গল্পেরঝুড়ির এ্যাপ ডাউনলোড করুন - get google app
গল্পেরঝুড়ি ফানবক্স ! এখন গল্পের সাথেও মজাও হবে! কুইজ খেলুন , অংক কষুন , বাড়িয়ে নিন আপনার দক্ষতা জিতে নিন রেওয়ার্ড !

গল্পেরঝুড়িতে স্বাগতম ...

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ত্রাতিনা – প্রথম পর্ব(1.1)

"সাইন্স ফিকশন" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Alyna (৩৫৩ পয়েন্ট)



০১. প্রথম পর্ব বিজ্ঞান একাডেমির মহাপরিচালক মহামান্য রিহা দুই হাতে তার মাথার ধবধবে সাদা চুল এক মুহূর্তের জন্যে খামচে ধরলেন। তারপর মাথা তুলে কমান্ডার লীয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী বলছ তুমি?” এটি একটি প্রশ্ন। কিন্তু তার কথাটি প্রশ্নের মতো না শুনিয়ে অনেকটা হাহাকারের মতো শোনালো। কমান্ডার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে খানিকক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মাথা তুলে নিচু গলায় বলল, “আমি দুঃখিত মহামান্য রিহা।” মহামান্য রিহা শূন্য দৃষ্টিতে কমান্ডারের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন। তারপর প্রায় ফিসফিস করে বললেন, “সারা পৃথিবীর মানুষ আমাকে তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব দিয়েছে, আর আমি তাদের রক্ষা করতে পারছি না?” কমান্ডার লী নরম গলায় বলল, “এখনো আমাদের হাতে আটচল্লিশ ঘণ্টা সময় আছে। ঠিক করে বললে বলা যায় আটচল্লিশ ঘন্টা সতেরো মিনিট।” “আটচল্লিশ ঘণ্টা সময় থাকা আর সময় না থাকার মাঝে কোনো পার্থক্য নেই কমান্ডার। শেষবার যখন এরকম ঘটনা ঘটেছিল, তখন আমরা ছয়মাস সময় পেয়েছিলাম। তারপরও সেটা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশন। প্রথম দুটো মিসাইল টার্গেট মিস করল। তিন নম্বরটা আঘাত করতে পারল, সেটাও আংশিক—” কমান্ডার লী মাথা নিচু করে বলল, “আমি আমার পুরো বাহিনী নিয়ে প্রস্তুত, আমাদের কী করতে হবে আদেশ করেন মহামান্য রিহা। আমরা আমাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে চেষ্টা করব।” মহামান্য রিহা উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “তুমি কমান্ড কাউন্সিলের সবাইকে ডেকে আনে। আধা ঘন্টার মাঝে আমি সবাইকে নিয়ে বসতে চাই। আর তুমি এর মাঝে তোমার পুরো বাহিনীকে নিয়ে টার্গেট লক করো। প্রয়োজন হলে বৃষ্টির মতো মিসাইল পাঠাও-” “মহাকাশে অনেক উপগ্রহ মহামান্য রিহা, বৃষ্টির মতো পাঠালে অনেক প্রাণহানি হবে।” মহামান্য রিহা মাথা ঝাঁকালেন। বললেন, “না, না, একটাও প্রাণহানি হতে পারবে না। পৃথিবীর মানুষ আমাকে তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব দিয়েছে, তাদের একজনের প্রাণও নেয়ার অধিকার দেয়নি।” কমান্ডার লী ইতস্তত করে বলল, “কয়েক বিলিয়ন প্রাণ বাঁচানোর জন্যে যদি কিছু প্রাণ দিতে হয়, সেটি খুব বড় একটি অন্যায় নয় মহামান্য রিহা।” মহামান্য রিহা হেঁটে জানালার দিকে এগিয়ে গেলেন। মাথা নেড়ে বললেন, “না। না কমান্ডার, একজন মানুষের প্রাণও আমি নিতে পারব না। তুমি যাও, যত দ্রুত সম্ভব সুপ্রিম কমান্ড কাউন্সিলের সভার আয়োজন করো।” কমান্ডার লী মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। মহামান্য রিহা তার ছোট দোতালা কাঠের ঘরের জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন। আকাশ ভরা নক্ষত্র তার মাঝে একটি দুটি বাই ভার্বোল মাঝে মাঝে চাপা গুঞ্জনের মতো শব্দ করে উড়ে যাচ্ছে। তার বাড়ির চারপাশে গাছ, সেখানে ঝিঁঝি পোকা ডাকছে। ঝিঁঝি পোকার চোখে ঘুম নেই, কিন্তু এখন মধ্যরাত, শহরের সব মানুষ তাদের ঘরে নিশ্চিন্ত নিরাপদে ঘুমাচ্ছে। কেউ জানে না, মহাকাশ থেকে একটি গ্রহকণা সরাসরি পৃথিবীর দিকে ছুটে আসছে। যদি সেটাকে থামানো না যায়, সেটি আটচল্লিশ ঘন্টা পর আফ্রিকার সাহারাতে আঘাত করবে। পঁয়ষটি মিলিয়ন বছর আগে এরকম একটি গ্রহকণা পৃথিবীকে আঘাত করেছিল। পৃথিবীর বুক থেকে তখন ডাইনোসর নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। যদি এই গ্রহকণাটি পৃথিবীকে আঘাত করে, তাহলে মানব প্রজাতি ডাইনোসরের মতো পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। . আধাঘণ্টার আগেই কমান্ড কাউন্সিলের সবাই শহর কেন্দ্রের বড় হলঘরটাতে। হাজির হলো। গভীর রাতে সবাইকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে আনা হয়েছে। কমান্ড কাউন্সিলের সদস্যদের চেহারায় তার একটা ছাপ পড়েছে। উশকু খুশকু চুল, চোখে এক ধরনের উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি, শুকনো মুখ। নিজেদের আসনে সবাই নিঃশব্দে বসে আছে। কোনো একটা কারণে আজ কেউ নিজেদের ভেতরেও কথা বলছে না। মহামান্য রিহা হলঘরে ঢুকতেই সবাই উঠে দাঁড়িয়ে তার প্রতি সম্মান দেখালো। মহামান্য রিহা সেটা লক্ষ্য করলেন বলে মনে হল না। নিজের বড় চেয়ারটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললেন, “তোমাদের সবাইকে এই গভীর রাতে ডেকে আনতে হলো, পৃথিবীর ইতিহাসে পৃথিবী এর আগে এতো বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বলে মনে হয় না।” কমান্ড কাউন্সিলের সদস্যরা কেউ কোনো কথা বলল না। মহামান্য রিহা বললেন, “তোমরা সবাই জান, কী জন্যে আমি তোমাদের ডেকেছি। প্রায় সতুর কিলোমিটার চওড়া একটা গ্রহকণা আগামী আটচল্লিশ ঘণ্টার ভেতর পৃথিবীতে আঘাত করবে। কক্ষপথ নির্ভুলভাবে বের করা হয়েছে, আফ্রিকার সাহারা মরুভূমিতে সেটি ঘন্টায় প্রায় ষাট হাজার কিলোমিটার বেগে আঘাত করবে। আঘাতটি হবে তিন লক্ষ মাঝারি সাইজের হাইড্রোজেন বোমার বিস্ফোরণের কাছাকাছি। আফ্রিকা, ইউরোপ এবং এশিয়ার বিশাল ভূখণ্ড আঘাতের সাথে সাথে ভস্মীভূত হয়ে যাবে। গ্রহকণাটি যখন আঘাত করবে, তখন পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে তার কক্ষপথে একটা শূন্যতার সৃষ্টি হবে। সেই শূন্যতার ভেতর দিয়ে ধুলোবালি পাথর ধোঁয়া কয়েক সেকেন্ডের ভেতর বায়ুমণ্ডলের ওপরের অংশে ঢুকে যাবে। কয়েক মিনিটের ভেতর পুরো আফ্রিকা, ইউরোপ এবং এশিয়া অন্ধকার হয়ে যাবে। কয়েক ঘণ্টার ভেতর সারা পৃথিবীর আকাশ কুচকুচে কালো হয়ে যাবে। পৃথিবী হবে একটি ঘন অন্ধকার গ্রহ। দুই থেকে তিন বছর আকাশ এভাবে অন্ধকার থাকবে। ধুলোবালি পৃথিবীতে ঝরে পড়তে আরো সময় নেবে। সূর্যের আলো ঢুকতে পারবে না বলে সমস্ত পৃথিবী হিমশীতল হয়ে যাবে। পৃথিবীর যত জীবিত প্রাণী, তার শতকরা নিরানব্বই দশমিক নিরানব্বই অংশ মারা যাবে। পৃথিবী হবে একটা প্রাণহীন গ্রহ।” মহামান্য রিহা একটু থেমে টেবিল থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে এক সেঁক পানি খেয়ে বললেন, “আমরা পৃথিবীতে এটা হতে দিতে পারি না। সেজন্যে তোমাদের ডেকে এনেছি। তোমরা