গল্পেরঝুড়ির এ্যাপ ডাউনলোড করুন - get google app
গল্পেরঝুড়ি ফানবক্স ! এখন গল্পের সাথেও মজাও হবে! কুইজ খেলুন , অংক কষুন , বাড়িয়ে নিন আপনার দক্ষতা জিতে নিন রেওয়ার্ড !

যারা একটি গল্পে অযাচিত কমেন্ট করছেন তারা অবস্যাই আমাদের দৃষ্টিতে আছেন ... পয়েন্ট বাড়াতে শুধু শুধু কমেন্ট করবেন না ... অনেকে হয়ত ভুলে গিয়েছেন পয়েন্ট এর পাশাপাশি ডিমেরিট পয়েন্ট নামক একটা বিষয় ও রয়েছে ... একটি ডিমেরিট পয়েন্ট হলে তার পয়েন্টের ২৫% নষ্ট হয়ে যাবে এবং তারপর ৫০% ৭৫% কেটে নেওয়া হবে... তাই শুধু শুধু একই কমেন্ট বারবার করবেন না... ধন্যবাদ...

সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান... জিজেতে আজে বাজে কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন ... অন্যথায় আপনার আইডি বা কমেন্ট ব্লক করা হবে... আর গল্প দেওয়ার ক্ষেত্রে গল্প দেওয়ার নিয়ম মেনে চলুন ... সার্বিকভাবে জিজের নীতিমালা মেনে চলার চেস্টা করুন ...

প্রেত

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Adom Ali (০ পয়েন্ট)



এক   রুমী বরাবরই একেবারে সাধারণ ছেলে। সাধারণ ছেলেদের মতো তাকে কেমন দেখাচ্ছে সে নিয়ে তার মাথাব্যথার শেষ ছিল না। ক্লাসের ফিটফাট ছেলেদের দেখে তাই তার ভিতরে হীনমন্যতা জেগে উঠতো। ঘুরেফিরে দুটি প্যান্ট পরেই তাকে ক্লাসে আসতে হয়, ব্যাপারটা অন্যেরা লক্ষ করছে কি না সে নিয়ে তার দুশ্চিন্তার সীমা নেই।টিউশনির টাকা পেয়ে সে যখন হাল ফ্যাশনের চওড়া কলারওয়ালা নতুন একটা শার্ট তৈরি করল তার ভিতরে তখন আনন্দের একটা জোয়ার বয়ে গিয়েছিল। সে সেই শার্ট পরে দোকানের সামনে দিয়ে হাঁটার সময় সাবধানে দোকানের আয়নায় নিজেকে লক্ষ করতো। তার চেহারামোটামুটি ভালো এ নিয়ে সে খুব সচেতন, গায়ের রংটা আরেকটু ফর্সা হলে তার আর কোনো দুঃখ থাকতো না। অন্যদের দেখাদেখি সে তার চুলকে কান ঢেকে ঝুলে পড়তে দিয়েছে, তাই সেগুলিকে আগের থেকে বেশি যত্ন করতে হয়। কাছে-পিঠে কেউ না থাকলে আজকাল সে তার পকেট থেকে ছোট একটা চিরুনি বের করে অনেক যত্ন করে চুল ঠিক করে নেয়। তার বয়সী অন্য যে কোনো ছেলেদের মতো রুমীরও মেয়েদের নিয়ে খুব আগ্রহ।রাস্তাঘাটে কোথাও কোনো মেয়ে তাকে আলাদা করে লক্ষ করে কি না সেটা জানার তার খুব কৌতূহল। কখনো কোনো কারণে কোনো মেয়ে ঘুরে দ্বিতীয়বার তার দিকে তাকালে সে সারাদিন ঘটনাটি ভুলতে পারে না। এমনিতে সে খুব মুখচোরা, কোনোদিন যেচে কোনো মেয়ের সাথে কথা বলবে এরকম সাহস নেই; অথচ প্রায়ই সে কল্পনা করে একটা আধুনিকা মেয়ে তার জন্যে পাগল হয়ে আছে। প্রতিবার নতুন টিউশনি নেবার আগে সে মনে মনে আশা করে একটি সুন্দরী মেয়েকে পড়াবে, কিন্তু কখনোই তা হয়ে ওঠেনি। কে জানে, সুন্দরী মেয়েদের বাবারা হয়তো উঠতি বয়সের কলেজের একটা ছেলের হাতে মেয়েকে অঙ্ক কষতে দেওয়ার সাহস পান না! রুমীর সবচেয়ে বড় সমস্যা তার নিজেকে নিয়ে। সে প্রাণপণ চেষ্টা করে কেউ যেন বুঝতে না পারে সে মফস্বলের ছেলে। ক্লাসের ফিটফাট ইংরেজি কথা বলা ছেলেদের সে মুগ্ধ বিস্ময়ে লক্ষ করে।