গল্পেরঝুড়ির এ্যাপ ডাউনলোড করুন - get google app
গল্পেরঝুড়ি ফানবক্স ! এখন গল্পের সাথেও মজাও হবে! কুইজ খেলুন , অংক কষুন , বাড়িয়ে নিন আপনার দক্ষতা জিতে নিন রেওয়ার্ড !

গল্পেরঝুড়িতে স্বাগতম ...

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নিতু আর তার বন্ধুরা (১২)

"ছোটদের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান TARiN (১৬৪৭ পয়েন্ট)



১২. এডভেঞ্চার নিতু, রেবেকা আর তানিয়া কোনো কিছু করার আগে খুব ভালো ভাবে পরিকল্পনা করার সুফলটা টের পেল খুব তাড়াতাড়ি। দেওয়াল টপকে স্কুল থেকে বের হয়ে স্কুলের বাইরে রাস্তা ধরে হেঁটে একেবারে শেষ মাথায় বাস স্টেশনে চলে গিয়ে দেখতে পায়। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানে মিতুল, রুনু-ঝুনু অপেক্ষা করছে, তবে ভয়ে, দুশ্চিন্তায় আর কী করবে সেই অনিশ্চয়তায় একেবারে আধখানা হয়ে গেছে। মিতুল আর রুনু-ঝুনু অন্য তিনজনকে দেখে যা খুশি হল সেটি আর বলার মতো নয়। একজন আরেকজনকে ধরে খানিকক্ষণ জাপটা জাপটি করে নেয় তারপর দ্রুত কাজের কথায় চলে আসে। আমাদের হাতে একেবারে সময় নেই। শান্তা আপা কোন রাস্তা দিয়ে আসবে আমরা জানি, সেখানে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকবি। যখন দেখব শান্তা আপা রিক্সা করে আসছেন, দৌড়ে গিয়ে তাকে থামিয়ে দিয়ে সবকিছু বলব, তারপরে আমাদের আর কিছু চিন্তা করতে হবে না। কিন্তু পুলিশ কিংবা কোনো বড় মানুষকে বললে হতো না? মিতুল পুরো ব্যাপার নিয়ে কেমন যেন অস্বস্তি অনুভব করতে থাকে, যদি মনে কর কোনোভাবে আমরা ঠিক করে খেয়াল করতে না পারি আর শান্তা আপা চলে যান? তাহলে মিতুল ব্যাপারটা চিন্তা করে একেবারে শিউরে উঠে। তানিয়া মাথা নাড়ল, বলল, মিতুল ঠিকই বলেছে। যদি শান্তা আপাকে থামাতে না পারি তাহলেই সর্বনাশ হয়ে যাবে। নিতু বলল, তার মানে যেভাবেই হোক আমাদেরকে শান্তা আপাকে থামাতেই হবে। পুলিশের কাছে যেতে পারলে ভালোই হতো—কিন্তু দেরি হয়ে যাবে না? তানিয়া বলল, আমরা আবার দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাই। এক ভাগ যাই পুলিশের কাছে আরেক ভাগ যাই স্কুলের রাস্তায়, শান্তা আপাকে থামাতে। গুড আইডিয়া। নিতু মাথা নাড়ল, পুলিশের কাছে কে যেতে চায়? দেখা গেল কেউই পুলিশের কাছে যেতে চায় না। খবরের কাগজে পুলিশের সম্পর্কে যেসব খবর ছাপা হয় সেটা পড়ে আজকাল পুলিশকে দেখলেই ভয় হয়, মনে হয় এই বুঝি ধরে কিছু একটা করে ফেলবে। নিতু বলল, ঠিক আছে, এখানে দেরি করে লাভ নেই, যেখানে আমাদের অপেক্ষা করার কথা সেখানেই যাই। তারপর ঠিক করা যাবে কে কে পুলিশের কাছে যাবে। কাজেই ছয় জনের দলটা রওনা দিয়ে দেয়। রাস্তা ঘাটে মানুষজন খুব বেশি নেই, যারা আছে তারা সবাই একটু অবাক হয়ে তাদের দেখছিল, এরকম রাত্রি বেলা ছয়টি মেয়ে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে হন্তদন্ত হয়ে যাচ্ছে দেখে অবাক না হয়ে উপায় কী? যে রাস্তা দিয়ে শান্তা আপার যাবার কথা সেখানে এসে তারা থেমে গেল। এই মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকলে লোকজন সন্দেহ করতে পারে তাই তারা খানিকটা এগিয়ে গেল। সেখানে একটা ছোট বাসার মতন রয়েছে, একটা বাসার সামনে তারা কীভাবে দাঁড়িয়ে থাকে? ছয়জন তাই আরেকটু সামনে এগিয়ে গেল, সেখানে একটা ছোট পানের দোকানে একজন বুড়ো চুপচাপ উদাস মুখে বসে আছে, তাই নিরিবিলিতে দাঁড়ানোর জন্যে তারা আরেকটু এগিয়ে যায়, রাস্তাটা এখানে একটু বাঁকা হয়ে চলে গেছে রাস্তার ঠিক পাশে বিশাল বিশাল কয়টা রেইন ট্রি সেজন্য পুরো জায়গাটাকে কেমন যেন নিঝুম মনে হয়। রাস্তার দুই পাশে এখান থেকে কেমন যেন জংগলের মতো শুরু হয়ে