বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

সবুজ প্রজাপতি (তৃতীয় পর্ব)

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান MD.Belal Hosan (৫ পয়েন্ট)



X (কোতোয়ালী থানার এসপি-র রুমে) জব্বার আরেকবার এসে আরো কি কি জানি বলতে চেয়েছিলো। আমিও আরেক ধমকে উধাও করে দিয়েছি। ও মাথা চুলকাতে চুলকাতে চলে গেছে। আমার অখণ্ড মনোযোগ দখল করে আছে বিপরীতে বসা মানুষটা। ভুল বললাম। এটা দেখতে আদতে মানুষের মতো, কিন্তু অস্তিত্বে সম্পূর্ণ অন্যকিছু। এর জন্ম এই জগতে না। -‘আপনি চাইলে আমাকে এখন প্রশ্ন করতে পারেন।’- তর্জনী দিয়ে নাকের ওপর চশমা এডজাস্ট করতে করতে সে বলে। আমার মাথায় হাজার হাজার প্রশ্ন। লক্ষ লক্ষ ও হতে পারে। প্রাথমিক হতবুদ্ধি অবস্থা আমি কিছুটা কাটিয়ে উঠেছি। নিজের আত্মবিশ্বাসী আর নিয়ন্ত্রণে থাকা রূপে ফিরে গেছি। যদিও এতক্ষন যা শুনলাম, আমার মতো সাত ঘাটের জল খাওয়া লোকেরও আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে গেছে। একটা ঘটনা মনে পড়লো, মাস ছয়েক আগের কথা। চর এলাকার টপ টেরর কাইল্যা শুভ পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্কে আমার মাথায় রিভলভারের মাজল ঠেকিয়েছিলো। সাত খুনের আসামী। ক্ষমতায় যেই থাকুক, রাঘব বোয়ালদের নাম্বার ওয়ান মেশিনম্যান,তাই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো ওর। পাঁচ মিনিট বাদে ওই বন্দুক আমি ওর গুহ্যদ্বার দিয়ে ঢুকিয়েছিলাম। পুরোটা অবশ্য ঢুকেনি। তবে যতটা গিয়েছিলো, কাইল্যা শুভ তাতে সারা জীবনের জন্য বেগুনী হয়ে গেছে। আমি ভীতু নই। দুঃসাহসী বললে এক বিন্দু বাড়িয়ে বলা হবেনা। আমার থানার সবাই বলে, ইশতিয়াক আহমেদের হাঁটু পর্যন্ত কলিজা, আর চুলের আগা অব্দি মেজাজ। বিনয়ে আমার কোন কমতি নেই। কিন্তু সীমা লঙ্ঘন করলে আমি এক চুল ছাড় দেইনা, তখন আমার চেহারা পালটে যায়। তা সে যেই হোক না কেনো। এই শহরে পোস্টিং হবার পেছনে বড় কারণ আমার নাছোড়বান্দা স্বভাব। আমি তাই নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম যখন খেয়াল করলাম লোকটার একেকটা খুনের বর্ণনা শুনতে শুনতে আমার পা অল্প অল্প কাঁপছে। আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে প্যান্ট খারাপ করে ফেলতো,আমি নিশ্চিত। -আপনার সিলেটের হাইড-আউটের একজাক্ট লোকেশনটা বলুন। আমি ঠান্ডা মাথায় জিগ্যেস করলাম। -বলছি। তার আগে কিছু কথা। আমার নাম কি সেটা কিন্তু আমি একবার ও বলিনি। আপনি সে ব্যাপারে কোনও আগ্রহও দেখালেন না। নর্স উপকথায় প্রথম মানবের নাম ছিলো, ‘আস্ক’। ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং,কারণ সাধারণত আমরা অপরিচিত মানুষের নামটাই প্রথমে আস্ক করি। – আমি অলরেডি জানি আপনার নাম কি। আমার আন্দাজ খুব শক্তিশালী। আপনি রুমী মোস্তফা। মোস্তফা গ্লাস ইন্ডাস্ট্রির প্রতিষ্ঠাতার ছেলে। -গুড ডিটেক্টিভ ওয়ার্ক। বাট আই সাপোজ আন্দাজ করা খুব একটা কঠিনও ছিলোনা । – হুম। প্রচারবিমুখ কোটিপতি এই শহরে একজনই। গুরুত্বপূর্ণ মোটামোটি সবাইকেই আমি অন্তত চেহারায় চিনি। আর আপনার শুধু নামই শুনেছি এতোদিন। শুনেছি আড়ালে থেকে চ্যারিটি করার অভ্যাস আছে আপনার। আমি ভাবতাম যে মানুষকে শহরের সবাই এক নামে চেনে, এই শহরের সবচে ধনী আর দাতা ব্যাক্তি হিসেবে, কোথাও তার কোনো সরব উপস্থিতি নেই এটা খুব অদ্ভুত। -আপনি চা খাওয়াতে চেয়েছিলেন, সেটা কি এখন পেতে পারি? -হুম। আমি হাঁক ছেড়ে জব্বার কে ডাকলাম। উত্তর এলোনা। আরো দু’বার ডাকলাম। তাও এলোনা। আমার মনে হলো বের হয়ে দেখা উচিৎ কি ঘটনা। কিন্তু ইতস্তত করলাম।বুঝতে পেরেই আওয়াজ এলো ; -শুনুন, আমার যে পরিমাণে টাকা আছে, চাইলে পুরো সিস্টেমটা আমি কিনে ফেলতে পারি। আমার সব জেনেও কেউ আমার একটা চুলও স্পর্শ করতে পারতোনা। কথায় সত্যতা আছে। যেবার আমার স্ত্রীর ব্রেস্ট-ক্যান্সার ধরা পড়লো, আজীবন নীতির ঝাণ্ডা ওড়ানো এই আমিও বিক্রি হয়ে গিয়েছিলাম, লাখ বিশেক টাকার কাছে। প্রমাণ মেলেনি দেখিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলাম দিনের আলোর মতন স্পষ্ট খুনের আসামীকে। সত্যি বলতে, এই লোক চাইলেই এখনো নিজেকে বাঁচিয়ে ফেলতে পারবে। টাকায় এ দেশে সব হয়। আর এতো টাকা থাকলে পঞ্চাশ না, পাঞ্চাশ হাজার খুন করেও পার পাওয়া সম্ভব। চিন্তাটা আমাকে ভাবায় কয়েক মিলিসেকেন্ড। একটু দিশাহারা লাগতে থাকে। মুহূর্তে সামলে উঠি, যদি ওরকম কিছু হয় তাহলে আমি নিজে হাতে ওর ব্যাবস্থা করবো। বিশ লাখ টাকা দেয়া চিড়িয়াকেও আমি ছয় মাসের মাঝে এনকাউন্টার করে দিয়েছিলাম। একেও ছাড়বনা। এ পার পেয়ে গেলে আমি আজীবন ভাতের চামচে দৈনিক তিন চামচ কাঁচা গু খাবো। -আপনি যান। আমি ধরা দিতেই এসেছি। এখন আমি পালাবো এই ধারণাটা হাস্যকর। আমি লোকটার দিকে তাকালাম। আয়েশ করে বসে আছে। থানার ভেতরে বসে অর্ধশত খুনের স্বীকারোক্তি দিয়ে তার তেমন একটা ভাবান্তর হয়নি। কারণটা যুক্তির অকাট্যতা হোক বা তার বসার ভঙ্গী, আমি বুঝলাম সে কোথাও যাবেনা। তার কথার এখনো অনেক বাকি। আমি বেরিয়ে এলাম। মাথার ভেতর সব জট পাকিয়ে আছে, কেমন ভোঁতা হয়ে আছে। নয়ত বের হয়েই খুব অবাক হতাম। কেউই নেই থানার ভেতরে।বাইরে থেকে চিৎকার চেঁচামেচি আর উত্তেজিত বাক্য বিনিময়ের অস্পষ্ট আওয়াজ আসছে। আমি দ্রুত পায়ে কারণ অনুসন্ধান করতে এসে দেখি গেইটের সামনে ভীড় জমে গেছে। আমি তাড়াতাড়ি জটলার মুখে যেয়ে দাঁড়ালাম। আমাকে দেখে শোরগোল একটু কমলো। আমি ভরাট গলায় কৈফিয়ত চাইলাম- ‘কি সমস্যা এখানে, এত চিল্লাচিল্লি কেন?’ নায়েক উত্তেজিত গলায় যা বললো তার সারমর্ম হচ্ছে, ১১ নাম্বার ওয়ার্ডের কমিশনারের ভাতিজাকে স্কুলের মেয়েদের টিজ করার সময় ধরে কষে এক হালি চটকানা দিয়েছে সার্জেন্ট মনির। কমিশনার চাচার পরিচয় দেয়ার পর পরিমাণে বেড়ে সেটা দুই হালি হয়েছে। তাই দলবল নিয়ে কমিশনারের চ্যালা-চামুন্ডা এসেছে মনিরের চামড়া তুলতে। ঝামেলাটা পেঁচাবে। কারণ যতদূর জানি ১১ নাম্বারের কমিশনারের নাম রফিক, সে খাদ্যমন্ত্রীর মেয়ের জামাই। সূর্যের চে বালি গরম বেশী। রফিকের জ্বালাতনে তাই মোটামুটি পুরো শহর অস্থির। নিজের ওয়ার্ডের সবকটা ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা ওঠায় প্রতি সপ্তাহে। প্রতিপক্ষের বেশ কয়টাকে দুনিয়াছাড়া করেছে। কিন্তু প্রমাণ করার উপায় নেই। তার দৌরাত্মে এলাকা অতিষ্ঠ। কিন্তু কারোর কিছু বলার সাহস নেই। আর মনিরকে দেখি একাগ্রচিত্তে সিগারেট টানছে। গায়ে মাখছেনা ব্যাপারটা। আমি আছি, এই ভরসা আমার থানার প্রত্যেকটা পুলিশের মাঝে টোটকার মতো কাজ করে। ওদের প্রত্যেকের অনড় থাকার ডেডিকেশন দেখে আমারও গর্ব হয়। পুলিশের ব্যাপারে মানুষের সাধারণ ধারণা আমার জন্য পীড়াদায়ক। আমাকে বাগে আনতে গিয়ে কানের পর্দা হারিয়েছে অনেক প্রভাবশালী। আমার হাতে মেয়রের চড় খাবার ঘটনা মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। বাবা পুলিশে ছিলেন। আমার জীবনে তারচে নীতিবান কাউকে আমি দেখিনি। তিনি ছিলেন লৌহমানব। আমার মাঝে তবু কিছু ছাড় দেবার ব্যাপার আছে। এক দুই জায়গায় নরম দেখিয়ে আমি এলুমিনিয়াম-মানব হয়ে গেছি। কিন্তু কেউ লাইন ক্রস করলে আমার হজম হয়না! আমার অধীনস্ত প্রত্যেকে পদে পদে আমাকে অনুসরণ করে। আমি আসার পর গত তিন বছরে তাই অনেক অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে। ছিনতাই-চুরি একেবারেই উঠে গিয়েছিলো। লাস্ট সিটি ইলেকশনের পর পর আবার হুট করে বেড়ে গেছে। সেটাও সাইজে নিয়ে আসবো আর মাসখানেকের মাঝে। কমিশনার রফিক আমাকে দেখে গাড়ি থেকে নামলো। সে হাত দিয়ে এক ইশারা করতেই অনুসারীরা থামলো। আমাকে নিজের প্রভাব দেখাতে পারায় তার ঠোঁটরে কোণে বাঁকা হাসি দেখতে পেলাম। আমি পাত্তা দিলাম না। তার চোখের দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বললাম, -এখানে ভীড় করেছেন কেনো? আপনার কোনো অভিযোগ থাকলে ভেতরে যেয়ে রিপোর্ট লেখান। আমি এসআই একজন কে বলে দিচ্ছি। মনির তুমি এখুনি ভেতরে যাও। বাকিরাও । আজাইরা কাজে সময় নষ্ট করার জন্য সরকার টাকা দেয়?! সব ভেতরে! আর কমিশনার সাহেব, আপনি ফরমালি কমপ্লেন লিখিয়ে যান। আমি ব্যাপারটা দেখবো। থানার সামনে এসে হই চই করেছেন। এটা কেমন কথা? এদের সবার ডিউটির টাইম। আপনিও তো জনগণের সেবক। আপনিই যদি তাদের সেবা পাওয়া থেকে আটকে রাখেন, তাহলে হবে? প্লিজ। বি রিজনেবল। কমপ্লেন লিখিয়ে যান। আই প্রমিজ, আমি ব্যাপারটা দেখবো। বলে জবাবের অপেক্ষা না করে আমি ঘুরে দাঁড়াই। অন্য দিন হলে সবকটাকে লক আপে ভরতাম। আজকের দিনের হিসাব আলাদা। আমার হাতে টান লাগলো। দেখি কমিশনার আমার হাত ধরে আছে। শক্ত করে। মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি। -যান কই? এইখানের ব্যাপারডা সুরাহা হওন লাগবোনা? আফনের লুকে আমার ভাইস্তারে চড় মারসে। এই চড়গুলা অরে ফিরত না দিয়া আমরা এইহান থাইক্যা নড়ুম না। আগেও দেখেছি। এখানকার লোকেরা শাসাতে গেলে লোকাল ভাষা ছাড়া কিছু ব্যাবহার করেনা। ঠিক হুমকির সুরটা শুদ্ধ ভাষায় পাওয়া যায়না ভাবে বলেই হয়ত। আমি ওর হাতটা আমার খালি হাত দিয়ে সরালাম। মাথায় আগুন ধরে গেছে। কিন্তু শান্ত থাকার চেষ্টা করলাম। -আরে ভাই। আপনাকে তো বললাম। সবকিছুর একটা প্রসেস আছে। আমাদের তো সেটা ফলো করতে হবে। নাকি? আপনাকে ভদ্রভাবে অনুরোধ করছি। আর ঝামেলা বাড়াবেন না দয়া করে। প্লিজ। আপনারা যে এখানে এসে গ্যাঞ্জাম করছেন, এই দোষেই তো সবাইকে চাইলে আমি এরেস্ট করতে পারি। বাট আমি তো এটা গায়ে লাগাচ্ছিনা। এই তোমরা সব সরো এখান থেকে! –আমি সবাইকে লক্ষ্য করে বললাম। -কইলেই অইলো? এইহান থাইকা এক পাও লরতাম না। আফনে চেনেন আমারে! মন্ত্রি আমার শ্বশুর। বেশী ত্যাড়িব্যাড়ি করলে- আমি বাক্যটা শেষ করার সুযোগ দিলাম না। আমি ছাড়ানোর পরেও আবার সে আমার হাত ধরেছে। আমি টের পেলাম নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছি। রফিকের কপালটা খারাপ। আমাকে রাগানো বুদ্ধিমানের কাজ না। -পার্কে ঘুরতে যাবেন নাকি? হাত ধরছেন কেন? আমার স্ত্রী আছে। সে শুনলে রাগ করবে। মনির,তুমি তো এখনো ব্যাচেলর, না? -জ্বি স্যার। মিটি মিটি হেসে মনির জবাব দেয়। -আপনি মনিরের হাত ধরেন। ও আপনাকে