গল্পেরঝুড়ির এ্যাপ ডাউনলোড করুন - get google app
গল্পেরঝুড়ি ফানবক্স ! এখন গল্পের সাথেও মজাও হবে! কুইজ খেলুন , অংক কষুন , বাড়িয়ে নিন আপনার দক্ষতা জিতে নিন রেওয়ার্ড !

সুপ্রিয় পাঠকগন আপনাদের অনেকে বিভিন্ন কিছু জানতে চেয়ে ম্যাসেজ দিয়েছেন কিন্তু আমরা আপনাদের ম্যাসেজের রিপ্লাই দিতে পারিনাই তার কারন আপনারা নিবন্ধন না করে ম্যাসেজ দিয়েছেন ... তাই আপনাদের কাছে অনুরোধ কিছু বলার থাকলে প্রথমে নিবন্ধন করুন তারপর লগইন করে ম্যাসেজ দিন যাতে রিপ্লাই দেওয়া সম্ভব হয় ...

সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান... জিজেতে আজে বাজে কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন ... অন্যথায় আপনার আইডি বা কমেন্ট ব্লক করা হবে... আর গল্প দেওয়ার ক্ষেত্রে গল্প দেওয়ার নিয়ম মেনে চলুন ... সার্বিকভাবে জিজের নীতিমালা মেনে চলার চেস্টা করুন ...

পলাতকার উড়াল-(02)

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মরীচিকা (১০৯ পয়েন্ট)



মায়া কোথায় প্রাতঃকৃত্য সারতে যায় তা জানি না ; হয়তো অন্যান্য মহিলাদের কাছ থেকে জেনে নিয়েছে । একজন নাপিত আসে মাসে কখনও গ্রামে যারা চায় তাদের দাড়ি কামিয়ে গোঁফ ছেঁটে দিয়ে যায় । আমি আমার গোঁফদাড়িকে স্বাধীনতা দিয়েছি, যেভাবে ইচ্ছা বেড়ে উঠুক । তবে, মশারি টাঙানো থেকে মুক্ত হতে পারিনি । সন্ধা্যা হলেই মশারির ভেতরে ঢুকে বসে থাকি, মশা আর অজানা কীটের ভয়ে । মায়া বাধা দিয়েছিল । বোঝাতে চেয়েছিল ওকে যে ম্যালেরিয়া হলে যে উদ্দেশ্যে মায়া এসে্ছে তা পূরণ হবে না । অবশ্য কী যে ওর উদ্দেশ্য ছিল তা আজও জানি না ল মাটিতে চাটাই আর মোটা চাদর পেতে শুই । প্রায় সপ্তাহখানেক মেঝের উঁচুনিচু মাটির সঙ্গে খাপখাওয়াতে সময় লেগেছিল । ক্রমশ অমনভাবে শোয়ায় অভ্যাস করে ফেললুম । সহ্য হয়ে গেল ল উটকো দুজন বাইরের মানুষ এসে তাদের সমাজে থেকে গেল, অঞ্চলের কারোর তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখলুম না । শহরে হলে, ক্লাবের ছেলেরা, পার্টির লোকেরা, পাড়া-প্রতিবেশি সবাই অযথা নাক গলাতো । এখানে কেউ নামও জানতে চাইল না । আমরা কোন ভাষায় কথা বলি বা কোথা থেকে এসেছি , তাতে কারোর কোনো আগ্রহ নেই । ভারতবর্ষে মানুষের চরিত্র ছোটো-ছোটো দ্বীপের মতন পৃথক বৈশিষ্ট্য নিয়ে গড়ে উঠেছে । একদিন মায়া বলল, গারু, এখানে পুরুষদের গারু বলে ডাকে, কলকাতায় যেমন স্যার কিংবা বাবু বা দাদা, মায়া বলেছিল, গারু, আজকে আমার মেন্সটুরেশান শুরু হল, হয়তো সেকারণে মেজাজটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে না, কিছু মনে করবেন না । ভালই হল, বলেছিলুম আমি, এখানে