বল আমরা কীভাবে পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারি?” কমান্ড কাউন্সিলের সদস্যরা একে অপরের দিকে তাকালো। জীব বিজ্ঞানী লিয়া সোজা হয়ে বসে বলল, “আমাদের হাতে সময় নেই। তাই আমি একেবারে সময় নেব না। যেটা বলতে চাই, সোজাসুজি সেটা বলছি। আমি সব সময় প্ল্যান বি প্রস্তুত রাখার পক্ষপাতী। প্ল্যান এ বা মূল প্ল্যানটি কাউন্সিলের সদস্যরা বের করে নিয়ে আসুক, সেই পরিকল্পনাটি যদি কাজ না করে, তাহলে কী করতে হবে আমি সেটি বলি।” জীববিজ্ঞানী লিয়া একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, “যদি আমাদের পরিকল্পনা কাজ না করে, তাহলে পৃথিবীটা অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাবে। শেষবার যখন এটা হয়েছিল, তখন ডাইনোসর ধ্বংস হয়ে স্তন্যপায়ী প্রাণী পৃথিবীতে বংশ বিস্তার শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্ম নিতে পঁয়ষট্টি মিলিয়ন বছর সময় লেগেছিল। আমি মনে করি, এবারে সেটা হতে দেয়ার প্রয়োজন নেই। আমি কয়েক হাজার নারী-পুরুষ এবং কয়েক লক্ষ মানব ভ্রুণ সংরক্ষণের পক্ষপাতী। পাহাড়ের গভীরে টানেল খুঁড়ে সেখানে হিমঘরে আমরা এভাবে মানব প্রজাতিকে রক্ষা করব। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবার কয়েক বছর পর যখন আবার সেটা মানুষের বসবাসের উপযুক্ত হবে, পৃথিবীর মানুষ তখন আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবে। নতুন করে মানব সভ্যতার জন্ম হবে।” ত্রাতিনা জীববিজ্ঞানী লিয়া তার কথা শেষ করে অন্যদের মুখের দিকে তাকালো, কেউ কোনো কথা বলল না। সবাই স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। লিয়া একটু ইতস্তত করে বলল, “আমাকে দায়িত্ব দেয়া হলে মানবপ্রজাতি সংরক্ষণের এই দায়িত্বটুকু আমি নিতে পারি।” মহামান্য রিহা তার চেয়ারে হেলান দিয়ে ক্লান্ত গলায় বললেন, “লিয়া, তোমাকে ধন্যবাদ। মূল পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে কী করতে হবে, সেটা তুমি যথেষ্ট স্পষ্ট করে বলেছ এবং তোমাকে সেই দায়িত্ব দিতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আমি ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে পছন্দ করি। মূল পরিকল্পনা কী হবে, সেটি ঠিক করার পর আমি তোমার প্ল্যান বি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেব।” মহামান্য রিহা চুপ করা মাত্রই পদার্থবিজ্ঞানী রিশি বললেন, “গ্রহকণার খবরটি শোনার পর থেকে আমার পক্ষে যেটুকু সম্ভব, আমি সেই তথ্য বিশ্লেষণ করেছি। আমার বলতে খারাপ লাগছে, কিন্তু আমি খোলাখুলি বলে ফেলি। আমার ধারণা, আমরা এইবার পৃথিবী রক্ষা করতে পারব না।” সবাই ঘুরে পদার্থবিজ্ঞানী রিশির দিকে তাকালো। পরিবেশ বিজ্ঞানী নিহি জিজ্ঞেস করল, “তুমি কেন এটা মনে করছ?” “গ্রহকণাটি কীভাবে পৃথিবীর দিকে রওনা দিয়েছে, আমি সেটা বিশ্লেষণ করেছি। এটা শুরু হয়েছে প্রায় এক বছর আগে। সৌরজগতের বাইরে থেকে একটা অখ্যাত ধূমকেতু প্রথম এই গ্রহকণাটুকুকে তার কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত করেছে। বৃহস্পতি গ্রহের আকর্ষণে প্রথম এটি কক্ষপথের বাইরে যাবার শক্তি পেয়েছে। মঙ্গল গ্রহ এটিকে স্লিং শট প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর দিকে পাঠিয়েছে। এই গ্রহকণাটির পৃথিবী