গল্পেরঝুড়ির এ্যাপ ডাউনলোড করুন - get google app
গল্পেরঝুড়ি ফানবক্স ! এখন গল্পের সাথেও মজাও হবে! কুইজ খেলুন , অংক কষুন , বাড়িয়ে নিন আপনার দক্ষতা জিতে নিন রেওয়ার্ড !

সুপ্রিয় গল্পের ঝুরিয়ান গন আপনারা শুধু মাত্র কৌতুক এবং হাদিস পোস্ট করবেন না.. যদি হাদিস /কৌতুক ঘটনা মুলক হয় এবং কৌতুক টি মজার গল্প শ্রেণি তে পরে তবে সমস্যা নেই অন্যথা পোস্ট টি পাবলিশ করা হবে না....আর ভিন্ন খবর শ্রেনিতে শুধুমাত্র সাধারন জ্ঞান গ্রহণযোগ্য নয়.. ভিন্ন ধরনের একটি বিশেষ খবর গ্রহণযোগ্যতা পাবে

সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান... জিজেতে আজে বাজে কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন ... অন্যথায় আপনার আইডি বা কমেন্ট ব্লক করা হবে... আর গল্প দেওয়ার ক্ষেত্রে গল্প দেওয়ার নিয়ম মেনে চলুন ... সার্বিকভাবে জিজের নীতিমালা মেনে চলার চেস্টা করুন ...

প্রেত

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Adom Ali (০ পয়েন্ট)



দুই কিবরিয়া ভাইয়ের সাথে পরিচয় হওয়ার পর রুমী অনেক যত্ন করে পাঠ্যবইয়ের বাইরে পড়াশোনা শুরু করেছে। পৃথিবী সম্পর্কে ওর ধারণা আজকাল পাল্টে গেছে। আগে মনে করতো যা ছাপা হয় বিশেষ করে বিদেশি পত্রপত্রিকায় সব বুঝি সত্যি। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের সংবাদপত্রগুলি যে খুব যত্ন করে পৃথিবীর খবর নিজেদের মনমতো করে পরিবেশন করে সাধারণ মানুষদের একটা ছাঁচের ভিতর ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে তা বোঝার পর সে তাদের অবিশ্বাস করা শুরু করল।বিদেশিরা ভালো বললে ভালো এবং বিদেশিরা খারাপ বললে খারাপ-এই ধরনের মতাবলম্বী লোকজনের সংখ্যা দেখে রুমী এই প্রথমবার বুঝতে পারে এ দেশের সত্যিকার সমস্যা কাদের মাঝে।পরীক্ষার আর ঠিক দশ দিন বাকি। রুমী নিজের পড়াশোনাতে খুব সন্তুষ্ট। অন্যদের মতো সে নির্দিষ্ট কয়টা প্রশ্নের উত্তর না শিখে পুরো বই পড়ছে। যদিও আজকাল সে প্রচুর বাইরের জিনিস পড়াশোনা করে, সপ্তাহে চারদিন দুটি করে টিউশনি করে তবু তার সময়ের অভাব হয় নি। পড়াশোনা একেবারে নেশার মতো হয়ে গিয়েছে। সবকিছু প্রথমবার পড়ে শেষ করতে অনেক সময় নেয়, দ্বিতীয়বার পড়তে আর তত সময় নেয় না। তৃতীয়বার পড়তে শুধু যেসময় আরও কম লাগে তাই নয় পড়ে প্রচণ্ড একটা আনন্দ হয়।রুমী ছোট একটা নোটবইয়ে বিভিন্ন বিষয়ের বিভিন্ন অংশের নাম লিখে তার পাশে তারকা চিহ্ন দিয়ে পড়াশোনার হিসাব রাখছে। তিন তারকা মানে ভালো পড়া হয়েছে, দুই তারকা মানে মাঝারি, এক তারকা মানে খারাপ। তার নোটবইয়ে তিন তারকা খুব বেশি, দুই তারকা খুব কম, এক তারকা নেই বললেই চলে। বাকি দশ দিনে সে তিন তারকাগুলিকে চার তারকা করে ফেলবে, না দুই এবং এক তারকাকে তিন তারকাতে নিয়ে আসবে ঠিক করতে পারছিল না। গত কয়েক বছরের প্রশ্ন যাচাই করলেই বোঝা যায় কোনো কোনো পরিচ্ছেদ না পড়লেও চলে, রুমীর নোটবইয়ে সেগুলিই দুই এবং এক তারকা হিসেবে রয়েছে─ অন্যেরা সেগুলি মোটেও পড়ছে না। রুমীর নীতিবোধ আজকাল প্রখর হয়ে উঠছে, প্রশ্ন বেছে পড়ে ভালো করাকে সে জোচ্চুরি মনে করে। একটা ভালো স্কলারশিপ ছাড়া আর কিছুতে তার আকর্ষণ নেই, অন্তত সেটাই সে নিজেকে বোঝায়। আজ তাই সে একেবারে নতুন একটা জিনিস পড়া শুরু করেছে।কিন্তু খানিকক্ষণ পড়েই সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে─ গত কয়েক দিন পরিশ্রম একটু বেশি হয়ে গেছে। একটু বিশ্রাম নেবার জন্যে রুমী ঘর থেকে হাঁটতে বের হয়। সে নতুন সিগারেট খাওয়া শিখছে, এখনো সিগারেট ভালো লাগা শুরু হয় নি, খেতে বেশ কষ্টই হয়। সাধারণত ভাত খাবার পর সে সিগারেট খেতে চেষ্টা করে, আজ কি মনে করে এখনই একটা সিগারেট ধরিয়ে নিল। প্রথম দু-তিন টান ওর খারাপ লাগে না, কিন্তু তারপরই গা গুলিয়ে ওঠে। সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে রাস্তা ধরে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে শুরু করল। কারো বাসায় যাওয়া যায় কি না ভাবল, কিন্তু পরীক্ষার পড়া নিয়ে সবাই ব্যস্ত এখন, যাওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। ঠিক তক্ষুনি তার “বিখ্যাত জ্যোতিষী জোয়ারদারের” কথা মনে পড়ল বেশ অনেকদিন থেকেই খবরের কাগজে প্রেম-ভালোবাসা, মামলা-মোকদ্দমা, শিক্ষা-সাফল্য, বিদেশ-ভ্রমণ সম্পর্কে জানার “অপূর্ব সুযোগের” বিজ্ঞাপন দেখে আসছিল।