গল্পেরঝুড়ির এ্যাপ ডাউনলোড করুন - get google app
গল্পেরঝুড়ি ফানবক্স ! এখন গল্পের সাথেও মজাও হবে! কুইজ খেলুন , অংক কষুন , বাড়িয়ে নিন আপনার দক্ষতা জিতে নিন রেওয়ার্ড !

গল্পেরঝুড়িতে লেখকদের জন্য ওয়েলকাম !! যারা সত্যকারের লেখক তারা আপনাদের নিজেদের নিজস্ব গল্প সাবমিট করুন... জিজেতে যারা নিজেদের লেখা গল্প সাবমিট করবেন তাদের গল্পেরঝুড়ির রাইটার পদবী দেওয়া হবে... এজন্য সম্পুর্ন নিজের লেখা অন্তত পাচটি গল্প সাবমিট করতে হবে... এবং গল্পে পর্যাপ্ত কন্টেন্ট থাকতে হবে ...

সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান... জিজেতে আজে বাজে কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন ... অন্যথায় আপনার আইডি বা কমেন্ট ব্লক করা হবে... আর গল্প দেওয়ার ক্ষেত্রে গল্প দেওয়ার নিয়ম মেনে চলুন ... সার্বিকভাবে জিজের নীতিমালা মেনে চলার চেস্টা করুন ...

কেপলার টুটুবি {8}

"সাইন্স ফিকশন" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান ☠Sajib Babu⚠ (২ পয়েন্ট)



》》মুহম্মদ জাফর ইকবাল《《 মাইক্রোফোনের সুইচটি অন করে লাল চুলের মেয়েটি বলল, তুমি কী আমার কথা শুনতে পাচ্ছ? মস্তিষ্কটি ভারী গলায় বলল, হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছি। লাল চুলের মেয়েটি বলল, আজকে খুব একটা বিশেষ দিন। আজকে তোমার সাথে অবশ্যই কথা বলতে হবে। মস্তিষ্কটি কোনো উত্তর দিল না। মেয়েটি বলল, কী হল তুমি কথার উত্তর দিচ্ছ না কেন? তুমি জান, আমি তোমার উচ্ছাসে অংশ নিতে পারি না। যেটি তোমার বিশেষ দিন পৃথিবীর মানুষের জন্যে সেটি নিশ্চয়ই খুব অশুভ একটি দিন। লাল চুলের মেয়েটি খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল, তুমি ঠিকই অনুমান করেছ! তুমি শুনতে চাও না কেন এটি মানুষের জন্যে অশুভ? না। আমি শুনতে চাই না। না চাইলেই হবে না। তোমাকে শুনতে হবে। এগুলো গোপন কথা। ভয়ংকর গোপন কথা। সারা পৃথিবীতে এখন আমরা মাত্র কয়েকজন রবোমানব এটি জানি। এটা কাউকেই বলার কথা না। কিন্তু আমি নিশ্চিন্তে তোমাকে সবকিছু বলতে পারি! তোমার মতো নিরাপদ শ্রোতা সারা পৃথিবীতে আর একটিও নেই। আমি শুনতে চাই না। তোমাকে শুনতে হবে। লাল চুলের মেয়েটি কঠিন মুখে বলল, তোমাকে অবশ্যই শুনতে হবে। আমার যা ইচ্ছে হয় আমি তোমাকে বলব তোমার তার সবকিছু শুনতে হবে! লাল চুলের মেয়েটি তার পানীয়ের গ্লাসে খানিকটা উত্তেজক পানীয় ভরে এনে জানালায় পা ভাঁজ করে বসে বলল, তুমি শুনে নিশ্চয়ই আতংকিত হবে, আমরা আমাদের কাউন্ট ডাউন শুরু করেছি। আগামীকাল বিকেল তিনটা হচ্ছে আমাদের আক্রমণের সময়। পৃথিবীর সব বড়বড় আক্রমণ হয় ভোর রাতে। আমরা ঠিক করেছি আমাদের আক্রমণটি হবে দিনের আলোতে। সন্ধ্যেবেলা সব মানুষ যখন সারাদিনের ব্যস্ততা কাটিয়ে নিশ্চিন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে বিশ্রাম নেবে তখন আমরা আমাদের ঘোষণাটি প্রচার করব। ঘোষণায় কী বলা হবে শুনতে চাও? মস্তিষ্কটি নিচু গলায় বলল, না শুনতে চাই না। তুমি শুনতে চাও কি না চাও তাতে কিছু আসে যায় না। ঘোষণাটি হবে এরকম, বলা হবে, পৃথিবীর রবোমানবেরা। তোমরা যে ঘোষণাটির জন্য দীর্ঘদিন থেকে অপেক্ষা করছিলে, আমরা এখন সেই ঘোষণাটি করতে চাই। আজ থেকে পৃথিবীতে সকল বৈষম্য সকল অবিচারের অবসান হয়েছে। এই পৃথিবীতে যে সম্প্রদায়ের বুদ্ধিমত্তা বেশি, যে সম্প্রদায়ের মেধা বেশি, ক্ষমতা বেশি সেই সম্প্রদায়ের অধিকারও বেশি। মানুষের যে অযোগ্য নেতৃত্বের কারণে পৃথিবীতে সভ্যতা গড়ে উঠতে পারছে না, সেই নেতৃত্বকে অপসারণ করা হয়েছে। প্রিয় রবোমানব এবং মানুষেরা তোমরা শুনে খুশি হবে যে নেতৃত্বের কারণে পৃথিবীতে আমাদের অত্যাচার নির্যাতন অবিচার আর বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে সেই নেতৃত্বকে প্রকাশ্যে বিচারের সম্মুখীন করা হবে। মস্তিষ্কটি আর্ত চিৎকার করে উঠল, না! লাল চুলের মেয়েটি খিলখিল করে হেসে ওঠে বলল, না? কেন না? এটা হতে পারে না। কিছুতেই হতে পারে না। মেয়েটি তার পানীয়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ। এটি আসলেই হতে পারে না। এটি আসলে একটা মিথ্যা ঘোষণা। বিজ্ঞান আকাদেমীর এগারোজন সদস্যকে বিচার করা হবে সেই ঘোষণাটি আসলে সত্যি নয়। কেন সত্যি নয় জান? না। জানি না। তার কারণ, আগামীকাল বিকেল তিনটার সময় সবার আগে তাদের বাসায় গিয়ে তাদের হত্যা করা হবে। কে কাকে হত্যা করবে সেটাও ঠিক হয়ে গেছে। আমাদের সর্বাধিনায়ক হত্যা করবে তোমাদের মহামান্য থুলকে! নিজের হাতে। সেই দৃশ্যটি দেখার জন্যে আমার সমস্ত শরীর আকুলি বিকুলি করছে! মেয়েটি অপ্রকৃতস্থের মতো একটা শব্দ করে বলল, আহ্! সেই দৃশ্যটি কী অভূতপূর্ব হবে তুমি চিন্তা করতে পার? মস্তিষ্কটি কাতর গলায় বলল, আমি চিন্তা করতে চাই না। আমি শুনতে চাই। তোমার দোহাই লাগে– মেয়েটির শরীরে উত্তেজক পানীয় কাজ করতে শুরু করেছে। সে মাটিতে পা দাপিয়ে বলল, তোমাকে শুনতে হবে হতভাগা মস্তিষ্ক! তোমাকে সব শুনতে হবে। নেটওয়ার্ক দখল করে আমরা কীভাবে সব রবোমানবকে নির্দেশ পাঠাব তোমাকে সেটা শুনতে হবে। কীভাবে অস্ত্রাগারের দরজা খুলে দেয়া হবে সেটা শুনতে হবে। কীভাবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো দখল হবে শুনতে হবে, কীভাবে শস্যভাণ্ডার দখল হবে শুনতে হবে, কীভাবে সুস্থ সবল মানুষের মাথায় ইমপ্লান্ট বসিয়ে রবোমান তৈরি করব শুনতে হবে। মস্তিষ্কটি আর্ত চিৎকার করে বলল, শুনতে চাই না! আমি কিছুই শুনতে চাই–দোহাই তোমার– লাল চুলের মেয়েটি অপ্রকৃতস্থের মতো হাসতে থাকে। কিছুতেই হাসি থামাতে পারে না। সাতজনের ছোট দলটি নিঃশব্দে হেঁটে যেতে থাকে। তাদের নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোথাও কোনো শব্দ নেই। পৃথিবী হলে এখানে পাখির ডাক থাকত, ঝি ঝি পোকার ডাক থাকত { গাছের পাতার মাঝে বাতাসের শিরশির শব্দ থাকত। দূর থেকে কোনো একজন নিঃসঙ্গ ভবঘুরের গানের সুর ভেসে আসত। এখানে কিছু নেই। ইহিতার কাছে এই নৈঃশব্দটুকু অসহ্য মনে হয়। ইহিতা দূরে তাকাল। সূর্যটি অস্ত যাচ্ছে, লাল এই গ্রহে দূরে নিপ্রাণ সূর্যটিকে কেমন যেন অপরিচিত মনে হয়। ঠিক পৃথিবীর মতোই খুব ধীরে ধীরে সন্ধ্যে নেমে আসবে। একটু পর ঘুটঘুটে অন্ধকারে ড়ুবে যাবে। মঙ্গল গ্রহের কুৎসিত চাঁদ দুটি আকাশে থাকবে কী না কে জানে, থাকলেই সেটা কতোটুকু আলো দিতে পারবে সেটাই বা কে জানে। শৈশবে এই গ্রহটিকে নিয়ে সে কতো পড়াশোনা করেছে, তখন কী সে কল্পনা করেছিল একটি নির্বোধ কম্পিউটারের কারণে এই গ্রহটিতে নির্বাসিত হয়ে যাবে? একটি ঢালু পাহাড়ের নিচে এসে সুহা বলল, আমরা এখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিই। ক্লদ মনে হয় একটু ক্লান্ত হয়ে গেছে। ক্লদ বলল, উঁহু। আমি ক্লান্ত হই নি। আমি কখনো ক্লান্ত হই না। ইহিতা বলল, চমৎকার! কিন্তু পরিশ্রম করলে ক্লান্ত হওয়াটা দোষের কিছু নয়। তুমি যদি ক্লান্ত হও, তাহলে আমাদের বল। আমরা তোমাকে ট্রান্সপোর্টারে বসিয়ে নিয়ে যাব। কোনো পরিশ্রম ছাড়াই তখন যেতে পারবে। টুরান বলল, আমাদের একটা বাই ভার্বাল থাকলে চমৎকার হতো, অনেক তাড়াতাড়ি যেতে পারতাম। টর দাঁত কিড়মিড় করে বলল, হতভাগা ট্রিনিটি আমাদের ছোট একটা স্কাউটশিপে করে এখানে পাঠিয়েছে, খাবার আর পানি নিয়েই টানটানি, এখানে বাই ভার্বাল কেমন করে পাঠাবে? ৮৪ নীহা আপন মনে তার কুগুরাভ সমীকরণ সমাধান খুঁজে যাচ্ছিল, তার চারপাশে সবাই কে কী বলছে ভালো করে শুনছিল না। হঠাৎ করে সে বলল, আমার অনেকক্ষণ থেকে একধরনের অস্বস্তি হচ্ছে। আমি কেন জানি আমার ভাবনায় মনোযোগ দিতে পারছি না। কেন? আমার–আমার—নীহা তার ব্যাকটিকে শেষ না করে থেমে গেল। ইহিতা জানতে চাইল, তোমার কী? আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, কেউ আমাদের চোখে চোখে রাখছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন আমাদের লক্ষ করছে। কেমন জানি অশুভ একটা অনুভূতি। সুহা বলল, সেটি হতেই পারে। আমরা সবাই তেজস্ক্রিয় প্রাণীকে নিয়ে ভয়ে ভয়ে আছি। নীহা মাথা নাড়ল, বলল, না সেরকম নয়। আমার অনুভূতিটি অনেক বাস্তব। মনে হচ্ছে কেউ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। চারদিকে অন্ধকারমনে হচ্ছে অন্ধকারের বাইরে অনেকগুলো চোখ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। টুরান কষ্ট করে একটু হাসির মতো শব্দ করল, বলল, তেজস্ক্রিয় প্রাণী নিয়ে ভয় আমার ভেতরেও আছে। কিন্তু অশুভ অনুভূতি বা অন্ধকারে চোখ এগুলো তোমার কল্পনা। কারণ তেজস্ক্রিয় প্রাণী যদি কাছাকাছি আসে তাহলে আমাদের মিটারে আমরা রিডিং পাব। এই দেখো এখানে কোনো রিডিং নেই। বলে টুরান তেজস্ক্রিয়তা মাপার ছোট যন্ত্রটি নীহাকে দেখাল। ঠিক তখন তেজস্ক্রিয়তা মাপার যন্ত্রটা থেকে হঠাৎ করে কট কট করে এক