গেছে, একটা লাইট পোস্ট টিমটিমে একটা লাইট বাল্ব জ্বলছে, এ ছাড়া কোথাও আর কোনো আলো নাই। লাইটপোস্টর আলো থেকে সরে গিয়ে বড় একটা গাছের আড়ালে তারা লুকিয়ে বসে গেল। এখান থেকে তারা রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারবে, রাস্তায় কে যাচ্ছে আসছে তারা স্পষ্ট দেখতে পাবে কিন্তু তাদেরকে কেউ দেখতে পাবে না। সবাই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে— হঠাৎ করে শান্তা আপা না চলে যান, তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। রাস্তাটা অবিশ্যি খুব নির্জন, এটা তাদের স্কুলের রাস্তা যারা স্কুলে যাবে শুধু তারাই এই রাস্তা দিয়ে যায় কাজেই অন্য কারো এদিক দিয়ে যাবার কথা নয়। ভুল করে তাদের চোখ এড়িয়ে শান্তা আপা চলে যাবেন তার সম্ভাবনা বলতে গেলে নেই। মোটামুটি নিশ্চিন্ত হয়ে বসার পর নিতু আবার পুলিশের কাছে যাবার ব্যাপারটি তুলল, জিজ্ঞেস করল, এখন বল, কে যাবে পুলিশের কাছে? রুনু স্বীকার করে ফেলল, সে পুলিশকে ভয় পায়। কিছুতেই যেতে চায় না। রুনু আর ঝুনুর মাঝে কোনো পার্থক্য নেই, কাজেই ধরে নেয়া হল ঝুনুও পুলিশের কাছে যাবে না। বাকি চারজনের মাঝে কী লটারী করে ঠিক করা হবে না এমনিতেই কেউ রাজি হয়ে যাবে সেটা নিয়ে যখন কথা বার্তা হচ্ছে ঠিক তখন তারা একটা গাড়ির শব্দ শুনতে পেল, সাথে সাথে সবাই মাথা নিচু করে বসে যায়। গাড়িটা তাদের স্কুলের দিক থেকে আসছে, তাদের কাছাকাছি এসে গাড়িটার গতি কমে আসে, এবং ঠিক তাদের সামনে এসে গাড়িটা থেমে যায়। লাইটপোস্টের টিমটিমে আলোতে তারা স্পষ্ট দেখতে পায় গাড়ির দরজা খুলে দুইজন মানুষ বের হয়ে এসেছে। মানুষগুলির বয়স খুব বেশি নয়, তারা সেরকম লম্বা চওড়াও নয়। জিন্সের প্যান্টের সাথে টি সার্ট পরে আছে, একজনের মাথায় একটা বেসবল ক্যাপ। মানুষগুলো বের হয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাল। বেসবল ক্যাপ মাথায় মানুষটা পিচিক করে থুতু ফেলে বলল, শান্তা মাস্টারনীকে এই খানেই ধরি! না কি বলেন ওস্তাদ? যাকে ওস্তাদ বলে ডাকা হল সে হঠাৎ প্যান্টের বোতাম খুলে দাঁড়িয়ে পেশাব করতে শুরু করে দিয়ে সিগারেটটা দাঁতের গোড়ায় চেপে ধরে বলল, সেই জন্যেই তো দাঁড়ালাম এইখানে। রং করার জন্যে কী দাঁড়িয়েছে? পেশাব শেষ করে মানুষটি সরে না যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল নিতু আর অন্য পাঁচজন। তারপর নিশ্বাস বন্ধ করে ওরা একটু পিছিয়ে গিয়ে নিচু হয়ে নিজেদের আড়াল করে ফেলল। নিতু চাপা গলায় বলল, সর্বনাশ! মাস্তানগুলো শান্তা আপাকে ধরার জন্যে যে এখানেই দাঁড়াল। তানিয়া বলল, এই জায়গাটাই তো নির্জন। এখানেই তো দাঁড়াবে। এখন উপায়? আমাদের তাড়াতাড়ি রাস্তার গোড়ার দিকে যেতে হবে। যাব কেমন করে? মিতুল ফিস ফিস করে বলল,  মাস্তান দুইটা যে এদিকেই তাকিয়ে আছে! কিছু করার নাই, এর মাঝেই যেতে হবে। না হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। ওরা উবু হয়ে তাকিয়ে দেখল, রাস্তাটা ঠিক এখানো বাঁকা হয়ে গেছে, রাস্তার গোড়ায় যেতে হলে এই লোক দুজন দেখে ফেলবে। মাস্তান দুজন গাড়ির বনেটে বসে আছে, সেটা হচ্ছে আরেক বিপদ। মাথায় বেস বল ক্যাপ দেয়া মানুষটা বলল, ওস্তাদ। লোহার রড টা বের করি? কর। কাঁটা রাইফেল বের করবি? কর, কেউ নাই এখানে। বেস বল মাথায় মানুষটা গাড়ির লাগেজ কম্পার্টমেন্ট খুলে সেখান থেকে একটা মোটা লোহার রড আর একটা কাঁটা রাইফেল বের করে এনে গাড়ির ছাদে রাখল। যে মানুষটাকে ওস্তাদ বলে ডাকা হচ্ছে সে বলল, কাচু। জে, ওস্তাদ। রাইফেলটা লোড করে রাখ। পারবি তো নাকি আগের মতো ট্রিগার টেনে গুলি করে দিবি? কী বলেন ওস্তাদ! একবার ভুল হয়েছে দেখে বার বার ভুল