Deprecated: mysql_connect(): The mysql extension is deprecated and will be removed in the future: use mysqli or PDO instead in /var/sites/g/golperjhuri.com/public_html/gj-con.php on line 6
মৃত্যুক্ষুধা-আট

সুপ্রিয় পাঠকগন আপনাদের অনেকে বিভিন্ন কিছু জানতে চেয়ে ম্যাসেজ দিয়েছেন কিন্তু আমরা আপনাদের ম্যাসেজের রিপ্লাই দিতে পারিনাই তার কারন আপনারা নিবন্ধন না করে ম্যাসেজ দিয়েছেন ... তাই আপনাদের কাছে অনুরোধ কিছু বলার থাকলে প্রথমে নিবন্ধন করুন তারপর লগইন করে ম্যাসেজ দিন যাতে রিপ্লাই দেওয়া সম্ভব হয় ...

সুপ্রিয় গল্পের ঝুরিয়ান গন আপনারা শুধু মাত্র কৌতুক এবং হাদিস পোস্ট করবেন না.. যদি হাদিস /কৌতুক ঘটনা মুলক হয় এবং কৌতুক টি মজার গল্প শ্রেণি তে পরে তবে সমস্যা নেই অন্যথা পোস্ট টি পাবলিশ করা হবে না....আর ভিন্ন খবর শ্রেনিতে শুধুমাত্র সাধারন জ্ঞান গ্রহণযোগ্য নয়.. ভিন্ন ধরনের একটি বিশেষ খবর গ্রহণযোগ্যতা পাবে

মৃত্যুক্ষুধা-আট

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান ... (৩০ পয়েন্ট)



মেজোবউ হেসে বলে, “কিন্তু আমি যে ওতে খুশি হই মা। আমি খুশি হলে কি তিনি খুশি হন না? আচ্ছা মা, তুমি মউলবি সায়েবকে জিজ্ঞেস কর তো, গান করে তাঁকে ডাকলে, তাঁর কাছে কাঁদলে কি তিনি তা শোনেন না? বড়োবউ মুখ গম্ভীর করে বলে, “কোরান পড়ে না ডাকলে আল্লা কি শোনে রে মেজোবউ?” মেজোবউ হেসে ফেলে। তারপর আপন মনে আবার গুন গুন করে গান ধরে। প্যাঁকালে যেদিন গভীর রাত্তিরে কাউকে কিছু না বলে চলে যায় –সেদিন বিকেল পর্যন্তও সে জানত না যে চলে যাবে। সন্ধ্যায় সে ফিরছিল কাজ করে। সারাদিনের ক্লান্ত চরণ তার কখন যে তাকে টেনে কুর্শির বাড়ির সামনে নিয়ে এসেছিল, তা সে নিজেই বুঝতে পারেনি। হঠাৎ কার কণ্ঠস্বরে সে সচকিত হয়ে দেখলে বেড়ার ওধারে কুর্শি, এধারে রোতো কামার। সে চুপ করে দাঁড়িয়ে গেল পাশের আমগাছটার আড়ালে। রোতোর কী একটা কথার উত্তরে কুর্শি কচার একটা ছোট্ট কচি শাখা ভেঙে রোতোকে ছুঁড়ে মারলে, রোতোও হেসে হাতের একটা পান ছুঁড়ে মারলে কুর্শির বুক লক্ষ করে। রোতোর হাত-যশ আছে বলতে হবে। পানটা কুর্শির বুকেই গিয়ে পড়ল। কুর্শি নিমেষে সেটাকে লুফে নিয়ে মুখ পুরে দিলে। কিন্তু এরই মধ্যে চক্ষের পলকে কী যেন বিপর্যয় হয়ে গেল। হঠাৎ কোত্থেকে একটা কন্নিক এসে লাগল কুর্শির বাম কানের ওপরে, ঠিক কপালের পাশে। কুর্শি ‘মাগো’বলে মাটিতে পড়ল। ফিনিক দিয়ে রক্ত পড়তে লাগল। এর পর রোতোর আর কোনো উদ্দেশ পাওয়া গেল না। কুর্শি তখন অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। প্যাঁকালে কুর্শিকে পাথালি কোলে করে –যেমন করে বর তার রাঙা নববধূকে বাসি-বিয়ের দিন একঘর হতে আর এক ঘরে নিয়ে যায় তেমনই করে – বুকে জড়িয়ে তাদের বারান্দায় নিয়ে এল। বাড়ির সকলে তখন বেরিয়ে গেছে কোথায় যেন। বহুক্ষণ শুশ্রূষার পর কুর্শি চোখ মেলে চাইল। চেয়েই প্যাঁকালেকে দেখে আবার চক্ষু বুঁজে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেঁদে উঠল, ‘মাগো!’ প্যাঁকালে তার কোল থেকে কুর্শির মাথাটা একটা বালিশের ওপর রেখে উঠতে উঠতে বলল, “তোর বাবাকে বলিস আমি মেরেছি তোকে!” বলেই বেরিয়ে গেল–কুর্শির ক্ষীণ কণ্ঠস্বর তার পশ্চাতে ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর হয়ে মিলিয়ে গেল। পরের দিন ঘুম হতে উঠেই কুর্শি শুনলে, প্যাঁকালে চলে গেছে – ওদের বাড়িতে মরাকান্না পড়ে গেছে! শুনেই সে আবার মূর্ছিতা হয়ে পড়ল! কোথায় কী করে লাগল হাজার চেষ্টা করেও কুর্শির বাবা-মা জানতে পারলে না। কুর্শি কিছু বলে না, কেবল কাঁদে আর মূর্ছা যায়। কিন্তু সেরে উঠতে তার খুব বেশি দিন লাগল না। মাথার আঘাত তার যত শুকাতে লাগল, ততই তার মনে হতে লাগল, যেন ওই কন্নিকের ঘা বুকে গিয়ে বেজেছে। সে রোজ দিন গোনে আর ভাবে, আজ সে আসবেই। তার গা ছুঁয়ে দিব্যি করল যে দুদিন আগে রাগের মাথায় সে চলেই যদি যায়, তাহলেও তার ফিরতে দেরি হবে না। এ অহংকার তার আছে। আর রোতোর কথা? অমন বাজে ইয়ার্কি জোয়ান বয়সের ছেলে-মেয়ের দেখাশুনা হলেই দুটো হয়। আ মরণ! এ মিনসেকে বুঝি সে ভালোবাসতে গেল? তারপরেই লুটিয়ে পড়ে কাঁদে! বলে, “ফিরে আয় তুই, ফিরে আয়! তোরই দিব্যি করে বলছি, ওর সঙ্গে দুটো ইয়ার্কি দেওয়া ছাড়া আর কোনো সম্বন্ধ নাই আমার! ওকে আমি এতটুকুও ভালোবাসিনে!” আরও কত কী! ছেলেমানুষের মতো যা মুখে আসে, তাই বলে যায় আর কাঁদে। কিন্তু বেশি দিন এমন করে যায় না। ফুল ফোটে, শুকায়, ঝরে পড়ে। হৃদয়ও ফোটে, শুকায়, তারপর দলিত হয় তারই পায়ে –যাকে সে কোনো দিনই চায়নি। একমাস – দুমাস –তিন মাস যায়, প্যাঁকালে আর আসে না। তবে, খবর পাওয়া গেছে যে, সে কোলকাতায় কাজ করছে – রাজমিস্ত্রিরই কাজ। দুবার টাকাও পাঠিয়েছে বাড়িতে। কুর্শি একদিন মরিয়া হয়ে প্যাঁকালের বড়ো-ভাবিকে জিজ্ঞেস করল – সে কখন আসবে এবং চিঠিপত্র দেয় কি-না। বড়োবউ মুখ বেঁকিয়ে বললে, “কে জানে কখন আসবে!” কিন্তু এ খবরটা জানা গেল যে, চিঠিপত্তর মাঝে মাঝে দেয় বাড়িতে। কুর্শি আর শুনতে পারল না, মাথা ঝিম ঝিম করতে লাগল। কিন্তু কীসের জন্য তার এত ক্ষোভ, তা সে নিজেই বুঝে না। কেবল অসহায়ের মতো ছটফট করে মরে। চিঠি সে যে কেমন