সে কোনো দিন এসব ব্যাপারে উৎসাহী নয়, কিরোর হাত দেখার বই বারবার পড়েও কোনটা আয়ু রেখা কোনটা হৃদয় রেখা সে মনে রাখতে পারে না। কিন্তু এই জ্যোতিষীর কথা ভিন্ন, তার এক বন্ধু বলেছে মাত্র দশ টাকার বিনিময়ে জ্যোতিষী নাকি সবকিছু বলে দিতে পারে। রুমীর বিশ্বাস হয় নি, কিন্তু তার বন্ধুটি খোদার কসম খেয়ে বলেছে যে ছেলেবেলায় তার অ্যাপেনডিসায়টিস অপারেশনের কথাটিও নাকি জ্যোতিষী দিন-তারিখসহ বলে দিয়েছে। সেই থেকে ওর ইচ্ছে ব্যাপারটি নিজে গিয়ে দেখে, কিন্তু যাওয়া হয় নি। এখন, হঠাৎ করে, সেখানে যাওয়ার কথা মনে হলো। পকেটে কিছু টাকা আছে, পড়ায় মন বসছে না─ এর থেকে ভালো সময় আর হবে না। বাসস্টপে এসে দাঁড়াল রুমী। জোয়ারদারের নাম এবং বিজ্ঞাপনের ধরন দেখে রুমীর ধারণা হয়েছিল সাদাসিধে একজন বুড়োমানুষ নিজের বসার ঘরে লোকজনের হাত দেখে কিছু বাড়তি পয়সা রোজগারের চেষ্টা করে, তাই ঠিকানা খুঁজে বের করে জোয়ারদারের ঘর দেখে সে হতবাক হয়ে গেল।মতিঝিলের এক সম্ভ্রান্ত এলাকায় চৌদ্দ তলা দালানের সাত তলায় চমৎকার একটা ঘর আর ছোট একটা বারান্দা নিয়ে জোয়ারদারের হাত দেখার জায়গা। বারান্দায় বসে জোয়ারদার হাত দেখে। একটা পর্দা দিয়ে সেটা ঘর থেকে আলাদা করে রাখা। ঘরটিতে একটা ছোট টেলিভিশন চলছে। এক কোনায় চায়ের সরঞ্জাম এবং কেতলিতে ফুটন্ত পানি; যারা চায় চা তৈরি করে নেবে। চমৎকার সোফা এবং টেবিলে দেশি-বিদেশি রংচঙে পত্রপত্রিকা। ঘরে হালকা আলো। টেলিভিশনের শব্দ কমে এলেই শোনা যায় কোথা থেকে যেন মিষ্টি সেতারের শব্দ ভেসে আসছে। দেখেশুনে রুমী মুগ্ধ হয়ে যায়। যে লোক হাতদেখা পয়সা দিয়ে এতসব আয়োজন করে ফেলতে পারে সে হয়তো সত্যিই হাত দেখতে পারে। এই প্রথম রুমীর লোকটার প্রতি একটু বিশ্বাস জন্মাল। বাইরে অন্ধকার নেমে এসেছে। ঘরের ভিতর এখন রুমী ছাড়া আরও দুজন। তারা ওর পরে এসেছে। রুমীর ঠিক আগে যে এসেছে সে এখন পর্দার ওপাশে হাত দেখাচ্ছে, এর পরেই রুমী।একজন কুড়ি থেকে পঁচিশ মিনিট করে সময় নেয়। রুমীর ঘণ্টাখানেক সময় এর মাঝে নষ্ট হয়ে গেছে, হাত দেখিয়ে ফিরে যেতে আরও দুই ঘণ্টা। ওর বাসা অনেকটা দূর, একবার বাস বদলাতে হয়। পরীক্ষার আগে এভাবে এতটা সময় নষ্ট করা ভালো হলো কি না রুমীর সন্দেহ হতে থাকে। পাশের ঘর থেকে জ্যোতিষী জোয়ারদার এবং তার সাথে রুমীর আগের আগের লোকটি বের হয়ে আসে। লোকটির মুখ একটু বিমর্ষ, কে জানে ভাগ্য গণনায় কি বের হয়েছে। জোয়ারদার রুমীর দিকে তাকিয়ে বলল, এরপর কে, তুমি? রুমী মাথা নাড়ল। এসো, বলে জোয়ারদার পর্দা তুলে ওকে ভিতরে ডাকল। কি হলো কে জানে হঠাৎ রুমী প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেল। ওর মনে হতে লাগল পর্দার ওপাশে একটা ভয়ানক অশুভ কিছু অপেক্ষা করে আছে। ওর ভিতর থেকে কে যেন ওকে বলছে, পালা পালা বাঁচতে হলে পালা...রুমীর হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, হঠাৎ সে কুলকুল করে ঘামতে থাকে। জোয়ারদার ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল, ঠাণ্ডা স্বরে বলল, এসো। রুমীর সারা শরীর আবার কাঁটা দিয়ে ওঠে, কি নিষ্করুণু তীব্র দৃষ্টি। শুকনো গলায় ঢোঁক গিলে বলল, আমি আজ বরং যাই, আরেক দিন আসব। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে, এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। জোয়ারদার এগিয়ে এসে ওর হাতে ধরে। শক্ত লোহার মতো হাত, কিন্তু মরা মানুষের মতো ঠাণ্ডা। রুমীকে প্রায় টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলে, সে কী চলে যাবে কেন? বেশিক্ষণ লাগবে না-এসো। পর্দার এপাশে ছোট বারান্দা, মাঝখানে ছোট একটা টেবিল। টেবিলের দুই পাশে দুটি চেয়ার। টেবিলের ওপর একটা টেবিল ল্যাম্প, একটা টেলিফোন আর একটা বড় ম্যাগনিফাইং গ্লাস, আর কোথাও কিছু নেই। বারান্দায় রেলিঙের ওপর দিয়ে ঢাকা শহর দেখা যায়। নিওন লাইট জ্বলছে-নিভছে, মাঝে মাঝে গাড়ির শব্দ। মতিঝিলের এ এলাকাটা সন্ধ্যার পর এমনিতে খুব চুপচাপ হয়ে পড়ে। জোয়ারদার একটা চেয়ারে বসে তাকে অন্যটাতে বসতে ইঙ্গিত করে। রুমী যন্ত্রের মতো চেয়ারে বসে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করতে থাকে। খামোখা আমি