পার্কে নিয়ে যাবে। ফুচকা বাদাম খাওয়াবে। তারপর আপনার পু*কিতে যে গুড়া কৃমি হইসে বাসায় নিয়ে ওইটার ওষুধও দিবে। -আফনের এত্ত বড় সা- -চোপ! বাইনচোদ শালা! আর একটা কথা বললে এইখানে পুঁতে ফেলবো। তোর মন্ত্রী বাপরে নিয়া আয় যা। এই ভরো সবকয়টা কে লক আপে! একটা চু*র ভাই যাতে বাদ না পড়ে। আমার মাথায় এবার আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটলো। -আর একটা আওয়াজ তুললে পাছা দিয়ে নল ঢুকিয়ে শুট করে দিবো খা*কির পোলা। সরকারী গুলি খরচের জন্য হাত চুলকায় আমার। দুইবার চিন্তা করবোনা। আমার কর্মচারী সবার গায়ে মুহূর্তে উত্তেজনা চলে আসে। সৎ থাকার একটা আলাদা নেশা আছে। সব নেশায় শরীর শিথিল হয়, সততার নেশায় হয় উত্তেজিত। -ভালোয় ভালোয় কেটে পড়তে বলসি ভাল্লাগেনাই না? ঢুকাও সবগুলারে! এই মালটারে আগে ঢুকাও। চোখে-মুখে ভয়। তবু চ্যালাদের সামনে ইজ্জত রক্ষার্থে শেষ চেষ্টা করে রফিক। তার পশ্চাদ্দেশের কাপড় সরে গেছে। পলিটিকাল ক্যারিয়ার নিয়ে টান পড়বে পরে। -মজা লন! ভিতরে ঢুকাও মানে। রফিক আমাকে ধাক্কা দেবার চেষ্টা করলো। আমি ঝট করে সরে এসে ওর মাথায় হ্যাঁচকা টান দিয়ে ওকে বেসামাল করে দিলাম। অ্যাসফল্টে মুখ থুবড়ে পড়ল। আমি বুট দিয়ে দুমদুম করে বেশ কটা দিলাম মাথা বরাবর। দশ মিনিটের মধ্যে লক-আপ ভরে গেলো। তিরিশের মত এসেছিলো। ৫-৬টা ফাঁকতালে কেটে পড়েছে। বাকি সবকটা ভেতরে। রফিকের নাকে চাপা সাদা রুমালের রঙ লাল হয়ে আছে। সে গজ গজ করতে করতে ফ্লোরে শুয়ে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করছে। সবার পকেট থেকে ফোন জব্দ করা হয়েছে। থাকুক আজকের দিন। কালকে কোর্টে চালান করে দিবো। আমি মনিরকে বললাম রফিকদের ঝামেলাটা হ্যান্ডেল করতে। আমার মন পড়ে আছে অন্য জায়গায়। -স্যার, মাইন্ড না করলে একটা প্রশ্ন করি। আপনার রুমে যে গত দুই ঘন্টা ধরে লোকটা বসে আছে সে কে? কি চায়? -রুমি মোস্তফাকে চেনো বোধয়। জরুরী কথা বলতে এসেছে। -গ্লাস কোম্পানির রুমি মোস্তফা?- অবাক কন্ঠে প্রশ্ন করে ও। আমি মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললাম। -এতক্ষণ ধরে আপনার রুমে। আমরা তো স্যার কিছুই বুঝতে পারছিনা। আমি মনে মনে কিছু হিসেব কষলাম। সত্যি কথাটা বললে এখন একটা হুলস্থূল হবে। এটা আমি চাইছিনা। তাহলে অনেক কিছু আর জানা হবেনা। আর ইংগিতে অল্প কথায় বোঝানোর মতো ঘটনা এটা না। তাই আমি বললাম- -উনি একটা জরুরী বিষয়ে কথা বলতে এসেছেন। আমি শেষ হলেই তোমাদের ডাকবো। কিন্তু এর আগে আমাকে বদার