ক্যালেন্ডার বা মাস-তারিখ জানার কোনো ব্যাপার নেই ; আপনার মেন্স যেদিন হবে আমাকে অবশ্যই বলবেন, আমি সামনের কাঁঠাল গাছটায় খুরপি দিয়ে দাগ দিয়ে রাখব , তাহলে মারা যাবার সময়ে আমি বা আপনি জানতে পারব, কতদিন একসঙ্গে ছিলুম । শারীরিক কষ্টের মধ্যেও জোরে হেসে উঠেছিল মায়া । হাসছিল ও, অথচ তার ঢেউ আছড়ে পড়ছিল আমার অস্তিত্বে , রিন রিন রিন রিন রিন । কারোর হাসি যে গা-ময় লেগে থাকে, তার কথা যে মগজের ভেতরে বাজতে থাকে, তার দেহের গন্ধ মনের মধ্যে ফিকে ঢেউ তোলে, তা মায়ার সংস্পর্শে না এলে জানতে পারতুম না । কলকাতায় নিজেকে কখনও পরগাছা মনে হয়নি । এখানে, তিন দিনেই মনে হতে লাগল যে পুরুতদের মতন বা পার্টিকর্মীদের মতন অন্যের দানে পেট ভরাতে হচ্ছে । বেশ গ্লানিময় । এত পড়াশোনা করেছি, গণিতে প্রথম শ্রেণি থেকে প্রথম হয়েছি চিরকাল, এই প্রায়-জনহীন গ্রামে সেসব জ্ঞানের কিয়দংশও কাজে লাগছে না । মায়াকে বলতে, ও বলল, ওর অবস্হা আরও খারাপ, ও চিরকাল ইংরেজি মাধ্যমে পড়েছে, ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর করেছে । ঘুরে-ঘুরে দেখেছি, আম লেবু পেঁপের গাছে তেলেগুতে সংখ্যা লেখা । গণিত আর ইংরেজি দুটোই সেক্ষেত্রে ফালতু বলেই মনে হল এই অঞ্চলে । তার চেয়ে, দুজনেই ঠিক করলুম, আমরাই শিখি । এই অঞ্চলের কীট পতঙ্গ আগাছা আচার ভাষা যা জানি না, তা-ই শেখার প্রয়াস করি । ওর বাবা ব্যারেটাইস খনিতে কাজ করার সময়ে বালো ওখানকার খনিশ্রমিকদের স্কুলে একবছর পড়েছে । বালুকে প্রস্তাব দেয়া হল যে সে আমাদের তেলেগু শেখাবে , যতটুকু ও জানে, অক্ষরজ্ঞান হলেই চলবে , প্রতিদানে আমি ওকে ইংরেজিতে এক দুই তিন চার শৈখাব , আর মায়া শেখাবে এ বি সি ডি । সমস্যা দেখা দিল শুরু করতে গিয়েই । ওর বা ওর পরিচিত কারোর বাড়িতে স্লেট-পেনসিল বা কাগজ কলম নেই । বালুই উপায় বাতলালো । আমাদের চালার বাইরে পেছনদিকে মাটির দেয়ালে কাঠ-কয়লা দিয়ে লেখা হবে আর ভিজে ন্যাকড়ায় তা পোঁছা হবে । ও উৎসাহিত, এইজন্যে যে ও দুটো জিনিস শিখবে আর আমরা দুজনে কেবল একটা । আমাদের ক্লাস নেয়া-দেয়া দেখাতে বালু নিজের মাকে এনেছিল । বালুর মা পরের দিন এসে কুমড়ো দিয়ে গিয়েছিল, যেটা দিয়ে কি করা হবে যাতে তা খাওয়া যায় ঠাহর করতে না পেরে মায়া শেষপর্যন্ত কুমড়ো-পোড়া বানিয়েছিল । গরম-গরম ভালই লেগেছিল খেতে , নুন-হীন । নুন খায় এ-অঞ্চলের লোকে, কিন্তু কুসংস্কারবশত নুন কেউ দিতে চায় না । আর চিনি তো খায়ই না এরা, পায়ই না তো খাবে কোথ্থেকে ! লঙ্কা হয় কারোর কারোর বাড়ির সামনের জমিটুকুতে– এনে দ্যায় বালু ; লঙ্কা দিয়েই স্বাদকে অভ্যস্ত করে নিয়েছিলুম আমরা । বালুর দেখাদেখি দশ-বারো দিনে আরও