গল্পেরঝুড়ির এ্যাপ ডাউনলোড করুন - get google app
গল্পেরঝুড়ি ফানবক্স ! এখন গল্পের সাথেও মজাও হবে! কুইজ খেলুন , অংক কষুন , বাড়িয়ে নিন আপনার দক্ষতা জিতে নিন রেওয়ার্ড !

গল্পেরঝুড়িতে লেখকদের জন্য ওয়েলকাম !! যারা সত্যকারের লেখক তারা আপনাদের নিজেদের নিজস্ব গল্প সাবমিট করুন... জিজেতে যারা নিজেদের লেখা গল্প সাবমিট করবেন তাদের গল্পেরঝুড়ির রাইটার পদবী দেওয়া হবে... এজন্য সম্পুর্ন নিজের লেখা অন্তত পাচটি গল্প সাবমিট করতে হবে... এবং গল্পে পর্যাপ্ত কন্টেন্ট থাকতে হবে ...

সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান... জিজেতে আজে বাজে কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন ... অন্যথায় আপনার আইডি বা কমেন্ট ব্লক করা হবে... আর গল্প দেওয়ার ক্ষেত্রে গল্প দেওয়ার নিয়ম মেনে চলুন ... সার্বিকভাবে জিজের নীতিমালা মেনে চলার চেস্টা করুন ...

কর্ভাস

"রোমাঞ্চকর গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আরাফাত হোসেন (০ পয়েন্ট)



নভেম্বর মাসে চিলির রাজধানী সানতিয়াগো শহরে সারা বিশ্বের পক্ষিবিজ্ঞানীদের একটা কনফারেনস আছে। মিনেসোটাতে আমার পক্ষিবিজ্ঞানী বন্ধু রিউফাস গ্রেনফেলকে একটা চিঠি লিখে দিয়েছি। যদি আমার বায়স বন্ধুটি সত্যি করে মানুষের বুদ্ধি কিছুটা আয়ত্ত করতে পারে, তা হলে ওকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে সম্মেলনে ডিমনসট্রেশন সহ একটা বক্তৃতা দেওয়া চলতে পারে । ৪ঠা অক্টোবর কর্ভাস হল কাক জাতীয় পাখির ল্যাটিন নাম । আমার ছাত্রটিকে আমি ওই নামেই ডাকছি। নাম ধরে ডাকলে প্রথম দিকে আমার দিকে ফিরে ফিরে চাইত, এখন দেখছি গলা দিয়ে শব্দ করে উত্তর দেয় । এই প্রথম একটা কাককে “ক” না বলে “কি বলতে শুনছি। তবে কণ্ঠস্বরের বিশেষ পরিবর্তন আমি আশা করছি না । অৰ্থাৎ কভাঁসকে দিয়ে কথা বলানো চলবে না। তার বুদ্ধির পরিচয় তার কাজেই প্রকাশ পাবে বলে আমার বিশ্বাস । কভার্স এখন ইংরাজি শিখছে। বাইরে গিয়ে ডিমনসট্রশন দিতে গেলে এই ভাষাটার প্রয়োজন হবে । ওর ট্রেনিং-এর সময় হল সকাল আটটা থেকে নাটা । দিনের বেলা বাকি সময়টা ও আমার ঘরের আশপাশেই ঘোরাফেরা করে । সন্ধ্যা হলে এখনও রোজই চলে যায় আমার বাগানের উত্তর-পশ্চিম কোণের আম গাছটায় । নিউটন দেখছি কভাঁসকে দিব্যি মেনে নিয়েছে। আজকে যে ঘটনাটা ঘটল, তার পরে সম্পর্কটা বন্ধুত্বে পরিণত হলেও আশ্চর্য হব না। ব্যাপারটা ঘটল দুপুরে। নিউটন আমার আরাম কেদারাটার পাশে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে, ক'ভসি কোথায় যেন উধাও, আমি খাতায় নোট লিখছি, এমন সময় হঠাৎ ডানার ঝটপটানি শুনে জানালার দিকে চেয়ে দেখি কভাঁস ঘরে ঢুকেছে, তার ঠোঁটে একটি সদ্য কাটা মাছের টুকরো। সে সেটাকে এনে থপ দিক ও দিক দেখতে লাগিল । গ্রেনফেল আমার চিঠির উত্তর দিয়েছে। লিখেছে, সে পক্ষিবিজ্ঞানীদের সম্মেলনে আমাকে নেমন্তান্ন পাঠানোর বন্দোবস্ত করছে। আমি অবশ্যই যেন কাক সমেত যথাসময়ে সানতিয়াগোতে গিয়ে হাজির হই। ২০শে অক্টোবর দু' সপ্তাহে অভাবনীয় প্রোগ্রেস। কভাস ঠোঁটে পেনসিল নিয়ে ইংরিজি কথা আর সংখ্যা লিখছে। কাগজটাকে টেবিলের উপর ফেলে দিতে হয়, কভাস তার উপর দাঁড়িয়ে লেখে । ওর নিজের নাম ইংরাজিতে লিখল— C-O-R-V-U-S । সহজ যোগ বিয়োগ করতে পারছে, ইংল্যান্ডের রাজধানী কী জিজ্ঞেস করলে লিখতে পারছে, আমার পদবি লিখতে পারছে। তিন দিন আগে মাস, বার, তারিখ শিখিয়ে দিয়েছিলাম, আজকে কী বার, জিজ্ঞেস করাতে পরিষ্কার অক্ষরে লিখল- F-R-I-D-A-Y । কভাঁসের খাওয়ার ব্যাপারেও বুদ্ধির পরিচয় পেয়েছি। আজ একটা পাত্রে রুটি-টােস্টের টুকরো আর আরেকটাতে খানিকটা পেয়ারার জেলি ওর সামনে রেখেছিলাম। ও রুটির টুকরোগুলো মুখে পোরার আগে প্রতি বারই ঠোঁট দিয়ে খানিকটা জেলি মাখিয়ে নিচ্ছিল। ২২শে অক্টোবর কভাস যে এখন সাধারণ কাকের থেকে নিজেকে আলাদা রাখতে চায়, তার স্পষ্ট প্রমাণ আজকে পেলাম। আজ দুপুরে হঠাৎ খুব বৃষ্টি হল, সঙ্গে বিদ্যুৎ ও বজ্ৰপাত। তিনটে নাগাত একটা