বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নিশাতের গল্প

"মজার গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান MD.Belal Hosan (০ পয়েন্ট)



X ১ এক রাশ বিরক্তি নিয়ে ঘুম ভেঙ্গেছে আজকে নিশাতের। রুমে বড় বড় জানালা দিয়ে আসা রোদে চারিদিক আলোকিত, হাত বাড়িয়ে ফোন অন করতে গিয়ে মনে পড়লো আগের রাতে চার্জশূন্য হয়ে বন্ধ হয়ে গেছিল। কয়টা বাজে জানার উপায় নেই। রুমে কোন ঘড়ি নেই, না না আছে। কিন্তু মেরামতের অভাবে দীর্ঘ দিন যাবৎ বিকল পড়ে আছে। বিছানায় শুয়ে শুয়েই নিশাত ভাবতে শুরু করে ওর রুমে কোন ক্যালেন্ডারও নেই। মুঠোফোনের যুগে ক্যালেন্ডার, ঘড়ি একদম বাহুল্য। অথচ স্কুলে থাকতে প্রতিবছর কার রুমে কোন ক্যালেন্ডার থাকবে সেটা নিয়ে রীতিমত ঝগড়া হতো ওর ভাইয়ার সাথে। সারাবছর দেয়ালে ঝুলত ক্যালেন্ডার, বছর শেষে সুন্দর সুন্দর পাতা দিয়ে মলাট হতো খাতার বা বইয়ের। এখন আর মলাট লাগেনা ওর খাতার। মনে হয়েই কেমন যেন হাসি পেয়ে গেলো। লাস্ট তিন সেমিস্টার ওর এক খাতাতেই চলছে। চেষ্টা করলে লাস্ট সেমিস্টারটাও এই খাতা দিয়েই চালিয়ে নেয়া সম্ভব। রান্নাঘর থেকে খুটখাট শব্দ আসছে। মা সম্ভবত সকালের নাশ্তা রেডি করছেন। অন্যদিন হলে হয়তো নিশাত উঠে গিয়ে সাহায্য করলেও করতে পারত, কিন্তু আজ একদম উঠতে ইচ্ছা করছেনা। বিছানায় শুয়ে শুয়েই পা দিয়ে ও জানালার পর্দা টানার চেষ্টা করল, কিন্তু তবু ফাঁকফোকর দিয়ে চোখ ধাঁধানো আলো আসছেই। গুঙিয়ে উঠে চোখ ঢাকল।পূর্বমুখী ঘরের এই এক মহা বিপত্তি। সকালে ঘুমটা একেবারে মাঠে মারা যায়। রোদ এসে পায়ে পড়ছে, তেজী রোদের জ্বলুনিতে চিড়বিড় করে উঠছে। “ধ্যাত” বলে এবার উঠেই যায়। মা গলদঘর্ম হয়ে নাশতা বানিয়েছেন। নাকের উপর, কপালে ঘাম চিকচিক করছে। “মা, আমি রুটি সেঁকে দেই” বলতেই মা প্রশ্রয়ের হাসি হাসেন। “এই গরমে দরকার নেই মা, টেবিলে যাও হাতমুখ ধুয়ে”, কি যেন একটা ভাজি নাড়তে নাড়তে বললেন। কথা না বাড়িয়ে চলে আসে নিশাত। চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে আয়নায় নিজেকে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করে। গাল তো মনে হয় আজকে আরেকটু ফুলে গেছে, নাকটাও যেন একটু বেশিই বোঁচা লাগছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখাটা অভ্যাস হয়ে গেছে। সাধারণত লোকে সৌন্দর্য বলতে যা যা বোঝায় তার কোনটাই ওর মধ্যে নেই, ছিটেফোঁটাও নেই। এসব নিয়ে কখনো মাথা ঘামানোর প্রয়োজনটাও ও মনে করেনি কখনো। ছোটবেলা থেকে ওর মেধা আর সামর্থ্য নিয়ে কখনই কারো সন্দেহ ছিলনা। যাই করেছে, তাতেই নিজেকে ছাড়িয়ে গিয়েছে বারবার। আত্মবিশ্বাসকে নিজের সবচেয়ে বড় শক্তি মেনে এসেছে বরাবরই। সেই নিশাতের মনে কেমন যেন একটা সন্দেহ ঢুকে গেছে যেন। নিজের উপর সন্দেহ, নিজের সামর্থ্য নিয়ে সন্দেহ! শরীরে বাসা বাঁধা মেদ, গায়ের রঙ, খাটো ঘাড় সবকিছুই খুব অসহ্য ঠেকছে নিজের কাছে।