থেকে কমপক্ষে এগারো মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে দিয়ে চলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু খুবই বিচিত্র কারণে এটি আরেকটা খুবই বৃহৎ গ্রহকণার সাথে সংঘর্ষে তার কক্ষপথ পরিবর্তন করেছে। ঠিক এই সময় সূর্যের বিশাল একটা করোনা ডিসচার্জ হয়েছে। সূর্য থেকে বের হওয়া চার্জড পার্টিকেলে এটা আটকা পড়ে পৃথিবীর কাছে এসেছে। আমরা মাত্র আটচল্লিশটা ঘন্টা আগে এটি সম্পর্কে জেনেছি। কারণ এর আগে এটি ছিল নিরীহ একটি গ্রহকণা, অনেক দূর দিয়ে এর চলে যাবার কথা ছিল। গতিপথ পাল্টে সরাসরি পৃথিবীর দিকে আসার জন্যে অনেকগুলো বিচিত্র ঘটনা ঘটতে হয়েছে এবং সবগুলো ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা খুব কম, সোজা কথায় এগুলো ঘটার কথা না। কিন্তু আমরা জানি, এটা ঘটেছে, কাজেই আমার ধারণা–” পদার্থবিজ্ঞানী রিশি কথা থামিয়ে মহামান্য রিহার দিকে তাকালো। মহামান্য রিহা বললেন, “তোমার কথা শেষ করো রিশি।” রিশি বলল, “আমার ধারণা, এটি নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি কাকতালীয় ঘটনা নয়।” “তাহলে এটি কী?” “কোনো একটি বুদ্ধিমান প্রাণী পৃথিবীকে নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। পঁয়ষট্টি মিলিয়ন বছর আগে যেভাবে এর একটা পরিবর্তন এনেছিল, এখন আবার সেই পরিবর্তন আনতে চাইছে। কাজেই আমার ধারণা, আমরা এটি থামাতে পারব না।” মহামান্য রিহা একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর ক্লান্ত গলায় বললেন, “সম্ভবত তোমার সন্দেহ সত্যি। সম্ভবত কোনো একটি বুদ্ধিমান প্রাণী পৃথিবীকে ধ্বংস করে ফেলার প্রস্তুতি হিসেবে এই গ্রহকণাটিকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। কিন্তু আমি সেজন্যে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকব না। আমি পৃথিবীকে রক্ষা করার চেষ্টা করব। সেটি কীভাবে করা যায়, আমি তার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব শুনতে চাই।” পরিবেশ বিজ্ঞানী নীহা বলল, “আসলে কী করতে হবে, আমরা সেটা সবাই জানি। গ্রহকণাটির কক্ষপথে পরিবর্তন আনতে হবে যেন সেটি পৃথিবীতে আছড়ে না পড়ে। এটি যেন পৃথিবীকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়।” পদার্থবিজ্ঞানী রিশি মাথা নেড়ে বলল, “কাজটি এতো সহজ নয় নীহা। যদি কক্ষপথে যথেষ্ট পরিবর্তন আনতে না পার, তাহলে এটা হয়তো আফ্রিকাতে আঘাত না করে সাইবেরিয়াতে আঘাত করবে। আমাদের কোনো লাভ হবে না।” নীহা বলল, “সেই হিসেবটুকু নিশ্চয়ই করা হবে। আমরা নিশ্চয়ই শুধু অনুমানের উপর নির্ভর করে গ্রহকণাটির কক্ষপথ পাল্টানোর চেষ্টা করব না। কাজটা নিখুঁতভাবেই করব। কিন্তু সেই কাজটুকু নিখুঁতভাবে করার জন্যে আমাদের যে প্রযুক্তির প্রয়োজন, সেটি কী আছে? এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?” প্রযুক্তিবিদ কিরি বলল, “আমি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি।” মহামান্য রিহা বললেন, “চমৎকার। উত্তর দাও কিরি।” কিরি এক মুহূর্তে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। তাকে দেখে মনে হল, তার হাতের মাঝে কোথাও যেন প্রশ্নের উত্তরটি লেখা রয়েছে। এক মুহূর্ত পর সবার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাদের কাছে এক সময় এই