ভয় পাচ্ছি, রুমী নিজেকে বোঝাতে শুরু করে এই লোক আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। বাইরে আরও দুজন লোক বসে আছে, আমার ভয় কিসের? লোকটার বিজনেস হাতদেখা, হাত না দেখে ছাড়তে চাইবে কেন? রুমী ঘামে ভেজা ডান হাতটা টেবিলের ওপর মেলে দেয়। জোয়ারদার বলল, বাম হাতটাও দেখি। রুমী তার বাম হাতটা বাড়িয়ে দেয়। রুমীর মেলে রাখা দুই হাত নিজের দিকে টেনে এনে এক পলক দেখে জোয়ারদার হাতে ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা তুলে নেয়। রুমী জানতেও পারল না জোয়ারদার যে রেখাটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে দেখে নিঃসন্দেহ হয়ে নিল সেটি তার পুরো ভবিষ্যৎকে সেই মুহূর্তে কি ভয়ানকভাবে পাল্টে দিল। অনেকক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে হাত দুটি দেখল জোয়ারদার। তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ক্লান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল, কি নাম তোমার? রুমী নিজের নাম বলে। হাত দেখাতে এসেছ কেন?এটা আবার কোনো প্রশ্ন হয় নাকি? লোকজন হাত দেখাতে না এলে ওর ব্যবসা চলবে কেমন করে? মুখে বলল, এমনি এসেছি, সবাই যেজন্যে আসে। ও! জোয়ারদার আবার চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। কি ভয়ানক নিষ্করুণু দৃষ্টি। সারা মুখে খোঁচা খোঁচা লালচে দাড়ি, শুকনো টেনে থাকা মুখ ঝাঁকড়া লালচে চুল ঝকঝকে সাদা দাঁত আর সবকিছু ছাপিয়ে জ্বলজ্বল করছে তার চোখ দুটি। জোয়ারদার হঠাৎ টেলিফোনটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে রিসিভার তুলে সাবধানে আস্তে আস্তে ডায়াল করে রুমীর দিকে তাকিয়ে বলল, আমি এই টেলিফোনটা শেষ করেই শুরু করছি।ওপাশ থেকে একটা মেয়ে টেলিফোন ধরল বলে মনে হলো। জোয়ারদার গলা নামিয়ে কথা বলতে শুরু করে, রুমী চেষ্টা করেও কিছু শুনতে পায় না। কথা বলার ভঙ্গি শুনে মনে হয় কাউকে যেন কিছু একটা নির্দেশ দিচ্ছে। রুমীর খুব অস্বস্তি বোধ হতে থাকে, কেন জানি ওর মনে হয় ওকে নিয়েই কথা বলছে ওরা।টেলিফোন শেষ করেও জোয়ারদারের শুরু করার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না, অন্যমনস্কভাবে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। রুমী একটু অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, কি দেখলেন হাতে? ও, আচ্ছা। একটু নড়েচড়ে বসে জিজ্ঞেস করল, তোমার জন্ম-তারিখ কত? ডিসেম্বরের কত তারিখ? তেইশ। বয়স কত? রুমী নিজের বয়স বলে। জোয়ারদার মাথা নেড়ে বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে শুরু করে।অদ্ভুত একটা গলার স্বর, একঘেয়ে ক্লান্ত আবেগহীন। কথা যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে, অনেকটা দৈববাণীর মতো, থেকে থেকে রুমী অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। খুব ছেলেবেলায় তোমার বাবা মারা গেছেন। তাকে খুন করা হয়েছিল... হ্যাঁ, ওর বাবাকে খুন করা হয়েছিল। সবাই জানে ওর বড় চাচা খুন করিয়েছিলেন লোক লাগিয়ে।কোনো প্রমাণ নেই, কিন্তু সবাই জানে। জমি নিয়ে গোলমাল ছিল অনেকদিনের। হাজীপুরের আলিমুল্লা হাজার টাকা পেলে এক কোপে গলা নামিয়ে দেয়। বড় চাচা পাঁচশো দিয়ে বায়না করেছিলেন, কাজ শেষ হবার পর বাকি পাঁচশো। কাজ শেষ করে সেই রাতেই আলিমুল্লা বড় চাচাকে ডেকে তুলল। হাতে লম্বা দা, তখনো রক্ত লেগে আছে। বড় চাচা তাড়াতাড়ি বাকি টাকা দিয়ে দিলেন। আলিমুল্লা তিন মাসের জন্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। তিন মাস পরে সবাই ভুলে গেলে সে আবার ফিরে এলো। শুকনো গিরগিটির মতো চেহারা, কালো কুচকুচে গায়ের রং, পান খেয়ে দাঁত লালসবাই জানে হাজার টাকা দিলে আলিমুল্লা গলা নামিয়ে দেয়। রাতের অন্ধকারে ওর বাবার গলা নামিয়ে দিয়েছিল আলিমুল্লা। কি নিখুঁত হাত, পাশে ওর মা শুয়ে ছিলেন, তাঁর গায়ে আঁচড়টিও লাগে নি। সারা শরীর শুধু রক্তে ভিজে গিয়েছিল। মা চিৎকার করে উঠে বসেছিলেন, আর ঘুম ভেঙে উঠে রুমী দেখেছিল, ওর মায়ের সারা শরীর রক্তে লাল। ও ভেবেছিল ওর মাকে কেউ কেটে ফেলেছে, কিন্তু ওর মায়ের কিছু হয় নি। ওর বাবাকে কেটে ফেলেছিল। নিখুঁত নিশানা, ঠিক গলাটা এক কোপে দুই ফাঁক। রুমী অনেকদিন ভেবেছিল ওর হাজার টাকা হলে আলিমুল্লাকে দিয়ে বলবে