ধরনের শব্দ হতে থাকে। সবাই বিস্ফারিত চোখে মিটারটির দিকে তাকিয়ে থাকে। সেখানে কাটাটি নড়ছে, কিছু আলো জ্বলতে নিভতে থাকে আর শব্দটা দ্রুততর হতে থাকে। ইহিতা নিচু গলায় বলল, নীহার ধারণা সঠিক। প্রাণীগুলো আমাদের দিকে আসছে। নীহা আর্ত চিৎকার করে বলল, সর্বনাশ! সুহা বলল, আমরা কী করব? ইহিতা বলল, প্রাণীগুলোকে ঠেকানোর চেষ্টা করতে হবে। কীভাবে? অস্ত্র দিয়ে। ইহিতা ডানে বামে তাকাল, বলল, পিছনে বড় পাথরগুলো আছে, এখানে দাঁড়াই তাহলে শুধু সামনের দিকে লক্ষ রাখতে হবে। তাড়াতাড়ি প্রস্তুতি নাও। শোনো খুব কাছে না আসা পর্যন্ত গুলি কর না। গুলি যেন লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। সবাই ছুটে বিশাল পাথরটাকে পিছনে রেখে দাঁড়াল। ইহিতা হেলমেটের সুইচ টিপে সেটাকে ভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর জন্যে সংবেদনশীল করার চেষ্টা করে। অবলাল আলোতে কিছু দেখতে পেল না কিন্তু আলট্রাভায়োলেট তরঙ্গে যেতেই সে প্রাণীগুলোকে স্পষ্ট দেখতে পায়। অনেকগুলো প্রাণী গুড়ি মেরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। প্রাণীর শরীরের যে জায়গা থেকে অতিবেগুনি রশ্মি বের হচ্ছে শুধু সেই অংশটুকু দেখতে পাচ্ছে তাই প্রকৃত আকারটা বোঝা যাচ্ছে না। অনুমান করা যায় প্রাণীটি আকারে খুব উঁচু নয়–হাত-পা থাকতে পারে, দুলতে দুলতে এগিয়ে আসছে। ইহিতা ফিসফিস করে বলল, তোমাদের হেলমেট অতিবেগুনি রশ্মিতে সংবেদনশীল করে নাও। নীহা জানতে চাইল, তাহলে কী হবে? প্রাণীগুলো দেখতে পাবে। নীহার সাথে সাথে অন্য সবাই তাদের হেলমেটের গগলস অতি বেগুনি রশ্মিতে সংবেদনশীল করে নিল, সাথে সাথে দুলতে দুলতে এগিয়ে আসা প্রাণীগুলো দেখতে পায়। টর চাপা স্বরে একটা কুৎসিৎ গালি দিয়ে বলল, আরেকটু কাছে আয় হতভাগারা–অনেকদিন কারো উপর গুলি চালাই নি। ইহিতা ফিসফিস করে বলল, সাবধান, প্রয়োজন না হলে গুলি করো না। কেমন করে বুঝব প্রয়োজন নেই! যদি দেখ প্রাণীগুলো থেমে গেছে। যদি দেখ আমাদের দিকে এগিয়ে না এসে ইতস্তত অন্যদিকে যাচ্ছে। কেন থেমে যাবে? কেন ইতস্তত অন্যদিকে যাবে? ইহিতা ফিসফিস করে বলল জানি না। শুধু দেখ যায় কি না। সবাই অস্ত্র তাক করে নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে ঠিক তখন যেন ইহিতার ধারণাকে সত্যি প্রমাণ করার জন্যেই প্রাণীগুলোর গতি কমে আসে, প্রাণীগুলোর অনেকগুলো থেমে যায়, অনেকগুলো ইতস্তত এদিক-সেদিক হাঁটতে থাকে। টুরান ফিসফিস করে বলল, কী হয়েছে? ইহিতা বলল, সবাই চুপ। কেউ একটা কথা বলবে না। একটা শব্দ করবে। কোনো কিছু না নড়লে প্রাণীগুলো দেখতে পায় না। কেউ নড়বে না। একেবারে কাছে এলেও নড়বে না। সবাই নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে থাকে। প্রাণীগুলো ইতস্তত এদিক-সেদিক ছড়িয়ে পড়ে। একটা প্রাণী তাদের কাছাকাছি এসে ডানদিকে সরে যায় সেখান থেকে হঠাৎ করে ঘুরে সোজাসুজি তাদের দিকে এগিয়ে আসে। সুহা ফিসফিস করে বলল, সর্বনাশ! অন্য কেউ কোনো কথা বলল না। সবাই দেখল কিছু একটা দুলতে দুলতে তাদের দিকে আসছে। কাছাকাছি আসার পর প্রথম প্রাণীটার অবয়ব স্পষ্ট দেখা যায়। রেডিয়েশন মিটারটি নিঃশব্দ করে রাখা আছে বলে সেটি শব্দ করছে না কিন্তু দেখা যাচ্ছে প্রচণ্ড রেডিয়েশনে তার কাটাটি থরথর করে কাঁপছে। প্রাণীটি আরো কাছে এগিয়ে আসে, এটি পৃথিবীর কোনো প্রাণীর মতো নয়। মনে হয় মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে একটি অতিকায় কুৎসিত ক্লেদাক্ত কীট তৈরি করা হয়েছে। ধারালো দাঁতের পিছনে লকলকে জিব। চোখ আছে কী নেই বোঝা যায় না। প্রাণীটি খুব কাছে এসে তাদেরকে পরীক্ষা করে দেখল তারপর একটু বাম দিকে সরে দুলতে দুলতে নড়তে নড়তে সরে গেল। হঠাৎ করে তারা মাটিতে একটা কম্পন অনুভব করে সাথে সাথে সবগুলো প্রাণী একসাথে ঘুরে গেল তারপর ছুটতে ছুটতে দূরে অদৃশ্য হয়ে গেল। ইহিতা ফিসফিস করে বলল, এখনো কেউ কোনো শব্দ করো না। কেউ একটুও নড়ো না। প্রাণীগুলো আগে একেবারে সরে যাক। যখন প্রাণীগুলো একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেল তখন নীহা একটা দীর্ঘশ্বাসকে বুক থেকে বের করে দিয়ে বলল, খুব বাঁচা বেঁচে গেছি। টর বলল, একটা গুলি পর্যন্ত করতে পারলাম না। তুমি গুলি করতে চাইছিলে? হ্যাঁ। অনেকদিন কোনো অস্ত্র ব্যবহার করি নি, হাত নিশপিশ করছিল। সবাই এক ধরনের সন্দেহের চোখে টরের দিকে তাকিয়ে থাকে। টুরান একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি একটা কথা বলতে পারি? সবাই এবার ঘুরে টুরানের দিকে তাকাল, সুহা বলল, বল। টুরান বলল, তোমাদের মনে আছে আমরা যখন মহাকাশযানে করে আমাদের যাত্রা ঠিক শুরু করতে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখন ইহিতা আমাদের সবার সাথে একবার কথা বলতে চাইছিল? সবাই মাথা নাড়ল। টুরান বলল, আমি এক ধরনের গোয়ার্তুমি করে ইহিতাকে কথা বলতে দিই নি। তার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেছিলাম। অপমানসূচক কথা বলেছিলাম। ইহিতা নিচু গলায় বলল, তুমি এমন কিছু অপমানসূচক কথা বল নি। বলেছিলাম। আমার খুব কাছাকাছি থাকা একটি মেয়ে আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল সেই থেকে আমি পুরোপুরি নারী জাতির বিদ্বেষী হয়ে গিয়েছিলাম কোনো মেয়েকে সহ্যই করতে পারতাম না। কোনো মেয়ের কথাও শুনতে চাইতাম না। বিষয়টা খুবই বড় নির্বুদ্ধিতা হয়েছিল। কেউ কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে টুরানের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল সে কী বলতে চাইছে। ইহিতা তখন যে কথাগুলো বলতে চাইছিল, আমি এখন তোমাদের সাথে সেই কথাগুলো বলতে চাই। টর জিজ্ঞেস করল, সেই কথাগুলো কী? আমরা সাতজন মানুষ অত্যন্ত বিপজ্জনক একটা পথ পাড়ি দিচ্ছি, এইমাত্র একটা খুব বড় বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছি। সামনে পাব কিনা জানি না। বিপদ আসবে সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এই রকম অসম্ভব বিপজ্জনক অবস্থা হলে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সব সময় সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্তটি নেয়া যায় না–তার সময় থাকে না। তখন খুব দ্রুত মোটামুটি সঠিক একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেটা খুবই জরুরি। টর বলল, আমি এখনও বুঝতে পারছি না, তুমি কী বলতে চাইছ! তুমি বুঝতে পারছ না কারণ আমি এখনো কথাটি বলি নি। তাড়াতাড়ি বলে ফেল। টুরান বলল, আমি যদি ঠিক করে অনুমান করে থাকি তাহলে ইহিতা আমাদের বলতে চেয়েছিল মানুষের একটা দল হিসেবে আমাদের একটা দলপতি থাকা দরকার। যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। শুধু তাই না, দলপতিকে মেনে নিলে আমরা সবাই তার সিদ্ধান্তটি কোনোরকম প্রশ্ন না করে মেনে নিতে পারব। টুরান একটু থামল এবং সবাই তার দিকে তাকিয়ে রইল। সে সবার দিকে চোখ বুলিয়ে বলল, এই মুহূর্তে আমাদের একজন দলপতি দরকার। আমি দলপতি হিসেবে ইহিতার নাম প্রস্তাব করছি। একটু আগে ইহিতা আমাদের যে কথাগুলো বলেছে তার প্রত্যেকটি কথা সত্যি বের হয়েছে। সে আমাদের ভয়ংকর বিপদে নিজে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। টর বলল, আমাদের মাঝে দুইজন রবোমানব আছে, তুমি কেমন করে জান ইহিতা একজন রবোমানব না? টুরান থতমত খেয়ে বলল, সেটা আমি জানি না। কেউই জানে না। নুট একটু এগিয়ে এসে বলল, আমি জানি, ইহিতা রবোমানব না। টর মাথা ঘুরিয়ে নুটের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি জান না। তুমি অনুমান করছ। নুট বলল, না। আমি জানি। আমার টুরানের প্রস্তাবটা খুব পছন্দ হয়েছে। আমিও ইহিতাকে আমাদের দলপতি হিসেবে গ্রহণ করছি। নীহা বলল, আমিও। সুহা বলল, আমিও তাকে দলপতি হিসেবে চাই। ক্লদ সবার মুখের দিকে তাকিয়ে আলাপটা বোঝার চেষ্টা করল। সে এমনিতে খুবই ছটফটে ছেলে, কিন্তু একটু আগে এতো কাছে থেকে তেজস্ক্রিয় প্রাণীগুলো দেখার পর থেকে সে হঠাৎ করে চুপ হয়ে গেছে। সে কিছুক্ষণ ইহিতার দিকে তাকিয়ে বলল, আমিও চাই। টর বলল, তার মানে বাকি রয়েছি শুধু আমি? কেউ কোনো কথা বলল না। টর বলল, আমার অবশ্যি কোনো পথ বাকি থাকল না। আমাকেও মেনে নিতে হচ্ছে। টুরান বলল, চমকার। ইহিতা বলল, আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না মঙ্গল গ্রহের এই পাহাড়ের নিচে এই ধূলিঝড়ের মাঝে, তেজস্ক্রিয় প্রাণীদের আনাগোনার মাঝে আমরা বসে বসে একটা নাটক করছি! কিন্তু আমি এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করব না। সময় খুব মূল্যবান। আমি সময়টা বাঁচাতে চাই। আমাকে যেহেতু দলপতির দায়িত্ব দিয়েছ আমি সেই দায়িত্ব নিচ্ছি-শুধুমাত্র এই বিপজ্জনক পথের অংশটুকুতে। যদি ঠিকভাবে মানুষের আবাসস্থলে পৌঁছাতে পারি তখন অন্য কাউকে