শুদ্ধ ইংরেজিতে সে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে যেতে পারে কিন্তু মুখে মুখে সে ইংরেজিতে একটা কথা পর্যন্ত বলতে পারে না। চেষ্টা করে দেখেছে, তার গ্রাম্য ক্লাস-টিচারের সুর এসে পড়ে। বৃদ্ধ ক্লাস-টিচারের তাকে নিয়ে যত গর্বই থাকুক না কেন,রুমীর নিজেকে নিয়ে লজ্জার সীমা নেই। একসময় ফিটফাট ছেলেদের সাথে সে মেশার চেষ্টা করে দেখেছে, কিন্তু তাদের প্রচ্ছন্ন অবহেলা বুঝতে পেরে সে নিজের মাঝে গুটিয়ে গেছে। মাঝে মাঝে রুমী কল্পনা করে সে বিদেশ থেকে অনেক বিখ্যাত হয়ে ফিরে এসেছে, আর এইসব ফিটফাট ছেলেরা তার সাথে দেখা করতে এসেছে। সে যেন বিশুদ্ধ সাহেবি ইংরেজিতে বলছে : তোমাদের দেখেছি দেখেছি মনে হচ্ছে, কিন্তু ঠিক চিনতে পারলাম না তো। রুমীর এই ধরনের অনেক কল্পনা, সাধারণ ছেলের মতো তার কল্পনাগুলিও সাধারণ মোহ আর উচ্চাশা তাকে বাঁচিয়ে রাখে। যা কিছু বিদেশি তাতেই আজকাল তার প্রচণ্ড বিশ্বাস। নিজের দেশের রাজনীতি পর্যন্ত সে বিদেশি সাংবাদিকদের আলোচনা পড়ে শিখতে চেষ্টা করে। দেশকে নিয়ে সে আজকাল সত্যি সত্যি হতাশাগ্রস্ত, বিদেশিরা কীভাবে উন্নতি করে ফেলছে আর এ দেশের লোকেরা কীভাবে নিজেদের সর্বনাশ করছে এ ব্যাপারে আজকাল সে বুদ্ধিজীবীদের সাথে একমত। একবার দেশের বাইরে যেতে পারলে সে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না-এরকম একটা ধারণা আস্তে আস্তে তার ভিতরে গড়ে উঠছে। সার্থক জীবনের অর্থ বিদেশে প্রতিষ্ঠা, এ ব্যাপারে তার আজকাল আর কোনো সন্দেহ নেই। এই আশা নিয়েই সে আস্তে আস্তে বড় হয়ে উঠছিল, কিন্তু একদিন সেটাতে একটা চোট খেয়ে গেল। তখন পরীক্ষার মাস দুয়েক বাকি, পড়াশোনার খুবচাপ ।বিকেলে একটা টিউশনি করে রুমী খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ছাত্রটার আলাদা পড়ার ঘর নেই, কাজেই মধ্যবিত্তের সংসারের ঠিক মাঝখানে বসে থেকে তাকে পড়াতে হয়। দৈনন্দিন তিক্ত ঘটনাবলির মাঝে বসে থেকে প্রায়-নির্বোধ একটি ছেলেকে এক জিনিস দশবার করে বোঝাতে তার দুই ঘণ্টা সময়কে দশ ঘণ্টার মতো দীর্ঘ মনে হয়। তার ওপর কোনোদিনই তাকে কিছু খেতে দেয় না, প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়ে সে উঠে আসে। চা খেয়ে খিদে নষ্ট করার জন্যে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকার কাছাকাছি একটা চায়ের দোকানে যেতো। আজকাল সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এসে আড্ডা জমায়। তাদের দেখা একটা মজার কাজ। একজন-দুজন রুমীর মনের মতো বের হয়ে পড়ে, তাদের সে মুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে লক্ষ করে সময় কাটিয়ে দেয়।