গল্পেরঝুড়ির এ্যাপ ডাউনলোড করুন - get google app
গল্পেরঝুড়ি ফানবক্স ! এখন গল্পের সাথেও মজাও হবে! কুইজ খেলুন , অংক কষুন , বাড়িয়ে নিন আপনার দক্ষতা জিতে নিন রেওয়ার্ড !

গল্পেরঝুড়িতে স্বাগতম ...

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

বকুল ফুলের মুক্তিযুদ্ধ

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মমতা বেগম (০ পয়েন্ট)



বকুল, ও বকুল। কোথায় গেলি? বকুলদের বাড়ির পিছন দিকটায় একটুখানি খেলার জায়গা। দুপুরের মুখে মুখে পাড়ার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সেই জায়গায় একত্রিত হয়েছে। দশ বারো বছরের বেশি বয়স হবে না কারও। মেয়েরা এক্কাদোক্কা খেলছে, ছেলেরা করছে দৌড়াদৌড়ি, হৈ চৈ। দিনের এই সময়টায় গ্রামের লোকজন একটু স্বস্তিতে থাকে। গরিব মানুষের গ্রাম। কেউ মাঠে কাজ করে, কেউ গরু ছাগল চড়ায়। বাজারে দোকান আছে কারও। কেউ জেলে, কেউ নৌকার মাঝি। জেলেরা আগে নদীতে মাছ ধরতে যেত, কিছুদিন ধরে যেতে পারছে না। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটা তেমন বড় নয়। ছোট নদী। তবে নদীতে ভালোই মাছ। মাছ ধরতে যাওয়া যাচ্ছে না গোলাগুলির ভয়ে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক মাস পরই নদীর পশ্চিমপারে এসে তাঁবু আর বাঙ্কার করেছে পাকিস্তানি মিলিটারিরা। পুবপারে করেছে মুক্তিবাহিনী। দিনেরবেলা তেমন না হলেও বিকাল সন্ধ্যার দিকে আর রাত্রে থেকে থেকে গোলাগুলি চলছে। একপক্ষ শুরু করলে সঙ্গে সঙ্গে শুরু করছে অন্যপক্ষ। মুক্তিযোদ্ধারা রাইফেল আর এসএমজি, এলএমজির গুলিতে নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছে পাকিস্তানি জন্তুদের। এই ভয়ে জেলেরা নদীতে যেতে পারছে না। কখন দু’পক্ষের গোলাগুলির মাঝখানে পড়ে যাবে! নৌকার মাঝিদেরও একই অবস্থা। নৌকা নিয়ে নদীতে বেরোলেই বিপদ। সোয়ারি হয়তো পাওয়া যাবে কিন্তু জানটা যাবে যখন তখন। গুলিতে ঝাঁঝরা হবে বুক পিঠ। দিনেরবেলা গোলাগুলি বন্ধই থাকে বলতে গেলে। তার পরও পাকিস্তানি পশুগুলোর তো ঠিক নেই। নদীতে নৌকা দেখলেই হয়তো গুলি চালাল। গুলিতে গুলিতে ফুটোফাটা করে ডুবিয়ে দিল নৌকা। সেটা জেলেনৌকা হোক বা নদী পারাপারের নৌকাই হোক। গুলিতে মরল মানুষ, ডুবেও মরল। এই অবস্থায় অতিকষ্টে বেঁচে আছে গ্রামের মানুষগুলো। একবেলা খাচ্ছে একবেলা উপোশ। কোনো কোনোদিন খাওয়াই জুটছে না। তার পরও কষ্টটা তাদের কারও গায়ে লাগছে না। মুক্তিযোদ্ধারা যেভাবে মারছে পাকিস্তানিদের, বাংলাদেশ স্বাধীন হতে সময় লাগবে না। বঙ্গবন্ধুর কথামতো সাধারণ মানুষও হয়ে উঠেছে মুক্তিযোদ্ধা। যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করছে। নানা রকমভাবে সহযোগিতা করছে মুক্তিযোদ্ধাদের। কোন পথে কীভাবে গেলে পাকিস্তানিদের ক্যাম্প আক্রমণ করতে সুবিধা হবে, কীভাবে ধ্বংস করা যাবে তাদের আস্তানা, আচমকা আক্রমণে কীভাবে মারা যাবে পাকিস্তানিদের, এসব খবর নানাভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের দিচ্ছে গ্রামের সাধারণ মানুষ। রাজাকার আর শান্তিবাহিনীর লোকদের হদিস জানিয়ে দিচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের। পাকিস্তানিদের এ দেশীয় সেই চাকর নফরগুলোকেও মারছে মুক্তিযোদ্ধারা। নিজেরা না খেয়ে থেকেও মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে কোনো না কোনোভাবে খাবার তুলে দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। বকুল তার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। বাজারে ছোট্ট একটা মুদি দোকান আছে বাবার। সকালবেলা উঠে বাজারে চলে যান বাবা, বাড়িতে বকুল আর তার মা। কিছু হাঁস মুরগি আছে, দুটো ছাগল আছে। মা আর বকুল ওসব তদারক করে। