Deprecated: mysql_connect(): The mysql extension is deprecated and will be removed in the future: use mysqli or PDO instead in /var/sites/g/golperjhuri.com/public_html/gj-con.php on line 6
মৃত্যুক্ষুধা-পনেরো

যাদের গল্পের ঝুরিতে লগিন করতে সমস্যা হচ্ছে তারা মেগাবাইট দিয়ে তারপর লগিন করুন.. ফ্রিবেসিক থেকে এই সমস্যা করছে.. ফ্রিবেসিক এ্যাপ দিয়ে এবং মেগাবাইট দিয়ে একবার লগিন করলে পরবর্তিতে মেগাবাইট ছাড়াও ব্যাবহার করতে পারবেন.. তাই প্রথমে মেগাবাইট দিয়ে আগে লগিন করে নিন..

সুপ্রিয় গল্পের ঝুরিয়ান গন আপনারা শুধু মাত্র কৌতুক এবং হাদিস পোস্ট করবেন না.. যদি হাদিস /কৌতুক ঘটনা মুলক হয় এবং কৌতুক টি মজার গল্প শ্রেণি তে পরে তবে সমস্যা নেই অন্যথা পোস্ট টি পাবলিশ করা হবে না....আর ভিন্ন খবর শ্রেনিতে শুধুমাত্র সাধারন জ্ঞান গ্রহণযোগ্য নয়.. ভিন্ন ধরনের একটি বিশেষ খবর গ্রহণযোগ্যতা পাবে

মৃত্যুক্ষুধা-পনেরো

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মিশকাত (১৯১ পয়েন্ট)



শৃঙ্খলাবদ্ধ আনসারকে দেখেই উন্মত্ত জনতা বিপুল জয়ধ্বনি করে উঠল। আনসার তাদের হাসিমুখে নমস্কার করে বললে, “তোমরা ফিরে যাও। ভয় নেই, আমার ফাঁসি হবে না। আবার আমি ফিরে আসব তোমাদের মাঝে।” একটু থেমে উদ‍্‍গত অশ্রু কষ্টে নিরোধ করে বললে, “আমার নিজের জন্য কোনো দুঃখ নেই ভাই, কারণ আমার জন্য দুঃখ করবার কেউ নেই –” অমনই সহস্র কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে উঠল, “আছে, আছে! আমরা আছি!” আনসার হেসে বললে, “জানি, তোমরা আছ। কিন্তু তোমরা তো আমার জন্য কাঁদবার বন্ধু নও! আমি যদি পরাজিতই হয়ে থাকি, তোমরা জয়ী হয়ে আমার সেপরাজয়ের লজ্জা মুছে দেবে।” অমনই সহস্র কণ্ঠে ধ্বনি উঠল, “নিশ্চয়, নিশ্চয়।” পুলিশ সাহেব অসহিষ্ণু হয়ে উঠতেই আনসার বললে, “ভয় পাবেন না, আমি ওদের খেপিয়ে তুলব না, শান্তই করব।” তারপর জনগণের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল, “বন্ধুগণ! আমার বিদায়কালে তোমাদের প্রতি আমার একমাত্র অনুরোধ, তোমরা তোমাদের অধিকারের দাবি কিছুতেই ছেড়ো না। তোমাদেরও হয়তো আমার মতো করেই শিকল পরে জেলে যেতে হবে, গুলি খেয়ে মরতে হবে, তোমরাই দেশের লোক তোমার পথ আগলে দাঁড়াবে, সকল রকমে কষ্ট দেবে, তবু তোমরা তোমাদের পথ ছেড়ো না, এগিয়ে যাওয়া থেকে নিবৃত্ত হোয়ো না। আগের দল মরবে বা পথ ছাড়বে, পিছনের দল তাদের শূন্যস্থানে গিয়ে দাঁড়াবে। তোমাদের মৃতদেহের ওপর দিয়েই আসবে তোমাদের মুক্তি। অস্ত্র তোমাদের নেই, তার জন্য দুঃখ কোরো না। যে বিপুল প্রানশক্তি নিয়ে সৈনিকেরা যুদ্ধ করে, সেই প্রাণশক্তির অভাব যদি না হয় তোমাদের, তোমরাও জয়ী হবে। আর অস্ত্র বা নাই বলব কেন? কোচোয়ান! তোমার