কানফাটানো বাজ পড়ার শব্দ শুনে জানালার কাছে গিয়ে দেখি, আমার বাগানের বাইরের শিমুল গাছটা থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। বিকেলে বৃষ্টি থামার পর প্রচণ্ড কাকের কোলাহল । এ তল্লাটে যত কাক আছে, সব ওই মরা গাছটায় জড়ো হয়ে হল্লা করছে। আমার চাকর প্রহ্লাদকে ব্যাপারটা দেখতে পাঠালাম। সে ফিরে এসে বলল, “বাবু, একটা কাক মরে পড়ে আছে। গাছটার নীচে, তাই এত চেল্লাচেল্লি। ’ বুঝলাম বাজ পড়ার ফলেই কাকটার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্য- কভাস আমার ঘর থেকে বেরোবার কোনও রকম আগ্ৰহ দেখাল না । সে একমনে পেনসিল মুখে দিয়ে প্রাইম নাম্বারুস লিখে চলেছে— 2,3,4,5,7,11,13...... ৭ই নভেম্বর কভাঁসকে এখন সদৰ্পে বৈজ্ঞানিক মহলে উপস্থিত করা চলে। পাখিকে শিখিয়ে পড়িয়ে খুঁটিনাটি ফরমাশ খাটানোর নানা রকম উদাহরণ পাওয়া যায়, কিন্তু কভাসের মতো এমন শিক্ষিত পাখির নজির পৃথিবীর ইতিহাসে আর আছে বলে আমার জানা নেই। অরনিথন যন্ত্রের প্রয়ােজন ফুরিয়ে গেছে। অঙ্ক, জ্যামিতি, ইতিহাস, ভূগোল, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ইত্যাদি সব বিষয়েই যে সব প্রশ্নের উত্তর সংখ্যার সাহায্যে বা অল্প কয়েকটি শব্দের সাহায্যে দেওয়া যায়, কিভাস তা শিখে নিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ওর মধ্যে যে জিনিসটা প্রায় আপনার থেকে জেগে উঠেছে, সেটাকে বলা চলে মানবসুলভ বুদ্ধি বা হিউম্যান ইনটেলিজেনস— যেটার সঙ্গে পাখির কোনও সম্পর্ক নেই। উদাহরণস্বরূপ একটা ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। সানতিয়াগো যাব বলে আজ সকালে আমার সুটকেস গোছাচ্ছিলুম। গোছানাে শেষ হলে পর বাক্সের ঢাকনা বন্ধ করে পাশে ফিরে দেখি, কভাস সুটকেসের চাবিটা ঠোঁটে নিয়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। কাল গ্রেনফেলের আর একটা চিঠি পেয়েছি। ও সানতিয়াগো পৌছে গেছে। পক্ষিবিজ্ঞানী সম্মেলনের কর্তৃপক্ষ আমার আসার পথ চেয়ে আছে। এর আগে এই সব সম্মেলনে কেবল পাখি নিয়ে বক্তৃতাই হয়েছে, জ্যান্ত পাখির সাহায্যে উদাহরণ সমেত কোনও বক্তৃতা কখনও হয়নি। গত দু মাসের গবেষণার ফলে পাখির মস্তিষ্কের বিষয়ে আমি যে দুর্লভ জ্ঞান সঞ্চয় করেছি, সে সম্পর্কে একটা প্ৰবন্ধ লিখছি। সেটাই হবে সম্মেলনে আমার পেপার। প্রতিবাদীর মুখ বন্ধ করার জন্য সঙ্গে থাকবে কভাস। ১০ই নভেম্বর দক্ষিণ আমেরিকা যাবার পথে প্লেনে বসে এই ডায়রি লিখছি। একটিমাত্র ঘটনাই লেখার আছে । বাড়ি থেকে যখন রওনা হব, তখন কভার্স হঠাৎ দেখি তার খাঁচা থেকে বার হওয়ার জন্য ভারী ছটফটানি আরম্ভ করেছে। কী ব্যাপার বুঝতে না পেরে খাঁচার দরজা খুলে দিতেই সে সটান উড়ে গিয়ে আমার রাইটিং টেবিলে বসে ঠোঁট দিয়ে উপরের দেরাজটায় ভীষণ ব্যস্তভাবে টােকা মারতে আরম্ভ করল। দেরাজ খুলে দেখি, আমার পাসপোর্ট-টা তার মধ্যে রয়ে গেছে । কভাসের জন্য একটা নতুন ধরনের খাঁচা বানিয়ে নিয়েছি। যে আবহাওয়া কভাসের পক্ষে সবচেয়ে আরামদায়ক, খাঁচার ভিতর কৃত্রিম উপায়ে সেই আবহাওয়া বজায় রাখার ব্যবস্থা করেছি। খাবার জন্য কাকের পক্ষে পুষ্টিকর ভিটামিন দিয়ে হােমিওপ্যাথিক বড়ির মতো মুখরোচক বড়ি তৈরি করে নিয়েছি। প্লেনের যাত্রীদের মধ্যে কেউই বোধ হয় এর আগে কখনও পোষা কাক দেখেনি। কভাস তাই সকলেরই কৌতুহল উদ্রেক করছে। তবে আমি আমার কাকের বিশেষত্ব সম্পর্কে কাউকে কিছু বলিনি। ব্যাপারটা গোপন রাখতে চাই অনুমান করেই বোধ হয়। কভাসও সাধারণ কাকের মতোই ব্যবহার করছে। ১৪ই নভেম্বর হােটেল একসেলসিয়ার, সানতিয়াগো। রাত এগারোটা । দু দিন খুব ব্যস্ত ছিলাম, তাই ডায়রি লেখার সময় পাইনি। আগে আমার বক্তৃতার কথাটা বলে নিই, তারপর এই কিছুক্ষণ আগের চাঞ্চল্যকর ঘটনায় আসা যাবে। এক কথায় বলা যায়, কভার্সসহ আমার বক্তৃতাটা হয়েছে- অ্যানাদার ফেদার ইন মাই ক্যাপ । লেখাটা পড়তে লেগেছিল আধা ঘণ্টা, তারপর কভাসকে নিয়ে ডিমন্সট্রেশন চলল। এক ঘণ্টার উপর। আমি মঞ্চে উঠেই কাভার্সকে খাঁচা থেকে বার করে টেবিলের উপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। প্ৰকাণ্ড লম্বা মেহগনির টেবিল, তার পিছনে লাইন করে সম্মেলনের কর্তৃপক্ষীরা বসেছেন, আমি এক পাশে দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোনে আমার প্রবন্ধ পড়ছি। পড়া যতক্ষণ চলল, ততক্ষণ কভসি এক পা-ও নড়েনি। তার এক পাশে ঘাড় কত করার ভঙ্গি ও মাঝে মাঝে মাথা উপরনীচ করা থেকে মনে হচ্ছিল, সে গভীর মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনছে এবং কথা বুঝতেও পারছে। বক্তৃতা শেষ হবার পর চারিদিক থেকে করধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে একটা কাঠঠোকরার মতো শব্দ শুনে টেবিলের দিয়ে চলেছে । ডিমনসট্রেশনের সময় অবিশ্যি। কভাসের কোনও বিরাম ছিল না। গত দু মাসে সে যা কিছু শিখেছে। সবই সম্মেলনের অভ্যাগতদের সামনে উপস্থিত করে তাঁদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে। সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেছে যে পাখির মস্তিষ্কে মানুষের জ্ঞান ও বুদ্ধি যে এভাবে প্রবেশ করতে পারে, তা কেউ কল্পনাই করতে পারেনি। এখানকার কাগজ “কোরিয়েরে দেল সানতিয়াগো’-র সান্ধ্য সংস্করণে এর মধ্যেই কভাসের খবর বেরিয়ে গেছে। শুধু বেরিয়েছে নয়, প্রথম পাতায় প্রধান খবর হিসেবে বেরিয়েছে, আর তার সঙ্গে বেরিয়েছে পেনসিল মুখে কভাসের একটা ছবি । মিটিং-এর পর গ্রেনফেল ও সম্মেলনের চেয়ারম্যান সিনিয়র কোভারুবিয়াসের সঙ্গে সানতিয়াগো শহর দেখতে বেরিয়েছিলাম। জনবহুল মনােরম আধুনিক শহর, পুব দিকে আন্ডিজ পর্বতশ্রেণী চিলি ও আরজেনটিনার মধ্যে প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ঘণ্টাখানেক ঘোরার পর কোভারুবিয়াস বললেন, “সম্মেলনের প্রোগ্রামে দেখে থাকবে, অতিথিদের জন্য আমরা নানা রকম আমোদপ্রমোদের আয়োজন করেছি। তারমধ্যে আজ বিকেলের ব্যাপারটায় আমি ব্যক্তিগতভাবে তোমাকে উপস্থিত থাকতে অনুরোধ করছি। একটি চিলিয়ান জাদুকর আজ তামাশা দেখাবেন তােমাদের খাতিরে। ইনি আগািস নামে পরিচিত । এর বিশেষত্ব হচ্ছে এই যে, ইনি ম্যাজিকে নানা রকম পাখি ব্যবহার করেন ৷ ” ব্যাপারটা শুনে কৌতুহল হয়েছিল, তাই আমি আর গ্রেনফেল আজ বিকেলে এখানকার প্লাজা থিয়েটারে আগাসের ম্যাজিক দেখতে গিয়েছিলাম। লোকটা নানা রকম পাখি ব্যবহার করে, সেটা ঠিকই। হাঁস, কাকাতুয়া, পায়রা, মোরগ, তিন হাত লম্বা সারস, এক ঝাঁক হামিং বার্ড— এ সবই কাজে লাগায় আগািস এবং বোঝাই যায় যে, সব কটি পাখিকেই সে বেশ দক্ষতার সঙ্গে কাজ শিখিয়ে নিয়েছে। বলাবাহুল্য, এই কাজের কোনওটাই আমার কভাসের কৃতিত্বের ধারেকাছেও আসে না। সত্যি বলতে কী, পাখির চেয়ে আমার অনেক বেশি ইনটারেস্টিং মনে হল জাদুকর ব্যক্তিটিকে । টিয়াপাখির মতো নাক, মাঝখানে সিঁথি করা, টান করে পিছনে আচড়ানো নতুন গ্রামোফোন রেকর্ডের মতো চকচকে চুল, চোখে মাইনাস পাওয়ারের চশমা, তার কাচ এত পুরু যে, মণি দুটােকে তীক্ষ বিন্দুর মতো দেখায়। লম্বায় লোকটা ছ। ফুটের উপর। চকচকে কালো কোটের আস্তিনের ভিতর থেকে দুটাে শীর্ণ ফ্যাকাশে হাত বেরিয়ে আছে, সেই হাতের বিভিন্ন ভঙ্গিমাই দর্শকদের সম্মোহিত করে রাখে । জাদু খুব উঁচু দরের না হলেও, জাদুকরের চেহারা ও হাবভাব দেখেই প্রায় পয়সা উঠে আসে। আমি শো দেখে হল থেকে বেরোবার সময় গ্রেনফেলকে পরিহাসচ্ছলে বললাম, “আমাদের যেমন আগাসের ম্যাজিক দেখানো হল, আগািসকে তেমনই কিভাসের খেলা দেখাতে পারলে মন্দ হত না । ” রাত ন’টায় ডিনার ও তারপরে অতি উপাদেয় চিলিয়ান কফি খেয়ে গ্রেনফেলের সঙ্গে হােটেলের বাগানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে সবেমাত্র ঘরে এসে বাতি নিবিয়ে বিছানায় শুয়েছি, এমন সময় টেলিফোন বেজে উঠল। আমি একটু অবাক হয়ে অন্ধকারেই রিসিভারটা তুলে কানে দিলাম । “সিনিয়ার শঙ্কু ? “হ্যাঁ—” ‘আমি রিসেপশন থেকে বলছি। আপনাকে অসময়ে বিরক্ত করার জন্যে ক্ষমা চাইছি। একটি ভদ্রলোক বিশেষ করে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন ৷ ” আমি বাধ্য হয়েই বললাম যে আমি