হবে নাকি! গাছের আড়ালে লুকিয়ে দেখতে পেল কাচু নামের মানুষটা কাঁটা রাইফেলে গুলি ভারে সেটা রেডি করে গাড়ির ছাদে রেখে দিয়ে খুব খুশি হয়ে বলল, সব রেডি। এখন মাস্টারনী আসলেই কেস কমপ্লিট। কাচু যাকে ওস্তাদ বলে ডাকছে, সেই মানুষটা উদাস উদাস গলায় বলল, বুঝলি কাচু, তুই বেশি তড়পাবি না। কাজ ঠাণ্ডা মাথায় করতে হয়। যে কাজের যে স্টাইল। পলিটিক্যাল কাজ এক রকম টাকার কাজ অন্যরকম। টাকার কাজে কোনো মাথা গরম নাই, কোনো বাড়াবাড়ি নাই। জে ওস্তাদ। যখন দেখবি রিক্সাটা আসতেছে আমি কাঁটা রাইফেলটা নিয়ে আগাব। তুই পিছনে থাকবি। কথাবার্তা যা বলার আমি বলব। রিক্সাওয়ালাটা থাকবে তো তারেও নিউট্রালাইজ করতে হবে। লাইট পোস্টটা যেন পিছনে থাকে। আলো আসবে পিছন থেকে চেহারা যেন ঠিক দেখতে না পারে। পুলিশের সাথে বন্দোবস্ত থাকলেও সব সময় সাবধান থাকতে হয়। বুঝলি? জে ওস্তাদ, বুঝেছি। আমি যখন বলব তখন রড দিয়ে মারবি। তার আগে না। মনে থাকবে? থাকবে ওস্তাদ। কাজ যেন ক্লীন হয়। এইটা টাকার কাজ। টাকার কাজ ক্লীন করলে কাস্টমার হাতে থাকে। পরের বারও বিজনেস দেয়। একটা বাড়ি দিয়ে হাঁটুটা গুড়া করে দিতে হবে। কোন্ হাঁটুটা করবি? ডান না বাম? আমি তো বায়া, ডান হাঁটুতেই সুবিধা। ঠিক আছে তাহলে ডান হাঁটু। যাকে ওস্তাদ বলে ডাকা হচ্ছে সেই মানুষটা এবারে আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে চুপ হয়ে গেল। কাচু নামের মানুষটা পুরো গাড়িটা একবার ঘুরে এসে শুকনো গলায় বলল, ওস্তাদ। কী? এইটা কী সেই জায়গা না? কোন্ জায়গা? সেই যে একটা স্কুলের ছেমড়ী সুইসাইড করল? তাই নাকি? জে ওস্তাদ। ছেমড়ীর নাম ছিল বকুল। গলায় দড়ি দিয়েছিল এইখানে। অ। কাচু কিছুক্ষণ পর বলল, জায়গাটা ভালো না। কাচুর ওস্তাদ তখন চমকে উঠল, বলল, কী বলিস তুই? জে ওস্তাদ, ঠিকই বলি। আপনি টের পাচ্ছেন না? দুজনেই তখন ইতি উতি তাকাল এবং কাচুর ওস্তাদ ভয়ে ভয়ে বলল, ঠিকই বলেছিস। জায়গাটা জানি কেমন! গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছয়জনও তখন চারিদিকে তাকাল, জায়গাটা অন্ধকার এবং নির্জন, গাছপালা জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে, কেমন যেন থমথমে ভাব। কেউ যদি মনে করে জায়গাটা ভৌতিক তাহলে খুব দোষ দেওয়া যায় না। কাচু বলল, ওস্তাদ, আপনি একটা জিনিস খেয়াল করেছেন? কাচুর ওস্তাদ শুকনো গলায় বলল, কী জিনিস? এই জায়গাটাতে কোনো শব্দ নাই। ওস্তাদ ভয়ে ভয়ে বলল, তাতে কী হয়েছে? যে সব জায়গা খারাপ সেখানে কোনো পশুপক্ষী থাকে না ঝি ঝি পোকাও থাকে না। দেখেছেন— কাচু আরো কী বলতে চেয়েছিল কিন্তু তার ওস্তাদ ধমক দিয়ে থামিয়ে দিল, চুপ কর হারামজাদা। কথা বলবি না। গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিতু আর তার বন্ধুরা বুঝতে পারল এই মানুষ দুটি ভয় পাচ্ছে। নিতু গলা নামিয়ে বলল, এদের ভয় দেখালে কী রকম হয়? ভয় দেখাবি? কথা বলতে গিয়ে রেবেকা নিজেই ভয় পেয়ে গেল। হ্যাঁ। এমনিতেই ভয় পেয়ে আছে, তার সাথে আর একটু চেষ্টা করলেই দেখাব কী ভয় পাবে। আর একটু চেষ্টা কীভাবে করবি? নিতু একটু চিন্তা করে বলল, মনে কর যদি একটা ঢিল ছুঁড়ি। কিংবা আরো ভালো হয়— আরো ভালো হয়? আরো ভালো হয় যদি জংগলের ভিতর থেকে একটা ভৌতিক শব্দ বের করা যায়। নিতু মিতুলের দিকে তাকিয়ে বলল, মিতুল তুই পারবি না? আমি? হ্যাঁ। ভৌতিক একটা শব্দ করে লাইট বাল্বটা ঠাশ করে ভেঙ্গে ফেলবি। পারবি না? মিতুল লাইট বাটার দিকে তাকিয়ে বলল, একটু দূর হয়ে যায়, তবু মনে হয় পার। দেখ কী মজা হয়! তানিয়া ফিস ফিস করে বলল, দাঁড়া, আগেই শুরু করিস না। পুরো জিনিসটা ঠিক করে প্ল্যান করে নেই আগে। একেবারে আগা গোড়া। কী কী করা হবে, সব