করে দেবে তাকে তা সে নিজেই ভেবে উঠতে পারে না। তবু রোজ মনে করে, বুঝি তার নামে আজ চিঠি আসবে। ক্রিশ্চান মেয়ে সে, মোটামুটি লেখাপড়া জানে, একটা চিঠিও হাতে কোনরকমে লিখতে পারে। মাঝে মাঝে কাগজ-পেনসিল নিয়ে বসেও লিখতে। কিন্তু লিখেই তার সমস্ত মুখ লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে, মন যেন কেন বিষিয়ে ওঠে নিবিড় অভিমানে। লেখা কাগজ টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে! মাঝে মাঝে ভাবে, খুব কঠিন হয়ে থাকলে বুঝি সে না এসে পারবে না। তারপর দুদিন তিনদিন মুখ ভার করে থাকে, রাস্তায় বেরোয়, গোলপুকুরে নাইতে যায় মুখ ভার করেই–সেখানে তিনটে বেজে যায়, কেউ আসে না। প্যাঁকালেদের ঘরের সামনে দিয়ে আসে যায়, এখন আর কেউ ফিরেও দেখে না। শুধু মেজোবউ তাকে দেখতে পেলে মুখ টিপে হাসে আর গান করে। কুর্শির শরীর-মন যেন রি-রি-রি-রি করতে থাকে রাগে। এতদিন তার সয়েছিল এই ভেবে যে, হাজার হোক সে-ই তো অপরাধী। অমন করে পর-পুরুষের সঙ্গে আলাপ করতে দেখলে কার না রাগ হয়! ভাবতেই জিভ কেটে লজ্জায় সে যেন মরে যায়! সেও তো পর-পুরুষ! রোতো যেমন সেও তো তেমনই! বিয়ে তাদের হয়নি, হতেও পারে না। তবু, মন তার এমনই অবুঝ যে, সে কেবলই কীসব অসম্ভব দাবি করে বসে তারই ওপর –বাইরের দিক থেকে যার ওপর কোনো দাবিই সে করতে পারে না। কিন্তু যত বড়োই অপরাধ সে করুক, তারই গা ছুঁয়ে তো সে দিব্যি করে বলেছিল যে, তাকে না বলে সে কোথাও যাবে না। সে না-হয় কিছু না-ই হল, মজিদের দিকে মুখ করে দিব্যি করেছিল! এত বড়ো কী অপরাধ করেছে সে যে, প্যাঁকালে মজিদেরও অপমান করতে সাহস করে সেই অপরাধের জ্বালায়! মন তার বেদনায় নিষ্ফল ক্রন্দনে ফেনিয়ে ওঠে। যত মন জ্বালা করে, তত বুক ব্যথা করে। সে বুঝি আর পারে না! রবিবার গির্জায় গিয়ে কাতরস্বরে প্রার্থনা করে, “জিশু, তুমি আমায় খুব বড়ো একটা অসুখ দাও, যেন শুনে সে ছুটে আসতে রাস্তা পায় না।” শুকিয়ে সে যেতে লাগল দিন দিন, কিন্তু বড়ো কিছু অসুখও হল না। প্যাঁকালেওএল না! কুর্শি এইবার যেন মরিয়া হয়ে উঠল। এইবার সে-যা হোক একটা কিছু করবে। এইবার সে দেখিয়ে দেবে যে, খেরেস্তান হলেও সে মানুষ। তাকে ছুঁয়ে দিব্যি করে যে সেই দিব্যির অপমান করে, তাকে সেও অপমান করতে জানে! সে ইচ্ছা করেই রোতো কামারের দোকানের সামনে দিয়ে একটু বেশি করে যাওয়া আসা করতে লাগল। সেই দুর্ঘটনার পর থেকে রোতো কিন্তু অতিমাত্রায় কাজের লোক হয়ে উঠেছে। এখন দিনরাত দোকানে বসে লোহা পেটে আর হাপর ঠেলে। কুর্শিকে দেখলে সে যেন এতটুকু হয়ে যায় – লজ্জায়, ভয়ে। কীসের এত লজ্জা, এত