করবেনা। আন্ডারস্টুড? -জি স্যার। নিশ্চই। -অলরাইট। তুমি এদিকের ব্যাপারটা সামলাও। মন্ত্রীর ফোন আসলে ধরবানা। এমপি তাজুদ্দিনও ফোন দিতে পারে, তার গাড়িতে আজকে ঢিলাঢিলি হয়েছে। তাকেও আপাতত ঝুলায়ে রাখ। আমি এগুলি সব পরে দেখছি। -খুব কৌতূহল হচ্ছে স্যার। বাট ওকে। -গুড। থাকো। আমি রুমে ঢুকলাম। দরজাটা চাপিয়ে চেয়ারে এসে বসে দেখি লোকটা ঠায় একই ভাবে বসে আছে। আমরা সরাসরি কাজের কথায় চলে গেলাম। লোকটাও বাইরের আওয়াজ শুনেছে নিশ্চিত। কিন্তু সে ব্যাপারে কথা বলায় তার আগ্রহ দেখলাম না। -আপনার চায়ের ব্যাবস্থা করা সম্ভব হচ্ছেনা বলে দুঃখিত। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। -চায়ের তৃষ্ণা চলে গেছে। -আপনি সিগারেট খান? আমি বেশ কিছুদিন ধরে ছাড়ার চেষ্টা করছি। এখন কমে দিনে পাঁচটাতে এসে ঠেকেছে। -না। আমি এক দু’বার টেনে দেখেছি। আমার ভালো লাগেনি। -অলরাইট। বলে আমি দিনের দ্বিতীয় সিগারেটটা ধরালাম। ফুসফুস ভরে ধোঁয়া নিলাম। স্নায়ু কিছুটা ঠাণ্ডা হলো তাতে। তাকে আমাদের কথায় ফিরে যেতে বলবো ঠিক করেছি, কিন্তু তার আগে সে-ই শুরু করলো। -গলিতে যে তিনজনকে ধরেছিলাম তারা সবাই এই শহরের। আমি জানি আপনি ভাবছেন, নিজের শহরে এত বড় ঝুঁকি আমার মতো সাবধানী মানুষ কেন নিলো। আমি আসলেই তাই ভাবছিলাম। তাই আলতো মাথা নাড়লাম। -আমার কাছে মনে হয়েছে এতেই সবচে ঝুঁকি কম। নিজের শহরের গলি, তাই সব ভালভাবে চেনা। আর ধরা পড়ে গেলে এখানে আমার পরিচয় দিয়ে ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা যাবে। অন্তত একটু সময় বের করার সম্ভাবনা থেকে যাবে। যেটা অন্য কোথাও সম্ভব না। আমি হেঁটে হেঁটে কিছুদিন রাতের শহরকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অবজারভ করেছি। সারা রাত হেঁটে ভোর হলে ঘরে ফিরেছি। আমি খুঁজে বের করেছি কোন কোন গলি সবচে নিরাপদ আমার জন্য। শুধু নিরাপত্তা যথেষ্ট ছিলোনা যদি সেখানে আমার প্রয়োজন মেটানোর মতো কেউ না আসে। সারা শহরে বিশটার মতো গলি ছিলো তখন আমার মনের মতো। কাকতালীয় ব্যাপার হচ্ছে সবচে পারফেক্টটা আমার বাসার খুব কাছে। মেইন রোড থেকে দূরে। গলির মুখেই ডাস্টবিন। এখনো আছে। দিনের বেলায়ই কেউ গন্ধে কাছে যায়না। কিন্তু আমি দুর্গন্ধের তোয়াক্কা করিনা। সেখানে একজনকে একা পেয়েছিলাম আমি। আমি জানতাম প্রতি রাতে ওই গলির সামনে দিয়েই তার যাতায়াত। খুব বেশী রাত হয়নি তখন। আমি টান দিয়ে তাকে অন্ধকারে আনার আগে নাকে রুমাল চেপে ডাস্টবিন পাড় হচ্ছিলো সে। আমি যখন তাকে নিয়ে