বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

এক যে ছিল রাজকন্যা

"ছোটদের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান স্নিগ্ধা আফসানা রোশনী (০ পয়েন্ট)



X এক যে ছিল রাজকন্যা বাইরে ভুট্টার দানার মতো হলদে বিকেল নেমেছে। কটকটে গরম লাগা হলুদ নয়। কেমন ঠান্ডা আর নরম একটা আলো। দেখে মনে হয় হাত বাড়ালেই কোমল আলোর স্পর্শ পাওয়া যাবে। রঙের ছোঁয়া লেগেছে বিশাল বাগানটা জুড়েও। লাল,কমলা হলুদ, গোলাপী ফুলগুলো কি চমৎকার রং পেয়েছে শেষ বিকেলে। আর কি সুবাস তাদের। বাতাসও যেন সুগন্ধী মেখে নিয়েছে তার গায়ে। ছোট্ট নীল পাখি আর প্রজাপতির আনন্দও যেন বাধ মানে না এই আলো নেমে এলে। হলুদ আলো বিকেলে প্রকৃতিতে যেন স্বপ্নপুরী নামে। ঘরের বাইরে না নেমেও ‘রোদ জানালা’ দিয়ে ঘরে ঢোকা আলোই জানান দেয় ঘরে বসে থাকার সময় নয় এখন। চমৎকার সব আনন্দ অপেক্ষা করছে বাইরের বিকেলে।‘রোদ জানালা’ বিশেষভাবে তৈরী করা হয়েছে তুতুলের জন্য। রাজকুমারী তুতুল। জানালা গলে আসা আলো দেখে সে বুঝতে পারে এখন সময় কত হল,কোন সময়ে সে কি করবে।সময়ের নিয়মমতো তার এখন প্রাসাদের বাগানে নেমে হাটাহাটি করার কথা। গাছের সাথে,পাখি আর ফুলের সাথে গল্প করার কথা।নিয়ম-টিয়ম তুতুলের একদম ভাল্লাগেনা।বাগানে হাঁটাহাঁটি করতে তার ভাল লাগে কিন্তু সেটা কেন এখনই করতে হবে!কেন অন্য সময় নয়? মাঝে মাঝে তার কিছুই করতে ইচ্ছা করে না।তাকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য দরজার ওপাশে দুজন দাসী দাঁড়িয়ে আছে। সে অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত তারা ঘরে ঢুকবেনা। কি জঘন্য ব্যাপার, সামান্য বাগানে যাওয়ার জন্য সাথে করে লোক নিয়ে যেতে হবে! সে তো প্রাসাদের বাইরে যাচ্ছেনা। তুতুল তো বাচ্চা মেয়ে নয়। তার বয়স এগারো।সে তো কোথাও হারিয়ে যাবেনা। কিন্তু না, মন্ত্রীচাচা এসব নিয়ম বানিয়েছেন,দুজন দাসী সারাক্ষন তার সাথে লেগে আছে। তুতুলের উপর কেউ নজর রাখলে তার একদম ভাললাগেনা। দরজার বাইরে দাঁড়ানো দাসীদের বলে দেওয়া উচিৎ সে আজ নিচে নামবেনা। দাঁড়িয়ে থেকে লাভ হবেনা। শুধু পা ব্যথা করা ছাড়া। কিন্তু তুতুলের ইচ্ছা করছেনা কথা বলতে। সে রোদ জানালার সামনে এসে দাঁড়ালো। জানালা দিয়ে নিচের অপরূপ বাগানটা অনেকখানী দেখা যায়।এই বাগান রাজকুমারী তুতুলের জন্য তার বাবা অজয়কুমার বিশেষভাবে তৈরী করিয়েছেন। বাবার কথা মনে পড়তেই তার মন খারাপ হল। আহারে, কতদিন দেখা হয়না। বাবা কেমন আছেন! রাজকুমারীরা তো চাইলেই প্রাসাদের বাইরে যেতে পারেনা। সাধারন মানুষের সাথে তাদের দেখা হয় খুব কম। নিয়ম নেই। নিয়ম মানতে রাজকুমারীর একটুও ভালো লাগেনা। এসব নিয়ম কারা বানিয়েছে কে জানে। আচ্ছা, তারা কি কখনও ছোট ছিলনা নাকি? ছোটদের যে ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগেনা এটা কে বোঝাবে! এসব ভেবে রাজকুমারী তুতুলের মন আরো খারাপ হল। জানালার সামনে দাঁড়িয়ে হাই তুলল। তার ঘুম পাচ্ছে, এমন অবেলায় তো ঘুমানো চলবেনা। সন্ধ্যা মিলিয়ে গেলে পন্ডিতমশাই আসবেন, তাকে পড়াবেন।