বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

স্মৃতিতে ভৈরব স্মৃতি সংঘ

"স্মৃতির পাতা" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান বি এম ইউসুফ আলী (guest) (১৬৬৮ পয়েন্ট)



X স্মৃতিতে ভৈরব স্মৃতি সংঘ পড়ার জন্য একটি বই হাতে নিলেই আমার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে একটি নাম আর তা হলো 'ভৈরব স্মৃতি সংঘ' । এই ক্লাবকে কোনো ভাবেই ভুলতে পারি না। পারবোইবা কী করে। এ যে কৈশোরে ভালোবেসে ফেলা একটি সংগঠন। ১৯৮৫ সাল। আমাদের নূরপুর গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল "ভৈরব স্মৃতি সংঘ"। মুন্সি বেলায়েত আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উত্তর পূর্ব কোণে ছিল ক্লাবের ঘরটি। মাটির ভিটের উপর বাঁশের বেড়া এবং ছনের ছাউনি দিয়ে সেই ঘরটি বানানো হয়েছিল। গ্রামের লোকজনই এই ঘর তৈরির সামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন। আর এই ক্লাবটি প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন জহুরুল ভাই (পুরো নাম মো জহুরুল হক) । যিনি এক সময় মুন্সি বেলায়েত আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক । প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতিও ছিলেন তিনি। ১১ সদস্য বিশিষ্ট পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মো মশিয়ার রহমান মৃধা। আর আমার ইমিডিয়েট বড়ভাই মো আব্দুল কুদ্দুস চুন্নু সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। অন্য সদস্য কারা ছিলেন সে কথা আজ আর মনে নেই। আমাদের গ্রামটি যশোর শহরের একেবারে কাছেই। বলা হয় শহরতলীর একটি গ্রাম। শৈশবে আমরা পড়াশোনা পাশাপাশি গ্রামীণ বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা করে কাটিয়েছি। তখনও টেলিভিশন ঘরে ঘরে পৌঁছায়নি। পৌঁছাবে কীভাবে। বিদ্যুৎ ছিল না। মাঝে মধ্যে যাত্রাপালা কিংবা সার্কাস এলে তা দেখতে যেতাম। তবে বয়সে ছোট হওয়ায় পালিয়ে দেখতে যেতে হত। খবরের কাগজ পড়তাম বাজারে আতিয়ার ডাক্তারের দোকানে। গল্পের বই পড়ার সুযোগও ছিল সীমিত। ৪/৫ ভাইবোনের পাঠ্যবই কিনতেই বাবাকে হিমসিম খেতে হত সেখানে অতিরিক্ত হিসেবে গল্পের বই ক্রয় করার কথা চিন্তাও করতে পারতাম না। এখনকার মত তখন সরকার বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ করতো না। 'ভৈরব স্মৃতি সংঘ' প্রতিষ্ঠিত হলে গল্পের বই পড়ার সুযোগ অবারিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানটি যুবকদেরকে সমাজকল্যাণ ধর্মী কাজে উদ্বুদ্ধ করাসহ তাদেরকে সৃজনশীল ও উন্নত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয়। আর এর অংশ হিসেবে ক্লাবটিতে একটি পাঠাগার স্থাপন করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এই পাঠাগারটিতে প্রায় তিন শতাধিক মূল্যবান গ্রন্থ ছিল। এর মধ্যে ১৫০টি বই জহুরুল ভাইয়ের নিজের সংগ্রহীত। তিনি সেগুলো পাঠকদের জন্য দিয়ে দিয়েছিলেন। এখান থেকেই বই নিয়ে গল্পের বই পড়া শুরু হয়। যার বেশির ভাগই ছিল রবীন্দ্র, নজরুল, বঙ্কিম, শরৎচন্দ্রের গল্প উপন্যাস। সেই সাথে রোমেনা আফাজের দস্যু বনহুর সিরিজ। তবে যৌবনের সেই শুরুতে কালজয়ী কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের উপন্যাসগুলো বেশি উপভোগ্য ও সামাদৃত ছিল আমাদের কাছে। তার রচিত উপন্যাসের মধ্যে পল্লীসমাজ, দেবদাস, চরিত্রহীন, শ্রীকান্ত, দত্তা, গৃহদাহ, পথের দাবী ইত্যাদি গ্রন্থ পড়েছি 'ভৈরব স্মৃতি সংঘ ' থেকে নিয়ে। আর যখন একটি বই পড়া শুরু করতাম তখন তা শেষ না করা পর্যন্ত উঠতে মন চাইত না। নাওয়া- খাওয়া ভুলে যেতাম। এক ধরনের নেশায় পরিণত হয়েছিল। কিছুটা হলেও আমার উপরে তার প্রভাব এখনো রয়েছে। এটি যেন ভৈরব স্মৃতি সংঘের প্রজ্বলিত শিখা এখনো দীপ্তমান। আমাদের গ্রামটি ভৈরব নদের তীরে অবস্থিত। তাই এই নদের নামেই ক্লাবটির নামকরণ করা হয়। কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের এলাকার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে রূপ নেয় এই ক্লাবটি। বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন, ঈদগাহ পরিচালনা,বৃক্ষরোপণ, সমাজ থেকে জুয়া ও মাদকাসক্ত দূরীকরণ ইত্যাদি কাজের সাথে সম্পৃক্ত করে এর সদস্যদেরকে । যার ফলে একশ্রেণির টাউট-বাটপারের রোষানলে পড়ে ক্লাবটি। শেষ পর্যন্ত তারা কিছুই করতে পারেনি, শুধুমাত্র কুৎসা রটনা ছাড়া। শীতকালে মধ্যে রাত অবধি নাটকের মহড়া চলত ক্লাবে। দূর থেকে শোনা যেত ভিলেনরূপী নাসিরের অট্টহাসি। কখনো বাউল রফিকুলের সুমিষ্ট ও সুমধুর কণ্ঠের গান। সেই সাথে নায়ক মফিজের প্রেমালাপের সংলাপ। পরিচালক হাফিয়ে গেলে নাটকের অভিনেতা জামাল প্রমফট করে সাহায্য করত। সেইসাথে আমার ভাইয়ের (কুদ্দুস) পুলিশ কাম কৌতুক অভিনেতার অভিনয় মহড়ার সময় সবাইকে মাতিয়ে রাখত । তবে সংলাপে ভুল বা গাফলতি দেখলেই পরিচালক কঠোরভাবে শাসাতেন। তার ভয়ে আতঙ্কিত ও তটস্থ থাকত নাটকের সকল অভিনেতারা। সম্ভবত ১৯৮৮ সালে প্রথম মঞ্চায়িত হয় 'ঘুনে ধরা সমাজ'। দারুণ দর্শক প্রিয়তা লাভ করে নাটকটি। আমিও ছোটখাটো একটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম নাটকটিতে। ১৯৮৭ সালে ক্লাবের মূল কর্ণধার জহুরুল ভাই চাকরি পেল প্রাইমারি স্কুলে। মশিয়ার মামা, আক্তার চাচা ও নোয়াভাইও গ্রাম ছাড়লেন নিজনিজ কর্মের জন্য। আমরা যারা জুনিয়র তারাও পড়াশোনা কিংবা চাকরিতে চলে গেলাম। ফলে নেতৃত্ব সংকট দেখা দেয়। অবশেষে ১৯৯২ সালে ক্লাবটি বন্ধ হয়ে যায়। তারপর আজও আমাদের গ্রামে আর কোনো ক্লাব বা পাঠাগার গড়ে উঠেনি। আমি ঢাকায় থাকি। ছুটি কিংবা বিভিন্ন পার্বনে বাড়িতে যাই। ক্লাব ঘরটি যেখানে ছিল আসা যাওয়ার পথেই সেখানেই আমার দৃষ্টি চলে যায়। আশেপাশে সবই আছে, শুধু নেই আমার ভালোবাসার ভৈরব স্মৃতি সংঘের চিহ্ন। মুন্সি বেলায়েত আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবনটি ক্লাব ঘরটি যেখানে ছিল সেখানে নির্মিত হয়েছে। মনের ভিতর হাহাকার করে উঠে। তবে ভৈরব নদের তীরে আমাদের লাগানো গাছগুলো সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে মূর্তমান হয়ে এখনো দণ্ডায়মান রয়েছে। সেই গাছগুলোর সুশীতল বাতাস এক ঝাপটায় মনের গহীনের হাহাকারকে দূর করে কখন যে প্রশান্তি এনে দেয় তা টেরই পাই না।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ১০২ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...