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে বকুল ক্লাস ফোরে পড়ে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে স্কুল বন্ধ। পাড়ার ছেলেমেয়েদের কোনো কাজই নেই। ঘরবাড়ির কাজ যেটুকু পারে তারা করে, বাকি সময়টা খেলাধুলা আর ছোটাছুটি হৈ চৈ। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই যে যার ঘরে। হয়তো তখন গোলাগুলি শুরু হয়ে গেছে দুই পক্ষের। নদীর পুবপারের গুলি টরটর টরটর করে যাচ্ছে পশ্চিমপারে, পশ্চিমপারের গুলি আসছে পুবপারে। যুদ্ধ চলছে। অন্ধকার রাতের নদীগুলোর আলোয় আগুনের মতো জ্বলে উঠছে। বাজার থেকে সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসেন বাবা। তার কাছে যুদ্ধের অনেক খবর। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে খবর প্রচার হয় সন্ধ্যাবেলা। আকাশবাণী কলকাতা থেকে হয়। লোকমুখে সেসব খবর শোনা যায় বাজারে। মুক্তিযোদ্ধারা চারদিক দিয়ে সাঁড়াশি আক্রমণ চালিয়ে দিশাহারা করে ফেলেছে পাকিস্তান বাহিনীকে। তাদের ক্যাম্প উড়িয়ে দিচ্ছে। ব্রিজ কালভার্ট উড়িয়ে দিচ্ছে যাতে পাকিস্তানিরা এগোতে না পারে। তাদের গানবোট ডুবিয়ে দিচ্ছে। রোজ বাড়ি এসে একটা কথাই বলেন বাবা, বাংলাদেশ স্বাধীন হতে বেশিদিন লাগবে না। বাংলার জয় হবেই। বলেই গভীর আবেগে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন। সকালবেলা দোকানে যাওয়ার সময়ও ‘জয় বাংলা’ বলেই বাড়ি থেকে বেরোন বাবা। বাবা যেই বলে জয় বাংলা সঙ্গে সঙ্গে হাসিমুখে মা কিংবা বকুলও সেই কথা। জয় বাংলা। পাড়ার বড়রা তো এভাবে ‘জয় বাংলা’ বলছেই, ছোটরাও বলছে। খেলা শেষ করে বাড়ি ফেরার সময় বলছে জয় বাংলা, খেলতে এসে বলছে, জয় বাংলা। খেলায় জিতে গেলে বলছে, যে কোনো আনন্দে বলছে। জয় বাংলাই এখন আনন্দ উল্লাস প্রকাশের একমাত্র ভাষা। এই গ্রামে একটা চাপকল আছে। কলটা প্রাইমারি স্কুল প্রাঙ্গণে। গ্রামের লোকজন রান্না আর খাওয়ার পানিটা সেই কল থেকেই নিত। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিন পর কলটা গেছে নষ্ট হয়ে। পানি ওঠে না। মাঝারি মাপের তিনটা পুকুর আছে গ্রামে। লোকের হাঁড়ি-পাতিল, বাসন-কোসন আর কাপড় ধোয়ার কাজ চলে সেই পুকুরে। গোসলের কাজ চলে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে নদীতে গিয়ে গোসল করত অনেকে। সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। নদীতীরে মানুষ দেখলেই গুলি করে পাকিস্তানিরা। সুতরাং পুকুর তিনটাই এখন ভরসা। ধোয়াধুয়ি আর গোসলের কাজ, এমনকি গরু ছাগল পর্যন্ত গোসল করানো হয়। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। পুকুর তিনটার পানি গেছে নষ্ট হয়ে। ওদিকে চাপকল নষ্ট। খাওয়ার পানির অভাব। গ্রামের মানুষ করে কী? চাপকল নষ্ট হওয়ার পর পুকুরের পানিই খাচ্ছিল। একটা পর্যায়ে আর পারা যাচ্ছিল না। পানি এমন নষ্ট হওয়া হয়েছে, খাওয়া যাচ্ছেই না। খেলেই পেটের পীড়া। এ অবস্থায় একটা বুদ্ধি বের করল গ্রামের বউঝিরা। নিজেরা নদীর দিকে তারা যাবে না। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মাটির কলস, পিতল আর এলুমিনিয়ামের কলস দিয়ে সকালের দিকে নদীতে পাঠাতে লাগল। তাও একজন একজন করে। একসঙ্গে বেশি ছেলেমেয়ে দেখলে সন্দেহ করতে পারে পাকিস্তানিরা, গুলি চালাতে পারে। একজনকে পানি নিতে দেখলে হয়তো কিছু বলবে না। তার পরও নানা রকমভাবে সাবধান করে তাদের পাঠায়। নদীতীরে কাশবন। সেই কাশবনের ভেতর দিয়ে সাবধানে গিয়ে যেন নদী থেকে পানিটা তাড়াতাড়ি কলসিতে ভরে যতদ্রুত সম্ভব ফিরে আসে। ছেলেমেয়েরা সেভাবেই কাজটা করছে। যদিও শুরুর দিকে ভয়টা ছিল ব্যাপক। অনেকে যেতেই চাইত না। একজন-দু’জন করে যেতে আসতে সাহস হয়েছে। এখন আর কেউ তেমন ভয় পায় না। নদীতে গিয়ে খাওয়ার পানি নিয়ে আসে। কাশবনের আড়ালে লুকিয়েই কাজটা করে। পাকিস্তানিরা বেশিরভাগ সময় দেখতেই পায় না। বকুল প্রায় রোজই যাচ্ছে পানি আনতে। আজ মায়ের ডাক শুনে খেলা ফেলে বাড়ি ফিরল। মা বললেন, যা মা, এক কলস পানি নিয়ে আয়। বকুল কথা বলল না। মাটির কলস কাঁখে নিয়ে নদীর দিকে রওনা দিল। কিছুদিন ধরে এ তো তার প্রতিদিনের কাজ। এখন আর ভয় করে না। পানি নিয়ে ভালোভাবেই ফিরে আসে। ওপারের পাকিস্তানি মিলিটারি তাকে দেখতেই পায় না। কাশবনের ফাঁকে ফাঁকে বাঙ্কার করেছে মুক্তিযোদ্ধারা। সেসব বাঙ্কারের পাশ দিয়েই সাবধানে পানি আনতে যায় ছেলেমেয়েরা, পাশ দিয়েই ফিরে আসে। মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে বাঙ্কারের ভেতর বসে অস্ত্র তাক করে আছে নদীর পশ্চিমপারে। বাঙ্কারের পাশ্চিমপাশে বালিভরা বস্তা একটার ওপর আরেকটা। সেইসব বস্তার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আছে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রের নল। এ সবের দিকে তাকিয়ে প্রতিদিনই বকুল মনে মনে বলে ‘জয় বাংলা’। আজও বলল। এ সময় এক বাঙ্কার থেকে বকুলকে দেখতে পেলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। ডাকলেন। শোনো। বকুল দাঁড়াল। বলেন। পানি আনতে যাচ্ছো? জি। আমাদের বাঙ্কারে পানি নাই। সকাল থেকে পানি খেতে পারি নাই। নদীতে গিয়ে পানিও আনতে পারছে না কেউ। কাল প্রায় সারা রাত গোলাগুলি চলেছে। তুমি কি আমাদের এক কলস পানি এনে দিতে পারো? জি পারবো। আপনাদের কাছে কলস আছে? আছে। এলুমিনিয়ামের একটা কলস আছে। দেন। আগে আপনাদের পানিটা নিয়ে আসি। পরে আমাদের বাড়িরটা আনবো। ঠিক আছে। তবে কাজটা করতে হবে খুব সাবধানে। পাকিস্তানিরা তীক্ষ্ণ চোখ রেখেছে আমাদের দিকে। কিছুতেই যেন তোমাকে দেখতে না পায়। ওরা তো মানুষ না। শয়তান, শয়তান। শিশুদেরও ছাড়ে না। আজ এখনও তোমাদের গ্রাম থেকে কেউ পানি নিতে আসেনি। তুমিই প্রথম। আমাদের গুলিতে কালরাতে ওদের দু-চারটা মরেছে। এজন্য ওরা আজ আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে আছে। অতি সাবধানে কাজটা তোমাকে করতে হবে। না পারলে ফিরে যেও। আমরা না হয় আরও কষ্ট করবো। নিজে এক ফাঁকে ক্রোলিং করে করে গিয়ে পানি নিয়ে আসব। বকুলের মনে পড়ল এক রাতের