নিজের অগোচরে সে তাদের মতো হওয়ার চেষ্টা করে-কথাবার্তায়, হাসিতে, পোশাকে, হাঁটার ভঙ্গিতে। সেদিন বৃষ্টি বলে চায়ের দোকানে ভিড় কম। রুমী জানালার পাশে একটা চা, একটা শিঙ্গাড়া নিয়ে আরাম করে বসেছে। তার ঠিক পাশেই একজন গভীর মনোযোগ দিয়ে গাঁজাভরা একটা সিগারেট নির্বিকারভাবে টেনে যাচ্ছে।সামনের টেবিলে বসে দুজন তর্ক করছে-বিষয়বস্তু রুমীর জ্ঞানের বাইরে, কোনো একজন আমেরিকান অর্থনীতিবিদের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের যৌক্তিকতা। তর্ক উত্তপ্ত হতেই কথাবার্তায় ইংরেজি বের হয়ে আসতে থাকে। কি সুন্দর, উচ্চারণ, কি সুন্দর কথা বলার ভঙ্গি, কি চমৎকার শব্দ চয়ন! রুমী মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। দাদা কি করে আপনাদের? রুমী গলার স্বর শুনে চমকে তাকায়। গাঁজা খাওয়া লোকটি লাল চোখে কিন্তু মুখে একটা হাসি এনে ছেলে দুটিকে জিজ্ঞেস করছে।ছেলে দুটি থতমত খেয়ে থেমে গিয়ে একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকাল। প্রশ্নটি ঠিক বুঝতে পারেনি ভেবে লোকটি গলা উঁচিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল, আপনাদের দাদারা কি করতেন? এক্সকিউজ মি? আপনার দাদা, মানে আপনার বাবার বাবার বাবা কি করতেন? কেন? গরিব ছিলেন কি না? চাষা, কি গোয়ালা, কি মাঝি? হোয়াট? একজনের ফর্সা মুখ টকটকে লাল হয়ে ওঠে, হোয়াট ডু ইউ মিন? আহা-হা-হা রাগ করেন কেন? আমি শুধু জানতে চাইছি আপনাদের দাদারা কি করতেন? কেন? ইটস নান অব ইওর বিজনেস।আমার দাদা যা খুশি করুক তাতে আপনার কি? লোকটার মুখে তখনো হাসি। পান খাওয়া দাঁত বের করে বলল, বলতে না চাইলে বলবেন না। লজ্জা করলে বলবেন কেন? একটা বড় ঝগড়া লেগে যাবার উপক্রম, অন্য ছেলেটা কোনোমতে থামিয়ে দিয়ে তাকে টেনে নিয়ে বের হয়েগেল। গাঁজা খাওয়া লোকের সাথে ঝগড়া করে কখনো, কি বলতে গিয়ে কি বলেছে! রুমী আড়চোখে লোকটাকে দেখার চেষ্টা করে, এমন অভদ্র লোকও আছে! লোকটা তখনো খিক খিক করে হাসছে যেন একটা ভারি মজার ব্যাপার হয়েছে। রুমীর চোখে চোখ পড়তেই বলল, দশ টাকা বাজি। রুমী থতমত খেয়ে বলল, বাজি? হ্যাঁ। ওই দুইটার ভিতরে অন্তত একটা গয়লা না হয় ধোপা ছিল! কেন? রুমী একটু উত্তপ্ত হয়ে যোগ না করে পারল না, ধোপা কিংবা গয়লা হওয়া দোষ নাকি? দোষ কেন হবে? লোকটা সাগ্রহে মাথা এগিয়ে আনে, দাদা ধোপা ছিল তাই বাপ খুব কষ্ট করে বড় হয়েছে। এখন ছেলেদের তাই সাহেব