ক্লান্ত, সুতরাং ভদ্রলোক যদি কাল সকালে আমাকে টেলিফোন করে একটা অ্যাপয়েনটমেনটি করতে পারেন, তা হলে ভাল হয়। নিশ্চয়ই কোনও রিপোটাির হবে । এরমধ্যেই চারজন সাংবাদিককে ইন্টারভিউ দিতে হয়েছে এবং তারা যে সব প্রশ্ন করেছে, তাতে আমার মতো ঠাণ্ডা মেজাজের মানুষকেও রীতিমতো অসহিষ্ণু হয়ে পড়তে হয়। একজন সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, ভারতবর্ষে যেমন গোরুকে পুজো করা হয়, তেমনই কাককেও হয় কি না । রিসেপশন লোকটির সঙ্গে কথা বলে বলল, “সিনিয়র শঙ্কু, ভদ্রলোক বলছেন তিনি পাঁচ মিনিটের বেশি সময় নেবেন না। সকালে ওঁর একটা অন্য এনগেজমেন্ট রয়েছে। ” বললাম, “যিনি এসেছেন তিনি কি সংবাদপত্রের লোক ?” “আজ্ঞে, না। ইনি হলেন বিখ্যাত চিলিয়ান জাদুকর আগািস।” নামটা শুনে বাধ্য হয়েই ভদ্রলোককে উপরে আসতে বলতে হল । বিছানার পাশের টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দিলাম। তিন মিনিট পরে কলিং বেল বেজে উঠল । দরজা খুলে যাঁকে সামনে দেখলাম, তাঁকে স্টেজে ছা ফুট বলে মনে হয়েছিল, এখন বুঝলাম তিনি সাড়ে ছাঁ ফুটেরও বেশি লম্বা। সত্যি বলতে কী, এত লম্বা মানুষ এর আগে আমি কখনও দেখিনি । বিলিতি কায়দায় সামনের দিকে ঝুকে পড়ে নমস্কার জানাবার সময়ও তিনি আমার চেয়ে প্রায় ছ। ইঞ্চি লম্বা রয়ে গেলেন । ভদ্রলোককে ঘিরে আসতে বললাম । স্টেজের পোশাক ছেড়ে জাদুকর এখন সাধারণ সুট পরে এসেছেন, তবে এ সুটের রংও কালো। ঘরে ঢোকার পর লক্ষ করলাম, কোটের পকেটে ‘কোরিয়েরে দেল সানতিয়াগো-র সান্ধ্য সংস্করণ। আগািস চেয়ারে বসার পর তাঁর ম্যাজিকের তারিফ করে বললাম, যত দূর মনে পড়ছে, গ্রিক উপকথায় আগািস নামক একজন কীর্তিমান পুরুষের কথা পড়েছি, যার সবাঙ্গে ছিল সহস্ৰ চােখ। একজন জাদুকরের পক্ষে নামটা বেশ মানানসই। ”. আগািস মৃদু হেসে বললেন, “সেই কীর্তিমান পুরুষটির সঙ্গে পাখির একটা সম্পর্ক রয়েছে, মনে পড়ছে নিশ্চয়ই । ” আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। গ্রিক দেবী হেরা আগাসের চােখগুলি তুলে ময়ুরের পুচ্ছে বসিয়ে দিয়েছিলেন। সেই থেকেই ময়ুরের লেজে চাকা চাকা দাগ। কিন্তু আমার কৌতুহল হচ্ছে আপনার চোখ সম্পর্কে । কত পাওয়ার আপনার চশমার ?” “মাইনাস কুড়ি। তবে তাতে কিছু এসে যায় না। আমার পাখিগুলোর কোনওটারই চশমার প্রয়োজন হয় না। ’ নিজের রসিকতায় নিজেই অট্টহাস্য করে উঠলেন আগােস। কিন্তু সে হাসি ফুরোবার আগেই ভদ্রলোক হঠাৎ মুখ-হাঁ অবস্থাতেই থেকে গেলেন। তাঁর চােখ চলে গেছে আমার ঘরের তাকে রাখা প্লাস্টিকের খাঁচাটার দিকে। কভাস ঘুমিয়ে পড়েছিল ; এখন দেখছি জাদুকরের অট্টহাসিতেই বোধ হয় তার ঘুমটা ভেঙে গেছে। সে দিব্যি ড্যাবি ড্যাবি করে চেয়ে আছে আগন্তুকটির দিকে । আগািস মুখ-হাঁ অবস্থাতেই চেয়ার ছেড়ে উঠে খাঁচাটার দিকে এগিয়ে গেলেন। তারপর মিনিটখানেক ধরে কভাসের দিকে চেয়ে বললেন, “আজি সন্ধ্যার কাগজে এর বিষয় পড়ে অবধি আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য উদ্গ্ৰীব হয়ে আছি। আপনার বক্তৃতা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। আমি পক্ষিবিজ্ঞানী নই, কিন্তু আমিও পাখিদের শিক্ষা দিয়ে থাকি।” ভদ্রলোক চিন্তিতভাবে ফিরে এসে চেয়ারে বসলেন। তারপর বললেন, “বেশ বুঝতে পারছি আপনি ক্লান্ত, কিন্তু তাও অনুরোধ করছি— যদি আপনার এই পাখিটিকে একবার খাঁচা থেকে বার করতে পারেন. একবার যদি ওর বুদ্ধির একটু নমুনা...” আমি বললাম, “শুধু আমিই ক্লান্ত নই, আমার পাখিও ক্লান্ত । আমার খাঁচার দরজা খুলে দিচ্ছি। বাকিটা নির্ভর করবে। আমার পাখির মেজাজের উপর । আমি ওকে জোর করে ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করাতে চাই না। ’ “বেশ তো—তাই হােক... খাঁচার দরজা খুলে দিলাম। কভাস বেরিয়ে এসে ডানার তিন ঝাপটায় আমার খাটের পাশে টেবিলটায় এসে ঠোঁটের এক অব্যৰ্থ ঠেকরে ল্যাম্পটা নিবিয়ে দিল । ঘর এখন অন্ধকার । জানােলা দিয়ে রাস্তার উলটাে দিকে হােটেল মেট্রোপোলের জ্বলা-নেবা সবুজ নিয়নের ফিকে আলো ঘরে প্রবেশ করছে। আমি চুপ। কভসি ডানা আগাসের মুখের উপর সবুজ আলো নিয়নের তালে তালে জ্বলছে, নিবছে। তার সোনার চশমার পুরু কাচের ভিতর সাপের মতো চােখ সবুজ আলোয় আরও বেশি সাপের মতো মনে হচ্ছে। বেশ বুঝতে পারছি সে অবাক, হতভম্ব। বেশ বুঝতে পারছি, কভাস ঘরের বাতি নিবিয়ে তার মনের যে ভাবটা প্রকাশ করল, সেটা আগাসের বুঝতে বাকি নেই। কভাস এখন বিশ্রাম চাইছে। সে চায় না ঘরে আলো জ্বলে । সে অন্ধকার চায়, অন্ধকারে ঘুমোতে চায় | আর আগািস ? তার সরু গোঁফের নীচে ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে একটা ফিসফিসে শব্দ উচ্চারিত হল—“ম্যানিফিকো '—অর্থাৎ চমকপ্ৰদ, অসামান্য। সে তার হাতদুটাে যেন তালির ভঙ্গিতে থুতনির সামনে এনে জড়ো করেছে। লক্ষ করলাম, তার নখগুলো অস্বাভাবিক রকম লম্বা ও চকচকে। বুঝলাম, সে নখে নেলপালিশ মেখেছে। রুপোলি পালিশ। তার ফলে মঞ্চের স্পষ্ট লাইটে আঙুলের খেলা জমে ভাল। সেই রুপোলি নখে এখন বার বার বাইরের সবুজ নিয়নের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। "আই ওয়ানট দ্যাট ক্ৰো ।” ফিসফিসে শুকনো গলায় ইংরিজিতে আগাসের কথা এল । এতক্ষণ সে স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলছিল আমার সঙ্গে। কথাগুলো লিখতে গিয়ে বুঝতে পারছি, তাতে একটা নগ্ন নির্লজ্জ লোভের ইঙ্গিত এসে পড়ছে, কিন্তু আসলে আগাসের কণ্ঠস্বরে ছিল অনুনয় । "আই ওয়ানট দ্যাট ক্রো !!'-আবার বলল আগােস। আমি চুপ করে তার দিকে চেয়ে রইলাম। এখন কিছু বলার দরকার নেই। আরও কী বলতে চায় লোকটা, দেখা যাক । আগািস এতক্ষণ জানালার দিকে চেয়ে ছিল। এবার সে আমার দিকে দৃষ্টি ফেরাল। ভারী অদ্ভুত লািগছিল এই অন্ধকার আর সবুজ আলোর খেলা। এও যেন একটা ভেলকি।। লোকটা এই আছে, এই নেই। আগাসের লম্বা আঙুলগুলো নড়েচড়ে উঠল। সেগুলো এখন তার নিজের দিকে ইঙ্গিত করছে । “আমাকে দেখো প্রোফেসর। আমি আগােস। আমি বিশ্বের সেরা জাদুকর। দুই পুরুষ সবাই চেনে। আগামী মাসে আমি পৃথিবী ভ্রমণে বেরোচ্ছি। রোম, মাড্রিড, প্যারিস, লন্ডন, অ্যাথেনস, স্টকহােলম, টােকিও, হংকং...। আমার ক্ষমতা এবার স্বীকৃত হবে সারা বিশ্বে । কিন্তু আমার চমকপ্ৰদ ম্যাজিক আরও সহস্র গুণে বেশি চমকপ্ৰদ হবে- কীসে জান ? ইফ আই গেট দ্যাট ক্রো- দ্যাট ইনডিয়ান ক্ৰো ! ওই পাখি আমার চাই প্রোফেসরআগািস তার ফিসফিসে কথার সঙ্গে সঙ্গে তার হাতটা আমার চোখের সামনে নাড়ছে, আঙুলগুলোকে সাপের ফণার মতো দােলাচ্ছে, নখগুলো সবুজ আলোয় চকচক করছে। আমি মনে মনে হাসলাম । আমার জায়গায় অন্য যে কোনও লোক হলে আগাসের কার্যসিদ্ধি হত। অথাৎ সে লোক হিপনােটাইজড হত, সেই সুযোগে খাঁচার পাখিও আগাসের হস্তগতহত। আমাকে হিপনােটাইজ করা যে সহজ নয় সেটা এবার আমার কথা থেকেই বােধ হয় জাদুকর বুঝতে পারল । “মিষ্টার আগািস, আপনি বৃথা বাক্য ব্যয় করছেন। আর আমাকে সম্মোহিত করার চেষ্টাও বৃথা । আপনার অনুরোধ রক্ষা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কভাস শুধু আমার ছাত্রই নয়, সে আমার সন্তানের মতো, সে আমার বন্ধু, আমার অক্লান্ত পরিশ্রম ও গবেষণার— “প্রোফেসর ”—আগাসের কণ্ঠস্বর আগের চেয়ে অনেক তীব্র । কিন্তু পরীক্ষণেই সে আবার গলা নামিয়ে বলে চলল, “প্রোফেসর, তুমি কি জান যে আমি ক্রোড়পতি ? শহরের পূর্ব প্রান্তে আমার একটা পঞ্চাশ কামরাবিশিষ্ট প্রাসাদ রয়েছে, সেটা কি তুমি জান ? আমার বাড়িতে ছাব্বিশজন চাকর, আমার চারটে ক্যাডিলাক গাড়ি— এ সব কি তুমি জান ? খরচের তোয়াক্কা আমি করি না, প্রোফেসর। ওই পাখির জন্য তোমাকে আমি আজই, এক্ষুনি দশ হাজার এসকুডো দিতে রাজি আছি। ” দশ হাজার এস্কুডো মানে প্রায় পনেরো হাজার টাকা । আগািস জানে না যে, সে যেমন খরচের তোয়াক্কা করে না, আমি তেমনই টাকা জিনিসটারই তোয়াক্কা করি না । সে কথাটা তাকে বললাম। আগািস এবার একটা শেষ চেষ্টা করল । “তুমি তো ভারতীয়। তুমি কি অলৌকিক যোগাযোগে বিশ্বাস কর না ? ভেবে দেখো—আগসি—কভাস ! ওই কাকের নামকরণ হয়েছে আমারই জন্য, সেটা কি তুমি বুঝতে পারিছ না, প্রোফেসর ?” আমি আর ধৈর্য রাখতে