আয়নার রীতিমতো অসুন্দরী মেয়েটার খুঁতগুলো বারবার চোখে পড়ছে ওর। একেকটা সম্পর্ক ভেঙ্গে যাবার পর সবারই কি নিজের ব্যপারে এমন সন্দেহ জাগে? এই উত্তর নিশাতের কাছে নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ও। সামনে একগাদা ইন্টারভিউ আছে, আচ্ছা ওকে দেখে যদি কেউ পছন্দ না করে? ভাইবাতে আউট করে দেয়??? সবার ওকে নিয়ে কতো স্বপ্ন, কত উচ্চাকাঙ্ক্ষা! পাশ করেই মোটা স্যালারির চাকরি কিংবা স্কলারশিপ পেয়ে যাবে! সবার প্রত্যাশার চাপ ও সামলে নিতে পারবে তো? নিশাতের মাঝে মাঝে খুব দমবন্ধ লাগে, ইচ্ছা হয় সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে কোথাও চলে যেতে। একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বেরিয়ে আসে তাড়াহুড়ো করে। নাশতার টেবিলে আজকে সবাই আছে, জগিং শেষে ফ্রেশটেশ হয়ে বাবা আর ভাইয়াও এসে বসেছে। নিশাতের চেয়ারটা টেনে বসে পড়ে ও। “আরে বেটি দেখি আজকে অনেক সকালেই উঠে গেছে, মিনিমাম নয়টা পর্যন্ত তো ঘুমানোর কথা ছুটির দিনে।”- বাবার কথার উত্তরে অল্প হাসে নিশাত। খাওয়ার রুচি নেই ওর, একটু নাড়াচাড়া করেই প্লেট সরিয়ে রেখে দেয় তাই। আলাভোলা বাবা খেয়াল না করলেও মার চোখ এড়ায় না। “কি রে খাওয়া না খাওয়া তো সমান দেখছি।” ভাইয়া কিছু না বললেও জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। “ভালো লাগছে না” বলে পাশ কাটিয়ে দেয় নিশাত, অন্তত সাময়িক ভাবে। বাবা তখন শিক্ষকদের নতুন পে স্কেল নিয়ে আলোচনা শেষ করে নিশাতের ক্যারিয়ার প্ল্যান পর্যন্ত এসেছেন। “এখনি বিয়ে শাদিও না, চাকরিও না। আগে কিন্তু ক্যারিয়ার বেটি। এমবিএ করো আগে, একনাগাড়ে পড়ালেখা শেষ করতে হবে।” বাকি সবাই আলোচনায় অংশ নিলেও নিশাত চুপচাপ শোনে কেবল। নিজের ঘরটা এমনিতে নিশাতের খুব প্রিয়। ঘরে এসে দরজা লাগিয়ে গান ছেড়ে দিলে ওর মনে হয় পুরো দুনিয়া থেকে আলাদা হয়ে গেলো। ওর নিজস্ব পৃথিবী। গল্পের বই আছে অনেক, ল্যাপটপ ভরা মুভি। কি করবে ভেবে পায়না এখন। কোথাও ঘুরতে যেতে পারলে ভালো হতো খুব। দমবন্ধ লাগছে ভীষণ। কিন্তু কিভাবে কথাটা তুলবে সেটা বুঝতে পারছেনা। গতমাসেই কক্সবাজার ঘুরে এলো মেজোখালাদের সাথে। মাকে একবার বলতেই পারমিশন পেয়ে গেছিল। নিশাত জানে ওর মা খুব বুদ্ধিমতী, উনি ঠিক ধরতে পেরেছিলেন কেন যেতে চাইছে, আসলে ও তো পালাতে চাচ্ছিল- হোক না দু’চার দিনের জন্যে। মেজোখালাও ভালো বন্ধু, উনি অনেক স্বাধীনতা দিয়েছেন পুরো ট্যুরেই। ভোর পাঁচটায় ও বের হয়ে যেতো হোটেল থেকে। তখন বালি দিনের মতো আগুন গরম থাকে না, খালিপায়ে হেঁটে বেড়াতো সৈকত ধরে, সমুদ্রের ধার ঘেঁষে। মাঝে মাঝে নিচু হয়ে তুলে নিতো দু একটা ঝিনুক। সাদা মাথার ঢেউগুলো ভাংতো ওর পায়ের কাছে এসে, পরক্ষনেই পায়ের নিচের মাটি সরে যাওয়ার অনুভূতি। হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূরে চলে যেতো, ওখানটায় হয়তো টুরিস্ট বলতে কেউই নেই, দূরে দাঁড়িয়ে মাছ ধরছে একজন দুইজন। সাদা বালির উপর বসে পড়ত তখন, চোখ বন্ধ করে সমুদ্রের গর্জন শুনত। দুই নম্বর বিপদ সংকেত চলছিল তখন, সমুদ্র খানিকটা উত্তাল। সকালের বাতাস গালে মুখে এসে লাগতো। নিশাত তখন দু হাতের মুঠোভর্তি বালু নিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতো, আর আকুল হয়ে কাঁদত। কাঁদতে কাঁদতেই স্রষ্টার সাথে ও নানারকম কথা বলতো। কেউ মনোযোগ দিয়ে শুনলে তার মনে হবে নিশাত তার খুব কাছের কোন বন্ধুর সাথে কথা বলছে। অভিযোগ, অভিমান সব শেষ হলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না