বানাচ্ছে। ভুলতে পারে না তো নিজে ধোপার পোলা! এমন সাহেবের সাহেব যে বাড়িতেও ইংরেজি ছাড়া কথা বলে না। রুমী যুক্তিটার মাথামুণ্ড কিছু না বুঝে চুপ করে রইল। লোকটার তাতে নিরুৎসাহিত হবার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না, নিজের মনে সে মা-বাপ তুলে গালিগালাজ দেওয়া শুরু করে। অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসে রুমী তাড়াতাড়ি নিজের চা শেষ করার চেষ্টা করতে থাকে। উঠে পড়া ভালো, কে জানে আবার কখন তাকে ধরে বসবে। ইংরেজি! ইংরেজি বলেন! লোকটা আবার শুরু করে, জার্মান বলে না কেন? স্প্যানিশ বলে না কেন? ফ্রেঞ্চ বলে না কেন? প্রশ্নগুলি রুমীকে নয়, তাই রুমী চুপ করে থাকে। তাড়াতাড়ি চা খেতে গিয়ে তার জিব গেছে পুড়ে, রাগটা উঠছে এই লোকটার ওপর। লোকটা হঠাৎ দুই হাত মাথার ওপরে তুলে নাচার ভঙ্গি করল, ইংরেজি বলে কারণ তাদের ব্রিটিশ বাবারা ইংরেজিতে কথা বলেন। তারা তিনশো বছর তাদের পাছায় লাথি মেরে গেছেন, এখন তাদের ভাষায় কথা না বললে চলে কেমন করে? কর্তায় কইছে শালার ভাই, আনন্দের আর সীমা নাই! লোকটা হঠাৎ তার দিকে ঘুরে বলল, ওই ব্রিটিশ বাবারা কি তাদের মানুষ বলে জানতো? জালিয়ানওয়ালাবাগে ডায়ার যখন চারশো লোককে কুত্তার মতো গুলি করে মেরে নিজের দেশে ফিরে গেছে তখন তার দেশের লোক কি করেছিল? রুমীর চা শেষ। সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, কি করেছিল? ব্রিটিশেরা চাঁদা তুলে ডায়ারকে ছাব্বিশ হাজার পাউন্ড উপহার দিয়েছিল। আর আমরা এখনো সেই ব্রিটিশের ইয়ে ধরে লাফাই! লোকটা অশ্লীল একটা কথা বলে মাটিতে একদলা থুতু ফেলল। রুমী আর দাঁড়াল না, পয়সা দিয়ে দ্রুত বের হয়ে এলো। লোকটার পুরোপুরি মাথা খারাপ। পরের কয়দিন কিন্তু ঘুরেফিরে লোকটার কথাগুলি মনে হতে থাকে রুমীর। বিশেষ করে সেই ইংরেজটার কথা, এ দেশের মানুষকে খুন করেছিল বলে যাকে নিজের দেশের লোকেরা খুশি হয়ে চাঁদা তুলে টাকা উপহার দিয়েছে। কথাটি কতটুকু সত্যি জানার জন্যে ওর ভিতরটা উশখুশ করতে থাকে। কাউকে জিজ্ঞেস করে লাভ নেই, ক্লাসের বন্ধু-বান্ধবেরা তার মতোই ইতিহাস বইয়ে শুধু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের গুণপনা আর বীরত্বের কথা পড়ে এটা সত্যি কথাগুলো কোথাও লেখা নেই।রুমী কথা প্রসঙ্গে ফিটফাট ছেলেগুলিকে জিজ্ঞেস করে একদিন, তারাও কিছু জানে না। একজন শুধু বলল টাগোর নাকি ওই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদস্বরূপ নিজের স্যার উপাধি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। রুমী স্কুলে শিখেছিল প্রপার নাউনের নাকি ইংরেজি হয় না, কিন্তু ঠাকুরের ইংরেজি কেমন করে টাগোর হলো? রুমী অবাক হলো আগে কখনো ওর এই প্রশ্নটি মনে