চারজন ছাত্র জুটে গেল আমাদের । ক্রমে গ্রামের, গ্রাম বলতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিলোমিটার খানেক দূরত্বের সব আগ্রহী ছেলেমেয়ে চলে আসতে লাগল । যার যখন সময় । ওদের শেখার আর আমাদের শেখার তো কোনো নির্দিষ্ট স্কুলসময় বলে রুটিন ছিল না । তাদের মধ্যে থেকে আমরা একজন শিক্ষিকা পেলুম, সিরিদেবি, বোধহয় শ্রীদেবীর অপভ্রংশ, যে তেলেগুতে আমাদের এক দুই তিন চার শেখানো শুরু করল । তারা যে মায়াকেই বেশি পছন্দ করছে তার স্পষ্ট আভাস ফুটে উঠছিল ছাত্রছাট্রিদের মুখে আর ব্যবহারে । মায়া ওদের জড়িয়ে ধরে আদর করতে পারে , আমার কেমন যেন বাধো-বাধো ঠেকে । পড়াবার সময়ে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে আমাদের পা ব্যথা করতে পারে অনুমান করে সিরিদেবির বাবা গাছের ডাল দিয়ে তৈরি দুটো টুল বানিয়ে দিয়ে গেছে একটা একটু নিচু,মায়ার জন্যে, আরেকটা আমার কোমরের উচ্চতায় , আমার জন্যে । মাঝে-মথভে পড়াবার দেয়ালটা মাটি দিয়ে লেপে নতুন করে দিয়ে যায় কোনো ছাত্র বা ছাত্রীর মা । নয়তো মায়া নিজেই কোথাও থেকে গোবর এনে সারাদিন লেপার কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখে । মায়া আমাদের চালার ভেতরটাও গোবরে লেপে ফেলেছে । কোথায় যে গোবর পায় তা জানি না ; এখনও তো গোরু বা মোষ নজরে পড়েনি । হয়তো গ্রামের লোকেরা নিয়ে আসে কোথাও থেকে । যখন এক মনে দেয়ালে গোবর লেপে মায়া, আমি ওকে দেখেছি আর অবাক হয়েছি । নিজেকে একেবারে নতুন ছাঁচে ঢালাই করে ফেলেছে মায়া ; দেকতে থাকলে মনে হয় ঠিক যেন রঙ করার আগের মাটির প্রতিমা যার চোখদুটো কেবল আঁকা হয়েছে । আমি নেজেকে কীরকম দেখতে হয়েছে অনুমান করতে পারি ; ক্রমশ মহিষাসুর হয়ে উঠছি , সবুজদেহ অসুর নয়, কয়লাদেহ । মায়া চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে তেলেগু সংখ্যা আনকেলু এক দুই তিন চার অর্থাৎ ওকাতি , রেন্ডু, মুন্ডু, নালগু, আইডু, আরু, এডডু, এনিমিডি , তোম্মিদি, পাডি মুখস্হ করত । স্বরবর্ণ বা আচ্ছেলু , ব্যঞ্জনবর্ণ বা হাল্লুলু মুখস্হ করত । আমি ওর সঙ্গীতময় কন্ঠস্বর শুনতুম আর মনে রাখতুম । আজও আমার কানে ওরই তেলেগু অক্ষর বাজছে , যখন এই লেখাটার জন্যে কি-বোর্ড টিপছি । অক্ষরগুলো গোলগোল , বাংলার চেয়ে বেশ কঠিন, ইংরেজির থেকে তো বটেই । মায়া আমার চেয়ে তাড়াতাড়ি শিখে ফেলছে । আমার একটা অক্ষর রপ্ত করতে , এবং তার পরের অক্ষরে গিয়ে প্রথম অক্ষরে ফিরে আসতে তিন-চার দিন লাগছে । ও, মায়া, কুয়োতলায় গিয়ে মহিলাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে, আকারে ইঙ্গিতে ইশারায় তারাও ওকে নানা কথা বলে , আমাদের সংসার গুছিয়ে ফেলেছি