ব্যাস্ত…গলির সামনে দিয়ে পার হয়ে গেছে অন্তত আধ ডজন রিকশা। আমি হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলেও সে চিৎকার করার চেষ্টা করছিলো। আমি তাই ঝুঁকি নেইনি। আই ব্রোক হার নেক। তারপর ছোট টর্চলাইটটা তার মুখে ধরে অবাক চোখের দিকে তাকাতে তাকাতে পাজামাটা টেনে নামিয়ে ভেতরে ঢুকে গেছি। উষ্ণতা তার শরীরকে তখনো পুরোপুরি ত্যাগ করেনি। তবু আমার ব্যাপারটা ভালো লাগেনি। তাই এরপর থেকে সবসময় আমি আগে ভেতরে ঢুকেছি। তারপর… আমার গলায় ধোঁয়া আটকে গেলো। আমি কেনো এই দানবের কথা এখনও শুনে যাচ্ছি? সার্ভিস রিভলভারটা কোমরেই আছে। আমার উচিৎ এই মুহূর্তে পুরোটা চেম্বার এর বুকে খালি করে দেয়া। কিন্তু আমি তা পারছিনা। আমাকে কৌতূহল পেয়ে বসেছে, কেনো এই লোক এখানে এসেছে? আমাকে এর সব বলার কি মানে? উত্তর পাবার অপেক্ষায় আমি তাই দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত হয়ে সব শুনে যাচ্ছি। এতো ভয়াবহ সব কথা কি অবলীলায় লোকটা বলে যাচ্ছে। তার মাঝে এক বিন্দু ভাবান্তর হছেনা। চিন্তায় ছেদ টেনে শব্দ করে ফোন বেজে উঠলো। আমার? হ্যাঁ আমারই তো। পকেটে ভাইব্রেট করছে। আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে লোকটাকে থামতে বললাম। পকেট থেকে বের করে দেখি সালমা কল করেছে। ধরতে হবে। আমার একমাত্র ছেলেটা ক্যাডেট কলেজ থেকে ছুটিতে এসেই বিছানায় পড়েছে। প্রচণ্ড জ্বর। অথচ কালকেই ছুটি শেষ। এই অবস্থায় কিভাবে আবার পাঠাই। অথচ কর্তৃপক্ষের শক্ত নির্দেশ। ছুটি শেষ হলে পাঠাতেই হবে। নিয়ম-কানুন আর শৃঙ্খলা শেখাতেই রাফিকে ক্যাডেটে দিলাম। এখন ওর মা যে হারে কান্না-কাটি করছে। বুঝতে পারছিনা কি করবো। আমার ভায়রা ব্রিগেডিয়ার। তাকে দিয়ে কথা বলাতে বলেছে। অথচ এসব লোক ধরাধরিতে আমার শক্ত আপত্তি। আবার ছেলেকে পাঠাবো তাতেও মন সায় দিচ্ছেনা। অনেক আদরের সন্তান। থাক ফোনটা পরেই ধরি। আমি বাটন চেপে একেবারে সুইচ অফ করে দিলাম। আমি আবার ইশারা করে তাকে কথা শুরু করতে বললাম। – সেই লাশ ডিসকভার হয়েছে ১২ ঘন্টা পর। পরে জেনেছিলাম সেই মেয়েটার বাবা আমাদের ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। আমি নিজ হাতে তাকে পাঁচ লাখ টাকার চেক দিয়েছি। তার পরিবার আমাকে দেবতা জ্ঞানে পুজা করে। যাই হোক, ওই ঘটনায় খুব একটা আলোড়ন হয়নি। যা হয়েছে সপ্তাখানেক বাদেই থেমে গেছে। একটা কম বয়সী মেয়ে রাতের বেলা একা একা হেঁটে গেলে খুন কিংবা রেইপ না হওয়াটাই এই দেশে অস্বাভাবিক। বাকি দুইজনের একজনকে পেয়েছিলাম