কিছু। রেবেকা মাথা নাড়ল, বলল হ্যাঁ তানিয়া ঠিকই বলেছে। প্ল্যানটা ভালো করে করি। নিতু একটু ইতস্তত করে বলল, দেরি না হয়ে যায় আবার হঠাৎ করে যদি এখন শান্তা আপা এসে যায়? আয় তাহলে তাড়াতাড়ি প্ল্যান করে ফেলি। গাছের আড়ালে বসে আবার নিখুঁত পরিকল্পনা করা হল। তাদের মূল উদ্দেশ্য গাড়ির উপর রাখা কাঁটা রাইফেল আর লোহার রডটা সরিয়ে নেওয়া। একবার কোনোভাবে সেই দুইটা সরিয়ে নিতে পারলে কোনো ভয় নেই সেগুলি দিয়েই তখন তাদের কাবু করা যাবে। নিতু আর তানিয়ার উপর ভার দেওয়া হল সেগুলি সরানোর। মাস্তান গুলিকে ব্যস্ত রাখার দায়িত্ব রুনু ঝুনু আর মিতুলের। কীভাবে ব্যস্ত রাখা হবে তার খুঁটিনাটি সবকিছু ঠিক করে নেয়া হল। হঠাৎ করে যদি সরাসরি মারামারি শুরু করে দিতে হয় তাহলে সেটা চালিয়ে নেওয়ার জন্যে কিছু প্রমাণ সাইজ ঢিল বিভিন্ন জায়গায় জমা করে রাখা হল। রেবেকা তার দায়িত্বে আছে, অন্ধকার থেকে মাস্তান দুটির দিকে ঢিল ছুঁড়ে দরকার হলে তাদেরকে কাবু করে দিতে হবে। পরিকল্পনার খুঁটিনাটি কয়েকবার পরীক্ষা করে দেখে নেবার পর তারা উঠে দাঁড়ায়। নিজের নিজের কাজে রওনা দেবার আগে হঠাৎ রুনু ফিস ফিস করে বলল, রেবেকা, আমাদের বুকে ফুঁ দিয়ে দিবি না? রেবেকা তখন আবার তিনবার কুলহু আল্লাহ পড়ে সবার বুকে ফুঁ দিয়ে দিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু হয়ে যায়। নিতু আর তানিয়া গুড়ি মেরে গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ঠিক একই সময়ে রুনু ঝুন আর মিতুল রাস্তার পাশে দিয়ে বেশ খানিকটা সামনে এগিয়ে গেল। রেবেকা তার জায়গায় বসে বড় বড় ঢিল সংগ্রহ করতে শুরু করে। মিনিট খানেক পর পরিকল্পনার ঠিক প্রথম অংশ টুকু কাজে লাগানো হল। গাছ পালা টাকা থমথমে নির্জন জায়গাটায় হঠাৎ একটা অশরীরি কণ্ঠ শোনা যায়, কাতর গলায় সেটি আর্তনাদ করে কাকে যেন ডাকছে, কণ্ঠস্বরটি মানুষের নয়, মানুষের কণ্ঠস্বরে এরকম ব্যাকুল কান্নার মতো দুঃখ থাকতে পারে না। গাছের আড়ালে বসে মিতুল এভাবে ডাকছে জানার পরও নিতুর সারা শরীর কেমন যেন শিউরে উঠে। গাড়ির বনেটে বসে থাকা মাস্তান দুটি লাফিয়ে উঠে একজন আরেকজনকে প্রায় জড়িয়ে ধরল। কাচু বড় বড় নিশ্বাস ফেলে বলল, ওইটা কীসের শব্দ? পা-পা- পাখি নিশ্চয়ই। পাখি কি মা-মা মানুষের মতো ডাকে? ওস্তাদ ভয় পাওয়া গলায় বলল, তা হলে কী? রা-রা-রাত্রে বেলা নাম নিতে চাই না ওস্তাদ। ঠিক এ রকম সময় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রেবেকা ছোট একটা ঢিল ছুঁড়ে মারল, গাড়ির দরজায় লেগে সেটা তীক্ষ্ম একটা ধাতব শব্দ করে উঠল আর সাথে সাথে মানুষ দুইজন আবার ভীষণভাবে চমকে উঠে। কাচু শুকনো গলায় বলল, এইটা কীসের শব্দ ওস্তাদ? মনে হল কেউ ঢিল মেরেছে? ঢিল? ঢিল এখানে কে মারবে? তাহলে? কাচু কাঁদো গলায় বলল, এখানে কী হচ্ছে ওস্তাদ? যখন মাস্তান দুজনকে ব্যস্ত রাখা হচ্ছে ঠিক তখনই দুই পাশ থেকে নিতু আর তানিয়া গুড়ি মেরে গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। আর একটু হলেই তারা গাড়ির নিচে লুকিয়ে যেতে পারবে। পরিকল্পনা অনুসারে তখন সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশটা করা শুরু হল। মাস্তান দুজন তখন অবাক হয়ে দেখল গভীর জঙ্গলের ভেতর থেকে ফুটফুটে একটা মেয়ে বের হয়ে এসেছে। মেয়েটা যেন এ জগতের বাসিন্দা নয়, কোনো কিছুতে তার কোনো কৌতূহল নেই, খুব ধীরে পায়ে সে হেঁটে হেঁটে মাস্তান দুটির দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। মাস্তান দুজন প্রথম রুনুকে দেখে আতংকে প্রায় চিৎকার করে উঠছিল, অনেক কষ্ট করে নিজেদেরকে সামলে নেয়। রুনু ধীরে পায়ে হেঁটে হেঁটে তাদের কাছে এগয়ে আসে। নিতু