গল্পেরঝুড়ির এ্যাপ ডাউনলোড করুন - get google app
গল্পেরঝুড়ি ফানবক্স ! এখন গল্পের সাথেও মজাও হবে! কুইজ খেলুন , অংক কষুন , বাড়িয়ে নিন আপনার দক্ষতা জিতে নিন রেওয়ার্ড !

গল্পেরঝুড়িতে স্বাগতম ...

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ত্রাতিনা – প্রথম পর্ব(1.02)

"সাইন্স ফিকশন" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Alyna (৩৫৩ পয়েন্ট)



১.০২ কমান্ডার লী তার সামনে বসে থাকা কুড়িজন মহাকাশচারীর উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, “আমাদের এখন কী করতে হবে, তোমরা সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ।” মহাকাশচারীরা মাথা নাড়ল। কেউ মুখে কোনো কথা বলল না। কমান্ডার লী গলার স্বরকে একটুখানি উঁচু করে বলল, “সুপ্রিম কমান্ড কাউন্সিল আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে তোমাদের ভেতর থেকে একটি টিম তৈরি করার জন্যে। যে টিমটি গ্রহাণুটিকে ধ্বংস করতে যাবে।” মহাকাশচারীরা এবারেও কোনো কথা বলল না। পাথরের মতো মুখ করে বসে রইল। কমান্ডার লী বলল, “আমি ইচ্ছে করলে তোমাদের কয়েকজনকে নিয়ে সেই টিম তৈরি করে দিতে পারি। কিংবা তোমরা চাইলে নিজেদের ভেতরে আলোচনা করে আমাকে একটা টিম তৈরি করে দিতে পার। এখন তোমাদের কী ইচ্ছা, বল।” মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ বলল, “আমাদের পাঁচ থেকে দশ মিনিট সময় দেয়া হলে আমরা নিজেদের ভেতর কথা বলে তোমাকে টিমের সদস্যদের তালিকা তৈরি করে দিতে পারব।” পিছন থেকে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “তার প্রয়োজন নেই কমান্ডার। আমি এই মিশনের দায়িত্ব নিতে চাই।” সবাই মাথা ঘুরিয়ে মেয়েটির দিকে তাকালো। মেয়েটির নাম রায়ীনা। মহাকাশচারীদের এই দলটির মাঝে সবচেয়ে অভিজ্ঞ কয়েকজনের একজন। কমান্ডার একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল, “রায়ীনা, তুমি জান এটা হচ্ছে একটা সুইসাইড মিশন।” রায়ীনা শান্তভাবে বলল, “হ্যাঁ আমি জানি। কিন্তু আমার কাছে এই কারণটি এতোটুকু গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার কাছে এই মিশনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সঠিকভাবে করা না হলে পৃথিবীর সাত বিলিয়ন মানুষকে বাঁচানো যাবে না। আমি এই দায়িত্বটি নিতে চাই।” মধ্যবয়স্ক মহাকাশচারী রায়ীনার দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল, “রায়ীনা, তুমি বিষয়টাকে যেভাবে দেখছ, আমরা সবাই ঠিক একইভাবে দেখছি। কাজেই আমরা কি সবাই মিলে এটা নিয়ে আলোচনা করে একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারি না?” রায়ীনা বলল, “অবশ্যই পারি। কিন্তু আমাদের হাতে সময় খুব কম, প্রত্যেকটা সেকেন্ড মূল্যবান। তাই আমি একটু সময় বাঁচানোর চেষ্টা করছি, আর কিছু নয়। তা ছাড়া আমার ধারণা, আমরা সবাই মিলে আলোচনা করলে তোমরা আমাকেই দায়িত্বটা দেবে। এ ধরনের মিশনে আমার অভিজ্ঞতা সবচাইতে বেশি।” মধ্যবয়স্ক মহাকাশচারী বলল, “মহাকাশে একটা গ্রহাণুতে মহাকাশযান নামানোতে