গল্পেরঝুড়ির এ্যাপ ডাউনলোড করুন - get google app
গল্পেরঝুড়ি ফানবক্স ! এখন গল্পের সাথেও মজাও হবে! কুইজ খেলুন , অংক কষুন , বাড়িয়ে নিন আপনার দক্ষতা জিতে নিন রেওয়ার্ড !

যারা একটি গল্পে অযাচিত কমেন্ট করছেন তারা অবস্যাই আমাদের দৃষ্টিতে আছেন ... পয়েন্ট বাড়াতে শুধু শুধু কমেন্ট করবেন না ... অনেকে হয়ত ভুলে গিয়েছেন পয়েন্ট এর পাশাপাশি ডিমেরিট পয়েন্ট নামক একটা বিষয় ও রয়েছে ... একটি ডিমেরিট পয়েন্ট হলে তার পয়েন্টের ২৫% নষ্ট হয়ে যাবে এবং তারপর ৫০% ৭৫% কেটে নেওয়া হবে... তাই শুধু শুধু একই কমেন্ট বারবার করবেন না... ধন্যবাদ...

সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান... জিজেতে আজে বাজে কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন ... অন্যথায় আপনার আইডি বা কমেন্ট ব্লক করা হবে... আর গল্প দেওয়ার ক্ষেত্রে গল্প দেওয়ার নিয়ম মেনে চলুন ... সার্বিকভাবে জিজের নীতিমালা মেনে চলার চেস্টা করুন ...

অবনীল (পর্ব-১)

"সাইন্স ফিকশন" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Tuba Rubaiyat (১৬৬ পয়েন্ট)



ক্যাপ্টেন বৰ্কেন হাত দিয়ে অন্যমনস্কভাবে টেবিলে শব্দ করতে করতে মনিটরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। পেছনে মৃদু একটা শব্দ শুনে মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখেন, মহাকাশযানের শিক্ষানবিশ ক্রু রিরা কন্ট্রোলরুমের পেছনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাপ্টেন বৰ্কেন একটু অবাক হয়ে বললেন, তুমি এখানে? মহামান্য ক্যাপ্টেন, আমাকে এখানে ডিউটি দেওয়া হয়েছে। ক্যাপ্টেন হাত নেড়ে পুরো ব্যাপারটি উড়িয়ে দেবার মতো করে বললেন, কন্ট্রোলরুমে এখন কোনো কাজ নেই রিরা। তুমি এখন বিশ্রাম নিতে যেতে পার। ক্যাপ্টেন বৰ্কেন এই মহাকাশযানের দলপতি, তার সাধারণ কথাই আদেশের মতো। রিরার মাথা নুইয়ে অভিবাদন করে চলে যাবার কথা ছিল, কিন্তু সে একটু ইতস্তত করে বলল, আর কিছুক্ষণ এখানে থাকার অনুমতি চাইছি মহামান্য ক্যাপ্টেন। ক্যাপ্টেন বৰ্কেন একটু অবাক হয়ে কমবয়সী এই মেয়েটির দিকে ভালো করে তাকালেন। কিশোরীর মতো মুখ, হালকা-পাতলা ছিপছিপে শরীর, ছোট করে ছাঁটা বাদামি চুল। বড় বড় চোখে কৌতূহল এবং একধরনের নিস্পাপ সারল্য। জীবনে প্রথমবার মহাকাশযানের দীর্ঘ অভিযানে এসে তার চোখে-মুখে একধরনের উত্তেজনার ছাপ, যেটি অনেক কষ্ট করে ঢেকে রেখে সে একধরনের শান্ত ভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। ক্যাপ্টেন বৰ্কেন মনিটর থেকে পা নামিয়ে হালকা গলায় বললেন, কন্ট্রোলরুম হচ্ছে মহাকাশযানের সবচেয়ে আনন্দহীন এবং সবচেয়ে একঘেয়ে জায়গা। তুমি এখানে থেকে কী করবে? আমার কাছে এটি অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক জায়গা মহামান্য ক্যাপ্টেন। আমাদের একাডেমিতে এসব শিখানো হয়েছে। কিন্তু এই প্রথমবার আমি সত্যিকারের কন্ট্রোলরুম নিজের চোখে দেখছি! ক্যাপ্টেন বৰ্কেন মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন, এস, তা হলে কাছে এসে দেখ! রিরা মেয়েটি সতর্ক পা ফেলে মনিটরের কাছাকাছি এগিয়ে আসে। ক্যাপ্টেন বৰ্কেন তার পাশের চেয়ারটি ঘুরিয়ে তাকে বসার জায়গা করে দিয়ে বললেন, নাও, এখানে বল। মহাকাশযানের ক্যাপ্টেনের পাশে বসার সুযোগ পেয়ে রিরার চোখে-মুখে কৃতজ্ঞতার একটা স্পষ্ট ছাপ পড়ল। সে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ মহামান্য ক্যাপ্টেন। এর মাঝে ধন্যবাদ দেবার কিছু নেই। তুমি নতুন এসেছ বলে সবকিছু এরকম মনে হচ্ছে—দেখতে দেখতে অভ্যাস হয়ে যাবে। একাডেমিতে তোমাদের অনেক আইনানুন। শিখিয়েছে না? শিখিয়েছে মহামান্য ক্যাপ্টেন। তুমি দেখবে আমরা এগুলো নিয়ে এখানে মাথা ঘামাই না। রিরা একটু অবাক হয়ে ক্যাপ্টেন বৰ্কেনের দিকে তাকাল, ক্যাপ্টেন বৰ্কেন একটু হেসে বললেন, সব মানুষের নিজের একটা নিয়ম থাকে। আমার মহাকাশযানের নিয়মটা খুব সহজ। সেটি কী মহামান্য বর্কেন? মহাকাশযানটাকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়াটা হচ্ছে আমাদের দায়িত্ব নিয়মগুলো করা হয়েছে সেজন্য। এই নিয়মগুলো অল্পবিস্তর শর্ট সার্কিট করে যদি মহাকাশবানকে আরো সহজে চালানো যায়, আমার আপত্তি কোথায়? রিরা মুখে এক ধরনের গাম্ভীর্য এনে বলল, আমাদের একাডেমিতে আপনার সম্পর্কে অত্যন্ত উচ্চ ধারণা পোষণ করা হয় মহামান্য ক্যাপ্টেন। আমার খুব সৌভাগ্য যে আমি আপনার মহাকাশযানে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। ক্যাপ্টেন বৰ্কেন শব্দ করে হেসে বললেন, আমি খুব নিশ্চিত না যে, তুমি সপ্তাহখানেক পরে এই কথা বলবে। আইনকানুন নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না সত্যি, কিন্তু কাজকর্ম নিয়ে আমি খুব খুঁতখুঁতে! কয়দিন পরেই টের পাবে। ক্যাপ্টেন বর্কেনের হালকা কথাবার্তা শুনে রিরা এর মাঝে খানিকটা সহজ হয়ে এসেছে এই প্রথমবার তার মুখে হালকা হাসির একটা ছাপ পড়ল, বলল, আমি সেটা টের পাবার জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি ক্যাপ্টেন বৰ্কেন। চমৎকার। ক্যাপ্টেন বৰ্কেন আঙুল দিয়ে টেবিলে শব্দ করতে করতে বললেন, মহাকাশযানের সমস্যাটা কী জান? কী মহামান্য ক্যাপ্টেন? এর সবকিছু নিজে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এই কন্ট্রোলরুমের মূল যে প্রসেসর, সেটা তোমার কিংবা আমার মস্তিষ্ক থেকে কয়েক হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী। কাজেই আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এখানে কারো কিছু করার নেই। কিন্তু– ক্যাপ্টেন বৰ্কেন কথা থামিয়ে দিয়ে অন্যমনস্কভাবে মনিটরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। রিরা ধৈর্য ধরে ক্যাপ্টেন বর্কেনের দিকে তাকিয়ে রইল; ক্যাপ্টেন বৰ্কেন একটা নিশ্বাস ফেলে রিরার দিকে তাকিয়ে বললেন, কিন্তু এখানে সব সময় খুব সতর্ক থাকতে হয়, এমন বিচিত্র সমস্যা হতে পারে, যেটা কেউ আগে কোনো দিন চিন্তা করে নি। এখন পর্যন্ত একটি