গল্পেরঝুড়ির এ্যাপ ডাউনলোড করুন - get google app
গল্পেরঝুড়ি ফানবক্স ! এখন গল্পের সাথেও মজাও হবে! কুইজ খেলুন , অংক কষুন , বাড়িয়ে নিন আপনার দক্ষতা জিতে নিন রেওয়ার্ড !

সুপ্রিয় গল্পের ঝুরিয়ান ... গল্পেরঝুড়ি একটি অনলাইন ভিত্তিক গল্প পড়ার সাইট হলেও বাস্তবে বই কিনে পড়ার ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করে... স্বয়ং জিজের স্বপ্নদ্রষ্টার নিজের বড় একটি লাইব্রেরী আছে... তাই জিজেতে নতুন ক্যাটেগরি খোলা হয়েছে বুক রিভিউ নামে ... এখানে আপনারা নতুন বই এর রিভিও দিয়ে বই প্রেমিক দের বই কিনতে উৎসাহিত করুন... ধন্যবাদ...

সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান... জিজেতে আজে বাজে কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন ... অন্যথায় আপনার আইডি বা কমেন্ট ব্লক করা হবে... আর গল্প দেওয়ার ক্ষেত্রে গল্প দেওয়ার নিয়ম মেনে চলুন ... সার্বিকভাবে জিজের নীতিমালা মেনে চলার চেস্টা করুন ...

অবনীল(পর্ব-৩)

"সাইন্স ফিকশন" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Tuba Rubaiyat (১৫৩ পয়েন্ট)



তার কোনো প্রয়োজন নেই। এখন মৃতদেহ সংরক্ষণের কাজ শুরু করে দেওয়া যাক। রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে চারটি নিচু শ্রেণীর রোবট পেয়ে যাবার পরও মহাকাশকেন্দ্রের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মৃতদেহগুলো শীতল ঘরে নিয়ে সংরক্ষণ করে মহাকাশযানটি ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে মোটামুটি ব্যবহারযোগ্য করতে করতে প্রায় আট ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়ে গেল। কাজ শেষ করে রিরা যখন ক্যাপ্টেনের অতিরিক্ত কেবিনে শুতে এসেছে, তখন সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। বিছানায় শোয়ার সাথে সাথে তার চোখে ঘুম নেমে এল–শুনতে পেল তার মহাকাশযানের মূল প্রসেসর শুষ্ক কণ্ঠে বলছে, রিরা, অভুক্ত অবস্থায় ঘুমিয়ে যাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তুমি আর কিছু না হলেও বলকারক একটু পানীয় মুখে দিয়ে নাও। না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে শরীরের কী কী ক্ষতি হতে পারে আবছাভাবে শুনতে শুনতে রিরা গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল। রিরার ঘুম ভাঙল ভয়ংকর খিদে নিয়ে। ঘুম থেকে উঠে সে খানিকক্ষণ নরম বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে রইল। তার মনে পড়ল—সে একটি মহাকাশযানে একা এবং এই মহাকাশযানটি আগামী কয়েকদিনের মাঝেই পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। ব্যাপারটি নিয়ে তার যেরকম বিচলিত হওয়ার কথা ছিল, সে সেরকম বিচলিত হল না। কোনো একটা অজ্ঞাত। কারণে তার ভাবনা-চিন্তা সবকিছুই কেমন যেন ভোতা হয়ে এসেছে। রিরা কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল; মহাকাশযানের ইঞ্জিনের চাপা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে–গুঞ্জনটির মাঝে কিছু একটা পরিবর্তন হয়েছে, যদিও সে পরিবর্তনটা ঠিক ধরতে পারল না। রিরা একসময় উঠে দাঁড়াল, শরীরের অবসাদ কেটে গেছে, ভালো করে কিছু খেয়ে নিতে পারলে সে দিনটি ভালোভাবে শুরু করতে পারবে। মহাকাশযানের সব মহাকাশচারী মারা গিয়েছে, বেঁচে আছে শুধু সে একা–জেনে প্রথমে তার ভেতরে এক ভয়াবহ আতঙ্কের জন্ম হয়েছিল। সে কী করবে কিছুতেই ঠিক করতে পারছিল না। মহাকাশযানটি কয়েকদিনের মাঝে ধ্বংস হয়ে যাবে শুনে হঠাৎ করে তার আতঙ্ক এবং অস্থিরতা পুরোপুরি কেটে গেছে, সে আবিষ্কার করেছে তার আসলেই কিছু করার নেই। কাজেই জীবনের শেষ কয়টি দিনকে এখন যতটুকু সম্ভব অর্থবহ করাই হতে পারে একমাত্র অর্থপূর্ণ কাজ। রিরা দীর্ঘ সময় নিয়ে শরীর পরিষ্কার করে সত্যিকার পানিতে স্নান সেরে নিয়ে পরিষ্কার একটি ওভারঅল পরে নেয়। ক্যাপ্টেনের সুদৃশ্য টেবিলে বসে সে যখন কী খাবে সেটা নিয়ে। মহাকাশযানের প্রসেসরের সাথে কথা বলছিল, ঠিক তখন তার নীলমানবটির কথা মনে পড়ল। কী আশ্চর্য! সে একটি আহত নীলমানবকে রক্তক্ষরণ হয়ে মারা যাবার জন্য একটা ঘরে বন্ধ করে রেখে তার কথা পুরোপুরি ভুলে গেছে। রিরা তার বিছানায় বসে দ্রুত খেয়ে নেয়। এক টুকরো রুটি, সত্যিকারের মাখন, পনির এবং খানিকটা কৃত্রিম প্রোটিন। খাবার শেষে এক মগ গরম কফি। রিরা খাওয়া শেষ করে তার অস্ত্রটি খুঁজে বের করে কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে কার্গো বের করিডরের শেষ মাথায় বন্ধ ঘরটিতে হাজির হল। সাবধানে তালা খুলে সে দরজা টেনে ভেতরে উঁকি দেয়, মনে মনে আশা করেছিল নীলমানবটি এতক্ষণে মরে গিয়ে সব ঝামেলা চুকিয়ে দিয়েছে, কিন্তু সে দেখতে পেল নীলমানবটি এখনো বেঁচে আছে। রিরা নিজের ভেতরে এক ধরনের ক্রোধ অনুভব করে, সে তার অস্ত্রটি হাতবদল করে হিংস্র আক্রোশ নিয়ে নীলমানবটির দিকে তাকাল, দাঁতে দাঁত ঘষে চাপা গলায় বলল, এখনো বেঁচে আছ? নীলমানবটি কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর আশ্চর্য রকমের এক ধরনের ভরাট গলায় বলল, পানি। পানি! রিরা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না, আহত নীলমানবটি তার কাছে পানি চাইতে পারে সেটি নিজের কানে না শুনলে সে বিশ্বাসই করত না। রিরা ক্রুদ্ধ গলায় বলল, আমার মহাকাশযানের সব মানুষকে একজন একজন করে গুলি করে মেরে ফেলেছ, এখন তুমি আমার কাছে পানি চাইছ, তোমার সাহস তো কম না! পানি নয়, তোমার মাথার খুলিতে চতুর্থ মাত্রার বিস্ফোরক দিয়ে একটা বুলেট পাঠানো দরকার। বুঝেছ? নীলমানবটি ধৈর্য ধরে রিয়ার কথা শেষ হবার জন্য অপেক্ষা করল, তারপর আবার ঠিক আগের মতো ভরাট গলায় বলল, পানি। রিরা আবার ক্রুদ্ধ গলায় বলল, চুপ কর শয়তানের বাচ্চা। আমি