হয় নি কেন ভেবে। কয়দিন পর এক বিকেলে কোনো কাজ খুঁজে না পেয়ে সে পাবলিক লাইব্রেরিতে ‘পাক ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশ’ নামে একটা বই বের করে পড়তে বসে যায়। রাতে পরীক্ষার পড়া আছে তাই বেশিক্ষণ পড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো না। এমনিতেও তার পাঠ্যবই এবং পত্রপত্রিকা ছাড়া আর কিছু পড়ার অভ্যাস নেই, যে কোনো কথা তিন-চারবার পড়ে বুঝতে হয়।সন-তারিখ দিয়ে কণ্টকিত ইতিহাস পড়ে কিছু বুঝে ওঠাও মুশকিল। রুমী ঘণ্টা দুয়েক চেষ্টা করে খানিকটা বিরক্ত হয়েই উঠে এলো। প্রথম যে ইংরেজ মোগল বাদশাহদের সুনজরে পড়ার চেষ্টা করেছিল সে ব্যাটা পরিষ্কার জোচ্চোর ছিল, দুই ঘণ্টা পড়ে এইটুকু মাত্র জ্ঞান লাভ হয়েছে। ফিরে যাবার সময় রুমী ঠিক করে এই শেষ, আজে বাজে কাজে সময় নষ্ট করবে না। কবে কখন কোন্‌ ইংরেজ কার কি ক্ষতি করেছে তাতে তার কি? পরদিন বিকেলে কিন্তু রুমী আবার পাবলিক লাইব্রেরিতে ফিরে এসে ঠিক ওই বইটা খুঁজে বের করে। সেদিন রুমী লাইব্রেরি থেকে বের হয়ে আসে অনেক রাতে, লাইব্রেরি বন্ধ হয়ে যাবার পর। পরীক্ষার পড়া আর হলো না, কিন্তু তাতে এমন কিছু ক্ষতি হবে না। সে মাঝে মাঝেই এরকম ছুটি নেয়, বিশেষ করে পরীক্ষার আগে। পড়ার চাপটা মাঝে মাঝে অন্য কিছু করে বের করে দিতে হয়। আজ অবিশ্যি অন্য ব্যাপার। সিপাহি বিদ্রোহের পুরোটা শেষ না করে সে কিছুতেই উঠে আসতে পারতনা। ও জানতো না ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রভুত্ব দূর করার শেষ চেষ্টাকে ইংরেজরা কি নির্মমভাবে দমন করেছিল। বিদ্রোহী সিপাহিদের ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেই সন্তুষ্ট হয় নি, তাদের মৃতদেহ কানপুর থেকে এলাহাবাদ পর্যন্ত পুরো রাস্তার দুপাশের গাছ থেকে ঝুলিয়ে রেখেছিল। নীলক্ষেতের অন্ধকার রাস্তায় বড় গাছগুলির নিচ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রুমীর মনে হয় সে বুঝি কানপুরের রাস্তা ধরে হাঁটছে, আর দুপাশের গাছ থেকে বিদ্রোহী সিপাহিদের মৃতদেহ ঝুলছে─ প্রচণ্ড রাগে রুমীর দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। রুমীর পরিবর্তন হয় খুব তাড়াতাড়ি। শুধু পাক-ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাস পড়েই ওর কাছে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যায়। ইংরেজদের দুইশো বছরের শাসন এ দেশের মানুষের মনোভাবকে কি রকমভাবে নষ্ট করেছে সে প্রথমবার বুঝতে পারে।