বড় চাচার গলা নামিয়ে দিতে। ও ঠিক নামিয়ে দিত। কিন্ত বড় চাচা মরে গেলেন, এমনিতে ভুগে ভুগে মরে গেলেন। শরীরের মাংস পচে খসে খসে পড়তো আর সারা রাত যন্ত্রণায় কাটা মাছের মতো লাফাতেন। সবাই বলতো বদ দোয়া লেগেছে, এতিমের বদ দোয়া… তোমার মায়ের সাথে তোমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে খুব ছেলেবেলায়। … মায়ের চেহারা হয়ে গেল ডাইনির মতো। রুমী কাছে যেতে ভয় পে পেতো। দাঁতে দাঁত ঘষে ফিট হয়ে যেতেন, সবাই বলতো জিনে ধরেছে। এত এত তাবিজ দিল গলায়, মা টেনে টেনে ছিঁড়ে ফেলতেন। একদিন নানা নৌকো করে এসে তার মাকে নিয়ে গেলেন। শুধু মাকে, রুমীকেও না শানুকেও না। রুমীর কি কান্না, শানু তখন কিছু বোঝে না, কিন্তু রুমীর কান্না দেখে তারও চিৎকার করে কান্না। নৌকো করে নানা মাকে নিয়ে গেলেন, মা পাথরের মূর্তির মতো নৌকোয় বসে রইলেন, একবার ঘুরেও তাকালেন না। রুমী নৌকোর সাথে সাথে নদীর তীরে তীরে চিৎকার করে ছুটে যেতে লাগল। ওর ছোট চাচা ওকে ধরে নিয়ে এলেন, বললেন ওর মা আবার ফিরে আসবেন। রুমী কিন্তু জানতো আর আসবেন না। ওর মা আসলেও আর আসেন নি। অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে গেছে, কেউ বলে নি, কিন্তু রুমী জানে… তোমার কোনো আপনজন নেই? …কে বলেছে নেই? নিশ্চয়ই আছে, শানু আছে! শানু-শানু-শানু গুটি গুটি হাঁটতো উঠানের নেড়ে দেওয়া ধানের মাঝে। মোরগগুলিকে তাড়া করতো, মোরগুলিও বুঝতো ও শানু,তাই ভয় পেতো না মোটেই। শানুর গা ঘেঁষে এসে ধান খেয়ে যেতো। শানু কিছু বুঝতো না, ওর মা ওদের ছেড়ে চলে গেছেন তাও বুঝতো না। থালা উল্টে ভাত ছড়িয়ে দিতো মাটিতে, তারপর খুঁটে খুঁটে খেতো মাটি থেকে তুলে। শুধু হাসতো ফোকলা দাঁত বের করে। কিছু বুঝতো না শানু, এত দুঃখ ওদের তাও বুঝতো না। তারপর একদিন শানুর বিয়ে হয়ে গেল।রুমী জানতেও পারে নি কখন শানু বড় হয়ে গেছে, শান্ত হয়ে গেছে, দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে চুপচাপ ওকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। বিয়ের রাতে শানু ওকে সালাম করতে এলো। বড় ফুফু বললেন, ভাইরে শেষবার সালাম করে নে রে, শানু। শুনে হঠাৎ রুমীর বুকটা হা হা করে ওঠে। শানু ওকে জরিয়ে ধরে কি কান্না! বলতে চাইছিল, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও দাদা, আমি বিয়ে করব না। রুমী জানে তাই বলতে চাইছিল, কিন্তু বলে নি। কেন বলবে? ভালো প্রস্তাব, ভালো বংশের ছেলে, দোকান আছে সদরে। কতদিন আর চাচাদের সংসারে থাকবে? শানু চলে গেল। কেমন আছে এখন শানু?কতদিন যোগাযোগ নেই-কতদিন! তিন বছর? চার বছর?... অনেক কষ্টে মানুষ হয়েছো তুমি। কারো কোনো সাহায্য ছাড়া, একা একা। ...একা একা? হবে হয়তো। বড় ফুফু বললেন, ঢাকা যাবি আমার সাথে? নাইট কলেজে পড়বি। আমার বাজারটা, ইলেকট্রিক বিলটা করে দিবি, তোর ফুপা পারলে প্রেসে একটা চাকরি খুঁজে দেবে।বিলু রীতার পড়াশোনাটা দেখবি। রুমী রাজি হলো। ফুফু এসে কাজের ছেলেটা ছাড়িয়ে দিলেন। রুমী চরকির মতো ঘুরতে থাকে, শখ ছিল পড়াশোনা করে বড় হবে কিন্তু ও কাজের ছেলে হয়ে গেল। বাজার করে, বাসন মাজে, কাপড় ধোয়। ময়লা কাপড় পরে, উচ্ছিষ্ট তরকারি দিয়ে একগাদা ভাত খায়, রাতে রান্নাঘরে মাদুর পেতে ঘুমায়। তখন ওর পরীক্ষার ফল বের হলো। স্টার মার্ক পেয়েছে, চার বিষয়ে লেটার। ক্লাস টিচার সেই গ্রাম থেকে দেখা করতে এলেন একটা নতুন এ সি দেবের ডিকশনারি নিয়ে। ওর অবস্থা দেখে একেবারে চুপ মেরে গেলেন, এমন কি ডিকশনারিটা দেওয়ার কথা পর্যন্ত মনেথাকল না। বসার ঘরে সারাদিন বসে রইলেন কিছু না খেয়ে। সন্ধ্যায় ফুপা এলে তার সাথে কথা বললেন, কি বললেন কে জানে। ওর ক্লাস টিচার চলে যেতেই ফুপা চিৎকার করে গালি দিতে শুরু করলেন ফুফুকে, তোমার চোদ্দগুষ্ঠির কেউ প্রাইমারি পর্যন্ত পাস করে নাই, আর তুমি আমাকে বলো নি পর্যন্ত যে রুমী ম্যাট্রিক পাস করেছে, স্টার মার্ক, চার সাবজেক্ট লেটার। ওকে দিয়ে তুমি বাসন মাজাও, বাজার করাও। তোমার বাপের গোলাম নাকি? স্কলারশিপ পাবে মাসে দেড়শো টাকা, কয়দিন পরে তোমাকে বাঁদী রাখবে সেটা খেয়াল আছে? ফুপু প্রথমে একটা দুটো কথা বলে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেন তারপর ফোঁস ফোঁস করে কাঁদতে লাগলেন। অবস্থা পাল্টে গেল রুমীর, নতুন কাপড় কিনে দিলেন ফুপা, বাইরের ঘরে ওর জন্যে বিছানা পাতা হলো, ঢাকা কলেজে ভর্তি করে দেওয়া হলো তাকে। লোকজন এলে ফুপা পরিচয় করিয়ে দিতেন, আমার মেজোশালার ছেলে, চার সাবজেক্টে লেটার, স্টার মার্ক।