আর তানিয়া গাড়ির কাছে চলে এসেছে, মাস্তান দুটিকে ব্যস্ত রাখতে পারলে তারা গাড়ির নিচে ঢুকে যেতে পারবে। রুনু হেঁটে হেঁটে গাড়ির কাছাকাছি আসার সময়টুকুতে দুজন গাড়ির নিচে ঢুকে গেল। রুনু হেঁটে হেঁটে মাস্তানদের কাছে এসে তাদের দিকে তাকিয়ে অশরীরি এক ধরনের গলায় বলল, আমার মা কে দেখেছ? মা? দেখ নাই, না? শুনলাম আমাকে ডাকল ব-কু-ল ব-কু-ল করে। কোথায় গেল আমার মা? মানুষ গুলিকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে রুনু অবাস্তব অশরীরি এক ধরনের ভঙ্গি করে জঙ্গলের দিকে হেঁটে যেতে থাকে। ঠিক একই সময় রুনু জঙ্গলের যে অংশ থেকে বের হয়ে এসেছে ঠিক সেই অংশ থেকে ঝুনু বের হয়ে এল ঠিক আগের মতো। কাচু নামের মাস্তানটা শুকনো গলায় বলল, ঐ টা কে, ওস্তাদ? ওস্তাদ মুখ খিচিয়ে বলল? আমি কেমন করে বলব? না মানে বলছিলাম কী-ইয়ে–বলে সে থেমে গেল, যে জিনিসটা বলতে চাইছে সেটা বলতে তার সাহস হল না। ঝুনু ঠিক রুনুর মতো এগিয়ে আসছে এবং রুনুও তখনো পুরোপুরি চলে যায় নি। মাস্তান দুজন এক সাথে দুইজনকেই দেখতে পাচ্ছে। ঝুনু যখন হেঁটে হেঁটে মাস্তান দুইজনের কাছে এল তখন রুনু হেঁটে যাচ্ছে। মাস্তান দুজন বিস্ফোরিত চোখে একবার রুনুর দিকে তাকাল আরেকবার ঝুনুর দিকে তাকাল। ঝুনু অশরীরি গলায় বলল, তোমরা আমার মাকে দেখেছ? দেখ নাই? শোন নাই আমার মা ডাকছে ব-কু-ল? শোন নাই? কোথায় যে গেল মা, আর খুঁজে পাই না। রুনু যতক্ষণ কথা বলছিল সেই সময়টাতে ঝুনু জঙ্গলে ঢুকে পড়ল। ঝুনু খুব আস্তে আস্তে হাঁটবে আর সেই সময়টার মাঝে রুনু আবার বের হয়ে আসবে, মাস্তানগুলি দেখবে একই জায়গা থেকে আবার একই মানুষ বের হয়ে আসছে। ঝুনু যখন খুব ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে তখন মাস্তান গুলি সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কেমন যেন শিউরে উঠল। কাচু মাস্তান বলল, দে-দে-দেখেছেন? হ্যাঁ। দেখতে এক রকম। এ-এ-এ-কে বারে এক রকম। ওস্তাদ শুকনো গলায় বলল, আসলে অন্ধকার তো এই জন্যে ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। ম-ম-মনে এ-এ-হচ্ছে এক রকম। না ওস্তাদ! হুবহু এক রকম। জামা কাপড় চেহারা গলায় স্বর সব কিছু একরকম। কাচু মাস্তানের কথা শেষ হবার আগেই জঙ্গলের ভেতর থেকে রুনু বের হয়ে এল। মাস্তান দুজন একবার বুনুর দিকে তাকাল আবার রুনুর দিকে তাকাল। রুনু খুব অশরীরি ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে আর ঝুনু অশরীরি ভঙ্গিতে জঙ্গলের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। ঝুনু মাস্তান দুইজনের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল,  আমার মাকে দেখেছ তোমরা? খুঁজে পাচ্ছি না আমি। মনে হল শোনলাম ডাকছে ব-কু-ল কিন্তু গিয়ে দেখি নেই। কোথায় যে গেল আমার মা। ঠিক তখন জঙ্গলের ভেতর থেকে কে যেন অশরীরী গলায় কেঁদে উঠল, কাতর, গলায় ডাকল, ব-কু-উ-উ-উ-ল। রুনু সেদিকে তাকিয়ে বলল, ঐ যে ডাকছে আমার মা। যাই মায়ের কাছে। রুনু কিন্তু খুব ব্যস্ততা দেখায় না, অশরীরী প্রাণীর জীবনে কোনো ব্যস্ততা নেই কোনো তাড়াহুড়া নেই জঙ্গলের ভিতর দিয়ে ঝুনুকে তার আগের জায়গায় ফিরে যাওয়ার সময় দিতে হবে সেটা হচ্ছে বড় কথা। এবং ঠিক পরিকল্পনা মতো আবার ঝুনু বের হয়ে এসে মাস্তান দুটিকে জিজ্ঞেস করল, তোমরা দেখেছো আমার মাকে কোথায় গেছে আমার মা আমাকে ডাকছে ব-কু-ল- বকুল কিন্তু আমি তো খুঁজে পাচ্ছি না। মাস্তান দুটি বিস্ফোরিক চোখে দেখে জংগলের একই জায়গা থেকে একজনের পর একজন মেয়ে বের হয়ে আসছে সবাই দেখতে হুবহু একরকম! কাচু মাস্তান এবারে পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ল, ভাঙ্গা গলায় বলল, দেখেছেন ওস্তাদ? চারবার