ভয় ওইটুকু মেয়েকে সে খুব ভালো করে যে বোঝে, তা নয়। কী যেন মস্ত বড়ো অপরাধের বোঝা জোর করে তার মাথাটা ধরে নিচু করে দেয়। কুর্শি তার পাশ দিয়ে হাঁটে, আর অমনি সে প্রাণপণ জোরে হাপর ঠেলতে থাকে। যেন সমস্ত বিশ্বটাকে সে-ই চালাচ্ছে। সমস্ত শক্তি দিয়ে জলন্ত লোহাটাকে নেহাই-এর ওপর রেখে পটতে থাকে। আগুনের ফুলকিতে তার মুখ আর দেখা যায় না। সেদিন হঠাৎ কুর্শি তার একেবারেই চোখের সামনে এসে পড়ল। সে কিন্তু হেসে উঠল, “আ মর ড্যাকরা! যেন চেনেনই না আমায়! তোর হল কী বল তো!” রোতো ঘেমে উঠে ভীত চোখের দৃষ্টিতে চারিদিকে চায়, তারপর আস্তে আস্তে বলে, “না ভাই, আর কাজ নেই। সেদিনের কথা মনে পড়লে আমার বুক আজও দুরুদুরু করে ওঠে!…শালা ডাকাত!..সে আবার আসছে কখন?” কুর্শি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে, “আর সে আসছে না। এলে টের পাইবে দেব মজাটা এইবার!” রোতো কিন্তু কথা খুঁজে পায় না। আমতা আমতা করে বলে, “আমি ইচ্ছে করলে শালাকে সেদিন গুঁড়িয়ে দিতে পারতুম, শুধু তোর জন্যেই দিইনি।” কুর্শি হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বলে, “মাইরি বলছিস, তুই তাকে মারতে পারবি এবার এলে? ওই কচার বেড়ায় ধারে -– যেখেনে সে আমায় কন্নিক ছুঁড়ে মেরেছিল, ওইখেনে ওকে মেরে শুইয়ে দিতে পারবি?” উত্তেজনায় তার মুখ দিয়ে আর কথা বেরোয় না। সে জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে থাকে। তার আন্দোলিত বুকের পানে তাকিয়ে রোতের রক্ত গরম হয়ে ওঠে। সে হঠাৎ কুর্শি হাত চেপে ধরে এসে। বলে, “এই তোকে ছুঁয়ে বলে রাখলাম কুর্শি, ওকে যদি ওইখেনে মেরে শুইয়ে না দিই, তবে আমি বাপের বেটা নই! একবার এলে হল শালা!” কুর্শি ঝাঁকানি দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, “মর হতচ্ছাড়া! বড়ো যে আস্পর্ধা তোর দেখছি! আমার হাত ধরেন এসে! একবার মেরেই দেখিস, পিঠের ওপর খ্যাংরার বাড়ি কেমন মিষ্টি লাগে!” সে আর বলতে পারে না; কান্নায় তার বুক যেন ভেঙে যায়! তারপর, দৌড়ে ঘরে গিয়ে ঢুকে বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে কাঁদতে থাকে। সন্ধ্যা নেমে আসে – তাদের গির্জার কালো পোশাক-পরা মিসবাবাদের মতো! একদিকে মৃত্যু, একদিকে ক্ষুধা। সেজোবউ আর তার ছেলেকে বাঁচাতে পারা গেল না। ওর শুশ্রূষা যেটুকু করেছিল সে শুধু ওই মেজোবউ আর ওষুধ দিয়েছিল মেম সায়েব – রোমান ক্যাথলিক মিশনারি। মেজোবউ সেজোর রোগ-শিয়রে সারারাত জেগে বসে থাকে। কেরোসিনের ডিবে ধোঁয়া উদগিরণ করে ক্লান্ত হয়ে নিবে যায়। অন্ধকারে বন্ধুর মতো জাগে একা মেজোবউ। আর পাথরের মতো