রুমী অবিশ্যি তবু বাজার করে দিতো, বিলু রীতার অঙ্ক দেখে দিতো। স্কলারশিপের টাকা পেয়ে ফুপুকে একটা শাড়ি কিলে দিল, ফুপাকে প্যান্টের কাপড়। তাই পেয়ে কি খুশি! টিউশনি নিল রুমী... কতক্ষণ ধরে জোয়ারদার কথা বলছিল রুমীর মনে নেই। অন্যমনস্কভাবে একঘেয়ে আবেগহীন গলার সুরে রুমীর ভাবনা-চিন্তা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, দুর্বলতা, আক্রোশ, গোপন কামনা-বাসনার কথা এত অনায়াসে বলে গেল যে রুমীর মনে হতে থাকল জোয়ারদার নয়, সে নিজেই যেন নিজের কথা বলছে। জোয়ারদার কথা বলে সুন্দর ভারি গলায়, নিশ্চিত আত্মবিশ্বাসে। রুমীর ভিতরটা যেন খোলা বইয়ের মতো পড়ে গেল। কখনো কখনো থেমে যাচ্ছিল ঠিক জুতসই শব্দটা না পেয়ে। তখন ধৈর্য ধরে একটার পর একটা শব্দ ব্যবহার করতে থাকে যতক্ষণ না ঠিক শব্দটা খুঁজে পায়। আস্তে আস্তে রুমী যেন সম্মোহিতের মতো হয়ে গেল। জোয়ারদারের গলার স্বর যেন ভেসে আসছে অনেক দূর থেকে। সাগরের ঢেউয়ের মেতো অর্থহীন কিছু শব্দ ওকে স্পর্শ করে যাচ্ছে। জোয়ারদারের চেহারা অস্পষ্ট হয়ে ওর সামনে, কি বলছে কিছু সে বুঝে উঠতে পারছে না। একটি একটি শব্দ সে শুনছে, কিন্তু সব মিলিয়ে তার যেন কোনো অর্থ নেই। যুগ যুগ যেন সে বসে আছে এখানে, এর যেন শুরু নেই, শেষ নেই। রুমীর চমক ভাঙলো তীব্র একটা আলোর ঝলকানিতে। পর্দা সরিয়ে একটি মেয়ে এসে ঢুকে ছবি ‍তুলেছে, ক্যামেরার ফ্ল্যাশের আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে গেছে রুমীর। কিসের ছবি তুলেছে মেয়েটি? রুমী ঠিক বুঝতে পারল না। মেয়েটি ভিতরে এলো না, জোয়ারদারের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি বাইরে আছি। তোমার কাজ শেষ হলে ডেকো। আমার কাজ শেষ। রুমী উঠে দাঁড়াল। পকেট থেকে মানিবাগ বের করে একটা দশ টাকার নোট কীভাবে দেবে বুঝতে না পেরে টেবিলের ওপরে রাখলো। কাউকে টাকা দিতে বা কারো কাছ থেকে টাকা নিতে সব সময়েই কেমন যেন অস্বস্তি লাগে। প্রত্যেক মাসে টিউশনির টাকা নেওয়ার সময় ওর এই রকম হয়।জোয়ারদার কিন্তু বেশ সপ্রতিভভাবে নোটটা নিয়ে পকেটে রাখল। তারপর ড্রয়ার খুলে একটা কাগজ বের করে রুমীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, তোমার নাম-ঠিকানাটা লিখে দেবে? আমি সবার নাম-ঠিকানা রাখছি রেফারেন্সের জন্যে। তোমার যদি কোনো আপত্তি থাকে তাহলে দরকার নেই। রুমীর আপত্তি ঠিকই ছিল কিন্তু কেউ এভাবে বললে না করা মুশকিল। একবার ইচ্ছা হলো একটা ভুল ঠিকানা দিয়ে দেয়, কিন্তু জেনেশুনে এত বড় মিথ্যা কাজ কীভাবে করে। নাম-ঠিকানা লিখে সে উঠে দাঁড়ায়, জোয়ারদার খুব আন্তরিকভাবে তার সাথে হাত মিলিয়ে বলে, তুমি বলছিলে তোমার দেরি হয়ে গেছে। তুমি যদি চাও ইভা তোমাকে পৌঁছে দিতে পারে। না, না-রুমী ব্যস্ত হয়ে বলল, আমি একাই যেতে পারব। মেয়েটি, যার নাম নিশ্চয়ই ইভা রুমীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, কোথায় বাসা তোমার? মালিবাগ। ওঃ কি সুন্দর করে হেসে উঠল মেয়েটি,আমি এমনিতে রাজারবাগ যাচ্ছিলাম, চলো তোমাকে পৌঁছে দিই। চমৎকার চেহারা ইভার, চমৎকার শরীরে আরও চমৎকার একটা শাড়ি পরে আছে। কেমন একটা আকর্ষণ আছে মেয়েটার শরীরে। একবার চোখ পড়লে আর চোখ সরানো যায় না। চোখের দৃষ্টি কেমন যেন ধারালো, মোটেই মেয়েদের চোখের মতো নয়, সোজাসুজি চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারে। চলো যাই, ইভা রুমীকে নিচে নিয়ে যায়। গাড়িতে উঠে সে রুমীর জন্যে দরজা খুলে দেয়। রুমী তার জীবনে গাড়ি চড়েছে খুব কম, হাতে গুনে বলা যায় কয়বার। বড় হয়ে ছাদ খুলে ফেলা যায় এরকম একটা গাড়ি কিনবে-কালো রঙের-এরকম একটা স্বপ্ন ওর বহুদিনের। ফাঁকা রাস্তায় গাড়িটা ঘুরিয়ে ইভা রুমীকে নিয়ে রওনা দেয়। গাড়িতে মিষ্টি একটা গন্ধ, সুন্দরী মেয়েদের গায়ে বুঝি সুন্দর একটা গন্ধ থাকার নিয়ম! রুমী আড়চোখে ইভাকে দেখার চেষ্টা করে। কি পড় তুমি? তুমি বলে বলছি বলে কিছু মনে করছো না তো?