প্রযুক্তি খুব ভালোভাবে ছিল। পৃথিবী যখন নানা দেশে বিভক্ত ছিল, নিজেদের ভেতর যুদ্ধ বিগ্রহ ছিল, তখন সব দেশই একে অপরকে আক্রমণ করার জন্যে এই প্রযুক্তি তৈরি করে রেখেছিল। কিন্তু পুরো পৃথিবীটা শান্তির দিকে এগিয়েছে। এখন পৃথিবীতে আলাদা আলাদা দেশ নেই, পুরো পৃথিবী মিলে একটি দেশ। শুধু তাই না, পৃথিবী পরিচালনার জন্যে পৃথিবীর মানুষ রাজনৈতিক নেতাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে আমাদের মতো বিজ্ঞানীদের দায়িত্ব দিয়েছে। আমরা এখন পৃথিবীকে পরিচালনা করি। আমরা অস্ত্রগুলো অকেজো করেছি। এখন যখন প্রয়োজন হয়েছে, আমাদের হাতে সেই প্রযুক্তি নেই। যেটি আগে নিশ্চিতভাবে করা যেতো, এখন সেটি করার সম্ভাবনা শতকরা পঞ্চাশ ভাগ। আমরা গ্রহকণাটিকে আঘাত করতেও পারি, আবার নাও করতে পারি।” মহামান্য রিহা বললেন, “তাহলে আমরা এখন কী করতে পারি?” “আমাদের হাতে দুটি ভিন্ন পথ খোলা আছে। আমার মনে হয়, আমাদের একই সাথে দুটি পথেই চেষ্টা করতে হবে। একটি হচ্ছে, পৃথিবী থেকে মিসাইল দিয়ে গ্রহকণাটিকে আঘাত করার চেষ্টা করা। যদি আঘাত করে ধ্বংস করে দিতে পারি, আমাদের বিপদ কেটে যাবে। কিন্তু আমি শুধু এটুকুর উপর ভরসা করতে চাই না। গ্রহকণাটির আকার বিদঘুঁটে এবং সেটি খুবই বিচিত্রভাবে ঘুরপাক খেতে খেতে আসছে। মিসাইলটি গ্রহকণাটিকে ঠিকভাবে আঘাত করতে পারবে কী না, আমি সে বিষয়ে তত নিশ্চিত নই। আমার মনে হয়, আমাদের দ্বিতীয় আরেকটা পথে কাজ করতে হবে।” “সেটি কী?” “একটা টিমকে নিউক্লিয়ার বোমাসহ মহাকাশযানে করে পাঠাতে হবে। তারা এই গ্রহকণার উপর নামবে। সেখানে বোমাটি বসাবে এবং বিস্ফোরণ ঘটাবে। এই কাজটি অসম্ভব কঠিন, কিন্তু এটি নিশ্চিতভাবে কাজ করবে।” মহামান্য রিহা কিছুক্ষণ নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “টিমের সদস্যরা কেউ বেঁচে ফিরে আসবে না?” “না। যেটুকু সময় আছে, সেই সময়ে তারা নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে পারবে না। যারা যাবে, তারা পৃথিবীর মানুষের কাছ থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়ে যাবে।” মহামান্য রিহা আবার কিছুক্ষণ নিঃশব্দে মাথা নিচু করে বসে রইলেন। তারপর মাথা তুলে একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “ঠিক আছে, যদি এটাই একমাত্র উপায় হয়ে থাকে, তাহলে এটাই আমাদের করতে হবে। এসো তোমাদের নিয়ে পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করে ফেলি।” পনেরো মিনিটের ভেতর কমান্ড কাউন্সিল পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করে নিল। সাথে আরো একটি সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, পৃথিবীর মানুষকে এই ভয়াবহ বিপদ সম্পর্কে কিছু জানানো হবে না। সত্যিই যদি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যায়, সেটি ঘটুক সবার অগোচরে। গল্প লিখেছেন : মুহম্মদ জাফর ইকবাল


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৮২ জন


এ জাতীয় গল্প

→ কুহক-৩
→ নেকড়ে ও ভেড়া
→ গাধা , শিয়াল ও সিংহ
→ ঈশপ
→ ঈগলের স্বপ্ন
→ এক লোক
→ খেলা দেখা বারণ
→ হযরত শাহজালাল (রা.) এর মাজার এবং লাক্কাতুর চায়ের বাগান ভ্রমণ
→ অষ্ট্রগ্রাম এবং মিঠামইন ভ্রমণ
→ কুকুর,ইনজেকশন, আমি ও আবদার

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...