এখনো কেউ ইংরেজি লিখতে গিয়ে ভুল করলে তার লজ্জায় মাথা কাটা যায়, কিন্তু বাংলা লিখতে ভুল করলে ভিতরে এতটুকু অপরাধবোধ পর্যন্ত জন্মায় না। যে ছেলেদের দেখলে একসময় রুমী মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতো আজকাল তাদের দেখলে তার ঘেন্নায় বমি আসতে চায়। আরও অনেক ব্যাপারেই রুমীর ধারণা আজকাল স্পষ্ট হয়ে আসছে। আগে রাজনীতি নিয়ে কখনো মাথা ঘামায় নি, ক্লাসের যে কয়টা ছেলে রাজনীতি করতো তাদের জন্যে ওর অনুকম্পা হতো, আজকাল তাদের সে রীতিমতো শ্রদ্ধা করা শুরু করেছে। ভুল হোক আর শুদ্ধ হোক, তারা দেশের জন্যে নিজেদের সময়, শক্তি, সামর্থ্য এমনকি ভবিষ্যৎ পর্যন্ত নষ্ট করতে প্রস্তুত। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়সী ছেলেরা কীভাবে দেশের জন্যে যুদ্ধ করেছে সে খানিকটা বুঝতে পারে। নিজের দেশকে নিয়ে তার ভিতরে গর্ব হতে থাকে, গোপন প্রেমের মতো সেটা ওকে আশ্চর্যভাবে আনন্দ দেয়। আবার একদিন সেই অভদ্র মাথা খারাপ লোকটির সাথে দেখা হলো রুমীর। দেখা হলো সেই একই জায়গায়, একইভাবে, লোকটা গম্ভীর মুখেনির্বিকারভাবে গাঁজা ভরা সিগারেট টানছে। আজকে কেন জানি রুমীর লোকটাকে এতটা খারাপ লাগল না, সামনে বসে বলল, ভালো আছেন? মাথা নেড়ে হাসল লোকটি, যেন কতকালের চেনা। রুমী বুঝতে পারে লোকটি তাকে চেনে নি, চেনার কথা না। চায়ে চুমুক দিয়ে রুমী জিজ্ঞেস করল, মনে আছে একদিন দুজনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তাদের দাদারা কি করে? মনে পড়ার সাথে সাথে কৌতুকে লোকটার চোখ নেচে ওঠে, দশ টাকা বাজি। অন্তত একটার বাবা গয়লা না হয় ধোপা...রুমী একটু হেসে প্রসঙ্গটা পাল্টানোর জন্যে বলে, আপনি ডায়ারের কথা বলেছিলেন মনে আছে? যে জালিয়ানওয়ালাবাগে... বলেছিলাম নাকি? হ্যাঁ। ডায়ারকে তো লন্ডনে গুলি করে মেরেছিল।হ্যাঁ, হ্যাঁ। উধম সিং, উধম সিং! অন্য ডায়ারকে মারতে পারে নি ওই ব্যাটা আগেই মরে গেছে। একই সময়ে একই জায়গায় দুই কুত্তার বাচ্চা দুইটার নামই এক। লোকটা হঠাৎ কথা বন্ধ করে ঘুরে ভালো করে রুমীকে দেখল, তোমার কি ইতিহাসে খুব উৎসাহ? না, খুব নয়। আসলে সেদিন আপনার মুখে জালিয়ানওয়ালাবাগের কথা শুনে একটু পড়ে দেখছিলাম। লোকটার মুখ খুশিতে ছেলেমানুষের মতো হয়ে ওঠে, আমার কথা শুনে? সত্যি? তুমি আরও পড়তে চাও? কি পড়বে বলো?এইভাবে কিবরিয়া ভাইয়ের সাথে পরিচয় রুমীর। কিবরিয়া ভাইয়ের কোনো ভালো গুণ নেই, তিনি স্বার্থপর এবং হিংসুটে। পৃথিবীর কোনো লোককে তিনি পছন্দ করেন না। তিনি ভীষণ সাম্প্রদায়িক। বয়স্ক লোকদের মাঝে হিন্দুবিদ্বেষ বিচিত্র নয়, কিন্তু কিবরিয়াভাইয়ের ভিতর এই বয়সে এত হিন্দুবিদ্বেষ কীভাবে গড়ে উঠেছে বোঝা মুশকিল। তিনি যে শুধু সাম্প্রদায়িক তাই নয় তার প্রখর আঞ্চলিকতাবোধ! কোনো কোনো জেলার লোকজনের সাথে তিনি কথা পর্যন্ত বলতে রাজি নন। দেশের প্রায় সব কজন বুদ্ধিজীবীকে তিনি উঠতে-বসতে মুখ খারাপ করে গালি দেন। কে কবে কখন কি ধরনের নোংরামি করেছিল সব তার নখদর্পণে। নিজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কাজেই মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স্ক শিক্ষকদের দুবেলা মুণ্ডুপাত করার অধিকার আছে তাঁর।