গল্পেরঝুড়ির এ্যাপ ডাউনলোড করুন - get google app
গল্পেরঝুড়ি ফানবক্স ! এখন গল্পের সাথেও মজাও হবে! কুইজ খেলুন , অংক কষুন , বাড়িয়ে নিন আপনার দক্ষতা জিতে নিন রেওয়ার্ড !

সুপ্রিয় গল্পের ঝুরিয়ান গন আপনারা শুধু মাত্র কৌতুক এবং হাদিস পোস্ট করবেন না.. যদি হাদিস /কৌতুক ঘটনা মুলক হয় এবং কৌতুক টি মজার গল্প শ্রেণি তে পরে তবে সমস্যা নেই অন্যথা পোস্ট টি পাবলিশ করা হবে না....আর ভিন্ন খবর শ্রেনিতে শুধুমাত্র সাধারন জ্ঞান গ্রহণযোগ্য নয়.. ভিন্ন ধরনের একটি বিশেষ খবর গ্রহণযোগ্যতা পাবে

সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান... জিজেতে আজে বাজে কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন ... অন্যথায় আপনার আইডি বা কমেন্ট ব্লক করা হবে... আর গল্প দেওয়ার ক্ষেত্রে গল্প দেওয়ার নিয়ম মেনে চলুন ... সার্বিকভাবে জিজের নীতিমালা মেনে চলার চেস্টা করুন ...

চার-পাঁচদিন জ্বরের ঘোরে

"ওয়েস্টার্ন গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান নাসরুল্লাহ (৬ পয়েন্ট)



দু’দিন পর। ডীপ টাউনের একটা ছোট্ট মুদি দোকানের ভেতর এসে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল রায়ান। ডীপ টাউনকে আসলে শহর বলা যাবে না। বাইসনের মাইল বিশেক আগে খান দু’তিন দোকান নিয়ে এটা টিকে আছে। আসলে বাইসন শহরটা গড়ে ওঠার আগে এদিকে এটাই ছিল মূল শহর। পরে সুবিধেজনক বিবেচনা করে শহরটা বাইসনের দিকে সরে যায়। ডীপ টাউন ছাড়া বাইসনের কাছে পিঠে একশ’ মাইলের মধ্যে আর কোনো শহর বা দোকানপাট নেই। ডীপ টাউনের কথা জানত রায়ান। আসার সময় শহরটার পাশ ঘেঁষেই এসেছিল। ইচ্ছে করলে ওখানেই থামতে পারত। কিন্তু বড় শহরটায় থামবে বলে ওখানে থামেনি। রায়ানের ফোলা, রক্তমাখা বীভৎস মুখ দেখে আঁতকে উঠল নিগ্রো দোকানদার। ‘সাহ্!’ ওর হাতে-পায়েও রক্ত। গরুর চামড়া থেকে লাগা রক্ত শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে। সারা শরীরে মারের দাগ, কালসিটে পড়ে গেছে। কোথাও কোথাও চামড়া কেটে গিয়ে দগদগে ঘা। পোশাক ছেঁড়াখোঁড়া, রক্ত আর কাদা মেখে নোংরা। নিগ্রো দোকানদারের উৎকণ্ঠাকে পাত্তা দিল না রায়ান। প্রথমেই বলল, ‘গোসল। খাবার। এুণি।’ ‘আইরিন,’ হাঁক দিল দোকানদার। একটা খালি গ্লাস হাতে তুলে নিল। তারপর কী করবে বুঝতে না-পেরে যেন ওটাকে মাজতে শুরু করল। দরজার মুখে দাঁড়ানো লোকটাকে দেখে ওর বিশ্বাসই হচ্ছে না যে, কারো এমন অবস্থা হতে পারে। মনে হচ্ছে, এই মাত্র নরক থেকে পালিয়ে এসেছে লোকটা। ‘আইরিন,’ আবার হাঁক দিল সে। ‘বেরিয়ে এসো এদিকে।’ ভেতর দিকের দরজা মুখে একটা ইন্ডিয়ান মেয়ে এসে দাঁড়াল। একটা পুরনো কম্বল কেটে পর্দার মতো করা হয়েছে ওখানে। রায়ানের দিকে স্থির চোখে কয়েক সেকেন্ড তাকাল মেয়েটা। তারপর আবার অদৃশ্য হয়ে গেল পর্দার ওপাশে। মিনিট কয়েক পর আবার দেখা গেল মেয়েটিকে। হাতে এক বালতি পানি। রায়ানের কাছে এসে নিঃসঙ্কোচে আরেক হাতে রায়ানের একটা বাহু ধরে মাঝখানের দরজা দিয়ে ভেতরে নিয়ে গেল। তারপর পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে পেছনের খোলা জায়গাটায় দাঁড়াল। একটা গাছের কাটা গোড়াকে বসার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা হয় ওখানে। ওই গোড়ার ওপর বসিয়ে দিল রায়ানকে। একটু পরে বেরিয়ে এল দোকানদার নিজেও। রায়ানের একদম কাছে এসে বলল, ‘সাহ্, আপনার এ অবস্থা কেন? মনে হয় ইনজুনদের হাতে পড়েছিলেন? দেখে মনে হচ্ছে, আগে আপনার গায়ের চামড়া তুলে নিয়ে তারপর আগুনে ঝলসানো হয়েছে!’ ওর উদ্বেগের জবাবে কিছু বলল না রায়ান। মেয়েটি তখন ওর গায়ের জামা খুলে নিয়ে ওকে গোসল করাতে শুরু করেছে। ওর সাবধানী হাতের সযতœ ডলায়ও ব্যথায় শিউরে উঠছে সে। মনে হচ্ছে, কথা বললে ব্যথা আরো বেড়ে যাবে। চুপচাপ নিজের কাজ করে যাচ্ছে মেয়েটি। মুখ দেখে মনে হচ্ছে যাকে সে গোসল করাচ্ছে, তার এ-অবস্থা কী করে হয়েছে, তা জানার কোনো কৌতূহলই ওর নেই। ও আসলে একটা কথা ভাবছে। আজ বছর দুই ধরে নিগ্রো দোকানদার বায়েকের দোকানে কাজ করছে ও। লোকটার পরিবার নেই। বিয়েই করেনি। সেটা অবশ্য ওর অনুমান। তবে ওর স্ত্রী-পুত্র আছে, এমন কোনো আভাস পায়নি। কখনো লোকটা নিজের ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ নিয়ে ওর সাথে আলাপ করেনি। তবে আইরিন জানে, লোকটা ওকে মেয়ের মতো ভালোবাসে। সেটা অবশ্য কোনোদিন মুখে বলেনি সে। কিন্তু আইরিন সেটা ঠিকই বুঝতে পারে। বছর সাতেক আগে সে অ্যাপাচিদের হাতে বন্দি একজন শ্বেতাঙ্গকে দেখেছিল। লোকটাকে হরিণের চামড়ার রশি দিয়ে বেঁধে রোদে ফেলে রাখা হয়েছিল। দিনের পর দিন উত্তপ্ত রোদে চিৎ হয়ে পড়েছিল লোকটা। কোনো খাবার দেয়া হয়নি ওকে। এর বেশি অত্যাচার অবশ্য করেনি অ্যাপাচিরা। তারা আসলে দেখতে চেয়েছিল, একজন লোক অভুক্ত অবস্থায় কতদিন বেঁচে থাকতে পারে। আইরিনের বয়স তখন বারো কি তেরো। নিজের লোকদের এমন নৃশংসতা সহ্য করতে পারেনি ও। শ্বেতাঙ্গ লোকটাকে গোপনে খাবার দিত। নিজের হাতে খাইয়ে দিয়ে আসত নিজের লোকদের চোখে না-পড়ে মতো করে। প্রথম যেদিন সে লোকটার জন্যে খাবার নিয়ে যায়, লোকটা দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল। বিড় বিড় করে কী যেন বলেছিল, আইরিন বুঝতে পারেনি। তবে এটা বুঝেছে যে, লোকটা তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে। খাবার অবশ্য তেমন কিছু না। তবে প্রাণ বাঁচানোর মতো। শিগগিরই ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেল। আইরিনের বাবা ছিল না। শ্বেতাঙ্গদের সঙ্গে এক লড়াইয়ে মারা গিয়েছিল। আর মা তখন আরেকজনকে বিয়ে করে তার সঙ্গে চলে যায়। গোত্রের যুবকরা আইরিনকে প্রচুর নির্যাতন করল এ-অপরাধের জন্যে। লোকটাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। কিন্তু