দায়িত্ব নিতে হবে। সেটি তখন দেখা যাবে। টুরান বলল, তাছাড়া আমরা একটি খেলার টিম তৈরি করছি না যে একেক খেলায় একেকজন দলপতি হবে। ইহিতা বলল, সেই আলোচনা থাকুক। তোমরা সবাই এখনই রওনা দাও। দ্রুত আমি আসছি। নীহা জিজ্ঞেস করল, তুমি কোথা থেকে আসছ? সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না। সবাই হাঁটতে শুরু কর। সবাই হাঁটতে হাঁটতে দেখল, ইহিতা পিঠ থেকে তার ব্যাকপেক নামিয়ে মাটিতে উবু হয়ে কিছু একটা করছে। কী করছে কেউ অনুমান করতে পারল না। ইহিতা তার কাজ শেষ করে একটু জোরে হেঁটে ছোট দলটির সাথে যোগ দিল। টর জিজ্ঞেস করল, কাজ শেষ হয়েছে? হ্যাঁ হয়েছে। টর আশা করছিল ইহিতা বলবে সে কী করেছে, ইহিতা বলল না। তখন টর নিজেই জিজ্ঞেস করল, তুমি পিছনে কী করে এসেছ? এমন কিছু নয়। তার মানে তুমি আমাদের বলতে চাইছ না? না। কেন? টর, তোমার একটা বিষয় বুঝতে হবে। তোমরা আমাকে তোমাদের দলপতি বানিয়েছ, এখন আমার উপর কিছু বাড়তি দায়িত্ব এসে পড়েছে। শুধু আমাকে বেঁচে থাকলে হবে না। তোমাদেরকেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সেজন্যে আমাকে কিছু বাড়তি কাজ করতে হয়ে। আমি সেটা করছি। যখন তোমাদের এটা জানার প্রয়োজন হবে আমি তোমাদের জানাব। টর কিছু বলল না, ইহিতার কথাটা তার খুব পছন্দ হল বলে মনে হল না। ছোট দলটি চারঘণ্টা হাঁটার পর ইহিতা বলল, আমরা এখন বিশ্রাম নেব। নীহা বলল, তোমার এই অসাধারণ সিদ্ধান্তের জন্যে অনেক ধন্যবাদ ইহিতা। আমি ভেবেছিলাম তুমি আর কোনোদিন বুঝি একটু বিশ্রাম নেবার কথা বলবে না। ইহিতা বলল, শক্তি থাকতে থাকতে আমি যতটুকু সম্ভব পথ অতিক্রম করে ফেলতে চাইছিলাম। ক্লদ ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল, টুরান এতোক্ষণ তাকে ট্রান্সপোর্টারে শুইয়ে এনেছে, এবারে তাকে নিচে শুইয়ে দিয়ে বলল, ভাগ্যিস মঙ্গল গ্রহে মাধ্যাকর্ষণ বল অনেক কম, তা নাহলে ক্লদকে নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে যেত। সুহা টুরানের হাত স্পর্শ করে বলল, আমি যে তোমাকে কী বলে ধন্যবাদ দেব বুঝতে পারছি না! কতোটুকু পথ ক্লদকে ট্রান্সপোর্টারে করে এনেছ! টুরান পাথরে পা ছড়িয়ে বসে বলল, ধন্যবাদ দেবার তুমি আরো ভালো সুযোগ পাবে–এবারে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে নেয়া যাক। ইহিতা বলল, সবাইকে মনে করিয়ে দিই–এবার যখন রওনা দেব তখন কিন্তু আর থামাথামি নেই। রওনা দেবার আগে সবাই খানিকটা স্নায়ু-উত্তেজক পানীয় খেয়ে নিও। তাহলে খিদেও পাবে না, ক্লান্তও হবে না। ঘুমাতেও হবে না। নীহা বলল, যখন রওনা দেব তখন সেটা দেখা যাবে। এই মুহূর্তে আমার ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। আমি একটু ঘুমাই যখন রওনা দেবে তখন ডেকে তুলো। সুহা বলল, তুমি নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাও। তোমাকে দেখে আমার হিংসা হচ্ছে। কেন? হিংসা হচ্ছে কেন? এরকম একটা পরিবেশে যার ঘুম পায় তাকে দেখে হিংসা হতেই পারে! নীহা চোখ বন্ধ করতে করতে বলল, তোমাকে কুগুরাভ সমস্যাটা শিখিয়ে দেব-তার সমাধানের কথা চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে যাবার মতো আনন্দ আর কিছুতে নেই! নীহা ধড়মড় করে ঘুম থেকে উঠল। টুরান ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে ঘুম থেকে তোলার চেষ্টা করে বলল, নীহা! ওঠ। নীহা ভয় পাওয়া গলায় বলল, কী হয়েছে? প্রাণীগুলো আসছে। রেডিয়েশান মিটারে আমরা সিগন্যাল পাচ্ছি। সর্বনাশ! এখন কী হবে? ইহিতা বলল, যা হবার সেটাই হবে। ভয় পাবার কিছু নেই। অস্ত্রটা তৈরি রাখ। নীহা অস্ত্রটা তাক করে গুড়ি মেরে বসে বলল, আমরা তো নড়ছি না, প্রাণীগুলো আমাদের দেখছে কেমন করে? জানি না। মনে হয় বাইরের তাপমাত্রা কমে যাবার কারণে আমাদের স্পেসস্যুট থেকে অনেক বেশি তাপ বিকিরণ করছে। নীহা কথা না বলে তার চোখের গগলসটি অতি বেগুনি রশ্মিতে সংবেদনশীল করে নিল, সাথে সাথে চারপাশের জগৎটা অন্য রকম দেখাতে থাকে, তার মাঝে সে দূরে প্রাণীগুলোকে দেখতে পেল। সেগুলো গুড়ি মেরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে, খুব ধীরে ধীরে চারদিকে থেকে তাদের ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে। ইহিতা ফিসফিস করে বলল, আমি না বলা পর্যন্ত কেউ গুলি শুরু করবে না। ঠিক আছে। সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে রইল, দেখতে পেলো প্রাণীগুলো তাদের দিকে দুলতে দুলতে এগিয়ে আসছে। রেডিয়েশন মিটারের কাটাটি নড়তে থাকে, প্রাণীগুলো থেকে চারপাশে তীব্র তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাণীগুলো আরেকটু কাছে এগিয়ে এল, এখন তাদের চেহারাগুলো দেখা যেতে শুরু করেছে। তারা অবাক হয়ে লক্ষ করল প্রাণীগুলো একরকম নয়, তাদের মাঝে গঠনগত একটা মিল আছে, সবগুলোরই সামনে বীভৎস ধারালো দাঁত, বড় মুখ। মুখটি কখনো শরীরের উপর, কখনো নিচে। অনেকগুলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। কখনো তাদের অতিকায় মাকড়শার মতো মনে হয়, কখনো ক্লেদাক্ত কীটের মতো মনে হয়। প্রাণীগুলো আরেকটু এগিয়ে এল, তাদের হিংস্র গর্জন খুব ক্ষীণভাবে তারা শুনতে পায়। মাটিতে মৃদু কম্পন অনুভব করতে পারে। যদিও কথা ছিল ইহিতা অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত কেউ গুলি করবে না, কিন্তু হঠাৎ করে টর প্রচণ্ড আক্রোশে গুলি করতে শুরু করল। সাথে সাথে যেন নরক নেমে আসে, প্রাণীগুলো ছুটে তাদের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করে। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের প্রচণ্ড বিস্ফোরণে সেগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে থাকে। কিন্তু তারপরেও সেগুলো থেমে যায় না–আরো ভয়ংকর আক্রোশে সেগুলো ছুটে আসতে থাকে। প্রাণীগুলোর ছিন্নভিন্ন দেহগুলোও গড়িয়ে গড়িয়ে পাথরে ঘষতে ঘষতে কাঁপতে কাঁপতে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। ইহিতা বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে একটা প্রাণীকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়ার পরও তার প্রতিটি অংশ যদি আলাদাভাবে জীবিত থেকে যায় প্রতিটি অংশই যদি নিজের মতো করে তাদের আক্রমণ করতে থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে তারা কেমন করে টিকে থাকবে? ইহিতা তার স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে কয়েকবার গুলি করে প্রাণীগুলোকে খানিকটা দূরে সরিয়ে দিল। তারপর দ্রুত তার পকেট থেকে রিমোট কন্ট্রোলটা বের করে। পথের মাঝখানে সে একটা সনিক চার্জার বসিয়ে এসেছে, সেটা ব্যবহার করা যায় কীনা পরীক্ষা করে দেখতে চায়। রিমোট কন্ট্রোলের প্যানেলটি চোখের সামনে ধরে সে দ্রুত তার রেটিনা স্ক্যানিং করে নিয়ে বোতামগুলো স্পর্শ করে। প্রায় সাথে সাথেই সে একটা কম্পন এবং একটু পর বিস্ফোরণের চাপা শব্দ শুনতে পেল। ইহিতা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ক্ষ্যাপা প্রাণীগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল এবং হঠাৎ করে তার মনে হল প্রাণীগুলোর মাঝে এক ধরনের নতুন চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। ইহিতা চিৎকার করে বলল, থামাও। গুলি থামাও! সবাই গুলি থামাও। সবাই গুলি থামাল এবং দেখতে পেল হঠাৎ প্রাণীগুলো পিছনে ছুটে যেতে শুরু করেছে। ছুটে যাবার সময় প্রাণীগুলো তাদের শরীরের ছিন্নভিন্ন অংশগুলো মুখে করে নিয়ে যেতে থাকে। শরীরের নানা অংশে সেগুলো ছুঁড়ে দিতে থাকে এবং সেগুলো শরীরে লেগে কিলবিল করে নড়তে থাকে। ইহিতা রদ্ধশ্বাসে এই বিচিত্র দৃশ্যটির দিকে তাকিয়ে থেকে ফিসফিস করে বলল, এখন গুলি করো না–প্রাণীগুলোকে চলে যেতে দাও। নীহা কাঁপা গলায় বলল, কোথায় যাচ্ছে? আমি যেখানে সনিক চার্জার লাগিয়ে এসেছি সেখানে। কেন? প্রথমবার যখন প্রাণীগুলো আমাদের দিকে ছুটে এসেছিল তখন হঠাৎ করে ছুটে চলে গিয়েছিল, মনে আছে? মনে আছে। আমি পরীক্ষা করে দেখেছিলাম–দূরে একটা বিস্ফোরণ হয়েছিল। বিস্ফোরণের পর খুব ছোট কম্পনের শব্দ তরঙ্গ ভেসে এসেছিল, ভূমিকম্পের বেলায় যেরকম হয়। তাই ভাবলাম- কী ভাবলে? প্রাণীগুলো ছোট কম্পনের শব্দ তরঙ্গ শুনতে পেলে সেদিকে নিশ্চয়ই ছুটে যায়। তাই পথে একটা সনিক চার্জার লাগিয়ে এসেছিলাম। এখান থেকে রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে সেটা বিস্ফোরণ করিয়েছি। আসলেই প্রাণীগুলো সেদিকে ছুটে গেছে। কেন? কেন ছুটে যায়? এখনো জানি না, কিন্তু সেটা নিয়ে পরে চিন্তা করা যাবে। আমাদের এক্ষুণি রওনা দিতে হবে। আমাদের কাছে আর সনিক চার্জার নেই, প্রাণীগুলো আবার আক্রমণ করলে আর ফেরাতে পারব না। এক্ষুণি রওনা দিতে হবে। টুরান বলল, তাছাড়াও এই তেজস্ক্রিয় প্রাণীগুলো থেকে অনেক তেজস্ক্রিয় পদার্থ বের হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এখানে বেশিক্ষণ থাকা ঠিক নয়। নীহা বলল, হ্যাঁ চল রওনা দিই। ট্রান্সপোর্টারে করে আমি ক্লদকে নিতে পারি। ক্লদ মাথা নাড়ল, বলল, না। আমি ট্রান্সপোর্টারে যাব না। আমি হেঁটে যাব। নীহা মাথা নাড়ল, বলল, ঠিক আছে। ইহিতা টরের দিকে তাকিয়ে বলল, আর টর, শোনো। বল। আমি কিন্তু বলেছিলাম আমি নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত কেউ গুলি করবে না। তুমি আমার নির্দেশ শোনো নি। তুমি আগেই গুলি শুরু করেছ। টর থতমত খেয়ে বলল, আমি দুঃখিত। ইহিতা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমার কেন জানি মনে হয় তুমি আসলে সেরকম দুঃখিত নও। কিন্তু শুনে রাখ– কী? মানুষের আবাসস্থলে না পৌঁছানো পর্যন্ত আমি তোমাদের দলপতি। তোমাদের আমার কথা শুনতে হবে। এটা একটা আদেশ। মনে থাকবে? মনে থাকবে। যদি মনে থাকে তাহলে আমাকে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। ঠিক আছে? টর পাথরের মতো মুখ করে বলল, ঠিক আছে। সাতজনের ছোট দলটা তখন মঙ্গলগ্রহের রুক্ষ পাথরের উপর দিয়ে হাঁটতে থাকে। তাদের হাঁটার গতি দ্রুত। যেভাবে হোক তারা মানুষের আবাসস্থলে পৌঁছাতে চায়। সাতজনের ছোট দলটি যখন মানুষের আবাসস্থলের কাছাকাছি পৌঁছেছে তখন সূর্যটি বেশ উপরে ওঠে গেছে। সূর্যের ম্লান আলোতে মঙ্গলগ্রহের বিস্তীর্ণ প্রান্তরকে কেমন যেন নিঃসঙ্গ দেখায়। টর বলল, আমার মনে হয় আমরা শেষ পর্যন্ত আবাসস্থলে পৌঁছে গেছি। নীহা বলল, হ্যাঁ। আরো কয়েকদিনের জন্যে বেঁচে থাকার সুযোগ হল। টর বলল, ব্যাপারটা ভালো হল কি না বুঝতে পারছি না! নীহা বলল, জীবন কখনো খারাপ হতে পারে না। জীবন সবসময়ই ভালো। কে বলেছে? সুহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, সবকিছু অন্যরকমও হতে পারে। হলেও আর কতোটুকু হবে? অনেকখানি হতে পারে। নীহা ভুরু কুঁচকে বলল, কীভাবে? সুহা বলল, কাছে এসো দেখাচ্ছি। নীহা দুই পা এগিয়ে সুহার কাছে যেতেই সে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা নীহার মাথায় ধরল। মুহর্তে সুহার চেহারাটি একটি হিংস্র মানবীতে পাল্টে গেল। সে হিসহিস করে বলল, সবাই তোমাদের হাতের অস্ত্র নিচে ফেলে দুই হাত উপরে তুলে দাঁড়াও। এক সেকেন্ড দেরি করলে এই নির্বোধ মেয়েটার খুলি ফুটো হয়ে যাবে। সবাই হতবাক হয়ে সুহার দিকে তাকিয়ে থাকে। সুহা প্রায় যান্ত্রিক গলায় বলল, এখনো যদি না বুঝে থাক তাহলে পরিষ্কার করে বলে দিই। আমি দুজন রবোমানবের একজন। টুরান কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, আরেকজন কে? ক্লদ বলল, আমি। সবাই বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠল, তুমি! হ্যাঁ আমি। বলে ক্লদ এগিয়ে নীহার হাত থেকে হ্যাচকা টান মেরে তার অস্ত্রটা নিয়ে নেয়। সুহা সবার দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বলল, আমি তোমাদের সাথে খোশগল্প করার জন্যে আসি নি। হাতের অস্ত্র নিচে ফেল। টর ইহিতাকে জিজ্ঞেস করল, ইহিতা, কী করব? তুমি যদি অনুমতি দাও তাহলে এই ডাইনিবুড়িকে শেষ করে দিই। তাহলে অন্যদের কথা জানি না কিন্তু নিশ্চিতভাবে নীহাকে হারাব। সুহা চিষ্কার করে বলল, বাজে কথা বল না। অস্ত্র ফেল, তা না হলে এই মুহূর্তে এর খুলি উড়িয়ে দেব। ইহিতা এক পা এগিয়ে এসে বলল, আমার মনে হয় না তুমি এই মুহূর্তে সেটা করবে। তুমি রবোমানব হতে পার কিন্তু রবোট নওনীহার মাথায় গুলি করা মাত্রই আমাদের চারজনের অস্ত্র তোমাকে ঝাঁঝরা করে দেবে! কাজেই তুমি এতো সহজে গুলি করবে না। তুমি রবোমানবকে চেনো না। রবোমানবের ভেতরে বিন্দুমাত্র দুর্বলতা নেই শব্দটা দুর্বলতা নয়। শব্দটা হচ্ছে মানবিক মায়া মমতা- সুহা হিস হিস করে বলল, অর্থহীন কথা বলে সময় নষ্ট কর না। তোমাদের মানবিক মায়ামমতা দুর্বলতা কি না সেটা এই মুহূর্তে প্রমাণিত হবে! তোমাদের নিজেদের রক্ষা করার একটি মাত্র উপায়-সেটি হচ্ছে আমাকে গুলি করা। করো গুলি। চিৎকার করে বলল, করো। নীহা হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সুহা হিংস্র ভঙ্গিতে বলল, করতে পারবে না। কাজেই সময় নষ্ট করো না। হাতের অস্ত্র ফেলে দাও। ইহিতা অন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল, সে ঠিকই বলেছে। আমাদের আর কিছু করার নেই–হাতের অস্ত্র ফেলে দিতে হবে। টর বলল, কিন্তু এই ডাইনি বুড়ি তাহলে সাথে সাথে আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে। সম্ভবত। কিন্তু আমাদের কিছু করার নেই, অন্তত নীহা জানবে আমরা আমাদের নিজেদের বাঁচানোর জন্যে তাকে মারা যেতে দিই নি। টর কাঁপা গলায় বলল, তুমি আমাদের দলপতি, তুমি যেটাই বলবে আমি সেটাই শুনব। আমরা কি শেষ চেষ্টা করব না? ইহিতা বলল, ক্লদের দিকে তাকাও। দেখো সে কীভাবে অস্ত্রটা তোমার দিকে তাক করে ধরেছে। সম্ভবত সে তোমাকে গুলি করবে, কিন্তু তুমি কি পারবে এই চার বছরের শিশুটাকে গুলি করে মারতে? টর মাথা নাড়ল, বলল, না। আমি জানি তুমি আমি কেউ পারব না। আমরা মানুষ সেই জন্যে এখানে এই মুহূর্তে হয়তো সবাই মারা যাব। কিন্তু জেনে রাখো যে কারণে আমরা সবাই এখানে মারা যাব ঠিক সেই কারণে পৃথিবীর অসংখ্য জায়গায় অসংখ্য মানুষ একে অপরকে বাঁচিয়ে রাখবে। সুহা চিৎকার করে বলল, অস্ত্র ফেল। টর ইহিতার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ইহিতা। তুমি আমাদের দলপতি। তুমি বল, অস্ত্র ফেলব? আমি খুবই দুঃখিত টর, কিন্তু আমাদের অস্ত্র ফেলতে হবে। টর হাতের অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলল। ইহিতা আর টুরান তাদের অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলল। নুট তার হাতের অস্ত্র তুলে বলল। আমি আমার হাতের অস্ত্রটি ছুঁড়ে ফেলার আগে একটি কথা বলতে পারি? কী কথা? নুট একটু এগিয়ে এসে বলল, মনে আছে আমি বলেছিলাম আমি জানি আমাদের ভেতরে কোন দুজন রবোমানব? তোমরা কী বিশ্বাস কর আমি সেটা জানতাম? সুহা মাথা নাড়ল, বলল, অসম্ভব। আমরা পুরো সময় নির্বোধ মানুষের মতো অভিনয় করে গেছি। নুট এক হাতে তার অস্ত্রটি ধরে রেখেছিল, অন্য হাতটি উপরে তুলে দেখিয়ে বলল, এটা কী দেখেছ? একটা লিভার। হ্যাঁ। এই লিভারটি ছেড়ে দিলে কী হবে জান? কী হবে? এটা খুব ছোট একটা বিস্ফোরক ডেটোনেট করবে। বিস্ফোরকটা কোথায় আছে জানতে চাও? সুহা হিংস্র মুখে জিজ্ঞেস করল, কোথায়? তোমার ছেলে ক্লদের শরীরে! মিথ্যা কথা! তোমার মনে আছে, ক্লদকে স্পেসস্যুট পরাতে কে সাহায্য করেছিল? আমি। কেন আমি এতো ব্যস্ত হয়ে তাকে সাহায্য করেছিলাম? ছোট্ট এই বিস্ফোরকটি রাখার জন্যে! তুমি মিথ্যা কথা বলছ! ঠিক আছে! নুট হাতের অস্ত্রটি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল, পরীক্ষা হয়ে যাক! আমাকে গুলি কর। আমার হাত থেকে লিভারটি মুক্ত করিয়ে দাও। ক্লদ চিৎকার করে বলল, না! না! সুহা, গুলি করো না। নুট হা হা করে হেসে বলল, আমি কম কথা বলি, তাই অনেক বেশি চিন্তা করি। চিন্তা করে করে সব কিছু বের করে ফেলা যায়। আরো একটা জিনিস জান? কী? আমাকে মানুষের এই দলটাতে কেন রেখেছে জান? কেন? আমার একটা অপরাধী মন আছে-যেটা এখানে আর কারো নেই। আমি অপরাধীর মতো চিন্তা করতে পারি-যেটা তোমাদের মতো রবোমানবদের বিপদে ফেলে দিতে পারে। নুট আবার হাসার চেষ্টা করে বলল, সুহা! নির্বোধ রবোমানব, তুমি কী লক্ষ করেছ, আমি সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। অন্যদের আড়াল করে ফেলেছি। তুমি আমাকে গুলি না করে অন্যদের গুলি করতে পারবে না। সুহা কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে নুটের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঘুরে ক্লদের দিকে তাকাল, বলল, ক্লদ তুমি নিচ থেকে সবগুলো অস্ত্র তুলে নিয়ে এস। ক্লদ বলল, কেন? আমার সাথে তর্ক করবে না, নিয়ে এস? ক্লদ নিচে পড়ে থাকা অস্ত্রগুলো তুলে নিয়ে আসে। সুহা তখন ধাক্কা দিয়ে নীহাকে সরিয়ে দিল, তারপর ক্লদকে বলল, অস্ত্রগুলো দাও। ক্লদ জিজ্ঞেস করল, কেন? তুমি এতোগুলো রাখতে পারবে না সেজন্যে। ক্লদ বলল, অস্ত্রগুলো ভারী না, তাছাড়া মঙ্গলগ্রহে মাধ্যাকর্ষণ বল খুব কম। আমি এগুলো রাখতে পারব। বাজে তর্ক করো না। অস্ত্রগুলো দাও আমার হাতে। ক্লদ তার শিশুসুলভ কণ্ঠে কিন্তু একজন বড় মানুষের ভাষায় বলল, সব অস্ত্র তোমার হাতে থাকলে তোমার কাছ থেকে আমাকে নিরাপত্তা কে দেবে! তা ছাড়া- তা ছাড়া কী? কথা ছিল আমি এখন প্রথম মানুষ হত্যা করব। তুমি আমাকে এখনো হত্যা করতে দিচ্ছ না। ক্লদ! নির্বোধের মতো আচরণ করো না! দেখতে পাচ্ছ না এই অপরাধীটা দাবি করছে তোমার জীবন তার হাতে? যতক্ষণ পরীক্ষা করে সেটা নিশ্চিত না হতে পারছি ততক্ষণ তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। ক্লদ চিৎকার করে বলল, তুমি বলেছিলে তুমি নিখুঁত পরিকল্পনা করেছ, এখানে দেখা