বিপিণ পার্কের পাশের গলিতে। এই ঘটনার ছয় মাস আগে। সেই লাশ গাড়িতে করে শ্মশানঘাটে ফেলে এসেছিলাম। ভেসে গিয়ে কোথায় উঠেছে তা আর জানা হয়নি। -আর তৃতীয়টা? লোকটা চুপ করে কি জানি একটা ভাবল। তারপর বলে উঠলো; -থাক। খুনের বর্ণনা অনেক দিলাম। আপনাকে যেটা বলতে এসেছি এখন সে কথায় আসি। আপনি ‘কার্মা’ তে বিশ্বাস করেন? আই মিন কর্মের শাস্তি হাতেনাতে পাওয়ার ব্যাপারে? আমি কিন্তু জীবনে কখনো মানিনি। আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই লোকটা বলতে থাকে। -কিন্তু শেষমেশ আমাকে মানতে বাধ্য করেছে আমার মেয়ে। ঐন্দ্রিলা। আদর করে যাকে আমি বাচ্চা ইঁদুর বলে ডাকি। আমার স্ত্রীকে হাসপাতাল নেবার সময় ওর জন্ম, গাড়ির মধ্যে। আমি তখন চালাচ্ছি। ওর কান্নার আওয়াজ পাবার আগ পর্যন্ত পুরো ব্যাপারটাই আমার কাছে অর্থহীন মনে হচ্ছিলো। ডক্টর যখন ওকে আমার কোলে দিলো আমি জীবনে প্রথমবারের মতো অবাক হওয়ার অনুভূতি হয়েছিলো। আমার নিজের হাতে বানানো রক্তমাংসের প্রাণ, এ প্রাণ আমার সৃষ্টি! নিজেকে আমার স্রষ্টা মনে হয়েছিলো। অবর্ণনীয় সে অনুভূতি। আমার বাবার মা তখন বেঁচে ছিলেন। বয়সের ভারে তার কান বিকল। বৃদ্ধদের মতো অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা আর নেই। যেনো বার্ধক্যের অস্তিত্বে পৃথিবী অশুচি, এমন ভঙ্গিতে নাক সিটকালো লোকটা। -যাই হোক, আমার মেয়ের নাম শুনে তিনি বলেছিলেন, ‘এ লো,এইডা আবার কিরহম নাম? কি জামানা আইসে, গেন্দা ছেরির নাম থুইসে ইন্দুর-লা।’ সেই থেকে ওর নাম ইঁদুর। একটু থেমে আমার মুখের দিকে তাকায় সে। -আপনার কাছে আমি আজকে এসেছি ওর গল্প বলতে। বাকি সবকিছু আমার কাছে প্রারম্ভিকা ছাড়া আর কিছুই না। আমি এখন আরো হতবাক। এরকম কিছু নিয়ে কথা উঠবে ভাবিনি। আমিও তার চোখের দিকে তাকালাম। প্রথমবারের মতো লোকটার চোখে কোন একটা অনুভূতির ছায়া দেখতে পেলাম। অন্য কারো চোখে দেখলে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারতাম এটা দুঃখের ছায়া। কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার সামর্থ্য আজ চির- নিঃসংশয় ইশতিয়াক আহমেদকে ফেলে গেছে। আমি আগ্রহী ভঙ্গীতে সামনে ঝুঁকলাম। আমি কল্পনাও করতে পারিনি, এতোক্ষন যে সব কথা শুনে আবাস্তব মনে হয়েছে, তারচে কত বড় বিস্ময় আমার জন্য সামনে অপেক্ষা করছে। …………………………(চলবে) লেখক: আরিফুল হক শোয়েব (২০০২-২০০৮)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৬২০ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...