কিনা তারা জানতে চায় । মহিলারা জল তোলার সময়ে বাচ্চাকে মায়ার কোলে দিয়ে দেয় । ও ফিরে আসলে ওর গা থেকে শিশুদের গন্ধ বেরোয় । মায়া ফিরে এসে সেই দিনকার কোন বাচ্চা ওকে বেশি আদর করল তার গল্প শোনায় । মনে হয় জল ভরার অছিলায় বাচ্চাদের কোলে নিয়ে আদর করতেই যায় ও । কোনো-কোনো যুবতী শিশু দেখলেই কোলে নিতে চায়, তার সঙ্গে তোতলা কথা বলতে চায়, মায়া সেই ধরণেরই এক যুবতী । মায়া যেন মায়াময় । আমি গল্প করার বিশেষ কাউকে পাই না, ছাত্রছাত্রীরা ছাড়া । বৃদ্ধ-বৃদ্ধা আছেন দূরের এক-আধটা চালায় , কিন্তু কী গল্পই বা করব তাঁদের সঙ্গে । তাঁরা আমার কথা বুঝতে পারবেন না, আমি তাঁদের । অনেক সময়ে মনে হয় স্হানীয় পুরুষদের মতন আমিও কোনো ফলের বাগানে গিয়ে চাকরি নিই , অন্তত ভাঙা-ভাঙা কথা বলার লোক তো পাব । মায়াকে সেকথা জানালে ও রাজি হয় না । বলল, ওরা টাকা দেবে, তা নিয়ে কী করবেন ? নতুন সমস্যা দেখা দেবে । টাকা এলে তার সঙ্গে সংসার পাতার প্রক্রিয়াও এসে পড়বে , জীবনে চাই না, এরকম অপ্রয়োজনীয় বস্তু জড়ো হয়ে যেতে পারে , যদিও এখানকার কারোর সঙ্গে এখনও পরিচয় হয়নি যে অমনধারা জিনিস সম্পর্কে আগ্রহ দেখিয়েছে । শিক্ষকতার দরুণ গুরুদক্ষিণাও জুটতে লাগল , ইন কাইন্ড, এবং একদিন চালও পাওয়া গেল , লাল খোসাসহ, ব্রাউন রাইস, যা দেখে মায়া বলেছিল, কলকাতায় কত খুঁজেছিলাম প্রকৃত ব্রাউন রাইস , আর এখানে এটা গরিব গ্রামবাসীর খাদ্য । বললুম, দেখছেন তো ? অতীত কী ভাবে ঘাপটি মেরে থাকে ! শুনে, মায়া যেন কেমনতর উদাসীন হয়ে উঠল । বেফাঁস কথা বলায় আমিও বেশ অপ্রস্তুত হলুম । চাল-পোড়া তো খাওয়া যাবে না , তাই মায়া চাল দাতাকে অনুরোধ করেছিল যে আমাদের একমুঠো ভাত দিলেই চলবে , কাঁচকলা পোড়া বা কাঁঠালবিচি পোড়া দিয়ে খেয়ে নেয়া যাবে , লঙ্কার টাকনা দিয়ে । প্রায় প্রতিদিনই ভাত পেতে লাগলুম , যদিও কলকাতায় যা খেতুম তার চেয়ে অনেক কমই, কিন্তু কম খেয়ে আর রাতে না খেয়ে অভ্যাস হয়ে যাচ্ছিল কম খাবার । আমি চাইতুম মায়া বেশি খাক, মায়া চাইত আমি বেশি খাই । আমি একদিন বলেই ফেললুম, প্রকৃত ভালোবাসা কাকে বলে জানি না , কেবল যৌনতাই জেনে এসেছি এতকাল, আপনি ভালোবাসতে শেখালেন । জবাবে মায়া বলেছিল, অতীতকে আনবেন না প্লিজ, আপনি কী ছিলেন, কী করেছিলেন, সব ভুলে যান, সমস্তকিছু মুছে ফেলুন , আমি কি কোনো স্মৃতিচারণ করেছি ? স্মৃতিচারণ মায়া করেছিল, করে ফেলেছিল, কয়েকজন বিদেশী সাহিত্যিকদের জীবনবোধকে একদিন তীব্র আক্রমণ করে ; আমি তাদের বইটই তখনও পর্যন্ত পড়িনি । তাই মুখ বন্ধ রেখে মায়ার জীবনদর্শনের সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ উপভোগ করেছিলুম । ভাত