এক মানুষ এসেছে? দেখেছেন? ওস্তাদ চাপা গলায় বলল, আরো আসছে। ওস্তাদ। কী হল? কী হবে এখন? আয়তুল কুরসী পড় হারামজাদা। জানি না। তাহলে কলমা পড়। একটা সমস্যা হয়ে গেছে। কী সমস্যা? না-পাক হয়ে গেছি ওস্তাদ। ভয়ের চোটে পেশাব হয়ে গেছে। হারামজাদা, দূরে সরে বস। ওস্তাদ একটা ধমক দিয়ে বলল, কাঁটা রাইফেলটা ল, দেখি জিন পরীরে দূর করা যায় কী না। কাঁটা রাইফেল নিতে গিয়ে কাচু মাস্তান বেকুব হয়ে গেল। তার স্পষ্ট মনে আছে গাড়ির ছাদে রেখেছিল, সেখানে কিছু নেই। সে মিছেই ছাদে হাত বুলায়, কোথায় কিছু নেই। ভূত নয় এবারে অন্য একটা ভয় তাকে চেপে বসে। ভাঙ্গা গলায় সে ডাকল, ওস্তাদ! কী হল? কাঁটা রাইফেল আর রড গায়েব। কী বললি? ওস্তাদ বনেট থেকে লাফিয়ে নেমে আসে, কী বললি হারামজাদা? বলছি যে অস্ত্রপাতি গায়েব। গায়েব? ওস্তাদ কাচুর মাথায় প্রচণ্ড জোরে একটা চাটি মেরে বলল,  গায়েব মানে কী? গায়েব মানে গায়েব। কাচু ইংরেজিতে চেষ্টা করল, ভ্যানিশ রংবাজির জায়গা পাস না? অস্ত্র গায়েব। তুই জানিস এইটা কার অস্ত্র আমরা ভারা এনেছি? আমি কী করব ওস্তাদ, জিন পরীর সাথে আমি কী করব? জিন পরীর আর কাজ নাই তোর অস্ত্রপাতি নিয়ে যাবে? নিয়ে তো গেল ওস্তাদ-আপনি নিজেই দেখলেন। খোঁজ ভালো করে ছাগলের বাচ্চা। তোর মতো গরু গাধাকে নিয়ে অপারেশনে আসাই ভুল হয়েছে। মাস্তান দুজন যখন গাড়ির ভিতরে তাদের কাঁটা রাইফেল আর লোহার রড় খোজা খুঁজি করছে ঠিক তখন ছয়টি মেয়ে একত্র হয়েছে। এখন আর তাদের ভয় নেই, তারা ছয়জন এক সাথে, তাদের হাতে একটা কাঁটা রাইফেল, একটা লোহার রড় আর সবচেয়ে বড় কথা এত বড় মাস্তানদের বোকা বানিয়ে এখন তাদের সাহস বেড়ে গেছে একশ গুন। ঠিক এই সময় টুং টুং করে একটা রিকশার শব্দ হল। শান্তা আপা রিক্সা করে আসছেন। মাস্তান দুইজন সাথে সাথে তিড়িং করে লাফিয়ে উঠল। একজন আরেকজনের দিকে তাকাল তারপর সামনের দিকে তাকাল। ওস্তাদ কাচু মাস্তানের মাথায় প্রকান্তি আরেকটা চাটি লাগিয়ে চাপা গলায় বলল, অস্ত্র পরে খুঁজিস গাধা। এখন আয় অস্ত্র ছাড়াই শুরু করি। রিক্সাটা এগিয়ে আসতেই মাস্তান দুইজন পথ বন্ধ করে দাঁড়াল, ওস্তাদ মাস্তান গলা উঁচিয়ে বলল, এই রিক্সা থাম! রিক্সাওয়ালা বিপদের গন্ধ পেয়ে কোনোভাবে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছিল কিন্তু পারল না, মাস্তান দুইজন রিক্সা থামিয়ে ফেলল। শান্তা আপা রিক্সার হুড ফেলে জিজ্ঞেস করলেন, কী হচ্ছে? কী হচ্ছে এখানে? ওস্তাদ মান্তান হুংকার দেয়ার চেষ্টা করে বলল,  চোপ। ততক্ষণে ছয়টি মেয়ে তাদের তিন দিকে থেকে ঘিরে ফেলেছে। নিতুর হাতে কাঁটা রাইফেল, মিতুলের হাতে লোহার রড়টা। অন্যদের হাতে প্রমাণ সাইজের চিল। তাদের পায়ের কাছে ব্যাগ, সেই ব্যাগে বোঝাই নানা সাইজের দিলে। নিতু হাতের কাঁটা রাইফেল তাক করে হুংকার দিয়ে বলল,  হ্যাণ্ডস আপ। মাস্তান দুইজন একসাথে চমকে উঠে। মাথা ঘুরিয়ে দেখতে চাইছিল তখন মিতুল হুংকার দিয়ে বলল, একটু নড়েছ তো গুলি করে খুলি ফুটো করে দেব। রেবেকা বলল, বিশ্বাস না করলে ঘোরানোর চেষ্টা করতে পার, একেবারে খুন হয়ে যাবে কিন্তু।। তানিয়া বলল, আগের বার তো ভয়ে পেশাব হয়ে গেছে এইবার বড় কাজটাও হয়ে যাবে। তানিয়ার কথা শুনে সবাই হি হি করে হেসে উঠল এবং হঠাৎ করে মাস্তান দুজন মনে হয় কী হচ্ছে একটু অনুমান করতে পারে। শান্তা আপা রিক্সায় হতচকিত হয়ে বসেছিলেন, এবারে প্রায় আর্ত চিৎকার করে বললেন, কী হচ্ছে এখানে, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। নিতু বলল, আপা, এরা আপনার পা ভেঙ্গে ফেলার জন্য এসেছিল। কী বলছ তোমরা? জি আপা। নিতু বলল, আপনার হাতে যদি জোর থাকে তাহলে কষে এই দুজন মানুষের গালে