যাচ্ছে তোমার পরিকল্পনায় শুধু ভুল আর ভুল! তুমি বলেছিলে মানুষ হচ্ছে নির্বোধ! এখন দেখা যাচ্ছে তুমি মানুষ থেকেও নির্বোধ?। সুহা ধমক দিয়ে বলল, বাজে কথা বলো না। আমার পরিকল্পনা নিখুঁত। তাহলে কেন এখনো আমি একটা মানুষকে হত্যা করতে পারছি না! পারবে। সময় হলেই পারবে। কখন সময় হবে? সুহা প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে রেডিয়েশান মনিটরের দিকে তাকাল। সেখানে আবার তেজস্ক্রিয়তার চিহ্ন দেখা দিতে শুরু করেছে। সে ভুরু কুঁচকে বলল। প্রাণীগুলো আবার আসছে। ক্লদ জিজ্ঞেস করল, আমরা এখন কী করব? তুমি ছুটে যাও আবাসস্থলের দিকে। অস্ত্রগুলো রেখে যাও। না। আমি অস্ত্র নিয়ে যাব। বলে সে দুই হাতে কোনোভাবে অস্ত্রগুলো ধরে আবাসস্থলের দিকে ছুটতে থাকে। নুট শব্দ করে হাসল, বলল, আমি তোমাকে যতই দেখছি—ততই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি! তুমি কী সত্যিই ক্লদকে জন্ম দিয়েছিলে? হ্যাঁ দিয়েছিলাম। তাতে কী হয়েছে? মা হয়ে তুমি যেভাবে তোমার নিজের সন্তানকে হত্যা করার ব্যবস্থা করলে। আমি সেটা দেখে মুগ্ধ হয়েছি সুহা। এখন তুমি আমাদের হত্যা করবে তখন আমার হাতের লিভারটি ছুটে যাবে সাথে সাথে ক্লদের শরীরের ভেতর বিস্ফোরক বিস্ফোরিত হবে–তুমি নিশ্চিত করলে তখন যেন সে তোমার কাছ থেকে দূরে থাকে! তোমার যেন কোনো ক্ষতি না হয়। এর ভেতরে কোন বিষয়টি অযৌক্তিক? একটা অবাধ্য শিশুর হাতে যখন অস্ত্র ওঠে যায় সে কতো বিপজ্জনক তুমি জান? জানি। নুট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ক্লদ ছুটে অনেকদূর চলে গিয়েছে তাই তোমার মনে ধারণা হয়েছে সে তোমার কথা শুনতে পারছে না। তুমি ভুলে গেছো আমাদের হেলমেটের মাঝে কমিউনিকেশান মডিউল লাগানোএকশ কিলোমিটার দূর থেকেও কথা শোনা যায়। ক্লদ তোমার কথাগুলো শুনেছে। তার হাতে একটি নয় দুটি নয় চার-চারটি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। সে ফিরে আসছে–তোমার কী মনে হয় চার বছরের একটা শিশুর সাথে তুমি বোঝাপাড়া করতে পারবে?। সুহা চমকে পিছনে তাকাল, তার গলা থেকে একটা হিংস্র শ্বাপদের মতো শব্দ বের হয়ে এলো। সে তার অস্ত্রটি শক্ত হাতে ধরে পায়ে পায়ে ক্লদের দিকে এগুতে থাকে। সবাই বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে, চার বছরের একটা শিশুও হাতে একটা অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসছে, দেখে মনে হচ্ছে সে বুঝি একটা খেলনা ধরে রেখেছে। কিন্তু এটা মোটেও খেলনা নয়-এটা ভয়ংকর একটা অস্ত্র! সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে। একটা মা আর তার শিশু সন্তান একজন আরেকজনের দিকে উদ্যত অস্ত্র হাতে এগিয়ে যাচ্ছে-একজন আরেকজন হত্যা করতে চায়। কী ভয়ংকর একটি দৃশ্য–এর চাইতে ভয়াবহ, এর চাইতে নিষ্ঠুর কোনো কিছু কি হওয়া সম্ভব? নুট নীহা টর টুরান আর ইহিতা নিঃশ্বাস বন্ধ করে সৃষ্টি জগতের সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্যটির দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে। মঙ্গল গ্রহের লাল পাথরে পাশাপাশি পড়ে থাকা সুহা আর ক্লদের মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে থেকে ইহিতা বলল, আমি নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না এটি সম্ভব। নীহা বলল, আমি নিজের চোখে দেখেও এটা বিশ্বাস করতে পারছি না। টর নুটের দিকে তাকালে, জিজ্ঞেস করল, তোমার হাতের লিভারটি কী আসলেই বিস্ফোরকের সাথে জুড়ে দেয়া, নাকি পুরোটি একটি ধোঁকা? নুট মাথা নাড়ল, বলল, না। এটা ধোকা না। এটা সত্যি। আমি জানতাম এরা দুজন রবোমানব। ক্লদের শরীরে সত্যি বিস্ফোরক লাগানো আছে? হ্যাঁ। ছোট বিস্ফোরক। এই দেখ–সে নিচু হয়ে ক্লদের ছিন্নভিন্ন স্পেসস্যুটের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে ছোট একটা বিস্ফোরকের গোলক বের করে আনে। সেটি দূরে ছুঁড়ে দিয়ে নুট তার লিভারটি ছেড়ে দিতেই দূরের বিস্ফোরকটি বিস্ফোরিত হল। টর নুটের দিকে তাকিয়ে বলল, আমাকে স্বীকার করতেই হবে তুমি অসাধারণ। আমি কখনোই এই দুজনকে রবোমানব হিসেবে সন্দেহ করতে পারতাম না। নুট কোনো কথা বলল না, অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। ইহিতা বলল, রেডিয়েশান মনিটরে রিডিং দিতে শুরু করেছে। প্রাণীগুলো আবার আসছে। আমাদের আবাসস্থলের ভেতর ঢুকে যাওয়া দরকার। চল যাই। টুরান জিজ্ঞেস করল, মৃতদেহ দুটি? এই মুহূর্তে কিছু করার নেই। পরে যদি সুযোগ পাই সমাহিত করে দেব। লাল পাথরের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অস্ত্রগুলো তুলে পাঁচজন দ্রুত আবাসস্থলের দিকে যেতে থাকে প্রাণীগুলো আসার আগে তারা ভেতরে ঢুকে যেতে চায়। আবাসস্থলের ভেতরটা খুব সাজানো গোছানো। মানুষজন থাকার জন্যে পরিপাটি ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাতাসের তাপ চাপ রক্ষা করা আছে বলে তারা স্পেসস্যুট খুলে বসেছে। শুধু তাই নয় তারা সত্যিকারের খাবারের প্যাকেট বের করে সেগুলো গরম করে ধূমায়িত কফির সাথে বসে বসে খেয়েছে। গত ছত্রিশ ঘণ্টার উত্তেজনা শেষে হঠাৎ করে একটা নিশ্চিন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে বসে থাকতে পেরে তাদের মাঝে এক ধরনের আলস্য ভর করেছে। কফির মগে চুমুক দিয়ে টুরান বলল, আমরা কী তাহলে এখন আমাদের মহাকাশযানে ফিরে যেতে পারি? ইহিতা বলল, নিশ্চয়ই পারি। এখন আমাদের মাঝে কোনো রোমানব নেই। আমরা নিশ্চয়ই মহাকাশযানে ফিরে যাব। টর বলল, তোমরা যা ইচ্ছে তাই বলতে পার–আমি কিন্তু তোমাদের পরিষ্কার করে একটা কথা বলতে চাই কী কথা? মহাকাশযানে গিয়ে আমি ট্রিনিটিকে নিজ হাতে খুন করব! ইহিতা শব্দ করে হাসল, বলল, তুমি কীভাবে সেটা কর, আমি সেটা দেখতে চাই। নীহা জিজ্ঞেস করল, কিন্তু আমরা এখন মহাকাশযানে ফেরত যাব কেমন করে? টুরান বলল, আমরা ট্রিনিটির সাথে যোগাযোগ করব, ট্রিনিটি কিছু একটা ব্যবস্থা করবে। একটা স্কাউটশিপ পাঠাবে এখানে বা সেরকম কিছু একটা করবে। তাহলে ট্রিনিটির সাথে যোগাযোগ করতে হবে? হ্যাঁ। কেমন করে করব? এই আবাসস্থলাটাতে অনেক ভালো কমিউনিকেশন্স মডিউল থাকার কথাএসো খুঁজে বের করি। নীহা আর টুরান মিলে আবাসস্থলে কমিউনিকেশন্স মডিউল খুঁজতে থাকে, আবাসস্থলের দোতলাতে সেটা পেয়ে গেল। টুরান কয়েকটা সুইচ স্পর্শ করে বলল, কী আশ্চর্য! দেখেছ, আমাদের জন্যে এখানে ম্যাসেজ রাখা আছে? কী ম্যাসেজ? এখনো জানি না। টুরান আরেকটা বোতাম চাপ দিতেই সামনে একটা আলোর ঝলকানি দেখা গেল, তারপর ট্রিনিটির কণ্ঠস্বর শোনা গেল, আমি ট্রিনিটি বলছি। স্কাউটশিপে করে মঙ্গলগ্রহে যাওয়া মহাকাশচারীদের সাথে যোগাযোগ করতে চাই। জরুরি। আবার বলছি, স্কাউটশিপে করে…। নীহা বলল, আমি সবাইকে ডেকে আনি। সবাই মিলে শুনি ট্রিনিটি কী বলে। যাও ডেকে আনো। কিছুক্ষণের মাঝেই সবাই ওপরে কমিউনিকেশন মউিডলের কাছে চলে এলো। টুরান তখন যোগাযোগের চ্যানেলটি চালু করে। সাথে সাথে ট্রিনিটির কণ্ঠস্বর শোনা গেল, আমি ট্রিনিটি, মহাকাশযান থেকে তোমাদের সবার জন্যে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। টর বলল, বাজে কথা বলল না। মানুষকে শুভেচ্ছা জানানোর মতো বুদ্ধিমত্তা তোমার নেই। আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত— টর মাঝপথে থামিয়ে বলল, আমি তোমাকে বলেছি, তুমি বাজে কথা বলবে। আমাদেরকে ভয়ংকর বিপদের মাঝে ঠেলে দিয়ে বলছ তুমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত? তুমি জান অন্তর মানে কী? বেজন্ম কোথাকার! ট্রিনিটি হাসির মতো শব্দ করে বলল, টর, আমি তোমার ক্ষোভটুকু পরিষ্কার বুঝতে পারছি। তবে তোমাকে দুটি ব্যাপার বুঝতে হবে। প্রথমত আমি যেটা করেছি সেটা না করে আমার উপায় ছিল না। খুব সোজা ভাষায় যদি বলতে হয় তাহলে বলা যায়, আমি একটা কম্পিউটার, আমাকে যেভাবে প্রোগ্রাম করা হয়েছে আমাকে ঠিক সেভাবে কাজ করতে হয়। দ্বিতীয়ত, তুমি যখন আমার ওপর রেগে যাও কিংবা রেগে গালাগাল কর আমি কিন্তু সেগুলো বুঝি না! তুমি যথার্থই বলেছ, আমার সেগুলো বোঝার ক্ষমতা নেই। টুরান বলল, ঠিক আছে। ঠিক আছে! তুমি কী বলার জন্যে আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছ সেটা বলে ফেল। ট্রিনিটি বলল, পৃথিবী থেকে তোমাদের সাথে খুব জরুরিভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ইহিতা অবাক হয়ে বলল, পৃথিবী থেকে? আমাদের সাথে? হ্যাঁ। কে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে? আমার জানা নেই। গোপনীয় চ্যানেল। তোমরা যদি প্রস্তুত থাকো তাহলে আমি চ্যানেলটি তোমাদের জন্যে উন্মুক্ত করে দিই। অবশ্যই। ইহিতা বলল, অবশ্যই উন্মুক্ত করে দাও। সাথে সাথে ঘরের ভেতর কিছু আলোর বিচ্ছুরণ দেখা গেল কিছু যান্ত্রিক শব্দ ভেসে এলো এবং বেশ কয়েক মিনিট পর হঠাৎ করে ঘরের ঠিক মাঝখানে তারা বিজ্ঞান আকাদেমীর সভাপতি