পেয়ে, মায়া বলেছিল, ভাতও খাবো কিনা সে-চিন্তায় ছিলাম , কেননা ভাতের সঙ্গে তো অতীত জুড়ে রয়েছে । আপনি আমাকে ভালোবাসার চোখে দেখবেন তা আমি জানি , আমিও যে আপনাকে ভালোবাসছি, ভালবেসে ফেলেছি, তা অনুভব করছেন না ? আমার চোখের পানে সরাসরি তাকিয়ে মায়া যোগ করেছিল, বালুরা যে ঝর্ণার জলে স্নান করতে যায়, কালকে চলুন সেই ঝর্ণায় গিয়ে স্নান করি , আমাদের সত্যিই এবার পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন, নয়তো আচমকা কোনো রোগে দুজনের একজন আক্রান্ত হয়ে পড়তে পারি । আমি বলেছিলুম, কালকে নয়, যেদিন আপনার চতুর্থ মেন্সের দাগ কাঁঠালগাছে আঁকব, সেই স্নান ঝর্ণার জলে করবেন । —আপনি জানেন দেখছি , মধ্যবিত্ত সংস্কার অনুযায়ী স্নান করতে হয় । —হ্যাঁ, পর পর তিনবার আপনাকে স্নান করতে দেখলুম না, বলার সাহসও হয়নি । —আদিম মানবীরা কি স্নান করত ? বিদেশের প্রতিটি দেশের মহিলারা কি স্নান করেন ? এখানের মহিলারা করেন ? স্নান করাটা, দেখেছেন তো, এখানকার জনজীবনে উৎসবনির্ভর । দৈনন্দিন রুটিন নয় । —আরেকটা কথা বলি আপনাকে । একই মশারির ভেতর পাশাপাশি শুতে এখনও অস্বস্তি হয় আমার । কাঠ হয়ে শুয়ে থাকতে হয় । আমি বলেছিলুম মায়াকে । —আমি তো ওভাবে শুই না । আমি তো আপনাকে অ্যাডাম মনে করি আর নিজেকে ইভ , তাহলে স্পর্শ বাঁচাব কেন ? বলেছিল মায়া , অকপটে । —আমি কি আপনাকে জড়িয়ে ধরতে পারি ? বলেছিলুম আমি । —এই নিন আপনার অস্বস্তি কাটিয়ে দিচ্ছি ; বলছেন ভালোবাসেন, ভালোবাসা তো সর্বগ্রাসী । বলতে-বলতে মায়া জড়িয়ে ধরল আমায় । বলল, এই কারণেই ঝর্ণার জলে গিয়ে স্নান করে আসার প্রস্তাব দিয়েছিলাম । জানি, শহরের সুগন্ধ থেকে মুক্ত হয়ে গেছি, আদিম মানবীর গন্ধ হয়তো ছেয়ে গেছে দেহে । জানি না এখানকার স্বাভাবিক দেহ-গন্ধে আপনি নিজেকে খাপ খাওয়াতে পেরেছেন কিনা । —আপনার হাত যতক্ষণ না ক্লান্ত হচ্ছে ততক্ষণ জড়িয়ে থাকুন প্লিজ, বললুম আমি । আমিও জড়িয়ে ধরব কিনা নির্ণয় নিতে না পেরে ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইলুম । এখানে এসে তো কেবল লুঙ্গি পরে থাকি , যা কাচা হয়নি এখনও । মায়াও একই কাপড় পরে আছে । বহুক্ষণ ওভাবে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল মায়া । অথচ আমার যৌনতার উদ্রেক হল না । আমিই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলুম এক ঠায়ে দাঁড়িয়ে । বললুম, জানি, আপনার হাত ক্লান্ত হয়ে পড়েছে ; আমার অস্বস্তি কেটে গেছে । চলুন আমরা আমাদের আরামকেদারায় বসি । আরামকেদারা অর্থে কাঁঠালগাছের তলায় রাখা দুটো পাথর । গ্রামের লোকেরা ওদুটো আমাদের জন্যে এনে দেয়নি, ওগুলো আগেই ছিল ওখানে, হয়তো