স্থির হয়ে দেখে, কেমন করে একজন মানুষ আর একজন অসহায় মানুষের চোখের সামনে ফুরিয়ে আসে। সেজোবউ তার ললাটে মেজোবউয়ের তপ্ত হাতের স্পর্শ-ছোঁয়ায় চকিত হয়ে চোখ খোলে। বলে, “এসেছ তুমি?” তারপর শিয়রে মেজোবউকে দেখে ক্ষীণ হাসি হেসে বলে, “মেজো-বু, তুমি বুঝি? তোমার সব ঘুম বুঝি আমার চোখে ঢেলে দিয়েছ?” মেজোবউ নত হয়ে সেজোর চোখে চুমু খায়। সেজো মেজোবউয়ের হাতটা বুকের ওপর টেনে নিয়ে বলে, “মেজো-বু, তুমি কাঁদছ?” –তারপর গভীর নিশ্বাস ফেলে বলে, “কাঁদো মেজো-বু, মরার সময়েও তবু একটু দেখে যাই, এই পোড়ামুখির জন্যেও কেউ কাঁদছে। দেখো মেজো-বু, তুমি আমার জন্য কাঁদছ, আর তাই দেখে আমার এত ভালো লাগছে – সে আর কি বলব। ইচ্ছে করছে বাড়ির সব্বাই যদি আমার কাছে বসে এমনই করে কাঁদে, আমি তাহলে হেসে মরতে পারি। হয়তো বা বেঁচেও যেতে পারি। কিন্তু মেজো-বু, আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না। এই ছেলের ভাবনা? ওর মায়া কাটিয়েছি! কাল ওর বাবাকে দেখেছিলুম ‘খোয়াবে’, বললে, ‘খোকাকে নিতে এসেছি।’আমি বললুম, ‘আর আমায়?’সে হেসে বললে, ‘তোকে নয়।‘আমি কেঁদে বললুম, ‘যম তো নেবে, তুমি না নাও’!” মেজোবউ কান্না-দীর্ণ কণ্ঠে বলে, “চুপ করে ঘুমো সেজো, তোর পায়ে পড়ি বোনটি!” সেজো মেজোবউয়ের হাতটা গালের নীচে রেখে পাশ ফিরে শোয়। বলে, “কাল তো আর আসব না মেজো-বু কথা বলতে। ঘুমোব বলেই তো কথা কয়ে নিচ্ছি। এমন ঘুমুব যে, হু –ই ‘গোদা ডাঙায়’গিয়ে রেকে আসবে তিনগাড়ি মাটি চাপা দিয়ে। যেন ভূত হয়েও আর ফিরে আসতে না পারি!.. দেখো মেজো-বু, কাল সে যদি শুধু খোকাকে নিতে আসত, তাহলে কি হাসতে পারত অমন করে? আমায়ও নিয়ে যাবে, ও চিরটাকাল আমার সঙ্গে অমনই দুষ্টুমি করে কথা কয়েছে!…তোমার মনে আছে মেজো-বু, মরার আধঘন্টা আগেও আমায় কেমন করে বললে, ‘আমার সামনে তুই যদি এক্ষুনি মরিস, তাহলে আমার মরতে এত কষ্ট হয় না!…” শিয়রে প্রদীপ নিবু-নিবু হয়ে আসে। শুধু মেজোবউয়ের চোখ ভোর আকাশের তারার মতো চোখের জলে চিকমিক করে। বলে, “সেজো, তোর কিছু ইচ্ছে করছে এখন?” সেজো ধীর শান্তস্বরে বলে, “কিচ্ছু না। আর এখন কোনো কিছু পেতে ইচ্ছে করে না মেজো-বু! কাল পর্যন্ত আমার মনে হয়েছে, যদি একটু ভালো খাবার-পথ্যি পেতুম –তাহলে হয়তো বেঁচে যেতুম। খোকার মুখে তার মায়ের দু-ফোঁটা দুধ পড়ত। আর তো পাবে না বাছা আমার!” বলেই ছেলের গালে চুমু খায়। একটা আঁধার রাত যেন ডাইনির মতো শিস দিয়ে ফেরে। গাছপালা ঘরবাড়ি–-সব যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমুতে থাকে। তারাগুলোকে দেখে মনে হয় সহস্র হতভাগিনির