আমাদের কারো অভিজ্ঞতা নেই। আমরা কেউ আগে এটা করিনি।” “কিন্তু আমি নিয়মিতভাবে মহাকাশ স্টেশনে রসদ নিয়ে যাই। আমি চোখ বন্ধ করে মহাকাশ স্টেশনে মহাকাশযান ডক করতে পারি। একটা জটিল মহাকাশ স্টেশন আর গ্রহাণুর মাঝে বড় কোনো পার্থক্য নেই।” মধ্যবয়স্ক মহাকাশচারী বলল, “আছে। এই গ্রহকণার বেলায় পার্থক্য আছে। মহাকাশ স্টেশন বিচিত্রভাবে তার তিন অক্ষে ঘুরপাক খায় না। এই গ্রহাণুটি বিচিত্রভাবে তার তিন অক্ষে ঘুরপাক খাচ্ছে।” রায়ীনা একটু হাসির মতো ভঙ্গি করে বলল, “আমি জানি। তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে, একটি মহাকাশ স্টেশন একবার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছিল। সবাই সেটির আশা ছেড়ে দিয়েছিল। আমি তখন নিজ দায়িত্বে সেই মহাকাশ স্টেশনে ডক করে সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করেছিলাম!” মধ্যবয়স্ক মহাকাশচারী হাসল। বলল, “হ্যাঁ। অবশ্যই মনে আছে। তোমার সেই কাজটুকু এখন মহাকাশ অভিযানের টেক্সট বইয়ে ঢোকানো আছে। মহাকাশ ইনস্টিটিউটের ছাত্রছাত্রীদের সেটা পড়ানো হয়।” “কাজেই তোমরা আমার উপর বিশ্বাস রাখতে পার। আমি তোমাদের নিরাশ করব না। মূল কাজটি করবে মহাকাশযানের অন বোর্ড কোয়াকম্প। গ্রহাণুটির গতি বিশ্লেষণ করে মহাকাশযানটিকে তার সাপেক্ষে স্থির করে আনতে হবে। আমি শুধু ম্যানুয়েল কন্ট্রোলে থাকব।” কমান্ডার লী এতোক্ষণ কোনো কথা বলেনি। রায়ীনার কথা শেষ হবার পর তার দিকে তাকিয়ে বলল, “শুধু ডক করা নয়, ডক করার পর একটি থার্মো নিউক্লিয়ার বোমা ডেটনেট করার ব্যাপার আছে।” রায়ীনা হেসে বলল, “সেটি হচ্ছে একটা লাল বোতাম টিপে ধরা। দেখিয়ে দেয়া হলে একটা পাঁচ বছরের বাচ্চাও এটা করতে পারে। সেটি করার আগে রেটিনা স্ক্যান করিয়ে সিকিউরিটি কোড ঢোকাতে হবে। আমি সেটা ঢোকাতে পারব। কোনো সাহায্য ছাড়াই আমি সিকিউরিটি কোড মনে রাখতে পারব। পাইয়ের মান দশমিকের পর তেতাল্লিশ ঘর পর্যন্ত আমার এমনিতেই মনে থাকে।” মধ্যবয়স্ক মহাকাশচারী বলল, “রায়ীনা। আমার মনে হয়, তোমাকে দায়িত্বটি দেবার আগে আমরা সবাই মিলে বিষয়টা একটুখানি আলোচনা করি।” রায়ীনা মাথা নাড়ল। বলল, “যদি তোমাদের কারো মনে হয়, আমি এই কাজটি করার উপযুক্ত নই, তোমরা সেটি প্রকাশ্যে সবার সামনে বলতে পার। আমি মেনে নেব। কিন্তু যদি আমার কর্মক্ষমতা নিয়ে তোমাদের কোনো সন্দেহ না থাকে, তাহলে আমি এই দায়িত্ব পালন করতে চাই। পৃথিবীতে খুব কম মানুষের জীবনে এতো গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ করার সুযোগ আসে। আমি নিজেকে খুবই সৌভাগ্যবান মনে করব, যদি আমাকে এই সুযোগটি দেয়া হয়।” মহাকাশচারীরা কোনো কথা বলল না। কমবয়সী একজন বলল, “রায়ীনা, তোমার কর্মদক্ষতা নিয়ে আমাদের কারো মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। আমরা, তরুণেরা সব সময় তোমার মতো একজন হওয়ার চেষ্টা করি–” তরুণ মহাকাশচারীর কথা শেষ হওয়ার আগেই রায়ীনা বলল, “তোমরা সত্যিই যদি এটি বিশ্বাস করো, তাহলে আমাকে দায়িত্ব দেয়া নিয়ে তোমাদের কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। আমি দায়িত্বটি নিতে চাই।” রায়ীনা কমান্ডার লীয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “কমান্ডার, আমাকে দায়িত্বটুকু দিন।” কমান্ডার কয়েক সেকেন্ড নিঃশব্দে রায়ীনার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর একটি নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “ঠিক আছে রায়ীনা। আমি তোমাকে দায়িত্ব দিচ্ছি। এই দায়িত্ব নেবার জন্য পৃথিবীর মানুষের পক্ষ থেকে আমি তোমাকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।” রায়ীনা বলল, “ধন্যবাদ কমান্ডার।” তারপর যেভাবে হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক সেভাবে তার জায়গায় বসে পড়ল। কমান্ডার বলল, “আমরা টিম লিডার পেয়েছি। এখন আমাদের আরো দু’জন সদস্য দরকার। যারা রায়ীনার সাথে যাবে।” একজন তরুণ মহাকাশচারী প্রায় লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি যাব।” সাথে সাথে অন্য সবাই উঠে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করল, “আমি। আমি। আমি যাব।” যে তরুণ মহাকাশচারী সবার আগে উঠে দাঁড়িয়েছিল, সে গলা উঁচিয়ে বলল, “আমি রায়ীনার সাথে অনেকবার রসদ নিয়ে মহাকাশ স্টেশনে গিয়েছি। রায়ীনার সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার সবচেয়ে বেশি। আমি রায়ীনার মিশনে চমৎকার একজন সহকর্মী হব।” সাথে সাথে অন্যেরাও কথা বলতে শুরু করল এবং ঘরের ভেতর একধরনের হট্টগোলের মতো অবস্থা হল। তখন রায়ীনা আবার উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “তোমরা আমাকে আরেকবার কথা বলার সুযোগ দাও।” কমান্ডার মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ। আমার মনে হয়, রায়ীনাকে আমরা তার টিমের অন্য দু’জন সদস্যকে বেছে নিতে দিই।” রায়ীনা বলল, “আমার আর কাউকে প্রয়োজন নেই। এই মিশনটি সবচেয়ে ভালোভাবে শেষ করার জন্যে আমি একাই যথেষ্ট। আমার প্রয়োজন একটি ইলন শাটল, সেখানে থাকবে একটি অনবোর্ড কোয়াকম্প। পৃথিবীর মূল ডাটা সেন্টারের সাথে সরাসরি যোগাযোগ থাকবে প্লিক্সি নেটওয়ার্ক দিয়ে। ইলন শাটলকে উৎক্ষেপণ করে ট্রিটন রকেট দিয়ে, তাহলেই আর কোনো কিছুর প্রয়োজন হবে না।” কমান্ডার লী একটু অবাক হয়ে বলল, “তুমি একা যেতে চাও?” “হ্যাঁ কমান্ডার। আমি একা গেলে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে পারব। আমাকে তাহলে অন্যের কাজকর্ম নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না। অন্যের কাজকর্মের উপর নির্ভর করতে হবে না। অন বোর্ড একটা কোয়াকম্প থাকলে আমার কোনো মানুষের সাহায্যের দরকার হবে না।” “কিন্তু এতো বড় একটা মিশনে শুধু একজনের উপর নির্ভর করা ঠিক হবে না।” রায়ীনা মাথা নাড়ল। বলল, “সেটি সত্যি। আমার মনে হয়, আমি রওনা দেয়ার পর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় এমনকি দরকার হলে চতুর্থ এবং পঞ্চম মিশনও প্রস্তুত থাকা দরকার। কোনো কারণে আমি যদি ব্যর্থ হই, একটির পর আরেকটি মিশন পাঠানোর প্রস্তুতি থাকতে হবে।” কমান্ডার