হাতে চাবুক আছে? বুনো ঘোড়াকে – পশুকে তুমি চাবুক শায়েস্তা কর, আর মানুষকে শায়েস্তা করতে পারবে না! রাজমিস্ত্রি! তোমার হাতের কন্নিক দিয়ে ফুটগজ দিয়ে এত বাড়ি-ইমারত তৈরি করতে পারলে, বুনো প্রকৃতিকে রাজলক্ষ্মীর সাজে সাজালে – পীড়িত মানুষের নিশ্চিন্তে বাস করার স্বর্গ তোমরাই রচে তুলতে পারবে। আমার ঝাড়ুদার, মেথর ভাইরা, তোমরাই তো নিজেদের অশুচি অস্পৃশ্য করে পৃথিবীর শুচিতা রক্ষা করছ, নিজে সমস্ত দূষিত বাষ্প গ্রহণ করে, আয়ুক্ষয় করে, আমাদের পরমায়ু বাড়িয়ে দিয়েছ, আমাদের চারপাশের বাতাসকে নিষ্কলুষ করে রেখেছ! তোমরা এত ময়লাই যদি পরিষ্কার করতে পারলে – তাহলে এই ময়লা-মনের ময়লা মানুষগুলোকে কি শুচি করতে পারবে না? তোমাদের মতো ত্যাগী করতে পারবে না? তোমাদের ওই ঝাড়ু দিয়ে ওদের বিষ-ময়লা ঝেড়ে ফেলতে পারবে না? – তুমি চাষা? তুমি যে হাল দিয়ে মাটির বুকে ফুলের ফসলের মেলা বসাও, সেই হাল দিয়ে কি এই অনুর্বর-হৃদয়, মানুষের মনে মনুষ্যত্বের ফসল ফলাতে পারবে না? ‍জনসংঘ মুহুর্মুহু জয়ধ্বনি করতে লাগল। সে আরও কী বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু পুলিশ সাহেব বাধা দিল। আনসার হেসে বললে, “ভয় নেই সাহেব! এ-রকম বক্তৃতা অনেক দিয়েছি, কিন্তু ওই জয়ধ্বনি ছাড়া ওদেরকে খেপিয়ে তুলতে পারিনি। আজও পারব না। খ্যাপানোর মানুষ আমার পিছনে আসছে! আমার মুখ তো বহুদিনের জন্যই এখন বন্ধ করে দেবে, যাওয়ার বেলায় না-হয় একটু আলগাই করলুম! যাক, আমি আর কিছু বলব না! এবার ওদের ফিরে যেতেই বলব!” বলেই জনসংঘের দিকে ফিরে বললে, “আমার অনুরোধ, তোমরা ফিরে যাও। আমার পিছনে যদি যেতে হয়, তো সে পথ শুধু ওই থানাটুকু বা তারও বেশি জেল পর্যন্ত, কিন্তু তোমাদের দেশ-লক্ষ্মীকে খুঁজতে হলে স্বর্ণ-লঙ্কা পর্যন্ত যেতে হবে। স্বর্গে উঠে যেতে হবে, পাতালে নেমে যেতে হবে।” ‍তারপর পুলিশের দিকে তাকিয়ে বললে: “এই বেচারারা তোমাদের আমাদের মতোই হতভাগ্য, দুঃখী। পেটের দায়ে পাপ করে, দেশদ্রোহী হয়। ওদের ক্ষমা করো, দুদিন পরে ওরাও আসবে তোমাদের কমরেড হয়ে। যে মৃত্যু-ক্ষুধার জ্বালায় এই পৃথিবী টলমল করছে, ঘুরপাক খাচ্ছে তার গ্রাস থেকে বাঁচবার সাধ্য কারুরই নেই। তোমরা মনে রেখো, তোমরা আমর উদ্ধারের জন্য এখানে আসনি, তোমাদের সে-মন্ত্র আমি কোনোদিনই শিখাইনি, তোমরা তোমাদের উদ্ধার করো – সেই হবে আমারও বড়ো উদ্ধার। তোমাদের মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে আমি হব মুক্ত। এসেছে, নমস্কার নাও, আমার দোষ ত্রুটি অপরাধ ক্ষমা করো, তারপর যদি আসতেই হয় আমার পথে, সংঘবদ্ধ হয়ে এসো আমার পিছনে। বিপুল বন্যার বেগে এসো, এক মুহুর্তের জোয়ারের রূপে এসো না। আমি ভেসে চললুম দুঃখ নেই, কিন্তু তোমরা এসো। নমস্কার!” উপস্থিত সকলেই