ঘুমানো চলবেনা কিছুতেই।তুতুল বাগানের দিকে তাকালো। বিশাল এক কাঠগোলাপের গাছ আছে সেখানে। সবুজ গাছ ঢেকে গেছে সাদা-হলদে ফুলে। বাগানে বেড়ানোর সময় প্রতিদিন কিছুক্ষন সে ওখানে বসে। এই সময়টায় সে পাখি, প্রজাপতি,আর ছোট্ট নরম সাদা খরগোশদের সাথে কথা বলে।তার বড় ভালো লাগে।গল্প করার মতো কেউ তো নেই এখানে।রাজকুমারীদের সাথে কেউ সহজভাবে কথাই বলে না। গল্প দূরে থাক। কাঠগোলাপের গাছটার কাছে কাকে যেন দেখা যাচ্ছে। মালীচাচারা নয়।তাদের কাজ তো সকালে।এই সময়ে তুতুল ছাড়া আর কারো বাগানে থাকার অনুমতি নেই। মা থাকলে মার সাথে সে ঘুরে বেড়াত। কত কি আবদার,গল্প করত। বাবা রাজকার্যে বাইরে বাইরে থাকেন। তুতুল সব দেখে,বোঝে।তবুও মনটা খারাপ হয় তার। একা থাকাটাই তো খারাপ লাগার। মনের এই ব্যাপারটা তুতুলের কাছে ঠিক স্পষ্ট নয়। এটা কারন জেনেও খারাপ হয়, না জেনেও খারাপ হয়। জানালার সাথে লাগানো রেশমের দড়ি ধরে আস্তে করে টান দিল তুতুল। সুরেলা এক শব্দ বেজে উঠলো। ঘন্টাটা তার ঘরের বাইরে লাগানো আছে। তুতুল ঘন্টা বাজালে তবেই কারো ঘরে ঢোকার অনুমতি হয়। ঘাগড়া পড়া দুজন দাসী এসে বিশাল কুর্নিশ করে। কারো সামনে মাথা নিচু করার ব্যাপারটা ঠিক না। মানুষ হয়ে মানুষের সামনে মাথা নিচু করার মাঝে দারুন এক অবহেলা,অপমানের ব্যাপার আছে।তার মতো পিচ্চি এক মেয়ের সামনে মাথা নিচু করতে নিশ্চয়ই তাদেরও ভালো লাগেনা। তবু তাদের করতে হয়।রাজকুমারীকে কুর্নিশ না করলে গর্দান যাবে যে! এই সময়টায় তুতুলের বড় লজ্জা লজ্জা লাগে।তুতুলের ইচ্ছা করে বলতে, আমাকে আর কখনো কুর্নিশ করবেনা,খবরদার। কিন্তু যা ইচ্ছা হয় তা সবসময় বলা যায়না। নিয়ম নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তুতুল তার মখমলের বিছানায় এসে বসল। দাসীদের দিকে তাকালো,তারা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।এই মাথা নিচু যেন আর উঁচুই হবেনা। তুতুল আস্তে করে বলল, ‘তোমরা চলে যাও,আজ আমি নিচে নামব না। আর বাইরে রাখা বাদাম-দুধও সাথে করে নিয়ে যাও। একটু থেমে যোগ করল, ‘তোমরা বরং দুধটা খেয়ে ফেল, ঠিক আছে?’ দাসীরা একযোগে মাথা নাড়ল।তারা আগেই খেয়াল করেছে তাদের রাজকুমারী প্রায়ই তার নিজের ইচ্ছে মত কাজ করেন! ইস, তারাও যদি করতে পারত। দাসীরা চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। রাজকুমারী তুতুল তখনই আবার তাদের ডাক দিল, ‘বাইরের বাগানে কে হাঁটছে তোমরা কি জানো?’ দাসীরা চমকে উঠল। কি সর্বনাশ! এখন তো রাজকুমারী ছাড়া কারো বাগানে থাকার অনুমতি নেই। তারা নিচু মাথা আরো নিচু করে ফেলল। ভাবখানা তাদের এমন পারলে মেঝে ফাঁকা করে মাটিতে ঢুকে পড়ে। গভীর মনোযোগে তুতুল তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। সামান্য একটা প্রশ্নের জবাব দিতেও তারা সাহস পাচ্ছেনা। সে তো এমন কিছু জানতে চায়নি।যদি এই প্রশ্নের উত্তর না জানে বলবে জানিনা। এত ভয় পাবার আছেটা কি? সে তো কখনো কড়া গলায় কারো সাথে কথাও বলেনা। কেন তাহলে তাকে ভয় করতে হবে। তুতুল তো বাঘ,হাতি কিছুই না। তার খারাপ হয়ে থাকা মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। তুতুল শান্ত গলায় বলল, ‘ঠিক আছে,তোমরা যাও।আমি দেখছি’। দাসী দুজন যেন পালিয়ে বাঁচল। দাসীরা চলে গেলে তুতুল আবার তার রোদ জানালার কাছে চলে এল। বাগানের এদিক-ওদিক তাকালো।এতক্ষন ঠিক করে বোঝা না গেলেও এখন পরিষ্কার বোঝা গেল। তার বয়েসী একটা মেয়েকে দেখা যাচ্ছে। কি তেজি আর স্নিগ্ধ দেখতে। পোশাকটাও কেমন হালকা।জারুল ফুলের মতো সুন্দর।তুতুল তার নিজের পোশাকের দিকে তাকালো। লাল চুনি,সবুজ পান্না, গোলাপী মুক্তোর হাজার রকম গয়না তার গায়ে।কতরকম রত্ন।তুতুল নামও জানেনা ঠিক মতো। হাতে-কানে,গলায়,মাথায়। ধুর, এসব ভারী পোশাক আর গয়না পরে রাতদিন কেউ বসে থাকতে পারে নাকি? গায়ের মধ্যে কেমন কুটকুট করছে। সে পারলে এখনই খুলে ফেলে। আর ঐ মেয়েটা! তার গায়ে গয়নার কোন চিহ্ন দেখা যাচ্ছেনা। কেমন লাফিয়ে লাফিয়ে হাটছে সে। হাত নেড়ে নেড়ে একা একা কিসব বলছে বলেও মনে হচ্ছে। এত কি আনন্দ তার মনে! তুতুলের খুব ইচ্ছা করছে নিচে নেমে মেয়েটার সাথে গল্প করে।মেয়েটা দেখি একা একা হাসেও! যাবে নাকি তুতুল? কিন্তু তুতুল চাইলেই পারেনা যে কারো সাথে কথা বলতে।রাজকুমারীর জীবন নাকি মহামূল্যবান। তুতুল এর মানে বোঝেনা। জীবন তো জীবনই।রাজকুমারীর জীবন আর একটা সাধারন মেয়ের জীবনের মধ্যে পার্থক্য কি! দাম দিয়ে কি জীবনের মূল্য করা যায় নাকি? কি অদ্ভুত কথা যে বলেনা বড়রা। নিচে নামতে ইচ্ছা করলেও এখন সেটা সম্ভবনা। আকাশ এখন লাল-গোলাপী হয়ে যাচ্ছে। চারদিকও লালচে হয়ে গেছে। মেঘগুলোরও যেন আকাশের সাথে বন্ধুত্ব।আকাশের সাথে তারাও নিজেদের রঙ পাল্টে নিল। রাজকুমারী তুতুলের কোন বন্ধু নেই। ইস, একটা প্রাণের সখী থাকত তার! রেশমী দড়ি ধরে টান দিল তুতুল।আবার একজন দাসী এসে বিশাল কুর্নিশ করে দাঁড়াল। উফ, এত বিশ্রী লাগে তুতুলের। ইচ্ছা করছে কড়া করে একটা ধমক লাগাতে। কিন্তু তার থেকে এত বড় একজন মানুষকে কি করে ধমক লাগাবে সে! সে নরম গলায় বলল, ‘তোমার নাম কি?’ দাসী চমকে গেল, রাজকুমারী তার নাম জিজ্ঞেস করছেন? সে কিছু ভুল শুনছে না তো! তাড়াতাড়ি জবাব দেওয়া দরকার।