মহামান্য থুলকে দেখতে পেল। মহামান্য থুল একটা সবুজ ঘাসের লনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। তারা শুনতে পেল মহামান্য থুল একটু ঘুরে তাদের দিকে বললেন, তোমাদের জন্যে শুভেচ্ছা। আমি খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে তোমাদের সাথে যোগাযোগ করছি। নীহা চিৎকার করে বলল, মহামান্য গুল? আপনি? নীহার কথাটি মহামান্য থুল সেই মুহূর্তে শুনতে পেলেন না। মঙ্গল গ্রহ থেকে পৃথিবীতে তার কথাটি পৌঁছাতে কমপক্ষে পাঁচ মিনিট সময় নেবে, মহামান্য থুলের উত্তরটি ফিরে আসতে আরো পাঁচ মিনিট। নীহা এবং অন্যেরা শুনতে পেলো মহামান্য থুল ঠিক সেই কথাটিই বললেন, মুখোমুখি কথা বলার যে সুবিধেটুকু আছে সেটি এখন আমাদের মাঝে নেই, তোমাদের কথা আমার কাছে এবং আমার কথা তোমাদের কাছে পৌঁছানোর মাঝে বেশ অনেকখানি সময় নেবে। তোমরা কেমন আছ আমি জানি না। আমার জানা প্রয়োজন। আমি এখন চুপ করছি, তোমরা বল। কেমন আছ বল। টুরান বলল, এর মাঝে অনেক কিছু ঘটে গেছে। কোনো মানুষের জীবনে এতো অল্প সময়ে এতো কিছু ঘটতে পারে সেটা বিশ্বাসই হতে চায় না। মহামান্য থুল আপনি শুনে খুশি হবেন যে আমরা ভয়ংকর ভয়ংকর বিপদের মাঝে থেকেও রক্ষা পেয়েছি। কীভাবে সেটা ঘটেছে সেটা আপনাকে বলবে ইহিতা। আমরা ইহিতাকে আমাদের দলপতি তৈরি করেছি। ইহিতা একজন অসাধারণ-দলপতি, সে কীভাবে আমাদের রক্ষা করে এনেছে সেটি শুনলে আপনি মুগ্ধ হয়ে যাবেন! টুরান ইহিতার দিকে তাকিয়ে বলল, ইহিতা! তুমি বল। ইহিতা একটু বিব্রত হয়ে বলল, আমি এমন কিছুই করি নি! তারপর সে একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে মহাকাশযানে কী ঘটেছে এবং কীভাবে তারা শেষ পর্যন্ত এই নিরাপদ আবাসস্থলে আশ্রয় নিয়েছে সেটি বলল। তাদের ভেতরে যে দুজন রবোমানব আছে এবং সেই দুজন শেষ পর্যন্ত কীভাবে নিজেরাই নিজেদের হত্যা করেছে সেটি বলার সময় ইহিতার মুখে গভীর একটা বেদনায় ছাপ পড়ে। ইহিতার কথা শেষ হবার পর প্রায় দশ মিনিট সময় পরে তারা মহামান্য থুলের কথা শুনতে পেল, মহামান্য থুল বললেন, পৃথিবী থেকে লক্ষ লক্ষ মাইল দূরে একটা নির্জন গ্রহের ছোট একটা আবাসস্থলে তোমরা কোনো ভাবে নিজেদের রক্ষা করে বেঁচে আছ। কিন্তু আমি তোমাদের কাছে কৃতজ্ঞ। সত্যি কথা বলতে কী শুধু আমি নই, পৃথিবীর মানুষ তোমাদের কাছে ঋণী থাকবে। তোমরা সবাই জান রবোমানবেরা কিছুক্ষণের মাঝেই পৃথিবীর নেটওয়ার্কটি দখল করে নেবে। দখল করার পর নিশ্চিতভাবেই তারা আমাকে এবং বিজ্ঞান আকাদেমীর সবাইকে হত্যা করতে আসবে। আমি সেটা নিয়ে খুব বেশি দুর্ভাবনা করছি না। তোমরা জান আমি দীর্ঘ একটি আনন্দময় জীবন কাটিয়েছি, আমি এখন খুব আনন্দের সাথে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারি। কিন্তু আমাদের ওপর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল পৃথিবীর মানুষকে রক্ষা করতে আমরা কি সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছি? রবোমানব যখন নেটওয়ার্ক দখল করে এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি প্রাণী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, প্রতিটি কমিউনিটি, প্রতিটি অস্ত্রাগার প্রতিটি যোগাযোগ ব্যবস্থা এক কথায় পুরো পৃথিবীর সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে তখন পৃথিবীর মানুষ রবোমানবের হাতে ধ্বংস হয়ে যাবে? মহামান্য থুল একটু থামলেন, অন্যমনস্কভাবে নিজের হাতের দিকে তাকালেন তারপর আবার মাথা তুলে সামনের দিকে তাকালেন, তাকিয়ে বললেন, এর সঠিক উত্তর কেউ জানতো না। এখন আমি জানি। ভবিষ্যতে যে ভয়ংকর বিপদটি আসবে সেই বিপদের মাঝে মানুষ ভেঙে পড়বে না। তোমরা যেমন ভেঙে পড়নি। তারা নিজেদের মাঝে নেতৃত্ব তৈরি করে নেবে। সেই নেতৃত্বকে মেনে নিয়ে তারা একে অন্যকে সাহায্য করবে। ঠিক যেরকম তোমরা করেছ। আর ঠিক তখন যদি আমরা রবোমানবকেও একই ধরনের বিপদের মাঝে ফেলতে পারি তখন তারা হবে ভয়ংকর রকম স্বার্থপর, তারা হবে হিংস্র, তারা হবে নিষ্ঠুর, তারা নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে একে অন্যকে হত্যা করবে। ঠিক এখানে যেরকম করেছে। মহামান্য থুল একটু হাসির মতো ভঙ্গি করলেন, তোমাদের প্রতি পৃথিবীর মানুষের কৃতজ্ঞতা! তোমাদের কাছ থেকে আমি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি পেয়েছি। আমাদের কী করতে হবে সেটা নিয়ে আমি একটু ভাবনার মাঝে ছিলাম, আমার ভাবনা দূর হয়েছে। মহামান্য থুলের কথা শেষ হবার আগেই সবাই প্রায় এক সাথে চিৎকার করে উঠল, কিন্তু আপনার কী হবে? আপনার কী হবে? তারা সেই প্রশ্নের উত্তর পেল না, প্রশ্নটি মঙ্গলগ্রহ থেকে পৃথিবীতে গিয়ে সেখান থেকে আর ফিরে এলো না, তার কারণ ততক্ষণে সেখানে একটি মহাপ্রলয় শুরু হয়ে গেছে। লাল চুলের মেয়েটি টেবিলে কাচের জারে তরলের মাঝে ড়ুবিয়ে রাখা থলথলে মস্তিষ্কটির দিকে একধরনের বিতৃষ্ণা নিয়ে তাকিয়ে রইল তারপর খুট করে সুইচটাতে চাপ দিয়ে মাইক্রোফোন অন করে বলল, এই, তুমি কী জেগে আছ? স্পিকারে একটা ক্ষীণ শব্দ শোনা গেল, জেগে আছি। আমার হয়েছে মুশকিল, কাচের জারে তোমাকে-তার মানে এই থলথলে মস্তিষ্কটা দেখতেই কেমন জানি গা ঘিনঘিন করে, আবার একটু কথা না বললে ভালোও লাগে না। তোমার কাছে আমার অনুরোধ তুমি আমাকে ধ্বংস করে দাও! আমার এই অস্তিত্ব যে কী ভয়ংকর তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। লাল চুলের মেয়েটি খিলখিল করে হেসে বলল, কে বলেছে কল্পনা করতে পারি না। অবশ্যই পারি! কল্পনা করতে পারি বলেই তো তোমাকে বাঁচিয়ে রাখছি। তুমি হচ্ছ আমার সবচেয়ে বড় বিনোদন। স্পিকার থেকে কাতর একটি কণ্ঠস্বর ভেসে ওঠে, দোহাই তোমার! দোহাই আমাকে আর কষ্ট দিও না। আমাকে শেষ করে দাও। বাজে কথা বলো না, তার চাইতে আমি তোমাকে কী বলতে এসেছি সেটা শোনো! আর কিছুক্ষণের মাঝেই পুরো নেটওয়ার্কটি আমরা দখল করে নেব। সাথে সাথে আমরা বের হব–সারাজীবন যেটা করতে পারিনি তখন সেটা করতে পারব–প্রকাশ্যে আমরা অস্ত্র নিয়ে বের হব। সবচেয়ে প্রথম কী করব তোমাকে তো বলেছি, বলেছি না? লাল চুলের মেয়েটি হাসতে হাসতে বলল, বলে থাকলেও আবার বলি। আনন্দের কথা অনেকবার শোনা যায়! মেয়েটি হাসি থামিয়ে বলল, সবার আগে হত্যা করব তোমাদের থুথুড়ে বুড়ো হতভাগা থুলকে! তার বাসভবন এরই মাঝে ঘিরে ফেলা হয়েছে। গ্রিন সিগনেল পেলেই আমরা অস্ত্র হাতে ঢুকে যাব! স্পিকার থেকে হাহাকারের মতো শব্দ ভেসে আসে, না! না! হ্যাঁ। হ্যাঁ। আমাদের সবার হাতে থাকবে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। তোমার খুলি কেটে আমি তোমাকে বের করে এনেছিলাম বলে আমাকে অনেক গুরুত্ব দেয়া হয়। থুলকে প্রথম গুলিটি করার সুযোগ দেয়া হবে আমাকে! বুঝেছ? আমাকে! একটা অসহায় যন্ত্রণার শব্দ শোনা গেল। লাল চুলের মেয়েটি সেই যন্ত্রণার শব্দটি উপভোগ করতে করতে বলল, পুরো ব্যাপারটা খুব গোপনীয়। কেউ কারো কাছে সেটা বলতে পারছে না। শুধু আমি তোমাকে বলতে পারছি! মেয়েটি আবার খিলখিল করে হেসে ওঠে। হাসির শব্দটি যে একটি অসহায় মস্তিষ্কের নিউরনে দীর্ঘসময় বিচ্ছুরিত হতে থাকল সেই কথাটি কেউ জানতে পারল না। -------------- দরজা ভেঙে বারোজন রোমানব মহামান্য থুলের বাসভবনে ঢুকে পড়ল। তারা সবাই জানে এই সময়টিতে তিনি বাসার পিছনে নরম ঘাসের ওপর একটি হেলান দেয়া চেয়ারে বসে দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন। রবোমানবগুলো তার বাসভবনের ভেতর দিয়ে ছুটে পিছনে চলে আসে, তাদের ধারণা সত্যি। মহামান্য থুল সত্যি সত্যিই একটা হেলান চেয়ারে চুপচাপ বসে আছেন। রবোমানবের পায়ের শব্দ শুনে তিনি ঘুরে তাকালেন। তার মুখে কোনো ভয় বা আতংকের ছাপ। পড়ল না। শুধুমাত্র একটু বিস্ময়ের ছাপ উঁকি দিয়ে গেল। রবোমানবের এই ছোট দলটির দলপতি, নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি একটু এগিয়ে এসে মহামান্য থুলের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, থুল! তোমার খেলা শেষ। মহামান্য থুল হাসলেন, বললেন, আমি আমার দায়িত্বটিকে কখনো খেলা হিসেবে নিই নি। মানুষটি ধমকের সুরে বলল, আমি তোমার সাথে কথার মারপ্যাচ পরীক্ষা করতে আসি নি। আমি কেন এসেছি সেটা তুমি খুব ভালো করে জান। আমি কী বলছি সেটা আরো ভালো করে জান! থুল মাথা নাড়লেন। বললেন, হ্যাঁ। জানি। বেশ ভালো ভাবেই জানি। তারপরও তোমার মুখ থেকে শোনার একটু আগ্রহ হচ্ছে। নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি হিংস্র গলায় বলল, অন্য কোনো সময় হলে আমি তোমার সাথে এই আলোচনার যেতাম না। কিন্তু আজকে-শুধু আজকে বলে আমি তোমার সাথে কথা বলছি। আজকে আমার মনটা আনন্দে ভরপুর। মহামান্য থুল বললেন, আমি শুনি তোমার কথা। আমরা রবোমানবেরা পৃথিবীটা দখল করে নিয়েছি। পৃথিবী? মহামান্য থুল ভুরু কুঁচকালেন। পৃথিবী তো অনেক