা করছে। . পাতাল ট্রেনটি ম্যাগনেটিক লেভিটেশন ব্যবহার করে ঘণ্টায় দুই হাজার ত্রাতিনা কিলোমিটার বেগে ছুটে যাচ্ছে। যদিও ট্রেনের ভেতরে বসে থেকে সেটি বোঝার কোনো উপায় নেই। ত্রাতিনা তার সিটে হেলান দিয়ে নিঃশব্দে বসে আছে। ইনস্টিটিউট থেকে তাকে ট্রেনের টিকিট পাঠিয়েছে ছোট একটা ঘরে সামনাসামনি দু’টি সিট। সামনের সিটে একজন বয়সী মহিলা কানে হেড ফোন লাগিয়ে বসে কিনিস্কির নবম সিম্ফোনি শুনছে। সিম্ফোনির তালে তালে খুব ধীরে ধীরে তার মাথা নড়ছে। এ ছাড়া বোঝার আর কোনো উপায় নেই। ট্রেনের ছোট কামরাটি পুরোপুরি নিঃশব্দ। ত্রাতিনা ক্রিস্টালটি হাতে নিয়ে বসে আছে। তার হাতে ভিডি গগলস। ক্রিস্টালটি ঢুকিয়ে গগলসটি চোখে লাগালেই সে তার মাকে দেখতে পাবে। মাকে দেখার জন্যে একই সাথে সে নিজের ভেতরে এক ধরনের ব্যাকুলতা এবং পাশাপাশি বিচিত্র এক ধরনের ভীতি অনুভব করছে। কী দেখবে সে? সে কী সহ্য করতে পারবে? নাকি ভেঙে পড়বে? শেষ পর্যন্ত সাহস সঞ্চয় করে সে কাঁপা হাতে ক্রিস্টালটি ভিডি গগলসের ছোট স্লটটিতে ঢুকিয়ে ক্লিপটা টেনে দিল। তারপর গগলসটি চোখের উপর লাগিয়ে ত্রাতিনা ট্রেনের সিটে মাথা রাখল। প্রথমে একটা নীল আলোর ঝলকানি দেখতে পেল। মৃদু একটা যান্ত্রিক শব্দ শুনতে পেলো। তারপর হঠাৎ করে সে তার মাকে দেখতে পেলো। ছোট করে কাটা কুচকুচে কালো চুল। গভীর কালো চোখ, সেই চোখে তীব্র একটা দৃষ্টি। মনে হয়, সেই দৃষ্টি দিয়ে তার মা সবকিছু ঝলসে দেবে। ত্রাতিনা কেঁপে উঠল। দেখলো, তার মা সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে আছে। এটি তার সত্যিকারের মা নয়, এটি তার মায়ের ত্রিমাত্রিক প্রতিচ্ছবি। তবু ত্রাতিনার মনে হলো সত্যিকারের মা তার দিকে তাকিয়ে আছে। ত্রাতিনা দেখলো তার মায়ের ঠোঁট নড়ে উঠেছে। সে তখন তার মায়ের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলো, স্পষ্ট গলায় তার মা বলল, “ত্রাতিনা, মা আমার। তুই এখন আমার কথা শুনছিস, তার মানে তুই আর আমার ছোট শিশুটি নেই। তুই বড় হয়েছিস। ভালো আছিস মা?” ত্রাতিনা জানে, এটি তার সত্যিকারের মা নয়। শুধুমাত্র তার মায়ের প্রতিচ্ছবি। তারপরও সে ফিসফিস করে বলল, “হ্যাঁ মা। ভালো আছি। খুব ভালো আছি।” “ত্রাতিনা মা, তুই নিশ্চয়ই আমার উপর অনেক অভিমান করে আছিস! তুই নিশ্চয়ই ভাবছিস, আমি কেমন করে তোকে একটা অনাথ আশ্রমে রেখে চলে গেলাম। মা হয়ে কেমন করে সন্তানকে ছেড়ে গেলাম! তাই না?” “কিন্তু মা আমার, সোনা আমার! বিশ্বাস কর, তোকে এই পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে আমি গিয়েছি। পৃথিবীটা কতো সুন্দর, তুই এখনো দেখিসনি মা, আমি দেখেছি। মহাকাশে আমি রাতের পর রাত মুগ্ধ হয়ে নীল পৃথিবীটার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। সেই পৃথিবীটাতে তুই যেন