লী মাথা নাড়ল। বলল, “হ্যাঁ। সেটি আমাদের পরিকল্পনার মাঝে আছে।” রায়ীনা এক মুহূর্ত ইতস্তত করে বলল, “আমার মিশনটি প্রস্তুত করতে মিশন কন্ট্রোলের খুব কম করে হলেও এক থেকে দুই ঘণ্টা সময় দরকার হবে। আমি কী এই সময়টুকু নিজের জন্যে পেতে পারি?” কমান্ডার লী বলল, “অবশ্যই পেতে পারো। মিশন শুরু করার আগে তোমার সাথে দশ থেকে পনেরো মিনিট সময় পেলেই চলবে।” “ধন্যবাদ কমান্ডার। আমি কী এখনই বিদায় নিতে পারি?” “অবশ্যই।” রায়ীনা ঘরের ভেতর চুপচাপ বসে থাকা মহাকাশচারীদের দিকে এক নজর তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, “তোমাদের সাথে সম্ভবত আমার আর দেখা হবে না। তোমাদেরকে বলছি তোমরা হচ্ছ আমার সত্যিকারের পরিবার। আমাকে চমঙ্কার একটা আনন্দময় জীবন দেওয়ার জন্যে তোমাদের ধন্যবাদ।” মহাকাশচারীরা মাথা নাড়ল। একজন বলল, “আমাদের বেঁচে থাকার অর্থ শেখানোর জন্যে তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা রায়ীনা। আমাদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তুমি যাও রায়ীনা। যার কাছ থেকে বিদায় নিতে হবে, তুমি তার কাছে যাও।” রায়ীনা ঘর থেকে বের হয়ে গেল। পিছনের সারিতে বসে থাকা একজন তরুণ তার পাশের তরুণীকে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “রায়ীনা কার কাছ থেকে বিদায় নেবে?” “তার দুই বছরের মেয়েটির কাছ থেকে।” . অনাথ আশ্রমের গেটে বাইভার্বালটি থামিয়ে দরজা খুলে রায়ীনা নেমে এল। সে তার বাম হাত দিয়ে তার দুই বছরের মেয়েটিকে আলগোছে ঝুলিয়ে রেখেছে। মেয়েটিকে দেখে মনে হতে পারে, তাকে এভাবে ঝুলিয়ে রাখার কারণে সে বুঝি খুব অস্বস্তি বোধ করছে। কিন্তু তার মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে, সে মোটেও অস্বস্তিতে নেই এবং এভাবে ঝুলে থাকায় সে খুবই অভ্যস্ত। মেয়েটি ঝুলন্ত অবস্থায় অনেকটা আপন মনে নিজের হাত দুটি নিয়ে খেলছে। রায়ীনা কয়েক পা অগ্রসর হতেই অনাথ আশ্রমের দরজা খুলে এর ডিরেক্টর ক্লারা–হাসিখুশি মধ্যবয়স্ক একজন মহিলা বের হয়ে এল। দুই হাত ওপরে তুলে আনন্দের একটা ভঙ্গি করে ক্লারা বলল, “আমাদের কী সৌভাগ্য, একজন সত্যিকারের মহাকাশচারী আমাদের দেখতে এসেছে। আমার বাচ্চারা আনন্দে পাগল হয়ে যাবে!” রায়ীনা হাসিমুখে বলল, “তারা যদি মহাকাশচারী দেখতে চায়, আমাদের সেন্টার থেকে ডজন ডজন মহাকাশচারী পাঠাতে পারব। আজকে আমি একটা কাজে এসেছি। সেই কাজটুকু আগে সেরে নেই।” “অবশ্যই। অবশ্যই। চলে এসো।” আশ্রমের ডিরেক্টর ক্লারার অফিসটা খোলামেলা। এখানে নিশ্চয়ই অনেক শিশু আসে। অফিসটিকে শিশুদের জন্যে আনন্দময় করে রাখা আছে। রায়ীনা তার বাম হাতে ঝুলিয়ে রাখা মেয়েটিকে মেঝেতে নামিয়ে দিল। মেয়েটি সাথে সাথে ঘরের কোনায় স্কুপ করে রাখা খেলনাগুলোর দিকে ছুটে গেল। রায়ীনা এক নজর সেদিকে তাকিয়ে থেকে একটা চেয়ার টেনে বসে ডিরেক্টর ক্লারার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার হাতে একেবারে সময় নেই। যে কথাটি বলতে এসেছি, আগে বলে নিই?” রায়ীনার গলার স্বরে কিছু একটা ছিল। আশ্রমের