কিন্তু মনে হচ্ছে জিভ আটকে যাচ্ছে। কোনমতে ঢোক গিলে বলল সে ,‘রাজকুমারী, আমার নাম মতি’। তুতুল হাসল। মতির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘শোন মতি তোমার কাজ হল কাউকে দিয়ে পন্ডিতমশাইকে খবর পাঠানো। আমি আজ পড়তে বসবনা। কাজটা খুব দ্রুত করতে হবে। পন্ডিতমশাইকে আনার জন্য পালকী রওনা হবার আগেই।যদি কাজটা ঠিকঠাক করতে পারো,তবে তোমাকে একটা মজার জিনিস দেখাবো। পারবে? বল পারবে? মাথা নাড়ছ কেন? মুখে বল,পারবে? মতি ক্ষীণকন্ঠে জানাল সে পারবে। ‘বেশ,তাহলে তাড়াতাড়ি যাও। সন্ধ্যে নামল দেখছ তো। রাজা অজয়কুমার বেশিরভাগ সময় রাজ্যের বাইরে থাকেন।রাজকার্যে তাঁর মন কম। আগে থাকলেও এখন আর তিনি রাজ্যের কাজ পছন্দ করেননা। রানী রুপমতী মারা যাওয়ার পর রাজা নিজের রাজ্যে খুবই কম থাকেন। তিনি এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে ছুটে বেড়ান। মন খুবই অস্থির হয়ে থাকে। রাজ্যের ভার একরকম মহামন্ত্রীর উপর ছেড়ে দিয়েছেন। চিন্তা শুধু কন্যা তুতুলকে নিয়ে। মাঝে মাঝে মেয়েটার জন্য মন কেমন কেমন করে। বুক ধড়ফড় করে। রাতে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে মন বিচলিত হয়ে যায়। অনেককাল যেন তিনি নিজের মেয়েকে দেখেননা। বুকে চেপে আদর করেননা।নাহ,আর না। তিনি এবার নিজের রাজ্য আর রাজকন্যার কাছে ফিরবেন। দুপুর আলো যখন ঘরে আসে তখন রাজকুমারী তুতুলের ঘুমানোর সময় হয়। দুই দাসী রঙ্গিন কাপড়ের পাখা নিয়ে হাওয়া করে। ঘরে বেলীর সুগন্ধী ছড়িয়ে দেয়। রাজকুমারী আজ নিয়মভঙ্গ করে ঘুমালোনা। তার ঘর থেকে নিচে নেমে এল। সন্ধ্যে মিলিয়ে যাওয়া অব্দি আজ বাগানে হাটাহাটি করবে।সোনার থালায় রাখা একুশ পদের ভোগও আজ তুতুল ফিরিয়ে দিয়েছে। মনটা আজ খুব খারাপ তার।বড় অস্থির লাগছে। বাবা নেই বলেই কি এমন হচ্ছে! বাবাকে তার ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে। কবে ফিরবেন বাবা? রাজবাগানের এককোণে মালীরা কাজ করছে।হাতে খুরপি,কাচি। চলছে ঘাস কাটা,গাছের পাতা ছাটার কাজ। রাজকুমারী বাগানে পা রাখা মাত্র তারা ছুটে এল। মাথা নিচু করে দাঁড়ালো। রাজকুমারী তুতুল মন খারাপ করা গলায় বলল, ‘মাথা নিচু করে থাকবেন না তো, খুব খারাপ লাগে দেখতে। এর থেকে বরং আমার একটা কাজ করে দিন’। মালীরা অবাক হল, রাজকুমারী তাদের ‘আপনি’ করে বলছেন! কি কান্ড,কি পরম সৌভাগ্য তাদের। তুতুল তাদের অবাক দৃষ্টি দেখে হেসে ফেলল, ‘গতকাল বিকেলে কেউ একজন কাঠ-গোলাপ গাছটার কাছে নেচে বেড়িয়েছে। আপনারা কি একটু জেনে আমাকে জানাবেন?’ মালীরা আরো অবাক হয়ে গেল যেন। তারা কোনদিন তাদের রাজকন্যার মুখের দিকে তাকানোর সাহস পায়নি।আজ ভয়ে ভয়ে চোখ তুলে তাকালো।