পারলাম না । চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে বললাম, ‘মিস্টার আগািস—তোমার গাড়ি বাড়ি খ্যাতি অর্থ নিয়ে তুমি থাকো, কভসি আমার কাছেই থাকবে। ওর শিক্ষা এখনও শেষ হয়নি। ওকে নিয়ে আমার এখনও অনেক আজ বাকি । আমি আজ ক্লান্ত । তুমি পাঁচ মিনিট সময় চেয়েছিলে, আমি বিশ মিনিট দিয়েছি, আর দিতে পারছি না। আমি এখন ঘুমোব। আমার পাখিও ঘুমোবে। সুতরাং গুড নাইট । ” আমার কথাগুলো শুনে আগাসের মুখে হতাশার ছাপ দেখে একটা সামান্য অনুকম্পার ভাব মনে প্রবেশ করলেও আমি সেটাকে একেবারেই আমল দিলাম না । আগািস আবার বিলিতি কায়দায় মাথা নুইয়ে স্প্যানিশ ভাষায় ‘গুড নাইট জানিয়ে আমার ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেল । দরজা বন্ধ করে খাঁচার কাছে গিয়ে দেখি কিভাস এখনও জেগে আছে। আমি যেতেই সে ঠোঁট ফাঁক করে একটা শব্দ উচ্চারণ করল ‘কে এবং শব্দটাতে যে একটা জিজ্ঞাসা রয়েছে, সেটা তার বলার সুরেই স্পষ্ট । বললাম, ‘এক পাগলা জাদুকর। টাকার গরমটা বডড বেশি। তোমাকে চাইতে এসেছিল, আমি না করে দিয়েছি। সুতরাং তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারো ।” ১৬ই নভেম্বর ভেবেছিলাম কালকের ঘটনা কালকেই লিখে রাখব, কিন্তু বিভীষিকার ঘোর কাটতে সারা রাত লেগে গেল । কাল সকালটা যেভাবে শুরু হয়েছিল, তাতে বিপদের কোনও পূবাভাস ছিল না। সকালে সম্মেলনের বৈঠক ছিল, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে জাপানি পক্ষিবিজ্ঞানী তোমাসাকা মোরিমোতোর ঘোর ক্লান্তিকর ভাষণ । সঙ্গে কভাঁসকে নিয়ে গিয়েছিলাম। প্রায় এক ঘণ্টা বক্তৃতার পর হঠাৎ খেই হারিয়ে ফেলে মোরিমোতো আমতা আমতা করছিল, এমন সময় কভসি হঠাৎ আমার চেয়ারের হাতলে সশব্দে ঠোঁটতালি আরম্ভ করে দিল ৷ হলের লোক তাতে হাে হাে করে হেসে ওঠাতে আমি ভারী অপ্ৰস্তুতে পড়ে গিয়েছিলাম । দুপুরে আমাদের হােটেলেই সম্মেলনের কয়েকজন ডেলিগেটের সঙ্গে লাঞ্চ ছিল। সেখানে যাবার আগে আমি আমার একাত্তর নম্বর ঘরে এসে কভাঁসকে খাঁচায় রেখে খাবার দিয়ে বললাম, “তুমি থাকে। আমি খেয়ে আসছি। ’ বাধ্য কভাস কোনও আপত্তি করল না। লাঞ্চ শেষ করে যখন ওপরে এসেছি, তখন আড়াইটে । দরজায় চাবি লােগাতেই বুঝলাম, সেটার প্রয়োজন হবে না, কারণ দরজা খোলা । মুহুর্তের মধ্যে একটা চরম বিপদের আশঙ্কা আমার রক্ত জল করে দিল । ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকে দেখি— যা ভেবেছিলাম, তাই। খাঁচা সমেত কভাস উধাও । আবার ঝড়ের মতো ঘরের বাইরে এলাম। উত্তরদিকে দুটাে ঘর পরেই বাঁ দিকে রুমবয়দের ঘর। উর্ধর্বশ্বাসে সে ঘরে গিয়ে দেখি, দুটাে রুমবয়ই পাশাপাশি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চােখের চাহনি দেখেই বুঝতে পারলাম, তাদের দুজনকেই হিপনােটাইজ করা হয়েছে। চলে গেলাম একশো সাত নম্বর ঘরে গ্রেনফেলের কাছে। তাকে সমস্ত ব্যাপারটা বলে দুজন সটান গিয়ে হাজির হলাম। একতলার রিসেপশনে। রিসেপশন ক্লার্ক বলল, “আমাদের কাছ থেকে কেউ আপনার ঘরের চাবি চাইতে আসেনি। ডুপ্লিকেট চাবি রুমবয়দের কাছে থাকে, তারা যদি দিয়ে থাকে ৷ ” রুমবয়দের অবিশ্যি দেওয়ার দরকার হয়নি। আগািস তাদের জাদুবলে অকেজো করে দিয়ে নিজেই চাবি নিয়ে তার কাজ হাসিল করেছে। শেষটায় হােটেলের দ্বাররক্ষকের কাছে গিয়ে আসল খবর পাওয়া গেল। সে বলল, আধ ঘণ্টা আগে একটা সিলভার ক্যাডিলাক গাড়িতে আগািস এসেছিলেন। তার দশ মিনিট পরে হাতে একটা সেলোফেনের ব্যাগ নিয়ে তিনি হােটেল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে চলে যান। রুপোলি রঙের ক্যাডিলাক । কিন্তু এখান থেকে কোথায় গেছে আগাস ? তার বাড়িতে কি ? না অন্য কোথাও ? অবশেষে কোভারুবিয়াসের শরণাপন্ন হতে হল। ভদ্রলোক বললেন, “আগাসের বাড়ি কোথায় সেটা এক্ষুনি জেনে দিতে পারি, কিন্তু তাতে কী লাভ হবে ? সে কি আর বাড়িতে গেছে ? সে তোমার কভাঁসকে নিয়ে নিশ্চয়ই অন্য কোথাও গা ঢাকা দিয়েছে। তবে সে যদি শহরের বাইরে বেরোতে যায়, তা হলে একটাই রাস্তা আছে। তোমাদের আমি ভাল গাড়ি, ভাল