ইভা একটু হেসে বলে, বয়সে তুমি আমাদের থেকে অনেক ছোট হবে। না, না মনে করার কি আছে-ভদ্রতার খাতিরে রুমীকে বলতেই হলো। এমনিতে কেউ সোজাসুজি তাকে তুমি বলে সম্বোধন করলে তার মোটেই পছন্দ হয় না। চেহারায় এখনো বয়সের ছাপ পড়ে নি, গোঁফটা একটু ঘন হলে সে রাখার চেষ্টা করে দেখতো। কি পড়ছো বললে না? রুমী বলল সে কি পড়ছে। পরীক্ষা দেবে তাও বলল। কবে পরীক্ষা তোমার? এই মাসের আঠারো তারিখ। তাই? পরীক্ষা তো এসে গেল। হুঁ। ইভা হঠাৎ খিলখিল করে হেসে ওঠে, রুমী অবাক হয়ে তাকায় ইভার দিকে। পড়াশোনা করো নি বুঝি, তাই হাত দেখাতে গিয়েছিলে? রুমীও হেসে ফেলে, বলে, না তা নয়। পড়া আমার ঠিকই হয়েছে,এমনি খেয়াল হলো তাই গেলাম। গাড়ি চালাতে চালাতে ইভা ঘুরে রুমীকে দেখল, কিছু বলল না। বেশ অনেকক্ষণ পর আস্তে আস্তে অনেকটা আপনমনে বলল, খেয়াল হলো তাই গেলে। আশ্চর্য! এর মাঝে আশ্চর্য কোন ব্যাপারটা রুমী বুঝতে পারে না।রুমীকে ইভা ওর বাসার কাছে নামিয়ে দেয়। রুমী একটু আগেই নেমে পড়তে চাইছিল, কিন্তু ইভা ওকে ঠিক বাসার সামনে না নামিয়ে ছাড়বে না। শুধু তাই নয় ইভা গাড়িতে বসে রইল যতক্ষণ পর্যন্ত রুমী তার বাসায় গিয়ে না ঢুকছে। এত রাতে এরকম একটা সুন্দরী মেয়ের গাড়ি থেকে নামছে, ব্যাপারটা কেউ দেখে ফেলছে কি না এ নিয়ে শঙ্কিত ছিল বলে ও তাড়াতাড়ি বাসায় ঢুকে পড়েছে, তা নইলে ও নিশ্চয়ই লক্ষ করতো যে ইভা কাগজ বের করে ওর বাসার নম্বরটা টুকে নিয়েছে। কেউই খেয়াল করল না গত ছয় মাস থেকে জ্যোতিষী জোয়ারদারের ভাগ্য গণনার যে বিজ্ঞাপনটি দৈনিক পত্রিকাগুলিতে ছাপা হচ্ছিল সেটি পরদিন থেকে বন্ধ হয়ে গেছে। পাবলিক লাইব্রেরি থেকে বের হয়ে রুমী হেঁটে হেঁটে নীলক্ষেতের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিল। ওর এক বন্ধুর বাসায় যাওয়ার কথা, নিউমার্কেট থেকে বাস ধরবে। ওর গাঘেঁষে একটা হালকা নীল রঙের গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে ও লক্ষও করেনি।গাড়ি থেকে মাথা বের করে একটা মেয়ে উচ্চকণ্ঠে ডাকল, রুমী-রুমী! রুমী ঘুরে তাকিয়ে দেখে ইভা। অবাক হয়ে কাছে এগিয়ে যায়। কি খবর তোমার? ইভা হাসিমুখে জিজ্ঞেস করে, কোথায় চলেছ? রুমী একটু থতমত খেয়ে বলল, এই এসেছিলাম একটু লাইব্রেরিতে। এখন কোথায় যাচ্ছ? কলেজ গেটের দিকে এক বন্ধুর বাসায়। চলো পৌঁছে দিই রুমী কিছু বলার আগেই দরজা খুলে দেয় ইভা। বাসে যেতে ওর আধঘণ্টা থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় লাগতো,ইভা সেখানে ওকে দশ মিনিটে পৌঁছে দিল। অল্প সময়ে বেশি কথাবার্তা হওয়ার সুযোগ নেই। এর মাঝেই ইভা তার পড়াশোনোর খবর নিয়েছে। কবে কোথায় পরীক্ষা তাও জেনে নিয়েছে। রুমী মেয়েদের সাথে কথা বলে অভ্যস্ত নয়, তাই পুরো সময়টুকু একটু আড়ষ্ট হয়েই বসেছিল, কথা যা বলার ইভাই বলেছে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মোড়ে ওকে নামিয়ে দেওয়ার পর ও যেন স্বস্তি ফিরে পেয়েছে। সে-রাতে ঘুরেফিরে ওর অনেকবার ইভার কথা মনে পড়ল।   পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে রুমী ওর ক্লাসের কজন ছেলের সাথে রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছিল। ও খেয়াল করে নি, করলে দেখতে পেতো একটু দূরে গাড়ি নিয়ে বসে আছে ইভা। রুমীকে অন্যদের সাথে বাসের জন্যে অপেক্ষা করতে দেখে ইভা গাড়ি ঘুরিয়ে উলটোদিকে চলে গেল। একা থাকলে হয়তো আবার রুমীকে গাড়িতে তুলে নিত।   নিউমার্কেটে বইয়ের দোকানে উবু হয়ে বসে রুমী বই দেখছিল, কে যেন ওর খুব কাছে মাথা এনে ডাকল, রুমী! রুমী ঘুরে দেখে ইভা। কি খবর-ইভা হাসিমুখে জিজ্ঞেস করে, ভালো? হ্যাঁ, এই আর কি। পরীক্ষা কেমন হলো তোমার? ভালো। কি করছো এখানে? যাবে নাকি কোথাও? নাহ্। সাতটার সময় ওর একটা টিউশনি আছে, এখনো খানিকক্ষণ বাকি সাতটা বাজতে, তাই সময় কাটাচ্ছিল। ইভাকে টিউশনির কথা বলতে ওর লজ্জা করল, বলল,অন্য কাজ আছে। ‍শুনে ইভা আর অপেক্ষা করল না। মিষ্টি করে হেসে বলল, আসি তাহলে, আবার দেখা হবে। দেখা হোক কি না হোক বিদায় নেওয়ার সময় অনেকেই বলে, আবার দেখা হবে, ওটা একটা কথার কথা। কিন্তু ইভার কথাটা কথা ছিল না। ও সত্যিই জানতো আবার দেখা হবে। শুধু ইভা নয় আরও অনেকে জানতো আবার দেখা হবে।বহুদিন থেকে ওকে ওরা চোখে চোখে রাখছে। অনেক খুঁজে ওরা রুমীকে পেয়েছে, এখন ওকে কিছুতেই হাতছাড়া করা চলবে না। রুমী যখন সেটা জানতে পারল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।