আইরিন মস্ত বড় এক ছোরা নিয়ে শ্বেতাঙ্গ লোকটির পাশে গিয়ে দাঁড়াল। হুমকি দিল, যে লোকটিকে মারতে আসবে, তাকে খুন করবে। তবে অ্যাপাচি ছেলে ছোকরারা মাথাগরম করলেও তাদের দলপতি অবশ্য খুব ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতির মোকাবিলা করল। প্রবীণ কয়েকজনের সাথে পরামর্শ করে আইরিনকে বলল, সে শ্বেতাঙ্গ লোকটাকে গোপনে খেতে দিয়ে মারাত্মক অপরাধ করেছে। খাদ্যের দেবতা এটা কখনো সহ্য করবে না। সে অ্যাপাচিদের মেয়ে হলেও এখন আর তাদের মধ্যে নেই। গোত্রের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে সবাইকে অমান্য করেছে। সুতরাং তাকে আর গোত্রের মধ্যে রাখা যাবে না। সিদ্ধান্ত হলো, বন্দি শ্বেতাঙ্গ লোকটাকে ছেড়ে দেয়া হবে এবং আইরিনকেও গোত্র থেকে বের করে দেয়া হবে। বন্দিকে তার কেড়ে নেয়া ঘোড়াটা দিয়ে দিল অ্যাপাচিরা। যাওয়ার সময় আইরিনকে সঙ্গে নিয়ে এল লোকটা। লোকটা ছিল একজন স্প্যানিশ। আইরিনের নাম তখন আইরিন ছিল না। ওর নাম ছিল তে পিয়া। তে পিয়াকে নিয়ে মোরায় চলে এল আলেসান্দ্রো নামের ওই লোকটি। লোকটির পরিবার-পরিজন ছিল না। মোরায় সে তার এক বন্ধুর পরিবারে রেখে গেল সে তে পিয়াকে। বন্ধু লোকটাও ছিল ভদ্রলোক। তে পিয়াকে কাজের মেয়ে হিসেবে রাখা হলেও শিগগিরই ওর তীক্ষ্ম বুদ্ধি ও বিনয়ী আচরণে মুগ্ধ হয়ে নিজের ছেলে- মেয়েদের মতো করেই মানুষ করতে শুরু করে। লেখাপড়াও শেখাতে থাকে। ওরাই ওর ইন্ডিয়ান নাম পাল্টে আইরিন রাখে। সেটা অবশ্য আইরিনকে জিজ্ঞেস করেই। আইরিন খুব দ্রুত স্প্যানিশ ভাষাটা শিখে ফেলে। কাজের মেয়ে হিসেবে থাকলেও স্প্যানিশ কায়দা-কানুন শিখতে তার বেশি দিন লাগেনি। অবশ্য ওই পরিবারটির সহৃদয়তা ও সৌজন্যের কারণে সে যে আসলে কাজের মেয়ে এটা তার মনেও থাকত না। ওই পরিবারটির সঙ্গে বছর পাঁচেক ভালোই কেটেছিল আইরিনের। ওই পরিবারের বড় ছেলের নাম ছিল পেদ্রো। বয়সে আইরিনের চেয়ে বছর পাঁচেক বড়। আইরিনের বয়স যখন সতেরো, বাইশ বছরের তরুণ যুবক পেদ্রো একদিন তাকে আড়ালে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল। লম্বা চওড়া সুঠাম যুবক পেদ্রো। সুদর্শন। যে কোনো মেয়েরই ভালো লাগবে তাকে। আইরিনেরও ভালো লাগত। পেদ্রোর প্রগাঢ় চুমু শিহরণ জাগিয়েছিল ওর শরীরে। কিন্তু ছটফটিয়ে উঠে ওকে সরিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘কাজটা তুমি ঠিক করনি, পেদ্রো। তোমার মা-বাবা এটা আশা করেন না নিশ্চয়?’ পেদ্রো তড়বড় করে বলেছিল, ‘আ-আমি তোমাকে বিয়ে করব।’ জবাবে কিছু বলেনি আইরিন। নিজেকে ওর হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে নিজের কাজে চলে গিয়েছিল। এর দিন দশেক পরে ওই স্প্যানিশ পরিবারের মাকে একখানা চিঠি লিখে সবার অল্েয ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল। চিঠিতে অবশ্য সে পেদ্রোর চুমু খাওয়া এবং তাকে বিয়ে করতে চাওয়ার কথা উল্লেখ করেনি। শুধু লিখেছিল, দীর্ঘদিন পরে নিজের লোকদের কথা মনে পড়ায় ওদের কাছে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে চলে যাচ্ছে। পরিবারটিকে ছেড়ে আসতে ভীষণ কষ্ট পেয়েছে সে। কিন্তু না-এসেও উপায় ছিল না। ও জানত, পেদ্রো নাছোড়বান্দা। ওকে বুঝিয়ে শান্ত করা যাবে না। বেপরোয়া হয়ে উঠবে দিনের পর দিন। কিন্তু পেদ্রোর উচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না ওর। ও জানত, এটা পুরুষের সাময়িক আবেগ। সামাজিকভাবে পেদ্রোরা এত ওপরে যে, সেখানে একটা ইন্ডিয়ান মেয়েকে নিয়ে ঘর করার কথা ভাবাই যায় না। তার ওপর ঘরের কাজের মেয়ে। এভাবে না-বলে চলে আসায় পেদ্রোর মা-বাবা নিশ্চয় দুঃখ পেয়েছেন, তাকে হয়তো অকৃতজ্ঞও ভেবেছেন। কিন্তু আইরিনের আর কিছুই করার ছিল না। বলে কয়ে আসতে হলে তাকে একটা কারণ দেখাতে হতো। পেদ্রোর ব্যাপারটা কারণ হিসেবে কীভাবে নিতেন তারা কে জানে? তবে ওর মনে হয়, ভালো একটা সমস্যা তৈরি হতো স্প্যানিশ পরিবারটিতে। মোরা থেকে স্টেজকোচে চড়ে আরো পশ্চিমে আলবেরো নামের একটা ছোট্ট শহরে চলে আসে আইরিন। সে একজন রেড ইন্ডিয়ান মেয়ে। শ্বেতাঙ্গদের শহরে তার অবস্থান ও চলাফেরা দুটোই অস্বাভাবিক। তবু স্প্যানিশ পরিবারে পাঁচ বছর থাকার দরুণ ওর আচার ব্যবহারে রেড ইন্ডিয়ানদের কোনো ছাপই আর ছিল না। বরং একটা স্প্যানিশ আভিজাত্যের আস্তর পড়েছিল ওর চরিত্রে। তাছাড়া স্প্যানিশ ভাষাটাও চমৎকারভাবে আয়ত্ত করেছিল সে। ফলে খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হয়নি। আর ওর অ্যাপাচি ধাঁচের মুখটা ছাড়া ওকে রেড ইন্ডিয়ান ভাবারও কোনো উপায় ছিল না। একজন চমৎকার স্প্যানিশ তরুণী হিসেবে অনায়াসেই নিজেকে চালিয়ে দিতে পারত সে। আলবেরোয় একজন স্প্যানিশ বারটেন্ডারের সঙ্গে পরিচয় হয় আইরিনের। শ্বেতাঙ্গদের রান্নাটাও ভালোই শিখেছিল সে। স্প্যানিশ ধাঁচের ইনজুন মেয়েটার মুখে নিজের দেশের অভিজাত পরিবারের কেতাদুরস্ত ভাষা আর আচরণ দেখে ভালো লেগে গিয়েছিল দোকানি আলবার্তোর। ওর দোকানেই রাঁধুনির কাজ পেয়ে যায় আইরিন। ওখানেই হয়তো বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারত সে। কিন্তু কপাল খারাপ হলে যা হয়। বছর দুয়েক পরে এক উচ্ছৃৃঙ্খল কাউবয়ের গুলিতে মারা যায় আলবার্তো। ওর দোকানের ভার পড়ে নিগ্রো কর্মচারী সিম বায়েকের ওপর। বায়েক বছর খানেক দোকান চালায়। পরে ওর হাত থেকে দোকানের ভার নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় আলবার্তোর পরিবার। বায়েক চাকরি ছেড়ে দেয়। ওর হাতে কিছু টাকা-পয়সা ছিল। আলবেরো ছেড়ে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেয় সে। ইচ্ছে, নিজেই দোকানদারি করবে। আইরিনের আচার-ব্যবহারে ওর প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েছিল