বাচ্চা একটা মেয়ের মুখ। কি শান্ত আর নিষ্পাপ। যেন পৃথিবীর সমস্ত জটিলতামুক্ত। এই মেয়ে তো সাধারন মেয়ে না।তাদের মতো মালীর সাথে কথা বলবে? রাজকুমারী তো দেবেন হুকুম। তা না করে কি নরম গলায় কথা বলছে তাদের সাথে। কি সম্মান করে। এই কন্যার জন্য তো সব করতে পারে তারা। বাগানের বুড়ো মালী রাজকুমারীর সামনে হাত জোড় করে দাড়ালো।তুতুল নরম গলায় বলল, ‘আপনি দয়া করে হাতজোড় করে থাকবেননা। আমার খুব লজ্জা লাগছে’। মালী আস্তে আস্তে বলল, ‘কালকে আমার নাতনী আইছিল গো রাজকন্যা। মাইয়াডা একটু পাগলী আছে। হে রাজবাগান দেখবই।আমি অনুমতি না নিয়াই ওরে বাগানে আনছি।মাফ দেন গো রাজকইন্যা’। তুতুল কপট গম্ভীর গলায় বলল,‘এর নিশ্চয়ই শাস্তি হবে।আপনি অবশ্যই আজ বিকেলে তাকে নিয়ে আসবেন আমার বাগানে। বলবেন, রাজকুমারী তুতুল অপেক্ষা করছে’। বুড়ো মালী আবার হাত জোড় করল। শব্দ করে হেসে ফেলল তুতুল, অনেকদিন পর আজ তার বড় আনন্দ লাগছে। ফ্রকটার রঙ হালকা গোলাপী। কয়েক জায়গায় ছেঁড়া। ছেঁড়া অংশগুলো রিফু করেও তেমন কাজ হয়নি। দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার। কিন্তু যার গায়ে এই ফ্রক তার এসব নিয়ে খুব মাথা ব্যথা আছে বলে মনে হয়না। গায়ে গোলাপী ফ্রক, খালি পা নিয়ে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। রাজকুমারী তুতুলের সামনে। রাজকুমারী শক্ত মুখ করে আছে। তবে সেই শক্ত মুখ দেখে গোলাপী ফ্রক পড়া মেয়েটি খুব ভয় পাচ্ছে তা না। তার ভঙ্গি বলছে সে খুব ফুর্তিতে আছে। তুতুল গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল,‘কাল তুমি আমার বাগানে কি করছিলে?’ মাথা নাড়ল মেয়েটি, ‘বেড়াতে এসেছিলাম’। ‘তুমি কি অনুমতি নিয়েছিলে?’ গোলাপী ফ্রকের মেয়েটি অবাক হয়ে গেল। তুতুলের দিকে তাকিয়ে বলল, এ-মা তুমি জানোনা ফুল, পাতা-লতা,গাছ সবার হয়।কারো একার না। কার কাছ থেকে অনুমতি নেব!’ রাজকুমারী ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল, মেয়েটি কি সহজ স্বাভাবিক করে কথা বলছে। অন্যদের মতো তাকে ভয় পাচ্ছেনা। ‘তোমার কি ভয় লাগছেনা,তুমি একজন রাজকুমারীর সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছ?’ ‘ভয়!কেন ভয় পাব? আমার তো আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই যে ভয় পাবো’। মেয়েটি তার হাতের পেয়ারাটায় কামড় বসাল। তুতুল তাকিয়ে আছে মেয়েটার দিকে। ইস, কি স্বাভাবিক করেই না কথা বলছে। সে কি কখনো পারবে এমন করে কথা বলতে কারো সাথে?’ উঁহু, রাজকন্যাদের সে সুযোগ নেই। রাজকুমারী প্রশ্ন করল, ‘তোমার নাম কি মেয়ে?’ ‘শিপু’ ‘তুমি সারাদিন কি কি কর শিপু?’ শিপু তার আঙ্গুল গুনতে শুরু করল। কিছুক্ষন খুব করে ভেবে তারপর মুখ খুললো, ‘ ঘুম থেকে উঠি,খাই, খেলতে যাই...