অভিযানও হয় নি যেখানে আমাকে বিচিত্র কিছু করতে হয় নি। মহামান্য ক্যাপ্টেন। বলো। আপনার কি মনে হয় আমাদের এই অভিযানে বিচিত্র কোনো অভিজ্ঞতা হতে পারে? নিশ্চয়ই হতে পারে রিরা। সেটি কি বিপজ্জনক কিছু হতে পারে? রিরা তার গলায় একটা স্বাভাবিক ভাব বজায় রাখার চেষ্টা করলেও সেখানে আশঙ্কাটুকু গোপন থাকল না। ক্যাপ্টেন বৰ্কেন মৃদু হেসে বললেন, বিপজ্জনক তো হতেই পারে রিরা—লক্ষ লক্ষ মাইলের নির্জন মহাকাশে কত কী ঘটতে পারে। কিন্তু তাতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। রিরা সোজা হয়ে বসে বলল, আমি ভয় পাচ্ছি না মহামান্য ক্যাপ্টেন। ক্যাপ্টেন বৰ্কেন হাসি গোপন করে বললেন, অবিশ্যি তুমি ভয় পাচ্ছ না রিরা। আমি জানি তুমি সাহসী মেয়ে। সাহসী না হলে কেউ মহাকাশযানের অভিযাত্রী হয় না। দুজন বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। মহাকাশযানটি প্রায় নিঃশব্দ, খুব চেষ্টা করলে তার শক্তিশালী ইঞ্জিনের মৃদু গুঞ্জন শোনা যায়। রিরা একটু ইতস্তত করে বলল, মহামান্য ক্যাপ্টেন, আপনাকে একটা জিনিস জিজ্ঞেস করতে পারি? হ্যাঁ, জিজ্ঞেস কর। আমাদের এই মহাকাশযানে করে আমরা নাকি একটা বিপজ্জনক কার্গো নিয়ে যাচ্ছি? ক্যাপ্টেন বৰ্কেন একটু অবাক হয়ে বললেন, তুমি কোন কার্গোর কথা বলছ রিরা? এই মহাকাশযানে করে নাকি একটা নীলমানবের দল নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? হ্যাঁ। আমাদের মহাকাশযানে সতের জন নীলমান আছে। ক্লড উপগ্রহের যুদ্ধে এরা ধরা পড়েছে। এরা নাকি অত্যন্ত ভয়ংকর? ক্যাপ্টেন বর্কেন একটু হেসে বললেন, আমরা যে জিনিসটা জানি না সেটাকেই মনে করি ভয়ংকর। নীলমানব সম্পর্কেও সেটা সত্যি তাদেরকে ভয়ংকর ভাবার কারণ হচ্ছে আমরা তাদের সম্পর্ক খুব বেশি জানি না। কদাচিৎ আমরা তাদের ধরতে পারি, এই প্রথমবার একসাথে সতের জনকে ধরতে পেরেছি। কিন্তু সেজন্য আমাদের নাকি ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করতে হয়েছে? ক্যাপ্টেন বর্কেন মাথা নাড়লেন, হ্যাঁ, সেটা সত্যি। নীলমানব নতুন কিছু অস্ত্র তৈরি করেছে, যেগুলো খু্ব শক্তিশালী। তাদের মহাকাশযানের টেকনোলজিটাও ভিন্ন। মহামান্য ক্যাপ্টেন, আমরা কি নীলমানবকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করি? না, করি না। মানুষের বিবর্তন হয় স্বাভাবিকভাবে। নীলমানব নিজেদের মাঝে জোর করে বিবর্তন এনেছে। তাদের চোখ ইনফ্রারেড থেকে শুরু করে আলট্রাভায়োলেট পর্যন্ত সংবেদন করে ফেলেছে। তাদের রক্ত কপারভিত্তিক, তাই তাদের গায়ের রঙ হালকা নীল। আমি যতদূর জানি তারা ফুসফুসের আকার অনেক বড় করেছে, বাতাসে কম অক্সিজেনেও বেঁচে থাকতে পারে। শরীরের ভেতরে নাকি নতুন নতুন পরিবর্তন এনেছে। রিরা একটু শিউরে উঠে বলল, কী সর্বনাশ! এগুলো হচ্ছে কাঠামোগত পরিবর্তন। আমি শুনেছি এদের চিন্তার জগৎটাও অনেক ভিন্ন। মানুষের মতো এরা বিচ্ছিন্ন না, এদের পুরো দলটি একসাথে কাজ করে। সেটা কীভাবে সম্ভব? আমরা সেটা এখনো জানি না, বোঝার চেষ্টা করছি। সতের জনের এই দলটাকে মূল বিজ্ঞান একাডেমিতে পৌঁছে দিতে পারলে অনেক কিছু জানা যাবে। ক্যাপ্টেন বৰ্কেন একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, আমি সিকিউরিটি ডিভিশনকে বলেছিলাম, পুরো দলটিকে ঘুম পাড়িয়ে শীতল ঘরে নিয়ে যেতে। তা হলে আমাদের ঝামেলা খুব কম হত, কিন্তু বিজ্ঞান একাডেমি রাজি হয় নি। কেন রাজি হয় নি মহামান্য ক্যাপ্টেন? এই মহাকাশযানে করে যখন নেওয়া হবে.