বেঁচে থাকতে পারিস, তোর মতো আরো লক্ষ কোটি মানুষ যেন বেঁচে থাকতে পারে সে জন্যে আমি গিয়েছি। আমার উপর রাগ করে থাকিস না মা! দোহাই তোর।” ত্রাতিনা ফিসফিস করে বলল, “না, মা। আমি তোমার উপর রাগ করে নাই!” “ত্রাতিনা মা আমার, আমার হাতে সময় নেই। একেবারে সময় নেই। আমার এখনই তোকে নিয়ে অনাথ আশ্রমে যেতে হবে। আমি নিজে অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছি। আমি জানি, সেখানে অনেক ভাইবোনকে নিয়ে বড় হওয়া যায়। সবাই মিলে বিশাল একটা পরিবার হয়, সেখানে সবাই সবার আপনজন। তুই নিশ্চয়ই আপনজনদের নিয়ে বড় হয়েছিস, তাই না মা?” ত্রাতিনা মাথা নাড়ল। ফিসফিস করে বলল, “হ্যাঁ, মা। আমি আপনজনদের মাঝে বড় হয়েছি।” “তুই এখন বড় হয়েছিস-কতোটুকু বড় হয়েছিস, সেটা তো জানি না। তোর মাথায় কী ঘন কালো চুল। তোর চোখগুলো কী গভীর কালো? তোর কোন বিষয় পড়তে ভালো লাগে? বিজ্ঞান? গণিত? সাহিত্য? গান শুনিস তুই? কার গান শুনতে ভালো লাগে তোর?” ত্রাতিনা দেখলো, তার মা হঠাৎ থেমে গেল। তারপর ফিসফিস করে বলল, “আমার এখন যেতে হবে মা। আমি যাই? তোকে কী একটিবার আমার বুকে চেপে ধরতে পারব? শক্ত করে চেপে ধরে রাখব, যেন তুই চলে যেতে না পারিস…” ত্রাতিনা দেখলো, তার মা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। সে থরথর করে কাঁপতে থাকে, কোনোভাবে সে নিজেকে সামলাতে পারে না। হঠাৎ সে অনুভব করল, কেউ তার মাথায় হাত রেখেছে। ত্রাতিনা চোখ থেকে গগলস খুলে তাকাল। সামনের সিটে বসে থাকা বয়স্ক মহিলাটি তার মাথায় হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, “সোনামনি মনে হচ্ছে কোনো কিছু দেখে তুমি খুব বিচলিত হয়েছ। আমি কী কোনোভাবে তোমাকে সাহায্য করতে পারি?” ত্রাতিনা মাথা নাড়ল। বলল, “তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু আমাকে কেউ সাহায্য করতে পারবে না। কেউ না।” বয়স্ক মহিলা গভীর স্নেহে ত্রাতিনার হাতটি ধরে তার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। গল্প লিখেছেন : মুহম্মদ জাফর ইকবাল


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৬৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ত্রাতিনা – দ্বিতীয় পর্ব(2.4) (ষোল বছর পর)
→ ত্রাতিনা – দ্বিতীয় পর্ব(2.3) (ষোল বছর পর)
→ তেরশ বছর আগের কথা…
→ ত্রাতিনা – . দ্বিতীয় পর্ব (2.02)(ষোল বছর পর)
→ ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ? – ৪
→ ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ? – ৩
→ ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ – ২
→ ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ – ১
→ ত্রাতিনা – প্রথম পর্ব(1.03)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...