আমার জীবনের শেষ সময়টা তোমার মতো দানবদের সেবা-যত্ন করে কাটাতে পারব না। তোমার গুলি খেয়ে মরার কথা ছিল—-তোমার চৌদ্দপুরুষের সৌভাগ্য যে গুলি খেয়ে মরতে হচ্ছে না। সভ্য মানুষের মতো রক্তক্ষরণে মারা যাচ্ছ। বুঝেছ? নীলমানবটি আবার ধৈর্য ধরে রিরার কথা শুনে গেল। তার কথা শেষ হবার পর বলল, পানি। কিশিমারা। কিশিমারা? রিরা ধমক দিয়ে বলল, কিশিমারা মানে কী? তিতির পাখির ঝলসানো কাবাব? নাকি আঙুরের রস? গ্যালাক্সির মহাসম্রাটের আর কী কী প্রয়োজন? ঘুমানোর জন্য নরম বিছানা? নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার সুগন্ধি বাতাস? স্নায়ু-উত্তেজক কিছু পানীয়? নীলমানবটি মাথা নাড়ল, এবং রিরার প্রথমবার মনে হল তার মুখে খুব সূক্ষ্ম এক ধরনের হাসি ফুটে উঠেছে। নীলমানবেরা যে মানুষের একটি অপভ্রংশ এই প্রথমবার রিরার মাথায় উঁকি দিয়ে যায়। রিরা জিজ্ঞেস করল, তা হলে কিশিমারা মানে কী? কিশিমারা। নীলমানবটি মুখে একটি কাতর ভঙ্গি করে হাত দুটি বুকের কাছে এনে অনুনয়ের ভঙ্গি করে। ও! রিরার রাগ কমে আসে, তা হলে কিশিমারা মানে অনুগ্রহ করে? নীলমানবটি মাথা নাড়ল, কিশিমারা অনুগ্রহ… কিশিমারা… অনুগ্রহ পানি পানি অনুগ্রহ। ঠিক আছে। রিরা তার অস্ত্রটা হাতবদল করে বলল, তোমাকে এক বোতল পানি দিচ্ছি কিন্তু আর কিছু পাবে না। এই বোতল পানি খেয়ে ঝটপট তোমাকে মরে যেতে হবে। বুঝেছ? আমি তোমার সেবা করতে পারব না। নীলমানবটি মাথা নাড়ল, বলল, বুঝেছি। বুকে হাত দিয়ে নিজেকে দেখিয়ে বলল, বুঝেছি। রিরা পানির একটি বোতলের সাথে কী মনে করে দুই টুকরো রুটি, এক টুকরো কৃত্রিম প্রোটিন আর একটা শুকনো ফল নিয়ে এল। ট্রেটা নীলমানবের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, খাও। এবং মনে রেখ এটা হবে তোমার প্রথম এবং শেষ খাবার। নীলমানবটির মুখের মাংসপেশি হঠাৎ শিথিল হয়ে সেখানে একটি হাসি ফুটে ওঠে। রিরা প্রথমবার লক্ষ করল, নীলমানবটির বয়স খুব বেশি নয় এবং গায়ের রঙ নীল না হলে এবং চোখ দুটোতে এত অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি না থাকলে তাকে সুদর্শন মানুষ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যেত। নীলমানবটি খাবার ট্রেটা নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলল, কুগুরা। কুগুরা? রিরা কঠিন মুখে বলল, কুগুরা মানে কী? আরো চাই? নীলমানবটি খাবারটুকু দুই ভাগ করে এক ভাগ নিজের কাছে রেখে অন্য ভাগ রিরার দিকে এগিয়ে দিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, কুগুরা। রিরার কয়েক মুহূর্ত লাগল বুঝতে যে নীলমানবটি তার খাবারের অর্ধেক তাকে খেতে দিয়েছে। যখন বুঝতে পারল তখন হঠাৎ সে শব্দ করে হেসে ফেলল, হাসতে হাসতে বলল, এমনিতে মহাকাশযানের সব মানুষকে গুলি করে মেরে ফেল, কিন্তু খাবার বেলায় সেটা ভাগাভাগি করে খাও! এটা তোমাদের কোন ধরনের ভদ্রতা? নীলমানবটি কোনো কথা না বলে বোতলটি মুখে লাগিয়ে ঢকঢক করে অনেকখানি পানি খেয়ে রিরার দিকে তাকিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, কুগুরা। অনেক কুগুরা। কুগুরা মানে কি ধন্যবাদ? হ্যাঁ। নীলমানবের মুখে আবার একটু হাসির চিহ্ন দেখা গেল, মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, ধন্যবাদ। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। রিরা অর্ধেক করে তার কাছে পাঠানো খাবারের ট্রেটা ধাক্কা দিয়ে নীলমানবের কাছে ফেরত পাঠিয়ে দিয়ে বলল, কুগুরা। ধন্যবাদ। আমি খেয়ে এসেছি—এটা তোমার জন্য। তারপর দরজাটা টেনে বন্ধ করতে করতে বলল, আবার যখন আলব, তখন যেন ঝামেলা না থাকে। খাবারটা খেয়ে ঝটপট মরে যাও। মনে থাকবে? নীলমানবটি দুই টুকরো রুটির মাঝে প্রোটিনের টুকরোটা রেখে সেটিতে একটা বড় কামড় দিয়ে বলল, ধন্যবাদ। তোমাকে ধন্যবাদ। অনেক ধন্যবাদ। কন্ট্রোল প্যানেলে ঝুঁকে পড়ে রিরা বলল, আমাদের মহাকাশযানের এখন কী অবস্থা? মহাকাশযানে মূল প্রসেসর শুষ্ক কণ্ঠে উত্তর দিল, অবস্থা ভালো নয়। গত আঠার ঘণ্টায়। আরো কিছু জ্বালানি ক্ষয় হয়েছে। কক্ষপথের পরিবর্তন না করলে আমরা অতিকায় অন্ধকার গ্রহটার মহাকর্ষ বলে আটকা পড়ে যাব। তা হলে কক্ষপথ পরিবর্তন করছি না কেন? দুটি কারণে। মহাকাশযানের ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং যথেষ্ট জ্বালানি নেই। জ্বালানি পরিবহন টিউব ফেটে গিয়ে অনেক জ্বালানি নষ্ট হয়েছে। রিরা একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, মহাকাশযানের বাতাসের কী খবর? খুব দ্রুত বাতাস বের হয়ে যাচ্ছে। আমরা রিজার্ভের বাতাস ব্যবহার করতে শুরু করেছি। রিরা চিন্তিত মুখে বলল, এটা খুব খারাপ খবর। হ্যাঁ। মূল প্রসেসর শুষ্ক কণ্ঠে বলল, রিজার্ভের বাতাস ব্যবহার করা খুব বিপজ্জনক। রিরা টেবিলে শব্দ করতে করতে বলল, কিছু বাতাস রক্ষা করা যাক। কী বলো? কীভাবে? মহাকাশযানে আমি ছাড়া আর কোনো জীবিত প্রাণী নেই। আমার তো খুব বেশি জায়গার প্রয়োজন নেই। কাজেই অল্পকিছু জায়গা বায়ু নিরোধক করে ফেল। তাতেও সমস্যার সমাধান হবে না। কেন? গোলাগুলিতে দেয়ালে অনেক ফুটো হয়েছে। ফুটোগুলো বন্ধ করা যাক। মহাকাশযানের ফুটো বন্ধ করার কোনো ক্ষমতা আমার নেই। আমি জানি মহাকাশযানে ফুটো বন্ধ করার তোমার কোনো ক্ষমতা নেই। তুমি হচ্ছ তথ্যকেন্দ্র। তোমার তথ্যগুলো খুব প্রয়োজনীয় যখন সবকিছু ঠিকভাবে কাজ করে। যখন। বড় কোনো বিপদ হয়, তখন মানুষকে নিজের চেষ্টায় বেঁচে থাকতে হয়। বুঝেছ? মূল ভাবনাটা অনুমান করতে পারছি। রিরা একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, সেটাই যথেষ্ট। মহাকাশযানের মূল প্রসেসর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বলল, তুমি তা হলে কীভাবে ফুটোগুলো বন্ধ করবে? অত্যন্ত প্রাচীন পদ্ধতি ব্যবহার করে। কোন প্রাচীন