বন্ধ করত। ভেজা গালে ঠান্ডা হাওয়া এসে লাগার কারণেই কিনা, বেশ হালকা লাগতো তখন। মুহিব অনেকবার ওকে নিয়ে আসতে চেয়েছিল কক্সবাজারে। খুব গুছিয়ে কথা বলত ছেলেটা, ও চুপ করে শুনত কেবল মুহিবের ফ্যান্টাসি। এক ঝুম বৃষ্টির দিনে মুহিব বলছিল, “ জানিস আমরা বৃষ্টি দেখব কেমন করে?” নিশাত বলত, “বল শুনি।” “টানা বারান্দায় বড় একটা ইজিচেয়ার পাতা থাকবে।” ওকে থামিয়ে দিয়ে জানতে চাইল, “একটা কেন? আমি কোথায় বসব?” মুহিব হেসে বলত, “একটু গাদাগাদি হবে, কিন্তু আমরা দুজনেই বসতে পারব। তুই সামনে, ঠিক পেছনে আমি। ঝুম বৃষ্টি, তার মধ্যে তুই বকবক করছিস। আমি তোকে থামিয়ে দিয়ে বলব একটু চা করো না। তুই চা বানিয়ে আনবি, কিন্তু তোর কথা শুনতে শুনতে আমি চা খাওয়ার কথা ভুলেই যাবো! চা তখন ঠান্ডা হয়ে জল!” নিশাত মুচকি হেসে বলে, “আমি কিন্তু গরম করতে পারব না আর।” মুহিব বলে, “আচ্ছা না করলি। আমি কিন্তু তোর বকবক কিছুই শুনছিনা, নাক ডুবিয়ে তোর চুলের ঘ্রাণ নিচ্ছি আর বৃষ্টি দেখছি। হঠাত হঠাত গ্রিলের ফাঁকে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির পানি নিয়ে তোকে ভিজিয়ে দিচ্ছি তুই খুব বিরক্ত হচ্ছিস।” বলেই থামত মুহিব। নিশাত তখন নরম গলায় জানতে চাইত, “তারপর?” মুহিব এবার গাঢ় স্বরে বলে, “তুই বিরক্ত হয়ে পেছন ফিরে তাকাতেই আমি তোকে জড়িয়ে ধরে তোর ঠোঁটে একটা…………………” –নিশাতের সারা শরীর কেমন শিরশির করে উঠতো। সমুদ্র নিয়ে মুহিবের ফ্যান্টাসি যেন কি ছিল? মনে পড়েনা। অবশ্য সেসব কোনকিছুই এখন আর কোন অর্থ বহন করেনা। ভালোবাসাটাই যখন মিথ্যে ছিল, তখন মুহিবের কথায় আর কি সত্য থাকতে পারে? জোর করে মুহিবকে মাথা থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। কক্সবাজারে রাতগুলোও ছিল আশ্চর্য রকম সুন্দর। অন্ধকারেও কেমন জ্বলজ্বল করতো ঢেউগুলোর মাথা। পানি আরো ঠাণ্ডা। পায়ে সমুদ্র মেখে হেঁটে বেড়াত। আর গুনগুন করে গান করত। অমাবস্যা ছিল সেদিন, সমুদ্রের গর্জন বাড়ছে ধীরে ধীরে। দূরে আগুন ঘিরে একদল তরুণ বসে আছে, গীটারের টুংটাং আর গানের আবছা শব্দ ভেসে আসছে। মাঝে মাঝে পাশ কাটাচ্ছে কোন কোন যুগলের, একে অন্যকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তারা হাঁটছে। সঙ্গিনী পরম নির্ভরতায় মাথা এলিয়ে দিয়েছে সাথের যুবকের বলিষ্ঠ ঘাড়ে। নিশাত দেখত আর হাঁটত। একা একাই বার্মিজ মার্কেটে ঘুরে বেড়াত, এটা সেটা নেড়েচেড়ে দেখত। তারপর পছন্দের রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসত কিছুক্ষণ। একা থাকতে নিশাতের ভালোই লাগে। সৌজন্য রক্ষার আলাপ চালানোটা ওর জন্যে রীতিমতো শাস্তি। তারচেয়ে চুপচাপ বসে লোকজনকে দেখতে ওর ভালো লাগে, কানে হেডফোন গুঁজে গান শুনতে ভালো লাগে। নিজে গুনগুন করতে ভালো লাগে। বন্ধুদের সাথে হইহল্লা করে হ্যাংআউটের চেয়ে নিজের বিছানায় আধশোয়া হয়ে বই পড়তে ভালো লাগে, মুভি দেখতে ভালো লাগে।মুহিবের সাথে গল্প করতে অবশ্য ভালো লাগত ওর, ঘুরে বেড়াতো ভালো লাগত! পছন্দের বই কিংবা স্বপ্ন নিয়ে ওরা কথা বলত ঘন্টার পর ঘন্টা! লেখক: খেয়া (০৬ - ১১)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৬৬১ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...