ডিরেক্টর ক্লারার হাসি হাসি মুখে এক ধরনের গাম্ভীর্য নেমে এলো। সে মাথা নেড়ে বলল, “অবশ্যই রায়ীনা।” রায়ীনা কোনোরকম ভূমিকা না করে বলল, “আমি আমার মেয়ে ত্রাতিনাকে তোমার হাতে দিতে এসেছি। আমার ইচ্ছা, সে এই আশ্রমে তার মতো আরো অনেকের সাথে বড় হোক।” ডিরেক্টর ক্লারার চোখে এক ধরনের বিস্ময়ের ছায়া পড়ল। কিন্তু সে কোনো কথা বলল না। রায়ীনা শান্ত গলায় বলল, “তুমি আমাকে কোনো প্রশ্ন করো না। কারণ প্রশ্ন করলেও আমি তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না।” ডিরেক্টর ক্লারা কোনো প্রশ্ন করলো না। একদৃষ্টে রায়ীনার দিকে তাকিয়ে রইল। রায়ীনা শান্ত গলায় বলল, “আমি মায়ের দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা করিনি। পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে আনন্দময় সময় ছিল ত্রাতিনার সাথে কাটানো সময়টুকু।” রায়ীনা হঠাৎ করে থেমে গেল। রায়ীনার ইস্পাতের মতো শক্ত নার্ভ, কিন্তু সে আবিষ্কার করল, সে আর কথা বলতে পারছে না। তার চোখ দুটো অশ্রুসজল হয়ে পড়ছে। ডিরেক্টর ক্লারা বলল, “রায়ীনা, তোমাকে আর কিছু বলতে হবে না। অমি কিছু জানতেও চাই না। একজন মা নিজে এসে তার সন্তানকে এই আশ্রমে দিয়ে গেলে আর কিছু করতে হয় না। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, তোমার মেয়ে ত্রাতিনা এখানে অন্য সব শিশুদের নিয়ে গভীর এক ধরনের ভালোবাসা নিয়ে একটা বিশাল পরিবারে বড় হবে। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। রায়ীনা।” রায়ীনা খুব সাবধানে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে তার চোখের কোনা মুছে নিয়ে ত্রাতিনার দিকে তাকালো। ত্রাতিনা তখন গভীর মনোযোগ দিয়ে একটা খেলনা ভালুকের মাথাটি ধড় থেকে টেনে আলাদা করার চেষ্টা করছিল। রায়ীনা আবার ডিরেক্টর ক্লারার দিকে তাকালো। তারপর পকেট থেকে ছোট একটা ক্রিস্টাল তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “আমি জানি প্রথম প্রথম ত্রাতিনা আমাকে খুঁজবে, আমার জন্যে কাঁদবে। তারপর সে আস্তে আস্তে আমাকে ভুলে যাবে। বহুদিন পর সে যখন বড় হবে, তখন হঠাৎ একসময় হয়তো তার কৌতূহল হবে, সে জানতে চাইবে সে কোথা থেকে এসেছে। তার মা কে, বাবা কে, তার পরিচয় কী। তখন তুমি এই ক্রিস্টালটি ত্রাতিনার হাতে দিও। এখানে আমি তাকে উদ্দেশ্য করে কিছু কথা বলেছি। আমার ধারণা, সে যদি এটা শোনে, তাহলে হয়তো তার মাকে সে ক্ষমা করে দেবে।” ডিরেক্টর মহিলাটি হাত বাড়িয়ে ক্রিস্টালটি নিয়ে বলল, “আমি এটা এখনই আমাদের সেফ ডিপোজিটে রেখে দিচ্ছি। ত্রাতিনা যখন পূর্ণ বয়সে পৌঁছাবে, তখন সেটি তার হাতে দেয়া হবে।” “ধন্যবাদ তোমাকে।” রায়ীনা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমার হাতে সময় খুব কম। আমি কী ত্রাতিনাকে তোমাদের অন্য শিশুদের মাঝে রেখে আসতে পারি? তাহলে আমার বিদায় নেওয়া সহজ হবে।” ডিরেক্টর মহিলা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “অবশ্যই সেটি করতে পারবে। এসো আমার সাথে।” রায়ীনা তখন হেঁটে ত্রাতিনার কাছে