গল্পেরঝুড়ির এ্যাপ ডাউনলোড করুন - get google app
গল্পেরঝুড়ি ফানবক্স ! এখন গল্পের সাথেও মজাও হবে! কুইজ খেলুন , অংক কষুন , বাড়িয়ে নিন আপনার দক্ষতা জিতে নিন রেওয়ার্ড !

যারা একটি গল্পে অযাচিত কমেন্ট করছেন তারা অবস্যাই আমাদের দৃষ্টিতে আছেন ... পয়েন্ট বাড়াতে শুধু শুধু কমেন্ট করবেন না ... অনেকে হয়ত ভুলে গিয়েছেন পয়েন্ট এর পাশাপাশি ডিমেরিট পয়েন্ট নামক একটা বিষয় ও রয়েছে ... একটি ডিমেরিট পয়েন্ট হলে তার পয়েন্টের ২৫% নষ্ট হয়ে যাবে এবং তারপর ৫০% ৭৫% কেটে নেওয়া হবে... তাই শুধু শুধু একই কমেন্ট বারবার করবেন না... ধন্যবাদ...

সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান... জিজেতে আজে বাজে কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন ... অন্যথায় আপনার আইডি বা কমেন্ট ব্লক করা হবে... আর গল্প দেওয়ার ক্ষেত্রে গল্প দেওয়ার নিয়ম মেনে চলুন ... সার্বিকভাবে জিজের নীতিমালা মেনে চলার চেস্টা করুন ...

একটি দ্বীপের সন্ধানে

"গোয়েন্দা কাহিনি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Md Jahid (১৫৭ পয়েন্ট)



সাইমুম সিরিজ একটি দ্বীপের সন্ধানে {সকল পর্ব} আবুল আসাদ ১ আহমদ মুসা কফির কাপে চুমুক দিতে যাচ্ছিল। আহমদ আবদুল্লাহ ছুটে এসে আহমদ মুসার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ঝাঁকুনি লেগে কিছুটা কফি পড়ে গেল আহমদ মুসার শার্টে। আহমদ মুসার এপাশে বসে জোসেফাইনও কফি পান করছিল। তার মুখে বিরক্তির চিহ্ন ফুটে উঠেছে। তাকিয়েছে সে আহমদ আবদুল্লাহর দিকে। বলল একটু শক্ত কন্ঠে, ‘আহমদ আবদুল্লাহ! তোমার কাছে এমনটা আশা করিনি।’ কাপ থেকে কফি পড়ে যাওয়ায় আহমদ আবদুল্লাহ এমনিতেই অপরাধবোধ নিয়ে থমকে গিয়েছিল। তার উপর মায়ের বকুনি খেয়ে কেঁদে ফেলল। মায়ের এ ধরনের বকুনি তার কাছে নতুন। আহমদ মুসা কফির কাপ পিরিচে রেখে আহমদ আবদুল্লাহকে টেনে নিল কোলে। বলল, ‘না বেটা, তোমার আম্মা তোমাকে বকেনি। উপদেশ দিয়েছে। মা তো ছেলেকে উপদেশ দেবেই।’ জোসেফাইন হাসল। আহমদ আবদুল্লাহর মাথায় হাত বুলিয়ে তার চোখ মুছে দিয়ে আদর করে বলল, ‘খুব ভালো ছেলে তুমি।’ দরজায় নক করে একটু পরে ড্রইংরুমে প্রবেশ করল আয়া। ট্রেতে কফির দু’টি কাপ তুলে নিতে নিতে আহমদ আবদুল্লাহকে বলল, ‘আহমদ আবদুল্লাহ, তুমি চলে এসেছ, আমাদের খেলা এখনো তো শেষ হয়নি!’ আহমদ আবদুল্লাহ আহমদ মুসার কোল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ওহ! গুড আন্টি।’ বলেই ছুটে গেল আয়ার দিকে। ওরা চলে গেল ভেতরে। আহমদ মুসা উঠে গিয়ে স্ট্যান্ড থেকে কয়েকটা দৈনিক পত্রিকা ও ম্যাগাজিন নিয়ে এসে টি-টেবিলে রেখে বসল সোফায়। বলল, ‘আজকের কাগজগুলো দেখেছ জোসেফাইন?’ জোসেফাইন টি-টেবিল থেকে একটা ম্যাগাজিন তুলে নিয়ে বলল, ‘দৈনিক পত্রিকা আমি তোমার পরে পড়ি। এতে তোমার কাছে শোনার পর আমার কম পড়লেই চলে।’ হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘সময় ও পরিশ্রম কমানোর সুন্দর কৌশল তোমার। ধন্যবাদ জোসেফাইন।’ ‘এসব হিসেব তোমার কাছ থেকেই শেখা জনাব।’ বলল জোসেফাইন হাসির সাথে। আহমদ মুসা একটা ইংরেজি দৈনিক খুলে পাতায় চোখ বুলাতে বুলাতে বলল, ‘তোমার সময়ের সেভিংটা কোন দিকে যাচ্ছে?’ ‘যে দিকে সব মেয়ের যায়।’ বলল জোসেফাইন। ‘মানে সংসার, কিন্তু তুমি তো সব মেয়ের মত নও।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আমি সব মেয়ের মত নই। তবে যাদের সংসার আছে, আমি সেই মেয়েদের মতই।’ বলল জোসেফাইন। ‘তুমি মারিয়া জোসেফাইন। ফরাসি রাজকণ্যা। দুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সব ব্যাপারে আপ-টু-ডেট। তুমি সংসারের চার দেয়ালের মধ্যে থাকবে, এটা আমকে বিশ্বাস করতে বল?’ কাগজ থেকে মুখ তুলে মিষ্টি হেসে বলল আহমদ মুসা। ‘পৃথিবীর মধ্যে যেমন সংসারের চার দেয়াল, তেমনি সংসারের চার দেয়ালের মধ্যে পৃথিবী থাকতে পারে।’ বলল জোসেফাইন। ‘যাক, আমি আশ্বস্ত হলাম। ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম বাইরে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে কিনা? ধন্যবাদ জোসেফাইন।’ আহমদ মুসা বলল। ‘বিশ্বাসটা অত দুর্বল হয়ে পড়েছিল কেন?’ বলল জোসেফাইন। ‘বিশ্বাস দুর্বল হয়নি, একটু ভয় ঢুকেছিল মাত্র।’ আহমদ মুসা বলল। ‘কেন?’ জিজ্ঞাসা জোসেফাইনের। ‘বাচ্চা পাওয়ার পর মেয়েরা কনজারভেটিড হয়। বাচ্চার স্বার্থ মানে সংসারের স্বার্থের ব্যাপারে বেশি সচেতন হয় তারা।’ আহমদ মুসা বলল। ‘এটা কি খারাপ, যদি তা অন্যের ন্যায্য স্বার্থের কোন হানি না ঘটায়?’ হাতের ম্যাগাজিনটা বন্ধ করল জোসেফাইন। ‘অবশ্যই খারাপ নয়। তবে পৃথিবী কোন না কোন উপকার থেকে বঞ্চিত হতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আমি তো বলেছি, সংসারের স্বার্থ ও পৃথিবীর স্বার্থ সাংঘর্ষিক নয়, যদি ভারসাম্য রাখা হয়।’ জোসেফাইন বলল। ‘ধন্যাবাদ!’ বলে আহমদ মুসা একটু ঝুঁকে জোসেফাইনের একটা হাত হাতে নিয়ে জোসেফাইনকে কাছে টেনে নিতে চাইল। জোসেফাইন দ্রুত নিজের হাত খুলে নিয়ে একটু সরে বসে হেসে বলল, ‘না জনাব, অন্য চিন্তা বাদ! ১০টার সময় তোমার এ্যাপয়েন্টমেন্ট সৌদি পুলিশ প্রধানের সাথে। পত্রিকা পড়ার জন্যে এখন যথেষ্ট সময় নেই।’ ‘অনেক ধন্যবাদ! ’ বলল আহমেদ মুসা। হাতের দৈনিকটির দিকে মনোযোগ দিতেই একটা সিংগল কলাম বক্স নিউজের উপর চোখ দু’টো আটকে গেল আহমদ মুসার। নিউজটার হেডিং ‘প্রতিভাধর ব্যক্তিদের নিখোঁজ হওয়ার উদ্বেগজনক রহস্য।’ খবরটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পদার্থ বিজ্ঞানের বেসরকারি বিখ্যাত ল্যাবরেটরি ‘সায়েন্স টুমরো’- এর এন্টিম্যাটার বিজ্ঞানী ড. ওমর আবদুল্লাহর দু’দিন আগে নিখোঁজ হবার তথ্য দিয়ে বলেছে, শুধু গত এক মাসেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আরও পাঁচজন প্রতিভাধর ব্যাক্তি নিখোঁজ হয়েছেন। এদের মধ্যে তিনজন পদার্থ বিজ্ঞানী, একজন জেনেটিক বিজ্ঞানী ও একজন মেরিন বিজ্ঞানী। ভ্রু কুঁচকালো আহমদ মুসা। উদ্বেগ ফুটে উঠল আহমদ মুসার চোখে-মুখে। মাত্র এক মাসে ছয়জন নিখোঁজ। পত্রিকার উপর থেকে মুখ তুলে জোসেফাইনের দিকে তাকিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘জোসেফাইন, সেই দু:সংবাদের খবর আবার।’ ‘কি খবর?’ জিজ্ঞাসা জোসেফাইন। ‘আর একজন বিজ্ঞানীর নিখোঁজের খবর।’ ‘এই মাসেই ৬জন বিজ্ঞানী প্রতিভা নিখোঁজ হলেন জোসেফাইন।’ বলল আহমদ মুসা। ‘এই ইন্টেলিজেন্স ম্যাগাজিনেও দেখছি এ ব্যাপারে নিউজ আছে।’ ‘কি আছে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘ঐ ধরনের নিখোঁজ সংবাদ। আরও বিস্তারিত।’ ভ্রু কুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। বলল, ‘বল তো কি আছে নিউজে?’ গোটা নিউজের উপর চোখ বুলাল জোসেফাইন। বলল, ‘গত এক বছরে নিখোঁজ হওয়ার হিসাব দেয়া হয়েছে এই নিউজে, সেই সাথে কিছু বিশ্লেষণও দেয়া হয়েছে এই নিউজে। ৫১ জন বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞ প্রতিভা গত এক বছরে নিখোঁজ হয়েছেন। এদের মধ্যে ২১ জন পদার্থ বিজ্ঞানী। পদার্থ বিজ্ঞানীদের মধ্যে এন্টিম্যাটার বিজ্ঞানী ১১জন, কণাবিজ্ঞানী ৭ জন এবং ৩ জন মেরিন বিজ্ঞানী। এই ২১ জন ছাড়া অবশিষ্ট ৩০ জনের মধ্যে রয়েছেন ইতিহাস, অর্থনীতি, ভূগোল, রসায়ন জীব-বিজ্ঞান, গণিত প্রভৃতি বিষয়ের বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী এবং আরও রয়েছেন কয়েকজন প্রতিভাবান রাজনীতিক। নিউজে আরেকটা বিশ্লেষণও দেয়া হয়েছে। সেটা ধর্মীয় পরিচয়মূলক। গত এক বছরে মোট ৫১ জন নিখোঁজ ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ৪৫ জনই মুসলিম। সবশেষে নিউজে লেখা হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নিখোঁজ এই বিজ্ঞানীদের কারোরই খোঁজ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি ইন্টারপোলও টেক-আপ করেছে, কিন্তু কোন ফল হয়নি। কারও হদিস মেলেনি। এটা যে সংঘবদ্ধ একটা অপরাধ এ বিষয়ে কারোরই আর কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এই সংঘবদ্ধ চক্র কে তাও জানা যায়নি। দু’একটা নাম জানা গেলেও তাদের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি।’ থামল জোসেফাইন। আহমদ মুসার চোখে-মুখে গভীর বেদনা ও অস্বস্তির চিহ্ন। বলল, ‘তাহলে যা আশঙ্কা করা হয়েছিল তাই। মুসলিম বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের বিরুদ্ধেই এ অভিযান।’ বলল জোসেফাইন, ‘কেন, অমুসলিম বিজ্ঞানীও তো আছেন কয় জন।’ ‘আছেন কয়েকজন। সেটা নিশ্চয় ক্যামোফ্লেজের জন্যে। যারাই এই অপরাধমুলক কাজের পেছনে থাক, বিজ্ঞানী-বিশেষজ্ঞদের নিখোঁজ করাই যদি তাদের লক্ষ্য হতো, তাহলে এত মুসলিম বিজ্ঞানী-বিশেষজ্ঞ নিখোঁজ হবার কথা নয়।’ আহমদ মুসা বলল। ‘কেন?’ প্রশ্ন জোসেফাইনের। ‘কারণ এই মানের বিজ্ঞানী অন্য সম্প্রদায়ের মধ্যে আরও বেশি পরিমাণে আছে। এদিক থেকে চোখ একতরফাভাবে মুসলিম বিশেষজ্ঞদের প্রতি যাবার কথা নয়।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ঠিক। তাহলে কি টার্গেট মুসলিম বিজ্ঞানী-বিশেষজ্ঞরা? দেখা যাচ্ছে শুধু বিজ্ঞানী-বিশেষজ্ঞ ব্যাক্তিরাই নয়, প্রতিভাবন মুসলিম রাজনীতিকও তাদের টার্গেট। এর অর্থ কি? বিষয়টি আমার কাছে খুব গোলমেলে লাগছে।’ বলল জোসেফাইন। ‘ঠিক বলেছ জোসেফাইন। মোটিভটা খুব সরল নয়। বিজ্ঞানীদের সাথে সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনীতিকরাও নিখোঁজ হওয়া উদ্বেগজনক।’ আহমদ মুসা বলল। ‘কি সেটা?’ জিজ্ঞাসা জোসেফাইনের। ‘অত্যন্ত কৌশলে একটা সম্প্রদায়কে ধীরে ধীরে মেধাশূণ্য করার ভয়াবহ একটা ষড়যন্ত্র।’ আহমদ মুসা বলল। চমকে উঠল জোসেফাইন। সামনে থেকে পর্দা সরে গেলে যা হয় তেমনি তার কাছে সব পরিষ্কার হয়ে গেল। কেঁপে উঠল তার মন। ‘গত এক বছরেই ৫১ জন বিজ্ঞানী-বিশেষজ্ঞ! পরিস্থিতি ভয়াবহ!’ বলল জোসেফাইন। ‘সত্যিই এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্র এটা! এর বিস্তারও দেখছি গোটা দুনিয়াব্যাপী।’ ‘হ্যাঁ জোসেফাইন, নিখোঁজের স্পট ছড়িয়ে আছে গোটা দুনিয়ায়। তার মানে গোটা দুনিয়া এদের নেট ওয়ার্কের আওতায়।’ বলল আহমদ মুসা। জোসেফাইন উঠে গিয়ে আহমদ মুসার পাশে তার গা ঘেঁষে বসল। বলল, ‘কেসটা তুমি নিচ্ছ।’ ‘নিচ্ছি নয়, কে দেবে এ কেস আমাকে? এর তো কোন বাদী নেই। পৃথিবীর মানুষ, মানবতা এর বাদী। কিন্তু মানুষ ও মানবতার কোন মুখপাত্র নেই। মানব জাতির একজন সদস্য হিসাবে আমি, তুমিই এর বাদি। আমাদের পক্ষ থেকেই আমি এ কেস গ্রহণ করেছি।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ধন্যবাদ। আল্লাহ সাহায্য করুন! এ এক অন্ধকারে ঢাকা কঠিন পথ তোমার।’ বলল জোসেফাইন। ‘ঠিক জোসেফাইন। একবারেই অন্ধকারে ঢাকা পথটা। একটা সন্ত্রাসী সংগঠনের নাম মাত্র শুনেছি। এর বাইরে আর কিছু অবলম্বন হাতে নেই। সন্ত্রাসী সংগঠনটির নামটাও অদ্ভূত: “ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট”। সেদিন সৌদি পুলিশ হেডকোয়ার্টারে গিয়েছিলাম। ওদের রেকর্ডে এমন কোন সংগঠনের নাম নেই। সৌদি পুলিশ প্রধান পরে কথা বলেছেন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই ও বৃটেনের এস-১০ এর প্রধানদের সাথে। তারাও জানিয়েছেন, এ ধরনের কোন ওয়ার্কিং সন্ত্রাসী সংগঠন বা গোপন কোন সংস্থার নাম তাদের রেকর্ডে নেই। এই বিষয়টিই আমাকে খুব বেশি বিস্মিত করেছে। তাদের নজরের বাইরে কোন সন্ত্রাসী সংগঠন বিশ্ব জুড়ে কাজ করছে, এটা অবিশ্বাস্য।’ ভাবছিল জোসেফাইন। আহমদ মুসার কথা শেষ হলেও কথা বলল না জোসেফাইন। কিছু একটা খোঁজার চিহ্ন তার চোখে-মুখে। হঠাৎ তার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘একটা মজার নামের মিলের কথা তোমাকে বলি। সায়েন্স ফিকশনে আমি “ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট”- এর নাম পড়েছি। সেই নামের সাথে এই গোপন সংগঠনের নাম কিন্তু একদম মিলে যায়!’ আহমদ মুসার চোখে-মুখে বিস্ময় নেমে এল! সেই সাতে প্রচন্ড উচ্ছাসে তার মুখ ফেঁড়েই যেন বেরিয়ে এল প্রশ্ন, ‘আশ্চর্য, একই নাম, ব্লাক সান সিন্ডিকেট!’ ‘হ্যাঁ, ব্ল্যাক সান সিন্ডিককেট।’ বলল জোসেফাইন। কপাল কুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। ‘সায়েন্স ফিকশনের মত সংগঠন এটা?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘সন্ত্রাসবাদী সংগঠন। অত্যান্ত পাওয়ারফুল। এর ক্ষমতার বিস্তার ছিল আমাদের গোটা ছায়াপথ-গ্যালাক্সি জুড়ে।’ বলল জোসেফাইন। ‘মজার ব্যাপার তো! এদের পরিচয় সম্পর্কে আর কি আছে সায়েন্স ফিকশনে?’ আহমদ মুসা বলল। ‘ওদের কথা তোমার কোন কাজে আসবে? ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট আমাদের ছায়াপথ-গ্যালাক্সির বিভিন্ন গ্যালাকটিক কিংডমগুলোতে সন্ত্রাস, কালোবাজারি ইত্যাদিসহ এমন কোন অপরাধ নেই যার সাথে তারা জড়িত ছিল না। তাদের উপস্থিতি, প্রভাব-প্রতিপত্তির অধীনে ছিল প্রায় গোটা গ্যালাক্সির গ্যালাকটিক রাজ্যসমূহ। ছায়াপথ-গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় সরকারেএ সিনিয়র দু’জন সামরিক অফিসার, ডারথ সিডিয়াম ও ডারথ মাউল, ব্লাক সান সিন্ডিকেট সম্পর্কে বলেছেন, এটা বিশাল এক ক্রিমিনাল সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের প্রভাব-প্রতিপত্তি পৃথিবীর সমূহ অঞ্চল থেকে শুরু করে গ্যালাক্সির প্রান্ত পর্যন্ত সব গ্রহে পরিব্যাপ্ত। যে সম্পদ এদের হাতে আছে, তা সীমাহীন। এদের সৈন্য আছে লাখ লাখ। গ্যালাক্সির সাধারন বাসিন্দাদের মতে এই সিন্ডিকেট জানা মহাবিশ্বের অত্যান্ত ক্ষমতাধর সংগঠন। সায়েন্স ফিকশনে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের অনেক উত্থান-পতনের কথাও বলা হয়েছে। খৃস্টের জন্মের প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে তাদের উত্থান। আর খৃষ্টপূর্ব ৩৩ বছর আগে তাদের মধ্যৈ ভাঙ্গন আসে। দু’বছরের মধ্যেই আবার সামলে ওঠে। ২৪ খৃষ্টাব্দে আবার ভেঙে পড়ে। কিন্তু পূর্ণ শক্তি ফিরে পায় আবার ১২৭ খৃষ্টাব্দের দিকে। গোটা গ্যালাক্সির রাজ্য-সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনে, সংঘাত-সংকটে এই সিন্ডিকেট বড় ভূমিকা পালন করেছে। সকল বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার সামর্থ্য ওদের দেখা গেছে।’ থামল জোসেফাইন। ‘চমৎকার জোসেফাইন। চমৎকার কাহিনী ব্লাক সান সিন্ডিকেটের। নিশ্চয় আমাদের ব্লাক সান সিন্ডিকেট ছায়াপথ-গ্যালাক্সির আকাশচারী সন্ত্রাসী সংগঠনের নাম কপি করেছে। কেন করেছে? একথা জানান দেয়ার জন্যে কি যে, আন্ত:গ্রহ সংগঠন ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের মতই তারা ক্ষমতাধর?’ বলে একটু থেমেই আবার শুরু করল, ‘আচ্ছা, জোসেফাইন, কাহিনীর ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের প্রধান কাজটা কি ছিল?’ জোসেফাইন একটু ভেবে বলল, ‘তাদের সন্ত্রাস-দুর্নীতির আসল লক্ষ ছিল, আকাশ-রাজ্যের রাজ্যগুলোকে দুর্বল বা ধ্বংস করে নিজের রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।’ ‘তাহলে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের আসল লক্ষ রাজনৈতিক। কিন্তু সেই রাজনৈতিক লক্ষটা কি? বিজ্ঞানী-বিশেষজ্ঞদের অপহরণ করানোর সাথে সে লক্ষের সম্পর্ক কি? স্বগতকন্ঠে বলল আহমদ মুসা। ‘এটা বলা মুশকিল। সায়েন্স ফিকশনের ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট গেরিলাদের মত কাজ সব গোপনে করলেও সংগঠনটি গোপন ছিল না এবং কাজের ফলও প্রকাশ্যে ভোগ করতো। কিন্তু বাস্তবে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট সংগঠন হিসাবেও গোপন, তাদের কাজও গোপন। সুতরাং তাদের লক্ষ কি বলা মুশকিলই। রাজনৈতিক লক্ষ হলে তো তার জন্যে জনসমর্থন দরকার হয়। কিন্তু গোপন সংগঠন কাজ করে জনগণের সাথে পরিচিত হবে কি করে, জনসমর্থন পাবে কি করে? এ বিষয়টাই আমি বুঝতে পারছি না।’ বলল জোসেফাইন। ‘নিশ্চয় ওদের একটা রাজনৈতিক লক্ষ আছে এবং সে লক্ষ অর্জনে ওদের রোড ম্যাপও নিশ্চয় আছে। সেটা জানাও দরকার। কিন্তু এই মুহুর্তে এটা খুব বিষয় নয়। ওদের সন্ধান পাওয়ার বিষয়টিই এখন বড়। আমাদের মনোযোগটা সেদিকেই আকৃষ্ট করবো।’ কথা শেষ করে একটু থেমেই আহমদ মুসা আবার বলল, ‘আচ্ছা জোসেফাইন, সায়েন্স ফিকশনের ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের প্রধান চরিত্রে কারা? তাদের তার কি কাজ ছিল, মনে আছে তোমার?’ ‘কিছু তো মনে আছেই। আমাদের ছায়াপথ-গ্যালাক্সির কোটি কোটি তারকা ও গ্রহ রাজ্য নিয়ে যে গ্যালাকটিক সাম্রাজ্য তার সম্রাট পালপেটাইন ও এই রিপাবলিকেরর সবচেয়ে প্রভাবশালী স্কাই কমোন্ডো-কমান্ডার ডারথ তাদের। এই গ্যালাকটিক রিপাবলিক জুড়েই প্রতিদ্বন্দী কমান্ডো শক্তি হলো ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট। গ্যালাকটিক সাম্রাজ্যে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট কবে থেকে কাজ শুরু করে তার কোন তথ্য ফিকশনে নেই। ছায়াপথ গ্যালাকটিক সাম্রাজ্যে রিপাবলিক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় থেকে মহাকাশ বর্ষ (BY-birth year) গণনা শুরু হয়। সায়েন্স ফিকশনে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের প্রধান হিসেবে যার নাম প্রথম এসেছে, তিনি আলেক্সি গ্যারিন। তিনি BBY (befor birth year) অর্থ্যাৎ মহাকাশ বর্ষ-পূর্ব ৩৩ অব্দে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের প্রধান ছিলেন। তার নেত্বেত্বে গোটা ছায়াপথ-গ্যালাক্সি জুড়ে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু গ্যালাকটিক সাম্রাজ্যের প্রেসিডেন্টের নিয়োজিত কমান্ডো নেতা ডারথ মাউল ও তার বাহিনীর হাতে আলেক্সি গ্যারিন ও তার ভিগোজ বা গভর্নররা নিহত হন। এরপর ব্ল্যাক সান সিন্ডিকে্ট তার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া ও হারানো প্রভাব পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে অনেকগুলো সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এই সময় গ্যালাকটিক সাম্র্যজ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। গৃহযুদ্ধের সুযোগে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট গ্যালাক্সি জুড়ে তার প্রভাব প্রতিষ্টার কাজে ব্রতী হয়। সময়টা মহাকাশ বর্ষ (ABY2) দ্বিতীয় অব্দের পরের ঘটনা। ডেল পারহি ছিলেন ব্ল্যাক সানের নেতা এ সময়। তাকে সরিয়ে দিয়ে ব্ল্যাক সানের ক্যাপ্টেন ফলিন গ্রহ-রাজ্যের প্রিন্স জিজর ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের ক্ষমতায় বসেন। প্রিন্স জিজরের নেতৃত্বে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের প্রভাব সর্বোচ্চে উন্নীত হয় এবং প্রিন্স জিজর গ্যালাকটিক রিপাবলিকের প্রেসিডেন্ট পালমেটাইন ও তাঁর প্রধান সেনাপতি কমান্ডো নেতা ডারথ ভাদেরের পরে তৃতীয় প্রভাবশালী ব্যাক্তিতে পরিণত হয়। প্রিন্সের বডিগার্ড ও ব্যাক্তিগত কমান্ডো গৌরী ছায়াপত সাম্রাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী মহিলায় পরিণত হয়। অবশেষে ডারথ ভাদেরের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়লে প্রিন্স জিজরের এলাকারই এক কক্ষপথে এক সংঘর্ষে ডারথ ভাদেরের ব্যাক্তিগত আকাশযান এক্সিকিউটর প্রিন্স জিজরের ব্যক্তিগত আকাশযান স্কাইলুককে প্রিন্স জিজরসহ ধ্বংস করে দেয়। আর এই সময়েই ভাদেরের ছেলে স্কাই ওয়াকার তার কমান্ডো বাহিনী নিয়ে প্রিন্স জিজরের প্রাসাদ ও হেডকোয়ার্টার ধ্বংস করে দেয়। ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের আর একবার পতন ঘটে। নতুন নতুন নেতৃত্ব ব্ল্যাক সানকে প্রভাব-প্রতিপত্তির আগের জায়গায় নিয়ে আসার চেষ্ঠা করে, যাদের একজন প্রিন্স জিজরের ভ্রাতুষ্পুত্র সাভান ও আরেকজন হলেন জোডি ডেক। অবশেষে একটা বড় বিপদ ব্ল্যাক সানকে উত্থানের সুযোগ করে দেয়। গ্যালাকটিক সাম্রাজ্যের সম্রাট ব্ল্যাক সানকে সমূলে উচ্ছেদ করতে চাইলেন। এজন্য তিনি কেসেল গ্রহের জেল কলোনি থেকে ভয়ংকর ব্যাগ স্কোয়াড্রনসহ সব ক্রিমিনালকে ছেড়ে দিয়ে ব্ল্যাক সানের হেডকোয়ার্টার গ্রহ কুরুস্ক্যান্টে ঢুকিয়ে দিলেন। সেই সাথে তাদের সংগে অনুপ্রবেশ ঘটান সাম্রাজ্যের গোয়েন্দাদের যারা ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের উৎখাত সম্পূর্ন করবে। কিন্তু গ্যালাকটিক সম্রাট বিপরীত ফল ফলাল। জেল থেকে ছাড়া পাওয়া জেকা থাইন ও মফ ফ্লেরীর মত ভয়ংকর ক্রিমিনালরা ব্ল্যাক সান সিন্ডিককেটের পুনরুজ্জীবন ঘটাল। ইউল আসিব-এর নেতৃত্বে ব্ল্যাক সান, এমনকি সম্রাটের রুলিং কাউন্সিল নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্ঠা করল। ব্যর্থ হলেও সেথ্রোস-এর নেতৃত্বে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট গোটা ছায়াপথ-গ্যালাক্সি ও গ্যালাক্সির গুরুত্বপূর্ণ লোকেশনে পৌছে যায়। কিন্তু এক সময় বিপদ নামে আবার তাদের উপর। গ্যালাকটিক সাম্র্যজ্যের বাহিনীর কাছে তারা পরজিত হয়। নিহত ও গ্রেফতার হয় ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের হাজার হাজার কমান্ডো। কিন্তু গ্যালাকটিক সাম্রাজ্যের ক্ষমতার লড়াই নিয়ে গৃহযুদ্ধের সুযোগে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট আবার সংগঠিত হয় এবং তাদের ক্ষমতা ফিরে পায়। কিন্তু বহু শতাব্দীর নীতি-পদ্ধতি পরিত্যাগ করে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট প্রকাশ্য সংগঠনে রূপ নিয়েছে। তাদের অফিস ও মহাকাশযানে এখন তাদের পতাকা ওড়ে। কিন্তু অপরাধমূলক কাজ তারা পরিত্যাগ করেনি। তবে তাদের প্রধান তৎপরতা এখন ছায়াপথ-গ্যালাক্সির আউটার স্পেসে। ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের অন্যান্য প্রধান চরিত্রের মধ্যে রয়েছে জাল সান, জারা, জিলাস, মেদিন, গ্রান্ট, টাইরেলি, নাশকা, নিলান্না ক্রিনিন। এরা সবাই আঞ্চলিক গভর্নর পর্যায়ের। বিখ্যাত কমান্ডো যারা নেতাদের সিকিউরিটি হিসাবে কাজ করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছে ইভা, উইবো, জুটি। আর গৌরীর কথা তো আগেই বলেছি।’ থামল জোসেফাইন। ‘ধন্যবাদ জোসেফাইন। ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের এক কথা, এত নাম তোমার এভাবে মনে আছে! অনেক ধন্যবাদ তোমাকে।’ থামল একটু আহমদ মুসা। থেমেই আবার শুরু করল, ‘তাহলে দেখা যাচ্ছে জোসেফাইন, ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট নিছক ক্রিমিনাল অর্গানাইজেসন নয়। ছায়াপথ সাম্রাজ্য দখলও তার লক্ষের মধ্যে রয়েছে।’ ‘হ্যাঁ, তারা সাম্রাজ্যের রুলিং কাউন্সিল দখলেরও চেষ্টা করেছে। কিন্তু বলা মুশকিল ক্রাইম তাদের টার্গেট, না ক্ষমতা তাদের টার্গেট।’ বলল জোসেফাইন। ‘এটাই আসল কথা। আমার মনে হচ্ছে, নিছক ক্ষমতা তাদের টার্গেট নয়, ক্ষমতা তাদের কাছে বাড়তি উপলক্ষ। আসল টার্গেট তাদের অপরাধ-সাম্রাজ্যের নেতৃত্ব।’ বলল আহমদ মুসা। ‘ঠিক বলেছ। কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতার নেতৃত্ব থেকে ওদের অপরাধ-সাম্রাজ্যের নেতৃত্ব বড় হলো কেন?’ জিজ্ঞাসা জোসেফাইনের। ‘রাষ্ট্র একটা আইনের অধীন হয়, সরকারকেও আইন মেনে চলতে হয়। আর অপরাধ-সাম্রাজ্যের নেতাদের কথাই আইন, তারাই সব কিছুর নিয়ন্ত্রক। এটা এক ধরনের পাপ। পাপ মানুষকে ঐ বিকৃতির দিকে নিয়ে যায়। আহমদ মুসা বলল। ‘বুঝেছি, কাহিনীর এটাই স্বাভাবিক পরিণতি। ছোট পাপ বড় পাপ করায়। বড় পাপ মানুষকে অমানুষ বানায়। এই অমানুষরা অপরাধের সাম্রজ্যে গড়ে তোলে। যেমন ছায়াপথ সাম্রজ্যের ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট।’ থামল জোসেফাইন। একটু ভাবল। তাকাল আহমদ মুসার দিকে। আবার বলে উঠল, ‘ছায়াপথের ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের কথা শুনলে, কি উপকার হলো তোমার? কি ভাবছ দুনিয়ার ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট নিয়ে?’ ‘ভাবছি এই ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট এই নাম গ্রহণ করর কেন? ছায়াপথ সাম্রাজ্যের ব্ল্যাক সিন্ডিকেটের কোন জিনিসটা এদের ভাল লেগেছে? গ্যালাকটিক সাম্রাজ্যে ওরা যে সব অপরাধ করতো, সে সবের সাথে এদের অপরাধের মিল নেই। আন্ত:গ্রহ ও তারকালোকের ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট প্রতিপক্ষ হিসেবে ছায়াপথ-রাষ্ট্রের সরকারি বাহিনীর সাথে অবিরাম সংঘাতে লিপ্ত ছিল, কিন্তু ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট কোন দেশের সরকারের সাথে কোন প্রকার সংঘাতে নেই। গ্যালাকটিক রাজ্যের ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট একটা নির্দিষ্ট ও তার নিয়ন্ত্রিত এলাকায় তাদের হেড-কোয়ার্টার স্থাপন করেছিল এবং ছায়াপথ গ্যালাক্সিতে তাদেরর নিয়ন্ত্রিত বহু এলাকা ছিল। কিন্তু এই ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের এ রকম কিছু আছে বলে মনে হচ্ছে না, আর কোন দেশে তাদের পক্ষে এমন একটা নিয়ন্ত্রিত এলাকা স্থাপন সম্ভব নয়। ভারতে মাওবাদীদের নিয়ন্ত্রিত বিশাল এলাকা আছে সত্য, কিন্তু মাওবাদীরা এই ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের মত সংগঠন নয়। মাওবাদীরা জনগণেরর ইস্যু নিয়ে জনগণকে সাথে নিয়ে তাদের যুদ্ধ চালাচ্ছে। আর ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট তাদের গোপন এজেন্ডা নিয়ে বলতে গেলে জনগণের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ চালাচ্ছে। আমাদের এই গ্রহের ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের ছায়াপথ-রাজ্যের ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের একটা বড় মিল দেখা যাচ্ছে। সেটা হলো, ঐ ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের মত এরাও গোপনে তাদের তৎপরতা চালাচ্ছে। কিন্তু গোপনীয়তার এই এক মিলের কারণে এরা ঐ ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের নাম গ্রহণ করেছে, এই যুক্তি খুব শক্তিশালী নয়। তাহলে এ ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের এই নাম গ্রহনের আর কি কারন থাকতে পারে? ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটকে বোঝার ক্ষেত্রে এই প্রাথমিক বিষয়েরই কোন কূল-কিনারা পাচ্ছি না জোসেফাইন।’ থামল আহমদ মুসা। ‘আরেকটা উজ্জ্বল দিক ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের আছে। বহু শতাব্দি ধরে তারা এই নাম নিয়ে গোটা ছায়াপথ গ্যালাক্সিতে কাজ করছে। অদম্য তারা। সব বিপর্যয়ের মধ্যে থেকে তারা নতুন শক্তিতে জেগে ওঠে। সবশেষে তারা প্রকাশ্য নামে কাজ করছে আগের সেই একই লক্ষে। এই বৈশিষ্ট্য যে কোন সংগঠনের লোভনীয় হতে পারে।’ বলল জোসেফাইন। ‘ঠিক বলেছ জোসেফাইন। এটা হতে পারে। তাদের অদম্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই এই ব্ল্যাক সান তাদের নাম গ্রহণ করেছে। কিন্তু ওদের উদ্দেশ্য ছিল ছায়াপথ গ্যালাক্সির ক্রাইম-লর্ড হওয়া, গড-ফাদার হওয়া এবং পারলে এই গড ছায়াপথ গ্যালাক্সির শাসকও হয়ে বসা। তাহলে এই ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের উদ্দেশ্য কি?’ বলল আহমদ মুসা্ মোবাইল বেজে উঠল আহমদ মুসার। ‘একদিনে সব প্রশ্নের জবাব আসবে না। তুমি টেলিফোন ধর।’ জোসেফাইন বলল। আহমদ মুসা তুলে নিল মোবাইল। আহমদ মুসা কল অন করে সালাম দিতেই ওপার থেকে কন্ঠ শুনতে পেল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। আহমদ মুসার কন্ঠ পেয়েই ওপার থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল, ‘মি. আহমদ, আমি একটু আপনার ওখানে আসতে চাই।’ ‘ওয়েলকাম, এখন কিংবা যে কোন সময়। কিন্তু কি ব্যাপার বলুন তো? আপনার নি:শ্বাস ফেলার সময় নেই। আপনি তো শুধুই বেড়াতে আসতে পারেন না, তাও রিয়াদ থেকে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘একটা বিষয় নিয়ে আমি আপনার সাথে আলোচনা করতে চাই। বিষয়টা ছোট, কিন্তু ইন্টারেষ্টিং।’ বলল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টেলিফোনের ও প্রান্ত থেকে। ‘আমার তো দারণ আগ্রহ হচ্ছে। বলুন না বিষয়টা কি?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।। ‘আপনি শুনে হয়তো হাসবেন! কিন্তু কি জানি বিষয়টা আমরা এড়াতে পারছি না।’ বলে একটু থামল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সংগে সংগেই আবার শুরু করল, ‘আমাদের রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডভান্সড টেকনলজি অব ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বিজ্ঞানী খালেদ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল-মক্কী একটা স্বপ্ন দেখেছেন। সে স্বপ্ন তিনি বলেছেন তার স্ত্রীকে। তার স্ত্রী স্বপ্নের তা’বীরের জন্যে যান ইমাম সউদ জামে মসজিদের খতিব প্রধান আলেমের কাছে। স্বপ্নের তা’বীর শুনে মুষড়ে পড়েন বিজ্ঞানীর স্ত্রী। তিনি বিজ্ঞানীর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেন। এ নিয়েই বেঁধেছে সমস্যা। সরকার বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানীর পরিবারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে দ্বিধা বোধ করছে।’ থামল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ‘মি, হোম মিনিষ্টার, স্বপ্নটা কি?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘একদিন তিনি গাড়ি ড্রাইভ করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরছিলেন। তাঁর গাড়িটা যখন বিশ্ববিদ্যালয় ও তাদের কোন এক স্থানে পৌঁছেছে, তখন তিনি দেখতে পেলেন একজন লোক পাঁজাকোলা করে একজন মহিলাকে নিয়ে অস্থিরভাবে তাকে ডাকছে। ডাক শুনে বিজ্ঞানী সাহেব তাদের পাশে গিয়ে তার গাঁড়ি দাঁড় করালেন। গাড়ি পাশে দাঁড়াতেই লোকটি বলল, স্যার, আমি একজন ট্যুরিষ্ট। এখানে এসেছিলাম রিয়াদের সবচেয়ে প্রাচীন এই মসজিদ দেখতে। হঠাৎ আমার স্ত্রী সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছে। আমার স্ত্রী হার্ট-প্রব্লেম আছে। এখনি তাকে হাসপাতালে নেয়া দরকার, প্লিজ আমাকে সাহায্য করুন। ‘অবশ্যই’ বলে বিজ্ঞানী গাড়ির পেছনের দরোজা খুলে দিলেন। লোকটি সংজ্ঞাহীন স্ত্রীকে পেছনের সিটে তুলে দিয়ে সামনের সীটে এসে বসল। বিজ্ঞানী গাড়ি চালাচ্ছিলেন। আবার ড্রাইভিং সীটে বসলেন তিনি। বিজ্ঞানী গাড়ি ষ্ট্যার্ট দিতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় তিনি অনুভব করলেন তার মাথার পেছনে শক্ত কিছু এসে যেন ঠেকল! পেছন ফিরে তিনি দেখলেন তার মাথায় তাক করা রিভলবার! রিভলবার সেই মেয়েটির হাতে যাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় গাড়িতে তুলেছিল লোকটি। বিস্মিত, ভীত বিজ্ঞানী চোখ ফিরিয়ে চাইলেন পাশে বসা লোকটির দিকে। দেখলেন লোকটির বাম হাত তার দিকে উঠে আসছে। তার হাতে রুমাল। বিজ্ঞানী কিছু বুঝে ওঠা, বলার আগেই লোকটির রুমাল তার নাকের উপর চেপে বসল। তারপর আর কিছু তার মনে নেই। প্রায় সংগে সংগেই তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। এই হলো স্বপ্ন।’ বলে থামল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আহমদ মুসা হাসল না, বরং তার কপাল কুঞ্চিত হলো। ‘মি. হোম মিনিষ্টার, বিজ্ঞানী কি নিয়ে গবেষণা করেন? ‘উনি একজন বহুমুখী বিজ্ঞান প্রতিভা, জনাব। স্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ তিনি বিশ্বের কয়েকজন বিরল প্রতিভার একজন। স্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেরিন ইঞ্জিনিয়ারি-এর তার সাম্প্রতিক দুই আবিষ্কার যুগান্তকারী। কল্পনার ‘এন্টি-ম্যাটার ফুয়েল’-কে তিনি বাস্তবে নিয়ে এসেছেন। এই ‘এন্টি-ম্যাটার ফুয়েল’ ব্যবহারের উপযোগী স্পেস-ক্র্যাফটের ইঞ্জিনও তিনি তৈরী করেছেন। এই ইঞ্জিন হবে প্রচলিত ইঞ্জিনের চেয়ে প্রায় পঞ্চাম গুণ হালকা, কিন্তু স্পেস অতিক্রম করার কয়েক লক্ষ গুন বেশি। এই ইঞ্জিন ব্যবহারিক পর্যায়ে এলে আন্ত:তারকা, আন্ত:গ্যালাস্কি স্পেস ট্রাভেল সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিজ্ঞানী-এন্টি-ম্যাটার ব্যবহার উপযোগী হাল্কা এমন একটা মেরিন ইঞ্জিন ডেভলপ করেছেন যা আমাদের রোডকারের মত মেরিন কারে ব্যবহার করা যাবে।। এই ব্যবহার সফল হলে মহাসাগর-পরিবহনে একেবারে বিপ্লব এসে যাবে।’ থামল সৌদি স্বরাষ্টমন্ত্রী। উজ্জল হয়ে উঠেছিল আহমদ মুসার চোখ-মুখ। বলল, ‘আল-হামদুলিল্লাহ! এমন অবিশ্বাস্য প্রতিভা আমাদের আছে! কিন্তু তাকে নিয়ে তো কোন আলোচনা শুনিনি, তার এসব আবিষ্কারের কথাও শুনিনি কোথাও।’ ‘তাকে নিয়ে কোন আলোচনা তিনি পছন্দ করেন না। তার গবেষণা-কর্মের বিষয়ও তিনি অপরিহার্য্য ক্ষেত্রগুলোর বাইরে যেতে দিতে চান না। তিনি কোনদিন কোন সংবাদ পত্রের পাতায়ও আসেননি। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক অধ্যাপকও তাকে চেনেন না।’ সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল। ‘আল-হামদুলিল্লাহ! আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি যে, তিনি দয়া করে এমন একটি প্রতিভা আমাদের মাঝে দিয়েছেন।’ বলে আহমদ মুসা চুপ করল। হঠাৎ গম্ভীর হয়ে উঠল তার মুখ। চিন্তার একটা গভীর ছায়া তার চোখে-মুখে। সাম্প্রতিককালে কিডন্যাপ হওয়া বিভিন্ন শাখা ও পেশার শীর্ষ ব্যাক্তিদের কথা মনে পড়ল। সেই কিডন্যাপের স্বপ্ন দেখলেন উনি, যিনি একজন বিজ্ঞানী। এমন বিজ্ঞানী যিনি অনন্য, অবিশ্বাস্য প্রতিভার অধিককারী। একই সাথে একজন বিজ্ঞানী ‘স্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং’- এ গবেষণার শীর্ষে পৌছতে পারে! তা ভাবনারও অতীত ছিল। ‘তাঁর জন্যে আমরা সহযোগিতা চাই আপনার মি. আহমদ মুসা।’ বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওপার থেকে। ‘কি সহযোগিতা মি. হোম মিনিষ্টার? আহমদ মুসা বলল। ‘স্বপ্নটা পরিষ্কার কিডন্যাপিং-এর। আর বিজ্ঞানী ও আউটষ্ট্যান্ডিং স্কলারদের কিউন্যাপিং ঘটনা সাম্প্রতিককালে ঘটেছে। পুলিশ প্রধানের কাছে শুনলাম, আপনি এই বিষয়টা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করছেন। খাদেমুল হারামাইন শরীফাইন মহান বাদশা একথা জানার পর এ বিষয়টা খতিয়ে দেখার জন্যে আপনাকেই অনুরোধ করতে বলেছেন।’ বলল সৌদি স্বরাষ্ট্যমন্ত্রী। ‘বিজ্ঞানী মি. খালেদ আবদুল্লাহ কি বিশ্ববিদ্যালয়ে যান?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘কয়েকদিন থেকে সেনা-কমান্ডোদের পাহারায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া শুরু করেছেন।’ সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ‘ঠিক আছে মি. মিনিষ্টার, আমি রিয়াদে যাব। তবে কবে যাব তা আপনাকে জানাব। একটা দাওয়াত রিয়াদে আছে আমার ও আমার স্ত্রীর।’ বলল আহমদ মুসা। ‘কোথায় দাওয়াত, কিসের দাওয়াত? আমরা তো কিছু জানি না মি. আহমদ মুসা।’ ‘ফরাসি দূতাবাসের একটা দাওয়াত। দাওয়াতটা বিয়ের। রিয়াদের ফরাসি রাষ্ট্রদূত ও আমার স্ত্রী একই ফরাসি পরিবারের। সেই সূত্রেই দাওয়াত আমার স্ত্রীকে। স্ত্রীর সাথে আমিও আছি।’ বলল আহমদ মুসা। ‘হ্যাঁ, ফরাসি রাষ্ট্রদূত মিস মেরী জেনিফারও তো ফ্রান্সের বুরবুন রাজবংসের মেয়ে। আলহামদুলিল্লাহ। তাহলে তো আপনি ম্যাডামসহ আসছেন? কবে?’ সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল। ‘সরি, বিয়ের তারিখটা আমি জানি না। বিষয়টা ডিল করছেন তো আমার স্ত্রী। আমি জেনে আপনাকে জানাব।’ বলল আহমদ মুসা। ‘না জনাব, আমিই টেলিফোন করব। তাহলে স্যার, এখনকার মত এখানেই ……।’ সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখের কথা শেষ না হতেই আহমদ মুসা বলল, ‘ওকে মুহতারাম। আসসালামু আলায়কুম।’ ‘ধন্যবাদ, ওয়া আলায়কুম আসসালাম।’ওপার থেকে ধ্বনিত হলো সৌদি স্বরাষ্ট্রন্ত্রীর কন্ঠ। আহমদ মুসা কল অফ করতেই জোসেফাইন বলল, ‘বিয়ের তারিখ ২৭ রজব। আমরা তো যাব বিয়ের অন্তত দু’দিন আগে।’ কথাটা শেষ করে সোফায় সোজা হয়ে বসল জোসেফাইন।হাসল।বলল, ‘বিয়েতে তাহলে তোমার যাওয়া হচ্ছে না।’ ‘কেন? যাওয়া আরও পাকাপোক্ত হয়েছে জোসেফাইন।’ আহমদ মুসা বলল। ‘তা হয়েছে, কিন্তু সেটা বিয়েতে যাওয়া নয়, যাচ্ছ নিজের মিশনে।’ বলল জোসেফাইন্ মুখে তার কৃত্রিম গাম্ভীর্য। ‘তা বটে, তুমি তো সব শুনেছই। কিন্তু বিয়েতে এ্যাটেন্ড করার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। আহমদ মুসা বলল। ‘কিন্তু তোমার সাথে এর সম্পর্ক আছে। হয়তো বিয়ের আসরেও তুমি খুঁজবে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের কাউকে।’ বলল জোসেফাইন। তার মুখ থেকে কৃত্রিম গাম্ভীর্য তখনও কাটেনি। হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘তুমি ঠিকই বলেছে জোসেফাইন। চোখ সেটা খোঁজা স্বাভাবিক, কিন্তু মন বিয়ের আনন্দ ষোল আনাই উপভোগ করবে তুমি নিশ্চিত থাক।’ হাসল এবার জোসেফাইনও। সরে এল আহমদ মুসার কাছে। ঘনিষ্ঠ হলো স্বামীর। আহমদ মুসার কাঁধে মাথা রেখে বলল, ‘তুমি না বললেও এটা আমি জানতাম। যার যা পাওনা তাকে তুমি তা দাও। দ্বায়িত্বের দাবী তুমি পূরণ কর, আবার মনকে তুমি সামান্যও বঞ্চিত কর না।’ ‘ধন্যবাদ জোসেফাইন, তোমার এই সাটিফিকেটের জন্যে।জানো, আল্লাহ স্ত্রীর সাক্ষ্যকেই সবচেয়ে বেশি মূল্য দেন।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আর স্ত্রীর জন্যে স্বামীর সাক্ষ্য?’ জিজ্ঞাসা জোসেফাইনের। হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘এই বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমি এ সংক্রান্ত কোন হাদিস পড়িনি।’ ‘স্ত্রীর জন্যে স্বামীর সাক্ষ্যের দরকার নেই?’ জোসেফাইন বলল। ‘মনে হয় আল্লাহ মেয়েদের ফেভার করেছেন। তিনি আখেরাতে মেয়েদের ভাগ্য স্বামীদের মুখাপেক্ষী করতে চান না।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আল কোরআনে বলেছেন, ‘স্বামী ও স্ত্রী একে অপরের অভিভাবক।’ মানে সমান তারা। তাহলে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পারিক সাক্ষ্যের ক্ষেত্রে সমান ট্রিটমেন্ট হবে না কেন?’ বলল জোসেফাইন। ‘আল্লাহর সৃষ্টিরই এটা একটা প্রকৃতি যে, সবলকে দুর্বলের সাক্ষ্যের মুখাপেক্ষী করা হয়েছে, কিন্তু দুর্বলকে সবলের সাক্ষ্যের মুখাপেক্ষী করা হয়নি। কারণ সবলরা অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বলের প্রতি অবিচার করে, করতে পারে। আর ফেতরাতিভাবে নারীরা দুর্বল ও পুরুষরা সবল।’ আহমদ মুসা বলল। ‘চমৎকার, বুঝলাম। কিন্তু সাক্ষ্য আইনের ক্ষেত্রে দুই নারীর সাক্ষ্যকে এক পুরুষের সমান করা হয়েছে মানে বিচার্য কোন বিষয়ে একজন পুরুষের সাক্ষ্য যথেষ্ট হবে, আর সাক্ষী যদি নারী হয়, তাহলে দুই নারীর সাক্ষ্য না পেলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। এখানে তো নারী পুরুষের অর্ধেক হয়ে গেছে।’ বলল জোসেফাইন। ‘না জোসেফাইন, তোমাকে এখানেও বিষয়টাকে সবল ও দুর্বলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। নারীদের স্বভাবজাত কিছুটা অসুবিধা ও দুর্বলাতার কারণে সাক্ষ্য দানের ক্ষেত্রে নারীদের কোন চাপ বা প্রভাবের শিকার হওয়ার আশংকা বেশি। তাই ন্যায়-বিচার নিশ্চিত করার জন্যেই এক পুরুষের বদলে দুই নারীর সাক্ষ্য চাওয়া হয়েছে। দুই নারী একত্র হলে স্বাভাবিকভাবে তাদের ক্ষমতায়ন হয়, তাদের ক্ষমতা বেড়ে যায়। সম্ভবত আল্লাহ এটাই চেয়েছেন।’ থামল আহমদ মুসা। জোসেফাইনের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। বলল, ‘ধন্যবাদ তোমাকে। তুমি কঠিন বিষয়কে সহজ করে তুলতে পার। বিষয়টা এভাবে আমার মাথায় আসেনি…..।’ জোসেফাইনের কথার মধ্যেই আহমদ মুসার মোবাইল বেজে উঠল আবার। ‘এক্সকিউজ মি. জোসেফাইন!’ বলে আহমদ মুসা মোবাইল হাতে তুলে নিল। কল ওপেন করে ‘হ্যালো’ বলে সাড়া দিতেই ওপার থেকে সালাম ভেসে এল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। আহমদ মুসা সালামের জবাব দিয়েই বলল, ‘খারাপ কোন খবর জনাব?’ ‘হ্যাঁ মি. আহমদ মুসা। আপনার সাথে কথা বলে টেলিফোন রাখতেই অয়্যারলেস পেলাম পুলিশ প্রধানের। তার কাছ থেকে জানতে পারলাম আমাদের বিজ্ঞানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাসায় ফেরার পথে আক্রান্ত হযেছেন। তিনি…..। সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথার মাঝখানেই আহমদ মুসার বলল, ‘কিডন্যাপ হননি, আক্রান্ত হয়েছেন?’ ‘হ্যাঁ মি. আহমদ মুসা, আল্লাহ রক্ষা করেছেন। কিডন্যাপ হওয়া থেকে বেঁচে গেছেন। তাঁর পেছনের সেনা কমান্ডোর দু’টি গাড়িই ধ্বংস হয়েছে। মারা গেছেন ৬ জন কমোন্ডোর সবাই। বিজ্ঞানীর ড্রাইভারকে ওরা গুলি করে মেরেছে।বিজ্ঞানীকেও ওরা নিয়ে যাচ্ছিল। এই সময় সেনাবাহিনীর দু’টি টহল গাড়ি দু’দিক থেকে এসে পড়ে। বিজ্ঞানীকে রেখেই ওরা পালিয়ে যায়। বিজ্ঞানী ……।’ আবারও সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বাধা দিয়ে আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘ওরা কয়টি গাড়ি নিয়ে এসেছিল? বিজ্ঞানীকে ওরা গাড়িতে তুলতে পারেনি?’ ‘ছোট একটা মাইক্রো নিয়ে তারা এসেছিল। ওরা বিজ্ঞানীর গাড়ির ড্রাইভারকে হত্যা করে তাকে বাইরে ফেলে দিয়ে ওদের একজন আমাদের বিজ্ঞানীকে সংজ্ঞাহীন করেছিল, অন্যজন গাড়ির সীটে উঠতে যাচ্ছিল, এ সময় সেনাবাহিনীর দু’টি গাড়ি এসে পড়ে। তখন ওরা বিজ্ঞানীর গাড়ি থেকে ছুটে এসে মাইক্রতে ওঠে। পালিয়ে যায় মাইক্রোটি। পরে স্পট থেকে একজন পুলিশ অফিসারের মাধ্যমে জানলাম, বিজ্ঞানীর গাড়ির চাবিটা নিহত ড্রাইভারের হাতে ছিল। ড্রাইভার…………।’ সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথার মাঝখানে আবার কথা বলে উঠল আহমদ মুসা। বলল, ‘ আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া মি. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী! বিজ্ঞানীর ড্রাইভার জীবন দিয়েছেন, কিন্তু বাঁচিয়ে গেছেন বিজ্ঞানীকে। আমার মনে হয়, বিজ্ঞানীর গাড়ি বহর আক্রান্ত হওয়ার পর যখন ওদেরকে বিজ্ঞানীর গাড়ির দিকে আসতে দেখে, তখনই ড্রাইভার গাড়ির চাবি হাতে নিয়েছিল কিংবা অজান্তেই গাড়ির চাবিটি তার হাতে এসে গিয়েছিল। গাড়িতে চাবি থাকলে সন্ত্রাসীরা বিজ্ঞানীসহ তার গাড়ি নিয়ে পালাত। সন্ত্রাসীরা কেউ মারা যায়নি? বলল আহমদ মুসা। ‘না, ওদের কেউ মারা যায়নি। যারা বিজ্ঞানীর গাড়িতে উঠেছিল, সেই দুই সন্ত্রাসীকেই শুধু দেখা গেছে। মাইক্রোতে কয়জন সন্ত্রাসী ছিল তা জানা যায়নি। যে দু’জন সন্ত্রাসী বিজ্ঞানীর গাড়িতে উঠেছিল, তাদের একজন মেয়ে মানুষ ছিল জানা গেছে। মনে হয় তাদের দু’জনেরই পোষাক বুলেট প্রুফ ছিল। দুই দিকের এক ঝাঁক গুলির মুখে তারা পড়েছিল, কিন্তু কোন ফল হয়নি।’ সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল। ‘ওদের একজন মেয়ে ছিল?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। তার চোখে-মুখে বিস্ময়! ‘তাই মনে করা হচ্ছে। দু’জনেরই এক রকম পোষাক ছিল। এরপরও একজনকে মেয়ে মনে হয়েছে।’ বলল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ‘বিজ্ঞানীর দেখা স্বপ্নের দু’জন সন্ত্রাসীর একজন মেয়ে ছিল। এখানেও দু’জনের একজন দেখা যাচ্ছে মেয়ে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘মি. আহমদ মুসা, এই মেয়েটিই গুলি করে ড্রাইভারকে মেরে ড্রাইভিং সীটে বসতে যাচ্ছিল।’ বলল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ‘তাহলে স্বপ্নটা সত্যি হলো মি. স্বরষ্ট্রমন্ত্রী।’ আহমদ মুসা বলল। ‘সত্যি হলো আংশিক। পুরোটা না সত্য হয়ে যায়, এই আতংক এখন আমাদের মি. আহমদ মুসা্।’ বলল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা আহমদ মুসাকেও চমকেও দিল! ঠিক কথাই বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বপ্নের অর্ধেক সত্যি, অন্য অর্ধেকও সত্যি হতে পারে। অবশ্য নাও সত্যি হতে পারে। কিন্তু আহমদ মুসারও আশংকা, ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের নাম থেকে তাদের যেটুকু পরিচয় পাওয়া গেছে, তাতে এ ধরনের সংগঠন কখনও হার স্বীকার করে না। ‘ডু অর ডাই’ হয়ে থাকে ওদের মটো। কিন্তু ‘ডাই’ এড়িয়ে ওরা ‘ডু’-কেই বাস্তবায়িত করে। আহমদ মুসার কথা বলতে দেরী দেখে ওপার থেকে সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই কথা বলে উঠল, ‘কি ভাবছেন মি. আহমদ মুসা?’ এই মাত্র আমাদের আলোচনা হয়েছে। কালকে সকালে আপনাকে আমরা রিয়াদে চাই। ফরাসি দূতাবাসের বিয়ের আমরা খোঁজ নিয়েছি। সে অনুষ্টান সাত দিন পর হচ্ছে। বড় দেরী হয়ে যাবে। আমাদের অনুরোধ, কাল সকালেই আপনি এখানে এসে যাবেন। ম্যাডামদেরও দাওয়াত আমাদের এখানে। খাদেমুল হারামাইন শরীফাইনের সম্মনিত অতিথি হবেন আপনারা।’ ‘বিষয়টিকে আমিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছি। পরাজিত ওরা আহত বাঘের মত হয়ে গেছে। আপনারা সাবধান থাকুন! আমি কাল সকালে আসছি।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আল-হামদুলিল্লাহ। আপনারা আসুন। আমরা আপনাদের জন্য অপেক্ষা কর্ব।’ বলল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ‘ওকে, মি. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আমরা আসছি ইনশাআল্লাহ আগামী কাল সকালে। কথা এখানেই শেষ।’ ‘ধন্যবাদ মি. আ্হমদ মুসা। আসসালামু আলাইকুম।’ ওপার থেকে বলল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আহমদ মুসা সালামের জবাব দিয়ে কল অফ করে দিল। আহমদ মুসা মোবাইল রাখতেই জোসেফাইন বলে উঠল, ‘তাহলে কাল সকলেই আমাদের যেতে হচ্ছে রিয়াদে।’ ‘স্যরি জোসেফাইন। তোমার সাথে পরামর্শের সুযোগ হলো না। রাজী না হয়ে উপায় ছিল না। বিজ্ঞানী আক্রান্ত হয়েছেন। ছয়জন কমান্ডোর জীবন গেছে। কিন্তু আল্লাহ বিজ্ঞানীকে রক্ষা করেছেন। ঠিক সময় সেনাবাহিনীর গাড়ি দু’টি এসে না পৌঁছলে বিজ্ঞানী অপহৃত হতেন। আমার অনুমান মিথ্যা না হলে বিজ্ঞানীর বিপদ যায়নি।’ আহমদ মুসা বলল। ‘স্যরি বলছ কেন? তুমি ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছ। আমার জন্যেও ভাল হলো। মেরী জেনিফারের সাথে কয়েক দিন বেশি সময় কাটাতে পারব।’ বলল জোসেফাইন। ‘ধন্যবদ জোসেফাইন। যতটুকু সহযোগিতা স্বাভাবিক, তবে চেয়ে অনেক বেশি সহযোগিতা তোমার কাছ থেকে পাই।’ আহমদ মুসা বলল। ‘সহযোগিতা শব্দটা কেন? তোমার কাজ কি আমার কাজ নয়?’ বলল জোসেফাইন। ‘অবশ্যই জোসেফাইন!’ বলে আ্হমদ মুসা কাছে টেনে নিতে চাইল জোসেফাইনকে। জোসেফাইন হেসে উঠে সরে যেতে যেতে আঙুল তুলল দরজার দিকে। আহমুদ মুসা চোখ ফেরাল দরজার দিকে। দেখল দরজা দিয়ে প্রবেশ করছে আহমদ আবদুল্লাহ। তার হাতে খেলনা রিভলবার। সে ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল আহমদ মুসার কোলে। ‘রিভলবার কোথায় পেলে বেটা?’ আহমদ আবদু্ল্লাহকে জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা। ‘আন্টি ম্যাডাম আমার জন্যে এনেছে।’ বলল আহমদ আবদুল্লাহ। ‘বেশ ভাল করেছে। কিন্তু বেটা, তোমার রিভলবার হলো কলম।’ বলে আহমদ মুসা পকেটের দামী কলমটা আহমদ আবদু্ল্লাহর হাতে তুলে দিল। আহমদ আবদুল্লাহ রিভলবার ফেলে দিয়ে আনন্দের সাথে কলমটা হাতে নিল। তারপর ছুটে গিয়ে মায়ের পাশে বসে বলল, ‘তুমি সেদিন এ কলমটা আমাকে নিতে দাওনি। আব্বু দিয়েছেন আমাকে।’ জোসেফাইন আহমদ আবদুল্লাহকে কোলে টেনে নিয়ে বলল, ‘তোমার আব্বা অনেক ভাল বেটা।’ ‘তুমিও ভাল আম্মা।’ মায়ের কোলে মুখ গুঁজে বলল আহমদ আবদু্ল্লাহ। ‘কে বলেছে?’ আহমদ আবদুল্লাহর কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল জোসেফাইন। ‘কেন?’ আব্বা বলেছেন। বলনি আব্বা তুমি? মায়ের কোল থেকে মুখ তুলে আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল আহমদ আবদুল্লাহ। ‘হ্যাঁ, তোমার মা অবশ্যই একটু বেশি ভাল। আর বেটা, দুনিয়ার সব মানুষই ভাল, যারা খারাপ তারা ছাড়া। আল্লাহ সব মানুষকে ভালবাসেন। আমাদেরও সবাইকে ভালবাসা উচিত।’ বলে আহমদ মুসা আহমদ আবদুল্লাহর গালে স্নেহের একটা টোকা দিয়ে উঠে দাঁড়াল। জোসেফাইনও উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘চল দেখি আহমদ আবদুল্লাহ, তোমার আন্টি ম্যাডাম আর কি নিয়ে এল?’ পরদিন সকাল ৭টার মধ্যেই আহমদ মুসারা মদিনা বিমানবন্দরে পৌছেছিল। সৌদি বিমান বাহিনীর একটা বিশেষ বিমান আহমদ মুসাদের নিয়ে যাবে রিয়াদে। আহমদ মুসারা বসেছিল ভিভিআইপি লাউঞ্জে। মিনিট খানেক আগে বিমান বন্দরের ষ্টেশন ম্যানেজার বলে গেছে আহমদ মুসাকে, বিমান রেডি স্যার। সেন্ট্রাল এয়ারট্রাফিকের একটা ফাইনাল সিগন্যালের অপেক্ষা করছে। বসে বসে আজকের কাগজে চোখ বুলাচ্ছে আহমদ মুসারা। ‘রিয়াদের গতকালকের খবরটা খুব ছোট করে ছাপা হয়েছে।’ আহমদ মুসাকে লক্ষ করে বলল জোসেফাইন। ‘উদ্বেগের খবর মানুষের বিস্তারিত না জানাই ভাল, এদেশে এটা সাংবাদিকদের একটা দৃষ্টিভংগি।’ আহমদ মুসা বলল। আহমদ মুসা আবার কাগজে মনোযোগ দিতে চাচ্ছিল। এ সময় তার মোবাইল বেজে উঠল। তাড়াতাড়ি পকেট থেকে মোবাইল বের করে স্ক্রিনে নজর বুলাল। দেখল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর টেলিফোন। কল অন করার সাথে লাউডস্পীকারও অন করে আহমদ মুসা বলল, ‘আসালামু আলায়কুম সালাম। ওয়েল কাম মি. আহমদ মুসা। আপনি আসুন। এদিকে শেষ রাতে মারাত্মক ঘটনা ঘটে গেছে। এ নিয়ে আপনি ভাবতে শুরু করুন, এজন্যেই আমার এই টেলিফোন।’ মুহুর্তের জন্যে ওপারে কন্ঠ থামল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। একটু বিরতিও অসহ্য মনে হলো আহমদ মুসার কাছে। সে বলল, ‘কি মারাত্মক ঘটনা মি. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী? বিজ্ঞানী মি. খালেদ আবদুল্লাহর কিছু ঘটেছে? কিডন্যাপড হয়েছেন তিনি?’ ‘হ্যাঁ মি. আহমদ মুসা, গত রাত সাড়ে তিনটায় তিনি কিডন্যাপড্ হয়েছেন বাসা থেকে।’ বলল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। উদ্বেগে ভেঙে পড়া তার কন্ঠস্বর। ‘ওনার বাসাতো বিশ্ববিদ্যালয়ের চিচার্স হাউজিং ব্লকে?’ জিজ্ঞাসা আহম্মদ মুসার। ‘জি হ্যাঁ। হা্উজিং-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সিকিউরিটি ব্যবস্থা আছে।’ আমরাও হাউজিং-এর গেটে একদল পুলিশ দিয়েছিলাম। তাছাড়াও সেনাবাহিনীর একটা কমান্ডো ইউনিট একজন কর্নেলের নেতৃত্বে বিজ্ঞানীর বাড়ির গেটে পাহারায় ছিল। বিস্ময়ের ব্যাপার, কর্নেলসহ পাঁচজন কমান্ডোকেই গেটে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে।তাদের দেহে কোন আঘাত নেই। মৃত্যুর কারণ এখনও জানা যায়নি।’ থামল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ‘বাউন্ডারি ওয়ালের পেছন দিকের প্রাচীর কেটে তাহরে ওরা প্রবেশ করেছিল।’ বলল আহমদ মুসা। ‘ঠিক বলেছেন। কি করে জানলেন আপনি?’ জিজ্ঞাসা সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। তার কন্ঠে বিস্ময়! ‘গেটে যখন কিছু ঘটেছে বলে আপনি বললেন না। তখন বুঝা গেছে ওরা বিকল্প পথে হাউজিং-এ ঢুকেছে। অন্তত পাঁচ ফিট পরিমাণ প্রাচীর কেটে ওরা গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করেছিল।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ঠিক বলেছেন, মি. আহমদ মুসা। প্রাচীরের কাটা অংশ আমরা মেপে দেখিনি। তারা পেছনের প্রাচীর কেটে গাড়ি নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করেছিল।’ বলল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ‘সেনা কমান্ডোদের পোষাক ওরা খুলে নিয়েছে মি. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা। ‘আপনার অনুমান সত্য, আহমদ মুসা। সেনা কমান্ডোদের পোষাক এবং গাড়ি নিয়েই ওরা পালিয়েছে। ওদের গাড়িটা পড়ে আছে বিজ্ঞানীর বাড়ির গেটে। গাড়িটা আনরেজিষ্ট্যান্ড। গতরাতেই একটা শো-রুম থেকে গাড়িটা চুরি গেছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।’ বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ‘বাড়ির ভেতরে ওরা নিশ্চয় বাধা পায়নি?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘বাড়ির ভেতরে সবাই ঘুমিয়ে ছিল। ওরা ল্যাসার বীম দিয়ে লক উড়িয়ে দিয়ে নি:শব্দেই সব দরজা খুলে ফেলে। ম্যাডাম জেগে উঠেছিলেন। তাঁর সামনেই বিজ্ঞানীকে সংজ্ঞাহীন করে নিয়ে গেছে। যাওয়ার সময় একটা মিনি রিভলবার দিয়ে ফায়ার করে ম্যাডামকে্ সংগে সংগেই ম্যাডাম জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।’ বলল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ‘ম্যাডাম কি বলেছেন, কয়জন ওরা ঘরে ঢুকেছিল?’ জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা। ‘তিনজন ঘরে ঢুকেছিল। তাদের মধ্যে একজন ছিল মেয়ে। মেয়েটির ছিল খুব বেশি ক্ষিপ্র। সেই বিজ্ঞানীকে সংজ্ঞাহীন করে কাঁথে তুলে নেয়। পুরুষ দু’জন রিভলবার তুলে পাহারা দিচ্ছিল।’ বলল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ‘কোন রুটে তারা পালিয়েছে, সেটা কি জানা গেছে?’ ওরা যাতে দেশের বাইরে যেতে না পারে তার ব্যবস্থা করেছেন নিশ্চয়।’ আহমদ মুসা বলল। ‘দেশের সকল সড়ক, নৌ ও বিমান বন্দরে রেড-এলার্ট জারি করা হয়েছে ভোর সারে পাঁচটা থেকে। কোথাও থেকে কোন তথ্য আমরা পাইনি।’ বলল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ‘আপনাদের রিয়াদের রাস্তায় তো ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার পাহাড়া আছে। তার রিপোর্ট থেকে কি জানা গেছে?’ আহমদ মুসা বলল। ‘সেটা এক বিস্ময়! সব রিপোর্ট আমরা পেয়েছি। কিন্তু মিলিটারি কমান্ডোদের যে গাড়ি নিয়ে ওরা পালিয়েছি সে গাড়িকে রিয়াদের কোন রাস্তায় দেখা যায়নি।’ বলল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ‘তাহলে মাঝখানে তারা আবার গাড়ি পাল্টেছে অথবা গাড়িটিকে তারা জ্যামিং ক্যামোফ্লেজে ঢেকে নিয়েছিল।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ক্যামেরা চোখ আড়াল করার মত জ্যামিং ক্যামোফ্লেজে তো বিশ্বের একটা দুষ্পাপ্য ও অত্যান্ত ব্যয়বহুল টেকনলজি! মাত্র সাম্প্রতিককালে আমরা এই টেকনলজি নিয়ে এসেছি। একটা সন্ত্রাসী সংগঠন এটা পাবে কি করে?’ বলল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমি জানি না, এই কিডন্যাপাররা কারা। তারা যদি ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট হয়, তাহলে মনে করি কোন টেকনলজিই ওদের বাইরে নেই।’ ‘আমাদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে, মি. আহমদ মুসা।’ বলল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ‘স্যরি, বাস্তবতা আমাদের সবাইকে জানতে হবে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ধন্যবাদ মি. আহমদ মুসা, দু:খের মধ্যেও একটু রস করলাম। ওকে, আপনি আসুন। আর খাস কোন পরামর্শ থাকলে বলুন।’ ‘ধন্যবাদ মি. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ঘটনার পর যা করার আপনারা তা সবই করেছেন। আমার একটা অনুরোধ গত এক মাসে সৌদি আরবে যারা প্রবেশ করবেন তাদের ফটোসহ পার্টিকুলারস আমার প্রয়োজন। আপনারা দয়া করে এর ব্যবস্থা করবেন।’ বলল আহমদ মুসা। ‘ধন্যবাদ মি. আহমদ মুসা, এসেই পেয়ে যাবেন। ওকে। এখানেই শেষ। আস্সালামু আলাইকুম।’ ‘ওয়া আলাইকুম সালাম’ বলে আহমদ মুসা কল অফ করে দিল। সবাই উদ্গ্রীবভাবে তাকিয়ে ছিল আহমুসার দিকে। সবার চোখে-মুখেই উদ্বেগ। ষ্টেশন ম্যানেজার আহমদ মুসাকে বলতে এসেছিল যে ষ্টেশন বিশেষ বিমান টেক-অফ পর্যায়ে আছে। আহমদ মুসারা উঠলেই বিমান ছাড়বে।কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে কথা বলছেন জেনে এবং আলোচনার বিষয় শুনে কথা বলতে আর সাহস করেনি। জোসেফাইনও বিব্রত অবস্থায় পড়েছিল। কিন্তু আহমদ মুসাকে ডিস্টার্ব করা উচিত মনে করেনি। বিজ্ঞানী কিডন্যাপড্ হয়েছে তার মনটাও মুষড়ে পড়েছিল। আহমদ মুসা মোবা্ইল পকেটে রেখে মাথা তুলে সামানে চাইতেই দরজায় দাঁড়ানো বিমান বন্দরের ষ্টেশন ম্যানেজারের নজরে পড়ে গেল। বলল, ‘স্যরি, প্রেন বুঝি দাঁড়িয়ে আছে?’ ‘নো প্রব্লেম স্যার। প্লেনের সময় ২০ মিনিট পিছিয়ে দেয়া হয়েছে।’ বলল ষ্টেশন ম্যানেজার। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘তার মানে আর দশ মিনিট সময় আমাদের হাতে আছে।’ আহমদ মুসার কথার রেশ বাতাসে মেলবার আগেই বাইরে থেকে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে এল। চমকে উঠল সবাই। প্রচন্ডভাবে কেঁপে উঠেছিল বিল্ডিংটাও। সোজা হয়ে বসল আহমদ মুসা। বলল, ‘এ বিস্ফোরণের শব্দ রানওয়ের দিক থেকে এসেছে। তার মানে কোন বিমানে বিস্ফোরণ ঘটেছে’। বিস্ফোরণের শব্দ শুনেই ছুটে বেরিয়ে গিয়েছিল ষ্টেশন ম্যানেজার। কয়েক মূহূর্তের মধ্যেই একজন পুলিশ অফিসার ছুটে এল আহমদ মুসার ভিভিআইপি কক্ষে। বলল আহমদ মুসাকে, ‘স্যার, যে বিশেষ বিমানে আপনার যাবার কথা ছিল, সে বিমানটি বিস্ফোরণে উড়ে গেছে।’ আহমদ মুসা বসে থেকেই শান্তভাবে কথাটা শুনল। হিসেব করে দেখল, টেলিফোন রিসিভের কারণে দেরি না হলে ঠিক সময়ে বিশেষ বিমানটি আকাশে উড়লে বিমানটি এখন রিয়াদের আকাশে থাকতো। রিয়াদের আকাশেই বিমানটি বিস্ফোরণে ভেঙে পড়তো তাদের সাথে নিয়েই। মূহুর্তের জন্যে তার চোখ দু’টি কঠোর হয়ে উঠল। একটা উষ্ণ স্রোত বয়ে গেল গোটা শরীরে। নিজেকে সামলে নিয়ে আহমদ মুসা তাকাল জোসেফাইনের দিকে। জোসেফাইনের চোখ-মুখ ভয়ে আড়ষ্ট। সে আহমদ আবদুল্লাহকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে আছে। আহমদ মুসা তার ডান হাত জোসেফাইনের কাঁধে রেখে বলল, ‘আল্লাহ আমাদের সাথে রয়েছেন। তিনিই তো আমাদের বাঁচালেন! ভয় করলে আল্লাহর এ সাহায্যর অমর্যদা হয় জোসেফাইন। ‘হাসবুনাল্লাহ! আল্লাহই আমাদের জন্যে যথেষ্ট। ঠিক, তিনি নিজ হাতে আমাদের গোটা পরিবারকে বাঁচালেন। আল-হামদুলিল্লাহ!’ বলে জোসেফাইন আহমদ আবদুল্লাহকে পাশে বসিয়ে আহমদ মুসাকে বলল, ‘স্যরি, মানবিক অনেক দুর্বলতা মানুষ অনেক সময় কাটিয়ে উঠতে পারে না। আমি সে ধরনের একজন মানুষ। আল্লাহ মাফ করুন।’ ‘ধন্যবাদ জোসেফাইন।’ বলে আহমদ মুসা তাকাল পুলিশ অফিসারের দিকে। পুলিশ অফিসার কক্ষের বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আরেকজন অফিসারও তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আহমদ মুসা ওদের উদ্দ্যেশ্য করে বলল, ‘আমি বিস্ফোরণের জায়গায় যেতে চাই। ষ্টেশন ম্যানেজার কোথায়?’ পরে যে অফিসার এসেছে, সে পুলিশ অফিসার ঘরে ঢুকল। বিনয়ের সাথে বলল, ‘স্যার, বিমান বন্দরে আমি আপনার সিকিউরিটির দায়িত্বে আছি। গোটা বিমান বন্দরে এখন সার্চ চলছে স্যার। স্যার, সার্চ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনাকে এখানেই অপেক্ষা করতে অনুরোধ করা হয়েছে।’ পুলিশ অফিসারের কথা শেষ হতেই আহমদ মুসার মোবাইল বেজে উঠল। আহমদ মুসা দেখল মদিনা মনওয়ারার গভর্নরের টেলিফোন। আহমদ মুসা কল অন করে সালাম দিতেই ওপার থেকে গভর্নরের কন্ঠ শোনা গেল। সালামের জবাব দিয়ে বলল, ‘ভাই আহমদ মুসা’ আমি আসছি। গিয়েই কথা বলব। ওকে, আসসালামু আলাইকুম।’ সালামের জবাব দিয়ে কর অফ করতেই আবার বেজে উঠল আহমদ মুসার মোবাইল। রিয়াদ থেকে সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর টেলিফোন। আহমদ কল অন করে সালাম দিল। ওপার থেকে সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কন্ঠ শোনা গেল। সালামের জবাব দিয়ে বলল, ‘আল-হামদুলিল্লাহ! আল্লাহর হাজার শোকর যে প্লেনটা ডিলে হয়েছিল! আমি মদিনায় আসছি, মি. আহমদ মুসা। ঐ প্লেনেই আমি আপনাদের রিয়াদে নিয়ে আসব।’ ‘ধন্যবাদ। আপনার আসাটা ভাল হবে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘এই ঘটনা একটা বড় ষড়যন্ত্র। আমি বিস্মিত হচ্ছি, গতকাল আপনার সাথে কথা বলে ঠিক করলাম, আজ আপনি আসবেন। আর বিমান বাহিনীর ঐ বিশেষ বিমানে আপনি আসবেন, সেটা ঠিক হয়েছে রাত ৮ টার পর কেমন করে এটা সম্ভব হলো?’ বলল ওপার থেকে উদ্বিগ্ন সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ‘এটা খুব সহজ তদন্ত মি. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আপনি নির্দেশ দিন। গত রাত ৮টা থেকে যত লোক বিমান বন্দরের টার্মাক এলাকায় প্রবেশ করেছে, যারা ঐ বিশেষ বিমানটিতে উঠেছে, তাদের সকলের উপর নজর রাখতে, তারা যেন কেউ সরে পড়তে না পারে।’ ‘ধন্যবাদ মি. আহমদ মুসা। আমি নির্দেশ দিচ্ছি। আমি গভর্নর মহোদয়ের সাথে আলোচনা করেছি। একটা তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে মদিনা মনোওয়ারার নিরাপত্তা প্রধানের নেতৃত্বে। তারা কাজ শুরু করেছে।’ বলল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ‘ধন্যবাদ মি.স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আপনার আগের টেলিফোন কলটা ছিল লাকি কল। কলটা দীর্ঘ হওয়ার কারণে ষ্টেশন ম্যানেজার প্লেনের সময় ২০ মিনিট পিছিয়ে দেন’ আহমদ মুসা বলল। ‘আল্লাহর হাজার শোকর, আহমদ মুসা। আল্লাহ সাহায্য করেছেন। আমরা নিমিত্ত মাত্র। ওকে, মি. আহমদ মুসা। আর কিছু পরামর্শ?’ বলল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি। ‘আপনি আসুন, আলোচনা করা যাবে।’ ‘ঠিক আছে মি. আহমদ মুসা। আসছি আমি। আসসালামু আলায়কুম।’ আহমদ মুসা মোবাইল রাখতেই সেই পুলিশ অফিসারটি ঘরে ঢুকল। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই কক্ষে প্রবেশ করল ষ্টেশন ম্যানেজার। বিধ্বস্ত তার চেহারা। বলল সে আহমদ মুসাকে, ‘স্যার, ওপরে বিশ্রামের জন্যে আমাদের কয়েকটা ভিভিআইপি স্যুট আছে। সেনাবাহিনীর এক্সপ্লোশন ইউনিট সেগুলো সম্পূর্ণ স্ব্যান করে রেডি করেছে। ম্যাডামকে নিয়ে আপনি সেখানে চলুন স্যার।’ ‘গভর্ণর সাহেব তো আসছেন। তিনি কোথায় আসছেন?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘স্যুটগুলোর পাশেই কয়েকটি সীটিং রুম রয়েছে। ওরা ওখানেই বসবেন স্যার।’ বলল ষ্টেশন ম্যানেজার। ‘ঠিক আছে চলুন।’ বলে আহমদ মুসা তাকাল জোসেফাইনের দিকে। আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। জোসেফাইনও। মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে মায়ের হাত আঁকড়ে ধরে আছে আহমদ আবদুল্লাহ। ২ মদিনা মনোওয়ারা বিমান বন্দরে টপ ফ্লোরে ভিভিআইপি মিটিং রুম। ওভাল সিটিং টিবিলের সভাপতির আসনে বসেছেন মদিনার গভর্নর। তার এক পাশে সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অন্য পাশে বসেছে আহমদ মুসা। অভাল টেবিল ঘিরে অন্যদের মধ্যে রয়েছে সৌদি অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা প্রধান, সৌদি কাউন্টার টেররিজম গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান, পুলিশ প্রধান ও মদিনা মনোয়ারা নিরাপত্তা কমিটির প্রধান। মদিনার গভর্নর, আহমদ মুসা ও মদিনা মনোওয়ারা নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ছাড়া অন্য সবাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে রিয়াদ থেকে এসেছেন। মিটিং উদ্বোধন করেছিলেন মদিনার গভর্নর। তিনি উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি যে, অল্প সময়ের জন্যে রিয়াদ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, জাতীয় দুই গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান ও পুলিশ প্রধান এসেছেন। আহমদ মুসা ও তার পরিবার আমাদের নাগরিক হলেও আমাদের সম্মানিত ও মূল্যবান অতিথিও। সৌদি আরবে তাদের জীবনে উপর আক্রমণ এই প্রথম। এই আক্রমণ আসলে সৌদি সিকিউরিটি ব্যবস্থারর উপর। আমরা আনন্দিত যে, খাদেমুল হারামাইন শরীফাইনের মহান বাদশা বিষয়টিকে এভাবে দেখেছেন এবং একটি সবোর্চ্চ কমিটি রিয়াদ থেকে পাঠিয়েছেন। তারা আসার আগে আমরা আরও দু’বার বসেছি। আল-হামদুলিল্লাহ! আহমদ মুসার পরমর্শে আমরা ঘটনার গভীরে প্রবেশ করতে পেরেছি। একটা ষড়যন্ত্র নেটওয়ার্কের গোটাটাকেই মনে হয় আইডেনটিফাই করা গেছে। এ ব্যাপারে রিপোর্ট পেশ করার জন্য আমি মদিনা মনোওয়ারার সিকিউরিটি কমিটির প্রধানকে সংক্ষেপে রিপোর্ট পেশ করার জন্য অনুরোধ করছি।’ প্রাদেশিক রাজধানী মদিনা মনোওয়ারার নিরাপত্তা কমিটির প্রধান জেনারেল আলী আবদুল্লাহ আল-হাবশা সোজা হয়ে বসল। কথা শুরুর ফর্মালিটি শেষ করে বলল, ‘বিস্ফোরণের সময় আমি বিমান বন্দরের সিকিউরিটি কক্ষে ছিলাম।’ বিস্ফোরণের সংগেই বিমান বন্দর সীল করে দেয়া হয়। কাউকে ঢুকে ও বের হতে দেয়া হয়নি। আর সংগে সংগেই বিমান বন্দর সার্চ করা হয়েছে সন্দেহজনক কিছ কিংবা কাউকে পাওয়া যায় কিনা সেটা নিশ্চিত করার জন্য। বিস্ফোরিত বিমান ও বিস্ফোরণস্থল পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ একই সাথে চালানো হয়। পরের গুরুত্বপূর্ণ কাজটি আমরা করি মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরামর্শে। তিনি আমাদের নির্দেশ দেন, গত রাতে থেকে বিস্ফোরণ পর্যন্ত যারা বিমান বন্দর, টার্মাক ও বিমানে প্রবেশ করেছে, তাদের তালিকা প্রণয়ন এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় নিয়ে আসতে। বিমান…..।’ জেনারেল আলী আবদুল্লাহ আল-হাবশীর কথার মাঝখানেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলে উঠল, ‘এই পরামর্শ বিমান বন্দর থেকে আহমদ মুসাই আমার কাছে পাঠিয়েছিল। স্যরি জেনারেল। বলুন আপনি।’ জেনারেল আলী আবদুল্লাহ আবার শুরু করল, ‘বিমান বন্দর, টার্মাক, বাইরে রাস্তা প্রভৃতি সংশ্লিষ্ট সকল জায়গায় ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা থেকে আমরা আগের মত সকাল ৮টা থেকে পরের দিন সকাল ৮টা পর্যন্ত ১২ ঘন্টা সময়ে যারা বিমান বন্দরে, টার্মাক ও বিমানে প্রবেশ করেছেন, তাদের বিস্তারিত একটা তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এই তালিকায় আমরা দেড় হাজার লোককে- যাদের মধ্যে আউটগোয়িং প্যাসেঞ্জারের সংখ্যাই সাড়ে ১৪শ’।অবশিষ্ট পঞ্চাশ ননপ্যাসেঞ্জার। এই পঞ্চাশ জনের মধ্যে বিমান বন্দর অফিসিয়ালস, ইমিগ্রেশন অফিসিয়ালস সার্ভিসিং কর্মী ও কেবিন ক্রুর সংখ্যা ৪৯ জন। মাত্র একজন ননঅফিসিয়ালস। কিন্তু তিনিও একজন ভিআইপি। এরোমেটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার আবুল ওয়াফা আল-সিদরী। তিনি আমাদের বিমান-বাহিনীর একজন টেকনিক্যাল উপদেষ্টা। আজ ভোরে পাঁচটায় তাঁকে ডাকা হয় বিশেষ বিমানটির একটা চেক করার জন্য।’ একটু থামল জেনারেল আলী আবদুল্লাহ আল-হাবশী। সামনে গ্লাস থেকে একটু পানি খেয়ে আবার শুরু, ‘এই পঞ্চাশ জনের ছবি ও বায়োডাটা নিয়ে একটা প্রোফাইল তৈরি করা হয়েছে এবং এরা সকলেই কর্মক্ষেত্রে কিংবা নিজ নিজ বাড়িতে হাজির আছে। বিনা অনুমতিতে তাদের মদিনার বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এটা নিশ্চিত করার জন্যে তাদের প্রত্যেকের উপর নজর রাখা হয়েছে।’ বলে একটু থামল। একটু নড়ে-চড়ে বসে আবার শুরু করল, ‘বিমান বন্দরের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় এদের যে গতিবিধি ধরা পড়েছে, তাতে অস্বাভাবিক কিছু পাওয়া যায়নি। এদের পার্সোনাল ফাইলে তাদের যে অতীত রেকর্ড পাওয়া গেছে, তাতে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি। এটা প্রাথমিক অনুসন্ধানের ফল। নিরাপত্তা কমিটির পক্ষ থেকে বিষয়টি মহোদয় সমীপে পরামর্শ ও নির্দেশনার জন্য পেশ করা হলো।’ থামল জেনারেল আবদুল্লাহ। সংগে সংগে কেউ কোন কথা বলল না। নিরব কিছুক্ষণ সবাই। মদিনা মনোয়ারার গভর্নর নিরবতা ভাঙল। বলল, ‘নিরাপত্তা কমিটিকে ধন্যবাদ। তারা গত তিন ঘন্টায় তদন্তের প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু এই রিপোর্টে আনন্দিত হবার কিংবা সামনে এগোবার কোন আলো দেখছি না। অপরাধীদের প্রতি কোন অঙুলি সংকেত নেই। রিপোর্ট আমরা সবাই শুনেছেন। এখন দয়া করে বলুন, আপনাদের পরামর্শ কি? কোন দিকে অঙ্গুলি সংকেত করার মত আপনারা কিছু দেখছেন কিনা।’ থামল গভর্নর। মুখ খুলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বলল, ‘তদন্ত কমিটি তার রিপোর্টের শেষে মন্তব্য করেছে, গত রাত ৮টা থেকে আজ সকাল ৭ টা পর্যন্ত বিমান বন্দরে এসেছে, টার্মাক ও বিশেষ বিমানটিতে ঢুকেছে, তাদের গতিবিধিতে কোন অস্বাবিকতা দেখা যাচ্ছে না এবং তাদের অতীত রেকর্ডেও সন্দেহজনক কিছু নেই। এই মন্তব্যের পর নতুন অনুসন্ধান ছাড়া কিছু বলার বা অপরাধী হিসেবে কারও দিকে অংগুলি সংকেতের কোন সুযোগ নেই। আমি ভাবছি, গুরুত্বপূর্ণ এই তদন্ত কাজটি পুলিশের অপরাধ অপরাধ তদন্তের ব্যাপারে সরকারের ‘এন্টিটেররিষ্ট কমিশন’ ও ‘‘সেনা গোয়েন্দা সংস্থা’র প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটা যৌথ কমিটির হাতে দেয়া উচিত। এ কাজে ভাই আহমদ মুসার সাহায্য পেলে ভাল হতো, কিন্তু অন্য একটা বড় কাজ তার হাতে আছে।’ থামল স্বরাষ্টমন্ত্রী। উপস্থিত সবাই একে একে স্বরাষ্টমন্ত্রীর প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানাল। শুধু আহমদ মুসাই কিছু বলল না। ভাবছিল সে। সবশেষে গর্ভনর আহমদ মুসার দিকে তাকাল। বলল, ‘ভাই আহমদ মুসা, এবার প্লিজ আপনি কিছু বলুন। কোন আশার কথা বলুন।’ ‘ধন্যবাদ এক্সিলেন্সি!’ বলে শুরু করল আহমদ মুসা। বলল, ‘মানণীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঠিকই নিয়েছেন এমন ঘটনা তদন্তের জন্য ঐ রকম একটি চৌকস তদন্ত কমিটিরই প্রয়োজন। তবে আমি কয়েকটা বিয়ষ জানতে চাই, বলতে চাই।’ একটু থামল আহমদ মুসা। তাকাল জেনারেল আলী আবদুল্লাহর দিকে। বলল, ‘বিশেষ বিমানটির পাইলট অফিসার ও কেবিন ক্রদের দায়িত্বে যারা ছিলেন সবাই মারা গেছেন। বিশেষ বিমানটিতে ওঠার লোকদের মধ্যে শুধু বেঁচে আছেন এ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার আবুল ওয়াফা ও ফ্লাইট উত্তর সার্ভিসিং কর্মীরা। বিভিন্ন টেকনিক্যাল বিভাগের সার্ভিসিং কর্মীরা যারা বিমানে উঠেছিলেন বা বিমানের কাছে গিয়েছিলেন কাজের জন্যে তাদের সংখ্যা কত হবে, মি. জেনারেল?’ ‘স্যর, সব মিলিয়ে তাদের সংখ্যা পাঁচজন।’ বলল জেনারেল আলী আবদুল্লাহ। ‘এ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার জনাব আবুল ওয়াফাসহ এদের তথ্য-বিবরণী কি ম্যানুয়ালি রেকর্ড করেছেন, না শো করার মত কম্পিউটারাউজড্ বিবরণীও আছে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘দু’ভাবেই রেকর্ড করা হয়েছে স্যার।’ বলল জেনারেল। ‘এখন কি শো করা যায়?’ জানতে চাইল আহমদ মুসা। ‘অবশ্যই স্যার।’ বলল জেনারেল আলী আবদুল্লাহ। ‘তাহলে ইঞ্জিনিয়ার আবুল ওয়াফা আল-জিদয়ী দিয়ে শুরু করুন।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ওকে স্যার।’ বলে কাজ শুরু করে দিল সে। সব ব্যবস্থা করাই ছিল টেবিলে। টেবিলের বিশেষ ড্রয়ার খুলে সেখান থেকে একটা তাঁর বের করে জেনারেল আলী আবদুল্লাহ তার ল্যাপটপে ঢুকিয়ে দিল। সেই সাথেই সামনের দেয়ালের মাঝামাঝি জায়গা থেকে তিন ফুট বর্গাকৃতির একটা স্লাটড সরে গেল। দেখা গেল সেখানে বড় একটা কম্পিউটার স্ক্রিন। স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা ছবি। ‘স্যার, আমি ইঞ্জিনিয়ার আবুল ওয়াফা আল-জিদয়ী দিয়েই শুরু করছি।’ বলল জেনারেল আলী আবদুল্লাহ। প্রথমে স্ক্রিনে এল ইঞ্জিনিয়ার আলী আবদুল্লাহর ছবি। তারপর একে একে জন্ম, পিতা-মাতার নাম ও তাদের ছবি, লেখা-পড়া, কর্মজীবনে প্রবেশ, বিয়ে, স্ত্রীর ছবি, নাম ও পেশা, উপদেষ্টা হিসেবে সৌদি এয়ারলাইন্সে যোগদান ইত্যাদিসহ ব্যক্তিগত জরুরি বিষয়সমূহ তুলে ধরা হলো। এভাবে মদিনা বিমান বন্দরের পাঁচজন গ্রাউন্ড ষ্টাফের সদস্যেরও পূর্ণ জীবন-বৃত্তান্ত কম্পিউটার স্ক্রিনে আনা হলো। আহমদ মুসা গভীর মনোযোগের সাথে সবার জীবন বৃত্তান্ত দেখছিল। বিভিন্ন সময় তার চোখে-মুখে প্রশ্ন, কিছু বিস্ময় ফুটে উঠতে দেখা গেল। জীবন বৃত্তান্ত দেখানো শেষ হলে আবার নিরবতা নামল সীটিং রুমে। এবার নিরবতা ভাঙল আহমদ মুসা। জেনারেল আলী আবদুল্লাহকে লক্ষ করে আহমদ মুসা বলল, ‘জেনারেল আলী আবদুল্লাহ, ইঞ্জিনিয়ার আবুল ওয়াফার জন্ম, লেখা-পড়া, বিয়ে মিসরে, এটা তো দেখাই গেল। কিন্তু পাঁচ গ্রাউন্ড ষ্টাফ-সার্ভিসিং কর্মীর মধ্যে আলী হাসানের জন্ম, লেখা-পড়া বিয়ে কি মিসরে?’ ‘ঠিক স্যার, এ বিষয়টি তার বায়োডাটাতে নেই। ঠিক আছে, তার পারসোনাল প্রোফাইলে ওটা পাওয়া যাবে।’ বলে জেনারেল আলী আবদুল্লাহ তার ল্যাপটপের ভিন্ন একটা ফাইলে গিয়ে ক্লিক করতেই দেয়ালের কম্পিউটার স্ক্রিনে আলী হাসানের বিশদ জীবন-বৃত্তান্ত এসে গেল। তাতে দেখা গেল আলী হাসানের জন্ম, লেখা-পড়া, বিয়ে সবই মিসরে। আহমদ মুসা জেনারেল আলি আবদুল্লাহকে ধন্যবাদ দিয়ে বলল, জেনারেল আরেকটা তথ্য পাওয়া কি সম্ভব, ইঞ্জিনিয়ার আবুল ওয়াফা বিয়ে করেছেন মায়ের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়া বা মাতৃকুলের কাউকে কী?’ গভর্নর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সকলের বিস্ময় দৃষ্টি আহমদ মুসার দিকে। এসব প্রশ্ন জেনে কি দরকার, এটা তাদের ভাবনার বিষয় নয়। কিন্তু কেউ কিছু বলল না। জেনারেল আলী আবদুল্লাহ হাসল। বলল, ‘এর উত্তর আমরা অনেকেই জানি স্যার। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব তার মায়ের বোনঝি মানে তিনি তার খালার মেয়েকে বিয়ে করছেন।’ ‘ধন্যবাদ জেনারেল, আমার একটা খবর জানার কৌতুহল আছে। ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের খালার নাম কি আমাত আল-কাদির?’ ‘জি হ্যাঁ, তাঁর নাম আমাত আল-কাদির। মিসর-সিনেমার তিনি নাম করা অভিনেত্রী, আবার লেখিকাও। কিন্তু এটা আপনি জানলেন কি করে স্যার? আপনি কি তাকে চেনেন?’ বলল জেনারেল আলী আবদুল্লাহ। ‘না, চিনি না জেনারেল। অন্য একটা হিসেব থেকে আমি এটা বলেছি।’ বলে আহমদ মুসা ফিরে তাকাল গভর্নর ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে। বলল, ‘এক্সিলেন্সি, মদিনা মনোয়ারার গভর্নর ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী! আমার বিবেচনায় ভূল থাকতেও পারে, তবে মনে করছি ইঞ্জিনিয়ার আবুল ওয়াফা ও আলী হাসান ভিন্ন ভিন্নভাবে বা যুক্তভাবে আহমদ মুসাকে হত্যার এই ষড়যন্ত্র করেছিল। ষড়যন্ত্রের জাল অনেক আগেই বিস্তার করা হয়। তারা সুযোগের সন্ধানে থাকে। অবশেষে উপস্থিত একটা সুযোগকে তারা কাজে লাগায়। আমি মনে করি তাদের দু’জনকে গ্রেফতার করে তদন্ত চালালে সবকিছু প্রমাণিত হয়ে যাবে।’ গভর্নর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ উপস্থিত সকলের চোখে-মুখে অপার বিস্ময়! ইঞ্জিনিয়ার আবুল ওয়াফা ও আলী হাসান দুই জনের কারো বিরুদ্ধেই তারা কিছুই দেখছে না। আহমদ মুসা কিভাবে এমন চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিচ্ছে। অবশ্য এটা ঠিক, আহমদ মুসা শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেন না। গভর্নর তাকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও তাকিয়েছিল গভর্নর দিকে। বোধ হয় বুঝল তারা দু’জনের কথা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘আপনার পরমর্শ আমাদের কাছে নির্দেশ। মি. আহমদ মুসা, আমরাও সব দেখলাম শুনলাম, কিন্তু আমরা তো কিছু বুঝতে পারছি না। আমরা জানতে খুব আগ্রহী আপনি এই সিদ্ধান্ত কি কারণে, কি জন্য নিলেন।’ আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘শক্তিশালী কোন এভিডেন্স, যথেষ্ঠ রকম কোন কার্যকরণের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত আমি নিইনি। দুর্বল একটা ক্লু আমি পেয়েছি, তার ভিত্তিতেই বড় এ সিদ্ধান্তটি আমি নিয়েছি।’ ‘সেটা কি মি. আহমদ মুসা? বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।’ ‘তিনটি বিবেচনা থেকে আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রথমটি হলো, ইঞ্জিনিয়ার আবুল ওয়াফার মা, স্ত্রী ও খালা এই তিনজন এবং আলী হাসানের স্ত্রীও ইহুদি। দ্বিতীয় বিবেচনা ছিল, সম্প্রতি আমি ইস্তাম্বুল ও পূর্ব আনাতোলিয়ার যাদের ষড়যন্ত্র ও স্বার্থ মাটি করে দিয়েছি, তাদের সাথে যুক্ত ছিল ইহুদি স্বার্থ। সুতরাং প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেয়ার আশু আশংকা তাদের তরফ থেকেই আসার কথা। তৃতীয় বিবেচনা হলো, স্পেশাল ফ্লাইটের নির্দিষ্ট স্পেশাল প্লেনটির জন্যে তাকে কল করা হয়নি, তিনি বিমান বন্দরে এসে সুযোগ সৃষ্টি করে তবেই প্লেনে উঠেছিলেন। কল রেজিষ্টারে তার জন্য কল এন্ট্রি হয়েছে তিনি বিমান বন্দরে আসার পর। কলের কারণটাও স্পেসেফিক নয়, জেনারেল।’ থামল। ‘ধন্যবাদ মি. আহমদ মুসা। তিনটি বিবেচনা এক সাথে করলে আপনার সিদ্ধান্তকেই অপরিহায্য করে তোলে। কিন্তু মি. আহমদ মুসা, ইঞ্জিনিয়ার আবুল ওয়াফার মা, স্ত্রী, খালা ও আলী হাসানের স্ত্রীকে ইহুদি বলছেন কেন?’ মুসলিম নাম নিয়ে এবং মুসলিম হিসেবেই ওরা ঘর-সংসার করছেন।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল। ‘একথা ঠিক, ইহুদিরা এখন এ নামগুলো ব্যবহার করে না। কিন্তু মধ্যযুগে মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে মিসরে এই নামগুলোর ব্যাপক প্রচলন ছিল। সাধারণভাবে এই নামগুলো ইহুদীরা ব্যবহার করতো। মধ্যযুগের বিভিন্ন ইহুদী ডকুমেন্টে বিশেষ করে মিসরের সিনাগগ থেকে এর প্রমাণ পাওয়া ‘Genij’ ডকুমেন্টগুলোতে এই সব ইহুদি নামের দীর্ঘ তালিকা রয়েছে। ইঞ্জিনিয়ার আবুল ওয়াফার স্ত্রীর নাম ‘আমাত আল-ওয়াহিত’ খালার নাম ‘আমাত আল-কাদির’ ও মায়ের নাম’ ‘আমাত আল-আজিজ’। মজার ব্যাপার হলো ইহুদিদের ‘গিনিজ’ ডকুমেন্টে এই তিনটি নাম এক সাথে রয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারের বায়োডাটা মা ও স্ত্রীর নাম যথাক্রমে ‘আমাত আল-আজিজ’ ও ‘আমাত আল-ওয়াহিত’ দেখার পর যখন শুনলাম ইঞ্জিনিয়ার খালাতো বোনকে বিয়ে করেছে, তখন আমি ইহুদি সিরিয়াল অনুসারে না জেনেই তার খালার নাম বলেছি ‘আমাত আল-কাদির’ এবং তা ঠিক হয়েছে। আলী হাসানের স্ত্রীর ‘মিত আল-শাদা’ নামটিও ‘গিনিজ’ ডকুমেন্টের। এই ক্লু সামনে রেখেই আমি মহিলাদের ইহুদি বলেছি এবং তা প্রমাণিত হবে ইনশালল্লাহ!’ থামল আহমদ মুসা। ‘ধন্যবাদ ভাই আহমদ মুসা। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। আল্লাহ আপনাকে লম্বা জীবন দান করুন। আপনার বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত নির্ভূল। আমরা এক সাথে জীবন-বৃত্তান্তগুলো শুনলাম। কিন্তু আপনি এত চিন্তা, এত অনুসন্ধান ও এত বিশ্লেষন কখন করলেন! সত্যি আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আপনাকে তার অসীম নেয়ামত দিয়ে ধন্য করেছেন। আল-হামদুলিল্লাহ!’ বলল মদিনা মনোয়ারার গভর্নর। ‘সম্মানিত সভর্নর মহোদয় ঠিক বলেছেন। আল-হামদুলিল্লাহ! তিনি এই তদন্তকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন, সহজ করে দিয়েছেন। আমি নিশ্চিত, তদন্ত অন্ধকার থেকে আলোতে চলে এসেছে। অপরাধীরা চিহ্নিত হয়েছে। এখন শুধু দেখার বিষয় ষড়যন্ত্রের শেকড় কোথায়, কারা এর পেছনে রয়েছে। এটা আমাদের গোয়েন্দারা পারবে।’ বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ‘কিন্তু ঐ বিষয়টাও জানা গেছে। আহমদ মুসা বলেছেন, তাকে হত্যা-প্রচেষ্টার সাথে ইহুদি ষড়যন্ত্র জড়িত রয়েছে। এখন শুধু বের করতে হবে, সৌদি আরবে কারা ইঞ্জিনিয়ার আবুল ওয়াফাদের এ কাজে ব্যবহার করছে। আবুল ওয়াফা ও আলী হাসানদের গ্রেফতার করলেই পেছনের লোকদের কথা জানা যাবে।’ বলল গভর্নর। এ সময় জেনারেল আলী আবদুল্লাহর টেলিফোন বেজে উঠল। ‘মাফ করবেন!’ বলে জেনারেল আলী আবদুল্লাহ মোবাইলসহ দ্রুত ঘরের বাইরে চলে গেল। মিনিট খানেক পরেই ফিরে এল জেনারের আলী আবদুল্লাহ। নিজের আসনের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এক্সিলেন্সি, একটা খবর এসেছে, অনুমতি হলে বলতে পারি।’ গভর্নর ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সকলেই তাকাল জেনারেল আলী আবদুল্লাহর দিকে। ‘বল জেনারেল, কি খবর।’ বলল গভর্নর। কন্ঠে প্রবল ঔৎসুক্য। ‘এই মাত্র আমাদের মদিনার পুলিশ প্রধান জানালেন, ইঞ্জিনিয়ার আবুল ওয়াফা সপরিবারে চলে যাচ্ছিলেন। সাদা পোষাকে পাহারায় থাকা পুলিশ তাদের আটকায়। জানায় যে, তাঁর মদিনা শরীফের বাইরে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আছে। এ কথা শুনে উনি পকেট থেকে রিভলবার বের করে ফাঁকা গুলি করে গাড়ি ষ্টার্ট দিয়ে পালাবার চেষ্টা করেন। পুলিশ সামনে গিয়ে বাধা দিলে সে একজন পুলিশকে গুলি করে আহত করেন। অবশিষ্ঠ দু’জন পুলিশ চাকায় গুলি করে তার গাড়ি থামিয়ে দেয় এবং তাকে আটক করে।’ ‘আল-হামদুলিল্লাহ! মি. আহমদ মুসার কথা ঘরের বাইরে বেরুবার আগেই সত্য প্রমাণিত হয়ে গেল। ঘটনা যে ঘটিয়েছে, সে ধরা পড়ল। আল্লাহর হাজার শোকর। আবারো ধন্যবাদ আহমদ মুসা আপনাকে।’ ‘তার গ্রেফতারের খবর দয়া করে সবার কাছ থেকে গোপন রাখুন। তার ধরা পড়ার কথা জানলে পেছনের ষড়যন্ত্রকারীরা পালাবে, তাদের ধরা কঠিন হয়ে পড়বে।’ বলল আহমদ মুসা। ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহেব, প্লিজ আপনি ব্যবস্থা করুন। কিভাবে সবার কাছ থেকে বিষয়টা গোপন রাখা যায় দেখুন।’ বলল গভর্নর দ্রুত কন্ঠে। ‘ইয়েস এক্সিলেন্সি, আমি দেখছি। আমি এখানকার পুলিশ ও গোয়েন্দা প্রধানের সাথে বসছি। আমি জানাব আপনাকে।’ একটু থামল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সামনের গ্লাস থেকে একটু পানি খেয়ে নিয়ে আবার শুরু করল’ ‘এক্সিলেন্সি, আমি সাড়ে ১২ টার দিকে আহমদ মুসাকে নিয়ে রিয়াদ যাত্রা করব। ওদিকের সংকটের কোনই সুরাহা হয়নি আপনি জানেন।’ ‘অবশ্যই। বেগম ও সাহেবজাদাকে আমরা খুব কষ্ট দিলাম। সেই ৭টা থেকে ওরা এয়ারপোর্টে। আরও দেড় ঘন্টা থাকতে হবে। দু:খিত আহমদ মুসা আমরা সকলে।’ বলে গভর্নর তাকাল আহমদ মুসার দিকে। ‘না, কোন কষ্ট নয়। ওরা পাশের স্যুটে বেশ ঘুমাচ্ছে আমি খোঁজ নিয়েছি। সুন্দর ব্যবস্থা করায় প্রশাসনকে ধন্যবাদ এক্সিলেন্সি।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা! বলে গভর্নর সকলের দিকে তাকাল। বলল, ‘সকলকে ধন্যবাদ, একটা সফল মিটিং-এর জন্যে। আমরা এখন উঠতে পারি।’ কথা শেষ করেই গভর্নর উঠে দাঁড়াল। তার সাথে সাথে উঠে দাঁড়াল সবাই। রিয়াদের গোয়েন্দা সদর দফতর। চারদিক ঘুরিয়ে ঠিক পেন্টগনের আদলে তৈরি। ঠিক যেন আরেকটা পেন্টাগন! মাইনাস থার্ড ফ্লোরে অর্থাৎ তিরিশ ফুট মাটির নিচে একটা সুরক্ষিত কক্ষ। কক্ষের দক্ষিণ প্রান্তে চারটি টেবিল। প্রতিটি টেবিলে একটি করে ছোট রিভলভিং চেয়ার। টেবিলের একটিতে বসেছে আহমদ মুসা। তার ডানপাশে সৌদি নিরাপত্তা প্রধান, বাম পাশে সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তার বাম পাশে সৌদি গোয়েন্দা প্রধান। কথা শুরু করেছিল গোয়েন্দা প্রধান আবদুল্লাহ বিন আবদুল্লাহ। সে আল্লাহর প্রশংসা ও নবী স. এর প্রতি দরুদ পেশের পর বলল, ‘আমাদের মুয়াজ্জেজ মেহমান আহমদ মুসা জরুরি ভিত্তিতে যে তথ্যগুলো চেয়েছিলেন তার মধ্যে রয়েছে, ‘সেদিন ভোর রাত থেকে সন্ধ্যা রিয়াদ থেকে আউটগোয়িং রাস্তাগুলোর যান চলাচলের মনিটরিং রিপোর্ট, এই সময়ের সধ্যে এই রাস্তাগুলোতে অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক কিছু ঘটেছে কিনা সে সম্পর্কে তথ্য, রিয়াদ থেকে বাইরে যাওয়া কোন গাড়িতে বা কয়টি গাড়িতে একাধিক নন-আরব, বিশেষ করে শ্বেতাংগ মেয়ে ও কয়েকজন ছেলেকে দেখা গেছে, যাদের সাথে একজন অসুস্থ বা ঘুমন্ত মধ্যবয়সী আরব ছিল।’ রিয়াদ থেকে আউটগোয়িং সব হাইওয়ে ও সড়কের মনিটরিং রিপোর্ট আমাদের কাছে আছে। অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক বড় কিছু ঘটেনি। শুধু একটা মজার ঘটনা। সেটা হলো রিয়াদ থেকে দক্ষিনে আল-খারজ ক্রসিং পয়েন্টে এবং রিয়াদ থেকে পুবে ও হফুফ থেকে চার মাইল পশ্চিমে আল-জগুফ পয়েন্টে দু’টি গাড়ির ছবি ও তথ্যবলী রেকর্ড হবার পর মনিটরিং ফাইল থেকে তা মুছে গেছে।….. গোয়েন্দা প্রধানের কথার মাঝখানেই আহমদ মুসা চোখ তুলে তাকাল গোয়েন্দা অফিসারের দিকে। তার কপাল কুঞ্চিত। কিন্তু কিছু বলল না। গোয়েন্দা প্রধান বলছিল, ‘একাধিক শ্বেতাংগ মেয়েসহ কয়েকজন শ্বেতাংগ পুরুষকে কোথাও কোন গাড়িতে এই সময়ের মধ্যে দেখা যায়নি। আমাদের জন্যে দু:খ যে, মনিটরিং থেকে বড় ধরনের কোন ক্লু পাওয়া যায়নি দেখা যাচ্ছে। সম্মানিত মেহমান আল্লাহর অশেষ নেয়ামতে ধন্য আহমদ মুসাসহ সবাই মনটরিং দেখলে, আমাদের আশা আহমদ মুসা, নিশ্চয় আমাদের পথ দেখাবেন।’ থামল গোয়েন্দা প্রধান আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ। সৌদি নিরাপত্তা প্রধান আহমদ মুসার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ মি. আবদুল্লাহ শুরু করুন।’ ‘ধন্যবাদ এক্সিলেন্সি! বলে গোয়েন্দা প্রধান আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ তার টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা লাল বোতামে চাপ দিল। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের ডান, বাম ও সামনের দেয়াল বিশাল সফেদ স্ক্রিনে পরিণত হলো। ‘এক্সিলেন্সি, আমি প্রথমে রিয়াদ থেকে পুবে যে হাইওয়ে ও সড়ক গেছে সেগুলোর মনিটরিং রিপোর্ট দেখাবো। তারপর উত্তর, এরপর পশ্চিম এবং শেষে দক্ষিণ দিকের হাইওয়ে।’ বলল গোয়েন্দা প্রধান আবদুল্লাহ। গোয়েন্দা প্রধান থামলেই আহমদ মুসা বলল, ‘জনাব, পুবের পর দক্ষিন হাইওয়েটা প্লিজ আগে দেখান, যদি অসুবিধা না হয়।’ ‘না স্যার, কোন অসুবিধা নেই। আপনি যা বলেছেন সেটাই হবে।’ বলল গোয়েন্দা প্রধান আবদুল্লাহ। বলেই গোয়েন্দা প্রধান একটা নীল বোতামে চাপ দিল। দেয়ালের স্ক্রিনে একটা প্রশস্ত রাস্তার ছবি ভেসে উঠল। ‘এক্সিলেন্সি, এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিসার্চ বাংলো।’ গোয়েন্দা প্রধান বলল। দেয়ালের স্ক্রিনে দু’একটা করে গাড়ির দৃশ্য ফুটে উঠতে লাগল। দেয়ালে গাড়ির দৃশ্য ফুটে উঠার সাথে সাথে দেয়ালের পরবর্তী বটমে গাড়িগুলো খুব ক্লোজ ছবি ফুটে উঠল। এতটাই ক্লোজ যে, ভেতরের আরোহী, গাড়ীর নাম্বার, আরোহীদের লাগেজ সব কিছুই নিখুঁতভাবে দেখা যাচ্ছে। একই সাথে রিয়াদের পূর্বঞ্চল, উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চল, পশ্চিমের ধাপে সব দৃশ্যই দেখা গেল দীর্ঘ দুই ঘন্টা ধরে। আহমদ মুসার চোখ দু’টি আকুলভাবে খুঁজল একটি গাড়ি যাতে দেখা যাবে একাধিক শ্বেতাংগ মেয়ে, কয়েকজন যুবক ও সংগাহীন বা ঘুমন্ত একজন আরব যুবককে। কিন্তু এ রকম কোন কিছু মিলল না কোথাও। রাস্তার দৃশ্য দেখানো বন্ধ হতেই আহমদ মুসা বলল গোয়েন্দ প্রধানকে উদ্দেশ্য করে, ‘ম. আবদুল্লাহ, রিয়াদের পূর্বে আল-জওফ ও দক্ষিণে আল-খারজ পয়েন্টে একটি করে গাড়ির ছবি ও তথ্য মুছে যাওয়ার সময়টা বলা যাবে? ‘জি হ্যাঁ, বলা যাবে স্যার। মনিটরিং রিলেতে একটা রেড ডট দিয়ে তা চিহ্নিত করা ছিল। আল-খারজে ঘটনাটা ঘটে ভোর পাঁচটায় এবং আল-জওফের ঘটনাটা ঘটে সকাল ৭টায়।’ বলল গোয়েন্দা প্রধান। ‘রিয়াদ থেকে আল-খারজ ও আ-জওফের দূরত্ব কত হবে, একশ’, তিনশ’ কিলোমিটার?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘ঠিক বলেছেন স্যার। রিয়াদ আল-খারাজ-এর দূরত্ব ১০০ কিলোমিটার এবং আল-জওফের দূরত্ব ৩শ’ কিলোমিটার।’ বলল গোয়েন্দা প্রধান। আহমদ মুসার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘আরেকটা কথা মি. আবদুল্লাহ, সিসিটিভি’র মনিটরিং-এ এভাবে গাড়ির ছবি ও তথ্য মুছে যাওয়ার ঘটনা তো আর কোন হাইওয়েতে ঘটেনি।’ ‘জি না।’ বলল গোয়েন্দা প্রধান। ‘কিন্তু আল-খারজ-এর ১০ নম্বর ও আল-জওফের ৪০ নম্বর হাইয়ের আর কোন পয়েন্টে এই ঘটেনি?’ ‘এ ধরনের কোন খবর আসেনি। তবে এই অঞ্চলের হাইওয়ে আবার চেক করতে চাই। যদি কোথাও ঐ দুই জায়গার মত ইরেজের ঘটনা ঘটে থাকে সংশ্লিষ্ট তদারককারীরা তা চিহ্নিত না করলেও প্রমাণ পাওয়া যাবে। ইরেজের জায়গায় ফিল্ম ইরেজের প্রকৃতি অনুসারে বিভিন্ন রং নিয়ে থাকে। জোরে স্ক্রোল করার সময় তা ‘ব্রেক’ আকারে স্পষ্টভাবে সামনে এসে যায়। আমি দেখছি স্যার।’ বলল গোয়েন্দা প্রধান। ‘তাহলে রিয়াদ থেকে যাওয়া সব হাইওয়ে আপনি চেক করুন। কতটুকু সময় লাগবে?’ বলল আহমদ মুসা। ‘না, বেশি সময় লাগবে না। কয়েক মিনিট মাত্র।’ গোয়েন্দা প্রধান বলল। কথা শেষ করেই গোয়েন্দা প্রধান আবদুল্লাহ ড্রয়ারে সুইচ-প্যানেলের একটা বোতাম চাপ দিল। সংগে সংগেই দেয়ালের স্ক্রিনে স্ক্রোল শুরু হয়ে গেল। প্রথমেই স্ক্রোলে এল রিয়াদের পূর্ব দিকের হাইওয়ে। হাইওয়ের নাম্বার ফরটি। হাইওয়ে ফরটিতে স্ক্রোলের দু’জায়গায় পাওয়া গেল ‘ব্রেক’- এর সংগে সংগেই দেয়ালের বটম। দেয়ালের স্ক্রিনে এবার গাড়ির ক্লোজ দৃশ্যের বদলে স্থানটির নাম ও সময় ভেসে উঠছে। ৪০ নাম্বার হাইওয়েথে প্রথম ব্রেক দেখা গেল রিয়াদের পূর্বে আল-নজল স্থানে, দ্বিতীয়টি আল-জওফে। ৪০ নাম্বার হাইওয়েতে আর ‘ব্রেক’ পাওয়া গেল না। ৮৫ নাম্বার হাইওয়ের হফুফ নামক স্থানে দু’টি ‘ব্রেক’ পাওয়া গেল অল্প সময়ের ব্যবধানে। অল্প ব্যবধানে দু’টি ‘ব্রেক’ পাওয়ায় ভ্রু কুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। বিস্ময় ও গভীর ভাবনার ছায়া নামল তার চোখে-মুখে। কিন্তু কিছুই বলল না। চতুর্থ স্থান আল-সালওতেও পাওয়া গেল দু’টি ব্রেক। আবার সেভাবেই ভ্রু কুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। সেই বিস্ময়, সেই চিন্তা আবার তার চোখে-মুখে। রিয়াদ থেকে উত্তর ও পশ্চিমগামী কোন হাইওয়ের স্ক্রোলেই কোন ব্রেক পাওয়া গেল না। সবশেষে শুরু হলো রিয়াদ থেকে দক্ষিনগামী ১০ নাম্বার হাইওয়ের স্কোল। হাইওয়ে ১০-এ পাওয়া গেল দু’টি ‘ব্রেক’। ৮৫ নং হাইওয়ের ‘হফুফ’ গামী হাইওয়ের হারাদ-এ এসে স্ক্রোলে ব্রেক পড়তেই আহমদ মুসার চোখ-মুখ থেকে বিস্ময় ও ভাবনার চিহ্ন মুছে গেল। আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার চোখ। বলল, ‘আর স্ক্রোলের দরকার নেই মি. আবদুল্লাহ। যা চাচ্ছিলাম তা পেয়ে গেছি।’ স্ক্রোল বন্ধ হয়ে গেল। বিস্ময় ও আনন্দে উদ্বেল গোয়েন্দা আবদুল্লাহ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সৌদি নিরাপত্তা প্রধান। তবে আহমদ মুসা অনেকটা নিরব। তার কন্ঠে ঝরে পড়ল অসীম হতাশা। ‘সৌদি আরব থেকে তারা পালিয়েছে কিনা জানি না। তবে তারা সকাল ৯টার মধ্যেই আল-মালওয়াতে পৌঁছে যায়। আল-মালওয়া থেকে আরও দক্ষিনে আরব আমিরাতের দিকে যাবার দৃশ্য কোন স্ক্রোল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমার মনে হয় তারা আল-মালওয়া অঞ্চলের কোথাও আছে অথবা আল-মালওয়ার লাগোয়া কাতারে তারা প্রবেশ করেছে বা সাগর পথে একটু এগিয়ে বাহরাইনের প্রবেশ করতে পারে কিংবা তারা সাগর পথে অন্য কোথাও চলে গেছে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘কিন্তু ঘটনা ঘটার প্রায় সাথে সাথে অন্তত ছ’টার মধ্যে দেশের সকল হাইওয়ে, বিমান বন্দর, সমুদ্র বন্দর ও কোষ্ট গার্ডের কাছে বিজ্ঞানিকে কিডন্যাপ করার বিববণসহ আমাদের নির্দেশ পৌঁচে গেছে। তাছাড়া আল-মালওয়ার সমুদ্র অঞ্চল ছোট ও খুবই ব্যস্ত। সৌদি কোষ্ট গার্ড ছাড়াও কাতার ও বাইরাইনের কোষ্ট গার্ডেরাও এখানে পাহারা দেয়। আমরা এলার্ট করার পর আমাদের বিজ্ঞানীসহ এই সাগর-পথ কারও পক্ষে পাড়ি দেয়া সম্ভব নয়।’ সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল। ‘আপনার কথা ঠিক জনাব। তবে ভাবনার বিষয় হলো তারা উপকূল থেকে পালাবার জন্যে কি ধরনের সমুদ্রযান ব্যবহার করেছেন। সড়ক পথের বিষয়টাই দেখুন। দুই গাড়ি নিয়ে ১০ নাম্বার হাইওয়ে ও ৪০ নাম্বার হাইওয়ের পথে ওরা হফুফ হয়ে আল-মালওয়াতে এসেছে। কিন্তু ধরা যায়নি তাদের।’ বলল আহমদ মুসা। ‘হাইওয়েতে যে দু’টি গাড়ির ছবি ও তথ্যবলী মনিটরিং ফাইল থেকে মুছে গেছে, সে দু’টি গাড়িকেই আপনি কিডন্যাপারদের বলে ধরছেন। এটা কি সন্দেহাতীত?’ বলল সৌদি নিরাপত্তা প্রধান। ‘আমি কতকগুলো বিষয়ের উপর আমার বিশ্বাস দাঁড় করিয়েছি। বিষয়গুলো কোন ত্রুটি নেই।’ আহমদ মুসা বলল। ‘কি সেই বিষয়গুলো মি. আহমদ মুসা?’ জিজ্ঞাসা সৌদি নিরাপত্তা প্রধানের। দু’টি গাড়িই সিসিটিভিকে ফাঁকি দেয়ার জন্যে এই টেকনলজি ব্যবহার করেছে, দ্বিতীয়ত, দুই গাড়ি এক শহর রিয়াদ থেকে বের হয়ে দুই পথে এগিয়ে আবার তারা হফুফে গিয়ে এক পথে উঠেছে এবং দু’টি গাড়িরই যাত্রা শেষ হয়েছে আল-মালওয়াতে গিয়ে। তৃতীয় বিষয় হলো, রিয়াদ থেকে দুই গাড়ি একই সময়ে যাত্রা শুরু করে আল-মালওয়ার উদ্দেশ্যে। শেষ কথা হলো, পরিবহন সিসিটিভি থেকে তারা নিজেদের আড়াল করতে চাচ্ছিল কেন? এ জন্যেই যে, তারা যাতে তাদের বন্দী ও নিজেদেরকে সবার চোখ থেকে আড়াল করতে পারে।’ বলল আহমদ মুসা। মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল সৌদি নিরাপত্তা প্রধানের। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও গোয়েন্দা প্রধানেরও। তাদের কাছেও বিষয়টা দিবালোকের মত পরিষ্কার হয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই মুখে অন্ধকার নেমে এল সৌদি নিরাপত্তা প্রধানের। বলল, ‘তাহলে মি. আহমদ মুসা, আমরা যদি নিশ্চিত হই যে, কিডন্যাপাররা বিজ্ঞানীকে নিয়ে আল-মালওয়াতে পৌঁছেছে, এ বিষয়েও তাহলে নিশ্চিত হতে হবে যে, কিডন্যাপাররা বিজ্ঞানীকে নিয়ে আমাদের দেশের বাইরে, মানে ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে।’ ‘সৌদি আরবের বাইরে চলে গেছে কিনা, তা আমি নিশ্চিত জানি না। অবশ্য যাওয়ার আশংকাই বেশি। তবে তারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে যায়নি। পৃথিবীতে থাকলে তাদের ধরা-ছোঁয়ার মধ্যেই থাকতে হবে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আল-হামদুলিল্লাহ! মি. আহমদ মুসা, সৌদি আরব থেকে ওদের চলে যাবার আশংকায় বেশি। তাহলে কম হলেও তাদের সৌদি আরবে থাকার একটা সম্ভাবনাও আছে। সে ক্ষেত্রে আল-মালওয়া অঞ্চলে আমাদের দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত হওয়া উচিত কিনা।’ বলল সৌদি নিরাপত্তা প্রধান। ‘আমি সেটাই ভাবছি। ওরা এখনও সৌদি আরব থেকে পালিয়ে যেতে পারুক বা না পারুক, আমাদের ওখানে যাওয়া দরকার।’ বলে মুহুর্তের জন্যে একটু থামল আহমদ মুসা। একটু নড়ে বসে চেয়ারটায় একটু হেলান দিল। শুরু করল আবার, ‘আপনারা প্লিজ একটা নির্দেশ দিন, সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী সময়ে আল-আলওয়া বে’র মারফেস ওয়াটার ও ইনার ওয়াটারে যত জলযান চলাফেরা করেছে, বিশেষ করে আল-মালওয়া বে’ থেকে আউট গোয়িং সব জলযানের বিবরণ ও নির্ঘন্ট তৈরি করে আপনাদের দিক। আপনাদের তরফ থেকে আরও একটা নির্দেশ দেয়া প্রয়োজন যে, আল-মালওয়া বন্দর ছাড়াও এর আশেপাশের উপকূল জুড়ে যে প্রাইভেট জেটি ও নৌ-টার্মিনালগুলো রয়েছে তাদেরও এই সময়ে একটা মনিটরিং দরকার। জানা দরকার যে, এই সময়ে কারা সেখানে গেছে। ‘ থামল আহমদ মুসা। গোয়েন্দা প্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকাল সৌদি নিরাপত্তা প্রধানের দিকে। ‘ধন্যবাদ মি. আহমদ মুসা। আমি আমাদের নৌবাহিনী ও কোষ্ট গার্ডকে এখনি নির্দেশ দিচ্ছি।’ এটুকু শেষ করেই সৌদি নিরাপত্তা প্রধান তাকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে। বলল, ‘আপনি পুলিশকে উপকূলের বন্দর, জেটি ও নৌ-টার্মিনালগুলোতে খোঁজ-খবর নিতে এবং মনিটরিংগুলো যোগাড় করতে বলুন।’ ‘অবশ্যই, এখুনি আমি নির্দেশ পাঠাচ্ছি।’ বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথার মধ্যেই গোয়েন্দা প্রধানের ওয়ারলেস ‘বিফ’ সিগন্যাল দিতে শুরু করেছে। ওয়্যারলেস নিয়ে গোয়েন্দা প্রধান ঘরের এক প্রান্তে সরে গেল। মিনিট খানেক কয়েক কথা বলে গোয়েন্দা প্র্রধান দ্রুত ফিরে এল টেবিল। তার চোখে-মুখে উত্তেজনা। চেয়ারে বসেই নিরাপত্তা প্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে চেয়ে বলল, ‘আল-মালওয়ার আমাদের গোয়েন্দা প্রধান খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা খবর দিল। সেটা হলো, আল-মালওয়া বে’তে আমাদের নৌবাহিনীর ইনার-ওয়াটার কমান্ডের পেট্রল সাবমেরিন বে’র ফ্লোরে একটা পরিত্যক্ত টিউব সাবমেরিন খুঁজে পেয়েছে। দশ ফিট লম্বা, পাঁচ ফিট বেড়ের টিউব সাবমেরিনটির গায়ে কোন রাষ্ট্রীয় পরিচয় বা কোম্পানীর পরিচয় চিহ্নিত নেই। প্রাথমিক এই খবরটুকুই আমাদের গোয়েন্দারা এখন পর্যন্ত পেয়েছে। টিউব সাবমেরিনটিকে আল-মালওয়ার নৌঁঘাটিতে নিয়ে আসা হচ্ছে।’ বিস্ময় নামল সকলের চোখে-মুখে। ভ্রু কুঁচকে গেল আহমদ মুসার। ‘ধন্যবাদ মি. আবদুল্লাহ। বিস্ময়কর এই ঘটনা। আমাদের পানিসীমায় এ ধরনের ঘটনার আর কোন নজির নেই। দেখি আমি জানতে চেষ্টা করছি। আর কিছু কি জানা গেল টিউব সাবমেরিন সম্পর্কে?’ বলে টেবিল থেকে তার অয়্যারলেস তুলে নিল সৌদি নিরাপত্তা প্রধান। সংগে সংগেই আহমদ মুসা সৌদি নিরাপত্তা প্রধানকে লক্ষ করে বলল, ‘জনাব, আপনি দয়া করে এ বিষয়টাও জানুন, পরিত্যক্ত টিউব সাবমেরিনটির ইঞ্জিন বন্ধ হয়েছিল কোন তারিখে, কতটায় এবং টিউব সাবমেরিনটিতে মনোগ্রাম ধরনের কোন চিহ্ন আছে কিনা।’ ‘ধন্যবাদ মি. আহমদ!’ বলে সৌদি নিরাপত্তা প্রধান ওয়্যারলেস নিয়ে সরে গেল ঘরের এক প্রান্তে। কয়েক মিনিট পরে ফিরে এল সৌদি নিরাপত্তা প্রধান। তার চোখে-মুখে আনন্দ ও উত্তেজনা দুই-ই! চেয়ারে ফিরে এসেই বলল, ‘ইয়েস মি. আহমদ মুসা, টিউব সাবমেরিনটির ইঞ্জিন বন্ধ হয় ৯টা ৩০ মিনিটে। আর মনোগ্রাম বিষয়ে তারা জানাল মনোগ্রাম ধরনের কিছু তাদের চোখে পড়েনি। অবশ্য বিস্তারিত অনুসন্ধান সবে তারা শুরু করেছে।’ ‘পরিত্যক্ত টিউব সাবমেরিনটি পাওয়া গেছে ঠিক কোন জায়গায়?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘হ্যাঁ, এ বিষয়টা আমিও ভেবেছি মি. আহমদ মুসা। বাহরাইনের পূর্ব উপকূল ও কাতারের পশ্চিম উপকূল থেকে প্রায় সমদূরত্বের সাগর তলে পাওয়া গেছে টিউব সাবমেরিনটা।’ বলে একটু থেমেই আবার শুরু করল সৌদি নিরাপত্তা প্রধান, ‘টিউব সাবমেরিনের একমাত্র বডি ছাড়া কিছুই আস্ত অবস্থায় পাওয়া যায়নি। ভেতরের ইঞ্জিনের কাঠামো ছাড়া সব কিছুই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। মনে করা হচ্ছে টিউব সাবমেরিন পরিত্যাগ করার সময় ইন্টারন্যাল বিশেষ বিস্ফোরণে ডিভাইসের মাধ্যমে ভেতরের সব কিছু সবংস করে দেয়া হয়। অন্যদিকে টিউব সাবমেরিনটির বাইরের বডি একেবারে ক্লিন, কোথাও কোন লেখা বা চিহ্ন কিছুই নেই।’ থামল সৌদি নিরাপত্তা প্রধান। ‘ঠিক কোন লোকেশানে পাওয়া গেছে টিউব সাবমেরিনটি?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘মি. আহমদ মুসা, আমি জানি কাতার ও বাহরাইনের মানচিত্র সম্পর্কে আপনার ভাল জানা আছে। ধরুন, কাতারের পশ্চিম উপকূলের মরুশহর আজুরাবা ও বাহরাইনের উপকূল শহর আল-দুর এই দুই শহরকে যদি এক সরল রেখায় যুক্ত করা হয়, তাহলে আল-দুরের কাছের যে বিন্দুটা হবে সেটাই পরিত্যক্ত টিউব সাবমেরিন খুঁজে পাওয়ার লোকেশন।’ বলল সৌদি নিরাপত্তা প্রধান। ‘ধন্যবাদ। যারা টিউব সাবমেরিন থেকে আসে, তারা কোথায় যেতে পারে এ সম্পর্কে কেউ কি জানতে পেরেছে?’ বলল আহমদ মুসা। ‘না, এ সম্পর্কে কেউ আমাকে কিছু বলেনি। নিশ্চয় তারা এ ব্যাপারে কিছুই জানতে পারেনি। কিন্তু মি. আহমদ মুসা, তারা কোথায় গেল তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তারা কারা?’ এই অদ্ভুত টিউব সাবমেরিন কেন এসেছিল আমাদের আল-মালওয়া বে’তে কোন পরাশক্তি বা অন্য কারো কি এটা একটা গোয়েন্দা মিশন?’ সৌদি নিরাপত্তা প্রধান বলল। ‘আমার কোন সন্দেহ নেই, এই টিউব সাবমেরিনে করেই কিডন্যাপাররা আমাদের বিজ্ঞানীকে নিয়ে পালাচ্ছিল। তারপর দুর্ঘটনায় পড়ে তারা টিউব সাবমেরিনটি পরিত্যাগ করে।’ বলল আহমদ মুসা। মুখ শুকিয়ে গেল সৌদি নিরাপত্তা প্রধান, সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও গোয়েন্দা প্রধানের। ‘সর্বনাশ, দুর্ঘটনায় আমাদের বিজ্ঞানীর তো কিছু হয়নি? যারা টিউব সাবমেরিন থেকে বেরিয়ে এসেছে তারা এখন কোথায়? তাদের সাথেই কি আমাদের বিজ্ঞানীও রয়েছেন? না তার কোন বিপদ হয়েছে?’ বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার কন্ঠে উদ্বেগ। ‘এ প্রশ্নগুলো আমারও মি. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আমি যথাসম্ভব শীঘ্র আল-মালওয়া যেতে চাই। বাহরাইনেও যেতে হতে পারে, যদি অন্য কোন জলযানে ওদের স্থানান্তরিত হওয়ার প্রমাণ না যায়।’ বলল আহমদ মুসা। ‘সে সম্ভবনা কি আছে?’ জিজ্ঞাসা সৌদি নিরাপত্তা প্রধানের। ‘যারা কিডন্যাপিং কাজে টিউব সাবমেরিন ব্যবহার করতে পারে, তাদের পক্ষে অমন ব্যবস্থা করা অসম্ভব নয়।’ বলল আহমদ মুসা। উদ্বেগে আড়ষ্ট হয়ে গেল সৌদি নিরাপত্তা প্রধানসহ সকলের মুখ। কথা বলল সৌদি নিরাপত্তা প্রধান। বলল, ‘তাহলে কি ও কিডন্যাপিং এর সঙ্গে পরাশক্তিদের কেউ জড়িত? আমি জানি দু’একটি পরাশক্তির গোয়েন্দা বিভাগের গোপন সঞ্চয় ও ধরনের টিউব সাবমেরিন থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু প্রথিবীর আর কোন সামরিক বাহিনী বা গোয়েন্দা বাহিনীর হাতে এ জিনিস নেই।’ সৌদি নিরাপত্তা প্রধানের কন্ঠ কম্পিত। ‘কিডন্যাপার সংগঠনের সাথে কোন পরাশক্তির যোগাগোগ বা যোগসূত্র আছে কিনা আমি জানি না। তবে কিডন্যাপার সংগঠন নিজেই অত্যান্ত পাওয়ারফুল, একেবারেই উত্তর-আধুনিক, ওদের হাতে অবিশ্বাস্য সব টেকনলজি রয়েছে। আপনার সাথে এ ব্যাপারে আমার কোন কথা হয়নি। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আপনাদের গোয়েন্দা প্রধান ওদের সম্পর্কে সামান্য যা জানা গেছে জানা গেছে তা জানিয়েছি।’ আহমদ মুসা বলল। আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলে উঠল, ‘ইয়েস এক্সিলেন্সি, জনাব আহমদ মুসা অনুমান করছেন গ্লোবাল সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট এই কিডন্যাপের সাথে জড়িত আছে।’ ‘ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট! বলে ভ্রু কুঞ্চিত করে সৌদি নিরাপত্তা প্রধান বলল, ‘এমন কোন সংগঠনের নাম তো আমি শুনিনি। কিন্তু অনুমান বলছেন কেন মি. আহমদ মুসা?’ ‘অনুমান এই কারণে যে, এখনও বিষয়টা নিশ্চিত হয়নি। তবে গোটা ঘটনার মধ্যে দিয়ে এমন কিছু দিক সামনে এসেছে তাতে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটকেই অভিযুক্ত করতে হয়।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আল-হামদুলিল্লাহ! মি. আহমদ মুসা, ধন্যবাদ আপনাকে। আপনি দ্রুত একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, উদ্ধার-অনুসন্ধানের জন্যে এটা খুব বড় ব্যাপার। আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করুন, আমাদেরও সাহায্য করুন। গোয়েন্দা প্রধান মি. আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ আপনার তাঁর সাথে যাওয়া উচিত।’ আবার একটু থেমে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার মহান আংকল খাদেমুল হারামাইন শরীফের মহান বাদশা আপনাকে রিয়াদে স্বাগত জানিয়েছেন। মানুষের প্রতি ও ইসলামের প্রতি আপনার নি:স্বার্থ খেদমত তিনি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেছেন, বর্তমান উদ্ধার-অনুসন্ধানের দায়িত্ব নেয়ার আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন এবং আশা করেছেন, যত তারাতারি সম্ভব আপনার সাথে তার সাক্ষাত হবে।’ ‘এক্সিলেন্সি, তিনি আমাকে স্মরণ করায় আমি। তাকে আমার সালাম পৌঁছাবেন। আল্লাহ তাকে ইসলামের, মানুষের আরো খেদমত করার তৌফিক দিন!’ বলল আহমদ মুসা। ‘ধন্যবাদ মি. আহমদ মুসা।’ বলে সবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি এখন উঠতে চাই। আস্সালামু আলায়কুম।’ উঠে দাঁড়াল সৌদি নিরাপত্তা প্রধান। উঠে দাঁড়াল আবদুল রহমান ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ফয়সাল ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আবদুল আজিজ আল-সউদ। সবাই উঠে দাঁড়াল। একটা ফেরি বোট আল-মালওয়া বে’র নীল বুক চিরে এগুচ্ছে বাহরাইনের দিকে। এই বোটের একজন সাধারন প্যাসেঞ্জার আহমদ মুসা। ফেরি বোটটি দু’তলা। দু’তলার ডেক চেয়ারে বসেছে আহমদ মুসা। আল-মালওয়া ও বাহরাইনের মধ্যে দিনে নিয়মিত কয়েকবার ফেরি যাতায়াত করে। ফেরিগুলো বাহরাইনের আল-দুর থেকে রাজধানী মানামা পর্যন্ত ভিন্ন ডেস্টিনেশনে যাতায়াত করে। অনেকে আল-দুর, জও, আরাকাস ইত্যাদি স্থানে নেমে সড়ক পথে বিভিন্ন স্থানে যায়। আহমদ মুসা যাচ্ছে আল-দুরে, দক্ষিন থেকে বাহরাইনের পূর্ব উপকূলে প্রবেশের প্রথম বন্দর। আহমদ মুসা হিসাব করেই বাহরাইরেন এ ছোট্ট বন্দরকে এন্ট্রিপয়েন্ট হিসাবে বাছাই করেছে। আহমদ মুসা আল-মালওয়া এসে আল-মালওয়া বে’থেকে উদ্ধার করা টিউব সাবমেরিন দেখেছে। টিউব সাবমেরিনে সে যা দেখার আশা করেছিল তা পেয়েছে। টিউব সাবমেরিনের বাইরে গা ও পুড়ে যাওয়া ভেতরের অংশে কোন চিহ্নই পায়নি। অবশেষে টিউব সাবমেরিনের কালো রংয়ের মাথায় কালো রংয়ের একটা মনোগ্রাম পেয়েছে। একটা কালো সুট ঘিরে সুঁচালো মাথার কালো ত্রিভুজ সজ্জিত কালো একটা রিং। রিং-এর শীর্ষ বিন্দুতে রিং-এর একটা ব্রেক। সেখানে ত্রিভুজের আকারে তীক্ষ্ণ ফলার সুদীর্ঘ বর্শা দাঁড়িয়ে। বর্শার দু’পাশে ছোট ছোট দু’টি ত্রিভুজ। আহমদ মুসা নি:সন্দেহ হয় যে, এটাই ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের সেই মনোগ্রাম। জোসেফাইন ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের মনোগ্রামের এমন একটি বর্ণানাই দিয়েছিল। টিউব সাবমেরিনেই ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট তাদের বিজ্ঞানীকে নিয়ে পালাতে চেষ্টা করেছিল, এটা নিশ্চিত হবার সংগে সংগেই আহমদ মুসা আল-দুরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। সে নিশ্চিত, ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের লোকরা টিউব সাবমেরিন থেকে বেরিয়ে যদি অন্য কোন জলযানে উঠে চলে না গিয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই তারা কূলে ওঠা ও অন্য কোথায় যাবার জন্যে সবচেয়ে কাছের আল-দুর বন্দরকেই ব্যবহার করেছে। যদি এটাই ঘটে থাকে, তাহলে দ্রুত বাহরাইনে পৌঁছতে পারলে ছোট্ট এই দেশে ওদের খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। অবশ্য আহমদ মুসা এটাও চিন্তা করেছে যে, তারা বাহরাইনে পৌঁছতে পারলে ছোট্ট এই দেশে ওদের খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। অবশ্য আহমদ মুসা এটাও চিন্তা করেছে যে, তারা বাহরাইন থেকে ডেষ্টিনেশনে যাবার বিকল্প ব্যবস্থা করতে অবশ্যই বেশি সময় নেবে না। তার মনে হয়েছে আজ দিনের অবশিষ্ট সময় ও রাতটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বোটের ডেকে আহমদ মুসা ছাড়া আরও অনেকে বসে আছে। চাঁদোয়া টাঙানো থাকায় উন্মুক্ত ডেকের সুবিধা নেই, তবে সরাসরি সূর্যের তাপ থেকে বাঁচা যাচ্ছে। তার উপর সাগরের অব্যাহত বাতাস। পরিবেশটা ঘুম পাড়িয়ে দেবার মত। আহমদ মুসার দু’পাশে, সামনে, পেছনে সব দিকেই বেদুইন শ্রেণীর আরব। তারা অবিরাম কথা বলছে। তাদের কথার মাঝখানে নিরব আহমদ মুসার অস্থিত্বই যেন হারিয়ে গেছে! আহমদ মুসার চোখ কিছুটা ধরে এসেছিল। হঠাৎ তার পাশে দু’জন আরবের কথাবার্তা তার ঘুম ছুটিয়ে দিল। আহমদ মুসার একদম পাশের জন বলছিল, ‘বেঁচে থাকলে আরও কত কি যে দেখতে হবে! আজ সকালে আমাদের ঘাট থেকে আল-দুরে যাবার সময় আমার নৌকার সামনে ৫ জন লোককে ভেসে উঠতে দেখলাম। প্রথমে বুঝতে পারিনি তারা মানুষ। কয়েকটা টিউব ভেসে উঠেছিল পানির উপর। টিউবের মাথায় টর্চের মত মাথাওয়ালা কিছু বসানো। টিউবের মাথা পানির উপর ভেসে ওঠার পরপরই টিউবের মাথা দু’ভাগ হয়ে দু’দিকে সরে যায়। তারপরই সেখান থেকে মানুষ বেরিয়ে আসে। তারা উপকূলে ওঠার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু খাড়া উপকূলে উঠতে পারছিল না। আমার নৌকা ওরা দেখতে পায়। আমার সাহায্য চাইলে আমি ওদের নৌকায় তুলে নিয়ে একটু সামনে নিয়ে গিয়ে সমভূমির মত উপকূলে নামিয়ে দেই। ওরা নাকি ট্যুরিষ্ট! ঐ টিউবে ঢুকে পানির তল দিয়ে আল-আসকার থেকে নাকি এদিকে এসেছে। ওদের একজন অসুস্থ হওয়ায় ওদের কূলে উঠতে হয়েছে। লোকটি টিউবের মধ্যেই নাকি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছিল। ওদের ডুবুরির পোষাক আমি দেখেছি। ওতে অক্সিজেন ট্যাংক সাথে নিতে হয় না। টিউবেও সে রকম কিছুই ছিল না। তাহলে ওরা অক্সিজেন ছাড়া ঘন্টার পর ঘন্টা পানির তলে থাকে কি করে! একদম ভূতুড়ে ব্যাপার!’ থামল লোকটি। আহমদ মুসার মনে কৌতূহল ও জিজ্ঞাসা তখন চরমে। আহমদ মুসা লোকটির দিকে তাকিয়ে সুন্দর আরবী ভাষায় বলল, ‘ভাই, আপনার মজার কাহিনী আমিও শুনলাম। সত্যিই খুব আশ্চর্যের ব্যাপার! ঘটনা আজকে ঘটেছে, কয়টায়?’ বেদুইন আরব আহমদ মুসার দিকে তাকাল। তার মুখে হাসি। বলল বেদুইন লোকটি, ‘তখন সময় সাড়ে নয়, পৌনে দশটা হবে। আমি আল-দুরে আসছিলাম সাড়ে দশটার ফেরি ধরব বলে। পথেই ঐ ঘটনা।’ ‘ওরা কি বিদেশী? অসুস্থ লোকটাকেও দেখেছেন? লোকটা সংজ্ঞাহীন হওয়ার পরও ওরা কি টিউব চালিয়ে এসেছে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। আহমদ মুসা তার উদ্দেশ্য আড়াল করার জন্যে বোকার মতও কিছু প্রশ্ন করছে। ‘অসুস্থ লোকটিকেও দেখেছি। সে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেই ওরা নাকি থেমে গেছে। সবাই ওরা বিদেশী। তবে অসুস্থ লোকটির পোষাক অন্যদের মত নয়। তার পরনে ঢিলা পাজামা, কুর্তা ছিল। তার পায়ে-হাতে ছিল রাবারের মোজা দস্তানা। ওদের মোট ছয়জনের মধ্যে একজন মেয়ে ছিল। সেও ছিল পুরুষের পোষাকে।’ বলল বেদুইন আনন্দের সাথে। ‘যে টিউবের মধ্যে ওরা ছিল সেগুলো কি করল?’ বলর আহমদ মুসা। ‘সেটাও এক আশ্চর্য! টিউব যখন গুটাল তখন এক একটা ব্যাগে পরিণত হলো। ব্যাগগুলো কাঁধে ঝুলিয়ে ওরা চলে যায়।’ বেদুইন লোকটা বলল। ‘টিউবের ভেতরে ইঞ্জিন ধরনের কিছু ছিল না?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘ঠিক ধরেছেন আপনি। কিছু ছিল টিউবের মধ্যে। তা না হলে ব্যাগগুলো কিছুটা ভারী হলো কেন?’ বলল বেদুইন। বেদুইন যতটা আনন্দিত হয়ে জবাব দিচ্ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দ আহমদ মুসার মধ্যে। তাহলে কিডন্যাপাররা বাহরাইনে ঢুকেছে, সে ব্যাপারে আর কোন সন্দেহ নেই। অসুস্থ লোকটিই তাদের বিজ্ঞানী। তাকে বেদুইন লোকটি শ্বেতাংগ চেহারায় দেখেছে। কারণ তাকে শ্বেতাংগ-সিকনের মুখোশ পরানো ছিল। তার গায়ের রং আড়াল করার জন্যেই বিজ্ঞানীর হাতে-পায়ে মোজা-দস্তানা পরানো ছিল। তার পোষাক পাল্টানোর সময় কিডন্যাপররা পায়নি। ঢিলা পাজামা-কামিজ ছিল বিজ্ঞানীর ঘুমানোর পোষাক। আবার কথা বলল আহমদ মুসা হাসতে হাসতে, ‘ওদের একটা টিউব পেলে মন্দ হতো না! এগুলো আমাদের দেশে এখনও আসেনি।’ ‘ঠিক বলেছেন। অমন জিনিস পেলে তাদের মত নিশ্চিন্তে পানিতে চলাফেরা করা যেত!’ বেদুইনও বলল হাসতে হাসতে। ‘ওরা আপনার সাথে কি ভাষায় কথা বলল?’ বলল আহমদ মুসা। ‘ট্যুরিষ্টরা যেমন বলে ইংরেজি মেশানো ভাঙা আরবিতে।’ বেদুইন বলল। আবার হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমি হলে কিন্তু বলতাম, একটা টিউব দিয়ে যাও।’ ‘দেখি, আবার দেখা হলে কোথায় পাওয়া যায় ওগুলো, জেনে নেব।’ বেদুইন লোকটি বলল। ‘কোথায় গেল ওরা, থাকে কোথায়, কোথায় উঠেছে? ওরা বলেনি কিছু?’ ‘হ্যাঁ, জিনিসগুলো দারুন মজার! কোথায় উঠেছে ওরা বলেনি। শুধু ঐটুকুই বলেছিল তারা আল-আসকার থেকে আসছে।’ বেদুইন বলল। ‘হ্যাঁ, ওখান থেকে আসতে পারে। তবে ট্যুরিষ্টরা প্রথমে আসে মানামাতেই।’ আহমদ মুসা বলল। কিন্তু মনে মনে আহমদ মুসা বলল, পুরোটাই ওরা আপনাকে মিথ্যা বলেছে বেদুইন ভাই। দুর্ঘটনার শিকার হয়ে বাহরাইনে এসেছে ট্যুরিষ্ট সেজে। নিশ্চয় ওদের উদ্ধার করার জন্যে বিকল্প যান আসছে। যতক্ষণ না আসছে ততক্ষণই মাত্র ওরা থাকবে বাহরাইনের কোথাও না কোথাও। কোথায় থাকবে তারা? ওরা বাহরাইনে থাকার এ সময়টা খুবই মূল্যবান। সে কি পারবে এই সময়ের মধ্যে ওদের কাছে পৌঁছতে? আহমদ মুসা একটুক্ষণ নিরব হয়ে পড়েছিল এসব চিন্তায়। ইতিমধ্যে বেদুইন লোকটি তার ওপাশের সাথীর সাথে কথা শুরু করে দিয়েছে। আহমদ মুসা খুশিই হলো। তার নিরিবিলি একটু সময় দরকার। ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের এদের বাহরাইনে ঢোকার এই খবর সৌদি গোয়েন্দা প্রধান আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহকে জানানো দরকার। ওদিক থেকে তিনিও বাহরাইন গোয়েন্দা পুলিশকে বলে এদের সন্ধানের চেষ্টা করতে পারেন। আহমদ মুসা বাহরাইনে আসছে এ ব্যাপারটা সৌদি সরকার আগেই বাহরাইনকে বলেছে। এক সময় বেদুইন লোকটি আহমদ মুসার দিকে ফিরল। বলল, ‘আপনি বাহরাইনের নন, সউদি আরবেও নতুন নিশ্চয়।’ ‘কি করে বুঝলেন?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার বেদুইনকে। ‘আমরা বেদুইনরা ভাষা চিনি, এমনকি আরবের কোন কবিলার ভাষা কেমন, তাও মোটামুটি আমরা জানি।’ বলল বেদুইন লোকটি অনেক গর্বের সাথেই। ‘ঠিক বলেছেন। তবে আমি মদিনা শরীফের বাসিন্দা।’ আহমদ মুসা বলল। ‘বাহরাইনে ব্যবসায়-বাণিজ্য না বেড়াতে এসেছেন?’ জিজ্ঞাসা বেদুইনের। ‘এবার বেড়াতেই এসেছি।’ আহমদ মুসা বলল। ‘মদিনা থেকে এই অদ্ভুত পথে কেন, কিং ফাহাদ কজওয়ে বাদ দিয়ে?’ বলল বেদুইন। বেদুইনের এই কথাবার্তায় বিস্মিত হলো আহমদ মুসা। তার এই সর্বশেষ প্রশ্ন ও ভাষা সম্পর্কে তার জ্ঞান সাধারণ বেদুইনের চেয়ে বড় কিছু তাকে প্রমাণ করে। আহমদ মুসা একটু হাসল। বলল, ‘আমাকে যে প্রশ্ন করলেন, এমন প্রশ্ন টিউবে করে পানি থেকে উঠে আসা ট্যুরিষ্টদের করা উচিত ছিল। যে ‘টিউব বডি ভেইকেল’ এর কথা আমাদের মত মানুষরা শোনেইনি, যে ‘টিউব বডি ভেহিকেল’ সাধারণ ট্যুরিষ্টরা এত সংখ্যায় পেল কি করে?’ বেদুইন লোকটিও হাসল। বলল, ‘প্রশ্ন করলে আরও কিছু মিথ্যা কথা শুনতে হতো। তাই প্রশ্ন করিনি।’ কিছুটা বিস্ময় আহমদ মুসার চোখে-মুখে! বলল, ‘তাহলে ওদের সন্দেহ করেছিলেন?’ ‘কিছুটা।’ বলল বেদুইন লোকটি। ‘কিন্তু কিছু তো বলতো। কিন্তু প্রশ্ন না করে ছেড়ে দিয়েছেন?’ আহমদ মুসা বলল। ‘কে বলল ছেড়ে দিয়েছি? থানায় টেলিফোন করেছিলাম। ওরা বন্দী। নিশ্চয় এতক্ষন কথা কিছু বের হয়েছে।’ বলল বেদুইন লোকটি। ‘বন্দী! ওরা বন্দী সত্যিই?’ প্রবল উচ্ছাস আর বিস্ময় নিয়ে কথা কয়টি বের হয়ে এল আহমদ মুসার মুখ থেকে! একটু চমকেই উঠল বেদুইন লোকটি। পাশের লোকরাও বিস্মিত কন্ঠে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। কিন্তু এসব দিকে আহমদ মুসার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। বলল, ‘প্লিজ আপনি থানায় টেলিফোন করুন। থানায় আটক থাকার মত লোক ওরা নয়। কি হয়েছে দেখুন।’ বিস্ময় বেদুইন লোকটির চোখে-মুখে। বলল, ‘আপনি ওদের চেনেন?’ ‘চিনি না, জানি আমি ওদের। ওদের সন্ধানেই আমি বাহরাইন যাচ্ছি।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আপনি কারো সন্ধানে বাহরাইন যাচ্ছেন সেটা আমি জানি। বাহরাইন থেকেই আল-মালওয়াতে আমাকে নির্দেশ পাঠানো হয়েছে আপনার সঙ্গ দিয়ে বাহরাইনে নেবার জন্যে।’ বলল বেদুইন লোকটি। ‘একটু দেরিতে সেটা আমি বুঝতে পেরেছি। ধন্যবদ আপনাকে। প্লিজ আপনি থানায় টেলিফোন করুন।’ আহমদ মুসা বলল দ্রুত কন্ঠে। ‘আমাদের বাহরাইনের থানাগুলো বিশ্বস্ত আর দক্ষও। আশা করি থানা তাদের ব্যাপারে আইনে প্রসেস শুরু করেছে।’ বেদুইন লোকটি পকেট থেকে মোবাইল বের করতে করতে কথাগুলো বলল। কল করল সে থানায়। ওপার থেকে সাড়া পেতেই সালাম দিয়ে বেদুইন লোকটি জিজ্ঞাসা করল বন্দীদের কথা। ওপারের কথা শুনেই এক পোঁচ কালিতে তার মুখটা যেন ঢেকে গেল! বলল, ‘পরের খবর কি?’ ওপারের সাথে কথা শেষ করে কল অফ করতেই আহমদ মুসা বলে উঠল দ্রুত কন্ঠে, ‘কি খবর? খারাপ খবর? বন্দীরা পালিয়েছে? ‘স্যরি। আপনার কথাই সত্যি হয়েছে।বন্দীরা পালিয়েছে। বন্দীদের নিয়ে থানায় পৌছার পর থানার পুলিশরা কৌতুহলী হয়ে এসেছিল থানার হল ঘরে। তখন হঠাৎ সব পুলিশ সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলে এবং সেই সুযোগে তারা পালিয়ে যায়।’ বলল বেদুইন। শুষ্ক কন্ঠ তার। সাধারন থানা ওদের আটকাতে পারবে না। আহমদ মুসা এটা জানলেও অবধারিত সে বিষয়টা খুবই কষ্টদায়ক হলো আহমদ মুসার জন্যে। বেদুইন লোকটি থামলেও আহমদ মুসা কোন কথা বলতে পারল না। নানা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে আহমদ মুসার মাথায়। কোথায় পাওয়া যাবে এখন ওদের? হাত ফসকে বেরিয়ে যাবার পর ওরা এখন আরও সতর্ক নিশ্চয়। আহত বাঘের মত এখন ওরা। অতি দ্রুত তারা বাহরাইন থেকে সরে পড়ার চেষ্টা করবে। অবশ্য বিকল্প যান না আসা পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করতেই হবে। কোথায় অপেক্ষা করবে? এই মুহুর্তে এই জায়গা খুঁজে পাওয়াই তাদের সামনের প্রধান কাজ। আহমদ মুসার চিন্তা থেমে গেল বেদুইন লোকটির কথায়। বলল বেদুইন লোকটি, ‘আপনি দেখছি খুব কষ্ট পেয়েছেন? আসলে ওরা কারা?’ ‘ওরা দুর্ধর্ষ একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী দলের সদস্য। আমাদের একজন শীর্ষ বিজ্ঞানীকে কিডন্যাপ করে নিয়ে ওরা পালাচ্ছে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ও ব্যাড লাক, ঐ অসুস্থ লোকটিই কি তাহলে ছিলেন বিজ্ঞানী।’ বলল বেদুইন লোকটি। ‘আচ্ছা, ওরা থানা থেকে বাহরাইনের কোথায় পালাতে পারে বলুন তো?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। বেদুইন লোকটি একটু ভেবে বলল, ‘উপকূলের কাছাকাছি কোন স্থানে?’ ‘সেটা কোথায় হতে পারে?’ বিভক্ত হয়ে উপকূল এলাকার বিভিন্ন হোটেলে।’ ‘শুধু বিভক্ত হয়ে নয় ছদ্ধবেশও নিতে নিতে পারে তারা।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ঠিক বলেছেন। ওদের স্কিন মুখোশগুলো একেবারে নিখুঁত। ওরকম তাদের গ্লাভস মোজাও আছে নিশ্চয়।’ বলল বেদুইন লোকটি। ‘আমার সম্পর্কে তো আপনি ব্রিফড হয়েছেন। এবার আপনার নাম-পরিচয়টা বলে ফেলুন। আমরা আল-দুরে এসে গেছি প্রায়।’ আহমদ মুসা বলল। হাসল বেদুইন লোকটি। বলল, ‘আমি প্রকৃতই এক বেদু্ইন পরিবারের ছেলে। বেদুইনের পোষাক পরতে আমি কমফর্ট ফিল করি বলে এই পোষাকই আমি সাধারনত পরে থাকি। বাহরাইনের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের একজন অফিসার আমি। আমার নাম আবদুল আলী আল-হামাদী। আমার আর কিছু পরিচয় নেই। আপনার সম্পর্কে কার্যত কিছুই জানি না। আমার মোবাইলে আপনার ফটো পাঠিয়ে বলা হয়েছে ইনি একজন ভিভিআইপি ব্যাক্তিত্ব। একটা মিশন নিয়ে বাহরাইন আসছেন। তাঁকে সঙ্গ দেবেন এবং তিনি যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে তা নিশ্চিত করবেন। আপনার নামটাও তারা আমাকে জানাননি।’ হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমার নাম আহমদ।’ ‘ধন্যবাদ, আর জানার দরকার নেই। আপনার মিশনটাও বুঝেছি। বিজ্ঞানীকে উদ্ধার।’ বলল আবদুল আলী আল-হামাদী। আহমদ মুসা আল-হামাদীর সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল, ‘চলুন, আমরা বন্দর আল-দুর থেকে আমাদের কাজ শুরু করি।’ ‘ওয়েলকাম স্যার। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা যাতে আমরা ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড’ বলতে পারি।’বলল আল-হামাদী। ‘সফল না হওয়ার ক্ষেত্রে আপনার মতে কি কি দিক আছে বলুন তো? আহমদ মুসা বলল। ‘প্রথম, ওদের ছদ্মবেশ নেয়ার দক্ষতা।দ্বিতীয়, প্রথমেই তারা গ্রেফতার হওয়ার মত ধাক্কা খাওয়ার পর ওরা সাগরেও নেমে যেতে পারে, এমনকি মাঝের অপ্রশস্ত উপসাগর পাড়ি দিয়ে কাতারেও চলে পারে।’ বলল আল-হামাদী। ‘ধন্যবাদ আল-হামাদী। ওরা যদি ভয় পেয়ে থাকে, তাহলে আপনার কথা সত্য হবে। কিন্তু ওরা দারুণ আত্মবিশ্বাসী। ভয় ওরা পায় না। ওদের এই আত্মবিশ্বাসই তাদের সাফল্য পুঁজি।’ আহমদ মুসা বলল। আল-দুরের জেটিতে নোঙর করল আহমদ মুসাদের বোট। আল-দুরের জেটিতে নোঙর করল আহমদ মুসাদের বোট। আহমদ মুসা ও আল-হামাদী উঠে দাঁড়াল এক সাথেই। ৩ আহমদ মুসার গাড়ি বাহরাইনের আল-মুহাররেক দ্বীপের উপকূল হাইওয়ে ধরে তীব্র বেগে এগিয়ে চলছিল পূর্ব উপকূলের ‘‘আল-হিদ’-এর দিকে। ‘আল-হিদ সাগরের পানি ঘেঁষে দাঁড়ানো বিখ্যাত পর্যটন শহর। আল-দুর বন্দরে নেমে খোঁজ-খবর নেয়ার পর আহমদ মুসারা বাহরাইনের রাজধানী মানামায় এসেছিল। মানামার একটা ব্রীফ চিত্র সামনে আনার পর মানামার শীর্ষ হোটেল গোল্ডেন টিউলিপের একটা কক্ষে বসে আহমদ মুসা বাহরাইনের মানচিত্র গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে আল-হামাদীকে বলেছিল, আমার মনে হয় ওরা সব দিক বিবেচনা করে আল-মুহাররেক দ্বীপকে বেছে নিয়েছে। আহমদ মুসার কথা শুনে আল- হামাদী বলেছিল, আল-মুহাররেক দীর্ঘ দ্বীপ। কোথায় আমরা ওদের তালাশ করব? আহমদ মুসা বলেছিল, আল-মুহাররেকে দ্বীপে তেমন বন-বাদাড় নেই ওদের লুকিয়ে থাকার মত। সুতরাং ওরা মানুষের ভিড়কেই বেছে নেবে নিজেদের হাইড করার মত। তাছাড়া এমন এক স্থানে আশ্রয় নেবে যেখান থেকে তাদের চলে যাওয়া বা পালোনো সহজ হয়। এ জন্যে সমুদ্রের উপকূল, বিশেষ করে সমুদ্রের পানি সংলগ্ন জায়গা ওরা বেছে নেবে ওদের লুকানোর জন্যে। এ সব দিকের বিবেচনায আমি মুহাররেক দ্বীপের পূর্ব উপকূলের আল-হিদ’-কে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। মুল শহরটাই বলা যায় সমুদ্রের গা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মধ্যে আল-হিদের সবচেয়ে ক্রাউডেড হোটেল’ সী-গাল বাহরাইন’ আর ‘সী গাল বাহরাইন’ তো গোটাটাই সমুদ্রের উপর ভাসছে! গোটা বাহরাইনে এর চেয়ে আইডিয়াল জায়গা সমুদ্রচারী কিডন্যাপাদের জন্যে আর দ্বিতীয়টি নেই বলে আমার মনে হয়। আল-হামাদী সোৎসাহে আহমদ মুসার কথায় সায় দিয়েছিল। এই চিন্তার সাথে সাথেই আহমদ মুসা ও আল-হামাদী আল-মুহাররেক দ্বীপের ‘আল-হিদে’র উদ্দেশ্য বের হয়। ‘আল-হিদ’ শহরে প্রবেশ করেছে আহমদ মুসাদের গাড়ি। আল-হিদ শহরটি উপকূল বরাবর লম্বালম্বি গড়ে তোলা হয়েছে। গভীর সাগর থেকে উঠে আসা পাহাড়ের গোড়ায তৈরি হয়েছে শহরটি। পাহাড়ের পাদদেশটা পাথুরে, দীর্ঘ ও প্রশস্ত। এটাই আল-হিদ শহরের ভিত্তিভূমি। হোটেল ক্যাম্পাসে প্রবেশ করল আহমদ মুসাদের গাড়ি। পার্কিং-এ গাড়ি রেখে দু’জনে হোটেলের লাউঞ্জে প্রবেশ করল। ‘মি. আল-হামাদী, আপনি এদের ডিসপ্লে ষ্ট্যান্ড থেকে হোটেলের ক্যাটালগটা নিয়ে আসুন।’ বলে আহমদ মুসা সোফায় গিয়ে বসল। হোটেলের ক্যাটালগ নিয়ে আল-হামাদী এসে আহমদ মুসার পাশে বসল। আহমদ মুসা হোটেলের ক্যাটালগে একবার চোখ বুলিয়ে বলল, ‘হোটেলে স্পেশাল স্যুট ছাড়াও এপার্টমেন্ট রয়েছে। স্যুট ও এপার্টমেন্ট প্রায় সব ক’টারই ফ্রন্ট দেখা যাচ্ছে সাগরের দিকে। যে সব স্যুট এপার্টমেন্টের ফেস সাগরের দিকে, সেগুলোর বাসিন্দাদের বিবরণ যোগাড় করুন। ইতিমধ্যে আমি দেখছি কোন এপার্টমেন্ট খালি আছে কিনা।’ উঠল আহমদ মুসা্। এগোলো রিজার্ভেশন কাউন্টারের দিকে। উঠে দাঁড়িয়েছিল আল-হামাদী্ও। এপার্টমেন্ট রিজার্ভেশনে গিয়ে আহমদ মুস দেখল যে, একটিও খালি নেই। আহমদ মুসা মনে মনে একটা হিসাব কষে বলল, ‘কিন্তু আমি জেনেছিলাম একটা খালি আছে।’ ‘স্যার, আজ সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দু’টি এপার্টমেন্ট খালি ছিল। পরে দু’টিই ভাড়া হয়ে গেছে।’ বলল রিজার্ভেশন অফিসার। ‘এক সাথে দু’টি?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘জি, স্যার।’ বলল রিজার্ভেশনের লোকটি। ‘তাহলে কি আমার বন্ধুরা আগেই এসে গেছে! প্লিজ নামগুলো একটু দেখি। ওরা হলে তো আমাদের রিজার্ভেশনও হয়ে গেছে।’ বলল আহমদ মুখে খুশির ভাব টেনে। ‘অবশ্যই স্যার, দেখুন। কিন্তু ওরা তো বিভিন্ন বয়সের। বাবার বয়সেরও আছেন।’ বলে রিজার্ভেশনের লোকটি রিজার্ভেশন রেজিষ্টারের সংশ্লিষ্ট পাতা আহমদ মুসার সামনে মেলে ধরল। আহমদ মুসা দেখল, নামগুলো সব ইউরোপীয়ান। বিভিন্ন বয়সের। দু’জন পঞ্চাশোর্ধ্ব। দু’জনের বয়স চল্লিশের উপরে। একজনের তিরিশ। অবশিষ্টজনের পঁচিশ। মনে মনে হতাশ হওয়ার ভংগিতে বলল আহমদ মুসা, ‘না, এরা নয়। তাহলে ওরা কি স্যুটে উঠেছে! আচ্ছা, বলুন তো আজ কয়টি স্যুটের রিজার্ভেশন হয়েছে?’ ‘স্যার, আজ কোন স্যুটের রিজার্ভেশন হয়নি। সব স্যুট আগে থেকেই ভর্তি।’ বলে রিজার্ভেশনের লোকটি একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘স্যার, ঘন্টাখানেকের মধ্যে একটা এপার্টমেন্ট রিজার্ভেশনের জন্যে রেডি হবে। এ এপার্টমেন্টের পাশেই সে এপার্টমেন্টটি। আপনি ইচ্ছা করলে এখনি বুক করতে পারেন। ঘন্টাখানেক কষ্ট করতে হবে আপনাকে।’ আহমদ মুসা বসে ভাবল, আল্লাহ যখন তাদের জন্যে এই এপার্টমেন্টটাই মেলাচ্ছেন, তখন নেয়াই উচিত। পরের চিন্তা পরে হবে। ‘ঠিক আছে রিজার্ভেশন করে ফেলুন।’ বলল আহমদ মুসা। রিজার্ভেশন অফিসার একটি ফরম এগিয়ে দিলে আহমদ মুসা সেটা পূরণ করে টাকা দিয়ে ফিরে এল লাউঞ্জে আগের সোফায়। একটু পর ফিরে আল-হামাদীও। ‘মি. আল-হামাদী, স্যুট ও এপার্টমেন্টে আশার আলো আমি দেখছি না। একমাত্র দু’টো এপার্টমেন্টে বেলা ১টার দিকে নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে। তারা সংখ্যায় ছয় বটে, কিন্তু বয়সে আকাশ পাতাল। দেখি আপনার লিষ্টটায় নতুন কিছু আছে কিনা। বলে আহমদ মুসা আর-হামাদীর হাত থেকে স্যুট ও এপার্টমেন্টের বাসিন্দাদের তালিকা নিয়ে নিল। নজর বুলাল সব শেষে এপার্টমেন্টে ওঠা দুই এপার্টমেন্টের সেই ছয়জনের বিবরণের উপর। ছয়জনের সবাই নিউজিল্যান্ডের নাগরিক। বলল, ‘নামগুলো দেখে ভেবেছিলাম এরা ইউরোপীয়, কিন্তু এখন দেখছি এরা নিউজিল্যান্ডের নাগরিক। এটুকু নতুন পাওয়া গেল।’ ‘তাহলে আমাদের এখানে আসাটা কি ব্যার্থ হলো?’ বলল আল-হামাদী। ‘অনেক বিবেচনা সামনে নিয়ে এখানে এসেছি। বিবেচনাগুলো আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন। অতএব, হতাশা নয়। এপার্টমেন্টে উঠতে এখনও এক ঘন্টা বাকি। চলুন, সময়টা আমরা কফিখানায় কাটাই। বিকেলে তো কফিখানায় অনেক লোক পাওয়া যাবে।’ বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। দু’জনে চলল কফিখানার দিকে। দু’জনের পরনেই শিখ ট্যুরিষ্টের ছদ্ধবেশ। বিশাল কফিখানা। অনেক লোক, তবু ফাঁকাই মনে হচ্ছে। কফিখানার এক প্রান্তের মঞ্চে আরবী পোষাকে একজন ইউরোপীয় গায়িকা হালকা সুরে সেতার বাজিয়ে গান গাচ্ছে। দু’জন সেই আরবী পোষাকে ইউরোপীয় তরুনী গানে সঙ্গ দিচ্ছে হালকা রকমের শরীর দুলিয়ে। বাহরাইনের কফিখানায় বিকালেও কফি পানের চল আছে। কফিখানায় নজর বুলাল। সাগর প্রান্তের টেবিলগুলোতেই ভিড় বেশি। দেখা গেল দু’টি চেয়ারের একটা টেবিল খালি আছে। আহমদ মুসা নিউজ পেপার ষ্ট্যান্ড থেকে একটা ইংরেজি পত্রিকা নিয়ে এগোলো সেই ফাঁকা টেবিলটার দিকে। টেবিলও একটা ইংরেজি পত্রিকা পড়ে ছিল। আহমদ মুসা টেবিলে পৌঁছতেই ওয়েটার কাগজটা নিয়ে যাচ্ছিল। ওটা ভিন্ন একটা ইংরেজি দৈনিক। ‘ওটাও আমি দেখব, রেখে যান প্লিজ।’ বলল ওয়েটারকে আহমদ মুসা। আহমদ মুসা ও আল-হামাদী বসল টেবিলে। আহমদ মুসার পেছনেই আরেকটা টেবিল। চারজনের টেবিল। তাতে চারজন শ্বেতাংগ বসে আছে। আহমদ মুসা কফির অর্ডার দিয়ে পত্রিকা খুলে পড়তে লাগল। পেছনের টেবিলের কথাবার্তা নিচু স্বরে হলেও কিছু টুকরো টুকরো শব্দ তার কানে আসছিল। শব্দগুলো ইংরেজি নয়। দু’একটা কন্ঠ পরিচিত হিসাবে কানে বাজছে। মাঝে মাঝে ইংরেজি শব্দও আসছে। কিন্তু পরক্ষনেই কন্ঠ আবার অপরিচিত শব্দে চলে যাচ্ছে। আহমদ মুসা দেখল ওদের উচ্চারণচটা সাবলীল, কিন্তু অপরিচিত ভাষাটা তাদের কন্ঠে সাবলীল শোনাচ্ছে না। যা হোক, ওদের কথাবার্তায় মনোযোগী হওয়ার এবং সেদিক থেকে মনোযোগ সরাতে না পারায় আহমদ মুসার খবরের কাগজ পড়া এগোল না। ইতিমধ্যে এসে গেল কফি। এবার কফির কাপে মনোযোগ দিল আহমদ মুসা। এখন তার খেয়াল হলো পেছনের কথাবার্তা আর কানে আসছে না। সংগে সংগে মাথা ঘুরিয়ে দেখল পেছনের টেবিল খালি। কফির সাথে সাথে এবার কাগজে মনোযোগ দিল আহমদ মুসা। ‘বাহরাইন টাইমস’ পড়ার পর আহমদ মুসা ‘বাহরাইন ইন্টারন্যাল’ পত্রিকা টেনে নিল। পত্রিকাটি খোলা অবস্থায় ভাঁজ করা ছিল। ভেতরের খোলা অংশের উপর চোখ পড়তেই চোখ আটকে গেল পত্রিকার মার্জিনে একটা লেখার উপর। তিন শব্দের একটা লেখা। ইংরেজি বর্ণমালায়, কিন্তু শব্দগুলো ইংরেজি নয়। মনোযোগ দিয়ে পড়ল আহমদ মুসা। বিস্মিত হলো আহমদ মুসা, এ যে তাহিতিয়ান ভাষা! হঠাৎ আহমদ মুসার মাথায় এল, ‘পেছনের টেবিলের যে শব্দগুলো তার কানে এসেছে, সেগুলোও তো তাহিতিয়ান! তাহলে এ টেবিলেও কি ওদেরই কেউ বসেছিল? পাশ দিয়ে ওয়েটার যাচ্ছিল। আহমদ মুসা তাকে ডাকল। জিজ্ঞাসা করল, ‘এ টেবিলে আমাদের আগে কারা বসেছিল, জান?’ ‘স্যার, আপনাদের পেছনের টেবিলের ৪ জনের দু’জন আগে এই টেবিলেই বসেছিল, পরে ওরা ঐ টেবিলে উঠে যায়।’ বলল ওয়েটার। ‘ধন্যবাদ ওয়েটার।’ আহমদ মুসা বলল। ‘মোস্ট ওয়েলকাম স্যার!’ বলে ওয়েটার চলে গেল। আবার লেখার দিকে মনোযোগ চলে গেল আহমদ মুসার। আহমদ মুসা মিন্দানাও থাকাকালে মুর হামসারের কাছে তাহিতিয়ান ভাষা কিছুটা শিখেছিল। মুর হামাসার বলা যায় ঐ অঞ্চলের ভাষার একজন বিশেষজ্ঞ প্রায়। তিন শব্দের তাহিতিয়ান ভাষায় যে অর্থ আহমদ মুসা দাঁড় করাল তা হলো: ‘অ্যাটল ক্ষমতার রাজধানী আজ।’ অর্থ করার পর আহমদ মুসা বিস্মিত হলো, পত্রিকার যে মার্জিনে এই কথা লেখা আছে তার পাশেই পত্রিকার যে ফিচারটা লেখা তা ‘অ্যাটল’-এর উপর। পত্রিকার ৪ কলাম আট ইঞ্চি নিয়ে বিশাল ফিচারটা। ফিচারের শিরোনাম হলো: ‘স্রষ্টার এক অপরূপ সৃষ্টি পৃথিবীর অ্যাটল দ্বীপগুলো।’ শিরোনামটা আহমদ মুসাকেও আকৃষ্ট করল। ‘অ্যাটল’ জাতীয় দ্বীপের কথা সে শুনেছে, কিন্তু কিছুই জানে না সে এই দ্বীপগুলো সম্পর্কে। পড়ল আহমদ মুসা ফিচারটা। পড়ে আহমদ মুসাও স্বীকার করল ‘অ্যাটল দ্বীপ’ সত্যিই আল্লাহর বিস্ময়কর সৃষ্টি! কিন্তু মার্জিনে তাহিতিয়ান ভাষায় যা লেখা রয়েছে তার সাথে কোন সংগতি খুঁজে পেল না আহমদ মুসা। ‘অ্যাটল দ্বীপ’ সুন্দর, বিস্ময়কর ঠিক আছে, কিন্তু ক্ষমতার রাজধানী হলো কি করে? এই জিজ্ঞাসার কোন উত্তর খুঁজে পেল না আহমদ মুসা। বিষয়টা অর্থহীন অবচেতন একটা মন্তব্যও হতে পারে। ‘স্যার, মাগরিবের নামাজ ঘনিয়ে আসছে। এদিকে আমাদের বরাদ্দ এক ঘন্টা সময়ও পূর্ণ হয়ে গেছে। আমরা এপার্টমেন্টে গিয়ে নামাজ পড়তে পারি।’ বলল আল-হামাদী। লেখা নিয়ে আহমদ মুসার চিন্তায় ছেদ পড়ল। আহমদ মুসা আল-হামাদীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হোটেলের মসজিদ দোতলায়। খাবারের প্রধান হলপরও দোতলায়। আমরা মসজিদে নামাজ পড়ে, ডিনার শেষ করে তারপর এপার্টমেন্টে নেমে যাব।’ সব এপার্টমেন্টই সাগরের উপর একতলার বিশাল বর্ধিত ডক অংশে তৈরি। ‘ঠিক আছে, এটাই ভাল হবে। নামাজ পড়ে খাওয়ার আগে আমি একটু খোঁজ নিতে চাচ্ছি যে, আজ বেলা ১ টার দিকে কারা হোটেলে এসেছে।’ বলল আল-হামাদী। ‘ঠিক বলেছেন, ওটা খুব জরুরী। খাবার ফাঁকে আমরা লিস্টটা দেখে নেব। রাত দশটার পর সন্দেহজনক টার্গেটগুলোর-আমরা খোঁজ-খবর নিতে চাই। ‘ছয়’ সংখ্যাটা গুরুত্বপূর্ণ স্যার।’ বলল আল-হামাদী। ‘ঠিক বলেছেন, ওটা খুব জরুরি। খাবার ফাঁকে আমরা লিষ্টটা দেখে নেব। রাত দশটার পর সন্দেহজনক টার্গেটগুলোর-আমরা খোঁজ খবর নেব।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আমাদের পাশের এপার্টমেন্টেরও আমরা একটু খোঁজ-খবর নিতে চাই। ‘ছয়’ সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ স্যার।’ বলল আল-হামাদী। ‘অবশ্যই, মি. আল-হামাদী। এমন চিন্তা থেকেই তো ওদের পাশের এপার্টমেন্টটা নিয়েছি। শুধু ‘ছয়’ সংখ্যা নয় মি. হামাদী, ওরা একটার দিকে হোটেলে উঠেছে, এটাও গুরুত্বপূর্ণ। ওদের বয়স অবশ্যই বড় কথা, কিন্তু বয়স নানাভাবে বাড়ানো-কমানো যায়।’ আহমদ মুসা বলল। আল-হামাদীর চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘ঠিক তো, এ দিকটা তো আমার মাথায় আসেনি!’ আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘চলুন।’ আল-হামাদী উঠে দাঁড়াল। দু’জন বেরিয়ে এল কফিখানা থেকে। রাত ৯টায় আহমদ মুসারা লিফটে উঠল এ্যাপার্টমেন্টে নামার জন্যে। এক তলায় লিফটের দরজা খুলতেই এক নয়নাভিরাম দৃশ্য চোখে পড়ল আহমদ মুসাদের। ডেকের তিন প্রান্ত দিয়ে সাগরের ধার ঘেঁষে এপার্টমেন্টের সারি। এপার্টমেন্টের ফেসগুলো সব সমুদ্রের দিকে। এপার্টমেন্টগুলোর দু’পাশ ও পেছন ঘিরে বাগান। পেছনের বাগানগুলোর পরে দীর্ঘ প্রশস্ত ডেকে টেনিস-ব্যাডমিন্টনের কোর্ট ও শিশুদের খেলাখুলা করার মত জায়গা। এসবের মধ্যে দিয়ে লাল পাথরের রাস্তা তৈরি হয়েছে ফ্ল্যাটগুলোতে যাবার। প্রতিটি এপার্টমেন্টের টপে নিয়ন সাইনে এপার্টমেন্টের নাম্বার লিখা। আহমদ মুসাদের এপার্টমেন্ট নাম্বার ‘সিগাল সুইট-১১’।চোখ ঘুরাবার সময় সর্বশেষ নাম্বারটাও চোখে পড়ল:’সি-গাল তাজ-৩৩’। আহমদ মুসাদের এপার্টমেন্ট মাঝ বরাবর থেকে একটু ডান পাশে। তার মানে সিরিয়ালটা শুরু হয়েছে দক্ষিণের প্র্রান্ত থেকে। আহমদ মুসারা লাল পাথরের রাস্তা ধরে এঁকেবেঁকে এগুলো তাদের এপার্টমেন্টের দিকে। প্রতিটি এপার্টমেন্টের পেছনের বাগানের ভেতর দিয়ে এপার্টমেন্টে ওঠার গেট। আহমদ মুসারা বাগানের সু্ন্দর গ্রিলের গেট খুলে বাগানের ভেতরে প্রবেশ করল। বাগানের ভেতর দিয়েও সেই লাল পাথরের রাস্তা।লাল রাস্তা ধরে আহমদ মুসারা এগুলো গেটের দিকে। মাথায় নীল গম্বুজের পরা সুন্দর গেট। দামি কাঠের সুন্দর দরজা মুসলিম ঐতিহ্যের লতা-পাতার অপরূপ কারুকাজে ভরা। একদম সামনের ফেসটা মজবুজ, সুন্দর, উঁচু ফেন্সে ঘেরা প্রশস্ত লন। ফেন্সের মাঝখানে তালাবদ্ধ একটা গ্রিলের দরজা আছে। দরজা খুললেই পাওয়া যাবে একটা সিঁড়ি এবং সেটি নীচে নেমে গেছে। সিঁড়ির গোড়ায় বাঁধা আছে বোট। প্রতিটি এপার্টমেন্টের একই ব্যবস্থা কিনা, তা দেখার জন্যে আহমদ মুসা তাকাল পাশের এপার্টমেন্টের জন্য দশ দশ ফুটের সাইডগার্ডেনে নামা যায়। পাশের এপার্টমেন্টের সামনে চোখ পড়তেই ভূত দেখার মত আঁৎকে উঠল আহমদ মুসা। দেখল এপার্টমেন্টটি থেকে সাগরে নেমে যাওয়া সিঁড়ির গোড়ায় একটা টিউব সাবমেরিন ভাসছে। টিউব সাবমেরিনের গায়ের একটা হোল দিয়ে একজন প্রবেশ করছে, আরেকজন অপেক্ষমাণ হোলের মুখে। সংগে সংগেই আহমদ মুসার মাথায় এল এটাই তো সেই নিউজিল্যান্ডের ছয় জনের ভাড়া নেয়া ‘সি-গাল আল-হামরা-১২’ এপার্টমেন্ট! একটা প্রচন্ড ঝড়ে রহস্যের সব দরজা এক সাথেই খুলে গেল আহমদ মুসার সামনে। মুহূর্তের জন্যে একটা বিমূঢ়তা এসে আহমদ মুসাকে আচ্ছন্ন করল। তাকাল সে সাগরের সিঁড়িতে নামার গ্রিলের দরজার দিকে। ওটা তালাবদ্ধ। চাবি কোনটা বা কোথায় তা তার জানা নেই। খুঁজলে বা জিজ্ঞাসা করলে জানা যাবে। সে সময় কোথায়? এখনি ওদের আটকাতে হবে। আহমদ মুসা হাতে রিভলবার আগেই উঠে এসেছিল। গুলি করে আহমদ মুসা গ্রিলের দরজার তালা ভেঙে ফেলল। এক টানে দরজা খুলে ফেলল আহমদ মুসা। সাগরে নামার সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছিল দ্রুত। বুঝতে পেরেছে আল-হামাদীও। সেও আহমদ মুসার পেছনে ছিল। হঠাৎ সে চিৎকার করে উঠল, ‘স্যার, ওরা বোমা ছুঁড়েছে!’ আল-হামাদীর কথা শেষ হবার আগেই একটা কিছু এসে বুম করে ফেটে গেল তাদের পাশের গ্রিলে। আহমদ মুসার সেদিকে তাকাবারও সময় হলো না। কয়েকটা শব্দ তার কানে এল। তা ভাববারও তার সময় হলো না। তার দেহটা লুটিয়ে পড়ল খোলা দরজার উপর। তার পেছনে আল আল-হামাদীর দেহটাও ঝরে পড়ল দরজার পেছনে মেঝের উপর। কতক্ষণ সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে ছিল তা ভাবতে পারছে না আহমদ মুসা। সংজ্ঞা ফিরে আসতেই আহমদ তার কষ্টকর অবস্থায় পড়ে থাকাটা প্রথম উপলব্ধি করল। তার কোমর থেকে উপর দিকটা ছিল দরজার উপর। আর সিঁড়ির উপর ঝুলছিল দেহের পেছনের অংশ। আহমদ মুসা দ্রুত উঠে বসে তাকাল পাশের এপার্টমেন্টের সামনে। যেখানে সাগরে দাঁড়িয়ে ছিল টিউব সাবমেরিন। কিছুই সেখানে নেই। শান্ত, নিস্তরঙ্গ সাগরের বুক। আহমদ মুসা তাকাল হাত ঘড়ির দিকে। রাত ১ টা বাজে। তার মানে চার ঘন্টা সে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ছিল। আহমদ মুসা হিসাব করল বাহরাইনের আল-মুহাররেক দ্বীপ থেকে পারস্য উপসাগরের মুখ হুরমুজ প্রণালীয় দূরত্বের কথা। ছয়শ’ কিলোমিটারের কম হবে না। চার ঘন্টায় ৬শ’ কিলোমিটার অতিক্রম করা টিউব সাবমেরিনের জন্যে কঠিন নয়। তবু আহমদ মুসা তাঁর দেয়া অয়্যারলেস থেকে কল করল সৌদি নিরাপত্তা প্রধান ইবনে আবদুল আজিজ আল-সউদের কাছে। আহমদ মুসা বুঝল ঘুম থেকে উঠে তিনি কল রিসিভ করলেন। আহমদ মুসা সালাম দিতেই ওপার থেকে উদ্বিগ্ন কন্ঠে সৌদি নিরাপত্তা প্রধান আল-সউদ সালাম দিয়ে বলল, ‘আহমদ মুসা, আপনি ভাল আছেন?’ ‘এক্সিলেন্সি! চার ঘন্টা সংজ্ঞাহীন থাকার পর জ্ঞান ফিরে পেয়েই আপনাকে কল করছি!’ বলে আহমদ মুসা সব ঘটনা তাকে জানিয়ে বলল, ‘যদিও টিউব সাবমেরিন এতক্ষণে হুরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে যেতে পারে। তবু আপনি নির্দেশ দিয়ে দেখতে পারেন, হুরমুজ প্রণালীতে এই মুহুর্তে আপনাদের নৌবাহিনী পাহাড়া বসাতে পারে কিনা। হুরমুজ প্রণালীতে ওদের আটকাতে না পারলে পরে আর তা সম্ভব নয়।’ ‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা। আমি নির্দেশ দিচ্ছি। আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি যে, আপনি শুধু জানা নয়, কাছাকাছিও যেতে পেরেছেন। এটা বড় সাফল্য। আমরা দু:খিত আহমদ মুসা আপনাকে এই কষ্টে ফেলার জন্যে। এর কোন বিনিময় দেয়া তো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লাহ আপনাকে এর উপযুক্ত যাযাহ দিন।’বলল সৌদি নিরাপত্তা প্রধান আল-সউদ। ‘আল-হামদুলিল্লাহ! আল্লাহই আমাদের জন্যে যথেষ্ট। ওকে এক্সিলেন্সি আপনার সাথে পরে কথা বলব।আপনি ওদিকের কাজ সারুন। আসসালামু আলাইকুম।’ ধন্যবাদ দিয়ে, সালাম নিয়ে কল অফ করে দিল ওপার দিল থেকে আল-সউদ। আহমদ মুসা কল অফ করে দিয়ে মনোযোগ দিল আলী আল-হামাদীর দিকে। তার সংজ্ঞা এখনও ফিরে আসেনি। আরও সময় নিল আলী হামাদীর সংজ্ঞা ফিরে আসতে। আহমদ মুসা বসেছিল গ্রিলের দরজায়। তার দুই পা সাগরে নামা সিঁড়ির উপর। সামনে পারস্য উপসাগরের দিগন্তপ্রসারী কালো কালো বুক। মাঝে মাঝে এই কালো বুকে তারার মত আলো জ্বলে উঠছে, আবার তা হারিয়ে যাচ্ছে। সেই ভাবনাটা আবার আহমদ মুসার মাথায় ফিরে এল। সৌদি নিরাপত্তা প্রধান আল-সউদ কি চেষ্টা করলেন হুরমুজ প্রণালীতে তাদের আটকাতে। আশা কম। টিউব সাবমেরিনের ক্ষমতা সাধারণভাবেই বেশি। আর ওতে যদি কোন বিশেষ জ্বালানি ব্যবহার করা হয়ে থাকে তাহলে গতিটা আরও বেশি হতে পারে। সুতরাং ওদিক থেকে কোন আশা নেই। কোথায় গেল ওরা? হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল জ্ঞান হারাবার সময় ওদের কন্ঠ থেকে ভেসে আসা তিনটি শব্দের কথা। মনে পড়তেই চমকে উঠল আহমদ মুসা। শব্দগুলো তো তাহিতিয়ান! এদের মুখে তাহিতিয়ান ভাষা লেখা দেখেছে, তা কি এদের কেউ লিখেছে! তার টেবিলের পেছনে বসা যাদের মুখে তাহিতিয়ান ভাষা শুনেছে, তার কি এরাই? তারা এরাই, যুক্তি তো এটাই বলে। আহমদ মুসা এটাই ভাবল। এর সাথে আরেকটা ভাবনা চেপে বসল আহমদ মুসার মনে। বুঝা গেছে, তাহিতিয়ান ভাষা এদের মাতৃভাষা নয়। নিজেদের কথা আড়াল করার জন্যে অপরিচিত তাহিতিয়ান ভাষা ব্যবহার করেছে। কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগরের ক্ষুদ্র একটা দ্বীপ তাহিতি, সেই তাহিতির ভাষা এরা ব্যবহার করল কেন? মাথায় একটা চিন্তার উদয় হওয়ার সাথে সাথেই ভীষণভাবে চমকে উঠল আহমদ মুসা। ওরা কি তাহিতিতে থাকে? ওদের হেডকোয়ার্টার কি তাহিতিতে বা আশে-পাশে কোথাও? আরেকটা প্রশ্ন আহমদ মুসার কাছে খুব বড় হয়ে দেখা দিল। কফিখানার সেই খবরের কাগজে অ্যাটল দ্বীপের প্রশংসা এভাবে এতটা করল কেন? যে অ্যাটল আজ ক্ষমতার রাজধানী। এটা কি একটা কথার কথা? না এর সাথে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের কাজ কিংবা পরিকল্পনার কোন যোগ আছে? সব এক সাথে আহমদ মুসার মাথায় জট পাকিয়ে গেল। কিন্তু সব ছাপিয়ে একটা বিষয় তার কাছে সুস্পষ্ট হয়ে উঠল যে, তাহিতি দ্বীপ ও ‘অ্যাটল দ্বীপ’-এর সাথে ব্ল্যাক সানের কোন না কোন সম্পর্ক রয়েছে। এই সংগে তার কাছে আরেকটি প্রশ্নও বড় হয়ে উঠল, বিজ্ঞানীকে কিডন্যাপকারীরা তাহিতিয়ান ভাষা মানে তাহিতির সাথে সম্পর্কিত, এ বিষয়টিও খুবই স্পষ্ট। তাহলে কি কিডন্যাপকারীরা বিজ্ঞানীকে তাহিতিতে কিংবা তাহিতির দিকে কোথাও নিয়ে গেল? উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার মুখ। একটা নতুন আশার আলো জাগল তার মনে। কিডন্যাপড হওয়া অন্য সব বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদেরও তাহলে কি ঐ একই স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে! সংজ্ঞা ফিরে পেয়েছে আলী আল-হামাদী। উঠে বসল সে। ‘মি. আলী আল-হামাদী, চিড়িয়া উড়ে গেছে আমাদের সংজ্ঞাহীন করে দিয়ে।’ বলল আহমদ মুসা। ‘তাহলে এরাই কিডন্যাপার? আমাদের বিজ্ঞানীকে নিয়েই ওরা পালিয়েছে?’ বলল আলী আল-হামাদী। ‘হ্যাঁ, এরাই কিডন্যাপার। আমরা ওদের সন্দেহের আওতায় এনেও কিছু করতে পারিনি। হয়তো আল্লাহর এটাই ইচ্ছা। আল্লাহর পরিকল্পনা হতে পারে এমনটাই যে, ‘শুধু এক বিজ্ঞানী নয়, কিডন্যাপড হওয়া বা হারিয়ে যাওয়া বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের ব্যাপারেই আমরা চিন্তা করি।’ আহমদ মুসা। ‘বুঝলাম না স্যার। আরও কি কিডন্যাপড হয়েছে?’ জিজ্ঞাসা আলী আল-হামাদীর। তার চোখে-মুখে বিস্ময়। ‘হ্যাঁ, মি. আল-হামাদী। এ পর্যন্ত অনেক বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞ হারিয়ে গেছে। বিচ্ছিন্ন অনুল্লেখযোগ্য নিউজ হিসাবে সেগুলো বের হয়েছে। কোন কোনটা প্রচারও পেয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়া কোন হৈ-চৈ করেনি।’ বলল আলী আল-হামাদী। ‘তাজ্জবের ব্যাপার! এ নিয়ে হৈ চৈ হয়নি কেন? এসব নিয়ে তো হৈ চৈ হবারই কথা! পাশ্চাত্য মিডিয়া মানবাধিকার’ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে তো পাগল!’ বলল আলী আল-হামাদী। হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘সব কারণের কথা আমি জানি না। তবে বড় একটা কারণ এই হতে পারে কিডন্যাপড বা হারিয়ে যাওয়া প্রায় সবাই মুসলমান।’ ‘হ্যাঁ, সাংঘাতিক কথা! এই সাংঘাতিকটাই সত্য আল-হামাদী।’ আহমদ মুসা বলল। উত্তরে কথা বলল না আল-হামাদী। বলতে পারল না। তার বিস্ফরিত দুই চোখ নিস্পলকভাবে তাকিয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসাই কথা বলল আবার তার হাত ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে, ‘রাত ২টার বেশি বেজে গেছে মি. আল-হামাদী। চলুন, ঘুমাতে হবে। এত টাকা দিয়ে এপার্টমেন্ট নেয়া হলো, ব্যবহার তো করতে হবে!’ তখনও আলী আল-হামাদী বিস্ময়ভরা চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই সে বলল, ‘স্যার, তাহলে সৌদি বিজ্ঞানীকেই শুধু উদ্ধার নয়, সকলকে সন্ধান করা, উদ্ধার করাই আপনার মিশন?’ গম্ভীর হলো আহমদ মুসা। বলল, ‘হ্যাঁ, মি. আলী আল-হামাদী আমার ইচ্ছা এটাই, যদি আল্লাহ মঞ্জুর করেন।’ ‘আরেকটা কথা স্যার, আমি আপনাকে সৌদি কোন শীর্ষ গোয়েন্দা বা কর্তৃপক্ষ মনে করেছিলাম। কিন্তু দেখছি, আপনার কাজ, কথাবার্তা, আচরণ সব কিছুই আমাদের ন্যায় পেশাদার গোয়েন্দার মত নয়। আপনার কাজ, তৎপরতা, আচরণ, কথাবার্তায় অফুরান প্রাণ আছে, সীমাহীন আবেগ আছে, গভীর স্থিরতা আছে। এমনটা আমি কারো মধ্যে কোথাও দেখিনি। আমি বড় বড় মার্কিন ও বৃটিশ গোয়েন্দাদের সাথে কাজ করেছি।’ বলল আলী আল-হামাদী গম্ভীর কন্ঠে। আহমদ মুসার মুখে শান্ত একটা হাসি ফুটে উঠল। হাত রাখল আলী আল-হামাদীর কাঁধে। বলল, ‘আপনি আমাকে ভাইয়ের চেয়েও বেশি ভালবেসে ফেলেছেন। ধন্যবাদ আল-হামাদী।’ একটু থামল আহমদ মুসা। সংগে সংগেই আবার বলে উঠল, ‘একটা জরুরি বিষয় আছে মি. আল-হামাদী। বাহরাইনে ভাল ভূগোলবিদ নিশ্চয় আছেন। আমি সে রকম একজনের সাথে দেখা করতে চাই।’ ‘নিশ্চয় আছে। প্রয়োজনটা কি ধরনের, জানতে পারি স্যার?’ বলল আলী আল-হামাদী। ‘অবশ্যই। আমি দুনিয়ার ‘অ্যাটল দ্বীপগুলো সম্পর্কে জানতে চাই। আমার সামনে এখন দু’টি ক্লু বা টার্গেটস্থল। এক, তাহিতি দ্বীপ, দুই, অ্যাটল দ্বীপ। আমার এখন জানা দরকার, দু’টি কি এক জায়গায়, এক লোকেশনে হতে পারে? না দুই জায়গায়। তাহিতি দ্বীপ আমি জানি। এখন ‘অ্যাটল’ দ্বীপগুলোর অবস্থান, অবস্থা সম্পর্কে আমার জানা দরকার।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ঠিক আছে স্যার, আমি সকালেই এর ব্যবস্থা করব।’ বলল আলী আল-হামাদী। ‘ধন্যবাদ মি. আল-হামাদী।’ উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। বলল, ‘চলুন, এবার শয়নঘরগুলোর দিকে। শোবার মত অবস্থা আছে কিনা দেখি।’ আলী আল-হামাদীও উঠে দাঁড়িয়েছে। বলল, ‘চলুন স্যার।’ শোবার ঘরের দিকে চলে গেল দু’জনে। সকাল সাড়ে ৮টা। নাস্তার টেবিলে আগেই এসে বসেছিল আহমদ মুসা। সকালের খবরের কাগজগুলো এসে গেছে। তার উপর নজর বুলাচ্ছিল আহমদ মুসা। আলী আল-হামাদী এল। আহমদ মুসার মুখোমুখি নাস্তার চেয়ারে বসে বলল, ‘স্যার, একটু দেরী হয়ে গেল। ভূগোলবিদের বিষয়টাও ঠিক করে এলাম স্যার। স্যার, আরেকটা কথা, আমাদের মহামান্য সুলতানের নিরাপত্তা উপদেষ্টা প্রিন্স খালিদ ইবনে সালমান-আল-খালিফা আপনার সাথে দেখা করতে চান।’ ‘উনি আমার ব্যাপারটা জানলেন কি করে?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা। ‘স্যার, সৌদি নিরাপত্তা প্রধান আল-সউদ তো তাকেই টেলিফোন করে আপনার কথা বলেছেন। উনি খুব গুণী মানুষ স্যার। উনি বৃটেনের স্যান্ডহার্টস ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চতর সামরিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। কিন্তু এই সাথে অত্যান্ত বিদ্যানুরাগী। বাহরাইনে আজ যে বিশাল সমৃদ্ধ লাইব্রেরী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, সেটা তারই অবদান। বাহরাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরী দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ লাইব্রেরীর মধ্যে একটি। দেশের বড় বড় শিল্পপতির সাথেও তার গভীর সম্পর্ক। আমাদের নিরাপত্তা প্রধান একজন ভাল ভূগোলবিদের ব্যাপারে তাঁকেই অনুরোধ করেছিলেন। সংগে সংগেই তিনি যোগাযোগ করে একটা এ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করে ফেলেছেন। স্যার, আজ দশটায় আপনি তার সাথে চা খাবেন এবং সাড়ে ১১ টায় বাহরাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের সমুদ্র ও দ্বীপ বিশেষজ্ঞ ড. সালেহ আবদুল্লাহর সাথে আপনার সাক্ষাত। স্যরি, আপনার অনুমতি না নিয়েই কিন্তু আমি সব ঠিক করে ফেলেছি।’ ‘অনুমতির কেন প্রয়োজন। আমি তো আপনাকে দায়িত্ব দিয়েছি। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। অসম্ভব দ্রুত আপনি সব ঠিক করে ফেলেছেন। আমি প্রিন্স খালিদের সাক্ষাত পেলে খুবই খুশি হবো।’ বলল আহমদ মুসা। ‘ধন্যবাদ স্যার। আসুন স্যার, আমরা নাস্তা খেয়ে নেই।’ বলল আল-মাহাদী। নাস্তা সারল দু’জনে। হোটেলের রুম-সার্ভিস বিভাগ থেকেই এ নাস্তা এসেছে। এপার্টমেন্টে যারা নিজেরা রান্না-বান্নার ঝামেলায় যায় না, তাদের খাবার হোটেলের রুম সার্ভিস থেকেই সরবারাহ করা হয়। সকাল দশটার মধ্যে আহমদ মুসারা প্রিন্স খালিদ ইবনে সালমান আল-খালিফার অফিসে পৌছলেন। প্রিন্সের প্রাইভেট সেক্রেটারি গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল আহমদ মুসার। আহমদ মুসাদের গাড়ি সেখানে পৌঁছতেই পিএস নিজে এসে গাড়ির দরজা খুলে স্বাগত জানাল আহমদ মুসাকে। বলল, ‘এক্সিলেন্সি আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।’ আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নামল। আলী আল-হামাদী আগেই নেমেছিল। বলল সে আহমদ মুসাকে, ‘স্যার, আমি অপেক্ষা করছি। আপনি আসুন।’ ‘ধন্যবাদ মি. আল-হামাদী।’ বলে আহমদ মুসা চলতে শুরু করল। পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল প্রিন্স খালেদ ইবনে সালমান আল-খালিফার পি.এস। সুলতানের সেক্রেটারিয়েটের চার তলার একটা স্যুটে বসেন সুলতানের নিরাপত্তা উপদেষ্টা প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা। সুলতানের নিরাপত্তা উপদেষ্টা প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা সুলতানের পক্ষে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা বাহিনী, পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের তদারকি করেন। চার তলায় পৌঁছে প্রিন্স খালেদ আল-খালিফার পি.এস আহমদ মুসাকে ভিআইপি গেষ্টরুমে বসিয়ে ইন্টারকমে বসকে খবর দিল। খবর জানাবার পরপরই দরজা ঠেলে গেষ্টরুমে প্রবেশ করল সুলতানের নিরাপত্তা উপদেষ্টা প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা। সালাম দিয়ে আহমদ মুসাকে জড়িয়ে ধরল সে। সাথে নিয়ে ঢুকে গেল অফিস কক্ষে। অফিস কক্ষের সাথেই তার পার্সোনাল গেষ্টরুম। সেখানেই সে বসল গিয়ে আহমদ মুসাকে নিয়ে। আহমদ মুসাকে বসিয়ে নিজে বসেই প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা বলল, ‘মহান ভাই সৌদি আরবের নিরাপত্তা প্রধান আল-সউদ আপনার এত প্রশংসা করেছেন যে, আমি আপনার সাথে সাক্ষাত না করে থাকতে পারলাম না। কিন্তু আপনার নামই আমার জানা হয়নি। আমার মহান ভাই আল-সউদও বলেননি। তিনি বলেছেন, তাঁর নাম তাঁকেই জিজ্ঞাসা করবেন। বিষয়টা আমার কিউরিসিটি বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন এই ‘নাম’ দিয়েই আমরা আমাদের কথা শুরু করতে পারি। আর একটা কথা বলি, ড. সালেহ আবদুল্লাহ যার সাথে আপনার সাড়ে ১১ টায় দেখা করার কথা, তিনি একটা জরুরি প্রয়োজনে আমার সেক্রেটারিয়েটে এসেছেন। আপনি চাইলে তাঁকে এখানে ডাকা যেতে পারে।’ ‘আল-হামদুলিল্লাহ! এতে আমারই বেশি সুবিধা হবে। তার ওখানে যাওয়া থেকে বেঁচে যা। তাছাড়া যে আলোচনা তার সাথে করতে চাই, সেটা আপনার উপস্থিতিতে আরো ভালো হবে এক্সিলেন্সি।’ বলল আহমদ মুসা। ‘ধন্যবাদ’ বলে প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা ইন্টারকমে পি.এস.-কে নির্দেশ দিল, ‘তুমি গিয়ে ড. সালেহ আবদুল্লাহকে নিয়ে এস।’ ইন্টারকম থেকে ফিরে প্রিন্স খালেদ আহমদ মুসার দিকে তাকাতেই আহমদ মুসা বলল, ‘এক্সিলেন্সি নানা কারণে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমার নামটা গোপন রাখা হয়। সেটা আপনার ক্ষেত্রে নয়। এক্সিলেন্সি! আল-সউদ আমার নাম নিয়ে একটা রহস্য সৃষ্টি করে রেখেছেন মাত্র! আহমদ মুসা। খুবই ছোট নাম।’ নাম শুনেই ভ্রু কুঞ্চিত হলো বাহরাইনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা প্রিন্স আল-খালিফার। তার বিস্ময় ও কৌতুহল মিশ্রিত স্থির দৃষ্টি আহমদ মুসার উপর নিবদ্ধ। ‘আপনি কি সেই লিজেন্ড আহমদ মুসা, যিনি তরুণদের স্বপ্ন নায়ক আর প্রবীণদের গর্ব?’ আহমদ মুসার মুখের উপর চোঁখ ঐভাবে স্থির রেখেই প্রশ্ন করল প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা। আহমদ মুসার মুখ নত মত হলো। বলল, ‘এক্সিলেন্সি আমি সাধারণ মানুষ। আমি মানুষের কাজে লাগার চেষ্টা করি মাত্র।’ পরম ও বিনীত কন্ঠস্বর আহমদ মুসার। আসন থেকে উঠে প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা। এগোলো আহমদ মুসার দিকে। উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসাও। প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। বলল, ‘কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বের’ হবার প্রবাদ, কিন্তু সোনার এক টুকরা খুঁজতে গিয়ে অমূল্য হীরকখন্ড পাবার কোন প্রবাদ নেই। কিন্তু আমি কল্পনাতীতভাবে এক অমূল্য হিরকখন্ড পেয়ে গেলাম। আমার গর্ব, আমাদের গর্ব আপনি। আপনাকে স্বাগত: খোশ আমদেদ আপনাকে।’ আবেগে কন্ঠ ভিজে উঠেছিল প্রিন্স খালেদ আল-খালিফার। নিজের আসনে ফিরে গেল প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা। পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ ভালো করে মুছে নিয়ে বলল, ‘সত্যি হঠাৎ অমূল্য হিরকখন্ড পেলে কপর্দকহীনের যে দশা হয়, সে রকমটাই আমার অবস্থা। গতবার হজ্জে গিয়ে গিয়ে মদিনায় ঘুরে বেড়াবার সময় পুলিশ পাহারায় থাকা একটা বাড়ি দেখিয়ে ভাই আল-সউদ আমাকে বলেছিলেন সেখানে আপনি থাকেন। কিন্তু তখন আপনি টার্কিতে ছিলেন। কিন্তু তখন আপনি টার্কিতে ছিলেন। দেখা করার সৌভাগ্য হয়নি। তারপর কয়েকবার চেষ্ঠা করেছি। কিন্তু আপনাকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। আমাদের মহামান্য সুলতানও আপনার সম্পর্কে জানেন। তিনি একবার আমাকে বাহরাইনে আপনাকে আমন্ত্রণের কথা বলেছিলেন। কিন্তু প্রথমত আপনাকে না পাওয়া, দ্বিতীয়ত আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ করে আনার মধ্যে উভয় পক্ষের নানা সুবিধা-অসুবিধার বিবেচনা করে এই ক্ষেত্রে অগ্রসর হওয়া যায়নি। সেই আপনাকে আজ হঠাৎ এভাবে চোখের সামনে হাজির দেখছি। এটা একজনের আবেগকে বাঁধভাঙা করে দেবার মতই। আল-হামদুলিল্লাহ।’ ‘ধন্যবাদ এক্সিলেন্সি। আমি দুর্লভ মানুষ নই। ডাক পেলে আমি সেখানে যাই। তবে শুধু শুধু বেড়াবার সময় আমার কম হয়। এই দেখুন, আমাকে খুঁজে পাননি। কিন্তু আজ বিনা ডাকে আপনার দোরগোড়ায় হাজির।’ আহমদ মুসা বলল। ‘যখন আপনাকে পেয়েছি। তখন আমার অনুরোধ মহামান্য সুলতানের সাথে আপনার দেখা করতে হবে’ বলল প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা। ‘এক্সিলেন্সি সময় হলে দেখা করতে পারলে আমিও খুব খুশি হবো।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ধন্যবাদ।’ বলে একটু থামল, একটু ভাবল প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা। সোফায় একটু হেলান দিল সে। বলল, ‘অনেক প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করছে মি. আহমদ মুসা আপনাকে। আপনার সব কাজই জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে। বিষয়টি বিরাট উদ্বেগ-উত্তেজনার। অব্যবহত ভাবে এই উদ্বেগ-উত্তেজনা নিয়ে চলার অফুরন্ত শক্তি আপনি কোথা থেকে পান? ক্লান্তি, অবসন্নতার অনেক কিছুই তো সামনে আসার কথা।’ ‘পৃথিবীটাই তো নানা রকম লড়াইয়ের ক্ষেত্র। প্রত্যেক মানুষই তার জীবন পরিচালনায় নানা রকম লড়াইয়ে ব্যস্ত। এই লড়াইয়ের মাধ্যমে মানুষের জীবনে শান্তি ও সাফল্য আসে। আমার লড়াইটাও মানুষের শান্তি ও সুবিচারের পক্ষে। আমার বিশ্বাস আমার শক্তির উৎস।’ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, ‘তিনি জীবন ও মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন এটা দেখার জন্যে যে মানুষ ভাল কাজ করছে।’ এই নি নির্দেশই আমার দায়িত্ব পালনের শক্তি। ভাল কাজ করার আরেকটা দিক হলো, মন্দ পরিত্যাগ করা এবং মন্দ কাজের প্রতিকার করে ভালোর প্রতিষ্ঠা করা। মজলুম কারো ডাক পেলে এই কাজে সাহায্য করি।’ বলল আ্হমদ মুসা। ‘এই কাজ অত্যান্ত কঠিন। এই প্রসংগে একটা প্রশ্ন, ভালোর প্রতিষ্ঠা মন্দ পথে হয় কি না? আমি বলতে চাচ্ছি, মন্দ পথে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আরেক সন্ত্রাস সৃষ্টি করা, মন্দের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ হিসাবে অপরাধী নিপরাধ নির্বশেষে হত্যা-হামলায় শিকার বানানো চলে কিনা?’ প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা বলল। ‘না, তা করা যায় না। মন্দ দুর করে ভালো’র প্রতিষ্ঠা করার মডেল হলেন আল্লাহর রসুল স.।আল্লাহর রসুল স.-এর গোটা জীবনে ভালো’র সাথে মন্দ পথ অনুসরণের এবং নির্দোষ-নিরপরাধিদের উপর হামলা ও হত্যা-নির্যাতনের কোন দৃষ্টান্ত নেই। এমনকি শত্রুর বিরুদ্ধে ঘোষিত যুদ্ধের ক্ষেত্রেও শত্রুপক্ষ বা শত্রু দেশের নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং যারা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়নি তাদের নিরাপত্তা দেবার ঘোষনা করা হয়েছে। শত্রুপক্ষের লোকদের ক্ষেত্রেই যখন এই ব্যবস্থা, তখন যারা শত্রু নয় বা বিঘোষিত শত্রু নয়, তাদের নির্দোষ-নিরপরাধদের উপর হামলা-হত্যা-নির্যাতনের তো কোন প্রশ্নই ওঠে না!’ আহমদ মুসা বলল। ‘ধন্যবাদ মি. আহমদ মুসা অন্য এক প্রসংগ। বিষয়টা অনেকটা ব্যাক্তিগত ধরনের। আপনার জীবনে অসংখ্য ঘঠনা আছে। অসংখ্য মানুষের সংস্পর্শে আপনি এসেছেন। এসবের মধ্যে কোন ঘটনা, কোন ব্যক্তি আপনার জীবনে দাগ কেটেছে সবচেয়ে বেশি?’ বলল প্রিন্স খালেদ। আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘এক্সিলেন্সি, আমি আপনার এই দুই প্রশ্নের জবাব দিতে পারবো না। আমি অতীতের দিকে ফিরে তাকাই না। কারো সাথে কারো, কোন ঘটনার সাথে কোন ঘটনার তুলনাও আমি করি না। আমার দৃষ্টি শুধুই সামনে, সামনে ওগোতে চাই আমি।’ ‘ধন্যবাদ মি. আহমদ মুসা, আপনার এমন জবাবই স্বাভাবিক। আচ্ছা মি. আহমদ….।’ প্রিন্স খালেদ আল-খালিফার কথার মাঝখানেই তার ইন্টারকম বেজে উঠল। কথা বন্ধ করে প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা ইন্টারকমের স্পীকার অন করে নিল। সালাম দিয়ে ওপার থেকে তার পি.এস. বলল, ‘এক্সিলেন্সি, ড. সালেহ আবদুল্লাহ এসেছেন।’ ‘নিয়ে এস তাঁকে।’ বলে ইন্টারকম রেখে দিল প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা। কয়েক মূহুর্ত। প্রিন্স খালেদ আল-খালিফার পি.এস. ড. সালেহ আবদুল্লাহকে নিয়ে প্রবেশ করল। প্রিন্স আবদুল্লাহ আল-খালিফা আহমদ ও আহমদ মুসা দু’জনেই উঠে এগিয়ে গিয়ে তাকে স্বাগত জানাল। ‘প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা আহমদ মুসার সাথে ড. সালেহ আবদুল্লাহকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, ‘ইনি আমাদের সম্মানিত অতিথি। সৌদি আরব থেকে এসেছেন। একটা বিষয়ে তিনি আপনার সাথে আলোচনা করতে চান, যে বিষয়ে আপনি বিশেষজ্ঞ।’ সরাই বসল। ‘আমি শুনেছি, দ্বীপ সংক্রান্ত কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চান। কিন্তু এ বিষয়ে সৌদি আরবের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তো বড় বিশষজ্ঞ আছেন!’ বলল ড. সালেহ আবদুল্লাহ। ‘স্যার, আমার জরুরি প্রয়োজন।’ সৌদি আরবে গিয়ে তাঁদের কাছে জানার মত সময় আমার হাতে নেই। এজন্যেই স্যার আপনাকে কষ্ট দেয়া।’ আহমদ মুসা বলল বিনীত কন্ঠে। ‘বুঝেছি ইয়ংম্যান! নো ম্যাটার। আমার কথায় আপনার যদি কোন সাহায্য হয়, তাহলে আমিই বেশি খুশি হবো।’ বলল ড. সালেহ আবদুল্লাহ। এই সময় প্রিন্স খালেদ আল-খালিফার পি.এস এসে তাঁকে জানাল, ‘এক্সিলেন্সি, টেবিলে নাস্তা দেয়া হয়েছে।’ সংগে সংগেই প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘চলুন, চা খেয়ে আসি। তারপর আমরা কথা বলব। সেটাই ভালো হবে। এই সাথে আমি আপনাদের জানাচ্ছি, লাঞ্চ না খেয়ে আপনাদের যেতে দেব না।’ সবাই উঠে দাঁড়াল।বলল ড. সালেহ আবদু্ল্লাহ, ‘আমরা আর কি করব, হোস্ট যদি আটকান, তাহলে গেস্টরা যাবেন কি করে? গেস্টের জন্যে যদি ক্ষতিকর না হয়, তাহলে হোস্টের কথা রাখাই নিয়ম।’ ‘ধন্যবাদ, ড. সালেহ আবদুল্লাহ।’ বলে পাশের কক্ষের দিকে হাঁটতে শুরু করল প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা। সবাই তার সাথে চলল পাশের ঘরে নাস্তার টেবিলে। নাস্তা শেষে সবাই ফিরে এল বসার ঘরে। ড. সালেহ আবদুল্লাহ তার আসনে বসেই বলল, ‘হ্যাঁ মি. ইয়াংম্যান, আপনার নাম কিন্তু জানা হয়নি।’ আহমদ মুসা একবার চোখ তুলে প্রিন্স খালেদ আল-খালিফার দিকে চাইল। তারপর বলল, ‘স্যার, আপনার নামের কাছাকাছি। আলী আবদুল্লাহ।’ নিজের নামটি তাকে বলতে পারল না আহমদ মুসা। কারণ যে বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছে সে বিষয়ের সাথে আহমদ মুসার নাম যুক্ত হলে এবং কোনভাবে তা শত্রুপক্ষের কানে গেলে শত্রুরা অনেক বিষয়ই আঁচ করতে পারবে। আর বাহরাইন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সব গোয়েন্দা সংস্থার জন্য একটা লোভনীয় স্থান। সুতরাং সতর্কতার প্রয়োজন মনে করেছে আহমদ মুসা। ‘হ্যাঁ, মি. আলী আবদুল্লাহ। বলুন, আপনি কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চান।’ বলল ড. সালেহ আবদুল্লাহ। ‘স্যার, আমি দুনিয়ার ‘অ্যাটল দ্বীপ’ সম্পর্কে জানতে চাই। দ্বীপগুলোর অবস্থান, দ্বীপগুলোর প্রকৃতি, এ সবের ব্যবহার কি রকম ইত্যাদি।’ আহমদ মুসা বলল। ‘হ্যাঁ, ইয়াংম্যান। বিষয়টা আমার সাবজেক্টের মধ্যে। কিন্তু মুখস্থ কতটুকু বলতে পারবো, সেটা আপনার কাজে আসবে কি না বলতে পারি না।’ একটু থামল ড. সালেহ আবদুল্লাহ। শুরু করল পর মুহুর্তেই, ‘অ্যাটল দ্বীপ’ আল্লাহর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি সাগর বক্ষে! সাগরের গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে সাধারণত কোরাল রীফ থেকে অ্যাটল দ্বীপের সৃষ্টি হয়। সমুদ্রে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত ফলে গলিত লাভা থেকেও অ্যাটল দ্বীপ তৈরী হতে পারে। অ্যাটল সাগর বক্ষের এমন দ্বীপ যার চারদিক সাগর সারফেসের উপর জেগে ওঠা মাটির সীমান্ত দিয়ে ঘেরা। এই ঘেরের মধ্যে থাকে পানি। এই পানির গভীরতা কম। বিভিন্ন অ্যাটলে গভীরতা বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। আবার অ্যাটলের চারদিকের সার্কলিং বা ঘেরটা আংশিকও হতে পারে। এক বা একাধিক জায়গায় ঘেরে ছেদ থাকায় অ্যাটলের ভেতরটা সাগরের সাথে উন্মুক্ত থাকতে পারে। এই অ্যাটল ধরনের দ্বীপগুলো দেখা যায় পৃথিবীর গ্রীষ্মমন্ডলীয় ও আধ-গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে। অক্ষরেখার ২৮ ডিগ্রি ২৪ ইঞ্চি উত্তরে ও ২৯ ডিগ্রি ৫৮ ইঞ্চি দক্ষিণে কোন অ্যাটল দ্বীপ নেই। আটলান্টিক মহাসাগরে কোন অ্যাটল দ্বীপ নেই, ছোট্ট একটা ব্যাতিক্রম ছাড়া। নিকারাগুয়ার সামনের সাগরে মাত্র আটটি অ্যাটল দ্বীপ রয়েছে। সব অ্যাটল দ্বীপ ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে। ভারত মহাসাগরের অ্যাটল দ্বীপগুলো মালদ্বীপ, লাক্ষাদ্বীপ ও সাগোজ দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর মধ্যে মালদ্বীপের অ্যাটল দ্বীপগুলোই উল্লেখযোগ্য। দুনিয়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ২৬টি অ্যাটল দ্বীপের মধ্যে ৫টি মালদ্বীপে। মালদ্বীপের একটি অ্যাটল দ্বীপের মধ্যে ২৫৫টি ক্ষুদ্র দ্বীপ আছে। এই বৈশিষ্টে এটাই পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপ। ২৬টি অ্যাটল দ্বীপ রয়েছে ভারত মহাসাগরে। প্রশান্ত মহাসাগর হলো অ্যাটল দ্বীপের সাম্রাজ্য। প্রশান্ত মহাসাগরের তোয়ামতু দ্বীপপুঞ্জ, ক্যারেলিন দ্বীপপুঞ্জ, মাশাল দ্বীপপুঞ্জ, কোরাল সী দ্বীপপুঞ্জে অ্যাটল দ্বীপের অবস্থান সবচেয়ে বেশি। প্রশান্ত মহাসাগরে অ্যাটলগুলোর সংখ্যা, বৈচিত্র্য ও সাইজ সব দিক দিয়েই শীর্ষে।’ থামল ড. সালেহ আবদুল্লাহ। ‘ধন্যবাদ স্যার। অ্যাটল দ্বীপসমূহের সুন্দর একটা ধারণা তুলে ধরেছেন আপনি। স্যার, তাহিতি দ্বীপের আশেপাশে অ্যাটল দ্বীপ আছে কিনা সে সম্পর্কে কিছু বলুন।’ ‘দু’টি দ্বীপ নিয়ে তাহিতি। গোটা তাহিতিই ভলকানিক দ্বীপ। এর পাশে কোন অ্যাটল দ্বীপ নেই। কিন্তু তাহিতি থেকে নীল সমুদ্র ধরে কিছু দুর এগোলেই পলিনেশীয় দ্বীপ সাম্রাজ্যের পূর্ব বাহুতে পৌঁছে যাওয়া যাবে। এটাই তোয়ামতু দ্বীপপুঞ্জ। এই তোয়ামতু দ্বীপপুঞ্জের অধিকাংশ বা গোটা দক্ষিণাংশ অনেক অ্যাটল দ্বীপ নিয়ে গঠিত। মোট ৭টি দ্বীপ, এর মধ্যে ৭৩টিই অ্যাটল দ্বীপ। তিনটি দ্বীপ কোরাল। শুধু দ্বীপপুঞ্জের পশ্চিমাংশে তাহিতির দিকে একটা মাত্র দ্বীপ প্রকৃত অ্যাটল দ্বীপ।’ বলল ড. সালেহ আবদুল্লাহ। ‘স্যার, এই অ্যাটল দ্বীপগুলোর কোনটিতে বড় স্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব কিন, যেখানে বহু মানুষের থাকার ও কাজ করার জন্য উপযুক্ত?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘স্থাপনার জন্যে ল্যান্ড দরকার হয়, কিন্তু অ্যাটল দ্বীপগুলোতে ল্যান্ডের অভাবই সবচেয়ে বেশি। ২০০০ মাইল বিস্তৃত গোটা তুয়ামতু দ্বীপপুঞ্জে ল্যান্ডের পরিমাণ ৮৮৫ বর্গ কিলোমিটার মাত্র। আর এই দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণাংশের ৭৮টি দ্বীপের মধ্যে ৭৩টিই অ্যাটল। এই ৭৮ টি দ্বীপের মোট লোক সংখ্যাই হলো মাত্র এক হাজার ছ’শো’র মত। মাত্র কয়েকটি দ্বীপে জনবসতি আছে। অন্য গুলো খালি। অন্তত এই দ্বীপপুঞ্জের এই সব অ্যাটলে বড় কোন স্থাপনা নির্মাণ সম্ভব নয়।’ বলল ড. সালেহ আবদুল্লাহ। ‘অ্যাটল দ্বীপে ল্যান্ড ছাড়া অন্য কোনভাবে বড় স্থাপনা নির্মাণ সম্ভব কিনা?’ আহমদ মুসা বলল। সংগে সংগেই উত্তর দিল না ড. সালেহ আবদুল্লাহ। সোফায় হেলান দিয়ে বসল। ভাবল একটু। তারপর বলল, ‘তার মানে গোপন স্থাপনার কথা বলছেন। অ্যাটলের লেগুন-ফ্লোরের নিচে অথবা অ্যাটলের কোরাল দেয়ালের ভেতরে কোন বড় রকমের স্থাপনা নির্মাণ সম্ভব কিনা এই তো?’ আমি এর কোন সম্ভবনা দেখি না। আমি মেরিন সাইনটিস্ট কিংবা মেরিন ইঞ্জিনিয়ার নই, একজন ভূগোলবিদ মাত্র। মেরিন সাইনটিস্টরাই এ ব্যাপারে সঠিক কথা বলতে পারে। ‘ধন্যবাদ স্যার। আরেকটি জিজ্ঞাসা, তোয়ামতুর অ্যাটল দ্বীপগুলোর মধ্যে নির্জনতা ও গোপনীয়তার দিক থেকে অগ্রগণ্য কোনটা হতে পারে?’ বলল আহমদ মুসা। ড.সালেহ আবদুল্লাহ তাকাল আহমদ মুসার দিকে। থামল একটু।বলল, ‘আপনি বলতে চাচ্ছেন, কোন অ্যাটল দ্বীপে বড় কোন গোপন কাজ কেউ গোপনে করে যেতে পারে কিনা, এইতো?’ আহমদ মুসাও হাসল। বলল, ‘বিষয়টা ও রকমই স্যার।’ ‘তোয়ামতু দ্বীপপুঞ্জের অ্যাটল দ্বীপগুলো সম্পর্কে বলছি। আগেই বলেছি, এখানকার মাত্র কয়েকটা অ্যাটলে খুব সামান্য লোক বসতি আছে। অন্য সবই জনবসতিহীন নিরব, নিঝুম দ্বীপ। দিনের বেলা অল্প কিছু মাছ ধরার কাজ চলে। আর দ্বীপপুঞ্জের মধ্যাঞ্চলের ফাকারাঙা, তাহানিয়া, মতুতুংনী, উত্তারাঞ্চলের রাবেহিয়া, নপুকা, টপোটো, ফাতুহিভা, হিভাওয়া, নকুহিভা এবং ওয়াপু, বাংগিরোয়া ও মাফতিয়ার মত কিছু দ্বীপ ও অ্যাটলে পর্যটকদের আবির্ভাব ঘটে দিনের বেল। মধ্য ও দক্ষিনাঞ্চলের অন্য সব অ্যটল দ্বীপ দিনের বেলাতেও নিরব-নিঝুম থাকে। আর রাতের বেলা দ্বীপপুঞ্জের কয়েকটা দ্বীপ ও অ্যাটলে বাতি জ্বললেও গোটা দ্বীপপুঞ্জের এ অ্যাটলসমূহ থাকে জমাট অন্ধকারে ঢাকা, নিরব-নি:শব্দ এক মৃত্যুপুরী যেন! এমন পরিবেশ তো গোপন কাজেই জন্যেই উপযুক্ত! কিন্তু আমার কথা মানুষকে কাজ করার জন্যে পায়ের তলায় মাটি চাই, এস মাটি তো অ্যাটলগুলোতে নেই।’ আহমদ মুসার মুখ উজ্জল হয়ে উঠেছিল। কিছু প্রশ্নের স্পেসেফিক জবাব না পেলেও তোয়ামুত দ্বীপপুঞ্জের অ্যাটল রাজ্য সম্পর্কে একটা সম্পূর্ণ ধারণা সে পেয়ে গেছে। মূল যে কথাটা সে জানতে চায়, তাহিতি দ্বীপে বা এই অঞ্চলের অ্যাটল দ্বীপে তা আছে কিনা, সেটা জানা তার হয়ে গেছে। এখন তান নিশ্চিত মনে হচ্ছে, তাহিতি বা অ্যাটল দ্বীপগুলোর কোথাও শয়তানরা আড্ডা গেড়েছে। আহমদ মুসা বলল, ‘ধন্যবাদ স্যার। আমি যা জানতে চেয়েছি, আল-হামদুলিল্লাহ তার চেয়ে বেশি জানতে পেরেছি। অনেক ধন্যবাদ স্যার, আপনাকে।’ ‘ধন্যবাদ ইয়াংম্যান। কিন্তু এ সব তো কেউ জানতে চায় না। আপনি কি করবেন এসব দিয়ে? কোন পেশায় আপনি জড়িত আছেন মি. আবদুল্লাহ?’ বলল ড. সালেহ আবদুল্লাহ। হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘স্যার, হাতেম তায়ীর মত রহস্যের সন্ধান আমার নেশা-পেশা দু’টোই। যেমন অ্যাটল রাজ্যে যাবার সুযোগ নিতে পারি।’ ‘চমৎকার! জীবনকে উপভোগ করার এক উৎকৃষ্ট পথ। আল্লাহর বিচিত্র সৃষ্টি মানুষ দেখুক, চিন্তা করুক এবং আল্লাহর সোলতানিয়াত মানুষ উপলদ্ধি করুক, এটা আল্লাহ চান। আর একটা জিজ্ঞাসা স্যার, আ্যটলের কোরাল দেয়ালে বা উপরে লেগুনের ফ্লোরের নিচে কোন স্থাপনা তৈরি করা যায় কিনা, এ বিষয়ে আমার মতটা বলেছি। কিন্তু কোরাল রীপগুলো আল্লাহর অপূর্ব সৃষ্টি! অ্যাটলের দেয়াল কোথাও পিলার আকারেও উঠতে পারে। আবার কোথাও অ্যাটলের চারদিকের দেয়ালের ভেতরটা ফাঁকাও থাকতে পারে। কোথাও কোথাও আবার অ্যাটলের লেভেলের যে ফ্লোর তাতেও ফাটল থাকতে পারে, হোল থাকতে পারে, কোন কোন ক্ষেত্রে তা আংশিক হতে পারে। এ সব বৈচিত্রাকে মেরিন সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নানাভাবে ব্যবহার করতেও পারে।’ ‘ধন্যবাদ স্যার। অ্যাটল সম্পর্কে এগুলো খুবই মূল্যবান তথ্য।আমার জিজ্ঞাসার উত্তর এর মধ্যে আছে। ধন্যবাদ স্যার, আপনাকে।’ আহমদ মুসা বলল। আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা বলল, ‘ধন্যবাদ মি. আবদুল্লাহ, ধন্যবাদ ডক্টর। আপনাদের প্রশ্নোত্তরে মনে হচ্ছে আমিই উপকৃত হয়েছি সবচেয় বেশি। অ্যাটল দ্বীপের নাম জানতাম। কিন্তু অ্যাটল দ্বীপ যে সঠিক অর্থে দ্বীপ নয় আজই প্রথম জানলাম। অ্যাটল দ্বীপগুলোর লোকেশন সম্পর্কেও কিছু জানা ছিল না আমার। তাও জানলাম আজ। এখন দেখতে ইচ্ছে করছে অ্যাটল এলাকা। কিন্তু একটা বিষয় ….।’ প্রিন্স খালদ আল-খালিফার কথার মাঝখানেই মোবাইল বেজে উঠল আহমদ মুসার। থেমে গেল প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা। ‘মাফ করবেন!’ বলে মোবাইল তুলে নিল আহমদ মুসা। স্ক্রিনে দেখল সৌদি নিরাপত্তা প্রধান আল-সউদের নাম। সালাম দিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘এক্সিলেন্সি, কেমন আছেন?’ ওপার থেকে আল-সউদ সালাম নিয়ে বলল, ‘আমরা সবাই ভাল। আপনি যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন সে সম্পর্কে জানাবার জন্যে এই টেলিফোন করছি এবং একটি খারাপ খবরও আপনাকে জানাতে চাই।’ ‘বলুন, এক্সিলেন্সি।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আপনার কাছ থেকে জানার পরই আমি আমাদের নৌবাহিনীর হুরমুজ প্রণালী ইউনিটকে জানিয়েছিলাম। তারা সংগে সংগেই হুরমুজ প্রণালীরর মুখে ছুটে গিয়েছিল। তারা সেখানে অপেক্ষা করার সঙ্গে সঙ্গে হুরমুজ প্রণালী কোস্টাল ষ্টেটস জয়েন্ট অথরিটিং মনিটরিং সার্চ করে। এতে জানতে পারে তারা হুরমুজ প্রণালীতে পৌঁছার আধা ঘন্টা আগে আন্ডারওয়াটার জলযান জাতীয় কিছু যান প্রণালী অতিক্রম করে। অতএব সে মিশনটি ফেল করেছে। এটাও খারাপ খবর। কিন্তু আরেকটা হুমকি আমরা পেয়েছি। সেটাকেই আমি খবর বলছিলম।’ ‘সে হুমকিটা কি? ওরা হুমকি দিয়েছে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘হ্যাঁ, আহমদ মুসা! ওরাই। তারা স্যাটেলাইট ই-মেইলে জানিয়েছে, তারা কোন প্রতিপক্ষের অস্তিত্ব বরদাশত করে না। বিজ্ঞানী আবদুল্লাহ আল মক্কীকে উদ্ধারের চেষ্টা করে প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড় করানো হয়েছে। এই অপরাধে বিজ্ঞানীর সমস্ত রক্ত শুষে নিয়ে আজ থেকে তৃতীয় মাসের শেষ দিনে তাকে হত্যা করা হবে। আর তাকে উদ্ধারের আরও যদি চেষ্টা করা হয়, তাহলে সৌদি আরবের রকেট-বিজ্ঞানের জনক বিজ্ঞানী ড. আবদুল আজিজ আল-নজদীকে কিডন্যাপ করা হবে।’বলল আল-সউদ। ‘এই হুমকিকে আপনারা কিভাবে নিয়েছেন?’ আহমদ মুসা বলল। ‘একটা ক্রিমিনাল গ্রুপের আত্মরক্ষার একটা কৌশল হিসাবে।’ বলল আল-সউদ। ‘আপনারা এরপর কি ভাবছেন?’ জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা। ‘আমাদের ভাবনা আগের মতই। আমরা চাই আমাদের বিজ্ঞানী উদ্ধার হোক! ক্রিমিনালরা ধরা পড়ুক এবং এই ব্যাপারে আমরা আপনার সাহায্য চাই। আমরা আপনার সাহায্য চাই শুধু আমাদের স্বার্থে নয়, বহু বিজ্ঞানী-বিশেষজ্ঞকে তারা কিডন্যাপ করেছে, সবার স্বার্থে। ক্রিমিনালদের এভাবে চলতে দিলে আরও প্রতিভার তারা সর্বনাশ করবে! এই কঠিন মিশনের দায়িত্ব আপনি গ্রহণ করুন। আমাদের সবার ইচ্ছা এটাই।’ বলল আল-সউদ। ‘ধন্যবাদ এক্সিলেন্সি। আমি কতটা পারব সেটা আল্লাহর সাহায্যার উপর নির্ভর করছে। তবে একটা কথা বলতে পারি, সামনে আমার এগিয়ে যাবার পথ বোধ হয় উন্মু্ক্ত হয়ে গেছে!’ আহমদ মুসা বলল। ‘আল-হামদুলিল্লাহ! আল্লাহর বিশেষ সাহায্য আপনার সাথে আছে, মি. আহমদ মুসা। আপনার প্রয়োজন আমাদের জানাবেন। দেশের ভেতর ও বাইরে সকল জায়গায় আমাদের সহযোগিতা আপনার জন্যে প্রস্তুত থাকবে।’ বলল আল-সউদ। ‘ধন্যবাদ এক্সিলেন্সি! আসি জনাব।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আপনি সৌদি আরবে ফিরছেন?’ জিজ্ঞাসা আল-সউদের। ‘এখনও সব কিছু ফাইনাল করিনি। আমি আজই স্ত্রীর সাথে কথা বলব। তবে সম্ভবত এখন ফেরা হচ্ছে না।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আপনার সব সিদ্ধান্তের সাথে আমরা আছি, আহমদ মুসা।’ বলল সৌদি নিরাপত্তা প্রধান আল-সউদ। একটু থেমেই আবার বলে উঠল আল-সউদ, ‘ওকে, মি. আহমদ মুসা আর কিছু?’ ‘ধন্যবাদ।’ বলল আহমদ মুসা। ‘আল-হামদুলিল্লাহ! আসসালামু আলায়কুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।’ ওপার থেকে বলল সৌদি নিরাপত্তা প্রধান আল-সউদ। ওপার থেকে কল অফ হয়ে গেল। আহমদ মুসাও সালাম নিয়ে কল অফ করে দিয়েছে। আহমদ মুসা মোবাইল রেখে দিয়ে ‘স্যরি’ বলে সকলের দিকে তাকাল। ‘আহমদ মুসা আপনি কি আমাদের মহান বড় ভাই আল-সউদের সাথে কথা বললেন?’ জিজ্ঞাসা প্রিন্স খালেদ আল-খালিফার। ‘জি।’ বলল আহমদ মুসা। ‘আপনাদের কথার মধ্যে আমার মনে কিছু কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে। আমি কি দু’একটা বিষয় জিজ্ঞাসা করতে পারি?’ ড. সালেহ আবদুল্লাহ বলল। এক খন্ড হাসি ফুটে উঠল আহমদ মুসার ঠোঁটে। বলল, ‘অবশ্যই স্যার, বলুন।’ ‘কি এক হুমকির কথা শুনলাম। আবার তা আপনার সামনে উন্মুক্ত হওয়ার কথা শুনলাম। অন্যদিকে আপনার অ্যাটল দ্বীপ নিয়ে বিশেষ করে একটা অঞ্চলের অ্যাটল দ্বীপ নিয়ে আপনার আগ্রহ। ইত্যাদি সব বিষয় মেলালে মনে হচ্ছে, বড় কিছু একটা ঘটেছে, আপনারা কিছু একটার সন্ধান করছেন।’ আহমদ মুসা মুহুর্তের জন্যে চোখ তুলে তাকাল প্রিন্স খালেদ আল-খালিফার দিকে। বলল, ‘আপনি ঠিকই ধরেছেন স্যার। একটা সন্ত্রাসী গ্রুপকে খোঁজা হচ্ছে। তাদের কোথায় পাওয়া যেতে পারে, এব্যাপারে নানা বিকল্প আমাদের সামনে আসছে। সেগুলো আসছে। সেগুলো ভাবা হচ্ছে। এটাই ঘটনা স্যার।’ আহমদ মুসা বিজ্ঞানী কিডন্যাপড্ হওয়ার ঘটনা চেপে গেল। ‘আল্লাহ আপনাদের সফল করুন। সকলেই আমরা সন্ত্রাসের উচ্ছেদ চাই।’ কথাটা শেষ করেই হাত ঘড়ির দিকে তাকাল প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা। বলল আবার, ‘আমরা এখন উঠতে পারি। লাঞ্চ রেডি।এখানে সুন্দর একটা ক্যান্টিন আছে সেখানেই আমরা যাব।’ উঠে দাঁড়াল প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা। ‘ধন্যবাদ এক্সিলেন্সি। আজকের লাঞ্চটা একটু আগাম আমার প্রয়োজন ছিল। আমার আরেকটা প্রোগ্রাম আছে।’ বলল আহমদ মুসা। হাসল প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা। বলল, ‘কিন্তু তার আগে আপনার আরও প্রোগ্রাম আছে। আমাদের মহামান্য সুলতানের সাথে দেখা করা। সে প্রোগ্রামও হযে গেছে। আমরা লাঞ্চের পরই সেখানে যাব।’ ‘ধন্যবাদ এক্সিলেন্সি, আমি খুশি হব তার সাথে দেখা করতে পারলে।এটাই আমার কাছে এখন সবচেয়ে প্রায়োরিটি প্রোগ্রাম।’ বলল আহমদ মুসা। ‘ধন্যবাদ মি. আবদুল্লাহ এই শুভেচ্ছার জন্যে।’ আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা। সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে। ‘থামুন, পাশেই আমার পার্সোনাল লিফট আছে।’ বলে হাঁটতে শুরু করল প্রিন্স খালেদ আল-খালিফা। তাকে অনুসরণ করল আহমদ মুসারা। ৪ তাহিতি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সুন্দরী এক তরুনী। তাহিতিয়ান চেহারা। কিন্তু মুখের আদলে সাউথ-ইষ্ট এশিয়ান ছাপ আছে। দেখলেই মনে হবে এ মেয়েটিকে ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার কোন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মনে হবে দেখেছি। মিষ্টি একটা চেহারা। কিন্তু পোষাকটা ব্যতিক্রম। তাহিতিয়ান অবয়বকে দখল করেছে এসে ইউরোপিয়ান পোষাক। পরণে কালো প্যান্ট। শর্ট সাদা সার্ট। কোমরে সাদা সার্টের উপর ফিতার মতো প্রশস্ত কালো চেইন। পাশে একটা খাতা পড়ে আছে। হাতে বই। পড়ছে সে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিক থেকে অভিজাত চেহারার এক তরুণ এগিয়ে আসছে মেয়েটির দিকে, তার পরণে তাহিতিয়ান ট্রেডিশনাল পোষাক। অবয়বেও সে তাহিতিয়ান। কিন্তু তারও চুল, চোখ ও মুখের গড়নে কিছুটা সেমেটিক, কিছুটা মঙ্গলীয় ছাপ। তরুণটি নিশব্দে এগিয়ে এল। একেবারে পাশে এসে দাঁড়ালেও টের পেল না তরুণীটি। তরুণটি মুখ টিপে হেসে তর্জনি দিয়ে টোকা দিল তরুণীটির মাথায়। চমকে উঠে ফিরে তাকাল তরুণীটি। তরুণকে দেখে মিষ্টি হেসে উঠে দাঁড়িয়ে আলতোভাবে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘স্যরি।’ তরুণটির নাম তামাহি মাহিন পোপা। তাহিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সে। পার্ট টাইম কাজও করে একটা সাপ্লায়ার প্রতিষ্টানে। ‘তুমি কি ক্লাস শেষ করে এসেছ মারেভা?’ ‘তোমার যখন মোবাইল পেলাম, তখন আমি ক্লাসে। আসতে একটু দেরি হলো। খুব জরুরি কিছু?’ বলল তামাহি মাহিন পোপা। মারেভার পুরো নাম মারেভা মাইমিতি পাপেতি। সে কলেজ অব টেকনলজিতে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্রী। অন্যান্য অনেক তাহিতিয়ান ছেলে-মেয়ের মত সেও পার্টটাইম পর্যটক গাইড হিসাবে কাজ করে। তামাহি মাহিন পোপার সাথে মারেভা মাইমিতির মন দেয়া-নেয়ার সম্পর্ক তাদের স্কুল জীবন থেকেই। দু’জনে উত্তর পাপেতি শহরের একই স্কুলে পড়ত। ‘জরুরী নয়, কিন্তু তোমাকে বলা দরকার। সেই জন্যেই ডাকা। সান্ডা সুসানের আচরণে আমার খুব অস্থির লাগছে। গতকাল টেলিফোনে আবার সে আমাকে থ্রেট দিয়েছে। আমি তোমাকে আবারও বলছি পার্ট টাইম চাকরিটা তুমি ছেড়ে দাও।’ ‘কেন, সান্ড্রা সুসান আবার তোমাকে কি বলেছে?’ শুকনা কন্ঠে বলল তামাহি মাহিন। তার মুখও মলিন। সান্ড্রা সুসান তামাহি মাহিনের বস। পাপেতির একটা সাপ্লাই অফিসের ষ্টেশন ম্যানেজার। এই অফিসেই তামাহি মাহিন সুপারভাইজিং অফিসার হিসাবে কাজ করে। ‘কি বলবে, সেই একই কথা। গতকাল তো গালিগালাজ করেছে। আর বলেছে আমাকে তোমার পথ থেকে সরে দাঁড়াতে।’ বলল মারেভা মাইমিতি। তার কন্ঠ ভারি। ‘এটা সে অন্যায় করেছে। ওর প্রতি আমার বিন্দুমাত্র সমর্থন নেই। মাইমিতি তোমাকে তো আগেই বলেছি যে, আমি যখনই বুঝলাম সে আমার ঘনিষ্ঠ হতে চায়, তখনই আমি তাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছি তোমার আমার সম্পর্কের কথা। আমি তাকে কখনও সামান্য প্রশ্রয়ও দেইনি। সে আমার বস, আমি তাকে আর কি বলতে পারি।’ তামাহি মাহিন বলল। তার কন্ঠে অসহায়ত্বের সুর। ‘কিছু তুমি বলতে পারবে না, সে জন্যেই বলছি তুমি ঐ চাকরি ছেড়ে দাও।’ বলল মারেভা মাইমিতি। ‘চাকরিটা খুব ভাল মারেভা। সকাল ৯টা থেকে ১০টা এই এক ঘন্টা সকালের সব্জি, মাছ, গোশতের কোয়ালিটি পরীক্ষা করে কেনা-কাটার একটা তালিকা তৈরি করে অফিসকে দিতে হয়। আর সন্ধ্যার পর এ ঘন্টা জিনিসগুলো বাইরে ডেলিভারি দিতে হয়। এ সময় প্যাকিংগুলো চেক করতে হয়, যাতে প্যাকিং করা জিনিসগুলোর কোন ক্ষতি না হয়। শেষে ডেলিভারির একটা তালিকা অফিসে আমাকে ফাইল করতে হয়। হঠাৎ কখনও কখনও মালের ডেলিভারির জন্যে আমাকেও বাইরে যেতে হয়। মোটামুটি দুই ঘন্টার চাকরি। কিন্তু আমি পাই ফুল চাকরির বেতন। তবু চাকরি আমার বড় নয়, তুমি বড়। তোমার জন্যে চাকরি কেন, আরও কিছু হলেও তা ছাড়তে রাজি আছি’ তামাহি মাহিন বলল। আবেগরুদ্ধ হয়ে উঠিছিল তার কন্ঠ। মারেভা মাইমিতি দু’হাত দিয়ে তামাহি মাহিনের একটা বাহু জড়িয়ে ধরে মাথা রাখল তামাহি মাহিনের কাঁধে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের গেট দিয়ে একটা গাড়ি প্রবেশ করে ধীরে ধীরে এগিয়ে তাদের সামনে এসে ব্রেক কষল। গাড়ির জানালা খোলা। ড্রাইভিং সীটে একজন পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের শ্বেতাংগ যুবতী। সে তাকিয়ে ছিল তামাহি মাহিনদের দিকে। তামাহি মাহিনরাও তাকে দেখছিল। মারেভা মাইমিতি মাহিনের হাত ছেড়ে দিয়ে তার কাঁধ থেকে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসেছিল। শ্বেতাংগ যুবতী গাড়িতে কয়েক মুহুর্ত অপেক্ষা করে নেমে এল গাড়ি থেকে। সে আসছিল তামাহি মাহিনদের দিকে। উঠে দাঁড়াল তামাহি মাহিন। তার মুখে অস্পষ্ঠ একটা বিরক্তির ও বিমর্ষ ভাব। তামাহি মাহিনের সাথে মারেভা মাইমিতিও উঠে দাঁড়িয়েছে। শ্বেতাংগ যুবতীটি কাছাকাছি আসতেই তামাহি মাহিন বলল মুখে হাসি আনার চেষ্টা করে, ‘হাই মিস সান্ড্রা সুসান, কিছু ঘটেছে? জরুরি কোন ব্যাপার?’ ‘হাই মাহিন, আমি তোমাকে টেলিফোন করেছিলাম। পাইনি, তাই আসতে হলো। অফিসে জরুরি কাজ পড়েছে। একটু তোমাকে যেতে হবে চল।’ সান্ড্রা সুসান বলল। এই সান্ড্রা সুসানই তামাহি মাহিনের অফিসের বস। মেয়েটা শ্বেতাংগ হলেও আকৃতিতে সে ফিলিপাইনি। তার চোখ দু’টিতে নারীসুলভ কমনীয়তার চাইতে রুক্ষতাই বেশি। কথায় দ্বিধাহীন নির্দেশের সুর। তামাহি মাহিন হাতঘড়ির দিকে তাকাল। তাকাল মারেভা মাইমিতির মলিন মুখের দিকেও। বলল মারেভা মাইমিতিকে, ‘তাহলে আসি আমি। তুমি বাসায় যা্ও। ফিরে এসে আমি কল করব।’ তামাহি মাহিনের কন্ঠে একটু বেপরোয়া ভাব। সে কথা শেষ করেই তাকাল সান্ড্রা সুসান দিকে। বলল, ‘চলুন মিস সান্ড্রা সুসান।’ ‘তুমি গাড়িতে গিয়ে বস আমি আসছি।’ বলল সান্ড্রা সুসান তামাহি মাহিনকে। মনে মনে আশংকিত হলো তামাহি মাহিন সান্ড্রা সুসান তাহলে মারেভার সাথে কথা বলতে চায়। কি কথা বলবে। আবার গালি-গালাজ করবে নাকি? মনে মনে ক্ষুদ্ধ হলো তামাহি মাহিন। কিন্তু কিছু না বলে সে গাড়ির দিকে চলল। মলিন মুখে দাঁড়িয়েছিল মারেভা মাইমিতি। তামাহি মাহিন চলে গেলে সান্ড্রা সুসান দু’ধাপ এগিয়ে মারেভা মাইমিতির মুখোমুখি হলো। সান্ড্রা সুসানের চোখে-মুখে চরম অসন্তোষ ও ক্রোধের প্রকাশ। বলল সে মারেভা মাইমিতিকে, ‘কাল তোমাকে কি বলেছি মনে নেই?’ মারেভা মাইমিতির চোখে-মুখে রুখে দাঁড়াবার ভংগি ফুটে উঠল। বলল, ‘মনে থাকলে কি হবে? আমি মাহিনকে ছেড়ে চলে যাব? আমাদের সর্ম্পককে বাইরের কেউ ডিকটেট করতে পারে না।’ চোখ দু’টি যেন জ্বলে উঠল সান্ড্রা সুসানের। বলল, ‘সামান্য একজন নেটিভের খুব বাড় তো দেখছি! আমি বাইরের লোক কে বলল তোমাকে। তামাহি মাহিন আমাদের ওখানে চাকরি করে। সে এখন আমাদের লোক।’ ‘নেটিভ!’ শব্দটি খুব আঘাত করেছিল মারেভা মাইমিতিকে। তার র্স্বণালী চেহারা অপমানে লাল হয়ে উঠেছিল। বলল, ‘তুমি কিন্তু ‘নেটিভ’দের দেশে এসেছ, আমি কিন্তু অনেটিভদেরই একজন। আর শোন আমি তোমার কোন ব্যাপারে নাক গলাতে চাই না, আমি পছন্দ করব না আমার কোন ব্যাপারে তুমি নাক গলাও।’ সান্ড্রা সুসানের দু’চোখ দিয়ে যেন আগুন বেরুচ্ছে। তার মুখ শক্ত হয়ে উঠেছে। মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠেছে হাত দু’টি। বলল সে চাপা তীব্র কন্ঠে, ‘কথা তুমি অনেক বড় বলে ফেলেছ।এর উপযুক্ত জবাব আমি দিতে পারি, কিন্তু আজ নয়। আমি তোমাকে শেষ বারের মত সাবধান করে দিচ্ছি, তুমি তামাহি মাহিনের পথ থেকে সরে দাঁড়াও এবং সেটা আজ থেকেই। তা না হলে তোমার পরিণতি কি হতে পারে তা তুমি কল্পনা করতে পারছ না্।’ বলেই ঘুরে দাঁড়িয়ে দ্রুত পায়ে চলল গাড়ির দিকে। গাড়ির ড্রাইভিং সীটে বসতে সে বলল, ‘মাহিন, এ মেয়েটাতে খুব বেয়াদব? কথা বলতেও জানে না। এ রকম মেয়ের সাথে বসে বসে কথা বল কি করে তুমি! যাক ভালো করে শাসিয়ে দিয়েছি।’ তামাহি মাহিনের মুখটা অসন্তুষ্টিতে ভরে গেল। কিন্তু কোন কথা বলল না সে। সান্ড্রা সুসান একবার তাকাল তামাহি মাহিনের দিকে। তার চোখে একটা চকচকে দৃষ্টি। চোখ ফিরিয়ে সে তাকাল সামনে। দু’হাত সে চেপে ধরল ষ্টেয়ারিং হুইল। ঠোঁটে একটা ঠান্ডা হাসি। গাড়ি চলতে শুরু করল। অফিসে বসের আচরণে তামাহি মাহিন খুব পেরেশান হয়ে পড়েছিল। সে সোজা চলে এসেছে মারেভাদের বাড়িতে। গাড়ি থেকেই তামাহি মাহিন দেখল মারেভা মাইমিতি গেট দিয়ে তাদের বাড়িতে প্রবেশ করছে। ‘মারেভা।’ ডাকল তামাহি মাহিন। থমকে দাঁড়িয়ে ফিরে তাকাল মারেভা মাইমিতি। তামাহি মাহিনকে দেখে তার চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল। খরব না দিয়ে, টেলিফোন না করে তো মাহিন এভাবে আসে না। আর বিশ্ববিদ্যালয় ছুটির পর এমন অসময়ে সে কখনও আসে না। উদ্বিগ্ন হলো মারেভা মাইমিতি। ছুটে এল সে তামাহি মাহিনের কাছে। সাধারণত দেখা হলেই মাহিনের যে স্বভাজাত হাসির উচ্ছসিত প্রকাশ দেখে তা আজ দেখতে পেল না মারেভা। তার বদলে চোখে-মুখে একটা দুশ্চিন্তার প্রকাশ। আরও উদ্বিগ্ন হলো মারেভা। ‘কি ব্যাপার মাহিন? এমন সময়ে, কোন খবর না দিয়ে? চল ভেতরে।’ বলল মারেভা উদ্বিগ্ন কন্ঠ। ‘না ভেতরে নয়, চল পাশের পার্কে গিয়ে বসি।’ তামাহি মাহিন বলল। মারেভা মাইমিতি তামাহি মাহিনের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। বাড়িতে এসেও পার্কে গিয়ে কথা বলবে! আশংকিত হলো মারেভা মাইমিতি। কি হলো মাহিনের?’ কিছু ঘটেছে তাহলে?কি সেটা? ‘ঠিক আছে আমি বাসায় বই রেখে আসি। তুমি একটু দাঁড়াও।’ বলল মারেভা মাহিন। বলে দৌড় দিল সে বাড়ির ভেতরে। ফিরে এল মিনিট খানেকের মধ্যেই। তামাহি মাহিনের হাত ধরে বলল, ‘চল।’ মারেভা মাইমিতির বাড়ির পাশ দিয়েই অ্যাভেনিউ ডি পোমেরা। র্পাকটিও এ অ্যাভেনিউ-এর ধারে আর মারেভা মাইমিতিদের বাড়রি পাশেই। অ্যাভেনিউ হয়ে না গিয়েও মারেভাদের বাড়ি থেকেও পার্কে প্রবেশ করা যায়। পার্কে ঢুকে একটা গাছ পেছনে রেখে তার ছায়ায় এক বেঞ্চিতে বসল দু’জন, মারেভা ও মাহিন। ‘কি ঘটেছে বলত?’ একটা কথাও বলছ না।’ বসেই মাহিনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল মারেভা মাইমিতি। ‘ঘটনাটা বলার জন্যেই এসেছি মারেভা।’ বলে একটুক্ষণ চুপ থাকল তামাহি মাহিন। একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘সেদিন তোমাকে আমার বস সান্ড্রা সুসান যে থ্রেট করেছিল, আমি গাড়িতে বসেই তা শুনতে পেয়েছিলাম। সেদিন আমি কিছু বলিনি। পরদিন আমি লিখিতভাবে অফিসকে জানাই যে, আগামী মাসের এক তারিখ থেকে আমি আমার কাজ রাখতে পারবো না। এই চিঠিকেই আমার ইস্তেফা পত্র হিসাবে গ্রহন করা হোক।’ আমি অফিস শেষে বাড়ি আসার সময় এই ইস্তেফা পত্র অফিসে দিয়ে আসি।’ থামল তামাহি মাহিন। ‘এটাই তো আমরা চেয়েছিলাম। তুমি ভাল কাজ করেছ। কিন্তু তোমার মুখ মলিন কেন? হাসি নেই কেন মুখে?’ বলল মারেভা মাইমিতি। মারেভার একটা হাত তামাহি মাহিন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বলল, ‘আমি কথা শেষ করিনি মারেভা। আমার ইস্তেফা পত্র ওরা গ্রহণ করেনি। আমি ইস্তেফা পত্র দিয়ে বাড়ি এসে পৌঁছার কিছুক্ষণ পরেই অফিস থেকে গাড়ি এসে আমাকে নিয়ে যায়। বস অফিসেই বসেছিল। আমাকে দেখে সে হাসল। হাসিটা ঠিক যেন সাপের হাসির মত। বলল, ‘চাকরিতে তুমি ঢুকেছ তোমার ইচ্ছার অধীন। চাকরি ছাড়ার তোমার সুযোগ নেই। অফিসে আসা বন্ধ করলে লোকরা গিয়ে তোমাকে ধরে আনবে। আমাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে কোথাও পালিয়ে থাকার সাধ্যও তোমার নেই। আর যদি বেশি বাড়াবাড়ি কর, তাহলে প্রথমে প্রাণ যাবে তোমার প্রেমিকার। তারপর তোমার। অন্যদিকে আমার কথা মেনে যদি চল তাহলে তোমার, তোমার বাড়ির, পরিবারের শ্রীবৃদ্ধি হবে। এসব কথা সে হাসতে হাসতে বলেছে। সে হাসির ধার আমার কাছে ছুরির ধারের চেয়েও ভয়ংকর মনে হয়েছে।’ থামল তামাহি মাহিন। মুষড়ে পড়া বিধ্বস্ত তার চেহারা। মারেভা তাকিয়েছিল তামাহি মাহিনের মুখের দিকে। তারও মলিন মুখ উদ্বেগে ভরা। তামাহি মাহিন থামলেও তখনি কথা বলতে পারল না মারেভা। তার বুক কাঁপছে। কোন মানুষ এমন নির্লজ্জ আর নিষ্ঠুর হয়! তামাহি মাহিনও নিরব। অন্ধকারের মত ভারি নিরবতা ভাঙল মারেভাই। বলল, ‘তুমি কি ভাবছ? আপাতত চাকরি না ছাড়লেই তো একটা সমাধান হয়।’ ‘অসম্ভব। ওর ওধীনে ভেবে দেখেছ? ওরা জোর করে তোমাকে অফিসে নিয়ে যাবে। না গেলে কি হবে সে থ্রেট তো দিয়েই রেখেছে।’ মারেভা বলল। ওরা তোমার করে বসে? ‘আমি নিজের জন্যে এক বিন্দুও ভাবছি না। ওরা বাড়াবাড়ি করলে আমি আমি পুলিশ কে বলব। কিন্তু আমি ভাবছি তোমার কথা।যদি কোন ক্ষতি করে বসে?সে থ্রেট তো সান্ড্রা দিয়েছেই।বললাম না ওর হাসিটাও সাপের মত, ছুরির মত। ওরা সব পারে।’ বলল তামাহি মাহিন। ‘আমাকে নিয়ে ভেব না। দেশটায় আমাদের আইন এখনও আছে। বাইরের থেকে এসে ওরা আমাদের নেটিভ বলে গালি দেবে, আর যা ইচ্ছা তাই বলবে আর তা আমাদের মেনে নিতে হবে! কিন্তু এখনই গন্ডগোল না পাকিয়ে তুমি আরও কিছু দিন নিরবে চাকরি করে যাও।’ বলল মারেভা মাইমিতি। ‘ভয় ও ঘৃণা দুই-ই সৃষ্টি হয়েছে আমার তার প্রতি। ওর পাশে চাকরির অভিনয় করাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। অফিসে প্রায় আমরা এক সাথে থাকি। কোন সময় কোন ঘটনা সৃষ্টি করে, কখন কোন অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে আনে তার ঠিক নেই। আমি কাল থেকেই আর অফিসে যাচ্ছি না।’ তামাহি মাহিন বলল। পেছনে পায়ের শব্দ পেয়ে মারেভা ও মাহিন দু’জনেই পেছনে ফিরে তাকাল। দেখলো মারেভার মা তাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। মারেভারা দু’জনেই উঠে দাঁড়াল। ‘মা, তুমি এখানে?’ বলল মারেভা মাইমিতি। ‘হ্যাঁ, আমি পার্কে অনেকক্ষণ এসেছি। ফেরার পথে তোমাদের দেখে এলাম। তোমরা এখানে কেন? আর তোমাদের এতটা বিমর্ষ দেখাচ্ছে কেন? আসতে আসতে মাহিনের মুখে কার বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা, আর কাল থেকে অফিসে আর না যাবার কথা শুনলাম। এসবের অর্থ কি?’ বলল মারেভার মা। দু’জনেই নিরব। তাকাল একে-অপরের দিকে। তামাহি মাহিনই কথা বলল, ‘আন্টি, আপনার কাছে কিছুই লুকানো ঠিক নয়। কিন্তু আন্টি তাতে আমাদের মতই আপনার মন খারাপ হবে, উদ্বিগ্ন হবে।’ ‘বাছা, ছেলে মেয়েদের উদ্বেগ বাবা-মা শেয়ার করবে না তো কে করবে? বল বাছা, কি হয়েছে তোমাদের?’ তামাহি মাহিন তার অফিসের বস সান্ড্রা সুসানের সাথে কি ঘটেছে, তামাহি মাহিন কি সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সব বলল মারেভার মাকে। শুনতে শুনতে উদ্বেগে ভরে গেল মারেভার মা’র মুখ। তামাহি মাহিনের কথা শেষ হতেই বলল, ‘মারেভা ঠিক বলেছে চাকরি অব্যাহত রেখে কি করা যায় তা ভাবার সুযোগ নেয়া দরকার। লোক ওরা সাংঘাতিক মনে হচ্ছে।’ ‘কিন্তু আন্টি, যে ভয়ের কারণে চাকরি অব্যাহত রাখার কথা বলছেন, যা ঘটেছে তার পর আমি চাকরি অব্যাহত রাখলে সে ভয় আরও বাড়বে। পরে কিছু করতে গেলে তাদের জিঘাংসা আরও বৃদ্ধি পাবে।’ তামাহি মাহিন বলল। ভাবছিল মারেভার মা। বলল, ‘তোমার কথাও ঠিক মাহিন। তাহলে আমাদের কি করা কর্তব্য? পুলিশকে আমরা বলতে পারি। কিন্তু জানি না বাছা, ফরাসীদের নিয়ন্ত্রিত পুলিশ সাদা চামড়ার সান্ড্রা সুসানদের বিপক্ষে কোন পদক্ষেপ নেবে কিনা। নেটিভদের অভিযোগ অনেক সময়ই তাদের কাছে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু তবু এটাই একমাত্র বিকল্প। আর এখনি এপথে না গেল আমি যা মনে করি চাকরি অব্যাহত রেখে সময় ক্ষেপণের পথ নিতে হবে।’ ‘তারা কি করতে পারে আন্টি? আমার ভয় শুধু মারেভাকে নিয়ে। তাদের জিঘাংসার প্রথম টার্গেট হতে পারে মারেভাই।’ বলল তামাহি মাহিন। ‘আমি ভয় করি না মাহিন। ওরা একটা হুমকি দিয়েছে বলেই আমরা গেয়ে পায়ে পড়ব? কেন এদেশ আমাদের নয়। এরা তো একে একে আমাদের জাতীয় সব কিছুই নিয়ে নিয়েছে, আমাদের ব্যাক্তি সত্ত্বাও আমাদের থাকবে না, তা হয় না। এটাই আমার পরিষ্কার কথা মা। মারেভা মাইমিতি বলল।’ আবেগরুদ্ধ মারেভার কন্ঠ। মারেভার আবেগ মারেভার মা ও তামাহি মাহিনকেও স্পর্শ করেছে। মারেভা থামলেও সংগে সংগে কথা বলতে পারলো না মারেভার মা ও তামাহি মাহিন। নিরবতা ভাঙল মারেভার মা। বলল, ‘মারেভার আবেগ ঠিক আছে। কিন্তু আবেগ দিয়ে সব সময় বাস্তবতার বিচার চলে না। যা হোক, মারেভা তুমি অন্তত কিছুদিন কলেজ যাওয়া বন্ধ রাখ। বিষয়টা নিয়ে কি করা যায় দেখা যাক। আর আমি মনে করি, মাহিনকেও সাবধান থাকতে হবে। তুমিও বিশ্ববিদ্যালয়ে যেও না। পারলে বাইরে থেকে বেড়িয়ে এস।’ ‘কিন্তু মা, কলেজে যাওয়া কয়েকদিন বন্ধ রাখলেও গাইডের কাজটা বন্ধ রাখতে পারবো না। ট্যুরিষ্টদের পিক সিজন শুরু হয়েছে। আমার এ বছরের রেজিষ্ট্রশনও হয়েছে। কাল থেকেই আমি কাজ শুরু করছি।’ বলল মারেভা। ‘আন্টি, মারেভা এটা করতে পারে। প্রতি বছরই তো করছে। চাকরি ছেড়েছি যেহেতু, আমিও চিন্তা করছি এ কাজে লাগার।’ তামাহি মাহিন বলল। চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল মারেভার। বলল, ‘তাহলে তুমি কাল নাম রেজিষ্ট্রেশন করাও। এবার একটু কড়াকড়ি। নাম রেজিষ্ট্রেশন না করলে গাইডের কাজ করা যাবে না।’ ‘হ্যাঁ, তোমরা যদি এক সাথে কাজটা করতে পারো, তাহলে মন্দ হয় না। সব সময় মানুষ নিয়ে কারবার, মানুষের মধ্যে থাকতে হবে, এর মধ্যে একটা নিরাপত্তা আছে। তবে আসা-যাওয়াটা যাতে দু’জনের এক সাথে হয় তার জন্যে চেষ্টা করো তোমরা।’ বলল মারেভার মা। ‘ঠিক আছে এটা করা যাবে। আমিই মারেভাকে বাসা থেকে নিয়ে যাব।’ বলল তামাহি মাহিন। ‘এটা বোধ হয় ঠিক হচ্ছে না। একবার ভয়ের কাছে আত্মসর্মপণ করলে এ থেকে আর মুক্তি পাওয়া যাবে না।’ মারেভা বলল। ‘তুমি আর কথা বাড়িও না মারেভা। কোন বিধিবদ্ধ আইন করা হচ্ছে না। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা তুমি আমি সবাই করতে পারবো।’ বলল তামাহি মাহিন। ‘ধন্যবাদ তোমাদের। মনে রেখ ভয় থাকাটা সবসময় খারাপ নয়। ভয় মানুষকে সাবধান করে। এর প্রয়োজন আছে। আশা করি তোমাদের মনে থাকবে কথাটা। চল এবার উঠা যাক।’ মারেভার মা বলল। সবাই উঠে দাড়াল। পাপেতি বিমানবন্দর। লাগেজ সার্কেলের বাইরে আউটার। আউটার লাউঞ্জে সবার সাথে দাঁড়িয়ে আছে মারেভা মাইমিতি। যাত্রী ও ট্যুরিষ্টরা বের হতে শুরু করেছে। কাঁচের দেয়াল ঘেরা লাগেজ সার্কেল দেখা যাচ্ছে, এদের অধিকাংশই ট্যুরিষ্ট। সব সময় যা হয় ট্যুরিষ্টদের ধরার জন্যে গাইডদের মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। আজও সেই কাড়াকাড়ি। পাশ থেকে বান্ধবী তিউ অন্য সবার সাথে ছুটে গেছে পর্যটকদের দিকে। মারেভা মাইমিতি যায়নি। সে টানা-হেঁচড়া পছন্দ করে না, সে ভাগ্যে বিশ্বাসী। তার বন্ধু-বান্ধবীরা, তার পরিচিতজনরা এবং অন্যরা ট্যুরিষ্টদের নিয়ে একে একে চলে যাচ্ছে। এল তার বান্ধবী তিউ দু’হাতে দুই ব্যাগ নিয়ে। ‘পেছনে একজন ট্যুরিষ্ট আসছে। কোন গাইড নেয়নি।’ একথা বলে তিউ চলে গেল। মারেভার তাকাল যেদিকে তিউ ইংগিত করেছিল সেদিকে। দেখল, এশিয়ান এক যুবক। পোষাকে-আশাকে অন্যান্য ট্যুরিষ্টদের মতো বিদঘুটে নয়, পরনে পরিচ্ছন্ন পোষাক। মাথার চুলের আকার ও অবস্থায় কোন স্বেচ্ছাচারিতা নেই। চুল সুন্দর করে আঁচড়ানো। আকৃষ্ট হলো মারেভা। ট্যুরিষ্ট যুবকটি কাছাকাছি আসতেই মারেভা মাইমিতি দু’ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘স্যার মে আই হেলপ ইউ? সার, আমি কি আপনাকে সাহায্য করতে পারি?’ ট্যুরিষ্ট যুবকটি তাকাল মারেভার দিকে। শান্ত, কিন্তু সাগরের মত গভীর দৃষ্টি ট্যুরিষ্ট যুবকটির চোখে। থমকে দাঁড়িয়েছে সে। মিষ্টি একটা অস্ফুট হাসি ফুটে উঠেছে ট্যুরিষ্ট যুবকটির ঠোঁটে। বলল, ‘ধন্যবাদ, হ্যাঁ আমাকে পথ দেখিয়ে সাহায্য করতে পার।’ ‘অনেক ধন্যবাদ স্যার।’ বলে মারেভা মাইমিতি ট্যুরিষ্ট যুবকটির হাত থেকে ব্যাগটি নিতে চাইল। ‘না মিস…….. আমাকে পথ দেখিয়ে সাহায্য করতে বলেছি, ব্যাগ বহন করতে বলিনি। আর আমি তোমার চেয়ে, শক্তিও বেশি হবে নিশ্চয়? সুতরাং ব্যাগ আমরই বহন করা উচিত।’ বলল ট্যুরিষ্ট যুবকটি হাসি মুখে মারেভার দিকে না তাকিয়েই। ট্যুরিষ্ট যুবকটির কথা শুনে অবাক-বিস্ময় নিয়ে মারেভা তাকাল ট্যুরিষ্ট যুবকটির দিকে। এমন অদ্ভুদ মানুষ সে জীবনে দেখেনি। শোনেওনি কখনো এমন ট্যুরিষ্টের কথা। বলল, ‘স্যার, আমার নাম মারেভা মাইমিতি।’ বলে মারেভা ট্যুরিষ্ট যুবকটির দিকে হাত বাড়াল হ্যান্ডশেকে জন্যে। এটা তাহিতির একটা কালচার। ট্যুরিষ্ট যুবকটি হাত না বাড়িয়ে ‘ধন্যবাদ’ বলে জানাল তার নাম, আমি আবু আহমাদ।’ ট্যুরিষ্ট আবু আহমদ।’ ট্যুরিষ্ট যুবকটি আবু আহমদ আসলে আহমদ মুসা। অন্যান্য অনেক সময়ের মত সংগত কারণেই ছদ্মনামের আশ্রয় নিল। তার সন্দেহ সত্য হলে এখানে ছদ্মনামের আশ্রয় নিল সে। তার সন্দেহ সত্য হলে এখানে ছ্দ্মনাম গ্রহণের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। ‘আবু আহমাদ’ নামটি মারেভা মাইমিতি শুনল বটে, কিন্তু ধন্যবাদ দিতে পারলো না। আহমদ মুসা হ্যান্ডশেক না করায় অপমানিত বোধ করল মারেভা মাইমিতি। সে মনে করল ‘গাইড’ বলে তাকে ছোট মনে করা হলো। আবার আহমদ মুসার স্বচছ-সরল মুখ দেখে কিন্তু এটা তার মন মেনে নিতে চাইলো না। যা হোক, এমন আচরণ কোন ট্যুরিষ্টের মধ্যে সে এর আগে দেখেনি। আহত মনটাকে সে বুঝাতে পারল না। এ সব চিন্তায় একটু দ্বিধায় পড়েছিল মারেভা মাইমিতি। কিঞ্চিত সময় নষ্ট হলো। পরে মুখে জোর করে হাসি টেনে বলল, ‘চলুন স্যার।’ তারা বেরিয়ে এল কার পার্কে। ‘মিস মারেভা, ট্যুরিষ্টদের ভীড় কম, এমন ভাল হোটেল আছে পাপেতিতে?’ বলল আহমদ মুসা। পাওয়ার ক্যাপিটাল হয়েছে বা হতে পারে এমন একটা অ্যাটল দ্বীপের সন্ধানে সে এসেছে। ট্যুরিষ্ট নয়, এ অঞ্চলের বা অন্য কোন অঞ্চলের নাগরিকদের সাহচর্য তার দরকার যারা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে আসে ও যায়। মারেভা তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘আছে স্যার, তবে খুব এক্সপেনসিভ। বেশি খরচ বলে ট্যুরিষ্টরা সেগুলোতে যায় না বললেই চলে।’ ‘গুড, সে হোটেলগুলোর মধ্যে উপকূলের ধারে এমন একটি হোটেলে চল।’ আহমদ মুসা বলল। মারেভা একটা বেবিট্যাক্সি ডাকল। সিংগল ট্যুরিষ্টরা সাধারনত এগুলোই ব্যবহার করে। ‘না মিস মারেভা, বেবিট্যাক্সি নয়, ম্যান ট্যাক্সি ডাকুন।’ বলল আহমদ মুসা। তার ঠোঁটে হাসির রেখা। মারেভা তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘ম্যান ট্যাক্সি মানে স্যার…!’ ‘ফুল ট্যাক্সি, ৪ সীটের ট্যাক্সি। বেবিট্যাক্সি নয়।’ আহমদ মুসা বলল। আহমদ মুসার কথার ধরনে হেসে ফেলল মারেভা। ওকে স্যার। আমি ফুল ট্যাক্সি ডাকছি। বলল মারেভা। ট্যাক্সি নিয়ে এল মারেভা। আহমদ মুসা গাড়ির দরজা খুলে হাতের ব্যাগটা পেছনের সীটে রেখে সামনে ড্রাইভারের পাশের সীটে গিয়ে বসল। বিস্মিত মারেভা তাকাল আহমদ মুসার দিকে। এ রকমটা রকটা রীতি নয়। ট্যুরিষ্ট, অতিথিরা যারা আসেন তার এরকম করেন না। গাইড বসে ড্রাইভারের পাশের সীটে, ড্রাইভারকে গন্তব্য বলতে হয় তাকেই। আর ট্যুরিষ্ট, অতিথি একজন হলেও পেছনের সীটেই বসেন। আহমদ মুসা সীটে বসে বিস্মিত চোখে চেয়ে থাকা মারেভাকে বলল, ‘তুমি পেছনের সীটে বস। স্যরি, তুমি বলে ফেললাম!’ বিস্মিত মারেভা পেছনের সীটে গিয়ে বসল। মনে মনে বলল, ‘কি পাগলরে বাবা। সব উল্টো কাজ। আমাকে পেছনের বসাল। একটুও ভাবল না যে, তাহলে আমিই গাড়ির মনিব হয়ে গেলাম। দু’সীটের হলেই যেখানে চলে সেখানে চরগুণ ভাড়া দিয়ে নিল ক্যাডিলাক কার। ট্যুরিষ্টদের প্রিয় হোটেল নিল না, নিল সবচেয়ে এক্সপেনসিভ হোটেল। টাকা আছে না হয় খরচ করল, কিন্তু এসব পাগলামি কেন? হ্যান্ডশেক করে না, বিশেষ করে মেয়েদের সাথে! এমন আজব লোক আমি জীবনে দেখিনি কোন দিন। গাড়ি চলছে পাপেতির প্রশস্ত রাস্তা দিয়ে। এক সময় আহমদ মুসা মুখ পেছন দিকে না ফিরিয়েই মারেভাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘কি যেন হোটেলের নাম বললে? কোন নাম কি বলে দিয়েছ আমাদের এই কার-মালিক ভাইকে?’ ‘বলে দিয়েছি স্যার। হোটেলের নাম ‘লা ডায়মন্ড ড্রপ তাহিতি’। উনি হোটেলটি ভাল করে চেনেন স্যার।’ বলল মারেভা। ‘একটু বেশি দামী। কিন্তু চমৎকার সিলেকশন, স্যার। পাহাড়ী নদী টাওনার মোহনায় ঐতিহাসিক বদ্বীপের উপর হোটেলটি। হোটেলটির পা ধুয়ে দিচ্ছে বিস্তৃত টাওনা লেক। লেকটার চারদিকেই কোরাল রীফ। কিন্তু ডান-বাম দু’টি দিকেই প্রশস্ত পথ আছে বেরিয়ে যাবার। আর সামনে সাগরের দিকটাই বেশি খোলা।’ বলল গাড়ির ড্রাইভার। ‘বদ্বীপকে ঐতিহাসিক বলছেন কেন?’ জিজ্ঞাসা আহমদ। ‘স্যার, ১৮৮০ সালের পূর্ব পর্যন্ত তাহিতির পোমা রাজবংশের অবকাশকালীন প্রাসাদ ছিল এই বদ্বীপে। তাহিতি দ্বীপ ও এই অঞ্চলকে ফরাসীরা ফ্রান্সের অংগীভূত করে নেবার পর অনেকদিন রাজার লোকরা এই প্রাসাদে ছিলেন। তারপর ধীরে ধীরে প্রাসাদ বিরান হয়ে যায়। এই প্রাসাদের ধ্বংসস্তুপের উপর রাজকীয় স্ট্যাইলে লা ডায়মন্ড ড্রপ হোটেলটি তৈরি হয়েছে। আপনি…..।’ হঠাৎ থেমে গেল ড্রাইভার। থেমেই সে আসার বলে উঠল, ‘আমরা লা ডায়মন্ড ড্রপে এসে গেছি স্যার।’ লেকের দিকে মুখ করে হোটেলটি তৈরি। হোটেলের বিশাল গাড়ি বারান্দায় গাড়ি থেকে নামল আহমদ মুসা। চারদিকে তাকিয়ে চমৎকৃত হয়ে গেল সে। তিন দিক থেকে লেক ঘিরে আছে হোটেলটিকে। লেকের ডান-বাম দু’দিকেই দেখা যাচ্ছে কোরাল প্রাচীর। সে সামনেও মাইল খানেক দূরে দেখা যাচ্ছে কোরাল প্রাচীরের মাঝখানে একটি প্রণালী লেককে সাগরের সাথে এক করে দিয়েছে। প্রণালীর দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে প্রশান্ত সাগরের অন্তহীন নীলবুক। দৃষ্টি ফিরে এলে বদ্বীপের পাশ দিয়ে নেমে আসা পাহাড়ী নদী টাওনাকে দেখতে পেল। অদ্ভূদ সুন্দর মিলনের এই দৃশ্যটি। পাহাড়ী নদীর চঞ্চল সফেদ স্রোত অবিরাম এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে লেকের নিরব-নিস্তরঙ্গ কালো বুকে। ‘সত্যি অপরূপ এই পরিবেশ, যা শুধু উপলদ্ধিই করা যায়, ভাষায় এর বর্ণনা চলে না।’ বলল অনেকটা স্বগতকন্ঠে আহমদ মুসা। আহমদ মুসার ব্যাগ নিয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে মারেভা মাইমিতি। আহমদ মুসা ‘ধন্যবাদ’ বলে মারেভার হাত থেকে ব্যাগটি নিয়ে বলল, ‘গাড়ি এখন ছেড়ে দেব মারেভা?’ ‘আপনি কখন বেরুতে চান? আপনার কি প্রোগ্রাম?’ বলল মারেভা। ‘না, বিকেলের আগে বেরুচ্ছি না।’ বলল আহমদ মুসা। ‘তাহলে গাড়ি ছেড়ে দিন।’ মারেভা বলল। ‘ভাড়া কত দিতে হবে মারেভা?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘মাইলের হিসাবে গাড়ির মিটারে ২০ ডলার ভাড়া উঠেছে স্যার।’ মারেভা বলল। আহমদ মুসা ৫০ ডলারের একটি নোট বের করে মারেভাকে দিয়ে বলল, ‘ওকে পুরোটাই দিয়ে দাও’ ড্রাইভার ভাড়া ও আশাতীত বখশিস পেয়ে হয়ে বলল, ‘স্যার, গাড়ি দরকার হলে যখন আসতে বলবেন আসতে পারি স্যার।’ ‘ধন্যবাদ, আপনার টেলিফোন নাম্বার মারেভাকে দিয়ে যান। আমরা আপনাকে ডেকে নেব। কথন ফ্রি পাওয়া যায় আপনাকে, নাম কি আপনার?’ আহমদ মুসা বলল। ‘স্যার, আমার নাম, তেপাও।’ এরপর ড্রাইভার ‘ধন্যবাদ’ বলে দীর্ঘ একটা বাও করে গাড়িতে উঠল। আহমদ মুসা ‘এস মারেভা’ বলে হাঁটা শুরু করল হোটেলে ঢোকার জন্যে। বুকিং কাউন্টারে গিয়ে আহমদ মুসারা জানতে পারল হোটেলে হাউজ ফুল। একটামাত্র ডবল ডিলাক্স রুম খালি। তাও হোটেলের পেছনের অংশে। এ দিক থেকে লেকের বা সাগরের দৃশ্য উপভোগ করা যায় না। তবে পেছন দিকে হোটেলে আঁকা-বাকা রাস্তাসহ পাহাড়ী ল্যান্ড-স্পেসটা দেখা যায়। ‘এত ভীড় এমন দামী হোটেলেও!’ আহমদ মুসার এমন স্বগতোক্তির জবাবে বুকিং অফিসার বলল, ‘স্যার এটা আমাদের পাপেতির সৌভাগ্য যে, গোটা ফ্রেন্স পলিনেশিয়া দ্বীপপুঞ্জের কেন্দ্র যেমন তাহিতি দ্বীপ, তেমনি এর হার্ট হলো পাপেতি। সুতরাং ফ্রেন্স পলিনেশিয়া দ্বীপপুঞ্জে ব্যবসায়, ভ্রমণ বা যে উদ্দেশ্যেই আসুন তার গেটওয়ে, অবস্থান স্থল ও ডিপারটার দরওয়াজা এই পাপেতি। ভীরটা এ কারণেই স্যার।’ ‘ধন্যবাদ’ দিয়ে আহমদ মুসা পেছন দিকের খালি ডবল ডিলাক্স কক্ষটিই নিয়ে নিল। চাবিটি নিয়ে মারেভা ফ্লোরে রাখা আহমদ মুসার ব্যাগটি তুলে নিল। বলল, ‘আসুন স্যার’। আহমদ মুসা মারেভার হাত থেকে ব্যাগটি নিতে গেলে মারেভা ত্বরিত কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে বলল, ‘ছোটরাও বড়দের ব্যাগ বহন করে স্যার, বড়দের সম্মান ও নিজেদের ধন্য করার জন্যে।’ মারেভা ব্যাগ নিয়ে হাঁটতে লাগল লিফটের দির্কে। বলল, ‘আসুন স্যার।’ হোটেলের দশতলায় রুমটা। চাবি দিয়ে দরজা খুলে রুমে প্রবেশ করল মারেভা। প্রবেশ করল আহমদ মুসাও। মারেভার পেছনে পেছনে। দরজা খোলা রেখেই এল আহমদ মুসা। বিশাল কক্ষ। দরজা দিয়ে ঢুকেই হাতের বামে বড় টয়লেট। ডান পাশে কাপড়-চোপড় রাখার বড় সেলফ। তার পাশে লাগেজ বেঞ্চ। মাঝখানে শর্ট করিডোর। ভেতরে আর একটু এগোলে ডান দিকে দু’টো বেড পাশাপাশি। বেডে ওপারে একটা সোফা সেট, তার সাথে ‘টি-টেবিল।’ সোফা সেটের বিপরীত দিকে ঘরের ওপাশে লম্বা টেবিল দেয়ালের সাথে সেঁটে রাখা। তার সাথে দু’টি চেয়ার। টেবিলটির উপর এক প্রান্তে ফলের একটা বাস্কেট। টেবিলের পাশে একটা মিনি ফ্রিজ। ঘরে প্রবেশ করে মারেভা হাতের ব্যাগটি দেয়ালের সাথের টেবিলটিতে রেখে বলল, ‘স্যার, আমি বাতিগুলো, টয়লেট, এসি’র কন্ট্রোলটা একটু দেখে নেই।’ ঘুরেই মারেভা খোলা দরজা দেখে বলল, ‘স্যরি, দরজা খোলা আছে লাগিয়ে দিয়ে আসি।’ এগোবার জন্যে পা তুলল মারেভা। ‘না দরজা খোলা থাকবে মারেভা।’ বলল আহমদ মুসা। সোফায় বসে জুতা খুলছে আহমদ মুসা। বিস্মিত চোখে তাকাল মারেভা আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘দরজা খোলা থাকবে কেন? এভাবে কেউ খোলা রাখে না। এটা দেখতে অড লাগে এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন তো আছেই।’ ‘এখন দরজা খোলা থাকুক মারেভা! আর ওসব চেক করতে হবে না। আমি সব দেখে নেব। তুমি ঐ চেয়ারটায় বস। কয়েকটি বিষয় একটু জেনে নেই।’ বলল আহমদ মুসা। ঘরের ও প্রান্তে দেয়ালের সাথের টেবিলে যে রাইটিং চেয়ার আছে, সেটাই দেখিয়ে দিল আহমদ মুসা মারেভাকে বলেছে বসার জন্যে। মারেভার চোখ মুখের জিজ্ঞাসু ভাব কাটেনি। সে ধীরে ধীরে গিয়ে চেয়ারে বসল। বলল, ‘বলুন স্যার।’ আহমদ মুসা জুতা খুলে সোফায় হেলান দিয়ে বসেছে। ভাবছিল। আধ খোলা তার চোখ। ঐ অবস্থায় বলল, ‘তাহিতির সবচেয়ে সুন্দর কি মারেভা?’ ‘উপকূলের রাস্তা ধরে সাগর আর পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে ড্রাইভ করা।’ বলল মারেভা। ‘আর কি আছে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসা। ‘উপকূলে লেগুনের ওপারে কোরাল রীফের উপর কটেজগুলোতে জোৎস্না রাতে আদিগন্ত সাগরের দিকে চেয়ে থাকা।’ বলল মারেভা। ‘এরপর কি?’ আহমদ মুসা বলল। ‘ঐ কটেজগুলোতে বসে জোৎস্নাবিহীন রাতে আকাশে তারার রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া এবং অন্ধকার সাগরবক্ষে কান পেতে সাগরের নি:শব্দ ভাষণ শোনা।’ মারেভা বলল। ‘ঐ কটেজগুলোতে বসে জোৎস্নাবিহীন রাতে আকাশে তারার রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া এবং অন্ধকার সাগরবক্ষে কান পেতে সাগরের নি:শব্দ ভাষণ শোনা।’ মারেভা বলল। ‘আর কিছু আছে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘তাহিতির সর্ব্বোচ পাহাড় চড়ায় উঠে প্রশান্ত মহাসাগরকে দেখা।’ বলল মারেভা। সোজা হয়ে বসল আহমদ মুসা। তার মুখে হাসি। তার চোখ দু’টি খবরের কাগজে। বলল, ‘আমি তো তাহিতির আলোচনা বা বর্ণনায় এসবের কথা পড়িনি। কোথায় পেলে এসব?’ ‘এগুলো আমার নিজস্ব চয়েস।’ বলল মারেভা। ‘তুমি কি গল্প-কবিতা লেখ?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা। ‘আমি গল্প-কবিতার ভাল পাঠক স্যার।’ মারেভা বলল। ‘এগুলো পাঠকের কথা নয়, লেখকের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা। থাক, তাহিতির কথা তো শুনলাম। এখন গোটা ফ্রেন্স পলিনেশিয়ার কথা বল।’ বলল আহমদ মুসা। ‘বলুন স্যার, কি জানতে চান।’ মারেভা বলল। ‘ফ্রেন্স পলিনেশিয়ার সবচেয়ে সুন্দর দর্শনীয় বস্তু কি?’ বলল আহমদ মুসা। ‘নি:সন্দেহ স্যার, এর অ্যাটলগুলো। এটা আমার শুধু নয়, সবার চয়েস।’ মারেভা বলল। ‘তুমি কি অ্যাটলে কি লোকজন আছে। তোমরা গেছো, সেটা কি কোন দরকার?’ আহমদ বলল। ‘কোন দরকারে নয় স্যার, আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ে স্রেফ বেড়াতে গেছি।’ বলল মারেভা। ‘আচ্ছা, অ্যাটলগুলো কার মালিকানায়, এখানকার সরকারের?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘না স্যার, অ্যাটলগুলোর মালিক কেন্দ্রীয় ফরাসি সরকার। আমাদের লোকাল সরকার তাদের দেয়া আইনের অধীনে শুধু দেখা-শুনা করে।’ বলল মারেভা। ‘আচ্ছা, অ্যাটল কেউ কিনতে বা লীজ নিতে কিংবা খাজনার ভিত্তিতে পত্তনি নিতে পারে?’ আহমদ মুসা বলল। ‘জানতাম যে ফরাসি সরকার এভাবে অ্যাটল কাউকে দেয় না। শুধু অনুমতি নিয়ে জমি কিনে বা লিজের ভিত্তিতে বাড়ি করে কেউ বসবাস করতে পারে। তবে সম্প্রতি শুনেছি দু’একটা অ্যাটল নাকি ফরাসি সরকার কিছু শর্তাধীনে বিক্রি বা লীজ দিয়েছে।’ বলল মারেভা। মারেভার কথা শেষ হয়েছে। আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল। এ সময় একজন লোক এসে দরজায় দাঁড়াল। তারপর উপর দিকে তাকিয়ে রুম নাম্বার দেখেই বলল, ‘স্যরি।’ চলে গেল লোকটা। আহমদ মুসা ও মারেভা মাইমিতি দু’জনেই তাকিয়েছিল দরজার লোকটির দিকে। লোকটি চলে গেলে মারেভা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে আসি স্যার।’ ‘না, মারেভা। দরজাটা খোলাই থাকবে।’ বলল আহমদ মুসা। বিস্মিত দৃষ্টি নিয়ে বসে পড়ল মারেভা। বলল, ‘দরজা কেন খোলা থাকবে বুঝতে পারছি না স্যার। কারও কি আপনি অপেক্ষা করছেন।’ ‘না, কেউ আসার কথা নেই। আচ্ছা মারেভা, বিকেলে তুমি কয়টায় আসতে পারবে?’ ‘সেটা আপনিই ঠিক করবেন। যখন চাইবেন, তখনই আমি আসব। আপনি কয়দিন থাকছেন স্যার?’ ‘ঠিক আছে, তুমি পাঁচটায় এস। আমি কতদিন থাকব ঠিক নেই। তবে খুব তাড়াতাড়ি যাচ্ছি না।’ কথাটা শেষ করে মুহুর্তকাল থামল আহমদ মুসা। তারপর আবার বলল, ‘তোমাদের ‘ফি’ সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। ট্যুরিষ্ট গাইডে একটা কিছু দেখেছিলাম। সেটা সম্ভবত অনেক আগের।’ মারেভার সুন্দর স্বর্ণালী মুখে একগুচ্ছ রক্তিম লজ্জা ছড়িয়ে পড়ল। মারেভা এখনও পেশাদার গাইড হয়ে উঠতে পারেনি। তবুও ‘ফি’ এর কথা জানাতে হয়, তাই সেও জানায়। কিন্তু তার কাছে আহমদ মুসা এক বিস্ময়কর মানুষ। এমন সভ্য-ভব্য সুন্দর ট্যুরিষ্ট সে এর আগে কখনও দেখেনি। অন্য ট্যুরিষ্টদের চকচকে দৃষ্টি ও ঘনিষ্টতাকে সব সময় এড়িয়ে চলতে হয়। আর এই অদ্ভূত লোকটিই তার চোখের দৃষ্টিকে আমার থেকে আড়াল করে রাখছে। এক দু’বার ছাড়া মারেভার চোখে সে চোখই ফেলেনি। এক দু’বার দেখার মধ্যেই লোকটির চোখে যে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা দেখেছে তা চিরদিন স্বরণ রাখার মত। এমন লোকটিকে ‘ফি’র কথা বলতে তার লজ্জা লাগছে। এসব ভেবে মারেভা বলল ‘ফি’র একটা আউট লাইন তো পেয়েছেনই। আমি কিছু বলতে চাই না, স্যার। আপনি আমাদের অতিথি। আমি আনন্দের সাথে আপনাকে সহযোগিতা করব।’ ‘ধন্যবাদ, মারেভা। তাহলে এই কয়েকটা টাকা তুমি অগ্রীম রাখ।’ বলে আহমদ মারেভার হাতে একটা ইনভেলাপ তুলে দিল। ‘ধন্যবাদ স্যার।’ বলে মারেভা না দেখেই তা পকেটে রেখে দিল। ‘তাহলে আসি স্যার।’ বলে ‘গুডবাই’ জানিয়ে ঘুরে দাঁড়াল মারেভা যাবার জন্য। মারেভা দরজার কাছে পৌছতেই আহমদ মুসা বলল, ‘প্লিজ মারেভা, দরজা বন্ধ করে দিয়ে যাও।’ মারেভা ফিরে তাকিয়ে বলল, ‘দরজা বন্ধ করে দিয়ে যাব!’ মারেভার চোখে নতুন এক বিস্ময়! ‘হ্যাঁ, মারেভা। এরপর একা থাকবো তো। ভয়ের ব্যাপার আছে।’ বলল আহমদ মুসা। তার ঠোঁটে হাসি। মারেভা আহমদ মুসার কথার কোন জবাব দিল না। তার চোখের দৃষ্টি গভীরতর হলো। কিন্তু সে দৃষ্টিটা আহমদ মুসার অবনমিত চোখে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল। আহমদ মুসার কথা বিশ্বাস করেনি মারেভা। কিন্তু সত্যটা কি তাও বুঝতে পারল না সে। বাড়িত ফিরে মুখ-হাত ধুয়ে ফ্রেস হয়ে তার ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়েছে মারেভা। মারেভার মা ঘরে ঢুকল। বলল, ‘মাকে খুব খুশি দেখছি। কাজ পেয়েছিস বুঝি? অনেক ট্যুরিষ্ট এসেছে?’ ‘হ্যাঁ মা, কাজ একটা পেয়েছি। কিন্তু মা ….।’ বলে উঠে ইজি চেয়ারে সোজা হয়ে বসে বলল, ‘কিন্তু লোকটা আজব!’ ‘কেমন?’ জিজ্ঞাসা মায়ের। ‘লোকটা আমার সাথে হ্যান্ডশেক করেনি। আমি হাত বাড়ালে, সে হাত সরিয়ে নিয়েছে। আবার তা ব্যাগ বহন করতে চাইলে বলেছে আমি তোমার চেয়ে বড়, শক্তিও নিশ্চয় বেশি হবে। অতএব, ভারটা আমারই বহন করা উচিত। আর দেখ, ট্যাক্সিতে উঠে সে ড্রাইভারের’ পাশে বসল এবং আমাকে পেছনের সীটে বসতে বাধ্য করল। তারপর মা, হোটেলের রুমে ঢুকের দরজা বন্ধ করতে বলল না। আমি বন্ধ করতে চাইলেও বন্ধ করতেই দেয়নি। কিন্তু আমি যখন চলে আসছিলাম, তখন বললেন ঘরের দরজাটা বন্ধ করে যেও।’ বলল মারেভা। তার মা মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছিল। তার চোখে-মুখে কিছু বিস্ময়, কিছু ভাবনাও। মারেভা থামলে সে বলল, ‘লোকট কি রকম, কেমন বয়সের?’ ‘একদম স্লীম যুবক মা। মনে হয় ব্যায়াম-ট্যায়াম করেন। মনে হলো বেশ কিছু দিন থাকবেন, অ্যাটল অঞ্চলে ঘুরবেন।’ ‘আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেমন লোক সে, কেমন হলো তাকে? বলল মারেভার মা।’ ‘খুবই ভদ্রলোক মা। স্বল্পভাষী, কারও উপর নির্ভশীল হতে চায় না। কেমন বলতে, যদি তুমি চরিত্রের কথা বুঝিয়ে থাক, তাহলে এর উত্তর দেওয়াটা মুস্কিল। চোখের দৃষ্টি থেকেই মানুষের মনের কথা বুঝা যায়। কিন্তু তাঁর চোখে চোখ ফেলা মুস্কিল। উনি চোখ নামিয়ে শান্তভাবে কথা বলেন। মাত্র বার দু’য়েক উনি সরাসরি তাকিয়েছেন আমার দিকে। বহু মানুষ, বহু ট্যুরিষ্টের চোখের দৃষ্টি আমি দেখেছি মা। সে দৃষ্টিতে আমি একটা লেহনভাব দেখেছি, যা চোখকে পীড়া দেয়, মনকেও। কিন্তু যতটুকু দেখেছি তাতে তার দৃষ্টিকে আমার কাছে গভীর শান্ত সাগরের মনে মতো হয়েছে। ঐ দৃষ্টি মানুষকে পীড়া দেয় না, প্রসন্ন করে।’ মারেভা বলল। মারেভার মা একটু হাসল। বলল, ‘বেশি প্রশংসা করে ফেলছিস মা। ঐ টুকু পরিচয়ে অত প্রশংসা চলে না। তবে একথা ঠিক, লোকটি অন্যদের থেকে ভিন্ন। নিজের লাগেজ নিজে বহন করেছে, এটাকে আমি খুব বড় মনে করছি না। মানবতার ব্যাপারে সেনসেটিভ কেউ একজন এটা করতে পারে। কিন্তু হ্যান্ডশেক করল না কেন? অহংকার থেকে কেউ এটা নাও করতে পারে। কিন্তু তোমার কথায় যা বুঝা গেল তাতে তার মধ্যে অহংকার নেই। অহংকার থাকলে লাগেজ বহন করবে কেন? সুতরাং এ বিষয়টি হোটেলের দরজা খোলা রাখার বিষয়টির মতোই দুর্বোধ্য। আমার তুমি চলে আসার সময় দরজা বন্ধ করতে বলল কেন?’ একটু থামল মারেভার মা। ভাবছিল। মূহুর্ত কয়েক পরেই সে বলল, ‘তুমি যতক্ষণ ঘরে ছিলে ততক্ষণ ঘরের দরজা খোলা ছিল। তুমি চলে আসার পর তা বন্ধ হলো। মজার ব্যাপার। এর অর্থ কি?’ ‘সেটাই তো প্রশ্ন, মা, এর অর্থ কি?’ বলল মারেভা। মারেভার মা উঠছিল। ‘না মা, একটু বস। আমার আজকের ইনকাম দেখে যাও। কিছু টাকা তিনি অগ্রীম দিয়েছেন। দেয়ার পর আমি পকেটেই রেখে দিয়েছি। আমিও দেখিনি।’ বলে মারেভা উঠে গিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে খামটা নিয়ে এল। বসল মায়ের পাশে। খামটি খুলতেই চমকে উঠল। দেখল অনেকগুলো মার্কিন একশ ডলারের নোট। গুনে দেখল দুই হাজার ডলার। তার মানে চার হাজার তাহিতিয়ান ফ্রাংক। বলা যায়, এট ট্যুরিষ্ট সিজনের তা দুই মাসের আয়। অবাক বিস্ময় নিয়ে মারেভা টাকাগুলো মা’র হাতে দিয়ে বলল, ‘মা দেখ, লোকটার আরেক পাগলামি।’ টাকাগুলো দেখে মারেভার মা বলল, ‘পাগলামি নয়, গাইডদের পারিশ্রমিক সম্পর্কে হয়তো তার কোন ধারনা নেই।’ না মা, গাইডের পারিশ্রমিক সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল। আমি বলিনি, কিন্তু তাহিতিয়ানের অতীতের পারিশ্রমিক সম্পর্কে তিনি জানেন বলেছিলেন।’ মারেভা বলল। ‘যাক, এর ব্যাখ্যা উনিই দিতে পারেন। এটা খুব বড় বিষয় নয়। হয়তো তিনি টাকাটা একবারেই দিতে পারেন। অথবা হতে পারে, তিনি অনেক দিন থাকবেন তাহিতিতে।’ বলল মারেভার মা। ‘হ্যাঁ মা, উনি বেশ কিছুদিন থাকবেন বলেছেন।।’ মারেভা বলল। ‘এটাই আসল ঘটনা মারেভা।’ হেসে বলল মারেভা মা। বলে মারেভার মা টাকাগুলো মারেভার হাতে গুঁজে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। মারেভা আর একবার গা এলিয়ে দিল ইজি চেয়ারে। ৫ আহমদ মুসা তাহিতির স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সিতে উঠে বসল। তারা গাড়িতে আগের মতই বসেছে। আহমদ মুসা বসেছে ড্রাইভারের পাশে। আর মারেভা বসেছে পেছনের সীটে। ড্রাইভার আহমদ মুসাকে গাড়িতে বসিয়ে দরজা বন্ধ করে গাড়ির সামনে দিয়ে ঘুরে তার সীটে ফিরছিল। উৎসুক মারেভা আহমদ মুসাকে প্রশ্ন করল, ‘স্যার, একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি?’ ‘অবশ্যই।’ বলল আহমদ মুসা। ‘স্যার, দেখলাম পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের ডিজি’র মত ফরাসি অফিসার আপনাকে গাড়ি, পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গেল। স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়েও তাই দেখলাম। আপনি কি এদের পূর্ব পরিচিত?’ মারেভা বলল। তার চোখে বিস্ময়। আহমদ মুসা যে ফ্রান্সেরও নাগরিক, সে রিয়াদ থেকে আসার সময় সেখানকার ফরাসি রাষ্ট্রদূতের চিঠি নিয়ে এসেছিল, ফরাসি রাষ্ট্রদূত যে তাকে ফরাসি রাজপরিবারের জামাই বলেও পরিচয় দিয়েছিল, এসব কথা চেপে দিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘হ্যাঁ মারেভা, এদের সাথে আমার পরিচয় আছে।’ কথাটা শেষ করেই আহমদ মুসা আবার বলে উঠল, ‘মারেভা, দক্ষিন উপকূল ও উত্তর উপকূলের কিছুটা তো আমরা কয়েক দিনে দেখলাম। আজ যখন শহরে ঢুকেছি, তখন চল জিওগ্রাফিক্যাল যাদুঘরটা দেখব। তেপাও আপনি নিশ্চয় যাদুঘরটা চেনেন?’ ‘জি স্যার। অনেক ইন্টারেষ্টিং স্যার। জিওগ্র্যাফিক্যাল যাদুঘরে গেল ফ্রেন্স পলেনিশিয়া দেখার কাজ অনেকটা হয়ে যায়।’ মারেভা বলল। ‘তুমি অনেকবার গেছ নিশ্চয়?’ মারেভাকে জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা। ‘স্যার, আমার পাঠ্য বিষয় মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর একটা পেপার আছে পলিনেশিয়ান আইল্যান্ডের ‘বেজ ও ওয়াল ফিজিক্যাল ফিচার’- এর উপর। এ জন্য এ যাদুঘরে আমাকে আসতে হয়।’ মারেভা মাইমিতি বলল। আহমদ মুসার মুখটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ভাবল, তাহলে তো এ যাদুঘরে অ্যাটলগুলো সম্পর্কে জানার অনেক কিছুই থাকতে পারে এবং মারেভা তাকে এ ব্যাপারে অনেক সাহায্যও করতে পারবে। মনে মনে হাসল। গাইড দেখি তার সহকারী হবারও যোগ্যতা রাখে। বলল আহমদ মুস, ‘পলিনেশিয়ান দ্বীপগুলো কি তথ্য এখানে আছে মারেভা।’ ‘দ্বীপ ও অ্যাটল দ্বীপের প্রত্যেকটির একটা মিনি প্রতিকৃতি এখানে আছে। এ প্রতিকৃতি শুধু দ্বীপের উপরের অংশের নয়, দ্বীপের আন্ডার ওয়াটার ‘ওয়াল’ ও ‘বেজ’- এর প্রতিকৃতি কেমন তাও দেখানো আছে। দ্বীপগুলোর পাহাড় কোরাল রীফ, উপকূল, বনাঞ্চল ও লোকবসতি সম্পর্কে তথ্য আছে। অ্যাটল দ্বীপগুলোর জীব-বৈচিত্র, ইত্যাদি সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য সেখানে পাওয়া যায়।’ বলল মারেভা। আনন্দে আহমদ মুসার চোখ-দু’টি চক চক করে উঠল। এ যে মেখ না চাইতেই পানি। যা সে জানতে চায় এ এলাক সম্পর্কে তার সিংহভাগ সে পেয়ে যাবে এই যাদুঘরে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অশেষ শুকরিয়া আদায় করল আহমদ মুসা। ‘দ্বীপ ও অ্যাটলগুলোর মালিকানা কিংবা বড় বড় প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা স্থাপনা সম্পর্কে কেমন তথ্য আছে যাদুঘরে?’ জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা। মারেভা মুখ তুলে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। ঠোঁটে এক টুকরো হাসিও ফুটে উঠল। বলল, ‘স্যার, কোথায় কোন দ্বীপ বা কোন সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির কথা জিজ্ঞাসা করছেন, কিনবেন নাকি স্যার?’ ‘কেনা যায় নাকি?’ বলল আহমদ মুসা। ‘খুব কঠিন। কেনার জন্যে ফরাসি নাগরিক হতে হয় কিংবা ফরাসি সরকারের উপর প্রভাব থাকতে হয়। তবে বিদেশী নাগরিকরা দ্বীপ লীজ নিতে পারে, কিনতেও পারে তবে বিক্রি করতে পারে না। অবশ্য বিশেষ দ্বীপ ও বিশেষ এলাকার দ্বীপ, অ্যাটল লীজ নেয়া যায় না, কেনাও যায় না।’ বলে একটু থেমেই আবার শুরু করল, ‘যাদুঘরে কিছু তথ্য ভিজিবল, এমনিতেই পাওয়া, দেখা যায়। কিছু তথ্য অন রিকোয়েষ্ট পাওয়া যায়। কিছু তথ্য ক্ল্যাসিফায়েড। সেগুলো সিক্রেট সেকশনে সংরক্ষিত। ওগুলো পাওয়া যায় না। চলুন গেলেই সব দেখা যাবে।’ পাপেতির জিওগ্রাফিক্যাল যাদুঘর মধ্য পাপেতির বিশাল এলাকা জুড়ে। এ যেন এক মিনি ফ্যেঞ্চ পলিনেশিয়া। অ্যাটলগুলোর প্রতিকৃতি আগাগোড়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল আহমদ মুসা। কিছু কিছু নোটও নিল। পাঁচ ঘন্টা পরে যাদুঘর থেকে বেরিয়ে এল আহমদ মুসা ও মারেভ। ‘মারেভা, তেপাওকে ডাক। চল, আমরা একটা রেষ্টুরেন্টে বসি। তৃষ্ণাও লেগেছে, একটু বিশ্রামও হবে। ‘যাদুঘরের পাশের একটা ভালো রেষ্টুরেন্ট প্যাসেফিক ইন্টারন্যাল- এ গিয়ে বসল। বসেই আহমদ মুসা মারেভাকে বলল, ‘বেলা দু’টা বাজে। খেয়ে নেয়াই দরকার। একটু ভাল খাবার অর্ডার দাও। আমি ‘টয়লেট থেকে আসছি।’ বলে আহমদ মুসা চলল টয়লেটের দিকে। আহমদ মুসা টয়লেট সেরে অজু করে বেরিয়ে এসে একটা নিরিবিলি স্পেস খুঁজে নিয়ে যোহরের নামাজ সেরে নিল। টেবিলে ফিরে এসে দেখল, খাবার এসে গেছে। টেবিলের মাঝখানে রোলিং ডিস টেবিল। তাতে খাবার সাজানো। ঘুরছে রোলিং ডিস-টেবিলটা। ‘স্যার, আপনি ভাল খাবারের অর্ডার দিতে বলেছেন। তাহিতিতে এসে পর্যটকরা সবচেয়ে যা পছন্দ করে, তাই আমি আনিয়েছি। দেখুন পয়সন ক্রু আছে, সেভ্রেটিস আছে এবং ফ্রায়েড চিকেন ও রাইচ এবং গ্রিলড্ পর্ক। খাবার শেষে আছে, ‘পো’, যা টুরিষ্টদের সবচেয়ে পছন্দনীয়।’ বলল মারেভা। ‘থ্যাংকস’ বলে আহমদ মুসা বসল চেয়ারে। বলল হাসি মুখে, ‘যেমন ক্ষুধা তেমনি সুন্দর হয়েছে খাবার। নাও শুরু করা যাক।’ খেতে শুরু করল সবাই। আহমদ মুসা খেল খুব আস্তে আস্তে। শুধু খেল ফ্রায়েড রাইচ, ফ্রেশ ওয়াটারের শ্রিম দিয়ে তৈরি সেভ্রেটিস, সালাদ। সব শেষে মজা করে খেল নারকেলের দুধে পেপে, ভ্যানিলা, কলাসহযোগে তৈরি মিষ্টি পুডিং। আহমদ মুসার এভাবে অধিকাংশ খাবার এড়িয়ে যাওয়া লক্ষ্য করছিল মারেভা। এক সময় সে বলে, ‘স্যার আপনি তো কিছুই খাচ্ছেন না।’ ‘না মারেভা, আমি খাচ্ছি।’ বলে না খাওয়া আইটেমগুলো রোলিং ডিশ টেবিল টেনে তার দিকে নেয়। টেনে নেয় বটে, কিন্তু ওসব ডিস থেকে কিছুই নেয় না। এটাও লক্ষ্য করেছিল মারেভা, কিন্তু সে আর কিছু বলেনি। রেষ্টুরেন্টের বিল চুকিয়ে রেষ্টুরেন্ট থেকে বেরুল আহমদ মুসা তাদেরকে নিয়ে। বের হবার সময় এক ফাঁকে সুযোগ পেয়ে ড্রাইভার তেপাও মারেভাকে বলল, ‘স্যারকে যতই দেখছি বিস্মিত হচ্ছি! নরমে-গরমে, কঠোর-উদারতায় এমন মানুষ আমি জীবনে দেখেনি। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে একদম অংকের মত টুদিপয়েন্ট চায়, আচরণের ক্ষেত্রে একদম মাটির মানুষ। এই প্রথম একজন ট্যুরিষ্ট একজন ড্রাইভারকে টেবিলে নিজের পাশে বসিয়ে খাওয়ালেন।’ মারেভা ড্রাইভারের কথার জবাবে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই আহমদ মুসা ফিরে এসে বলল, ‘মারেভা, যাদুঘরের রিসেপশনে কিছু ফোল্ডার ও বুকলেট দেখলাম। মনে করেছিলাম, ফেরার পথে কিনে নিব। কিন্তু বের হলাম তো অন্যপথে। চল রিসেপশনে যাব।’ মারেভা আগেই থেমে গিয়েছিল। আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই ‘ইয়েস স্যার, চলুন!’ বলে মারেভা ড্রাইভার তেপাওকে বলল, ‘আপনি গাড়িতে যান, গাড়ি নিশ্চয় গরম হয়ে গেছে, একটু ঠান্ডা করে নিন।’ আহমদ মুসা ও মারেভা চলল যাদুঘরের রিসেপশনের দিকে। ‘স্যার, একটা কথা বলব।’ বলল মারেভা। ‘বল।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আমার খারাপ লাগছে, আমি অযথাই আপনার অনেক টাকা খরচ করেছি। আপনি কি গোশত খান না স্যার?’ বলল মারেভা। ‘কিন্তু চিকেনও তো খেলেন না। এমন কি ‘পইসন ক্রু’ ও খাননি, যা মাছ দিয়ে তৈরি।’ বলল মারেভা। হাসল আহমদ মুসা। বলল ‘পইসনে মাছের সাথে সাপও আছে। ওটা আমি খাই না।’ ‘কিন্তু চিকেন?’ জিজ্ঞাসা মারেভার। হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘স্রষ্টা অর্থ্যাৎ ঈশ্বরের নাম নিয়ে জবাই করা না হলে সে জিনিস আমরা খাই না।’ ‘আজব কথা! এমন কথা তো কোনদিন শুনিনি।’ বলল মারেভা। গম্ভীর হলো আহমদ মুসা। একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘মারেভা বিষয়টা আমি তোমাকে বলতে চাইনি। আমি দেখছি, তোমার অবাক হওয়ার মতো ঘটনা আরও ঘটতে পারে। তাই আমার একটা পরিচয় তোমার জানা দরকার। মারেভা, আমি মুসলিম, ইসলাম ধর্মের অনুসারী।’ মারেভা একটু থমকে দাঁড়াল। তাকাল আহমদ মুসার দিকে। একটু উৎসুক দৃষ্টি তার চোখে। বলল, ‘হ্যাঁ, মুসলমান! টেলিভিশন, পত্রিকায় মুসলমান সর্ম্পকে অনেক কিছু শুনি। তবে কোন মুসলমান আমি দেখিনি। তাহিতিতে দু’চারজন মুসলমান আছে বলে শুনেছিলাম কার কাছে যেন। তাদের সাথে কখনও দেখা হয়নি। তবে একবার আরুতে গিয়ে আমাদের গ্রেট গ্রান্ড ফাদারদের এক কথাবার্তায় মুসলমানদের কথা শুনেছিলাম। তখন অনেক ছোট আমি। আচ্ছা, মুসলমানরা কি শুকর, সাপ ইত্যাদির মত অনেক কিছুই খায় না? স্রষ্টার নাম নিয়ে জবাই করা না করার মধ্যে কি পার্থক্য যে, এ জন্যে তা খাবারই আযোগ্য হয়ে যায়?’ ‘সে অনেক কথা মারেভা, পরে একদিন বলব।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ঠিক আছে। কিন্তু স্যার, টিভিতে আমি মাথা, মুখে, শরীরে কালো কাপড় জড়ানো মেয়েদের ছবি দেখেছি, এরা নাকি মুসলিম? এটা কি সত্যি স্যার?’ বলল মারেভা। ‘তুমি যেটা দেখেছ, সেটা প্রপাগান্ডা। তবে সত্যটা বুঝতে তোমার একটু সময় লাগবে। এক কথায় বললেই বুঝবে না।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আপনি অন্যদের থেকে অনেক আলাদা। মুসলমান বলেই কি?’ ‘এক ধর্ম থেকে আরেক ধর্ম, এক সংস্কৃতি থেকে আরেক সংস্কৃতির অনুসারিদের মধ্যে পার্থক্য থাকবেই।’ বলল আহমদ মুসা। তারা রিসেপশনে পৌঁছে গিয়েছিল। পাশের পাবলিক রিলেশনস কাউন্টার থেকে ফ্রেন্স পলিনেশীয় দ্বীপপুঞ্জ বিশেষ করে অ্যাটল দ্বীপ সম্পর্কিত সব ফোল্ডার ও বুকলেট কিনে রিসেপশন থেকে বেরিয়ে এল আহমদ মুসারা। গাড়িটা চলে এসেছিল জাদুঘরের গাড়ি বারান্দায়। রিসেপশন থেকে বেরিয়েই গাড়ি পেয়ে গেল তারা। গাড়িতে উঠে পেয়ে গেল তারা। গাড়িতে উঠে বসল আহমদ মুসা ও মারেভা। আহমদ মুসা হাতঘড়ির দিকে তাকাল। বেলা তিনটা বাজে। ‘মি. তেপাও, আমি হোটেল ফিরব। তার আগে মারেভাকে তুমি বাড়িতে নামিয়ে দাও। তারপর আমাকে হোটেলে নেবে।’ বলল আহমদ ড্রাইভারকে। ‘স্যার, গাড়ি সরাসরি হোটেলে নিন। আমি সেখান থেকে বাসায় ফিরব।’ মারেভা বলল। ‘মারেভা, এটা বাড়তি কোন সুবিধা নয়। হোটেলের পথেই তোমার বাসা। শুধু ভিন্ন একটা পথে যেতে হবে মাত্র।’ কিছুটা শক্ত কন্ঠে বলল আহমদ মুসা। ‘স্যরি স্যার।’ বলল মারেভা। ‘ম্যাডাম মারেভা, আপনার যাদুঘরে ঢোকার পরপরই একজন, সম্ভবত আপনার কোন বান্ধবী, আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল আপনি হোটেলে ফিরবেন, না বাসায় ফিরবেন। আমি বলতে পারিনি। একটু অপেক্ষা করে তিনি চলে গেছেন।’ ড্রাইভার তেপাও বলল মারেভাকে উদ্দেশ্য করে। ‘আমার বান্ধবী! তার সাথে ট্যুরিষ্ট ছিল মানে কোন ট্যুরিষ্ট নিয়ে এসেছিলেন তিনি?’ জিজ্ঞাসা মারেভা।’ ‘উনি একটা মাইক্রো থেকে নেমেছিলেন। ভেতরে কে ছিলেন আমি দেখিনি। তারা কেউ নামেনি।’ বলল ড্রাইভার। মনে মনে কিছুটা বিস্মিত হলো মারেভা। আমার কোন বান্ধবী এখানে মাইক্রো নিয়ে তো আসার কথা নয়। ট্যুরিষ্ট নিয়ে এলে তো ট্যুরিষ্টরাই আগে নামতো। ট্যুরিষ্টদের ভেতরে রেখে তার আমার জন্যে অপেক্ষার তো কোন প্রশ্নই উঠে না! হিসাব মেলাতে পারলো না। বলল, ‘চিনলাম না। যাক, কেউ একজন হবে হয়তো।’ সবাই চুপচাপ। গাড়ি চলছে। কর্মহীন ভাবে একটু বসার সুযোগ পেতেই আহামদ মুসা মাথা এসে দখল করল যাদুঘরে দেখা অ্যাটলগুলো। বিশেষ করে অ্যাটলগুলোই আহামদ মুসা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে চেষ্ঠা করেছে। সব দেখে হতাশ হয়েছে আহমদ মুসা। কোন অ্যাটলই বড় ধরনের কোন ঘাঁটি ধারণ করার উপযুক্ত নয়। গোটা পলিনেশিয়া দ্বীপপুঞ্জে তাহিতির পুবে তোয়ামতোই আসলে অ্যাটল দ্বীপপুঞ্জ। উল্লেখযোগ্য সব অ্যাটল এখানেই রয়েছে। প্রায় ৭৬ টি অ্যাটল এখানে রয়েছে। অন্যগুলো নিরেট অ্যাটল দ্বীপ। এই অ্যাটলগুলোর মধ্যে ডজন দেড়েক অ্যাটল রয়েছে যার ভূমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। এগুলোতে কম-বেশি জনবসতি রয়েছে। কিন্তু এগুলোর ভূমি-অবস্থান অ্যাটলের মধ্যেকার লেগুন (পানি)-এর চারদিকে ঘিরে, যা এমন কোন বড় বা প্রশস্ত নয় যেখানে লোকচক্ষুর আড়ালে কোন বড় ধরনের ঘাঁটি বা স্থাপনা নির্মাণ করা যায়। তাছাড়া অন্য অ্যাটলগুলো ঘর-বাড়ি করে বসবাসের মত নয়। তাহলে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট বিশাল ঘাঁটি গড়ার মত অ্যাটল এখানে কোথায় পাবে, যাকে বা যে অ্যাটলকে ক্ষমতার কেন্দ্র বলে অভিহিত করতে পারে? অ্যাটলগুলোর যে চেহারা দেখেছে তাতে সে ধরনের কোন অ্যাটল তার চোখে পড়েনি। এসব চিন্তা আহমদ মনের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিল। তাহলে কার্যকরণ মতে সামনের রেখে আসা তাহিতির আশে-পাশের অ্যাটলেই ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের ঘাঁটি আছে বলে সে মনে করেছে, সেটা কি মিথ্যা হবে? আহমদ মুসার মন বলছে সে ঠিক পথেই চলছে। যে অনিশ্চয়তা দেখছে সে মাঠের বাস্তবাতায়, তার চিহ্ন কিন্তু তার মনে নেই। হঠাৎ গাড়ি হার্ড ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল। চমকে উঠে আহমদ মুসা তাকাল চারদিকে। দেখল, বাম দিকে একটা পার্ক ও ডানদিকে বাগান-শোভিত একটা সংরক্ষিত টিলা। ‘দাঁড়ালেন কেন মি. তেপাও? এটা কোন জায়গা?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘স্যার, আমি আ্যভেনিউ হিন্দি থেকে আ্যভেনিউ পোমা যাওয়ার জন্যে এই ডাইভারসন রোডে ঢুকেছি। সামনে পথের উপর হঠাৎ একটা মাইক্রো এসে দাঁড়িয়েছে স্যার।’ বলল তেপাও। গাড়িটা আহমদ মুসার চোখে পড়েছিল আগেই। ভেবেছিল, এক বোকা ড্রাইভার গাড়িটা ঘুরিয়ে নিচ্ছে। না, তা নয়। রাস্তা ব্লক করে গাড়িটা স্থির দাঁড়িয়ে আছে। মাইক্রোর জানালায় কাঁচ শেড দেয়া। ভেতরের কিছুই কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মাইক্রোটা আহমদ মুসাদের গাগড়ি থেকে সাত আট গজ দুরে। ‘মি. তেপাও মাইকোর সামনের দিক দিয়ে পাশ কাটিয়ে যাবার চেষ্টা কর। দেখা যাক, ওদের মতলব কিছু আছে কিনা।’ আহমদ মুসা বলল ড্রাইভারকে। ‘কি ঘটেছে? মাইক্রোটা আমাদের পথ আগলেছে কেন?’ বলল মারেভা। তার কন্ঠে উদ্বেগ। ‘বুঝা যাচ্ছে না, দেখা যাক।’ বলল আহমদ মুসা। ড্রাইভার তেপাও দ্রুত গাড়ির মাথা ঘুরিয়ে নিতে চলতে শুরু করল মাইক্রোকে পাশ কাটাবার জন্যে। আহমদ মুসাদের গাড়ি মাইক্রোটির বরাবর আসতেই মাইক্রোর দু’দিক থেকে জনাছয়েক লোক নেমে ছুটে এল আহমদ মুসাদের গাড়ির দিকে। লোকগুলোকে দেখেই আহমদ মুসা বুঝল, গুন্ডা-বদমাস শ্রেণীর লোক হবে এরা। সবাই শ্বেতাংগ। আহমদ মুসার চোখ মাইক্রোর ফ্রন্ট সীটের দিকেও গিয়েছিল। দেখল, ড্রাইভিং সীটের পাশে একজন শ্বেতাংগ যুবতী বসে আছে। তার স্থির চোখ মনে হোল মারেভার দিকে। ওরা ছয়জন এসে আহমদ মুসাদের গাড়ি ঘিরে ফেলল। দু’জন গিয়ে মারেভার পাশের দরজায় লাথি দিয়ে বলল, ‘খোল দরজা। না হলে দরজা ভেঙে ফেলব।’ উদ্বেগ-আতংকে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল মারেভার মুখ। কাঁপছিল সে। তাকাল সে আহমদ মুসার দিকে। ‘দরজা খুলে দাও মারেভা।’ শান্ত কন্ঠে বলল আহমদ মুসা। আহমদ মু্সাও বেরিয়ে এল গাড়ি থেকে। মারেভা চিৎকার করে বলল, ‘তোমরা কে? কি তাও তোমরা? আমি কি করেছি? ছাড় আমাকে।’ ‘চল, তোকে প্রেম করতে করা শেখাব। তামাহি মাহিনের চেয়ে আমরা অনেক ভাল প্রেম করতে জানি।’ বলল ওদের একজন। এদের কথা শুনে এবং মাইক্রোর সামনের সীটে বসা সান্ডা সুসানকে দেখে মূহুর্তেই সব বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল মারেভার কাছে। তাহলে সান্ডা যে থ্রেট দিয়েছেল, সেটারই বাস্তবায়ন করতে এসেছে সে। এরা কি তাহলে তাকে কিডন্যাপ করতে এসেছে! ইতিমধ্যে দু’জন মারেভাকে টেনে বের আনল গাড়ি থেকে এবং কয়েকজন তাকে শূন্যে তুলে ধরে মাইক্রোর দিকে যাবার উদ্যোগ নিল। ‘ছেড়ে দাও, বাঁচাও!’ বলে চিৎকার করছে মারেভা। আহমদ মুসা আস্তে আস্তে এসে তাদের সামনে দাঁড়াল। বলল, ‘ছোকরার দল, ছেড়ে দাও ওকে।’ শান্ত কিন্তু শক্ত কন্ঠস্বর আহমদ মুসার। ওরা সবাই ফিরে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। এমন শান্ত, শক্ত কন্ঠস্বরের সাথে তারা বোধ হয় পরিচিত নয়। ফিরে তাকিয়ে আহমদ মুসাকে একটু দেখে নিয়ে ওদের একজন বলল, ‘সরে যা নেটিভ ডগ, ছাতু করে দেব তা না হ…।’ কথা তাকে শেষ করতে দিল না আহমদ মুসা। এক ধাপ এগিয়ে এসে লোকটির বাম চোঁয়ালে ডান হাতের একটা ব্লু চালাল। কথা শেষ না করেই লোকটি সটান পড়ে গেল মাটিতে। পড়ে গিয়ে একটুও নড়ল না। জ্ঞান হারিয়েছে সে। তিনজন দাঁড়িয়ে ছিল মারেভাকে শূন্যে তুলে নিয়ে। আর দু’জন দাঁড়িয়েছিল তাদের সামনে। এরা দু’জন সংজ্ঞা হারানো সাথীর দিকে একবার তাকিয়ে চোখ ফেরাল আহমদ মুসার দিকে। চোখ জ্বলছে ওদের বাঘের মত। বাঘের মতই ওরা এক সাথে ঝাঁপিয়ে পড়ল আহমদ মুসার উপর। আহমদ মুসা বিদ্যুৎ গতিতে পিছিয়ে এল আর সাথে সাথে ওদের দু’জনের মাথা এসে আছড়ে পড়ল আহমদ মুসার পায়ের কাছে। পড়েই ওরা উঠে দাঁড়াচ্ছিল। আহমদ মুসা ডান পাশের লোকটির ডান কানের নিচে ডান পায়ের একটা লাথি ছুড়ে মারল। জুতার পয়েন্টেড মাথাটা সুতীব্র একটা ঘা মারল লোকটার কানের নিচের নরম জায়গায়। সংগে সংগেই লোকটার দেহ মাটির উপর খসে পড়ল। মাথায় এই ঘা খাওয়ার পর তার সংজ্ঞা থাকার কথা নয়। বাম পাশের লোকটি তার দু’পায়ের উপর দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, কিন্তু কোমরটা তখনও সোজা করতে পারেনি। তার দেহের উপরের অংশ কোমরের উপর তখনও সমকৌণিক অবস্থানে। আহমদ মুসা বাম হাতে লোকটার মাথার চুল খামচে ধরে ডান হাতের মোক্ষম কারাত চালাল তার ঘাড়ে। ঘাড়ের নাজুক জায়গাটায় হাতুড়ির মত আঘাতে যে কোন মানুষকে কয়েক ঘন্টা ঘুমিয়ে রাখার জন্যে যতেষ্ট। এ লোকটির দেহটাও মাটিতে আছড়ে পড়ল। আহমদ মুসা ডান হাতের কারাতের কাজ শেষ করেই তাকিয়েছিল মারেভা চ্যাংদোলা দেহ নিয়ে দাঁড়ানো তিন জনের দিকে। দেখল ওরা মারেভাকে ছেড়ে দিয়েছে। একজন তার পকেট থেকে রিভলবার বের করেছে। চোখের পলকে আহমদ মুসার দুই হাত শূন্যে উঠেই ছুটল মাটির দিকে। আর পা দু’টি শূন্যে উঠে তীব্র গতিতে বৃত্তাকারে ঘুরে গিয়ে আঘাত করল রিভলবারধারীর হাত ও বুকে। রিভলবারধারীর হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল রিভলবার এবং সেও পড়ে গেল চিৎ হয়ে। আহমদ মুসার পা যখন লোকটিকে আঘাত করে মাটি স্পর্শ করল, তখন চক্রাকারে ঘুরে সোজা হয়েছে এবং দক্ষ এ্যাক্রব্যাটের মত আহমদ মুসা পায়ের উপর দাঁড়িয়ে গেছে। রিভলবার কুড়িয়ে নিয়েই আহমদ মুসা পেছনে ওদের তিনজনের দিকে রিভলবার তাক করে ওদেরকে বলল, ‘কোন চালাকি না করে তোমরা ওপুর হয়ে শুয়ে……।’ আহমদ মুসা কথা শেষ করার আগেই তিন জনের দু’জন আহমদ মুসার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আহমদ মুসার রিভলবার তাক করা ছিল। কিন্তু গুলি না করে ধাক্কা মেরে মারেভাকে এক দিকে সরিয়ে দিয়ে সেও দ্রুত এক পাশে সরে গেল। আহমদ মুসার উপর চড়াও হতে ব্যর্থ হয়ে দু’জন গর্জে উঠে আবার ঘুরে দাঁড়াল। তাদের সাথের তৃতীয় জনও এবার উঠে দাঁড়িয়ে তাদের সাথে যোগ দিল। আহমদ মুসা বুঝল ওরা বেপরোয়া। ওদের চোখে মুখে ভয়ের চিহ্ন নেই। তবু আহমদ মুসা গর্জে উঠল, ‘দেখ, তোমরা আত্মসসর্পণ কর, না হয় পালিয়ে যাও। অন্যথা করলে তিনজনই ….!’ এবারও আহমদ মুসাকে কথা শেষ করতে দিল না। আহমদ মুসার রিভলবার পর পর তিনবার গুলিবর্ষণ করল। তিন জনই ওরা পায়ে গুলি খেল। অদ্ভুদ ব্যাপার, তিনজনই ওরা গুলি খেয়ে বসে পড়ল বটে, কিন্তু দেখা গেল তিনজনই ওরা আহত হওয়ার দিকে ভ্রক্ষেপ না করে পকেট থেকে বের করে আনল ডিম্বাকৃতির হাত বোমা। চোখে-মুখে ওদের চরম বেপরোয়া ভাব। তিনজনের হাতই এক সাথে উপরে উঠল হাত বোমা ছোঁড়ার জন্যে। নিরুপায় আহমদ মুসা। গুলি করা ছাড়া আত্নরক্ষার আর কোন উপায় নেই। কিন্তু রিভলবারে গুলি আর কয়টা আছে কে জানে! ওদের হাত উপরে ওঠার সংগে সংগেই আহমদ মুসার রিভলবার পরপর তিনবার গুলিবর্ষণ করল। তিন জনেই কব্জি গুলিবিদ্ধ হলো। তাদের হাত থেকে খসে পড়ল বোমা। স্বস্তির নি:শ্বাস নিয়ে আহমদ মুসা তাকাল মাইক্রোর দিকে। মাইক্রোর সেই মহিলাকে। আরও কয়েকজন পুলিশ এগিয়ে আসছে এদিকে। তাদের সাথে ভয়ে-উদ্বেগে বিপর্যস্ত একজন তরুণ। তরুণকে দেখেই মারেভা চিৎকার করে উঠেছে, ‘মাহিন!’ মারেভা কন্ঠ কান্নাজড়িত। তরুণটি কাছাকাঠি আসতেই মারেভা ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল তাকে। বলল, ‘ঈশ্বর বাঁচিয়েছেন, স্যার যেন ঈশ্বরের হাত। কিভাবে কি ঘটে গেল।’ কেঁদে উঠল মারেভা। পুলিশরা ছয়জনকে যখন হাতকড়া পরাছিল, তখন পুলিশের কর্তা ব্যাক্তিটি আহমদ মুসার সামনে এসে বলল, ‘ধন্যবাদ আপনাকে। একাই ছয়জনকে সামলেছেন। আমার কাছেও অবিশ্বাস্য লাগছে। সবচেয়ে অবাক হয়েছি, আপনি হত্যা এড়িয়েছেন জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্বেও। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। কিন্তু আপনাকে এখানে নতুন মনে হচ্ছে। আগে আপনাকে দেখিনি।’ আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই কথা বলে উঠল মারেভা। পুলিশকে আহমদ মুসার দিকে আসতে দেখেই মারেভা তামাহি মাহিনকে নিয়ে আহমদ মুসার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বলল, ‘স্যার, ইনি একজন টুরিষ্ট।’ আমি তার গাইডের কাজ করছি। ক’দিন আগে তিনি এসেছেন।’ ‘ওয়েলকাম আপনাকে। কিন্তু ট্যুরিষ্টরা সাধারনত ভীতু হয়। তারা স্থানীয় কোন ব্যাপারে নিজেদের জড়ায় না। আপনি কিন্তু ব্যাতিক্রম।’ বলল পুলিশ অফিসারটি। ‘মানুষের সামনে বিশেষ কিছু বিষয় যখন আসে, তখন তার কাছে নিজদেশ আর পরদেশ বলে কিছু থাকে না। সবাই এটা করে। আমিও তাই করেছি।’ আহমদ মুসা বলল। ‘সবাই করে না। ব্যতিক্রম হিসেবে কেউ কেউ করেন, যেমন আপনি।’ বলল পুলিশ অফিসার। ‘কিন্তু সবাইকেই করা উচিত। না করাটাই ব্যতিক্রম।’ আহমদ মুসা বলল। হাসল পুলিশ অফিসারটি। বলল, ‘নীতিগত ভাবে আপনার কথাই ঠিক।’ কথাটা শেষ করেই পুলিশ অফিসার তাকাল তার পুলিশদের দিকে। বলল, ‘তোমাদের কাজ শেষ? রেডি তোমরা।’ ‘ইয়েস স্যার!’ একজন পুলিশ একটু এগিয়ে এসে স্যালুট করে বলল। পুলিশ তাদের সাথের তরুনটির দিকে চেয়ে বলল, ‘মাহিন তুমি ও মারেভা তোমাদের দু’জনকেই পুলিশ ষ্টেশনে যেতে হবে। মারেভার ষ্টেটমেন্ট নিতে হবে।’ বলেই পুলিশ অফিসার তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘আপনি কোথায় উঠেছেন মারেভা জানে। আমরা ওর কাছ থেকে জেনে নিয়ে আপনার কাছে আমারদের একটু যেতে হবে। আপনার লিখিত সাক্ষ আমাদের দরকার হবে।’ ‘ওয়েলকাম! আবার দেখা হবে।’ বলল আহমদ মুসা। পুলিশ অফিসার ‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসার সাথে হ্যান্ডশেক করে গাড়ির দিকে চলতে শুরু করল। পুলিশ অফিসারকে লক্ষ করে মারেভা বলল, ‘আমরা আসছি।’ বলে মারেভা দাঁড়াল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘স্যার, মাহিনের সাথে আপনার পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়নি। ও তামাহি মাহিন! আমার মত সেও ছাত্র।’ হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আরও পরিচয় হলো, তোমরা একে অপরের খুব কাছাকাছি। আমি আশা করি, একে অপরের জীবন সাথী হবে তোমরা। আরও খবর হলো, তোমার বিপদ সে আঁচ করতে পেরে পুলিশ নিয়ে এসেছিল তোমাকে বাঁচাতে। ধন্যবাদ তামাহি মাহিন!’ মুখস্তের মতই কথাগুলো এক নি:শ্বাসে বলল আহমদ মুসা। মারেভা ও তামাহি মাহিন দু’জনেরই মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। বলল, ‘স্যার, এত সব বিষয় কখন আপনি জানলেন, কি করে জানলেন?’ ‘সে সব কথা পরে হবে। তোমরা এখন যাও। পুলিশের ঝামেলাটা আগে শেষ করে এস।’ আহমদ মুসা বলল। ‘স্যার, আপনার কাছে আমরা চির কৃতজ্ঞ। কোন ধন্যবাদ বা কোন কিছু দিয়েই আপনার ঋন শোধ হবে না।’ তামাহি মাহিন বলল। আহমদ মুসা হেসে বলল, ‘মনে হচ্ছে চির বিদায় নিয়ে যাচ্ছ। তোমাকে তো বিদায় দেইনি আমি। তুমি মারেভা সাথে করে আসবে আমার হোটেল।’ ‘অবশ্যই স্যার। কয়েকটা কথা বলেই মনে হচ্ছে আপনাকে বহুদিন ধরে চিনি। তাহলে এখন চলি স্যার।’ বলল তামাহি মাহিন। মারেভা মুখোমুখি হলো আহমদ মুসার। তার মুখ-চোখ ভারি। বলল, ‘আপনাকে ধন্যবাদ দিলে আপনাকে ছোট করা হবে স্যার। আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন। আপনি না থাকলে পুলিশ আসার আগেই ওরা আমাকে গায়েব করতো। ওরা সাংঘাতিক। ভবিষ্যতে আরও কি আছে জানি না স্যার।’ কান্নায় আটকে গেল মারেভার শেষ কথাগুলো। ‘কোন ভয় নেই যাও। পরি শুনব তোমাদের কথা।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আপনার ওখানে কখন আসব স্যার।’ বলল মারেভা। ‘সব ঝামেলা শেষ করে যখন তুমি সময় পাবে, তখন মাহিনকে সাথে নিয়ে আসবে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ধন্যবাদ স্যার। ওকেও নিয়ে আসব। চলি স্যার। গুড বাই।’ বলে মারেভা ঘুরে দাঁড়িয়ে হাটতে শুরু করল। হাঁটতে গিয়েও তামাহি মাহিন দাঁড়িয়ে গিয়ে মারেভার জন্যে অপেক্ষা করছিল। দু’জনে এক সাথে হাঁটতে শুরু করল। আহমদ মুসা এগোলো তার ট্যাক্সির দিকে। ট্যাক্সি ড্রাইভার তেপাও ভয়ে আড়ষ্ট স্থানুর মত বসেছিল তার সীটে। ভয় ও আতংক এখনও তার চোখ মুখ থেকে যায়নি। আহমদ মুসা গাড়ির কাছে এসে পৌঁছতেই ড্রাইভার তেপাও আহমদ মুসার প্রতি স্থির দৃষ্টি নিয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল এবং আহমদ মুসার সামনে দাঁড়িয়ে লম্বা একটা বাউ করল। বলল, ‘আমার অভিবাদন গ্রহণ করুন। আমার চোখ ধন্য হয়েছে জীবন্ত এই দৃশ্য দেখে।’ আহমদ মুসা কিছু না বলে গাড়িতে উঠে বসল। বলল, ‘মি. তেপাও। বুঝলাম না, এটা নিছক নারী-অপহরণের কেস, না এর পিছনে অন্য কিছু আছে? তোমাদের এখানে কি প্রায়ই এমন ঘটনা ঘটে?’ ‘স্যার, নারী কেন্দ্রিক ঝগড়া-ঝাটি আছে। কিন্তু এ রকম যুদ্ধ মানে সংঘবদ্ধ অপহরণের ঘটনা কখনও ঘটেছে বলে জানি না।’ বলল ড্রাইভার তেপাও। আহমদ মুসা কিছু বলল না। গাড়ির সীটে গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করল আহমদ মুসা। বলল, ‘হোটেলে চল মি. তেপাও।’ গাড়ি ষ্টার্ট নিয়ে চলতে শুরু করল। শুকনা মুখে সান্ড্রা সুসান গ্রান্ট টাইরেলির কক্ষে প্রবেশ করল। দুশ্চিন্তায় তার মুখ আচ্ছন্ন। সান্ডা সুসান যে সাপ্লাই কোম্পানির পাপেতি কেন্দ্রের ষ্টেশন ম্যানেজার, সেই কোম্পানীর বড় কর্তা গ্রান্ট টাইরেলি। গ্রান্ট টাইরেলির তলব পেয়ে তার সাথে দেখা করতে এসেছে সান্ডা সুসান। গ্রান্ট টাইরেলিই তার পরিচিত মহলের সাহায্য নিয়ে উপরে দেন-দরবার করে থানা থেকে সান্ডা সুসান, গুলিবিদ্ধ তিনজন ও অন্য তিনজনকে ছাড়িয়ে এনেছে এবং এ নিয়ে আর তদন্ত –অনুসন্ধান না হয় সে ব্যাবস্থাও করেছে। লিখিত অংগীকার করতে হয়েছে যে তামাহি মাহিন ও মারেভাকে তারা আর কোনওভাবে বিরক্ত করবে না। সান্ডা সুসান আশংকা করছে এই বিষয়েই তার কঠোর বস গ্রান্ট টাইরেলি তাকে কিছু বলবে। সান্ড্রা সুসান জানে কোন ভুলের মাফ নেই কোম্পানির উপরের বস টাইরেলির কাছে। সান্ড্রা সুসান প্রবেশ করতেই বিশাল টেবিলের ওপাশে বসা দীর্ঘদেহি ও ঋজু শরীরের গ্রান্ট টাইরেলি টেবিলের উপর থেকে চোখ না তুলেই বলল, ‘ওখানেই দাঁড়াও সান্ড্রা।’ গ্রান্ট টাইরেলির সামনে একটা ফাইল খোলা ছিল। ‘ইয়েস স্যার’ বলে টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে গেল সান্ড্রা সুসান। টেবিলের সামনে বসার কোন চেয়ার নেই। মিনিট দু’য়েক পরেই মুখ তুলল গ্রান্ট টাইরেলি ফাইল থেকে। অভিব্যাক্তিহীন পাথরের মত শক্ত মুখ। ঠান্ডা চোখ। সেই শক্ত মুখ থেকে বেরিয়ে এল কথা, ‘সান্ড্রা, তুমি কয়টি অপরাধ করেছ?’ কেঁপে উঠল সান্ড্রা। বলল, ‘দু’টি অপরাধ করেছি স্যার। এক, বাইরের একজনের সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছি এবং দুই. আমার কারনেই বিষয়টি থানা পর্যন্ত গড়িয়েছে।’ ‘তোমার সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো তুমি আমাদের স্থানীয় নীতি লংঘন করেছো। আমরা চাই না মানুষের দৃষ্টি কোনওভাবে আমাদের প্রতি আকৃষ্ট হোক, আমাদের পেছনে লাগুক, আমাদের সন্ধান করুক। তুমি এই কাজই করেছ, যা ক্ষমাহীন অপরাধ। তুমি এই অপরাধ স্বীকার কর?’ বলল গ্রান্ট টাইরেলি। ‘হ্যাঁ স্যার। আমি এই অপরাধ করেছি।’ বলল সান্ড্রা সুসান। ‘ধন্যবাদ!’ বলে গ্রান্ট টাইরেলি অত্যান্ত ধীরস্থিরভাবে ড্রয়ার থেকে রিভলবার বের করে গুলি কলল সান্ড্রা সুসানের বাম বুকে। মাপ-জোক করা গুলি। এক গুলিতেই সান্ড্রা সুসানের দেহটা ঝরে পড়ল মেঝেতে। গুলি খাবার আগে সান্ড্রার দু’চোখ একবার বিস্ফোরিত হয়েছিল। কিন্তু মুখ দিয়ে চিৎকার বের হতে পারেনি। গুলির শব্দ হওয়ার পর পরই দু’জন ঘরে প্রবেশ করল একটা ট্রলি ঠেলে। সান্ড্রা সুসানের লাশ তারা ট্রলিতে তুলে নিয়ে চলে গেল। লাশ চলে গেল গেলে গ্রান্ট টাইরেলি চেয়ার থেকে উঠে ঘরের পাশের দরজা দিয়ে আরেকটা ঘরে প্রবেশ করল। সেখানে একটা টেবিলের সামনে চারজন লোক বসেছিল। গ্রান্ট টাইরেলি টেবিল ঘুরে ওপাশে গিয়ে হোষ্টেল বড় চেয়ারটায় বসল। টেবিলের পাশের যে চারজন লোক উঠে দাঁড়িয়েছিল, তারাও বসল। ‘সান্ড্রা সুসান আমাদের একজন পুরানো ও পরীক্ষিত কর্মী ছিল। তার পতন আমাদের জন্য একটা শিক্ষা। লর্ড অ্যালেক্সী গ্যারিন ভীষণ ক্ষুদ্ধ হয়েছেন। ম্যাডাম গ্যারিনের একটা মেসেজ পেয়েছি আজ।’ চেয়ারে বসেই বলে উঠল গ্রান্ট টাইরেলি। ‘কি মেসেজ স্যার?’ চরজনের একজন বলল। ‘পাপেতির সাপ্লাই অফিস আজ থেকে বন্ধ হয়ে যাবে। ফা’তে যে বিকল্প অফিস নেয়া আছে, ওটা আজ থেকে চালু করতে হবে। তামাহি মাহিন ও মারেভার ব্যাপারে নির্দেশ এসেছে। আপাতত ওদের কিছু করা যাবে না। মারেভার উপর আক্রমণ ও থানা-পুলিশের ঘটনা যখন মানুষ কয়েক মাস পরে ভূলে যাবে, তখন সান্ড্রা যে শাস্তি পেয়েছে, ওরাও সেটাই পাবে। সান্ড্রার মৃত্যুর নিমিত্ত ওরা। তাই ওরাও একই শাস্তি পাবে।’ বলল গ্রান্ট টাইরেলি। ‘আমাদের অখন্ড গোপনীয়তার গায়ে কোন আঁচড় কখনও পড়েনি। সান্ড্রার ঘটনা আমাদের কতখানি ক্ষতিগ্রস্থ করেছে, তা কি আমরা জানতে পেরেছি?’ চারজনের মধ্য থেকে একজন বলল। ‘আমি যতটা ক্ষতিয়ে দেখেছি, তাতে সান্ড্রার বাইরে আমাদের কারো পরিচয় অন্য কোথাও বা কারো কাছে উন্মু্ক্ত হয়নি। সেই মাত্র যোগসূত্র হয়ে উঠছিল বা হতে পারতো। সে না থাকায় যোগসূত্র এখন উধাও। সুতরাং চিন্তার কিছু নেই।’ বলল গ্রান্ট টাইরেলি। কথা শেষ করেই গ্রান্ট টাইরেলি তাকাল চারজনের একজনের দিকে। বলল, ‘নাশকা, আমাদের ‘ফা’ সাপ্লাই কেন্দ্রের দায়িত্ব তোমাকে দেয়া হয়েছে। তুমি আজই চলে যাও ‘ফা’ সাপ্লাই অফিসে। সাপ্লাই রুটিন-এ কোন অনিয়ম হওয়া চলবে না।’ ‘ধন্যবাদ স্যার। আমি আজই ‘ফা’তে যাচ্ছি। অবশ্যই কোন অসুবিধা হবে না, সব ঠিক ঠাক চলবে।’ বলল লোকটি, যাকে উদ্দেশ্য করে কথা বলেছিল গ্রান্ট টাইরেলি। ‘কথা এখানেই শেষ!’ বলে উঠে দাঁড়াল গ্রান্ট টাইরেলি। তার সাথে উঠে দাঁড়াল সবাই। আহমদ মুসার হোটেল রুম। মারেভাদের বসিয়ে আহমদ মুসা এইমাত্র ঢুকল তার বেডরুমে এটাচ্ড বাথে। হোটেলের জিমনেসিয়াম থেকে সবেমাত্র ফিরেছে সে। মারেভার মারেভা মা পাশের আরেকটা সোফায় বসেছে। পাশাপাশি সোফায় বসেছে মারেভা ও তামাহি মাহিন। তারা সময়ের আগেই পৌঁটে গেছে আহমদ মুসার রুমে। পথে আরুতে একটা কাজ ছিল বলে একটু আগেই বেরিয়েছিল। কিন্তু সে কাজের সুযোগ হয়নি বলে সময় বেঁচে গেছে। ‘আরু’ নামের ধব্বংস প্রাপ্ত নগরী তামাহি মাহিন ও মারেভার পরিবারের অতীত বাসস্থান। মাহিন ও মারেভার বাবারা তাহিতির পমারী রাজবংশের সন্তান। পমারী রাজবংশের রাজধানী ‘আরু’ এখন একটা ধব্বংসাবশেষ। তবে পমারীদের একটা প্রার্থনা গৃহ এখনও টিকে আছে। তাছাড়া প্রার্থনা গৃহের শতায়ু বয়সের পুরোহিত মারেভাদের আত্মীয়। তার সাথেই তাদের কাজ ছিল। আহমদ মুসা চলে যেতেই সে পথের দিকে চোখ ফেরাল মারেভার মা। মূলত পুরোহিতের সাথে দেখা করার জন্যই মারেভার মা এসেছে মারেভাদের সাথে। এটা জেনে আহমদ মুসাই তাকে হোটেলে আনতে বলেছিল। আহমদ মুসার গমন পথের দিকে চোখ নিবদ্ধ রেখেই তামাহি মাহিন বলল, ‘স্যারকে যতই দেখছি, বিস্ময় ও কৌতূহল আমার ততই বাড়ছে। সেদিন ছয়জন হাইজ্যাকারের সাথে লড়াই করা দেখে মনে হয়েছে। সবজান্তা একজন লড়াকু তিনি। আবার সব মানুষের সাথে তার ব্যাবহার ও ভালোবাসা দেখলে মনে হয় তিন একজন মানবতাবাদী।’ ‘উনি একজন অসম্ভব ভাল মানুষ! এটাই আমার মতে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। আমি একা ঘরে থাকলে কেন তিনি ঘর খোলা রাখেন সেটা জেনেছি মা। ওদের ধর্মের এটাই বিধান। এ কয় দিনে ওদের ধর্মের অনেক কিছু জেনেছি। যা দেখছি, তাতে ওদের ধর্ম ‘মানবতার ধর্ম’ মা। মানে প্র্যাকটিক্যাল বাস্তব জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ঠ।’ ‘মুসলমানদের সাথে ওঠা-বসা করিনি। ওদের সম্পর্কে জানিও না। কিন্তু আমার দাদা শ্বশুরের কাছে শুনেছিলাম, তাঁর দাদা নাকি বলতেন আমাদের ‘পমারী’ বংশের সাথে মুসলমানদের গভীর যোগসূত্র ছিল। কি একটা বড় ঘটনা, বৃটিশদের আগমন, সবচেয়ে ফরাসিদের প্রতিপক্ষ-নিমূল অভিযানে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।’ বলল মারেভার মা। ‘কি শেষ হয়ে গেছে খালাম্মা?’ বলতে বলতে বেড রুম থেকে বের হয়ে এল আহমদ মুসা। খুব ফ্রেস দেখাচ্ছে আহমদ মুসাকে। ফরমাল পোষাক পরেছে আহমদ মুসা। বাইরে বেরুবার ইচ্ছা তার নিশ্চয় আছে। সবাই উঠে আহমদ মুসাকে স্বাগত জানাল। আহমদ মুসা মারেভার মা’কে বসিয়ে তারপর নিজে বসল। মারেভার মা বসতে বলল, ‘বাচ্চারাও ছাড়ল না। আমিও ভাবলাম এদিক হয়েই যাই। আপনি কিন্তু একদিন যাব বলেছিলেন! ক’দিন হয়ে গেল আর তো গেলেন না।’ ‘যাব একদিন। তবে খুব শীঘ্র তো যাওয়া হচ্চে না।’ সব কিছু হয়ে গেলে। কিছু কি ঘটেছে?’ ‘না, এখনকার কোন বিষয় নয়। মুসলমানদের সাথে আমাদের পমারী রাজবংশের সম্পর্কের কথা বলছিলাম। কি একটা ঘটনা এবং বৃটিশ ও ফরাসিদের আগমন সব শেষ করে দেয়। সেটাই বলছিলাম।’ মারেভার মা বলল। ভ্র কুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। বলল, ‘তাহিতির প্রাচীন রাজবংশ পমারীর কথা শুনেছি। কিন্তু তাদের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক হবে কি করে?’ ‘আমিও এব্যাপারে কিছু জানি না। একবার আমার দাদা শ্বশুর খবরের কাগজে কি একটা নিউজ পড়ে তাঁর দাদাকে কোট করে বলেছিলেন পমারী রাজবংশের সাথে মুসলমানদের গভীর সম্পর্ক ছিল। আমি এটুকুই জানি। সেটাই আমি ওদের বললাম।’ মারেভার মা বলল। ‘এমন কিছু অসম্ভব নয়। পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত মুসলমানদের যুদ্ধ ও বাণিজ্য জাহাজ আটলান্টিক, ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগর চষে ফিরত। তারপরও তিনশত বছর পর্যন্ত সাগরগুলোতে বিভিন্নভাবে মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল। আমি তাহিতির পুরাতত্ব যাদুঘরে একদিন যেতে চাই।’ বলল আহমদ মুসা। ‘তাহলে স্যার, মুসলমানরা এক সময় দুনিয়া জোড়া রাজনৈতিক শক্তি ছিল?’ জিজ্ঞাসা তামাহি মাহিনের। ‘অবশ্যই। পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত মুসলমানরা তখনকার জানা পৃথিবীর সবটার উপর শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। সপ্তদশ শতকে মুসলমানরাই প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি ছিল। জ্ঞান-বিজ্ঞানে তারাই নেতৃত্ব দিয়েছে। বৃটিশ, ফরাসিসহ ইউরোপীয়রা মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখা-পড়া জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার সন্ধান পেয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল। বলেই আহমদ মুসা তাকাল মারেভার দিকে। বলল, ‘সান্ড্রা না কি যেন নাম? ওদের খবর কি, ওরা কি আর ডিষ্টার্ব করেনি?’ মারেভা জবাব না দিয়ে তাকাল তামাহি মাহিনের দিকে। বলল, ‘তুমিই বল মাহিন, অনেক কিছুই তো ঘটেছে?’ ‘কেন, ওরা থানা থেকে ছাড়া পাবার পর আরও কিছু করেছে?’ আহমদ মুসা বলল। তার কন্ঠে কিছুটা বিস্ময়! ‘না স্যার, আমাদের কিছু করেনি। ওদের মধ্যেই অনেক কিছু ঘটেছে।’ ‘অনেক কিছু ঘটেছে? কি ঘটেছে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘সেই সাপ্লাই অফিস বন্ধ হয়ে গেছে। সান্ড্রা সুসানও বেঁচে নেই বলে মনে হয়।’ বলল তামাহি মাহিন। ‘বেঁচে নেই? ঘটনা কি বলত?’ আহমদ মুসা বলল। ‘সাপ্লাই অফিসের ক্যারিয়ার ও প্যাকিংম্যান দু’জনের সাথে আমার দেখা হয়েছিল। তাদের কাছ থেকেই এসব ঘটনা শুনলাম।’ বলল তামাহি মাহিন। ‘কি বলেছে তারা?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘যে দিন সান্ড্রারা থানা থেকে মুক্ত হয়, সেদিনও ওরা দু’জন অফিস করেছে। কিন্তু পরদিন অফিসে গিয়ে দেখে তাদের সাপ্লাই অফিস বন্ধ। ছোট্ট একটা নোটিশ টাঙানো দেখতে পায়। তাতে লেখা ছিল: ‘কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তক্রমে ব্যবসায় বন্ধ করে দিয়েছেন। দেনা-পাওনার বিষয়টি কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্টদের সাথে সরাসরি করবেন।’ নোটিশ দেখে হতাশ হয়ে ঐ দু’জন কর্মী সান্ড্রার সাথে দেখা করার জন্য তার বাড়িতে যায়। গিয়ে দেখে তার মাকে দেখতে পায় সাংঘাতিক ভীত। কথা বলতেও অস্বীকার করে। পাশের একজনের কাছ থেকে জানতে পারে সান্ড্রা দুর্ঘটনায় মারা গেছে। তার লাশ তার পরিবার পায়নি। কোম্পানিই নাকি তার সৎকারের ব্যবস্থা করেছে।’ ‘ভ্র কুঞ্চিত হয়ে উঠেছিল আহমদ মুসার। গোটা ঘটনার মধ্যে রহস্যের গন্ধ পরিষ্কার। অনেক প্রশ্ন এসে ভীড় করল তার মনে। সান্ড্রা দূর্ঘটনায় মারা গেছে। তার লাশ তার পরিবার পায়নি। কোম্পানিই নাকি তার সৎকারের ব্যবস্থা করেছে।’ ভ্র কুঞ্চিত হয়ে উঠেছিল আহমদ মুসার। গোটা ঘটনার মধ্যে রহস্যের গন্ধ পরিষ্কার। অনেক প্রশ্ন এসে ভীড় করল তার মনে। সান্ড্রা দুর্ঘটনায় মারা গেলে তার পরিবার ভীত কেন? সান্ড্রার দেহ ফেরত পেল না কেন? কে তার পরিবারকে ভয় দেখাল? সান্ড্রার কোম্পানি কি? কেন ভয় দেখাল? ব্যবসায় বন্ধ করল কেন কোম্পানি? থানা থেকে সান্ড্রা ও তার সাথীদের মুক্ত করল কে? কোম্পানিটা আসলে কি? তাহলে কোম্পানি তো সাংঘাতিক পাওয়ারফুল! তামাহি মাহিন জানিয়েছিল, পুলিশ তাকে বলেছিল সান্ড্রাদের তারা নি:শর্তে ছেড়ে দিয়েছিল, কারণ ওদের হাত সাংঘাতিক লম্বা! এসব নানান চিন্তা এসে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল আহমদ মুসার মন। আহমদ মুসাকে হঠাৎ চিন্তায় ডুবে যেতে দেখে তামাহি মাহিন বলল, ‘স্যার কিছু ভাবছেন?’ আহমদ মুসা তাকাল তামাহি মাহিনের দিকে। বলল, ‘তোমাদের সান্ড্রার বিষয় নিয়েই ভাবছি।’ ‘কি ভাবছেন?’ তামাহি মাহিন বলল। ‘আমার বিশ্বাস তোমাদের সান্ড্রাকে খুন করা হয়েছে।’ ‘খুন?’ কে খুন করবে? বলল তামাহি মাহিন। বিস্ময় বিস্ফোরিত দু’চোখ তার। ‘যে কাহিনী তুমি শোনালে, তাতে তার কোম্পানি তাকে খুন করেছে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘তার কোম্পানি? কেন খুন করবে? তারাই তো তাকে জেল থেকে বের করল!’ বলল তামাহি মাহিন। ‘কেন খুন করবে জানি না?’ বলে আহমদ মুসা মুহুর্তকাল ভাবল। তারপর বলল, ‘আচ্ছা মাহিন, কোম্পানির হেড অফিস কোথায়?’ ‘আমি জানি না।’ বলল তামাহি মাহিন। ‘তুমি কি কোম্পানির উপরের বসদের কাউকে দেখেছ?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘না দেখিনি।’ তামাহি মাহিন বলল। ‘কোন দিন তারা আসেননি?’ বলল আহমদ মুসা। ‘আমার চোখে পড়েনি।’ তামাহি মাহিন বলল। ‘টেলিফোনে কখনও কথা বলেছ? কিংবা তারা টেলিফোন করেছেন কখনও?’ বলল আহমদ মুসা। ‘না। আমার অন্তত জানা নেই।’ তামাহি মাহিন বলল। ‘তোমাদের কোম্পানি আর কি ব্যবসায় করে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘আমার জানা নেই। কোম্পানি সম্পর্কে কোন আলোচনাই কখনও আমি অফিসে শুনিনি।’ বলল তামাহি মাহিন। ‘তোমাদের সাপ্লাই অফিস থেকে গড়ে প্রতিদিন কত টাকার পণ্য বিক্রি হতো?’ আহমদ মুসা বলল। ‘বিক্রির টাকা কখনও আমি অফিসে আনতে দেখিনি। অফিস থেকে টাকা দিত, শুধু সেই টাকা দিয়ে পণ্য কিনে আমরা সাপ্লাই করতাম।’ বলল তামাহি মাহিন। ‘কোথায় সাপ্লাই হতো?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘অ্যাটল এলাকায়।’ বলল তামাহি মাহিন। ‘অ্যাটল কি বাজার আছে?’ আহমদ মুসা জানতে চাইল। ‘তোয়ামতো দ্বীপপুঞ্জের উত্তরের কয়েকটা দ্বীপে ছোট-খাট বাজার রয়েছে।’ বলল তামাহি মাহিন। ‘সে সব বাজরেই তোমরা মাল পৌঁছাতে?’ সেখানে ও এখানকার দরের মধ্যে পার্থক্য কেমন?’ ‘মূল্যের পার্থক্যটা আমি জানি না। কয়েকটার মাত্র আমাকে সাপ্লাই টিমের সাথে যেতে হয়েছে। কিন্তু কখনই সে সব বাজারে যাইনি।’ বলল তামাহি মাহিন। ‘সাপ্লাই তাহলে কোথায় দিত?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা। ‘স্যার, আমি তাহনিয়া দ্বীপে নামিয়ে দিয়ে চলে এসেছি।’ তামাহি মাহিন বলল। ‘সেখানে বাজার নেই?’ বলল আহমদ মুসা। ‘স্যার, সে দ্বীপে কোন জনবসতিই নেই, বাজার থাকবে কি করে?’ তামাহি মাহিন বলল। ‘জনবসতি নেই, তাহলে সাপ্লাই কোথায়, কাকে দিয়ে এলে, কেন দিয়ে এলে?’ বলল আহমদ মুসা। ‘স্যার, তাহানিয়া একটা অ্যাটল। সে অ্যাটলে ল্যান্ড বেন্টে একটা ছোট্ট গোডাউন আছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। পণ্য ওখানেই কয়েকবার নামিয়ে দিয়ে এসেছি।’ তামাহি মাহিন বলল। ‘ওটা কি কোন ফেরিঘাট? ওখান থেকে কি রিসাপ্লাইয়ের ব্যবস্থা আছে?’ বলল আহমদ মু্সা। ‘না, ওটা কোন ফেরিঘাট নয়। ওখান থেকে কোন জনযান যাতায়াত করে না্। ওখান থেকে আরও অনেক উত্তরে কয়েকটি দ্বীপে জনবসতি আছে।’ তামাহি মাহিন বলল। ভ্র কুঞ্চিত হয়ে উঠেছে আহমদ মুসার। চোখে মুখে তার ফুটে উঠেছে অনেক জিজ্ঞাসা। বলল, ‘উত্তরের ঐ সব দ্বীপে মানে অ্যাটলে কি তাহানিয়া দ্বীপ হয়ে যেতে হয়?’ বলল আহমদ মুসা। ‘না স্যার। তাহিতি থেকে উত্তরের ঐ সব অ্যাটল বরং কাছেই। সোজাসুজি ওখানে যাওয়া যায়।’ তামাহি মাহিন বলল। ‘তাহলে তাহানিয়া দ্বীপে সাপ্লাই পণ্য নামিয়ে আস কেন তোমরা?’ বলল আহমদ মুসা। তার চোখে মুখে ফুটে ওঠা জিজ্ঞাসা আরও তীক্ষ্ণ হয়েছে। ‘সেটা আমি জানি না স্যার। প্রশ্নটি আমার মনেও জেগেছে। কিন্তু কোম্পানির প্রয়োজন নেই এমন কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা যায় না।’ গভীর একটা ভাবনার ছায়া পড়েছে আহমদ মুসার চোখে মুখে। বলল, ‘ঐ গোডাউন ছাড়া ঐ দ্বীপে আর কোন স্থাপনা নেই?’ ‘নেই স্যার।’ বলল তামাহি মাহিন। তামাহি মাহিনের কথা শেষ হলেও আহমদ মুসা কোন কথা বলল না। তার মুখ নিচু হয়েছে। ভাবছে সে। তামাহি মাহিন ও মারেভাদের চোখে মুখেও কিছুটা বিস্ময় ফুটে উঠেছে! এতসব অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন আহমদ মুসা কেন করছে, এই জিজ্ঞাসা তাদের মনে স্বাভাবিক ভাবেই জেগে উঠেছে। এই কৌতুহল থেকেই তামাহি মাহিন জিজ্ঞাসা করল, ‘এতসব প্রশ্ন কেন করছেন স্যার? এসব কোন কৌতুহলের বিষয় বলে তো আমার মনে হয় না।’ আহমদ মুসা মুখ তুলল। তাকাল তামাহি মাহিনের দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে। চোখ ফেরাল মারেভাদের দিকেও। বলল ধীর কন্ঠে, ‘আসলে আমি একটা দ্বীপের সন্ধান করছি।’ ‘একটা দ্বীপের সন্ধান?’ প্রায় এক সংগেই বলে উঠল মারেভা ও তামাহি মাহিন। ‘হ্যাঁ।’ আহমদ মুসা বলল। ‘কি দ্বীপ, কেমন দ্বীপ?’ বলল তামাহি মাহিন। ‘সেটা হতে হবে অ্যাটল দ্বীপ।’ আহমদ মুসা বলল। ‘কোনো বিশেষ অ্যাটল দ্বীপ খুঁজছেন, না একটা ভাল অ্যাটল দ্বীপ খুঁজছেন?’ বলল মারেভা। ‘বিশেষ একটা অ্যাটল দ্বীপ খুঁজছি।’ আহমদ মুসা বলল। ‘কেমন সে দ্বীপ?’ বলল তামাহি মাহিন। ‘সেখানে বড় স্থাপনা থাকবে এবং চারদিকে থাকবে গোপনীয়তার আবরণ।’ আহমদ মুসা বলল। ‘তোয়ামতো দ্বীপপঞ্জে বড় স্থাপনা সম্বলিত দু’চারটি অ্যাটল দ্বীপ আছে। কিন্তু সেগুলো পাবলিক প্লেসে। সেখানে কোন গোপনীয়তা নেই।’ তামাহি মাহিন বলল। ‘আপনার সেই বিশেষ অ্যাটল দ্বীপ কি আমাদের এই তোয়ামতো দ্বীপপুঞ্জেই, আপনি নিশ্চিত স্যার?’ মারেভা বলল। ‘নিশ্চিত না হলে আমি এখানে ছুটে আসতাম না।’ বলল আহমদ মুসা। বিস্ময় দৃষ্টি নিয়ে মারেভারা তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল মারেভা, ‘স্যার, আপনি শুধু সে দ্বীপের সন্ধানেই এখানে এসেছেন?’ ‘হ্যাঁ তাই।’ আহমদ মুসা বলল। ‘স্যরি, খুবই কৌতুহল হচ্ছে জানতে কি আছে সে দ্বীপে কিংবা কি কাজা সেই দ্বীপে, যার জন্য হাজার হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে এখানে আসা!’ বলল মারেভার মা। আহমদ মুসা গম্ভীর হলো। ভাবনার একটা ছায়াও তার চোখে মুখে ফুটে উঠল। ধীর কন্ঠে বলল, ‘স্যরি খালাম্মা, বিষয়টা এই মুহুর্তে আমি বলতে পারছি না। এক সময় অবশ্যই আপনারা জানবেন। বিষয়টা আপনাদের ভয়-উদ্বেগই শুধু বাড়াবে। তবে এটুকু আমি বলতে পারি, বিষয়টা অত্যান্ত গুরুতর। ভয়ংকর এক ষড়যন্ত্রের পিছু নিয়ে আমি এখানে এসেছি। একটা ধারণা ছাড়া আমিও ওদের সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানি না।’ আহমদ মুসার শান্ত, ঠান্ডা কন্ঠের কথাগুলো মারেভারা খুব গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। তাদের সবার চোখে মুখেই ভয় ও উদ্বেগের একটা ছায়া নেমে এসেছে। আহমদ মুসার কথা শেষ হলেও সংগে সংগে ওরা কেউ কথা বলল না। নিরবতা ভাঙল মারেভাই, ‘স্যার, আপনার কথা থেকেই বিষয়টার গুরুত্ব আমরা উপলব্ধি করতে পারছি। কিন্তু স্যার, এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আপনি একা লড়াই করবেন কিভাবে?’ কি ষড়যন্ত্র তা জানা না থাকলে, ষড়যন্ত্রটা কার বিরুদ্ধে সেটা কি জানা যায়? আপনার একার বিরুদ্ধে নিশ্চয় ষড়যন্ত্র নয়?’ ‘না, ষড়যন্ত্রটা আমার বিরুদ্ধে নয়। ষড়যন্ত্রটা এক অর্থে বলা যায় মানবতার বিরুদ্ধে, সভ্যতার বিরুদ্ধে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘সে তো তাহলে বিরাট ব্যাপার! কিন্তু ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার একটা এ্যাটল থেকে এই যড়ষন্ত্রটা কিভাবে হতে পারে?’ ‘ষড়যন্ত্র হয়েছে, হচ্ছে, এটাই বাস্তবতা।’ বলল আহমদ মুসা। ‘এ ধরনের অ্যাটল দ্বীপ কি আমাদের তোমামতো দ্বীপপুঞ্জে আছে? কোনভাবে ভুল হচ্ছে না তো স্যার।’ বলল মারেভা। ‘অবশ্যই আছে। আমার ভুল হয়নি। আমি পারস্য উপসাগর থেকে একটা গুপকে তাড়া করে এখানে এসেছি। ওরা এখানকার কোন এক অ্যাটলে উঠেছে।’ ‘আপনি বলছেন এটাই যথেষ্ট। সত্যের পক্ষে এর চেয়ে বড় প্রমাণ আমরা চাই না। ওদের ষ্ট্যাবলিশমেন্টটা কত বড় স্যার?’ বলল তামাহি মাহিন। ‘আমি জানি না। তবে আমার ধারণা একশ’ লোকের কম হবে না। আহমদ মুসা বলল। ‘অসম্ভব স্যার! আমাদের কোন অ্যাটলেই এত বড় ষ্ট্যাবলিশমেন্ট নেই।’ বলল মারেভা। ‘তোমাদের এ অসম্ভব বলাটা রহস্যকে আরও ঘনিভূত করছে। এই রহস্যের সমাধান করতে হবে। আমি প্রথমে তোমাদের তাহানিয়া দ্বীপ দেখতে চাই মারেভ।’ আহমদ মুসা বলল। ‘অবশ্যই দেখবেন স্যার। কিন্তু হতাশ হবেন।’ বলল মারেভা। ‘হতাশার পাশেই আশা থাকে মারেভা। এই তাহানিয়া দ্বীপ দর্শনে মারেভা তো থাকবেই, তামাহি মাহিনকে অবশ্যই আমার সংগী হতে হবে। এখন থেকে তোমরা দু’জনই আমার গাইড হবে।’ বলল আহমদ মুসা। ‘গাইড না গার্ড স্যার। আপনি তো পর্যটক নন। অতএব আপনার গাইড দরকার নেই।’ বলল মারেভা। তার মুখে হাসি। ‘মারেভার কথা ঠিক। গাইড না বলে গার্ড বলাই বেশি যুক্তি সংগত। তবে গার্ড যাকে বলে সেই গার্ড তোমাদের হতে হবে না। আমি আমার কোন বিপদে তোমাদের টানব না। তোমারা একটা বিপদে পড়েছিলে। তোমারা আবার কোন বিপদে পড়ো তা আমি চাইব না।’ বলল আহমদ মুসা। ‘সেদিন যেভাবে নিজের জীবন বাজি রেখে আমাকে বাঁচিয়েছেন, তাতে আপনার এ কথারই প্রমাণ মেলে। যারা নিজের জীবন বিপন্ন করে অন্যদের বাঁচায়, তার অন্যের জীবন বিপন্ন হওয়াকে পছন্দ করবে না। তবে স্যার, আমাদের গার্ড ভাবার দরকার নেই আপনার। সহযোগী হিসেবে ভাবুন। সহযোগীরা একে অপরের দুঃখ ভাগ করে নেয়। আমাদের মর্যাদা দিলেই আমরা খুশি হবো।’ মারেভা বলল। ‘আচ্ছা থাক এসব কথা! বলল মাহিন পুলিশ যে বলেছিল, তোমাদের কোম্পানির হাত খুব লম্বা, এটা কেন বলেছিল? ওরা প্রভাবশালী কোন দিক দিয়ে?’ ‘আমি জানি না স্যার। তবে তাদের সম্পর্কে পুলিশের আরও কিছু কথা শুনেছিলাম। পুলিশরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করেছিল ওরা ছয়কে নয় করার ক্ষমতা রাখে।’ বলল তামাহি মাহিন। ‘আচ্ছা বলত মাহিন, তোমাদের কোম্পানি তোমাদের স্থানীয় অফিস থেকে প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে গড়ে যে শাক-সব্জি, মাছ-মাংস সাপ্লাই করতো তার গড় পরিমাণ কি একই রকমের?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘জি স্যার, গড় পরিমাণ একই রকমের। তামাহি মাহিন বলল।’ ‘সে পরিমাণটা কি রকম? পঁচিশ তিরিশটা পরিবারে প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহের উপযুক্ত?’ বলল আহমদ মুসা। তামাহি মাহিন একটু ভাবল। মনে মনে অংকও কষল। বলল, ‘ঠিক স্যার পঁচিশ তিরিশটি পরিবারের মত। প্রতিদিন সব্জি কম বেশি একমণ, মাছ-মাংস প্রতিদিন গড়ে বিশ তিরিশ কেজির বেশি সাপ্লাই হতো না।’ আহমদ মুসার চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘কিন্তু যে কয়েকটি অ্যাটলে জনবসতি আছে, তার মোট পরিবারে সংখ্যা পঁচিশ তিরিশের অনেক বেশি হবে নিশ্চয়?’ ‘ঠিক বলেছেন স্যার। কয়েকশ’ পরিবার অবশ্যয় হবে।’ বলল তামাহি মাহিন। ‘তাহলে মাহিন তোমাদের কোম্পানির সব্জি, মাছ, মাংশের সাপ্লাই অ্যাটলের পরিবারগুলোর চাহিদা পুরণের জন্যে নয়।’ আহমদ মুসা বলল। ‘কেন স্যার?’ বলল তামাহি মাহিন। ‘সব পরিবারের চাহিদা পুরনের জন্যে হলে চাহিদা বাড়া, কমা বা চাহিদা অনুসারে সাপ্লাইয়ের পরিমাণ কমবেশি হতো। সাপ্লাই ব্যবসায়ের এটাই নিয়ম।’ আহমদ মুসা বলল। ‘কোম্পানির সাপ্লাই তাহলে কোন কারণে কি জন্যে একই ছিল?’ জিজ্ঞাসা তামাহি মাহিনের। ‘আমি ঠিক বলতে পারবো না। তবে সাপ্লাইয়ের অব্যবহত যে পরিমাণ, তা প্রমাণ করে সাপ্লাই ছিল বিশ পঁচিশটি পরিবার মানে শতখানেক মানুষের জন্যে।’ বলল আহমদ মুসা। বিস্ফোরিত হয়ে উঠল তামাহি মাহিন ও মারেভার চোখ। বলল তামাহি মাহিন, ‘তার মানে স্যার, আপনি বলতে চাচ্ছেন একশ’ জনের যে ষড়যন্ত্রকারী ষ্ট্যাবলিশমেন্টর কথা আপনি বলেছেন, তাদের জন্যেই ছিল এই সাপ্লাই?’ ‘আমি তা এখনও বলছি না। কিন্তু সকল যুক্তি তাদেরকে সন্দেহ করা পক্ষেই। এমন কি সান্ড্রা নিহত হওয়া বা গায়েব হওয়া, সামান্য কারণে সাপ্লাই অফিস বন্ধ হওয়ার মত বিষয়ও আমার সন্দেহকেই আরও প্রবল করেছে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘এ দু’টি ঘটনা কি প্রমাণ করে?’ প্রশ্ন মারেভার। ‘দু’টি নয়, চারটি ঘটনা। মারেভাকে কিডন্যাপের চেষ্টা ও থানায় মামলা হওয়া, এ দু’টি ঘটনার অবশ্যম্ভাবী ঘটনা ছিল সান্ড্রার নিহত হওয়া এবং সাপ্লাই অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়া।’ আহমদ মুসা বলল। ‘কিভাবে? কোম্পানির লোকরাই সান্ড্রাদেরকে ছাড়িয়ে নেয়?’ বলল তামাহি মাহিন। ‘যে কারণে তাদেরকে ছাড়িয়ে নেয়া হয়েছে সে একই কারণে সান্ড্রা খুন হয়েছে এবং সাপ্লাই অফিস বন্ধ হয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘সে কারণটা কি হতে পারে স্যার?’ বলল তামাহি মাহিনই। ‘কোম্পানির গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়।’ আহমদ মুসা বলল। ‘বুঝলাম না স্যার।’ বলল তামাহি মাহি্ন। ‘সান্ড্রা ও সাথী ছয় হাইজ্যাককারী থানায় থাকলে বা জেলে গেলে তাদের পরিচয়ের সাথে কোম্পানির পরিচয়ও প্রকাশ হয়ে পড়ার ভয় ছিল। সে জন্যেই তাদের তড়িঘড়ি করে থানা থেকে ছাড়িয়ে নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে কিডন্যাপের ঘটনার মধ্যে দিয়ে সান্ড্রা ও সাপ্লাই অফিসের উপর থানা পুলিশসহ কিছু মানুষের চোখ গিয়ে পড়িছিল। এর মাধ্যমে কোম্পানির পরিচয়ও বেরিয়ে পড়ার ভয় সৃষ্টি হয়েছিল। সান্ড্রাকে গায়েব করা বা খুন করা এবং সাপ্লাই অফিস বন্ধ করে দেয়ার ফলে আশংকার সব দরজাই বন্ধ হয়ে গেছে।’ আহমদ মুসা বলল। মারেভা ও মাহিনের মুগ্ধ দৃষ্টি আহমদ মুসার দিকে। মুগ্ধ মারেভার মা বলল, ‘বেটা তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণে তুমি অত্যান্ত দক্ষ গোয়েন্দার মত তোমার সুক্ষ দৃষ্টি। আমি তোমার কথা শুনছিলাম আর ভাবছিলাম, আমি কোন গোয়েন্দা কাহিনী শুনছি। আমি ঈশ্বরকে সাক্ষী রেখে বলছি, তুমি যে মিশনেই এসে থাক, তুমি সফল হবে। ঈশ্বর তোমাকে অদ্ভুদ ক্ষমতা দিয়েছেন। তুমি শূণ্যর উপরও প্রসাদ নির্মাণ করতে পার। সব চেয়ে বড় কথা হলো তুমি অত্যান্ত ভালো মানুষ। যে লোভগুলো মানুষকে দুশ্চরিত্র বানায়, অমানুষ বানায়, সে সব লোভ থেকে তুমি মুক্ত। আমার মেয়ে আমার পাশে থাকলে যতটা নিশ্চিত থাকি, তোমার সাথে থাকলেও ততটাই নিশ্চিত থাকি। ঈশ্বর তোমার সহায় হোন বেটা।’ থামল মারেভার মা। ‘ধন্যবাদ খালাম্মা। মায়েরা সব সময় সন্তানদের ভালটাই দেখেন। আপনি তাই দেখেছেন। তবে খালাম্মা আমারও সবচেয়ে বড় চাওয়া এটাই যে, আল্লাহ যে রকম মানুষ চান, আমি যেন সে রকম একন মানুষ হতে পারি এবং আমি যাই করি তা যেন মানুষের উপকারে আসে। আমাদের ধর্মগ্রন্থ আল কুরআনে ভাল কাজ সম্পাদনকেই মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য বলে উভিহিত করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘জীবন ও মৃত্যু আমি সৃষ্টি করেছি এটা দেখার জন্যে যে কারা ভাল কাজ করে।’ ‘ধন্যবাদ বেটা। মারেভা তোমাদের ধর্মের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আমি তো বললাম আমাদের পমারী বংশের সাথে মুসলমানদের একটা গভীর সম্পর্ক নাকি ছিল।’ ‘আমি এ বিষয়টাও অনুসন্ধান করব খালাম্মা। আমি পমারী ডাইনেষ্টির ধ্বংস প্রাপ্ত রাজধানী ‘আরু’ এবং আপনাদের পুরাতত্ব ঘাদুঘরে যাব।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আমরাও খুশি হবো বেটা। আঠারশ’ পনের অর্থ্যাৎ উনিশ শতকের শুরু থেকে দেশের খৃষ্টীয়করণ যেমন শুরু হয়েছে, তেমনি ইতিহাস মুছে ফেলার ধুম চলচে। তাহিতির মূল অধিবাসিরা চায় ইতিহাস রক্ষা পাক, প্রকৃতি ইতিহাস উদ্ধার হোক।’ ‘এই দায়িত্ব খালাম্মা মারেভা, মাহিনদের মত নতুন প্রজন্মের।’ ‘এই প্রজন্ম জানেই না যে, তাদের স্বতন্ত্র কোন ইতিহাস আছে। আমাদের ইতিহাস শুরু হয়েছে বৃটিশদের ও ফরাসিদের আগমন থেকে। আজ আপনাদের কথা থেকে ইতিহাস নিয়ে যে উৎসাহ বোধ করছি, তা অতীতে কোন সময় হয়নি। আপনাদের বিশেষ করে স্যারকে ধন্যবাদ।’ বলল মারেভা। আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আর দেরি নয় সকলে উঠুন। লাঞ্চের সময় পার হয়ে যাচ্ছে। কথা বলার ফ্লোরটা মারেভার কাছে থাকল। আজকের মত আলোচনা মুলতবি। আলোচনা আবার চলবে অন্য কোন দিন, অন্য কোন সময়ে?’ বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল হাসতে হাসতে। তার সাথে সবাই উঠে দাঁড়াল। ৬ ড্রাইভার তেপাওকে পাশের সীটে বসিয়ে আজ আহমদ মুসা নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করছিল। আহমদ মুসা শিখ ড্রাইভারের ছদ্মবেশ নিয়েছে। মাথায় পাগড়ি, মুখে দাড়ি, গোঁফ। পোষাক কিন্তু একেবারে ইংলিশ। হোটেল থেকে বেরিয়ে তাওনোয়া নদী বরাবর হাইওয়ে ধরে এগিয়ে পাপেতি থেকে আসা হাইওয়েতে উঠেছে। এগিয়ে যাচ্ছে না দক্ষিণে। পাপেতি হাইওয়ে একটা জংশনে গিয়ে প্রিন্স আল-হিন্দি অ্যাভেনিউ-এর সাথে মিশেছে। সেই উপত্যকার সামনেই সুন্দর করে সাজানো গাছ-গাছালিতে ঢাকা একটা সমতল পাহাড়। মনোরম দৃশ্যের এই পাহাড়টি পিকনিক পাহাড় নামে খ্যাত। এই পাহাড়েই এসেছে মারেভা ও মাহিনরা পিকনিক করতে। এলাকাভিত্তিক তাদের কম্যুনিটির এট বার্ষিক পিকনিক কর্নার। প্রতি বছর এই সময়েই তাদের এই পিকনিক হয়ে থাকে। পিকনিকে আহমদ দাওয়াত পেয়েছে। কুম্যুনিটির পক্ষ থেকে মারেভার মা তার বিশেষ গেষ্ট হিসাবে দাওয়াত করেছে আহামদ মুসাকে। পিকনিকের সাথে সাথে সারাদিনের উৎসব এটা ওদের। লক্ষ্যহিন ঘুরে বেড়ানো ও রিল্যাক্স মুডে থাকে তার সারাদিন। আহমদ মুসা দুপুরের খানা তাদের সাথে খাওয়ার দাওয়াত নিয়েছিল। সেই দাওয়াত রক্ষা করতেই যাচ্ছে আহমদ মুসা। আহমদ মুসার গাড়ি পাপেতি হাইওয়ে থেকে সরে গিয়ে উঠেছে প্রিন্স আ্যভেনিউ-এর মিলন জংশনে। হঠাৎ এই সময় নারী কন্ঠের ‘বাঁচাও’ ‘বাঁচাও’ চিৎকার তার কানে এল ডান দিক থেকে। কন্ঠ অনেকটা মারেভা মত। আহমদ মুসা চোখ ফিরিয়ে দেখল, একটি হাইল্যান্ডার জীপ প্রিন্স অ্যাভেনিউ থেকে জংশনে প্রবেশ করেছে। জীপের গতি সোজা পূর্ব দিকে। পাপেতি হাইওয়ের এই জংশনে প্রিন্স অ্যাভেনিউ-এর সাথে মিলিত হবার পর প্রিন্স অ্যাভেনিউ নাম নিয়ে পূর্ব দিকে এগিয়ে গেছে। হাইল্যান্ডার জীপের গতি সেই পূর্ব দিকেই। নারী কন্ঠের চিৎকার শোনার সাথে সাথেই আহমদ মুসা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। সে তার গাড়ির মুখ বাম দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে সামনে এগিয়ে হাইল্যান্ডার জীপকে সামনে থেকে ব্লক করার চেষ্টা করবে। কিন্তু আহমদ মুসা গাড়ি ঘুরাতে গিয়ে কিছুটা সময় নষ্ট করেছিল। হাইল্যান্ডার জীপের তীব্র বেপরোয়া গতি তাকে বাড়তি সুযোগ করে দিয়েছে। আহমদ মুসার কার যখন জীপের সমান্তরাল হলো, তখনও আহমদ মুসার কার গজ চারেক দূরে। আহমদ মুসা উপায়ন্তর না দেখে গুলি করল হাইল্যান্ডারের পেছনের চাকায়। খুবই মূল্যবান ছিল গুলি করা। গুলিটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো না। বিকট শব্দে টায়ারটা বাস্ট হয়ে গেল। কিন্তু তার পরেও গাড়ি সামনে এগিয়ে গেল। আহমদ মুসার গাড়ি বাঁক দিয়ে সামনে এগিয়ে হাইল্যান্ডারটির পেছনে গিয়ে পৌঁছবার আগেই আরেকটা হাইল্যান্ডের জীপ ঝড়ের বেগে তার পাশ দিয়ে ছুটে গিয়ে আগের হাইল্যান্ডের ডান পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল। আহমদ মুসা দেখল এতে পরে হাইল্যান্ডারটি বেরিয়ে যেতে পারে, তাই সে আবার তার গাড়িটি আর একটু বামে ঘুরিয়ে নিয়ে আগের হাইল্যান্ডার জীপটির বাম পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল। দেখতে পেল এ জীপের তিনজন আরোহী পাশে এসে দাঁড়ানো জীপটায় উঠে গেছে। দেখল মারেভা জীপের এদিকের দরজা খুলে বেরিয়ে আসছে। আহমদ মুসা তারাতারি গাড়ি থেকে নেমে মারেভাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে নিজেও বসে পড়ল এবং মারেভা তাড়াতাড়ি গাড়ির পেছনের দিকে সরে যাও, সামনে থেকে ওদের অনেক গুলি আসতে পারে। আহমদ মুসা মাটিতে বসে পড়ার সাথে সাথে কয়েকটা গুলি তাদের উপর দিয়ে চলে গিয়েছিল। মারেভার ও আহমদ মুসা গাড়ির পেছন দিকে সরে গেল। গুলি তখনও আসছিল। গুলি করতে করতেই জীপটা সামনে এগোতে শুরু করেছিল। কিছু গুলি আহমদ মুসার গাড়িতেও লাগল। কিছু গুলি দুই গাড়ির মাঝখান দিয়ে পেছন দিকে ছুটে এল। এ গুলির ভয়টা য় আহমদ মুসা করছিল। আহমদ মুসার গাড়ির ড্রাইভার তেপাও আগেই গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির আড়ালে লুকিয়েছিল। আহমদ মুসা তেপাওকে বলল মারেভাকে নিয়ে আশে পাশে কোথাও অপেক্ষা করতে। তেপাওকে এ নির্দেশ দিয়ে আহমদ মুসা গাড়িতে উঠে বসল। বলল, ‘আহমদ মুসা গাড়িতে ষ্ট্যার্ট দিল।’ চলতে শুরু করল গাড়ি। মারেভা ও তেপাও তখন এগোচ্ছে জংশনের পাশের এক হোটেলের দিকে। উৎসুক কিছু মানুষও চারদিক থেকে এসে জমা হয়েছে জংশনের এখানে সেখানে। আহমদ মুসার গাড়ি জংশনটা পার হয়ে প্রিন্স রোডে আবার উঠতে যাবে এমন সময় পেছনে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শুনতে পেল। আহমদ মুসা পেছনে ফিরে দেখল সেই হাইল্যান্ডার জীপটি দাও দাও করে জ্বলছে। ওরা ওদের একটা আলামত ধ্বংস করে দিল যাতে ওটা আর কারো হাতে না পড়ে। মনে মনে প্রশংসা করল আহমদ মুসা ওদের। ওরা পেছনে কোন আলামত রেখে যায় না। বার বারই এটা প্রমাণ হচ্ছে। প্রিন্স হাইওয়ে সোজা একটা সরল রেখার মত পূর্ব দিকে এগিয়ে গেছে। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে ওদের গাড়ি, যদিও অনেক সামনে এগিয়ে গেছে ওরা। আহমদ মুসা গাড়িতে সর্বোচ্চ গতিবেগ এনে ওদের কাছাকাছি পৌঁছার চেষ্টা করল। কিন্তু ওরা টের পেয়ে গেছে যে তাদের ফলো করা হচ্ছে। ওদের গাড়ির স্পীডও বেড়ে গেল। আহমদ মুসার ভাড়া করা ট্যাক্সির চেয়ে হাইল্যান্ডারের গতিবেবগও ছিল বেশি। আহমদ মুসা চেষ্টা করল গতির সমতা রক্ষা করতে। আহমদ মুসার ওদের সাথে হয়তো পারবে না, কিন্তু ওদের ডেষ্টিনেশন জানতে চায়। মারেভাকেই যখন আবার কিডন্যাপ করতে চেষ্টা করেছিল, তখন লোকগুলো সেই কোম্পানির লোক হবে, সে সর্ম্পকে কোন সন্দেহ নেই। আর সেই কোম্পানি অবশ্যই ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট অথবা ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটেরই কেউ হবে। কিন্তু ওরা আবার মারেভাকে কিডন্যাপ করতে চেষ্টা করল কেন? ওরা সান্ড্রাকে সরিয়ে দিয়ে এবং সাপ্লাই অফিস বন্ধ করে দিয়ে পরিচয় লিংকটা তো কাটআপ করেছে। লিংক হয়ে যেতে পারে এমন চেষ্টা আবার তার কেন করল! নানা ভাবনা আহমদ মুসার মনে মাথা তুলছে। কিন্তু তার চোখটা সামনে নিবদ্ধ। হাইল্যান্ডার জীপটিকে সে হারাতে চায় না। কয়েক মাইল এভাবে চলার পর হঠাৎ হাইল্যান্ডার জীপটা বামে টার্ণ নিয়ে ঢালু পাহাড়ি পথে চলতে শুরু করল। আহমদ মুসা ভাবল, বামের ঢাল বেয়ে এগোলে মাইল খানেক পরেই তো হ্রদ। তাহলে তারা হ্রদে নেমে পানি পথে কোথাও যেতে চায়! তাই হবে। যেখানে গিয়ে হাইল্যান্ডার বামে নেমে গেছে, সেখানে পৌঁছে আহমদ মুসা দেখল রাস্তার মত একটা এবড়ো থেবড়ো চিহ্ন নিচে হ্রদের দিকে নেমে গেছে। হাইল্যান্ডারটা আর্ধেকটা পথ এগিয়ে গেছে। হাইল্যান্ডারের পক্ষেই এত দ্রুত এগোনো সম্ভব হচ্ছে, সাধারণ কারের পক্ষে এভাবে এগোনো সম্ভব নয়। আহমদ মুসা কারটিকে একটা ঝোপের আড়ালে রেখে পায়ে হেঁটে নামতে শুরু করল নিজেকে যতটা সম্ভব করে। ওরা জানে এপতে তার গাড়ি নামতে পারবে না। অতএব এ পথের শুরু থেকেই আমি ফিরে যাব, এটা তারা নিশ্চিতই ধরে নেবে। কারণ হেঁচে এগিয়ে গিয়ে তো ওদের ধরা যাবে না, তাহলে এগোবো কেন। আহমদ মুসা তাদের এই নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ নিয়েই যতটা সম্ভব তাদের কাছাকাছি পৌঁছাতে চায়। দেখতে চায় যে তারা কি করছে। আহমদ মুসা সোজাসুজি খাড়া হয়ে হেঁটে নামতে পারছে না। তাই তাকে গাছ-গাছকড়ার আড়ালে নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে অগ্রসর হতে হচ্ছে। চলার মাঝে মাঝে সে উঁকি দিয়ে গাড়িটাকে দেখতে কত দূর পৌঁছল। এক সময় একটা উঁচু টিলার আড়ালে দাঁড়িয়ে উঁকি দিতে গিয়ে দেখল, গাড়িটা দাঁড়িয়ে গেছে। ওখান থেকে হ্রদের পাড়টা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। জীপটা হ্রদের পানি ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। লোকজনও নেমেছে দেখা যাচ্ছে। আহমদ মুসা কাঁধে ঝুলানো দুরবিনটা হাতে নিয়ে চোখে লাগাল সামনে চোখ পড়তেই চমকে উঠল আহমদ মুসা। দেখল হ্রদের পানি ঠেলে তিমি মাছের মত একটা কিছু পানির ভেতর থেকে পানির সারফেসে উঠে আসছে। যখন সম্পূর্ণটা উঠে এল, মনে হলো যেন আস্ত একটা তিমি মাছ। ওটা আসলে তিমি মাছের আদলে তৈরি একটা সাবমেরিন। তিমি মাছের মতই সাবমেরিনটা এক সময় হাঁ করল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা ষ্টিলের ব্রীজ। ব্রীজের সামনের প্রান্তটা উপকূলের এসে লান্ড করল। সংগে সংগেই জীপকে সংকুচিত হতে দেখা গেল। উচ্চতা অর্ধেকের বেশি কমে গেল। তার পর জীপটা সে ব্রীজ দিয়ে সাবমেরিনের পেটে ঢুকে গেল। একে একে পাঁচজন লোকও সেই ব্রীজ দিয়ে সবামেরিনের ভেতরে চলে গেল। তারপর তিমি মাছের করাতের মত দাঁতওয়ালা বিকট হাঁ’টা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই সাবমেরিনটা পানির নিচে হারিয়ে গেল। আহমদ মুসার দু’চোখে আনন্দের ঝিলিক। সে এখন নিশ্চিত, কোম্পানিটা ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের একটা অংশ। সে আরও নিশ্চিত তার আকাক্ষিত সে অ্যাটলটি তাহিতির পূর্ব পাশের তোয়ামতো দ্বীপপুঞ্জের রয়েছে। এই আনন্দের সাথে আহমদ মুসাকে একরাশ বিস্ময়ও পীড়িত করল। এদর কত রকমের সাবমেরিন রয়েছে! সৌদি আরবের উপকূলে যে সাবমেরিন দেখে এসেছে, সেটা টিউব সাবমেরিন। আর এখানে দেখল তিমি মাছের মত এক উদ্ভুত অবয়বের সাবমেরিন। একটু দুর থেকে দেখলে কিংবা হাঠাৎ দেখলে একে তিমি মাছ ছাড়া অন্য কিছু বলতে পারবে না কেউ। আর কত ধরনের সাবমেরিন এদের আছে! কোন বেসরকারী সংগঠন এত শক্তিশালী হয়, এতটা রিসোর্সফুল হয়, এমনটা ধারনাতেও ছিল না। এদের আসলে টার্গেট কি? তাদের অ্যাটলকে শক্তির রাজধানী বানাবার পর তারা কি করতে চায়? এসব প্রশ্ন মাথায় নিয়ে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াল। ফিরে এল সেই রোড জংশনে। দেখল মারেভার মা’সহ পিকনিকের প্রায় সবাই চলে এসেছে এদিকে। আহমদ মুসাকে ঘিরে ধরল সবাই। পুলিশও এসেছে। পুলিশরাও ছুটে এল আহমদ মুসার কাছে। বলল, ‘স্যার, আপনি মেয়েটিকে উদ্ধার করার পর কিডন্যাপারদের ফলো করেছিলেন। কোন হদিশ পেলেন ক্রিমিনালদের?’ ‘ওরা রাস্তা থেকে হ্রদে নেমে যায়। ওখানে ওদের নৌযান ছিল। সে নৌযানে ওরা পালিয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘তাহলে ওরা আটঘাট বেঁধেই এসেছিল। আপনাকে ধন্যবাদ স্যার। পুলিশের কাজ আপনি করছেন।’ বলল পুলিশ অফিসার। ‘ঐ কাজ শুধু পুলিশের নয়, সবার।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আপনি ঠিক বলেছেন। কিন্তু একথাটা সবাই বুঝে না। বুঝলে সমাজে অপরাধ থাকতো না।’ সেই পুলিশ অফিসারটিই বলল। আহমদ মুসা পুলিশের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল মারেভার মায়ের দিকে। মারভার মা মারভাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। মারভার সেই ভীত অবস্থা এখন নেই। একেবারেই ভাবলেশহীন মুখ। ‘খালাম্মা, মাহিন কোথায়?’ আহমদ মুসা জিজ্ঞাসা করল মারেভার মাকে। ‘মারেভা ও মাহিন ঘটনার সময় এক সাথেই ছিল। ওদের সাথে ধ্বস্তাধ্বস্তিতে আহত হয়েছে মাহিন। সে একটা ক্লিনিকে ফার্ষ্টএইড নিচ্ছে।’ বলল মারেভার মা। শুকনো কন্ঠ তার। ‘কেমন আহত সে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘চোখের পাশটা তার কেটে গেছে, কিন্তু চোখ বেঁচে গেছে। দেখা গেছে অন্য তেমন কোন আঘাত তার দেহে নেই।’ বলল মারেভার মা। ‘ওদিকে পিকনিকের অবস্থা কি খালাম্মা?’ আহমদ মুসা বলল। ‘খবর পেয়েই আমরা অনেকে গাড়ির পেছনে পেছনে ছুটে এসেছি। ওদিকের খবর জানি না। ভালোও লাগছে না। এখন বাড়ি ফিরতে চাই।’ বলল মারেভার মা। ‘না খালাম্মা, চলুন পিকনিকে। সবাই নিশ্চয় অপেক্ষা করছে। তা ছাড়া আমারও ক্ষুধা পেছেছে।’ আহমদ মুসা বলল। আহমদ মুসার কথা শুনেই হঠাৎ জেগে উঠার মত সচেতন হয়ে উঠল মারেভার মা। তাকাল মারেভার দিকে। ‘চল মা পিকনিকে। স্যার আছেন আর ভয় নেই।’ বলে মারেভা উঠে দাঁড়াল। ‘মারেভা, পুলিশ তোমাদের বক্তব্য নিয়েছে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘আমার বক্তব্য নিয়েছে। তেপাও-এর কথাও রেকর্ড করেছে। মাহিন তার ষ্টেটমেন্ট পুলিশকে আগেই দিয়েছে।’ বলল মারেভা। ‘গুড, এ দিকের কাজ তো শেষ। আমরা তাহলে চলি পিকনিকের দিকে। মারেভা, খালাম্মা আমাদের গাড়িতে আসতে পারেন। পেছনের তিন সীট তো খালিই আছে।’ আহমদ মুসা বলল। মারেভা ও মারেভার মা গিয়ে গাড়িতে উঠল। পিকনিকের যারা এদিকে এসেছিল তারা সবাই ছুটল পিকনিক স্পটের দিকে। হাইওয়ে থেকে উপত্যকার রাস্তায় চলতে শুরু করেছে আহমদ মুসার গাড়ি। উপত্যকাতেই পিকনিক পাহাড়টা। গাড়ি চলছে। পেছন থেকে মারেভার মা বলল, ‘ধন্যবাদ দিয়ে ঋণ শোধ হবে না। তাই ধন্যবাদ দেব না। মারেভার কাছ থেকে আজকের ঘটনা সবই শুনেছি। তোমার নিজের কথাও তোমাকে এখন ভাবতে হবে যে বেটা। তুমি নিজের কথাও তোমাকে এখন ভাবতে হবে যে বেটা। তুমি কিন্তু ওদের টার্গেট। তোমার খোঁজেই কিন্তু ওরা আজ এসেছিল মারেভা ও মাহিনের কাছে।’ বলল মারেভা মা। ‘আমাকে পায়নি। আমাকে না পেয়েই কি তাহলে মারেভা ও মাহিনকে কিডন্যাপ করতে চেয়েছিল।’ জিজ্ঞাসা মুসার। ‘তা নয় বেটা, ওরা এস একটু আড়ালে পেয়ে গিয়েছিল মারেভা ও মাহিনকে। ওরা মারেভা ও মাহিনের কাছে তোমার পরিচয় কি, বাড়ি কোথায়, কোথায় উঠেছ, কত দিন থাকবে? এসব বিষয় জিজ্ঞাসা করেছিল। ওরা নিজদেরকে মার্কিন গোয়েন্দা হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল। মারেভা ও মাহিন তাদের প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়েছে তোমার কোন তথ্যই তাদের দেয়নি। এ নিয়েই হট কথাবার্তা। এরই পরিণতিতে তারা মারেভা ও মাহিনকে কিডন্যাপ করার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে তাদের সাথে ধ্বস্তাধ্বস্তি শুরু হয়। তখন আশে পাশের লোকরা টের পেয়ে যায়। বেগতিক দেখে মাহিনকে ছেড়ে দিয়ে মারেভাকে টেনে হেঁচড়ে গাড়িতে তুলে নিয়ে চম্পট দেয়। আমরা কয়েকজন গাড়ির পিছু পিছু ছুঁটতে থাকি। গাড়ি নেবার কথা আমাদের খেয়াল হয়নি। গাড়িটি বিস্ফোরিত হবার পরপরই আমরা ওখানে পৌঁছি। মারেভাকে পেয়ে যেন দেহে প্রাণ ফিরে পাই। শুনলাম তুমি দুষ্কৃতকারীদের ফলো করেছ।’ বলল মারেভা মা। আহমদ মুসা ভাবল ওরা তাহলে টার্গেট বদলেছে। ওদের হাত থেকে শিকার যে কেড়ে নিয়েছে, তাদের কয়েকজনকে যে গুলিবিদ্ধ করেছে, তার পরিচয় ওরা চায়। এমন ঘটনা বোধ হয় ওদের এটাই প্রথম। তাই প্রতিশোধ নেবার বিষয়টা ওদের কাছে বড় হয়ে উঠেছে। কিন্তু আজ আবার তো সেই ঘটনাই ঘটল। আজও শিকার তাদের হাত ছাড়া হলো। হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘খালাম্মা ভাববেন না। এবার আমি ওদের টার্গেট। ওরা মারেভাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল আমার সন্ধান নেবার জন্যে। আজকেও ওরা পরাজিত হয়েছে, ব্যার্থ হয়েছে মারেভাকে কিডন্যাপ করতে। এরপর ওরা শিখ ড্রাইভারেরও সন্ধান চাইতে পারে মারেভার কাছে।’ ‘তাহলে বিপদ তো মারেভার থাকছেই। আমার ভয় করছে বেটা। প্রত্যেক দিন তো তুমি থাকবে না মারভাকে রক্ষা করতে।’ বলল মারেভার মা। ‘এবার ওরা যোগাযোগ করলে মারেভা তুমি আমার যে পর্যটক পরিচয় জান, তা এবং আমি কোথায় থাকি সব বলে দিও। আমি চাই ওরা আমার কাছে আসুক। ওদের সাক্ষাত, ওদের ঠিকানা আমার দরকার।’ আহমদ মুসা বলল। ‘এটাই বুঝি হবে স্যারের প্রতি আমার দায়িত্ববোধ! দু’দুবার যিন আমার প্রাণ বাঁচালেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, তার প্রতি এটাই বুঝি বলল না।’ বলল মারেভা। ‘মারেভা আজ তোমার কিডন্যাপারদের পিছু নিয়ে আমার বিরাট লাভ হয়েছে। আমি যাদের সন্ধানে তাহিতি এসেছি। এরা তারাই। মাহিনের কোম্পানি তাদেরই অংশ। আজ ওদের পরিচয় সর্ম্পর্ণ পরিষ্কার হয়ে গেছে। এখন ওদের পরিচয় যত জানতে পারি ততই আমার লাভ। সম্ভব হলে আমি কালকেই তাহানিয়া দ্বীপটিতে যাব।’ আহমদ মুস বলল। ‘আমি বুঝেছি স্যার। কিন্তু এর ফলে আপনার বিপদে পড়ার সম্ভবনা আছে। যদি তা ঘটে তাহলে আমি নিজেকে মাফ করতে পারবো না স্যার।’ বলল মারেভা। তাহলে শোন মারেভা, তুমি ও মাহিন কিছুদিন অন্তত বাইরে চলাফেরা বন্ধ করে দাও। আমার সাথে যখন দরকার হবে, তখন আমি তোমাদেরকে বাসা থেকে তুলে নেব। আর তোমাদের কোন কোন সময় ছদ্ধবেশ নেয়ার প্রয়োজন হতে পারে, ঝামেলা এড়াবার জন্যে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘স্যার, আপনি কি সত্যি কাল তাহানিয়া দ্বীপে যাচ্ছেন?’ বলল মারেভা। ‘চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেইনি। চিন্তা করে দেখি।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আমি ও মাহিন কি যাচ্ছি আপনার সাথে?’ বলল মারেভা। ‘পর্যটনে গেলে গাইডরা অবশ্যই যাবে। আর যদি অন্য কোন উদ্দেশ্য যাই, তাহলে গাইডরা সাথে যাবার প্রশ্ন নেই।’ আহমদ মুসা বলল। মারেভা প্রতিবাদে কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু গাড়িটা দাঁড়িয়ে গেল। এবার গাড়ি থেকে নেমে পাহাড়ের পিকনিক স্পটে উঠেতে হবে। গাড়ি থেকে সবাই নামল। পাহাড়ে ওঠার জন্য এগোলো সবাই। ৭ তাহানিয়া দ্বীপ তন্ন তন্ন করে খুঁজল আহমদ মুসা। কিন্তু সন্দেহ করার মত কিছুই পেল না। তাহানিয়া একটা নিরেট অ্যাটল দ্বীপ। কোন জনবসতি নেই এই দ্বীপ। তবে এই অ্যাটল দ্বীপ একটা ট্যুরিষ্ট স্পট। প্রায় ৭৫ টির মত অ্যাটল দ্বীপ নিয়ে গঠিত তোয়মতো দ্বীপ পুঞ্জে যে ট্যুরিষ্ট রুট রয়েছে তার একটা কেন্দ্র এই তাহানিয়া। বিচিত্র রংয়ের কোরাল ও মাছ দেখা এবং দীর্ঘ লেগুনের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্যে পর্যটকরা এখানে আসেন। কিন্তু তাহানিয়া অ্যাটলের চার প্রান্ত ঘিরে মাটির যে সীমান্ত রয়েছে তা এতই সংকীর্ণ যে সেখানে কোন স্থাপনা তৈরিই সম্ভব নয়। সুতরাং এ অ্যাটলে কোন স্থাপনা গড়ে ওঠার কোন প্রশ্নই নেই। মাহিনের কোম্পানির যে সাপ্লাই গোডাউন তা তাহানিয়ার পশ্চিম সীমানার বেশ কিছুটা প্রশস্ত। ঐ স্থানটিতেই গড়ে তোলা হয়েছে দ্বিতল সাপ্লাই গোডাউন। গোডাউনটিতে এসি লাগানো। বোটে বসেই দেখছিল আহমদ মুসা তাহানিয়া অ্যাটল দ্বীপকে। আহমদ মুসার পরনে খৃষ্টান ফাদারের পোষাক। তামাহি মাহিনের পরনেও তাই। আর মারেভা পরছে খৃষ্টান ‘নান’-এর পোষাক। ‘মারেভা, মাহিন! মিশন বোধ হয় আমার ব্যর্থ হলো। তাহানিয়া তো দেখছি সর্ব প্রকার বসবাসের অযোগ্য একটা অ্যাটল আচ্ছা, তোমরা কি জান, এই তাহানিয়া দ্বীপের মালিক কে?’ আহমদ মুসা বলল। ‘সব দ্বীপের মালিক তো ফরাসি সরকার। তাহানিয়ার মালিকও তারাই হবেন।’ বলল তামাহি মাহিন। ‘তোমাদের কোম্পানি তাহানিয়াতে এভাবে গোডাউন তৈরি করল কিভাবে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘এভাবে স্থাপনা গড়ার জন্য কোন অ্যাটলের অংশ বিশেষ, এমনকি পুরো অ্যাটলও লীজ নেয়া যায়। নিশ্চয় কোম্পানি তাহানিয়ার এই জায়গাটা গোডাউন তৈরির জন্য লিজ নিয়েছে। আমি শুনেছি, পাশের ছোট্ট অ্যাটল মতুতংগারর গোটাটাই তার লিজ নিয়েছে।’ বলল তামাহি মাহিন। ‘মতুতুংগা গোটাটাই লিজ নিয়েছে? কোনটা সে দ্বীপ?’ আহমদ মুসা বলল। তার চোখের অনুসন্ধিৎসা তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। ‘তাহানিয়ার দক্ষিণ পাশে একেবারে লাগোয়া। বোটে দাঁড়ালেও অ্যাটলটা আপনার চোখে পড়বে।’ বলল তামাহি মাহিন। ‘সে অ্যাটল দ্বীপটা কেমন? ল্যান্ড বেল্ট কেমন সে অ্যাটলের?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। প্রবল আগ্রহ ঝরে পড়ল তার কন্ঠে। ‘স্যার, বলেছি তো দ্বীপটা তাহানিয়ার প্রায় চার ভাগের এক ভাগ। অ্যাটলের চার পাশের ল্যান্ড বেল্টের আয়তন তাহানিয়ার চেয়ে ভাল নয়। মতুতুংগা নামে এই অ্যাটল দ্বীপটিতে মানুষ বাস করে না।’ বলল তামাহি মাহিন। ‘তাহলে তোমাদের কোম্পানি ছোট্ট এই অ্যাটলটি কিনল কেন?’ আহমদ মুসা বলল। ‘আমিও বুঝতে পারছি না কিনল কেন? ঐ দ্বীপ এমন কিছু নেই যা কাজে লাগতে পারে, অর্থকরি হতে পারে।’ তামাহি মাহিনের এই কথাগুলো আহমদ মুসার কানে গেল না। গভীর চিন্তায় ডুবে গেছে সে। তামাহি মাহিনের কোম্পানিই যে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট তাতে আর কোন সন্দেহ নেই। তাদের ঘাঁটি যে তোয়ামতো দ্বীপপুঞ্জের কোন অ্যাটলে তাতেও কোন সন্দেহ নেই। এই তাহানিয়া দ্বীপ নিয়ে কোন রহস্য আছে। তাও বলা যায় নিশ্চিত করেই। এই দ্বীপে এই ছোট বেঢপ গোডাউন এখানে হলো কেন? এখান শাক-শব্জির চালান কোথায় যায়? গোডাউন এখানে হলো কেন? তাহলে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের সেই ঘাঁটি আশে-পাশেই কোথাও! মানব বসতিহীন, উপযুক্ত ভূমির সুযোগ নেই এমন ছোট এই অ্যাটল মতুতুংগা ওরা লীজ নিল কেন? এসব প্রশ্নের জবাব অবশ্যই আছে। কি সে জবাব? আহমদ মুসা যখন ভাবনা আর অনেক প্রশ্নের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে, তখন তার পাশের ব্যাগ থেকে ভেসে আসা মাল্টিওয়েভ সিগন্যাল মনিটরিং (MOSM) বিপ বিপ শব্দ করে তার ভাবনার জাল ছিঁড়ে দিল। জেগে ওঠা বা সতর্ক হবার এক প্রচন্ড প্রবাহ খেলে গেল তার সারা দেহে। এই মাল্টিওয়েভ সিগন্যাল মনিটরিংটি (MOSM) অ্যাকটিভ করেছিল। মাল্টিওয়েভ মনিটরিং এর বিপ বিপ শব্দ শুনে চমকে উঠল আহমদ মুসা। অনেক পরে হলেও প্রয়োজনীয় এ যন্ত্রটির মিষ্টি বিপ বিপ শব্দ তার কানে বাজে। কিন্তু এখানে বিপ বিপ শব্দ আসবে কোথেকে? চারদিকে অথৈ আদিগন্ত সাগর। চারদিকের অ্যাটলগুলেত তেমন জনবসতিই নেই, ওয়েব সিগন্যাল কোথা থেকে আসবে? পাশের ব্যাগ থেকে মাল্টিওয়েভ মনিটরিং ‘মম’ বের করে নিয়ে কল অন করে রেকর্ডে চাপ দিয়ে কানে ধরল। একটা শক্তিশালী কন্ঠের স্পষ্ট কথা ভেসে এল, ‘SOS’ সেভ আওয়ার সোল, উই আর সেভেনটি সিক্স (আমাদের বাঁচান, আমরা ৭৬জন)।’ কথাটা উচ্চারণের পরেই আকস্মিক তা বন্ধ হয়ে গেল। যেন সশব্দে কিছু আছড়ে পড়ে লাইন কেটে গেল। আহমদ মুসা বার বার হ্যালো করে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করলো, কিন্তু লাইন আর ফিরে এলো না। হতাশ আহমদ মুসা ‘সেভ’ বাটনটি টিপে ‘মম’টি রেখে দিল। স্তম্ভিত বাকহীন অবস্থা আহমদ মুসার। তার শূন্য দৃষ্টি সামনে প্রসারিত। এই ‘এস ও এস’ কাদের আর্তনাদ? ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেট যাদের আটক রেখেছে, তাদের সংখ্যা তো এ রকমই। কোথেকে এল এই এস ও এস? তা এক বর্গমাইলের মধ্যে হবে নিশ্চয়। এর অর্থ ই অ্যাটল দ্বীপপুঞ্জেরই কোন অ্যাটল থেকে এসেছে এই এস ও এস। বিস্ময় ও উদ্বেগ ভরা দৃষ্টি নিয়ে মারেভা ও মাহিন তাকিয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে। তাদের মনেও অনেক প্রশ্ন, তাদের স্যারকে এখানে কে ম্যাসেজ পাঠাল। হটাৎ তা আবার কেটে গেল? কল পাবার পর তাদের স্যার এমন স্তম্ভিত ও বাকহীন হয়ে গেল কেন? কখনও কোন বিপদেই তো তাকে এমন অবস্থায় দেখিনি! অস্বাভাবিক একটা নিরবতা। নিরবতা ভাঙল মারেভাই। বলল, ‘স্যার, কোন খারাপ কিছু? আমরা কি জানতে পারি?’ মুখ তুলল আহমদ মুসা। মুখ তার গম্ভীর। বলল, ‘আমার মাল্টিওয়েভ মনিটরিং-এ একটা ‘এস ও এস’ ধরা পরেছে। আমি সেটা নিয়েই ভাবছি।’ ‘এস ও এস কি?’ এক সাথেই বলে উঠল মারেভা ও মাহিন। আহমদ মুসা তার মাল্টিওয়েভ মনিটরিং-’মম’ তুলে নিয়ে মেসেজ অপশনে গিয়ে ‘প্লে’তে চাপ দিয়ে লাউড স্পীকার অন করল। বেশ উঁচু শব্দেই এবার ‘এস ও এস’ স্পষ্ট কানে এল। ‘ও গড! ৭৬জন মানুষের জীবন বিপন্ন? কিন্তু লোকেশন তো বলল না?’ বলল তামাহি মাহিন। ‘তার আগেই তার কন্ঠ বন্ধ হয়ে গেছে। যে অয়্যারলেস বা যে মাধ্যমে কথা বলছিল তা হয়তো তার হাত থেকে ফেলে দেয়া হয়েছে। কথার পরবর্তী শব্দগুলো একথাই বলে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘সর্বনাশ! তাহলে বন্দী কিছু লোকের ‘এস ও এস’ এটা।’ বলল মারেভা। তার চোখে মুখে উদ্বেগ। ‘অবশ্যই মারেভা।’ আহমদ মুসা বলল। বিস্ময় বেদনামিশ্রিত স্থির দৃষ্টি মাহিনের আহমদ মুসার দিকে। বলল সে, ‘এরা কারা স্যার? এর কি তারা যাদের খোঁজে আপনি এ্রখানে এসেছেন?’ ‘আমি নিশ্চিত মাহিন এরা তারাই। এই অ্যাটল দ্বীপপুঞ্জে তারা ছাড়া এত সংখ্যায় বিপদগ্রস্থ হবার আর কেই নেই।’ আহমদ মুসা বলল। আতংক ফুটে ওঠে মারেভা ও মাহিন দু’জনের মুখে চোখেই। মুখ শুকিয়ে গেছে তাদের। বলল মারেভা কম্পিত কন্ঠে আস্তে আস্তে, ‘এত ষড়যন্ত্রের ঘাঁটি আমাদের অ্যাটলের কোথাও? কিন্তু এমন জায়গা কোথায় স্যার? এই এস ও এস কোথেকে আসল, এই দ্বীপপুঞ্জ থেকেই যে আসল, কি করে বুঝলেন?’ ‘আমার এই মাল্টিওয়েভ সিগন্যাল মনিটরিং-এর রেঞ্জ এক বর্গমাইল। এক বর্গমাইলের ভেতরের সিগনাল বা মেসেজই শুধু এই মনিটরে ধরা পড়ে। তার মানে এই এস ও এস এসেছে আমরা যেখানে বসে আছি তার চারদিকের এক বর্গমাইল এলাকার যে কোন এক স্থান থেকে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘তাহলে হতে পারে স্যার, আমরা ষড়যন্ত্রের আশে পাশেই আছি।’ বলল মারেভা। ভীত ও শুকনো কন্ঠ তার। ‘স্যার, কোন উপায় আছে, মেসেজের উৎস স্থানটিকে লোকেট করার।’ উদ্বেগ জড়িত ফিসফিসে কন্ঠে বলল তামাহি মাহিন। ‘মেসেজ বা সিগনাল চলা অবস্থায় এর উৎস চিহ্নিত করার সহজ ব্যবস্থা আছে। কিন্তু ওল্ড মেসেজ বা সিগন্যালের উৎস চিহ্নিত করতে হলে একটা হলে একটা অংক কষতে হবে। সেটাই আমরা এখন করব।’ বলে আহমদ মুসা তাকাল মারেভার দিকে। বলল, ‘কাগজ কলম নাও মারেভা।’ মাল্টিওয়েভ সিগন্যাল সিগন্যাল মনিটরিং-এ আবার মনোযোগ দিল আহমদ মুসা। এস ও এস মেসেজটি আবার অন করে সাউন্ড অপশনে গিয়ে অটোকাট বাটন চেপে দেখল শতভাগ সাউন্ডের ৭৫ ভাগ শক্তি অক্ষত আছে। তার মানে কাট হয়েছে ২৫ ভাগ। আহমদ মুসা আবার তাকাল মারেভা দিকে। বলল, ‘আমার এই মাল্টিওয়েভ মনিটরিং-এ সাইন্ডের উৎসে সাইন্ডের শক্তি থাকে হানড্রেড পারসেন্ট। আর সাউন্ডের উৎস থেকে এক পয়েন্ট মানে এক মাইল দূরে এই সাউন্ডের মুভিং পাওয়ার জিরো। এখন হিসেব করো সাউন্ডের পঁচিশ ভাগ মুভিং পাওয়ার যদি লষ্ট হয়, তাহলে পঁচিশ ভাগ সাউন্ড লষ্ট হওয়ার উৎস থেকে সাউন্ডের আসল উৎসটা কত দূরে।’ ‘এ আর হিসাব কি করবো স্যার। সোজা হিসাব, উৎসটি চারশ চল্লিশ গজ দূরে।’ ‘৪৪০ গজ মানে উৎসটি এখান থেকে ১৩২০ ফুট দূরে। ধন্যবাদ মারেভার।’ বলে আহমদ মুসা মাল্টিওয়েভ সাউন্ড মনিটরিং স্ক্রিণে আবার চোখ নিবদ্ধ করল। এস ও এস মেসেজের অপশনে আবার গিয়ে ডাইরেক্ট বাটনে চাপ দিল। সংগে সংগেই স্ক্রিনে ‘শূন্য এস শূন্য’ (OSO) বর্গ-অংক ভেসে উঠল। মুখ উজ্জল হয়ে উঠল আহমদ মুসার। বলল, ‘আল-হামদুল্লিহ!’ মারেভা, মাহিন উৎসটি এখান থেকে একদম সোজা দক্ষিণে।’ মারেভা ও মাহিন অনেকটা চমকে উঠেই যেন সোজা হয়ে বসল। তাদের চোখে মুখে ভয় ও আনন্দের অদ্ভূত এক মিশ্র দৃশ্য। তাকাল একে-অপরের দিকে। তারপর তাকাল আহমদ মুসার দিকে। দুই জনের মুখ থেকেই এক বেরিয়ে এল, ‘সোজা দক্ষিণে এই রকম দূরত্বে তো ‘মতুতুংগা’ ছাড়া আর কোন দ্বীপ নেই। প্রায় সমদূরত্বের তেপেতো দ্বীপ সোজা দক্ষিণে নয় দক্ষিণ-পূর্বে।’ ‘হ্যাঁ মারেভা, মাহিন! আমি যে দ্বীপের সন্ধানে এসেছি সে দ্বীপ এই মতুতুংগা।’ বলল আহমদ মুসা। ‘এস ও এস-এর দ্বীপ, সেই ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের দ্বীপ তাহলে মতুতুংগা! বলল মারেভা ও মাহিন দু’জনে এক সাথেই। তাদের চোখে মুখে আতংক ও আশার এক অদ্ভুত দৃশ্য।’


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৩২৩ জন


এ জাতীয় গল্প

→ একটি দামি উপহার
→ মৃত সাগর (Dead Sea)-আল্লাহ প্রদত্ত একটি শাস্তি
→ উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) এর একটি ঘটনা এবং আমাদের জন্যে শিক্ষা
→ ♥নেকলেস♥আমার প্রিয় একটি গদ্য
→ আমার মা (একটি সরল গল্প)
→ একটি লাল তারা
→ ছোট্ট উপহার একটি চিরকুট
→ ভুতের একটি মজার গল্প
→ মন ভালো করে দেয়া একটি গল্প
→ একটি ফালতুচিকিৎসার কাহিনি।

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...