পদ্ধতি? ওয়েল্ডিং। ধাতব পাত এনে উপরে লাগিয়ে ওয়েন্ড করব। বাতাস বের হয়ে যাওয়া কমবে। এটি অত্যন্ত শ্রমসাপেক্ষ ব্যাপার। রিরা বলল, জানি। তোমার কি এর চাইতে ভালো কোনো পদ্ধতি জানা আছে? না, জানা নেই। তবে— তবে কী? এরকম পরিশ্রমসাপেক্ষ একটি কাজ করে ঠিক কী লাভ হবে? মহাকাশযানটি দুদিন পরে ধ্বংস না হয়ে হয়তো তিন কিংবা চার দিন পরে ধ্বংস হবে। মহাকাশযানটিকে তো রক্ষা করা যাবে না। রিরা একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, মানুষের সাথে এখানে যন্ত্রের পার্থক্য। মানুষ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করে। যন্ত্র করে না। কিন্তু যেখানে আশা নেই, সেখানে চেষ্টা করে কী লাভ? আমি সেটা তোমাকে বুঝাতে পারব না। মানুষের ইতিহাস পড়ে দেখ, অসংখ্যবার তারা অসাধ্য সাধন করছে। তবে রিরা একমুহূর্ত অপেক্ষা করে বলল, আমার অসাধ্য সাধন করার ক্ষমতা নেই, কিন্তু শুধুমাত্র বসে বসে তো আর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে পারি না। কিছু একটা করে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চাই। মহাকাশযানের মূল প্রসেসর শুষ্ক কণ্ঠে বলল, তুমি কি নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য এখনই ওয়েল্ডিং করতে শুরু করে দেবে? হ্যাঁ। ওয়েল্ডিঙের যন্ত্রপাতি কোথায় আছে বলে দাও। এই কাজে সাহায্য করার জন্য কি কোনো নিম্নশ্রেণীর রোবট পাওয়া যাবে? আমি খুব দুঃখিত রিরা। এটি এত প্রাচীন পদ্ধতি যে, কোনো রোবটকে এটা শেখানো হয় না। রিরা টানা ছয় ঘণ্টা কাজ করে কন্ট্রোলরুমের আশপাশের দেয়ালগুলোর ফুটোগুলো ওয়েল্ডিং করে বন্ধ করার চেষ্টা করল। পুরোপুরি নিচ্ছিদ্র করতে পারল না, কিন্তু যেটুকু করেছে সেটা খারাপ নয়, বাতাস আগে থেকে অনেক কম বের হবে, মহাকাশযানটি। পুরোপুরি বায়ুশূন্য হতে এখন নিশ্চিতভাবে আরো দুদিন বাড়তি সময় পাওয়া যাবে। রিরা মনে মনে আশা করে আছে কোনো একটি উদ্ধারকারী মহাকাশযান তাদেরকে উদ্ধার করতে আসবে—সেজন্য মহাকাশযানটি যত দীর্ঘ সময় বাচিয়ে রাখতে পারবে, ততই বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। যদিও সে খুব ভালো করে জানে সুবিস্তৃত এই বিশাল মহাশূন্যে তাদেরকে উদ্ধার করতে যে সময়ের প্রয়োজন, সেই সময়টুকু তারা কোনোভাবেই মহাকাশযানটাকে টিকিয়ে রাখতে পারবে না। কিন্তু কখনো কখনো তো অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে—তার জীবনেও কি একটা অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটতে পারে না? ক্যাপ্টেনের ঘরে গিয়ে খেতে বসে তার হঠাৎ করে নীলমানবের কথা মনে পড়ল। নীলমানবটি কি এখনো বেঁচে আছে? রিরা কী ভেবে খাবারের ট্রেটা সরিয়ে রেখে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা কাঁধে ঝুলিয়ে কার্গো বের পাশে করিডরের কাছে তালাবদ্ধ ঘরটির সামনে এসে দাঁড়াল। অস্ত্রটি