গিয়ে বলল, “এসো ত্রাতিনা, আমরা তোমার আপনজনের কাছে যাই।” ত্রাতিনা কী বুঝল কে জানে, আপনজনের কাছে যাওয়ার জন্যে প্রায় লাফিয়ে রায়ীনার বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। রায়ীনা তাকে বুকে চেপে উঠে দাঁড়াল। ডিরেক্টর মহিলার পিছনে পিছনে সে করিডোর ধরে হাঁটতে থাকে। করিডোরের শেষ মাথায় একটা বড় হলঘর। হলঘরের দরজা খুললেই দেখা গেল, ভেতরে অনেকগুলো নানা বয়সী শিশু হুটোপুটি করে খেলছে। তাদের ভেতর থেকে বেশ কয়েকজন মাথা ঘুরিয়ে ডিরেক্টর মহিলা এবং রায়ীনার দিকে তাকাল। তাদের চোখ মুখ হঠাৎ আনন্দে জ্বলজ্বল করে ওঠে এবং এক সাথে সবাই তাদের দিকে ছুটে আসে। শিশুগুলো তাদের ঘিরে দাঁড়াল এবং অকারণে খিলখিল করে হাসতে শুরু করল। রায়ীনা মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে ত্রাতিনাকে নামিয়ে দিয়ে ফিস ফিস করে বলল, “ত্রাতিনা, এই যে, এরা তোমার ভাই বোন! তুমি যাবে তাদের কাছে?” ত্রাতিনা একবার খানিকটা সন্দেহের চোখে মায়ের দিকে তাকালো, তারপর তাদের ঘিরে থাকা শিশুগুলোর দিকে তাকালো। তার চোখে মুখে দুর্ভাবনার একটা ছাপ পড়ল। সে বুঝতে পারছে না, হঠাৎ করে তার চারপাশে তার সমবয়সী এতোগুলো শিশু কোথা থেকে এসেছে। একটি সোনালী চুলের মেয়ে ত্রাতিনার কাছে এসে সাবধানে তার হাতটি ধরে নিজের দিকে টেনে আনতে চেষ্টা করল। ত্রাতিনা প্রথমে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করে। তারপর হঠাৎ কী মনে করে অন্য হাত দিয়ে মেয়েটির সোনালী চুলগুলো স্পর্শ করে দেখল। কী কারণ কে জানে কেন, হঠাৎ করে ত্রাতিনার মুখ থেকে দুর্ভাবনার চিহ্নটি সরে গিয়ে মুখটি হাসি হাসি হয়ে যায়। রায়ীনা নিচু গলায় বলল, “যাও ত্রাতিনা, যাও। তোমার ভাই বোনের কাছে যাও।” ত্রাতিনা তখন খুব সাবধানে শিশুদের সাথে গুটি গুটি পায়ে হেঁটে যেতে থাকে। রায়ীনা কিছুক্ষণ তার মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ডিরেক্টর ক্লারার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি কি কিছুক্ষণ এই ঘরটিতে থাকতে পারি?” “অবশ্যই। তোমার বসার জন্যে একটা চেয়ার এনে দিই।” “তার কোনো প্রয়োজন নেই।” রায়ীনা একটু পিছিয়ে গিয়ে দেওয়ালে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। তারপর ক্লারার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার হাতে একেবারে সময় নেই। দশ কী পনেরো মিনিটের ভেতর আমার ডাক পড়বে। তখন আমাকে যেতে হবে। যতক্ষণ আমাকে না ডাকছে, আমি ততক্ষণ এখানে বসে থাকতে চাই।” ডিরেক্টর ক্লারা বলল, “ছোট বাচ্চাদের চেঁচামেচি যদি তোমার নার্ভের উপর উঠে না যায়, তুমি যতক্ষণ ইচ্ছা এখানে বসে থাকতে পার। তুমি সম্ভবত নিরিবিলি একা বসে থাকতে চাও। আমি তোমাকে একা থাকতে দিই?” রায়ীনা একটু হাসার চেষ্টা করল। বলল, “তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। আসলেই আমি একটু সময় একা বসে থাকতে চাইছিলাম।” রায়ীনা দেওয়ালে হেলান দিয়ে একা একা বসে রইল। বড় হলঘরের এক পাশে ত্রাতিনা অন্য শিশুদের সাথে খেলতে শুরু করেছে। রায়ীনা বিচিত্র