কথা। এখানে বাঙ্কার করার আগে রাতেরবেলা চারজন মুক্তিযোদ্ধা তাদের বাড়িতে এসেছিলেন। সঙ্গে অস্ত্র। বহুদূর থেকে এসেছেন। দুদিন কিছু খাওয়া হয়নি। ক্ষুধার কষ্টে আর ক্লান্তিতে হাঁটতে পারছিলেন না। বাবাকে ডেকে তুলে বললেন, ঘরে যা আছে তাই আমাদের খেতে দিন। আমরা আর পারছি না। বাবা-মা দুজনেই ব্যস্ত হলেন। মা সঙ্গে সঙ্গে ভাত বসালেন। খোঁয়াড় থেকে বের করে বাবা একটা মুরগি জবাই করলেন। খুবই তৃপ্তি করে খেলেন মুক্তিযোদ্ধারা। যাওয়ার সময় বাবা-মাকে বলে গেলেন, আমাদের জন্য অনেক করলেন আপনারা। আপনাদের ধন্যবাদ। বাবা বললেন, ধন্যবাদ দিচ্ছেন কেন? আপনারা দেশের জন্য কাজ করছেন। যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করবেন। আমরা তো করতে পারছি না কিছুই। একবেলা একটু খাওয়ালাম, এ আর কী? এও অনেক বড় কাজ। এও মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধাদের যারা একবেলাও খাওয়ায় তারাও মুক্তিযোদ্ধা। শুধু অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করলেই যোদ্ধা হয় না। আপনি এবং আপনার স্ত্রীও মুক্তিযোদ্ধা। বকুল মুগ্ধ হয়ে তাদের কথা শুনছিল। চলে যাওয়ার সময় একজন মুক্তিযোদ্ধা বকুলের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, আমরা যে এসেছিলাম এ কথা কাউকে বলো না। তোমাদের মতো শিশুরাও কিন্তু অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের কথা কাউকে না বললে তুমিও হবে একজন মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধ এমনই। অনেক কিছু গোপন করতে হয়। ধরো তুমি অতি উৎসাহী হয়ে কাউকে বললে, তোমাদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা এসেছিলেন, তোমরা তাদের খাইয়েছো। এক কান দু’কান করে এই খবর ছড়িয়ে গেল। তাতে আমরা যেমন বিপদে পড়বো, তোমরাও পড়বে। তোমার বাবা-মাকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে মেরে ফেলবে। আমাদের হদিস বের করে মিলিটারিদের জানিয়ে দেবে। সুতরাং মুখবন্ধ রাখতে হবে। এটাই তোমার যুদ্ধ। জয় বাংলা। সেই মুক্তিযোদ্ধাদের কথা কাউকে বলেনি বকুল। আজ এই মুহূর্তে তাদের কথা মনে পড়ল। তাদের কথা চেপে রেখে সেও তো মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেছে। এলুমিনিয়ামের কলসটা নিয়ে কাশবনের ভেতর দিয়ে অতি সাবধানে নদীতীরে এলো বকুল। সাবধানী চোখে তাকালো ওপারে। পাকিস্তানিদের বাঙ্কার পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে এখান থেকে। তবে মিলিটারি দেখল না একটাও। ওগুলো নিশ্চয় ঘাপটি মেরে আছে। নদীতীরে ঝুঁকে আছে কাশঝোপ। কচুরিপানাও আছে নদীতে। কয়েকদিন আগে বাবা বলেছেন, নদীর পানিও আর খাওয়া যাবে না। দেশের সব পানিতে ভাসছে মানুষের লাশ। সাধারণ মানুষ ধরে ধরে মারছে পাকিস্তানিরা, লাশ ফেলছে নদীতে। মুক্তিযোদ্ধারাও মিলিটারি আর রাজাকার মেরে ফেলে দিচ্ছে নদীতে। নদীর পানি নষ্ট হচ্ছে। নদীর মাছ খাওয়া অনেকেই ছেড়ে দিয়েছে। এদিকটায় নদীর পানিতে ভাসছে না তো কোনো লাশ? কাশবনের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে, এলুমিনিয়ামের কলসের নিচের দিকটা দিয়ে ঢেউ দিয়ে দিয়ে জায়গাটা পরিষ্কার করল বকুল, কলস কাত করে পানি ভরতে লাগল। মৃদু বুরবুর শব্দে ভরে গেল কলস। সাবধানে সেই