মাঝে মাঝে পাঠশালায় যাই। ভাল্লাগেনা বেশী।আবার খেলি,তারপর আবার খেলি। খাই,ঘুমাই’। বকবক করে গেল শিপু। রীতিমত হিংসা হল তুতুলের। শিপু নামের এই মেয়েটা কি আনন্দেই না আছে! আর সে তো প্রাসাদের বাইরেই যেতে পারেনা! হাতের পেয়ারাটা খাওয়া শেষ করে কোঁচড় থেকে আরেকটা পেয়েরা বের করল শিপু। কামড় দিতে গিয়ে তুতুলের দিকে তাকালো। পেয়ারাটা বাড়িয়ে ধরল তুতুলের দিকে। বিস্মিত হয়ে গেল তুতুল। আনন্দে কি করবে বুঝতে পারছেনা। ধন্যবাদ দিতেও ভুলে গেল সে। ‘তুমি পেয়ারা কোথায় পেয়েছ?’ মুখভর্তি পেয়ারা নিয়ে ঠিকমতো কথা বলতে পারছেনা শিপু, তুতুলকে বুঝে নিয়ে হল সে আসলে কি বলতে চাচ্ছে। ‘পেয়ারা আর কোথায় পাওয়া যাবে,গাছে পাওয়া যায়’। ‘তুমি নিজে পেরেছ?গাছে চড়ে?’ ‘হুম’ তুতুল বড় বড় চোখ করে বলল, ‘তিন সত্যি কসম’? শিপু মাথা নেড়ে রাজি হয়ে বল, ‘তিন সত্যি, কসম’। কান্না পেতে লাগল তুতুলের। সে যদি পারত এমন, গাছে উঠে নিজের হাতে পেয়ারা পেড়ে খেতে। গাছে কেমন করে চড়তে হয় তাও তো তুতুল জানেনা। মনে হয় শিপুকে বললে শিখিয়ে দেবে। বলে দেখবে নাকি? থাক,পরে বললেও হবে। বন্ধুত্ব তো হয়েই গেছে। একসময় শিখে নেবে তুতুল। একদিন ওর মত হালকা একটা ফ্রক পড়ে ঘুরে বেড়াবে। শিপু তখনও পেয়ারাটা ধরে আছে। তুতুল হাত বাড়িয়ে সেটা নিয়ে নিল। রাজা অজয়কুমার রাজপ্রাসাদে এসে পৌঁছেছেন অনেকক্ষন হল। ফিরেই তিনি রাজদরবার ডেকেছেন। এখানের কাজ শেষ করে রাজকন্যার কাছে যাবেন। প্রতিবার তাঁর যাবার সময় হলেই রাজকন্যা খুব কান্নাকাটি করে। পিতা এখন থেকে কন্যার কাছেই থাকবেন। দরবার শেষ করে মহামন্ত্রীকে তাঁর খাসকামরায় ডেকে পাঠালেন। আগে মন্ত্রীর কাছ থেকে সংবাদ নেওয়া যাক। ‘মহামন্ত্রী রাজকন্যা তুতুলের কি এখন ঘুমানোর সময়?’ মন্ত্রী বিনয়ের অবতার হয়ে বললেন, ‘তা ঘুমানোর সময় তো বটেই মহারাজ। কিন্তু রাজকন্যা এই মুহুর্তে রাজবাগানে বসে ফুলের মালা তৈরী করছেন। ‘কি ফুলের মালা?’ ‘কাঠগোলাপ রাজামশাই’। ‘কে শেখাচ্ছেন,তার মন্ত্রীচাচী?’ মহামন্ত্রী গলার স্বর নিচু করে বললেন, ‘তাহলে তো খুশি হতাম মহারাজ। কিন্তু রাজকুমারী তাতে রাজী নন। তিনি মালা তৈরী শিখছেন আমাদের এক মালীর নাতনীর কাছে’। মন্ত্রী আরো যোগ করলেন, ‘রাজকন্যা সেই মেয়ের সাথে প্রাসাদের বাইরে যাবার ইচ্ছে পোষন করেছেন। মহারাজ এটা একদমই অসম্ভব।মহারাজ... রাজা তাকে থামিয়ে দিলেন।শান্ত গলায় বললেন, ‘আমার মেয়ের মালা তৈরী শেষ হলে তাকে বার্তা পাঠান,তার পিতা এসেছেন’। রাজকন্যা তুতুলের খাসকামরা। মহারাজ অজয়কুমার আর রাজকন্যা তুতুল মুখোমুখি বসে আছেন। দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে আছেন। চোখের পাতা না ফেলার অদ্ভুত এক খেলা খেলছেন। প্রতিবার অজয়কুমার হেরে যান এ খেলায়।