উদ্যত রেখে সে সাবধানে তালা খুলে দরজাটা ঠেলে ভেতরে উঁকি দিল, নীলমানবটি মারা যায় নি, দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। রিরার মনে হল তাকে দেখে তার মুখে খুব সূক্ষ্ম একটি হাসি ফুটে উঠল। নীলমানবটি পায়ের কাছে ট্রাউজারটি গুটিয়ে এনেছে, রক্ত বন্ধ করার জন্য শরীরের কাপড় ছিঁড়ে শক্ত করে বেঁধে রেখেছে। আগে শরীরের নানা জায়গায় শুকিয়ে যাওয়া কালো রক্তের দাগ ছিল, মনে হল পানি দিয়ে সে সেগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করেছে। নীলমানবটি কোনো কথা না বলে এক ধরনের কৌতূহল নিয়ে রিরার দিকে তাকিয়ে রইল। রক্তক্ষরণে মারা যাবে বলে রিরার যে ধারণাটি ছিল সেটি সত্যি হবার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না—ব্যাপারটিতে রিরার রেগে ওঠার কথা ছিল কিন্তু খানিকটা বিস্ময় নিয়ে সে আবিষ্কার করল, সে মোটেও রেগে উঠছে না, বরং নীলমানবটি বেঁচে আছে দেখে সে এক ধরনের স্বস্তিবোধ করছে। যে নৃশংস প্রাণীরা তার মহাকাশযানের সবাইকে হত্যা। করেছে, তাদের একজন এখনো বেঁচে আছে বলে সে স্বস্তিবোধ করছে দেখে রিরা নিজের ওপর রেগে ওঠে। সে জোর করে মুখে এক ধরনের কাঠিন্য নিয়ে এসে নীলমানবটির দিকে তাকিয়ে থাকে। নীলমানবটি রিরার দিকে তাকিয়ে বলল ওয়েল্ডিং। তার সারা শরীরে কালিঝুলি মাখানো, ওয়েল্ডিঙের এসিডের ঝাঁজালো গন্ধ শরীর থেকে বের হচ্ছে, সে যে ওয়েল্ডিং করে এসেছে সেটা বোঝা খুব কঠিন নয়। নীলমানবটির কথার উত্তরে সে মাথা নাড়ল। নীলমানবটি নিজের বুকে থাবা দিয়ে বলল, আমি ওয়েল্ডিং ভালো। অনেক ভালো। রিরা ভুরু কুঁচকে বলল, তুমি খুব ভালো ওয়েল্ডিং করতে পার? নীলমানবটি হ্য-সূচকভাবে মাথা নাড়ল। রিরা মাথা নাড়ল, বলল, তাতে কিছু আসে যায় না। তুমি আশা করবো না আমি তোমাকে এখানে ওয়েল্ডিং করতে দেব। বুঝেছ? নীলমানবটি মাথা নেড়ে আবার বলল, আমি খুব ভালো ওয়েল্ডিং। বেশি বেশি ভালো ওয়েন্ডিং। ব্যস, অনেক হয়েছে। নিজের প্রশংসায় এত পঞ্চমুখ হবার কোনো দরকার নেই। রিরা একটু থেমে বলল, তোমার পায়ে যে গুলি লেগেছে, সেটা খেয়াল আছে? গুলি-লাগা পা দিয়ে তুমি দাঁড়াবে কেমন করে শুনি? রিরার সব কথা নীলমানব বুঝতে পারল না কিন্তু তার কথায় যে তার গুলি খাওয়া পায়ের কথা আছে সেটা সে বুঝতে পারল। নীলমানব তার পায়ের দিকে দেখিয়ে বলল, কিজুন। কিজুন? হ্যাঁ। নীলমানবটি হাত দিয়ে তার পায়ের ক্ষতে ইনজেকশন দেবার ভঙ্গি করে বলল, কিশিমারা… অনুগ্রহ… কিজুন। রিরা ভুরু কুঁচকে বলল, কিজুন মানে ওষুধ? তোমার পায়ের জন্য ওষুধ দরকার? নীলমানবটি জোরে জোরে মাথা নাড়ল। রিরা কঠিন মুখে বলল, এরপর তুমি কী বলবে? ঘুমানোর জন্য নরম বিছানা? নেশা করার জন্য উত্তেজক ড্রাগ? দেশে ফিরে যাবার জন্য স্কাউটশিপ? রিরা কী বলছে নীলমানবটি ঠিক বুঝতে পারল না, কিন্তু গলার স্বরে ক্রোধটি অনুভব করে এক ধরনের