দুটি চড় লাগান। এরকম ফাজিল আর বেয়াদপ মানুষ খুব কম আছে। শান্তা আপা রিক্সা থেকে নেমে বললেন, আমি এখনো কিছু বুঝতে পারছি না– নিতু তখন রিক্সাওলালাকে বলল, রিক্সাওয়ালা ভাই তাহলে– নিতু তার কথা শেষ করার আগেই রিক্সাওয়ালা ছুটে এসে ওস্তাদ মাস্তানের গালে এমন জোরে চুড় বসালো যে সে একেবারে মুখে হাত দিয়ে বাবাগো বলে মাটিতে বসে গেল। নিতু ব্যস্ত হয়ে বলল, না, না—আপনাকে আমি চড় মারতে বলি নাই। আপনি বলেন নাই তো কী হইছে? আমার একটা দায়িত্ব আছে — বলে রিক্সাওয়ালা হাত ওপরে তুলে কাচু মাস্তানের দিকে এগিয়ে যেতেই সে একেবারে হাঁটু ভেঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে রিক্সাওয়ালার পা ধরে ফেলল। থাক, থাক মারপিটের দরকার নেই বলে শান্তা আপা এগিয়ে এলেন, বললেন, এরা যদি আসলেই মাস্তান হয় তাহলে পুলিশের হাতে দিলেই হবে। আপা, নিতু বলল, এদেরকে আগে বেঁধে ফেলতে হবে। ভীষণ বদমাইস এরা। টাকা নিয়ে খুন খারাপ করে। রিক্সাওয়ালা ততক্ষণে তার কোমরের গামছা খুলে ওস্তাদকে শক্ত করে বেঁধে ফেলেছে। ব্যাগের ভেতর থেকে একটা চাদর খুঁজে পাওয়া গেল, সেটা ছিঁড়ে পাকিয়ে দডির মতো করে কাচু মাস্তানকেও বাঁধা হল। তানিয়া মাথা নেড়ে বলল, এদের পা ও বেঁধে ফেলতে হবে। হ্যাঁ। আগে রিক্সায় তুইলা নেই, তারপর। গুড আইডিয়া। মিতুল মাথা নাড়ল, পা বাঁধা থাকলে রিক্সা থেকে লাফিয়ে আর পালিয়ে যেতে পারবে না। একেবারে পুরোপুরি ভড়কে যাওয়া মাস্তান দুইটি বিস্ফোরিত চোখে সবার দিকে তাকিয়ে ছিল, এখনো তারা বিশ্বাস করতে পারছে না কী ঘটছে। রিক্সাওয়ালা যখন শক্ত করে মাস্তান দুটিকে বাঁধছে তখন শান্তা আপা বললেন, এখন আমাকে বল, কী হচ্ছে? বিশাল স্টোরি আপা! রুনু দাঁত বের করে হেসে বলল, বলতে এক মাস লাগবে। লাগুক। নিতু জিজ্ঞেস করল, সংক্ষেপে বলব? বল। বেগম জোহরা কামালের সব কাগজপত্র খুঁজে পেয়েছি আমরা। কী বললে? শান্তা আপা চিৎকার করে বললেন, কী বললে? হ্যাঁ আপা। আপনার ঘরেই ছিল। ঐ সিক্রেট ধাপটার মাঝে! সব কিছু আছে। স্কুলের দলিল। স্কুলের পরিকল্পনা, সব। কী আশ্চর্য! শান্তা আপা অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকালেন, বললেন,  তোমরা খুঁজে পেয়ে গেছ! তার মানে কী জান? তার মানে হচ্ছে আর কেউ কখনো তোমাদের জ্বালাতন করতে পারবে না! না আপা, পারবে না। কী আশ্চর্য, আমি সারা দুনিয়া চষে ফেলছি, আর তোমরা কী না— আপা। কী হল? চলেন স্কুলে যাই। সব মেয়েরা কী ভয়ে ভয়ে আছে, তাদেরকে গিয়ে সব কিছু বলি। সাহস দিই। চল। হেঁটে যেতে পারবে তো? কী বলেন আপা, আমরা এর মাঝে কী কী করেছি শুনলে আপনার হার্টফেল হয়ে যাবে। শান্তা আপা মাথা নাড়লেন, বললেন, মনে হচ্ছে তোমরা ঠিকই বলছ, সত্যি হার্টফেল হয়ে যাবে। কিছুক্ষণের মাঝেই ছোট দলটি রওনা দিল। প্রথমে রিক্সায় আষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধা দুই মাস্তান। তার পিছনে ছয়জনের ছোট দল এবং সবার শেষে শান্তা আপা। কাঁটা রাইফেল থেকে বুলেট বের করে নেয়া হয়েছে এবং সেই একেকবার একেকজন ঘাড়ে করে নিচ্ছে। স্কুলের কাছাকাছি এসে ওরা ছোট খাট শ্লোগান দেয়া শুরু করল, হায় হায় এ কী হল? শান্তা আপা ফিরে এল কিংবা গুণ্ডা মাস্তান কান্দে—দড়ি দিয়া বান্ধে) ইলেকট্রিক শক খাওয়া খাড়া খাড়া চুল দাড়ি ওয়ালা দারোয়ান প্রথমে স্কুলের গেট খুলতে দারোয়ান রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু মেয়েদের হাতে কাঁটা রাইফেল দেখে আর আপত্তি করল না। স্কুলের সীমানার ভিতরে ঢুকে, হবে হবে জয়, নাই ভয় নাই ভয় গাইতে গাইতে দলটি খোরাসানী ম্যাডামের বাসার দিকে যেতে থাকে। তাদের গান শুনে হোস্টেলের সব মেয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। গেটে