এক ধরনের লোভাতুর দৃষ্টিতে তার মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল। আর কোনোদিন সে তার এই সন্তানটিকে বুকে চেপে ধরতে পারবে না। এই শিশুগুলো যেন পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারে, সে জন্যে সে তার প্রাণটি দিতে যাবে। সেটি নিয়ে তার ভেতরে কোনো হতাশা নেই। কোনো জ্বালা কিংবা ক্ষোভ নেই। একটুখানি দুঃখ হয়তো আছে, কিন্তু সেরকম দুঃখ কার জীবনে নেই? ঠিক দশ মিনিটের মাথায় রায়ীনার ট্রাকিওশানটি তাকে সংকেত দিল, তার যাবার সময় হয়েছে। রায়ীনা উঠে দাঁড়াল, তার দুই বছরের মেয়েটির কাছ থেকে এখন তাকে বিদায় নিতে হবে। সে কী পারবে বিদায় নিতে? রায়ীনা নরম গলায় ডাকল, “ত্রাতিনা, মা আমার।” ত্রাতিনা ঘুরে তাকাল। তারপর তার দিকে ছুটে এলো। রায়ীনা দুই হাত বাড়িয়ে ত্রাতিনাকে জড়িয়ে ধরল। তাকে বুকে চেপে রেখে ফিসফিস করে বলল, “ত্রাতিনা, মা আমার। তুই ভালো থাকিস মা। তোর এই মায়ের ওপর কোনো রাগ পুষে রাখিস না মা। এই পৃথিবীতে তোরা যেন বেঁচে থাকিস, সে জন্যে আমাকে চলে যেতে হচ্ছে সোনামনি।” ত্রাতিনা তার মায়ের কথাগুলো বুঝতে পারল না। কিন্তু গলার স্বরের আকুতিটুকু বুঝতে পারল। সে অবাক হয়ে তার মায়ের দিকে তাকাল। রায়ীনার চোখে পানি টলটল করছে, সে খুব সাবধানে তার চোখ মুছে এবার ত্রাতিনাকে স্পষ্ট গলায় বলল, “যাও মা। তোমার ভাইবোনের কাছে যাও।” ত্রাতিনা চলে গেল না। মায়ের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রায়ীনা আবার বলল, “যাও ত্রাতিনা। ওই দেখো, সবাই তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে।” ত্রাতিনা খপ করে রায়ীনাকে ধরে বলল, “না। না।” রায়ীনা হতাশভাবে ত্রাতিনার দিকে তাকিয়ে রইল। তাকিয়ে দেখল কাছাকাছি ডিরেক্টর ক্লারা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। রায়ীনা নিচু গলায় তাকে বলল, “তুমি কী আমার মেয়েটিকে ধরে রাখবে? আমার এখন যেতে হবে।” ডিরেক্টর ক্লারা ত্রাতিনার কাছে এসে তার হাত ধরে বলল, “মাকে ছেড়ে দাও ত্রাতিনা, তোমার মায়ের এখন যেতে হবে।” ত্রাতিনা তার মাকে ছেড়ে দিল। তারপর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। গল্প লিখেছেন : মুহম্মদ জাফর ইকবাল


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ১০৯ জন


এ জাতীয় গল্প

→ করোনার প্রথম ডেউয়ে বাংলাদেশে যেসব বিশিষ্ট, গুণী ও খ্যাতনামা ব্যক্তিদের হারিয়েছি
→ ত্রাতিনা – দ্বিতীয় পর্ব(2.4) (ষোল বছর পর)
→ মাঝরাতে যেদিন প্রথম তোমায় দেখি
→ ত্রাতিনা – দ্বিতীয় পর্ব(2.3) (ষোল বছর পর)
→ ত্রাতিনা – . দ্বিতীয় পর্ব (2.02)(ষোল বছর পর)
→ ত্রাতিনা – দ্বিতীয় পর্ব(2.01) (ষোল বছর পর)
→ ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ? – ৪
→ ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ? – ৩
→ ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ – ২
→ ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ – ১

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...