সব সময়েই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলেন, তাই কেউ প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে পারে না। এমনিতে খিটখিটে এবং বদমেজাজি, সাধারণ লোকজনের জন্যে কোনো সম্মানবোধ নেই। রুমী নিজে কিবরিয়া ভাইকে এক রিকশাওয়ালার সাথে কথা কাটাকাটি করে চড় মারতেদেখেছে। তারপর সমস্ত রিকশাওয়ালা একত্র হয়ে উল্টে কিবরিয়া ভাইকে সে কি মার! রুমী কোনোমতে সেবার প্রাণ নিয়ে পালিয়েছে। এরপর থেকে তিনি রিকশাওয়ালাদের দুই চোখে দেখতে পারেন না। কিবরিয়া ভাইয়ের বয়স খুব কম নয়, কিন্তু এখনো বিয়ে করেন নি, রুমীর ধারণা কোনো মেয়ে বিয়ে করতে রাজি হয় নি। জগৎ সংসারের ভালোমন্দ সবকিছুর ওপর এরকম খেপে থাকা লোক রুমী আগে কখনো দেখে নি। কিবরিয়া ভাইয়ের একটি ব্যাপার অবিশ্যি প্রশংসা করার মতো, সেটি হচ্ছে তাঁর পড়াশোনা।গল্প, কবিতা এবং উপন্যাস ছাড়া আর সব ধরনের বই পড়ায় তাঁর সমান উৎসাহ। এমন কোনো বিষয় নেই যা সম্পর্কে তিনি পড়েন নি এবং তাঁর বেশ ভালো ধারণা নেই। এতে অবিশ্যি লাভের চেয়ে ক্ষতি হয়েছে বেশি, তর্কবিতর্ক কথা কাটাকাটিতে তিনি প্রতিপক্ষকে চেপে ধরে তাঁর সমস্ত জ্ঞানভাণ্ডার এত নির্দয়ভাবে ব্যবহার করেন যে প্রতিপক্ষ কখনো তাঁকে ক্ষমা করতে পারে না। রুমী এখন পর্যন্ত একটি লোকও খুঁজে পায় নি যে কিবরিয়া ভাইকে পছন্দ করে বা যাকে কিবরিয়া ভাই পছন্দ করেন। সে নিজে তাঁর থেকে অনেক ছোট বলে কিবরিয়া ভাই কখনো তার সাথে লাগেন নি। রুমী যে কিবরিয়া ভাইকে খুব পছন্দ করে তা নয়, কিন্তু একজন মানুষকে ভালোভাবে বুঝে নিলে তখন তার খারাপ কিংবা ভালো কিছুতেই কিছু এসে যায় না।তাছাড়া কিবরিয়া ভাইয়ের সাথে কথা বলায় একটা আনন্দ আছে, অনেকটা পরচর্চার আনন্দের মতো। কখন কি পড়তে হবে এবং কোন্ বইয়ে কি পাওয়া যাবে কিবরিয়া ভাই খুব ভালো বলে দিতে পারেন। তিনি নিজে রুমীকে অনেক বই জোগাড় করে দিয়েছেন যেগুলি তার পক্ষে পাওয়া অসম্ভব ছিল। *****আপনাদের সমর্থন পেলে খুব শীঘ্রই ২য় পার্ট দেব।*****


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৯৬৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ প্রেত
→ ঐতিহাসিক প্রেতাত্না!
→ প্রেতাত্নার অট্টহাসি
→ প্রেতের কান্না
→ প্রেতাত্মার জবান-বন্দি ! 
→ প্রেতাত্মার ডাক
→ তিন রাজার প্রেতাত্মা!
→ অনভি-প্রেত!!!!
→ অশুভ গলির তিন প্রেত [১ম অংশ]

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...