তালা লাগানো না থাকলে নিশ্চয়ই সবাই এতক্ষণ ছুটে আসত। খোরাসানী ম্যাডামের বাসায় যাবার আগেই দেখা গেল সে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে, কপালে কাছে একটা অংশ ফুলে গিয়ে বাম চোখটা প্রায় বুজে গিয়েছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে খুব বেকায়দা ভাবে সে একটা আছাড় খেয়েছে, ঘরের মেঝেতে তেল ঢেলে রাখার কারণেই হয়ে সম্ভবত কিন্তু এখন সেটা জানার কোনো উপায় নাই। খোরাসানী ম্যাডাম এই ছোট দলটি দেখে একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে গেল। শান্তা আপা এগিয়ে গিয়ে বললেন, আপনি তো আমাকে বরখাস্ত করে দিয়েছেন এই স্কুলে তো আমার আসা উচিত না। তবু চলে এলাম। তিনটা খুব জরুরি কাজ পড়ে গেল কি না। খোরাসানী ম্যাডাম কোনো কথা না বলে রক্তচক্ষু করে শান্তা আপার দিকে তাকিয়ে রইল। শান্তা আপা হাসি হাসি মুখে বললেন,  প্রথম কাজটা হচ্ছে একটা টেলিফোন করতে হবে পুলিশের কাছে। রাস্তা থেকে দুইটা মাস্তান ধরে এনেছি, অস্ত্রপাতি সহ। আসলে আপনার স্কুলের মেয়েরাই ধরেছে আমি শুধু সাথে ছিলাম। গুণ্ডা বদমাইস বাইরে থাকা ঠিক না। আর দুই নম্বর কাজটা হচ্ছে একটা রিসিট নিয়ে। এই মাস্তান দুইজন নাকি আপনার কাছ থেকে এক হাজার টাকা এডভান্স নিয়েছে কিন্তু কোনো রিসিট দেয় নাই। কী অন্যায়। কী অন্যায়! রিসিট না দিয়ে এক হাজার টাকা নিয়ে গেল? এক্ষুনি একটা রিসিট লিখিয়ে নেন। তিন নম্বর কাজটা আসলে ঠিক কাজ না– শান্তা আপা ইতস্তত করে বললেন, তিন নম্বর কাজটা একটা প্রশ্ন। আপনি কী মোটা চালের ভাত খেতে পারেন? খোরাসানী ম্যাডাম নাক দিয়ে ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করল, কী? আপনি কি মোটা চালের ভাত খেতে পারেন? শুনেছি জেলখানায় নাকি শুধু মোটা চালের ভাত দেয়। আমরা বেগম জোহরা কামালের ফাইলটা খুঁজে পেয়েছি কি না— শান্তা আপা কথা শেষ করার আগেই হঠাৎ খোরাসানী ম্যাডাম আঁ আঁ শব্দ করে, তবে রে শয়তানী বলে চিৎকার করে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে একটা চলন্ত ট্রাকের মতো শান্তা আপার দিকে ছুটে এল, দরজার কাছাকাছি এসে বাঘ যেভাবে লাফ দেয় সেভাবে শান্তা আপার ওপর লাফিয়ে পড়ল। শান্তা আপা মনে হয় প্রস্তুত ছিলেন, শুধু বাম দিকে একটু সরে গেলেন আর খোরাসানী ম্যাডাম প্রচণ্ড শব্দ করে ঘরবাড়ি কাঁপিয়ে মেঝেতে আছাড় খেয়ে পড়ল। সেই অবস্থায় মাথাটা একবার তুলে শেষে একটা হুংকার দিয়ে নেতিয়ে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। রিক্সাওয়ালা এগিয়ে এসে বলল, ইয়া মাবুদ! এইটা তো দশমনী লাশ! কোরবানীর গরু হলে ষাট হাজার টাকার এক পয়সা কমে কেউ গাবতলীর বাজার থেকে কিনতে পারত না। এরকম অমার্জিত রূট একটা কথায় কিছুতেই ছাত্রীদের সামনে হাসবেন না ঠিক করেও শান্তা আপা হঠাৎ হি হি করে হেসে ফেললেন -তখন হাসতে হাসতে অন্য সবার যা একটা অবস্থা হল সে আর বলার মতো নয়।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৪৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ সততার পুরষ্কার হিসেবে রাজা হওয়া।
→ দীপু নাম্বার টু (১২)
→ বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারী সংখ্যা আর করোনা ভাইরাসের ডাক্তার সংখ্যা কী সমান?
→ ফটিকচাঁদ (১২)
→ আর্থার,আয়ান কিংবা নাঈমের গল্প!
→ হাসু আর কাসুর মা চাকমাদের কারণে পাগল হয়েছে।
→ ঘুম থেকে সজাগ হলে পৃথিবী আর সজাগ না হলে অনন্ত পৃথিবী থেকে।
→ স্কুলের নাম পথচারী (১২)
→ ক্লাসে পড়া বলা আর সমাবেশে পড়া বলা এক নয়।
→ ক্লাসে পড়া বলা আর সমাবেশে পড়া বলা এক নয়।

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...