শূন্যদৃষ্টি নিয়ে রিরার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টি দেখে সম্পূর্ণ অকারণে হঠাৎ রিরা আরো ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। সে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি ঝকিয়ে চিৎকার করে বলল, আমি যে তোমাকে গুলি করে মেরে না ফেলে এখনো বেঁচে থাকার জন্য দুবেলা খাবার দিচ্ছি, সেটা তোমার চৌদ্দপুরুষের ভাগ্য। এই ভাগ্যকে টেনে আর লম্বা করার চেষ্টা করো না বুঝেছ? নীলমানবটি কী বুঝল কে জানে, কিন্তু সে সম্মতিসূচকভাবে মাথা নেড়ে রিরার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। রিরা ক্যাপ্টেনের ঘরে দীর্ঘসময় একা একা খাবারের ট্রে নিয়ে বসে থাকে। নিঃসঙ্গ এই মহাকাশযানটি আর কয়েকদিনের মাঝে ধ্বংস হয়ে যাবে, জীবনের এই শেষ কয়েকটি মুহূর্তে তার কোনো একজন আপনজনের সাথে কথা বলার জন্য বুকের ভেতরটি হাহাকার করতে থাকে। এখানে কোনো আপনজন নেই, একমাত্র জীবিত প্রাণী নীলমানবটির কথা তার ঘুরেফিরে মনে হতে থাকে। গুলিবিদ্ধ অসহায় প্রাণীটির শূন্যদৃষ্টির কথাটি সে ভুলতে পারে না। তার মনে হয় সে খাবারের ট্রেটি নিয়ে নীলমানবের কাছে যাবে, গিয়ে বলবে, আমি দুঃখিত যে তোমার সাথে এত দুর্ব্যবহার করেছি। এস জীবনের শেষ কয়েকটা মুহূর্ত আমরা ভুলে যাই তুমি নীলমানব এবং আমি মানুষ। দুজনে একসাথে বসে বসে খেতে খেতে কথা বলি। কিন্তু রিরা নীলমানবের কাছে গেল না, ক্যাপ্টেনের সুদৃশ্য ঘরে একা একা খাবারের ট্রে সামনে নিয়ে বসে রইল। রিরা মনিটরের সামনে নিঃশব্দে বসে আছে। মহাকাশযানটি একটা নিউট্রন স্টারের গা ঘেঁষে যেতে যেতে গতি সঞ্চয় করছে—দূরে একটা গ্রহাণুপুঞ্জ, তার ভেতর দিয়ে যাবার কথা। রিরা গ্রহাণুপুঞ্জটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে মহাকাশযানের মূল প্রসেসরকে জিজ্ঞেস করল, এই গ্রহাণুপুঞ্জের সব গ্রহ-উপগ্রহ কি নিখুঁতভাবে ক্যাটালগ করা আছে? আছে। এটা আমাদের নিয়মিত রুটের মাঝে পড়ে। তা হলে আমরা এখানকার ভালো দেখে একটা গ্রহে নেমে পড়ি না কেন? মহাকাশযানের মূল প্রসেসর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বলল, এটি একটি অত্যন্ত অবাস্তব পরিকল্পনা। রিরা একটু রেগে উঠে বলল, কেন? অবাস্তব পরিকল্পনা কেন? এই মহাকাশযানটি খুব খারাপভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—কোনো গ্রহে নামা বা সেখান থেকে ওঠার ক্ষমতা নেই। নামতে গেলে বিধ্বস্ত হবার আশঙ্কা শতকরা নব্বই ভাগ থেকে বেশি। রিরা কাঠকাঠ স্বরে হেসে উঠে বলল, মহাকাশে যেতে থাকলে এমনিতেই মহাকাশযান বিধ্বস্ত হয়ে যাবে—তা হলে নামার চেষ্টা করে বিধ্বস্ত হওয়া কি বুদ্ধিমানের কাজ না? যদি বেঁচে যাই, তা হলে কী লাভ হবে বুঝতে পারছ? না, বুঝতে পারছি না। তা হলে হয়তো ভবিষ্যতে কখনো কোনো মহাকাশযান এসে আমাদের উদ্ধার করতে পারবে। তার সম্ভাবনা দশমিক