কন্যার দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখ ভর্তি হয়ে যায় জলে। ‘বাবা,তুমি আজও হেরে গেলে’। বাবার চোখ মুছিয়ে দিল তুতুল। ‘কন্যার কাছে হার বড় আনন্দের মাগো’। তুতুল তার বাবার একটা হাত ধরে বলল, ‘ বাবা, আমার একটা ইচ্ছা আছে’। ‘মাগো তোমার ইচ্ছা শীরধার্য। বল’। ‘বাবা, আমি একটা দিনের জন্য শিপুর মতো হতে চাই’। ‘শিপু কে মা?’ তুতুল তার বাবাকে সব বলল। মহারাজ মাথা নাড়লেন আস্তে করে, ‘মাগো, একা তো প্রাসাদের বাইরে যাওয়া ঠিক নয়। একজন দাসী নিয়ে যাও মা’। ‘বাবা,একটা দিন...কয়েকঘন্টা’। মহারাজ হিসেবে রাজকুমারীর এই আবদারে তিনি রাজী হতে পারেননা। কিন্তু তিনি তাঁর কন্যার কাছে এখন শুধুই এখন পিতা। সকাল সকাল শিপু প্রাসাদে হাজির। রাজগেটে অনুমতি দেওয়া আছে,শিপু তার ইচ্ছেমতো প্রবেশ করতে পারবে। তার হাতে একটা নীল রঙা ফ্রক। শিপু ইতস্তত করছে। ফ্রকটা সে এনেছে রাজকুমারীর জন্য। কিন্তু মহারাজ রাজকুমারীর হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। মন্ত্রীমশাই রাগী চোখে শিপুর দিকে তাকাচ্ছেন। সে বুঝতে পারছেনা ফ্রকটা সে কেমন করে রাজকুমারীর হাতে দেবে। রাজা অজয়কুমার রাজকুমারীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কি মেয়ে, তোমার হাতে করে কি এনেছ? রাজকন্যার জন্য এনে থাকলে তাকে দিয়ে দাও। চট করে শিপুর মুখটা হাসিহাসি হয়ে গেল। রাজকন্যা তুতুল যখন নীল ফ্রক গায়ে দিয়ে ফিরে এল তখন মেয়েদুটোকে আলাদা করা যাচ্ছেনা। শিপু আর তার মাঝে কোন পার্থক্য বোঝার উপায় নেই। বেনী দুলানো দুটো বাচ্চা মেয়ে। আনন্দের হাসিতে উদ্ভাসিত তাদের মুখ। দুজন-দুজনের হাত ধরে আছে। যেন প্রিয় সখী দুজন। মহামন্ত্রী ফিসফিস করে রাজাকে তার আপত্তির কথা জানাতে চেষ্টা করল। মহারাজ কানে তুললেন না। মেয়ের হাসির দাম তাঁর কাছে অমূল্য। মহারাজ হাসিমুখে মন্ত্রীর দিকে তাকালেন, বললেন,‘মন্ত্রীমশাই অনেককাল তো হল মন্ত্রী হয়েছেন। এখনও এই ব্যাপারটা বুঝতে পারেননি!মানুষের আলাদা কোন রঙ হয়না। বর্ণ হয়না। সে যে মানুষ এটাই তার সব থেকে বড় পরিচয়।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৫৭১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ জুতা চোর ও রাজকন্যা
→ রাজা ও রাজকন্যার গল্প
→ রশিদসাহেবের রাজকন্যা "বানু"
→ রাগী রাবণ এবং বোকা রাজকন্যা
→ অহংকারী রাজকন্যা
→ রাজকন্যা মণিমালা (পর্ব ১০)
→ রাজকন্যা মণিমালা (পর্ব ০৯)
→ রাজকন্যা মণিমালা (পর্ব ০৬)
→ রাজকন্যা মণিমালা(পর্ব ০৭)
→ রাজকন্যা মণিমালা(পর্ব০৮)
→ রাজকন্যা মণিমালা(পর্ব ০৫)
→ রাজকন্যা মণিমালা(পর্ব ০৪)
→ রাজকন্যা মণিমালা(পর্ব ০৩)
→ রাজকন্যা মণিমালা(পর্ব ০২)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...