তখন তারা কী করে বিজ্ঞান একাডেমি সেটা দেখতে চায়। তারা কীভাবে কথা বলে, কীভাবে সময় কাটায় ব্যাপারটা নিয়ে গবেষণা করবে। রিরা একটু অবাক হয়ে বলল, এর মাঝে গবেষণা করার কী আছে মহামান্য ক্যাপ্টেন? ক্যাপ্টেন বর্কে একটু হেসে বললেন, নীলমানরা অসম্ভব সাহসী, অসম্ভব একরোখা, প্রায় খ্যাপা ধরনের প্রাণী। তারা মহাকাশযান থেকে বের হয়ে যাবার চেষ্টা করবেই কীভাবে চেষ্টা করবে সেটাই দেখতে চায়। রিরার মুখে আতঙ্কের একটা ছাপ পড়ল, বলল, সর্বনাশ! যদি সত্যি বের হয়ে যায়? ক্যাপ্টেন বৰ্কেন হাসলেন, বললেন, এত সোজা নয়। ওদের পুরো ঘরটা চব্বিশ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আমি ছয় জন নিরাপত্তা প্রহরীকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে–অস্বাভাবিক কিছু ঘটলে সাথে সাথে গুলি করার অনুমতি আছে। রিরা সাবধানে একটা নিশ্বাস ফেলল। খানিকক্ষণ দেয়ালের বিশাল মনিটরটির দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ মাথা ঘুরিয়ে ক্যাপ্টেন বর্কেনকে জিজ্ঞেস করল, মহামান্য ক্যাপ্টেন, নীলমানবেরা কী ভাষায় কথা বলে? তাদের নিজেদের ভাষা রয়েছে। একসময় তো নীলমানবেরা মানুষই ছিল, তাই আমাদের ভাষার সাথে মিল আছে। কথা শুনলে মোটামুটি বোঝা যায়। ওরা এখানে কী নিয়ে কথা বলছে? প্রথম কয়েকদিন লক্ষ করেছিলাম একেবারে দৈনন্দিন কথাবার্তা। মেঝেতে দাগ কেটে কী একটা খেলা খেলছে, অনেকটা দাবার মতো। বসে বসে সেটা খেলে। কোনোরকম দুশ্চিন্তা নেই? থাকলেও কথায় বার্তায় সেটা বোঝার কোনো উপায় নেই। খুব চাপা স্বভাবের। ওদের মাঝে কি মেয়ে আছে? আছে। ছেলেমেয়ের ব্যাপারটা আমাদের মতোই, সব কাজে সমান সমান। এখানে সতের জনের মাঝে আট জনই মেয়ে। দলটার যে নেতৃত্ব নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে সেও একজন মেয়ে। কমবয়সী একরোখা ধরনের। মহামান্য ক্যাপ্টেন, আমি কি তাদের দেখতে পারি? যখন তোমার ডিউটি দেওয়া হবে, তখন তো দেখবেই। কাছে থেকে দেখবে। এখন দেখতে চাইলে এই মনিটরে দেখ। ক্যাপ্টেন বৰ্কেন একটা সুইচ টিপে দিতেই বড় মনিটরে অবরুদ্ধ একটা ঘরের ছবি ফুটে উঠল। ঘরের ভেতর সতের জন নানাবয়সী নীলমানব ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। একজন মাথার নিচে হাত দিয়ে শুয়ে নিষ্পলক চোখে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে, মুখে গভীর একটা বিষণ্ণতার ছাপ। গায়ের রঙ হালকা নীল, দেখে মনে হয় বুঝি কোনো একটি অশরীরী প্রাণী। দুজন মেঝেতে দাগ কাটা ছকের দু পাশে বসে খেলছে—খেলাটি প্রাচীন