ড্রাইভার আর সঙ্গে পুলিশ দিতে পারি। সময় কিন্তু খুব কম। আধা ঘণ্টার মধ্যে বেরিয়ে পড়ে । হাইওয়ে ধরে চলে যাবে। যদি কপালে থাকে তো তার সন্ধান পাবে। ” সোয়া তিনটের মধ্যে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। রওনা হবার আগে হােটেল থেকে ফোন করে জেনে নিয়েছিলাম যে, আগািস (আসল নাম দোমিনগো বার্তেলেমে সারামিয়েনতো) তার বাড়িতে ফেরেনি। আমাদের সঙ্গে দুজন সশস্ত্ৰ পুলিশ, আমরা পুলিশেরই গাড়িতেই চলেছি। দু'জন পুলিশের একজন— ছােকরা বয়স, নাম কারেরাস— দেখলাম আগািস সম্বন্ধে বেশ খবরটাবর রাখে । বলল, সানতিয়াগো এবং আশেপাশে আগাসের নাকি একাধিক আস্তানা আছে। এককালে জিপসিদের সঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়েছে। উনিশ বছর বয়স থেকে ম্যাজিক দেখাতে আরম্ভ করেছে। পাখি নিয়ে ম্যাজিক শুরু করেছে। বছরচারেক আগে, আর সেই থেকেই ওর জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ও কি সত্যিই ক্রোড়পতি ? কারেরাস বলল, “তাই তাে মনে হয়। তবে লোকটা ভয়ানক কঞ্জস, আর কাউকে বিশ্বাস করে না। তাই ওর বন্ধু বলতে এখন আর বিশেষ কেউ নেই।” শহর থেকে বেরিয়ে হাইওয়েতে পড়ে একটা মুশকিল হল। হাইওয়ে দু ভাগে ভাগ হয়ে একটা চলে গেছে উত্তরে লস আনডিজের দিকে, আর একটা চলে গেছে। পশ্চিমে ভালপারাইজো বন্দর পর্যন্ত । দুটাে হাইওয়ের মুখের কাছে একটা পেট্রোলের দোকান। দোকানের লোকটাকে জিজ্ঞেস করাতেই সে বলল, “ক্যাডিলাক ? সিনিয়র আগাসের ক্যাডিলাক ? সে তো গেছে ভালপারাইজোর রাস্তায় ৷ ” আমাদের কালো মারসেডিস তিরবেগে রওনা দিল ভালপারাইজোর উদ্দেশ্যে। কভাসের প্রাণহানি হবে না সেটা জানি, কারণ তার প্রতি আগাসের লোভটা খাঁটি। কিন্তু কাল রাত্রে কভাঁসের হাবভাব দেখেই বুঝেছিলাম যে, সে জাদুকর লোকটিকে মোটেই পছন্দ করছে না। সুতরাং আগাসের খপ্পরে পড়ে তার যে মনের অবস্থা কী হবে, সেটা ভাবতেই খারাপ লাগছে। পথে আরও দুটাে পেট্রোল স্টেশন পড়ল, এবং দুটােরই মালিকের সঙ্গে কথা বলে আমরা নিশ্চিন্ত হলাম যে আগাসের সিলভার ক্যাডিলাক এই রাস্তা দিয়েই গেছে। আমি আশাবাদী লোক । নানান সময় নানান সংকট থেকে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে এসেছি। আজ পর্যন্ত আমার কোনও অভিযানই ব্যর্থ হয়নি । কিন্তু আমার পাশে বসে গ্রেনফেল ঘন ঘন মাথা নাড়ছে আর বলছে, "ভুলে যেও না, শঙ্কু—তুমি একজন অত্যন্ত ধূর্ত লোকের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছ। তোমার কভাঁসকে সে যখন একবার হাতে পেয়েছে, তখন সে পাখি তুমি সহজে ফিরে পাবে না এটা জেনে রেখো। ’ কারেরাস বলল, “সিনিয়র আগাসের হাতে কিন্তু অস্ত্র থাকার সম্ভাবনা । এককালে তার অনেক ম্যাজিকে তাকে আসল রিভলভার ব্যবহার করতে দেখেছি। ” হাইওয়ে ক্রমে ঢালু নামছে। সানতিয়াগোর ষোলোশে ফুট থেকে এখন আমরা হাজারে নেমে এসেছি। পিছনে দূরে পর্বতশ্রেণী ক্রমে ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে আসছে। চল্লিশ মাইল পথ এসেছি, আরও চল্লিশ মাইল গেলে ভালপারাইজো । গ্রেনফেলের ব্যাজার মুখ আমার আশার প্রাচীরে বার বার আঘাত করে তাকে টলিয়ে দিচ্ছে। হাইওয়েতে কিছু না পেলে শহরে গিয়ে পড়তে হবে। তখন আগািস-এর অনুসন্ধান আরও সহস্ৰ গুণ বেশি কঠিন হয়ে পডবে । রাস্তা সামনে খানিকটা চড়াই উঠে গেছে। পিছনে কী আছে দেখা যাচ্ছে না । গাড়ি এগিয়ে চলেছে দুবার গতিতে । চড়াই পেরোল। সামনে রাস্তা ঢালু নেমে গেছে বহু দূর । রাস্তার পাশে এখানে ওখানে দু-একটা গাছ। বহু দূরে একটা গ্রাম। মাঠে মোষের দল। জনমানবের কোনও চিহ্ন নেই। কিন্তু সামনে ওটা কী ? এখনও বেশ দূর। সিকি মাইল তো হবেই। এখন চারশো গজের বেশি নয় । একটা গাড়ি । রোদে ঝলমল করছে। রাস্তার এক পাশে বেঁকে দাঁড়িয়ে আছে। তার পিছনে একটা গাছের গুড়ি । এবার কাছে এসে পড়েছে গাড়িটা । ক্যাডিলাক গাড়ি । সিলভার ক্যাডিলাক । আমাদের মারসেডিস তার পাশে এসে দাঁড়াল । গাড়িটা কেন থেমে আছে, তার কারণটা এবার বুঝলাম। রাস্তার এক পাশে ছটকে গিয়ে সেটা একটা গাছের