মধ্যবয়সী বায়েক। ওকে নিজের মেয়ের মতোই দেখত নিগ্রো লোকটা। চাকরি ছেড়ে দিয়ে আইরিনকে নিজের পরিকল্পনার কথা জানায় ও। দু’দিন পর আইরিন ওকে জানায়, বায়েক চাইলে সে তার নতুন দোকানে কাজ করতে আগ্রহী। বায়েক সানন্দে রাজি হয়ে যায়। বছর দুয়েক আগে বাইসনের বিশ মাইলের মধ্যে ছোট্ট এই শহরটায় আসে বায়েক। দু’জনে মিলে এই দোকানটি চালাচ্ছে তারা। বেচাবিক্রি যা হয়. তাতে খানাখরচাটা হয়ে যাচ্ছে। আশেপাশের দু’চারটি ছোটখাট র‌্যাঞ্চই তাদের নিয়মিত খদ্দের। রায়ানকে দেখে আইরিন যা ভাবছে তা হলো, নিষ্ঠুরতায় শ্বেতাঙ্গরাও কম যায় না। একজন অ্যাপাচি যখন একজন শ্বেতাঙ্গের ওপর নির্যাতন চালায়, সেটা যতটা না ক্রোধ, তারচে’ বেশি কৌতূহল। তারা জানতে চায়, তাদের বন্দি কতটা মতাবান। তাদের কাছে একজন মানুষের মতা যাচাই করার মাপকাঠি হলো, লোকটা কতটা নির্যাতন সইতে পারে তার ওপর। যে-লোক নির্যাতন সইতে পারে মুখের চামড়া একটুও না-কুঁচকে, তাকে অ্যাপাচিরা সমীহ করে; খুব বড় যোদ্ধা বলে স্বীকার করে নেয়। আর যে-লোক গলা ফাটিয়ে চেঁচায়, তার প্রতি তাদের কোনো করুণা হয় না। তারা কাপুরুষকে মানুষ মনে করে না। তাকে হাসতে হাসতে খুন করে ফেলে। কিন্তু এদিকে কোনো অ্যাপাচি নেই। সুতরাং শাদা চামড়ার এই লোকটার এই দুর্দশার জন্যে দায়ী তারই মতো কিছু শাদা চামড়ার লোক। লোকার ওপর চরম নির্যাতন চালিয়েছে ওরা। তারপর কাঁচা চামড়া দিয়ে হাত-পা বেঁধে মরার জন্যে ফেলে রেখে গেছে। শাদা চামড়ার লোকদের সাথে আইরিন পাঁচ-ছয় বছর ধরে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে জানে, তারা কখনো অ্যাপাচিদের মতো নিষ্ঠুর নির্যাতন করে না। পুরো পাঁচদিন প্রবল জ্বরে প্রায় অচেতন অবস্থায় কেটেছে রায়ানের। তবে অচেতন অবস্থার মধ্যেও মাঝে মাঝে একজন নারীর অস্তিত্ব অনুভব করেছে নিজের শিয়রে। মাঝে মাঝে জ্বরের ঘোরে খেয়াল করেছে, ওর কপালে শান্ত একটা হাত রাখা। কখনো সারা শরীরে পরশ বুলিয়েছে ওই হাত, ঠাণ্ডা কিছু একটার প্রলেপ দিয়েছে ব্যথার জায়গা জায়গাগুলোতে। পাঁচদিন পর জ্বর নেমে যায়। শরীরের ব্যথা-বেদনাও কমে আসে অনেকটা। তবে শরীর পুরোপুরি ফিট হতে মনে হয় সময় লাগবে। বাইসনে ওদের হাতে নিগৃহীত হওয়ার পর থেকে এ-পর্যন্ত সময়টা নিয়ে ভাবছে রায়ান। ওরা ওকে সরাসরি খুন না-করে এক অসহনীয় নির্যাতনের মধ্য দিয়ে মারার ব্যবস্থা করেছিল। এটা নিষ্ঠুরতা। মানুষ মানুষকে খুন করে ফেলতে পারে। সেটা একটা অপরাধ। কোনো মানুষেরই বিনা কারণে কোনো মানুষকে খুন করার অধিকার নেই। আইনত সেটা দণ্ডনীয়। কিন্তু অপরাধ হলেও সেটাকে অমানবিকতার পর্যায়ে ফেলা যাবে না। কিন্তু কাউকে নির্মম নির্যাতন করাটা আইন ও মানবিকতা কোনোটাই সমর্থন করে না। মানবসভ্যতায় এটা একটা ঘৃণিত কাজ বলে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এর পরেও এ-কাজটা মানুষ করে থাকে