শিয়রে নিবু-নিবু পিদিম। এরই মাঝে মাটির ঘরের মাটির শেজে শুয়ে একটি মানুষ নিবতে থাকে রিক্ত-তৈল মৃৎ-প্রদীপের মতো। তেল ওর ফুরিয়ে গেছে, এখন সলতেতে আগুন ধরেছে। ওটুকুও ছাই হতে আর দেরি নেই। সেজো মেজোবউয়ের হাতটা বাঁ-বুকে জোরে চেপে বলে, “দেখছ, মেজো-বু, বুকটা কীরকম ধড়ফড় করছে। একটা পাখিকে ধরে খাঁচায় পুরলে সে যেমন ছটফট করে বেরোবার জন্যে, তেমনই, না? উঃ! আমার যেন দম আটকে আসছে! মেজো-বু! বাইরে কি এতটুকুও বাতাস নেই?” মেজোবউ জোরে জোরে পাখা করে। সেজো মেজোবউয়ের পাখা-সমেত হাতটা চেপে ধরে, “থাক, থাক! ও বাতাসে কি আর কুলোয় মেজো-বু? সব সইত আমার, সে যদি পাশে বসে থাকত! আমি চলে যাচ্ছি দেখে সে খুব করে কাঁদত, তার চোখের পানিতে আমার মুখ যেত ভেসে!” আর বলতে পারে না। কথা আটকে যায়। মুখ দিয়ে নিশ্বাস নেয়। খোকা কেঁদে ওঠে। মেজোবউ কোলে নিয়ে দোলা দেয়, ছড়া গায় –“ঘুম আয়োরে নাইলো তলা দিয়া, ছাগল-চোরায় যুক্তি করে খোকনের ঘুম নিয়া।” ভোরের দিকে সেজোবউ ঢুলে পড়তে লাগল মরণের কোলে। মেজোবউ কাউকে জাগালে না। সেজোর কানে মুখ রেখে কেঁদে বললে, “সেজো! বোনটি আমার! তুই একলাই যা চুপটি করে। তোর যাওয়ার সময় আর মিথ্যে কান্নার দুখ্যু নিয়ে যাসনে!” সেজো শুনতে পেলে কিনা, সে-ই জানে। শুধু অস্ফুটস্বরে বললে, “খোকা…তুমি…” মেজোবউ সেজোর দুই ভুরুর মাঝখানটিতে চুমু খেয়ে বললে, “ওকে আমি নিলাম সেজো, তুই যা তোর বরের কাছে। আর পারিস তো আমায় ডেকে নিস!” মেজোবউ আর থাকতে পারল না –ডুকরে কেঁদে উঠল। দূরে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ভোরের নামাজের আহ্বান শোনা যাচ্ছিল –“আসসালাতু খায়রুম মিনান্নৌম। – ওগো জাগো! নিদ্রার চেয়ে উপাসনা ঢের ভালো। জাগো!” মেজোবউ দাঁতে দাঁত ঘষে বললে, “অনেক ডেকেছি আল্লা, আজ আর তোমায় ডাকব না।” সেজোর মুখ কিন্তু কী এক অভিনব আলোকোচ্ছ্বাসে আলোকিত হয়ে উঠল। সে প্রাণপণ বলে দুই হাত তুলে মাথায় ঠেকালে – মুনাজাত করার মতো করে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে গেল –কিন্তু তা তক্ষুনি ছিন্নলতার মতো এলিয়ে পড়ল তার বুকে। মেজোবউ মুগ্ধের মতো তার মৃত্যু-পাণ্ডুর মুখের শেষ জ্যোতি দেখলে –তারপর আস্তে আস্তে তার চোখের পাতা বন্ধ করে দিলে। প্রভাতের ফুল দুপুরের আগেই ঝরে পড়ল। মেজোবউ আর চুপ করে থাকতে পারল না। চিৎকার করে কেঁদে উঠল, “মাগো, তোমরা ওঠো, সেজ নেই…” প্রভাতের আকাশ-বাতাস হাহাকার করে উঠল – নেই – নেই – নেই! চলবে


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২২ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...