বড় ব্যাপার। এক সময় সাত বিলিয়ন মানুষ ছিল। এখন সেটাকে কমিয়ে আমরা দুই বিলিয়নে নামিয়ে এনেছি। দুই বিলিয়ন মানুষের পৃথিবী কেমন করে কেউ দখল করে? নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি তার হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, নির্বোধের মতো কথা বলো না! তুমি খুব ভালো করে জান এখন পৃথিবী দখল করার জন্যে পৃথিবীর মাঠে ঘাটে দৌড়াতে হয় না। পুরো পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে নেটওয়ার্ক, কাজেই শুধু নেটওয়ার্ককে দখল করতে হয়! সেটি প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার। নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি হা হা করে হাসল। বলল, আমরা সেই অসম্ভব। কাজটি করেছি। আমরা নেটওয়ার্কটি দখল করেছি। কাজটি খুব সহজ ছিল না, একদিনেও আমরা এটা করি নি, ধীরে ধীরে করেছি। নির্বোধ মানুষের ভেতর একজন একজন করে রবোমানব ঢুকিয়েছি, তারা খানিকটা করে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অন্য রবোমানব ঢুকিয়েছে। একটু একটু করে আমরা তোমাদের নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছি। এখন এটা আমাদের নেটওয়ার্ক! এই পৃথিবীর দুই বিলিয়ন মানুষের প্রত্যেককে আমরা নিয়ন্ত্রণ করব। তাদের জীবন-মরণ এখন আমাদের হাতে! মহামান্য থুল মাথা নাড়লেন, বললেন, কাজটা খুব বুদ্ধিমানের হয় নি। কোন কাজটা? এই যে একটা নেটওয়ার্ক দিয়ে পুরো পৃথিবীর সব মানুষকে সেবা দেয়া। তুমি কিছু মনে করো না, নেটওয়ার্কটা কিন্তু মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে তৈরি হয় নি। সাহায্য করার জন্য তৈরি হয়েছে। তবে তুমি ঠিকই অনুমান করেছ। মানুষের দৈনন্দিন সব কাজই নেটওয়ার্ক দিয়ে করতে হয়, তাই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তাদের সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকেও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। হ্যাঁ। তুমি ব্যাপারটা বুঝেছ! আমরা যদি কোনো বাবা-মাকে বলি আমাদের কথা না শুনলে তোমার চার বছরের বাচ্চাটার রক্তের তেজস্ক্রিয় পদার্থ পাওয়া যাবে তাহলে কোন বাবা-মা আমাদের অবাধ্য হবে? আর নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণে থাকলে রক্তে তেজস্ক্রিয় দেয়া পানির মতো সহজ। স্কুলের লাঞ্চের প্যাকেট পর্যন্ত নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণে। মহামান্য থুলকে কেমন যেন বিষণ্ণ দেখাল। তিনি একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তোমার সাথে কথা বলে আমার মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি একটু এগিয়ে এসে বলল, বুড়ো তোমার চিন্তার কোনো কারণ নেই। তোমার মন খারাপের অনুভূতি দূর করার জন্যে আমরা এসেছি! আমাকে হত্যা করার কথা বলছ? হ্যাঁ। শুধু তোমাকে না, এই মুহূর্তে বিজ্ঞান আকাদেমীর এগারোজন সদস্যকেই হত্যা করা হচ্ছে। তোমাকে দিয়ে শুরু করব। তোমাকে নিজের হাতে হত্যা করার জন্যে সবাই আগ্রহী, আমি অনেক বেছে এই মেয়েটিকে সুযোগ দিয়েছি। নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করতেই লাল চুলের মেয়েটি হাসি হাসি মুখে এগিয়ে এল। থুল কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, আমার ঠিক তোমার বয়সী একটা মেয়ে আছে। আমার তোমার বয়সী বাবা নেই। তুমি আমাকে হত্যা করবে? হ্যাঁ। আমার গুলি করতে খুব ভালো লাগে। ঠিক আছে গুলি কর। মেয়েটি তার অস্ত্রটি উপরে তুলতেই মহামান্য থুল হাত তুলে তাকে থামালেন বললেন, এক সেকেন্ড।। কী হয়েছে? আমাকে হত্যা করার আগে আমি কি তোমাদের একটা কথা বলতে পারি? কী কথা? একটি নেটওয়ার্ক দিয়ে পুরো মানবজাতিকে একটা শৃঙ্খলার মাঝে আনার মাঝে একটা ঝুঁকি আছে সেটা যে আমরা অনুমান করেছিলাম সেটা কি তোমরা জান? তুমি কী বলতে চাইছ? তোমরা যে নেটওয়ার্কটি দখল করতে চাইবে সেটা আমরা অনুমান করেছিলাম সেটা কী তোমরা জান? এটা একটা ছোট শিশুও অনুমান করতে পারবে। কাজেই আমরা কী করেছি তোমরা জান? কী করেছ? নেটওয়ার্কটি ধ্বংস করে দিয়েছি। এই মুহূর্তে সেটি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটির এক মুহূর্ত সময় লাগল কথাটি বুঝতে। যখন বুঝতে পারল তখন সে হা হা করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, বুড়ো ভাম কোথাকার! তুমি আমাকে বুদ্ধিহীন প্রতিবন্ধী ভেবেছ? তুমি ভেবেছ আমি জানি না যে এই নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা সম্ভব না? সরাসরি নিউক্লিয়ার বোমা ফেলেও এটা ধ্বংস করা যায় না? ওর কোনো নিয়ন্ত্রণ কক্ষ নেই, এটা বন্ধ করার কোনো সুইচ নেই! এর বিদ্যুৎপ্রবাহ বন্ধ করার কোনো উপায় নেই, মূল কেন্দ্রে মানুষ ঢোকার ব্যবস্থা নেই। ভূমিকম্প, সুনামি এর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না! তুমি ভেবেছ আমি এসব জানি না? তুমি ভেবেছ আমি জানি না যে এটি অনেক জায়গায় এটি কপি করে রাখা আছে? তুমি ভেবেছ আমি তোমার এই অর্থহান প্রলাপ বিশ্বাস করব? মহামান্য থুল মাথা নাড়লেন, বললেন, আমি একবারও সেটি ভাবি নি। আমি ভেবেছি তুমি আমার কথা শুনে খোঁজ নেবে আমি কী সত্যি কথা বলেছি নাকি মিথ্যে কথা বলে তোমাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছি। রবোমানবেরা তাদের হেডফোনে কিছু শোনার চেষ্টা করে, তাদেরকে হঠাৎ করে বিভ্রান্ত দেখা যায়, নিজেদের ভেতরে ফিসফিস করে কথা বলে তারপর নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটির কাছে ছুটে আসে, চাপা গলায় বলে, আসলেই নেটওয়ার্ক থেকে কোনো তথ্য আসছে না। মহামান্য থুল হাসলেন, বললেন, এটা কোনো কূট চাল নয়! তোমাদের বিভ্রান্ত করার কোনো কৌশল নয়। আসলেই নেটওয়ার্কটিকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি চিৎকার করে বলল, অসম্ভব! নেটওয়ার্ক দখল করার মতো অসম্ভব একটা কাজ যদি তোমরা করতে পার, তাহলে সেটা ধ্বংস করার মতো আরেকটা অসম্ভব কাজ কেন আমরা করতে পারব না? এটা কেউ করতে পারবে না–নিশ্চয়ই এখানে অন্য কিছু আছে। অন্য কিছু নেই। আছে। নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি হিংস্র গলায় বলল, নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা অসম্ভব। স্বয়ং শয়তান এলেও পারবে না। আমি এক্ষুণি বের করছি আসলে কী হয়েছে। মানুষটি তার পকেট থেকে ছোট কমিউনিকেশন মডিউল বের করে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। সে হতবাক হয়ে আবিষ্কার করে সেটি নীরব হয়ে আছে। সে বোতামগুলো স্পর্শ করল, কোনো লাভ হল না। তারপর সেটা ধরে সে ঝাঁকুনি দিল, দুই হাতে সেটাকে পাগলের মতো আঘাত করতে লাগল। মহামান্য থুল বললেন, কোনো লাভ নেই। তুমি আমার কথা বিশ্বাস কর, পৃথিবীতে এখন কোনো নেটওয়ার্ক নেই। নেটওয়ার্কটি ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। তোমরা যেন পৃথিবীর মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পার সেজন্যে আমরা নেটওয়ার্কটি ধ্বংস করেছি! অসম্ভব! হ্যাঁ। প্রায় অসম্ভব। তারপরও করেছি। খুব বেশি জানাজানি হতে দেই নি, ধ্বংস করার দায়িত্বটি নিয়েছিলাম আমি! মহামান্য থুল একটু হাসলেন, এই প্রথম আমি কিছু একটা ধ্বংস করলাম! নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটির মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে ওঠে, সে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলে, অসম্ভব! অসম্ভব! তুমি আমাকে ধোঁকা দিতে চেষ্টা করছ। তোমাদের অন্য কোনো মতলব আছে! তোমরা খুব ভালো করে জান নেটওয়ার্ক। ধ্বংস হলে পুরো পৃথিবীর সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যাবে! পুরো পৃথিবী অচল হয়ে যাবে। নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা হচ্ছে মাথায় গুলি করার মতো। মহামান্য থুল মাথা নাড়লেন, বললেন, তুমি ঠিকই বলেছ! পুরো পৃথিবী এখন ওলট-পালট হয়ে যাবে! কোথাও কোনো তথ্য নেই, কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সমস্ত পৃথিবীতে এখন বিশৃঙ্খল অবস্থা শুরু হবে! চরম বিশৃঙ্খলা! তুমি বলতে চাইছ তুমি নিজের হাতে পৃথিবী ধ্বংস করছ? মহামান্য থুল বাধা দিয়ে বললেন, আমি মোটেও পৃথিবী ধ্বংস করছি না। আমি শুধু নেটওয়ার্কটি ধ্বংস করেছি। নেটওয়ার্ক! নেটওয়ার্ক ধ্বংসের কারণে পৃথিবী ধ্বংস হবে না—পৃথিবী অনেক বড় ব্যাপার। এতে অল্পে পৃথিবী ধ্বংস হয় না। বড়জোর বিশৃঙ্খলা হবে, হই চই হবে, ওলট-পালট হবে কিন্তু ধ্বংস মোটেও হবে না। তোমরা যেহেতু সব খবর রাখো, তোমরা নিশ্চয়ই জান খাদ্যশস্যের যেন কোনো অভাব না হয় সেজন্যে আমরা অনেকদিন থেকে একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যন্ত খাবার মজুদ করেছি। ওষুধপত্র মজুদ করেছি, প্রয়োজনীয় রসদ মজুদ করেছি! কাজেই পৃথিবীর মানুষ প্রথম কয়েকদিন হই চই করবে, একটু বিশৃঙ্খল হবে তারপর নিজেরা নিজেদের নেতৃত্ব তৈরি করে নিজেদের দায়িত্ব নেবে! তোমরা তাদের নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পাবে না। নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি বিস্ফারিত চোখে মহামান্য থুলের দিকে তাকিয়ে রইল, সে এখনো তার কথা বিশ্বাস করতে পারছে না। মানুষের চেহারায় নিষ্ঠুরতা সরে গিয়ে সেখানে এখন এক ধরনের আতংকের ছাপ পড়তে শুরু করেছে। সে তার শুকনো ঠোঁটকে জিভ দিয়ে ভিজিয়ে মাথা নেড়ে বলল, আমি তোমার একটি কথাও বিশ্বাস করি না। মহামান্য থুল তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, না করলে নেই। তারপরও তোমাদের জানিয়ে রাখছি। আমার মনে হয় তোমাদের আরো একটা তথ্য জানিয়ে রাখা দরকার। মানুষের উপর যখন বড় বিপদ নেমে আসে তখন তারা একে অন্যের বিভেদ ভুলে যায়, তারা তখন এক সাথে কাজ করে। তার কারণ হচ্ছে মানুষের সভ্যতার জন্মই হয়েছে একজনের জন্যে অন্যের মমতা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে। রবোমানবেরা তাদের ভেতর থেকে মমতা আর ভালোবাসা তুলে দিয়েছে। তাই রবোমানবেরা যখন বড় বিপদে পড়ে তখন তারা কী করে জান? কী করে? তারা স্বার্থপর হয়ে যায়। হিংস্র হয়ে যায়। একে অন্যকে সরিয়ে নেতৃত্ব নিতে চায়। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। তখন কী হয় জান? নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি কোনো কথা না বলে থুলের দিকে তাকিয়ে রইল। মহামান্য থুল তার দিকে তাকিয়ে বললেন, তখন রবোমানবেরা একে অন্যকে হত্যা করে! কাজেই আমি কাগজে লিখে দিতে পারি আজ থেকে তিন মাস পরে পৃথিবীতে কোনো রোমানব থাকবে না। যেহেতু নেটওয়ার্ক থেকে কোনো সাহায্য পাবে না তাই একজন আরেক জনকে হত্যা করতে থাকবে! লালচুলের মেয়েটি বলল, তুমি এটা কী ভাবে জান? মঙ্গল গ্রহে আমরা ছোট একটা এক্সপেরিমেন্ট করেছি। সেই এক্সপেরিমেন্টে দেখা গেছে বড় বিপদের মাঝে রবোমানবের মা তার সন্তানকে হত্যা করে ফেলে! লাল চুলের মেয়েটি নিষ্ঠুর চেহারার দলপতির দিকে তাকাল। দলপতির চেহারায় নিষ্ঠুরতাটুকু সরে গিয়ে এখন সেখানে একধরনের উদ্ভ্রান্ত ভাব চলে এসেছে। লাল চুলের মেয়েটি বলল, আমি কি এখন গুলি করতে পারি। দলপতি বলল, দাঁড়াও। এক সেকেন্ড। তারপর ঘুরে মহামান্য থুলের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি এখনো বিশ্বাস করি না তুমি নেটওয়ার্ক ধ্বংস করেছ। কিন্তু আমি তারপরও জানতে চাই সত্যিই যদি ধ্বংস করে থাক তাহলে সেটি কেমন করে করেছ? মহামান্য থুল হেসে চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন, তোমার পক্ষে সেটা বোঝা সম্ভব না। তোমার মস্তিষ্ক সেটা বোঝার ক্ষমতা রাখে না। আমি তবু শুনতে চাই। রবোমানবদের দলপতি ক্ষিপ্ত স্বরে বলল, আমাকে বল। আমি তোমাকে পুরো ব্যাপারটি বোঝাতে পারব না, বড় জোর তোমাকে একটু ধারণা দিতে পারি। মহামান্য থুল তার আঙুলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, আমি জানি না, তোমরা লক্ষ করেছ কি না প্রিসা নগরীর উত্তরের বনাঞ্চলে একটা আগুন জ্বলছে। শীতের মওসুমে প্রায়ই জ্বলে—এটি এমন কিছু বড় ব্যাপার নয়। তবে আগুনের কারণে যে ধোয়া হয় সেটা সূর্যের আলোকে আটকে দেয় তাই নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সৌর বিদ্যুতের প্যানেলগুলো প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে না। সেটি এমন কোনো গুরুতর ব্যাপার না, কিন্তু ঠিক একই সময় মাহীরা হদের সুইস গেট খুলে নিচের শুষ্ক অঞ্চল পাবিত করা হয়েছে। খুবই স্বাভাবিক একটা কাজ কিন্তু হদের পানির উচ্চতা কমে গিয়েছে, পানি দিয়ে বিদ্যুৎ প্লান্ট শীতল করা হলে এক সময় সেটি সম্ভব হবে না! তোমরা লক্ষ করেছ কিনা জানি না দুটো বিনোদন উপগ্রহ বন্ধ হয়ে গিয়েছে, মানুষের বিনোদনের উপায় নেই, নগরীতে বিক্ষোভ হয়েছে তার জন্যে নিরাপত্তা কর্মীরা ব্যস্ত, ঠিক তখন শক্তি কেন্দ্রে তেজস্ক্রিয় আয়োডিন পাওয়া গেছে, নিরাপত্তা কেন্দ্র, শক্তি কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে! মাজুরা ইলেকট্রিক কোম্পানির ফোরম্যানকে অগ্রিম বোনাস দেয়া হয়েছে-এই মানুষটি বোনাস পেলেই শহরে গিয়ে উত্তেজক পানীয় খায়, ভোরে ঠিক করে কাজ করতে পারে না। সেজন্যে সে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি এবং একটা দুর্ঘটনা ঠেকাতে পারেনি। অগ্নিকাণ্ডের জন্যে যে ফায়ারব্রিগেড যাবার কথা তাদেরও সমস্যা হয়েছে সবুজ পৃথিবীর স্কুলের বাচ্চাদের জন্যে! তারা আর্ট মিউজিয়ামে গিয়েছে সকাল দশটায় সেজন্যে রাস্তাটা সাময়িকভাবে বন্ধ! এরকম অসংখ্য ছছাট ছোট ঘটনা আলাদা আলাদা ভাবে পুরোপুরি গুরুত্বহীন। কিন্তু যখন একটার সাথে আরেকটা জুড়ে দেখ দেখবে সেটি ভয়াবহ বিপজ্জনক! নেটওয়ার্কের কেন্দ্রটি ধ্বংস হয়ে যাবে। গিয়েছে! রবোমানবের দলপতি হিংস্র গলায় বলল, তার মানে তুমি দাবি করছ কী করলে কী হবে তার সবগুলো তুমি আগে থেকে জান? হ্যাঁ জানি। আমাকে কেউ দাবা খেলায় কখনো হারাতে পারে না—কী হলে কী হতে পারে তার সম্ভাব্য সবকিছু আমি বলতে পারি। এখানেও আমি বলতে পারি, তাই কিছু ছোটখাট ব্যবস্থা করে দিয়েছি। এর সবগুলোর সম্মিলিত ফল হচ্ছে নেটওয়ার্ক ধ্বংস হওয়া। মহামান্য থুল বললেন, ক্যাওস থিওরি বলে একটা থিওরি আছে। সেখানে বলা হয় এখানে হয়তো একটা প্রজাপতি তার ডানা ঝাঁপটেছে–তার ফলস্বরূপ অন্য গোলার্ধে একটা ঘূর্ণিঝড় হয়ে যাবে! এখানেও তাই, পার্থক্য হল আমি নিজের হাতে একটি একটি করে সেটা সাজিয়েছি। রবোমানবের দলপতি বলল, আমি তোমার কথা বিশ্বাস করি না! ঠিক আছে। তোমার ইচ্ছা। মহামান্য থুল কাঁধ ঝাঁকিয়ে চুপ করলেন। লাল চুলের মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, আমি কী এখন এই বুড়োটিকে গুলি করব! দলপতি হিংস্র গলায় বলল, হ্যাঁ। করো। এর এই অভিশপ্ত মস্তকটাকে ছিন্নভিন্ন করে দাও। লাল চুলের মেয়েটি তার স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র তুলে গুলি করল। ঝলক ঝলক রক্ত বের হয়ে দেহটি ঘুরে পড়ে যাবার কথা ছিল কিন্তু দেহটি পড়ে গেল না। বরং মহামান্য থুল ওঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি তোমাদের আরো একটু বুদ্ধিমান ভেবেছিলাম। তোমরা কেউ অনুমান করতে পার নি আমি যে আমি নই? আমি আমার হলোগ্রাফিক ছবি। নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়ে গেছে, জরুরি বিদ্যুৎ দিয়ে এই হলোগ্রাফিক ছবি তোমাদের দেখানো হয়েছে, মনে হয় আর দেখানো সম্ভব নয়। সত্যিই যদি আমাকে চাও বাইরে খুঁজতে হবে। আমি এখন বাইরে। লক্ষ লক্ষ বিভ্রান্ত আতংকিত মানুষের সাথে মিশে গেছি। প্রচণ্ড আক্রোশে সবগুলো রবোমানব মহামান্য থুলের হলোগ্রাফিক ছবিটিকেই গুলি করতে থাকে। মহামান্য থুল হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে বইলেন। খুব ধীরে ধীরে তার ছবিটি মিলিয়ে গেল। রাস্তার ফুটপাথ দিয়ে অসংখ্য মানুষ ছুটছে। একটা ছোট শিশু কাঁদছে আর তার মা শিশুটির হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। শিশুটি জিজ্ঞেস করল, এখন কী হবে মা? নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়ে গেছে– আমি জানি না। মা ভয় পাওয়া গলায় বললেন, আমি জানি না বাবা। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বৃদ্ধ বলল, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে। মা জিজ্ঞেস করল, আপনি কেমন করে জানেন? বৃদ্ধ হাসলেন, বললেন, আমি জানি! মানুষের অসাধ্য কিছু নেই। আপনাকে চেনা চেনা লাগছে। আপনাকে কী আমি আগে কখনো দেখেছি? আমি জানি না। অনেকের চেহারা হয় এরকম, দেখলেই মনে হয় আগে কোথায় জানি দেখেছি। মনে হয় আমার চেহারা সেরকম। আপনি সত্যিই বলছেন, সব ঠিক হয়ে যাবে? হ্যাঁ। বিশ্বাস কর। আমি বলছি সব ঠিক হয়ে যাবে। মা শিশুটিকে নিয়ে ছুটতে থাকে। শিশুটি এখন নতুন উৎসাহে ছুটতে ছুটতে হঠাৎ ফিক করে হেসে ফেলল, মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হাসছিস কেন? এমনি। তোর ভয় করছে না? না। আমার ভয় করছে না। কেন ভয় করছে না? ঐ যে বললেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। কোন বুড়ো কী না কী বলেছে— কী বলছ তুমি মা? তুমি মহামান্য থুলকে চিনতে পার নি? মা থমকে দাঁড়ালেন, পিছনে তাকালেন কিন্তু থুলকে আর খুঁজে পেলেন না।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৬১৯ জন


এ জাতীয় গল্প

→ টুকি ও ঝায়ের (প্রায়) দুঃসাহসিক অভিযান {8}
→ কেপলার টুটুবি {7}
→ কেপলার টুটুবি {6}
→ কেপলার টুটুবি {5}
→ কেপলার টুটুবি {4}
→ কেপলার টুটুবি {3}
→ কেপলার টুটুবি {2}
→ কেপলার টুটুবি {01}

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...