সম্পূর্ণ যুক্তিহীন ও বিকৃত একটা আনন্দের চরিতার্থতার জন্যে। অবশ্য বর্বর সমাজে এটাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার মতো বিবেচনাবোধ থাকে না। শিকারী রেড ইন্ডিয়ানরা শ্বেতাঙ্গদের তাদের এলাকায় অনুপ্রবেশকারী ভেবে থাকে। তাদের প্রতিরোধের জন্যে লড়ে। বন্দিকে নির্যাতন করে ােভের প্রশমন ঘটায়। কিন্তু বাইসনে ওরা যা করেছে, তার পেছনে কোনো যুক্তি নেই। ও তাদের কোনো তি করেনি যে, তারা প্রতিহিংসার বশে তাকে নির্যাতন করে এমন এক অমানুষিক যন্ত্রণার মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে। কিন্তু তারা তা করেছে এবং সেটা নেহাত বিকৃত আনন্দ লাভের উদ্দেশ্যে। রায়ান সে বিকৃত আনন্দের মাশুল গুণতে তাদের বাধ্য করবে। ওর শরীরের যন্ত্রণা কমেছে। কিন্তু পেশী ও হাড়ের মধ্যে রয়ে গেছে তার ছাপ। শরীর আড়ষ্ট। নড়তে চড়তে ব্যথা জানান দেয়। পুরোপুরি ফিট হতে আরো সময় লাগবে। ইন্ডিয়ান মেয়েটাকে গভীর আগ্রহে ল করে রায়ান। চুপচাপ কাজ করে যায় মেয়েটা। খুব কমই কথা বলে। ইংরেজি জানে খুব সামান্যই। দোকানদার বায়েকের সঙ্গে ঝরঝরে স্প্যানিশ ভাষায় ওকে কথা বলতে শুনেছে ও। বায়েকের কথা শুনে মনে হয়েছে, মেয়েটাকে যথেষ্ট সমীহ করে ও। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর কী একটা ওষুধের মতো নিয়ে এল মেয়েটা। ওষুধটা দেখিয়ে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলল, ‘হাড়ে ব্যথা। ভালো। বেশি ভাল…’ রায়ান স্প্যানিশে বলল, ‘তোমার নাম আইরিন। তুমি ইন্ডিয়ান। অ্যাপাচি। অ্যাপাচি মেয়ের নাম আইরিন হয় না।’ থেমে গেল মেয়েটি। তারপর বলল, ‘তাতে কী? অ্যাপাচিদের সাথে থাকলে তুমিও একটা অ্যাপাচি নাম পেয়ে যেতে পার।’ ‘তার মানে তুমি স্প্যানিশদের সঙ্গে অনেকদিন ছিলে। তুমি ঠিক ওদের উচ্চারণেই কথা বলো।’ ‘পাঁচ বছর। নাও এখন শোও। ওষুধটা দিতে দাও।’ ‘এটা কী ওষুধ?’ ‘এটা বন থেকে তুলে আনা উদ্ভিদের রস। আমরা ইন্ডিয়ানরা জানি, কোন গাছের রস শারীরিক ব্যথা সারানোয় কাজ করে। শ্বেতাঙ্গদের মতো আমাদের সমাজে পাসকরা ডাক্তার নেই।’ আরো দিন পাঁচেক বিশ্রাম নিল রায়ান। কীভাবে এ-অবস্থা হয়েছে আইরিনকে জানাল। চুপচাপ সব কথা শুনে গেল আইরিন। তারপর জানতে চাইল, ‘রাইসা কে?’ ’আমার স্ত্রী ছিল। এখন নেই।’ অবাক হলো রায়ান। ‘চার-পাঁচদিন জ্বরের ঘোরে অজ্ঞান ছিলাম। প্রচুর বকাবকি করেছিলাম, না?’ ‘এখন কোথায় তোমার বউ?’ ‘টেক্সাসে। কেমন আছে জানি না। কারণ মৃত্যুর পর মানুষ কেমন থাকে, তা জানা এখনো সম্ভব হয়ে ওঠেনি।’ দীর্ঘ সময় ধরে চুপ করে রইল আইরিন। তারপর বলল, ‘তুমি সুস্থ হয়ে বাইসন যাবে, না?’ মেয়েটির দিকে অপলক তাকাল রায়ান। জবাব দিল না।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ১০৯ জন


এ জাতীয় গল্প

→ জ্বরের ঘোরে

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...