রুমী বহুদিন হলো শানুকে দেখে নি। সেই কবে শানুর বিয়ে হয়ে গেছে তারপর মাত্র একবার দেখা হয়েছে। কদিন আগে শানুর স্বামী ঢাকা এসেছিলেন গুড়ের একটা চালান নিয়ে। ছোটখাটো মানুষ, মুখে সব সময়ই ভালো মানুষের মতো একটা হাসি। সদরঘাটের কাছে কি একটা ঘিঞ্জি হোটেলে ছিলেন সপ্তাহখানেক। রুমীকে খুব যত্ন করে হোটেলে নিয়ে শিককাবাব খাইয়েছিলেন। যাবার সময় খুব করে বলেছেন যেতে। রুমী কথা দিয়েছিল পরীক্ষা শেষ হলে যাবে। তখন ভদ্রলোককে শান্ত করার জন্যেই বলেছিল,কিন্তু পরীক্ষা শেষ হবার পর ও সত্যিই ঠিক করল যাবে। হকার্স মার্কেট ঘুরে ঘুরে সে শানুর জন্যে একটা শাড়ি কিনল, শানুর বাচ্চার জন্যে একটা খেলনা গাড়ি। শানুর স্বামীর জন্যে একটা দামি সিগারেট লাইটার, ভদ্রলোক শৌখিন মানুষ কিন্তু প্রাণে ধরে বিলাসিতার জিনিস পয়সা খরচ করে কিনতে পারেন না। রাত আটটায় ট্রেন। রুমী ছটার মধ্যে রওনা দিল। সকাল সকাল গেলে ট্রেনে একটু ভালো জায়গা পাওয়া যাবে। সাথে ছোট একটা ব্যাগ, খামোখা রিকশা করে না গিয়ে সে বাসেই চলে যাবে ভাবছিল, তাতে অনেক পয়সা বাঁচে। বাসের জন্যে দাঁড়িয়ে পাঁচ মিনিটও অপেক্ষা করে নি, ওর পাশে একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ইভা বলল, কি খবর রুমী, কোথায় যাচ্ছ? রুমী একটু অবাক হয়ে এগিয়ে যায়, কমলাপুর স্টেশন। তাই নাকি? চলো তোমাকে পৌঁছে দিই। বাসে করে যাবার বদলে গাড়িতে করে যেতে আজ ওর কোনো আপত্তিই ছিল না, কিন্তু ও দেখল গাড়ির ভিতরে আরও দুজন লোক বসে আছে।একজন সামনে ইভার পাশে, আরেকজন পেছনে। অপরিচিত লোকজনের সাথে প্রায়-অপরিচিত আরেকজন মেয়ের গাড়িতে ওঠা কোনো সুখকর ব্যাপার নয়। কিন্তু ততক্ষণে পেছনের লোকটা পিছনের দরজা খুলে দিয়ে সরে বসে তাকে জায়গা করে দিয়েছে। রুমী একটু ইতস্তত করে উঠে বসে, ইভা সাথে সাথে গাড়ি ছেড়ে দেয়। হঠাৎ করে কেন জানি রুমীর ইচ্ছে হলো নেমে পড়ে, গাড়ির ভিতরে যেন কি একটা অশুভ জিনিস অপেক্ষা করে আছে। ওর শিরদাঁড়া বেয়ে বেয়ে ঠাণ্ডা কি যেন একটা নেমে যায়। কোথাও যাচ্ছ নাকি? ইভা জিজ্ঞেস করে। হুঁ। কটায় ট্রেন তোমার? ভারী গলার স্বর শুনে সে পাশে তাকায়, লোকটিকে সে আগে দেখেছে, জোয়ারদার... সেই জ্যোতিষী। রুমী শুষ্ক গলায় বলল, আটটায়। ও। বলে জোয়ারদার কোথা থেকে যেন একটা পকেট ঘড়ি বের করল।লম্বা চেন লাগানো সাথে। সোনালি রঙের চমৎকার একটা ঘড়ি। ওপরে কারুকাজ করা ঢাকনা। ঢাকনা খুলে সময় দেখে বলল, এখনো অনেক সময় আছে। ঢাকনাটা বন্ধ করে চেনটা ধরে রেখে জোয়ারদার আস্তে আস্তে ঘড়িটাকে ঝুলে পড়তে দিল। গাড়ির অল্প কাঁপুনির সাথে ঘড়িটা চেনের মাথা থেকে দুলছে, এত চমৎকার কাজ, রুমী চোখ ফেরাতে পারে না ঘড়ি থেকে। ঘড়িটা আস্তে আস্তে দুলছে জোয়ারদারের হাতে, ডান থেকে বামে, বাম থেকে ডানে। তাকিয়ে থেকে থেকে রুমীর কেমন যেন মাথা গুলিয়ে আসে, চোখ সরাতে পারে না সে ঘড়ি থেকে। ভয় পেয়ে যায় হঠাৎ। লাফিয়ে উঠে বসতে চায় সে, কিন্তু আবিষ্কার করে ওর কোনো শক্তি নেই, ওর চোখ ভেঙে ঘুম নেমে আসছে। ঘুমাও তুমি, ঘুমাও─ কে যেন ওকে বলছে অনেক দূর থেকে। না, না, না, রুমী প্রাণপণ চেষ্টা করে জেগে থাকতে,ভয়ের একটা শীতল স্রোত ওর চেতনাকে জাগিয়ে রাখতে চায়, কিন্তু পারে না। ঘুমাও, ঘুমাও তুমি, ঘুমাও! রুমীর চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে আসে। গাড়ির সিটে মাথা রেখে শিশুর মতো ঘুমিয়ে পড়ে একসময়। গাড়ি মতিঝিল কলোনির সামনে এসে ঘুরে গেল তারপর ছুটে চলল উলটোদিকে।.রুমীর ঘুম মাঝে মাঝে হালকা হয়ে এসেছে, কিন্তু একবারও ভাঙে নি। স্বপ্নে দেখছিল উত্তপ্ত মরুভূমির ওপর দিয়ে সে প্রাণপণে ছুটে যাচ্ছে আর ওর পিছু পিছু ছুটে আসছে বুনো কুকুরের দল, একটি দুটি নয় হাজার হাজার, অন্ধকারেও তাদের সাদা দাঁত আর হিংস্র চোখ স্পষ্ট দেখা যায়। তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে রুমীর, কিন্তু তবু ও থামতে পারছে না, থামলেই ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে বুনো কুকুরের দল, মুহূর্তে ওকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে ধারালো দাঁত দিয়ে। কিন্তু আর পারছে না রুমী, হাঁটু ভেঙে পড়ে গেল বালিতে, কোনোমতে উঠে দাঁড়াল সে, কিন্তু পা যেন গেঁথে গেছে, কিছুতেই নড়তে পারছে না। লক্ষ লক্ষ বুনো কুকুর ছুটে আসছে-আরও কাছে আরও কাছে-তাদের হিংস্র চিৎকারে কানে তালা লেগে যায়, ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর। প্রচণ্ড আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে রুমী, সাথে সাথে ঘুম ভেঙে যায় ওর। অনেকক্ষণ লাগল ওর বুঝতে ব্যাপারটা কি। ধক্ ধক্ করে তখনো ওর বুকের ভিতর হৃৎপিণ্ড শব্দ করছে, প্রচণ্ড তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে, সে শুয়ে আছে একটা অন্ধকার ঘরে আর ঘরের বাইরে সত্যি সত্যি অসংখ্য কুকুর তখনো গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। মনে করার চেষ্টা করল রুমী। কি হয়েছে ওর! আবছা, মনে পড়ল শানুর কাছে যাবার কথা ছিল, কমলাপুর স্টেশনে যাচ্ছিল সে, হঠাৎ-ইভা! এক মুহূর্তে সবকিছু মনে পড়ে যায় রুমীর, সাথে সাথে লাফিয়ে উঠে বসে বিছানায়। কোথায় নিয়ে এসেছে ওকে? অন্ধকার ঘর, ভালো করে কিছু দেখা যায় না। ঘরে আর কেউ আছে কি? কান পেতে শোনার চেষ্টা করল রুমী, কিছু বুঝতে পারল না।ছোট ঘর, দরজা-জানালা সব বন্ধ, ঘরের একপাশে কি সব জিনিস রাখা। সাবধানে বিছানা থেকে নামে রুমী, হাতড়ে হাতড়ে দেয়াল স্পর্শ করে দরজা খুঁজতে থাকে সে। ঘরটা নোংরা এবং মাঝে মাঝেই ভিজে, ওর পায়ের নিচে কাঠকুটো পাথর-চাপা পড়ছে। খুঁজে খুঁজে দরজা পেল শেষ পর্যন্ত, কিন্তু বাইরে থেকে তালা মারা,ও ফাঁক করে দেখতে পায় দরজার কড়ায় মাঝারি গোছের একটা তালা ঝুলছে। প্রচণ্ড ভয় পেল রুমী, হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল ওর, মনে হলো মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। তাকে একটা অন্ধকার ঘরে তালা মেরে আটকে রেখেছে। কি করবে তাকে? মেরে ফেলবে? নিশ্চয়ই মেরে ফেলবে! কিন্তু কেন মেরে ফেলবে? ইভার কথা মনে পড়ে ওর, জোয়ারদারের কথা। গাড়িতে নিশ্চয়ই তাকে সম্মোহিত করেছিল জোয়ারদার। কি আশ্চর্য ব্যাপার, সে ওই ঘড়িটা থেকে চোখ সরাতে পারছে না আর জোয়ারদার তাকে বলে চলছে ঘুমিয়ে পড়তে, কিছুতেই সে জেগে থাকতে পারছে না।কত চেষ্টা করল জেগে থাকতে অথচ সে ঘুমিয়েই পড়ল শেষ পর্যন্ত। রুমীর সারা শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ওঠে, ভুরু বেয়ে ঘাম গালের ওপর দিয়ে গলার দিকে নেমে যায় স্রোতের মতো। একটুক্ষণ বসে থাকে সে, তারপর আবার উঠে দাঁড়ায়, হাতড়ে হাতড়ে ঘরটা দেখতে থাকে। কোনো আসবাবপত্র নেই, কোনো জানালা নেই, একটা মাত্র দরজা,তাও বাইরে থেকে তালা মারা। ঘরময় নানা আবর্জনা, ইট, গাছের ডাল, মাটি, ভেজা মতন কি সব জিনিস। এক কোনায় ওর পায়ে গোল মতো কি একটা লাগল। হাত দিয়ে দেখে বেশ মসৃণ, সাবধানে হাতে তুলে নিল সে। ভিতরটা ফাঁপা, জিনিসটা যত বড় ওজন তার তুলনায় বেশ কম। সে চোখের কাছে নিয়ে দেখার চেষ্টা করল, কিছু দেখা যায় না। সাদা মতন একটা কিছু হবে, বোটকা গন্ধ রয়েছে মনে হয়। দরজার ফাঁক দিয়ে নক্ষত্রের একটু আলো এসে ঢুকছে, রুমী জিনিসটা সেখানে নিয়ে গেল। সে আলোতেও ভালো দেখা যায় না।ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে ফেলে দিতে যাচ্ছিল, হঠাৎ জিনিসটা চিনে ফেলল। সারা শরীর শিউরে উঠল ওর। হাতে একটা মরা মানুষের করোটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। যেটুকু আলো আসছে তাতে স্পষ্ট দেখা যায়, ও চিনতে পারছিল না কারণ ও কল্পনাও করে নি এটা একটা করোটি হতে পারে। জন্তুর মতো গোঙানোর আওয়াজ করে সে ছুঁড়ে ফেলে দিল করোটিটা, সশব্দে পড়ে সেটা গড়িয়ে গেল কোনার দিকে। সারা শরীর কাঁপছে রুমীর, ইচ্ছে হচ্ছে চিৎকার করে পৃথিবীকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়, দরজা ভেঙে ছুটে পালিয়ে যায় এই অশুভ ঘর থেকে। কিন্তু ওর কিছু করার নেই, টলতে টলতে বিছানার ওপর উঠে বসে, করোটির স্পর্শ মুছে ফেলার জন্যে বিকারগ্রস্তের মতো বারবার হাত দুটি বিছানার চাদরে ঘষতে থাকে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৬১১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ প্রেত
→ ঐতিহাসিক প্রেতাত্না!
→ প্রেতাত্নার অট্টহাসি
→ প্রেতের কান্না
→ প্রেতাত্মার জবান-বন্দি ! 
→ প্রেতাত্মার ডাক
→ তিন রাজার প্রেতাত্মা!
→ অনভি-প্রেত!!!!
→ অশুভ গলির তিন প্রেত [১ম অংশ]

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...