দাবার মতো, খুঁটি নেই বলে খাবারের জন্য দেওয়া শুকনো রুটির টুকরো কেটে কেটে খুঁটিগুলো তৈরি করেছে। খেলোয়াড় দুজন গালে হাত দিয়ে ভাবছে। তাদের ঘিরে আরো কয়েকজন। নিচু গলায় কথা বলছে। দেখে মনে হয় কীভাবে খেলতে হবে, সে বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছে। বন্ধ ঘরের দেয়ালে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছে বেশ কয়েকজন। একজন নিচু গলায় একটা গান গাইছে। গানের কথাগুলো বোঝা যায় না কিন্তু সুরটুকু খুব বিষণ্ণ এবং করুণ, বুকের ভেতর এক ধরনের হাহাকারের মতো অনুভূতি হয়। রিরা এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে নীলমানবদের দলটির দিকে তাকিয়ে রইল। এই মানুষগুলো আসলে ভয়ংকর একরোখা, দুর্ধর্ষ এবং নৃশংস। কিন্তু চুপচাপ নিঃশব্দে বসে থাকতে দেখে সেটি একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। একাডেমিতে মানুষের এই অপভ্রংশ সম্পর্কে তাদেরকে পড়ানো হয়েছে, তাদের সম্পর্কে রিরার এক ধরনের বিচিত্র কৌতূহল ছিল, মনিটরে সরাসরি দেখতে পেয়ে সে বিস্ময়াভিভূত চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। রিরা তখনো জানত না তার জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটবে এই নীলমানবদের নিয়েই। তীক্ষ্ণ একটা অ্যালার্মের শব্দ শুনে রিরা ঘুম থেকে জেগে উঠল। মহাকাশযানে এই অ্যালার্মটি একটি বিপদসংকেত। একাডেমিতে তাদের অনেকবার শোনানো হয়েছে। রিরা লাফিয়ে বিছানা থেকে নেমে তার কাপড় পরতে শুরু করে, জরুরি অবস্থার জন্য আলাদা করে রাখা ব্যাকপেকটা পেছনে ঝুলিয়ে সে দ্রুত দরজা খুলে বের হয়ে এল। মহাকাশযানের অন্যরাও ছুটতে ছুটতে যাচ্ছে, রিরা ভয় পাওয়া গলায় কমবয়সী একজনকে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে জান? উহ জানি না। মানুষটি হাত দিয়ে পুরো ব্যাপারটি উড়িয়ে দেবার একটা ভঙ্গি করে বলল, আমার মনে হয় ড্রিল। ড্রিল? হ্যাঁ। মহাকাশযানে রওনা দেবার পর প্রথম প্রথম ইচ্ছে করে এরকম ড্রিল করানো হয়। রিরা ছুটতে ছুটতে মহাকাশযানের কন্ট্রোলরুমে হাজির হয়ে দেখতে পেল, সেখানে এর মাঝে অন্য সবাই পৌঁছে গেছে। ক্যাপ্টেন বৰ্কেন বড় মনিটরটির দিকে চিন্তিত মুখে তাকিয়ে আছেন। তিনি মনিটরটি বন্ধ করে মাথা ঘুরিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি অ্যালার্ম বাজিয়ে সবাইকে ডেকে এনেছি—যদিও তোমাদের মনে হতে পারে ডেকে আনার প্রয়োজন ছিল না। তোমাদের মনে হতে পারে এটি মোটেও মহাকাশযানের একটি জরুরি ঘটনা নয়। ক্যাপ্টেন বৰ্কেন চুপ করলেন এবং মধ্যবয়স্ক ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার লি জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে মহামান্য ক্যাপ্টেন? তোমরা সবাই জান আমরা আমাদের এই মহাকাশযানে করে সতের জন নীলমানকে বিজ্ঞান একাডেমিতে নিয়ে যাচ্ছি। তোমরা নিশ্চয়ই এটাও জান যে নীলমানবেরা এই মহাজগতের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ এবং সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণী। আমি যদি তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে শীতলঘরে করে নিতে পারতাম, তা হলে স্বস্তিবোধ করতাম। কিন্তু বিজ্ঞান একাডেমির বিশেষ নির্দেশে আমরা তাদেরকে একটা ঘরে বন্ধ করে মুক্ত অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছি। ক্যাপ্টেন বৰ্কেন একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, আমার একটি সন্দেই ছিল যে, এরা নিশ্চয়ই কোনোভাবে এখান থেকে নিজেদের মুক্ত করে মহাকাশযানটি দখল করার চেষ্টা করবে। ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার লি শঙ্কিত গলায় বললেন, তারা কি কিছু করেছে? আমার ধারণা প্রক্রিয়াটি তারা শুরু করেছে। উপস্থিত সবাই একসাথে চমকে উঠল। কমবয়সী একটা মেয়ে বলল, তারা কী করছে? ক্যাপ্টেন বৰ্কেন একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, কিছুক্ষণ আগে একজন নীলমানব তার হাতের কবজির ধমনিটা কেটে ফেলেছে। তার শরীর থেকে নীল রক্ত বের হয়ে আসছে। কিছুক্ষণের মাঝেই এই নীলমানবটি মারা যাবে। কমবয়সী মেয়েটা ছটফট করে বলল, কিন্তু এটা তো আত্মহত্যা। নীলমানবেরা নিজেরা আত্মহত্যা করে কেমন করে আমাদের মহাকাশযান দখল করবে? ক্যাপ্টেন বর্কেন একটু হাসার চেষ্টা করে বললেন, নীলমানবেরা, যে ঘরটিতে আছে, সেটা বলা যেতে পারে একটা দুর্ভেদ্য ঘর, তার ভেতরে কারো যাবার কিংবা বের হবার ব্যবস্থা নেই। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র দিয়ে তাদের খাবার দেওয়া হয়, তাদের বর্জ সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু এখন— ক্যাপ্টেন বৰ্কেন একটু থামলেন—সবার দিকে একনজর দেখে বললেন, কিন্তু এখন এই দুর্ভেদ্য ঘরের দরজা আমাদের খুলতে হবে। নীলমানবের মানুষ নয়—তাই যে নীলমানরটি তার হাতের কবজি কেটে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করছে, তাকে বাঁচানোর আমাদের কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু বিজ্ঞান একাডেমি এদেরকে জীবন্ত পেতে চায়। আমাদের এখন একে বাচাতে চেষ্টা করতে হবে। এবং সেজন্য এখন আমাদের এই ঘরের দরজা খুলে ঢুকতে হবে। মহাকাশযানের নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান ক্রুশ ভুরু কুঁচকে বললেন, মহামান্য ক্যাপ্টেন, আপনার ধারণা এই ঘরের দরজা খোলার জন্য নীলমানবটি আত্মহত্যা করেছে? আমার তা-ই ধারণা। তা হলে এর একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে। নীলমানবেরা সবাই মিলে এই পরিকল্পনাটি করেছে? হ্যাঁ। নীলমানব বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে না। তারা সব সময় একসাথে কাজ করে। এরা এক ধরনের সমন্বিত প্রাণসত্তা। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান ক্রুশ গম্ভীর মুখে বললেন, যদি তারা সত্যিই এটি পরিকল্পনা করে থাকে, তা হলে আমাদের সিকিউরিটি সিস্টেম সেটি জানবে। কারণ আমরা তাদের প্রত্যেকের প্রতিটি পদক্ষেপ মনিটর করছি। আমাদের সিকিউরিটি সিস্টেম কী বলছে? ক্যাপ্টেন বৰ্কেন বললেন, সেটাই হচ্ছে সমস্যা। আমাদের মহাকাশযানের মূল সিকিউরিটি প্রসেসর যে রিপোর্ট দিয়েছে, সেখানে কোথাও কোনো ধরনের পরিকল্পনার কথা নেই। কোনো ষড়যন্ত্র নেই। নীলমানবেরা হালকা কথাবার্তা বলেছে, দাবা জাতীয় একটা খেলা খেলে সময় কাটিয়েছে, গান করেছে এবং বেশিরভাগ সময়ে কিছু না করে চুপচাপ ছাদের দিকে তাকিয়ে শুয়ে থেকেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান ক্রুশ একটি নিশ্বাস ফেলে সহজ গলায় বললেন, মহামান্য বর্কেন, আমার মনে হয় আপনার সন্দেহটি অমূলক। নীলমানবের আত্মহত্যাটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আমাদের মহাকাশযান দখল করার প্রক্রিয়া এটা নয়। ক্যাপ্টেন বৰ্কেন কিছুক্ষণ ক্রুশের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, আমি সত্যিই চাই যে, তোমার ধারণা সত্যি প্রমাণিত হোক এবং আমি ভুল প্রমাণিত হই। কিন্তু– কিন্তু? ক্যাপ্টেন বৰ্কেন হাত দিয়ে বড় মনিটরের সুইচটা স্পর্শ করে সেটা অন করে দিলেন। নীলমানবদের ঘরের দৃশ্যটি মুহূর্তের মাঝে ফুটে উঠল। একজন নীলমান মেঝেতে নিথর হয়ে শুয়ে আছে। তার চোখ দুটো খোলা, ভান হাতটি অবসন্ন হয়ে পাশে পড়ে আছে। কবজির খানিকটা অংশ কাটা। সেখান থেকে রক্ত চুইয়ে চুইয়ে বের হয়ে শরীরের নিচে জড়ো হয়েছে। রক্তের রঙ নীল, এখন কালচে হয়ে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। তার মাথার কাছে একজন নীলমানব স্থির হয়ে বসে আছে–তার মুখ পাথরের মতো ভাবলেশহীন। দুজন মেঝেতে দুক কেটে রাখা ঘরের দু পাশে বসে খেলছে। তাদের পাশে আরো দুজন স্থির হয়ে বসে আছে। একজন করুণ বিষণ্ণ স্বরে গান। গাইছে। অন্যের দেয়ালে হেলান দিয়ে নিঃশব্দে বসে আছে। সমস্ত দৃশ্যটি একটি পরাবাস্তব দৃশ্যের মতো। ক্যাপ্টেন বৰ্কেন একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, আমি নীলমানদের বিশেষজ্ঞ নই কিন্তু তারপরও আমি বলতে পারি, এই দৃশ্যটি স্বাভাবিক নয়। এটি স্বাভাবিক হতে পারে না। একজন মানুষের মৃত্যুর সময়ে অন্যেরা এত নিস্পৃহ হতে পারে না। নীলমানব হলেও না। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান ক্রুশ বললেন, দৃশ্যটি অস্বাভাবিক হতে পারে মহামান্য ক্যাপ্টেন, কিন্তু এখানে তো কোনো ষড়যন্ত্রের আভাস নেই। ক্যাপ্টেন বনে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে ক্রুশের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর শান্ত গলায় বললেন, এই দৃশ্যটিতে ষড়যন্ত্রের কোনো আভাস নেই আমার ধারণা সেটাই হচ্ছে ষড়যন্ত্র। ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার লি বললেন, এই নীলমানবটিকে বাঁচানোর জন্য কী করা হবে মহামান্য ক্যাপ্টেন? ক্যাপ্টেন বৰ্কেন মনিটরটির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, প্রথমে ঘরটিতে নিথিলিয়াম গ্যাল দেওয়া হবে। গ্যাসের বিক্রিয়ায় সবাই অচেতন হয়ে যাবার পর নিরাপত্তাকর্মীরা ঘরটিতে ঢুকবে। কবজি কেটে যে নীলমানবটি আত্মহত্যা করার চেষ্টা করছে, তাকে বের করে আনা হবে চিকিৎসা করার জন্য। তাকে কি বাঁচানো সম্ভব হবে? জানি না। শুনেছি নীলমানদের প্রাণশক্তি আমাদের প্রাণশক্তি থেকে অনেক বেশি। হয়তো বেঁচে যেতেও পারে। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান ক্রুশ বললেন, আমরা তা হলে কাজ শুরু করে দিই? হ্যাঁ। শুরু করে দাও ক্যাপ্টেন বৰ্কেনকে হঠাৎ কেন জানি ক্লান্ত দেখায়, তিনি ঘুরে অন্য সবার দিকে তাকিয়ে বললেন, অ্যালার্মের শব্দ শুনে চলে আসার জন্য সবাইকে অনেক ধন্যবাদ। আমি সবাইকে সবকিছু জানিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম, যেন হঠাৎ করে আমরা আক্রান্ত হয়ে না পড়ি। কমবয়সী মেয়েটি বলল, কিন্তু আমাদের তো এখন আক্রান্ত হবার কোনো আশঙ্কা নেই—তাই না? ক্যাপ্টেন বৰ্কেন কোনো কথা না বলে অন্যমনস্কভাবে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান ক্রুশ মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললেন, না, কোনো আশঙ্কা নেই। এখন আপনারা সবাই নিজেদের কেবিনে কিংবা নিজেদের স্টেশনে ফিরে যেতে পারেন। ক্রুশ মাথা ঘুরিয়ে অন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার কমান্ডে যারা আছ, তারা আমার সাথে এস। সবাই নিজেদের অস্ত্রগুলো লোড করে বেখ। । মহাকাশচারীরা একজন একজন করে কন্ট্রোলরুম থেকে বের হয়ে যেতে শুরু করার পর ক্যাপ্টেন বৰ্কেন মনিটরের সামনে বড় চেয়ারটিতে বসলেন। হাত বাড়িয়ে সুইচ টিপে মনিটরটি চালু করে কার্গো বেতে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তাকর্মীদের দেখতে দেখতে অন্যমনস্কভাবে হাত দিয়ে টেবিলে শব্দ করতে লাগলেন। মহামান্য ক্যাপ্টেন— গলার স্বর শুনে ক্যাপ্টেন বৰ্কেন মাথা ঘুরিয়ে দেখলেন রিরা তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাপ্টেন বৰ্কেন হালকা গলায় বললেন, কী ব্যাপার রিরা? আমি কি আপনার সাথে এখানে কিছুক্ষণ থাকতে পারি? এখানে থাকতে চাও? জি মহামান্য ক্যাপ্টেন। কেন? রিরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিচু গলায় বলল, আমাদের একাডেমিতে কয়েকটা কেস স্টাডি পড়ানো হয়েছিল, তার ভেতরে আপনার দুটো অভিযানের ঘটনা ছিল। আমি সেগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে বিশ্লেষণ করেছি। আমার মনে হয়েছে, কিছু কিছু বিষয়ে আপনার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আছে। গ্রিন গ্রহপুঞ্জে আপনি যেভাবে বিপদের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। সেটি রীতিমতো অলৌকিক।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৩৬৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ জিজের পরিচিতরা যে কারণে প্রিয় (পর্ব-১)
→ অবনীল(পর্ব-৮)
→ অবনীল(পর্ব-৭)
→ অবনীল(পর্ব-৬)
→ অবনীল(পর্ব-৫)
→ আমি শুধু তোমারই (পর্ব-১)
→ অবনীল(পর্ব-৪)
→ অবনীল(পর্ব-৩)
→ অবনীল(পর্ব-২)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...