জয়ধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে ললাটে কর ঠেকিয়ে সালাম ও নমস্কার করল। পুলিশ আনসারকে নিয়ে গেল! আশ্চর্য! কেউ আর বাধা দিল না! থানাতেও গেল না! বজ্রগর্ভ মেঘের মতো ধীর-শান্ত গতিতে নিজ পথে চলে গেল। যাওয়ার সময় সবচেয়ে মুশকিল হয়েছিল – লতিফাকে নিয়ে! সে কেবলই ঘন ঘন মূর্ছা যাচ্ছিল। আনসার যখন গেল তখনও সে মূর্ছিতা। আনসার নীরবে ধুলায় লুণ্ঠিতা তার ললাটে, শিরে বারবার হাত বুলিয়ে বলতে লাগল, “বুঁচি, ওঠ ওঠ। তুই অমন করিসনে। আমি আবার আসব।” আনসারের অশ্রু-সাগরে যেন অমাবস্যার রাতের জোয়ার উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল!… পরদিন প্রত্যুষে রানাঘাট স্টেশনে শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রহরী-বেষ্টিত অবস্থায় আনসার যখন গাড়িতে বদল করছিল, তখন হঠাৎ চোখ পড়ল অদূরের কয়েকটি যাত্রীর প্রতি! তারা আর কেউ নয়, মিস জোন্স, মেজোবউ, প্যাঁকালে এবং কুর্শি। মিস জোন্স এগিয়ে এসে হাসি চেপে বললে, “আপনার এ অবস্টা ডেখে দুঃখিট, মিস্টার আনসার!” আনসার হেসে বললে, “ধন্যবাদ! তারপর, ওদের নিয়ে কোথায যাচ্ছেন?” মিস জোন্স বললে, “বরিশালে! আপনাদের মেজোবউ তো কাল বেঁকে বসেছিল সে আর গির্জায় থাকবে না। আবার মুসলমান হবে, ঘরে ফিরে যাবে। সে কী কান্না, মিস্টার আনসার! কিন্তু আজ সকালে দেখি, এসে বললে, –সে এদেশে থাকতে চায় না! আজ কিন্তু সারাদিন কেঁদেছে ও! ওর মাথায় বোধ হয় ছিট আছে, মিস্টার আনসার! হ্যাঁ, আর আপনি শুনে বোধহয় খুশি হবেন, কাল প্যাঁকালেও আমাদের পবিত্র ধর্মে দীক্ষা নিয়েছে। কুর্শির সঙ্গে ওর বিয়ে হয়ে গেছে। জিশুখ্রিস্ট ওদের সুখী করুন! গুড বাই!” ট্রেন এসে পড়ল। আনসার দেখতে পেল ইঞ্জিনের অগ্নিচক্ষুর মতোই অদূরে দুটি চক্ষু জ্বলছে। মৃত্যু-ক্ষুধার মতো সে-চাউনি জ্বালাময়, বুভুক্ষু, লেলিহান। সে-চোখে অশ্রু নাই, শুধু রক্ত। ট্রেন ছেড়ে দিল। আনসার তার চোখের জলের ঝাপসা দৃষ্টি দিয়ে দেখতে পেল, প্লাটফর্মে, কাকে যেন অনেকগুলো লোক আর মিস জোন্স ধরাধরি করে তুলছে। রেলগাড়ির ধোঁয়ায় আনসারের চোখ এবং প্লাটফর্ম সব আচ্ছন্ন হয়ে গেল। সেই মাটির পুতুলের কৃষ্ণনগর! সেই ধুলা-কাদার চাঁদ-সড়ক! শুধু সড়কই আছে, চাঁদ নেই! সবাই বলে, দুদিনের জন্য চাঁদ উঠেছিল, রাহুতে গ্রাস করেছে! বলেই আশেপাশে তাকায়। “বিশ্বাসং নৈব কর্তব্য রাজকুলেষু!” সেই ‘ওমানকাৎলি’পাড়া, সেই বাগান, পুকুর, পথ-ঘাট, কোঁদল-কাজিয়া সব আছে আগেকার মতোই। শুধু যারা কিছুতেই ভুলতে পারে না তারা ছাড়া আর সকলেই মেজোবউ, কুর্শি, প্যাঁকালে, আনসার – সবাইকে, সব কিছুকে ভুলে গেছে। স্মরণ রাখার অবকাশ কোথায় এই নিরবচ্ছিন্ন দুঃখের মাঝে! অগাধ স্রোতের বিপুল আবর্তে পড়ে যে হাবুডুবু খেয়েছে, সে-ই জানে কেমন করে আবর্তের মানুষ এক মিনিট আগে হারিয়ে-যাওয়া তারই কোলের শিশু-সন্তানের মৃত্যু-কথা ভুলে আত্মরক্ষা চেষ্টা করে! নিত্যকার একটানা দুঃখ-অভাব-বেদনা-মৃত্যুপীড়া-অপমানের পঙ্কিল স্রোতে, মরণাবর্তে যারা ডুবে মরছে, তাদের অবকাশ কোথায় ক্ষণপূর্বের দুঃখ মনে করে রাখার? ওরা কেবলই হাত-পা ছুঁড়ে অসহায়ের মতো আত্মরক্ষা করতেই ব্যস্ত। কিন্তু জীবনের সকল আশা-ভরসায় জলাঞ্জলি দিয়ে যে মৃত্যুর মুখে নিশ্চিন্তে আত্মসমর্পন করে, এই শেষ নির্ভরতার চরম মুহূর্তে বুঝি-বা তারও স্মরণ-পথে ভিড় করে আসে – সেই চলে-যাওয়ার দল –যারা সারা জীবন তারই আগোপিছে তার প্রিয়তম সহযাত্রী ছিল। শোকে জরায়-অনাহারে দুঃখে প্যাঁকালের মা শয্যা নিয়েছে। সে কেবল বলে, “দেখ বড়োবউ, জন্মে অবধি এমন শুয়ে থাকার সুযোগ আর আরাম পাইনি … কাল থেকে এই একপাশেই শুয়ে আছি, মনে হচ্ছে এ ধারটা পাথর হয়ে গিয়েছে, তবু কী আরামই না লাগছে! … আর কারুর জন্যই ভাবি না, তোদের জন্যেও না, আমার জন্যেও না, কারুর জন্যেও না! … খোদা যা করবার করবেন! পানিতে লাঠি মেরে তাকে কেউ ফিরাতে পারে না! যা হওয়ার, তা হবেই!” – বলেই সে নিশ্চিন্ত-নির্বিকার চিত্তে আকাশের দিকে চেয়ে থাকে! হঠাৎ সে দার্শনিক হয়ে ওঠে, দুঃখ ভোলার বড়ো বড়ো কথা তার মুখ দিয়ে বেরোয় – যা জীবনে তার মুখ দিয়ে বেরোয়নি। বলেই সে নিজেই আশ্চর্য হয়ে যায়। প্রশান্ত হাসিতে মুখ-চোখ ছলছল করে ওঠে। ও যেন সারা রাত্রি ঝিমিয়ে-ঝিমিয়ে পোড়া তৈলহীন প্রদীপের সলতের মতো নিববার আগে হঠাৎ জ্বলে ওঠা! বড়োবউ চোখ মোছে। জল এলেও মোছে, না এলে লজ্জায় চোখ ঢাকার ছলনায় মোছে। ওইটুকু তো দুটো চোখ, কত জলই বা ওতে ধরে! যে রক্ত চুঁয়ে ওই চোখের জল ঝরে, সেই রক্তই যে ফুরিয়ে গেছে। মেজোবউয়ের পরিত্যক্ত সন্তান দুটি আঙিনায় খেলা করে; কেমন যেন নির্লিপ্তভাব ওদের কথায়-বার্তায় চলাফেরায় চোখে মুখে ফুটে ওঠে। মাতৃহারা বিহগ-শাবক যেমন অন্য পাখিদের সঙ্গে থেকেও দলছাড়া হয়ে ঘুরে ফেরে, কী যেন চায়, কাকে যেন খোঁজে – তেমনই! খানিক খেলা করে, খানিকক্ষণ কাঠ কুড়োয়, খানিক অলস ভাবে গাছের তলায় পড়ে ঘুমোয়, ঘুমিয়ে উঠে, আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবে, তারপর বুকফাটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ঘরে ফিরে। ঘরে এসেই কাকে যেন খোঁজে, কী যেন প্রত্যাশা করে, পায় না। বড়োবউয়ের ছেলেমেয়েরা ভাব করতে আসে, ভালো লাগে না। বড়োবউ আদর করতে আসে, কেঁদে ওরা হাত ছাড়িয়ে নেয়। অকারণ আখোট করে। সন্ধ্যার সঙ্গে-সঙ্গে ওরা আস্তে আস্তে রুগ‍্‍ণা শয্যাশায়ী দাদির কাছে এসে বসে। ছেলেটি গম্ভীরভাবে বলে, “দাদিমা, আজ ভালো আছিস?” বৃদ্ধা হেসে বলে, “আর দাদু, ভালো! এখন চোখ দুটো বুজলেই সব ভালো মন্দ যায়।” তারপর