কলস কাঁখে তুলল বকুল। খালি কলস নিয়ে কুঁজো হয়ে হেঁটে আসছিল, যাতে ওপার থেকে পাকিস্তানিরা দেখতে না পায়। ভরা কলস নিয়ে তো কুঁজো হওয়া যায় না। সোজা হয়ে হাঁটতে হয়। সোজা হয়ে হাঁটতে গেলেই না পাকিস্তানিরা দেখে ফেলে! যতটা সম্ভব কুঁজো হয়ে কাশবনের ভেতর দিয়ে হাঁটতে লাগল বকুল। এখন শরৎকাল। স্বচ্ছ নীল আকাশে সাদা মেঘ ভাসছে। কাঁশফুলে ভরে গেছে নদীতীর। হাওয়ায় উড়ছে কাশফুলের রেণু। একটু একটু শীত পড়ছে সকালবেলা, রাতেরবেলা। কিন্তু কাশবনের ভেতর বেশ গরম। চারদিক ঝলমল করছে রোদে। এই উজ্জ্বল রোদের ভেতর দিয়ে বকুল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পানি নিয়ে যাচ্ছে... এ সময় হঠাৎ করেই গুলি শুরু করল পাকিস্তানিরা। বকুলকে দেখতে পেয়েছিল কিনা কে জানে! দেখেই গুলি শুরু করল কিনা বোঝা গেল না। তবে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে লাগল। আচমকা গুলির শব্দে দিশাহারা হল বকুল। মাথা নিচু করে, কোনো রকমে কলস কাঁখে সেই বাঙ্কারের দিকে এগোতে লাগল। একটা গুলি এসে লাগল তার বাঁ কাঁধে। তেমন ক্ষতি হল না। চামড়া কিছুটা ছিন্নভিন্ন করে চলে গেল গুলি। বকুল ভাবল যা হওয়ার হবে কলসের পানিটা কিছুতেই সে পড়তে দেবে না। মুক্তিযোদ্ধারা সকাল থেকে পানি খায়নি। একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে সে অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের পিপাশার্ত রাখতে পারে না। কিন্তু যে হারে গুলি আসছে, একটা গুলি কলসে লাগলেই কলস ফুটো হয়ে সব পানি পড়ে যাবে। তাহলে আর লাভ হল কী? কলসটা কাঁখ থেকে বুকের কাছে আনল বকুল। দু’হাতে কলস বুকে জড়িয়ে ধরে নদীর দিকে পিঠ দিয়ে বাঙ্কারের দিকে যতদ্রুত সম্ভব ছুটতে লাগল। গুলি লাগলে তার পিঠে লাগবে। কিছুতেই যেন কলসে না লাগে! বকুল ছুটছে, পাকিস্তানিদের গুলিও ছুটছে। এদিক থেকে মুক্তিযোদ্ধারাও শুরু করেছে গুলি। দুপক্ষের গুলির শব্দে আকাশ-বাতাস কাঁপছে। নদীর পানি আর শরতের রোদ কাঁপছে। বাঙ্কারের কাছাকাছি আসতেই পর পর তিন চারটা গুলি লাগল বকুলের পিঠে, ঘাড়ে। হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তেও পড়ল না বকুল। পানির কলস ঠিকই এনে নামালো সেই বাঙ্কারের সামনে। এই অবস্থায় বকুলকে নিয়ে কী করবে মুক্তিযোদ্ধারা বুঝতে পারল না। বাঙ্কার থেকে বেরোবারও উপায় নেই। তারা দিশাহারা। কিন্তু বকুলের মুখে ফুটেছে অসামান্য এক বিজয়ের হাসি। রক্তে ভেসে যাচ্ছে শরীর। সেদিকে তার খেয়াল নেই। বাঙ্কারের সামনে লুটিয়ে পড়তে পড়তে সে স্নিগ্ধকণ্ঠে বলল, জয় বাংলা। গ্রামে অপেক্ষা করে আছেন মা। বাবা আছেন দোকানে। বকুলকে তারা আদর করে ডাকেন বকুল ফুল। তারা কেউ জানতে পারলেন না, তাদের বকুল ফুল আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। ইমদাদুল হক মিলন ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৩৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ নারকেল ফুলের নুপুর❤️
→ ♦কদম ফুলের দিন♦
→ প্রজাপতি ও বনফুলের প্রেম♥♥♥
→ বকুলের গার্লফ্রেন্ড এর বিয়া পর্ব-১
→ "আমাদের বকুল ভাই"
→ মুক্তিযুদ্ধের অজানা গল্প
→ ফুলের সৌন্দর্য
→ এপ্রিল ফুলের ইতিহাস
→ বকুল গাছ

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...