গুড়িতে মেরেছে। ধাক্কা । গাড়ির সামনের অংশ গেছে থেতলে । কারেরাস বলল, “সিনিয়র আগাসের গাড়ি । এ ছাড়া আরেকটা সিলভার ক্যাডিলাক আছে সানতিয়াগোতে। ব্যাঙ্কার সিনিয়র গালদামেসের গাড়ি। কিন্তু এটার নম্বর আমার চেনা ৷ ” গাড়ি তো রয়েছে, কিন্তু আগািস কোথায় ? আর আমার কভাসই বা কোথায় ? ড্রাইভারের পাশের সিটে ওটা কী ? জানােলা দিয়ে মুখ ঢুকিয়ে দেখলাম, সেটা কভাসের খাঁচা । দরজার চাবি আমারই তৈরি, আর সেটা রয়েছে আমারই পকেটে। আজ দুপুরে দরজায় চাবি দিইনি, শুধু ছিটিকিনিটাই লাগানো । কভার্স খাঁচা থেকে নিজেই বেরিয়েছে সন্দেহ নেই ; কিন্তু তার পরে ? হঠাৎ একটা চিৎকার কানে এল। দূর থেকে। মানুষের গলা । কারেরাস ও অন্য পুলিশটি বন্দুক উচিয়ে তৈরি। আমাদের ড্রাইভার দেখলাম ভিতু লোক। সে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে মেরিমাতার নাম জপ করতে শুরু করেছে। গ্রেনফেল আমি বললাম, “তুমি বরং আমাদের গাড়ির ভিতরে গিয়ে বোসো। ’ চিৎকারটা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। রাস্তার বাঁ দিক থেকে। কিছু দূরে কতকগুলো ঝোপড়া। দু-একটা বড় বড় গাছও রয়েছে। সেই দিক থেকেই আসছে চিৎকারটা । কাল রাত্রে ফিসফিসে গলা শুনেছি, তাই চিনতে দেরি হল । এ গলা আগাসের । অকথ্য অশ্রাব্য স্প্যানিশে সে গাল দিয়ে চলেছে। কার উদ্দেশ্যে ? ডেভিল বা শয়তানের স্প্যানিশ প্রতিশব্দটা বারিকয়েক কানে এল, আর তার সঙ্গে কভাঁসের নামটা । ‘কোথায় গেল সে শয়তান পাখি ? কিভাস! কিভাস ! মুর্থ পাখি ! শয়তান পাখি ! নরকবাস আছে তোর কপালে । নরকবাস !”— আগাসের কথা আচমকা থেমে গেল- কারণ সে আমাদের দেখতে পেয়েছে। আমরাও দেখতে পাচ্ছি তাকে । তার দু হাতে দুটাে রিভলভার। একশো হাত দূরে একটা ঝোপড়ার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে । কারেরাস হুঙ্কার দিয়ে উঠল, “সিনিয়র আগাস, তোমার অস্ত্ৰ নামাও ! নইলে—” একটা কৰ্ণপটহাবিদারক শব্দে আমাদের মারসেডিসের দরজায় একটা রিভলভারের গুলি এসে লাগিল । তারপর আরও তিনটে গুলির শব্দ । এ দিকে ও দিকে আমাদের মাথার উপর দিয়ে ছটকে বেরিয়ে গেল সেগুলি। কারেরাস দৃপ্ত কণ্ঠে চেচিয়ে উঠল, “সিনিয়র আগািস, আমাদের কাছে বন্দুক রয়েছে। আমরা পুলিশ। আপনি যদি রিভলভার না ফেলে দেন, তবে আমরা আপনাকে জখম করতে বাধ্য হব । ” ‘জখম ? আগািস শুকনাে গলায় আর্তনাদ করে উঠল। “তােমরা পুলিশ ? আমি যে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না ! আগািস এখন পচিশ হাতের মধ্যে। এইবার বুঝলাম তার দশটা । তার চশমাটি খোওয়া যাওয়াতে সে প্রায় অন্ধের সামিল হয়ে পড়ে যত্রতত্র গুলি চালিয়েছে। আগািস হাতের অস্ত্র ফেলে দিয়ে হোঁচটি খেতে খেতে এগিয়ে এল। কারেরাস ও অন্য পুলিশটি তার দিকে এগিয়ে গেল। আমি জানি, এ সংকটে আগাসের কোনও ভেলকিই কাজ করবে না । তার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় । কারেরাস এগিয়ে গিয়ে মাটি থেকে রিভলভার দুটাে তুলে নিল। আগািস তখন বলছে, ‘সে পাখি উধাও হয়ে গেল ! দ্যাট ইনডিয়ান ক্ৰো ! গ্রেনফেল কিছুক্ষণ থেকে ফিসফিস করে কী যেন বলতে চেষ্টা করছিল, এবারে তার কথাটা বুঝতে পারলাম । ‘শঙ্কু—দ্যাট বার্ড ইজ হিয়ার। ” কী রকম ? কোথায় কভসি ? আমি তো দেখছি না। তাকে ! গ্রেনফেল রাস্তার উলটােদিকে নেড়া অ্যাকেসিয়া গাছটার মাথার দিকে আঙুল দেখাল। উপরে চেয়ে দেখলাম— সত্যিই তো—আমার বন্ধু, আমার শিষ্য, আমার প্রিয় কভাস গাছটার সবচেয়ে উঁচু ডালে বসে নিশ্চিন্তভাবে আমাদের দিকে ঘাড় নিচু করে দেখছে। তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতেই সে অক্লেশে গোঁত খাওয়া ঘুড়ির মতো গাছের মাথা থেকে নেমে এসে বসল। আমাদের মারসেডিসের ছাদের উপর । তারপর অতি সন্তৰ্পণে— যেন জিনিসটার মূল্য সে ভালভাবেই জানে— তার ঠোঁট থেকে তার সামনেই নামিয়ে রাখল আগাসের মাইনাস বিশ পাওয়ারের সোনার চশমাটা ।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৩৭৯ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...