দার্শনিকের মতো শান্তস্বরে বলে, “দেখ দাদু, আমি চলে গেলে তোরা কেউ কাঁদিস না যেন। মানুষ জন্মালেই মরে। ছেলেমেয়ে, মা-বাপ কারুর কি চিরদিন থাকে?” শ্রীমান দাদু এ-সবের এক বর্ণও বোঝে না, হাঁ করে চেয়ে থাকে। মা-বাপের নাম শুনতেই ঢুলতে ঢুলতে খুকি বলে ওঠে, “দাদি, তুই আব্বার কাছে যাবি? আচ্ছা দাদি, আব্বা যেখানে তাকে সেইখেন বেশিদূর, না, মা যেখানে থাকে সেই বরিশাল বেশি দূর?” শান্ত বৃদ্ধা ছটফট করে ওঠে। একটা ভীষণ যন্ত্রণাকাতর শব্দ করে পাশ ফিরে শুয়ে বলে, “ওই বরিশালই বেশি দূর, ওই বরিশালিই বেশি দূর!” খুকি বুঝতে পারে না। তবু ক্লান্ত-কণ্ঠে বলে, “তাহলে আমি আব্বার কাছে যাব। আচ্ছা দাদি, আব্বার কাছে যেতে হলে কয়দিন বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়! তুই তো বিছানায় শুয়ে অসুখ করেছিস, তারপর সেখানে যাচ্ছিস! আমারও এইবার অসুখ করবে, তারপর আব্বার কাছে চলে যাব! মা ভালোবাসে না, খেরেস্তান হয়ে গিয়েছে! হারাম খায়! থুঃ! ওর কাছে আর যাচ্ছি না, হুঁ হুঁ!” বৃদ্ধা শুয়ে শুয়ে ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলে। মনে হয়, কামারশালে বুঝি পোড়া কয়লা জ্বালাতে হাপরের শব্দ হচ্ছে! দাওয়ার মাটিতে শুয়ে পড়ে জড়িতকণ্ঠে খুকি আবার জিজ্ঞাসা করে, “হেঁ দাদি, আব্বা যেখানে থাকে সেখানে সন্ধ্যাবেলায় কী খেতে দেয়। আমি বলি দুধ-ভাত, হান‍্‍পে বলে গোশ‍্‍ত-রুটি!”…কিন্তু দাদির উত্তর শোনার আগেই সে ঘুমিয়ে পড়ে! ছেলেটি জেগেই থাকে। কী সব ভাবে, মাঝে মাঝে রান্নাঘরের দিকে চায়। সেখানে অন্ধকার দেখে আর কিছু জিজ্ঞাসা করতে সাহস করে না। কিন্তু থাকতেও পারে না। আস্তে আস্তে উঠে বেরিয়ে যায়! দাদি চেঁচিয়ে ওঠে, “অ হান‍্‍পে, কোথায় যাচ্ছিস রে এই অন্ধকারে?” অন্ধকারের ওপার থেকে আসে, “মসজিদে শিন্নি আছে, আনতে যাচ্ছি।” বড়োবউ মসজিদের দ্বার থেকে কোলে করে আনতে চায়, সে ধুলায় গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে। বলে, “যাব না, আমি শিন্নি খাব, আমার বড্ড খিদে পেয়েছে গো! আমি যাব না।” মসজিদের ভিতর থেকে মউলবি সাহেবের কণ্ঠ ভেসে আসে। কোরানের সেই অংশ – যার মানে – “আমি তাহাদের নামাজ কবুল করি না, যাহারা পিতৃহীনকে হাঁকাইয়া দেয়!” মউলবি সাহেব জোরে জোরে পাঠ করেন, ভক্তরা চক্ষু বুজিয়া শোনে! অন্ধকার ঘরে ক্ষুধাতুর শিশুর মাথার ওপর দিয়ে বাদুড় উড়ে যায় – আসন্ন মৃত্যুর ছায়ার মতো! ঘুমের মাঝে খুকি কেঁদে ওঠে, “মাগো আমি আব্বার যাব না‌! আমি তোর কাছে যাব, বরিশাল যাব!” খন্ড অন্ধকারের মতো বাদুর দল তেমনই পাখা ঝাপটে উড়ে যায় মাথার ওপর। – রাত্রি শিউরে ওঠে! চলবে


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৩৮ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...