শূন্য শূন্য চার ভাগ। রিরা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, তুমি তোমার সম্ভাবনা হিসাব করে বের করা একটু বন্ধ করবে? আমি দুঃখিত রিরা। মূল প্রসেসর তার শুক ধাতবস্বরে বলল, আমি তোমাকে সিদ্ধান্ত নেবার ব্যাপারে সাহায্য করছিলাম। তোমার যেখানে সাহায্য করার কথা, সেখানে সাহায্য করলেই হবে। সিদ্ধান্ত নেবার ব্যাপারে সাহায্য করতে হবে না। ঠিক আছে। এখন ক্যাটালগ দেখে আমাকে জানাও কোন গ্ৰহটাতে নামা সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমানের কাজ হবে। মহাকাশযানের মূল প্রসেসর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমি সবগুলো গ্রহ পরীক্ষা করে দেখলাম। এর কোনোটাই দীর্ঘ সময় থাকার উপযোগী নয়। রিরা একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, তোমাকে খুব সহজ একটা জিনিল বোঝানো যাচ্ছে! আমি আমার গ্রীষ্মের ছুটি কাটাতে এই গ্রহে যাচ্ছি না। আমি এই গ্রহে যাচ্ছি কোনো উপায় না দেখে হয়তো এই গ্রহে কিছুদিন থাকা যাবে—যে সময়ের ভেতরে কোনো উদ্ধারকারী মহাকাশযান আমাদের খুঁজতে আসবে। বুঝেছ? বুঝেছি। তা হলে আমাকে বলে কোন গ্রহটা সবচেয়ে কম বিপজ্জনক। মহাকাশযানের মূল প্রসেসর বলল, প্রথম প্রহটা ছোট–বায়ুমণ্ডল নেই, প্রতিমুহূর্তে উল্কাপাত হচ্ছে–খুব বিপজ্জনক। দ্বিতীয় গ্রহটা এখনো শীতল হয় নি, অসংখ্য আগ্নেয়গিরি ক্রমাগত লাভা বের হচ্ছে, এটাও বিপজ্জনক। তৃতীয় গ্ৰহটাতে একটা বায়ুমণ্ডল আছে, তাপমাত্রাও মোটামুটি আরামদায়ক–তবে গ্রহটা পুরোপুরি অন্ধকার। রিরা মাথা নেড়ে বলল, উহুঁ, অন্ধকার গ্রহে যাওয়া যাবে না। মহাকাশযানের প্রসেসর বলল, চতুর্থ গ্রহটাকে মনে করা যায় বাসযোগ্য, অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি এর মাধ্যাকর্ষণজনিত ত্বরণ জি-এর কাছাকাছি। গ্রহটি মোটামুটি আলোকিত, একটা কাজ চালানোর মতো বায়ুমণ্ডল আছে, তবে অক্সিজেন সাপ্লাই না নিয়ে তুমি বের হতে পারবে লা। রিরা টেবিলে থাবা দিয়ে বলল, চমৎকার! আগেই চমৎকার বলো না। মানুষ প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে এখানে কলোনি করেছিল, কিন্তু– কিন্তু কী? কোনো একটি অজ্ঞাত কারণে কলোনির সবাই মারা পড়েছিল। কারণটা বের করতে পারে নি মানুষ আর কখনো ফিরে আসে নি। রিরা ভুরু কুঁচকে বলল, আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছ? না রিরা। আমি ভয় দেখানোর চেষ্টা করছি না, তোমাকে শুধু জানিয়ে রাখছি। অনেক ধন্যবাদ সেজন্য। রির অন্যমনস্কভাবে টেবিলে আঙুল দিয়ে কয়েকবার শব্দ করে বলল, এই গ্রহের সব মানুষ কেন মারা পড়েছিল, সেটা নিয়ে কোনো তথ্য আছে? না নেই। মহাকাশযানের প্রসেসর তার শুকণ্ঠে বলল, তবে অসমর্থিত একটা তথ্য আছে। সেটা কী?


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৭০ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...