কাঁঠাল গাছে ওঠার জন্য কখনও এনেছিল কিশোর-যুবকেরা । পাথরের ওপর বসে মায়া শোনাত জীবনের সৌন্দর্যের গল্প । ও বলত, দেখছেন তো, জীবন মোটেই দরিদ্র, পঙ্কিল, কদর্য, অশ্লীল , জঘন্য, স্হূল, পাশবিক, অশিষ্ট , বর্বর নয় । শহরের সমস্তপ্রকার সুবিধা থেকে বঞ্চিত আমরা ; তবু কত শান্তিতে রয়েছি । কাঠাল গাছে দাগ দেবার চার দিন পর আমরা ঝর্ণার জলে স্নান করতে গেলুম , অনেকটা হেঁটে, প্রায় তিন কিলোমিটার । আমাদের সঙ্গে তিনজন ছাত্র যোগ দিল । আমি ভালোভাবেই স্নান করলুম, গা থেকে নোংরা ঘষে-ঘষে তুললুম । চুলের জট ছাড়ালুম , আঙুল দিয়ে আঁচড়িয়ে দাড়ির চুল ভালো করে ধুলুম । জলের আয়নায় নিজেকে প্রাগৈতিহাসিক মানব মনে হচ্ছিল । বহুদিন পর নিজের প্রতিবিম্ব দেখে নিজেকে অপরিচিত মনে হচ্ছিল । মায়ার প্রায় পুরোটা সময় গেল ছাত্রদের দিকে নজর রাখতে । একজন ছাত্র, কার্তিকা, বলল, আজকে আকাশ এরকম মানে রাতে বৃষ্টি পড়বে, তখন বৃষ্টিতে নাচব । ছাত্রদের জল থেকে তুলে, তাদের নিয়ে আমি রওনা দিলুম আস্তানার দিকে, ছাত্রদের দুজনের চালা আমাদের চালা থেকে বেশ দূরে, আধঘন্টার বেশি হাঁটতে হবে ওদের । মায়াকে বললুম, আপনিও ভালোভাবে স্নান করে আসুন , আপনার চুল তো সাধুদের মতো হয়ে চলেছে , আমি এদের নিয়ে এগোচ্ছি । কিছুটা হাঁটার পর বালু মায়াগারু মায়াগারু বলে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল, আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, আম্মা আম্মা । দেখলুম মায়া সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হয়ে স্নান করছে । অপূর্ব লাগল । ভয়ও হল , প্রচণ্ড ভয়, যদি কেউ ওকে লুকিয়ে দেখতে থাকে ! তাকিয়েছিলুম ওর দিকে । তক্ষুনি মনে হল উচিত কাজ করছি না । এর আগে ওকে নগ্ন দেখিনি । দৃশ্যটা চোখ বুজলেই ভেসে ওঠে, আজও । মায়া ওদের আম্মা হয়ে উঠেছে কবে থেকে জানতুম না । বোধহয় কুয়োতলায় বাচ্চাদের আদর করার দৌলতে বা শিক্ষকতার কারণে । রাতে দুজনে দুজনকে নগ্ন পেলুম । একে আরেকজনের সামনে দাঁড়িয়ে, প্রায়ান্ধকারে, মশারির বাইরে । মায়া প্রশ্ন করল, ইতস্তত করছেন ? নিজেকে ফর্নিকেটর বা আমাকে ফ্ল্যাপার ভেবে গুটিয়ে রাখছেন না তো নিজেকে , মিস্টার মায়ালিঙ্গা । বললুম, আপনি এখানে সবায়ের আম্মা হয়ে গেছেন , কিশোর-কিশোরীদের, তাদের মা-বাবার সকলের আম্মা ; আমি নিরঞ্জন দত্ত থেকে ক্রমশ অবলুপ্তির পথে মিলিয়ে যাচ্ছি মায়ায়, নাম থেকে নামে , নামহীনতায় । কিন্তু আমার আর আপনার মাঝে আমি আর কাউকে চাই না, তাই ইতস্তত করছি । আমি চাই কেবল আপনি আর আমি , আমাদের নিজস্ব ব্রহ্মাণ্ডে ; আপনিই তো বলেছিলেন, আমরা কোনো সংসার পাতাপাতি করব না । আমরা যদি যৌনকর্মে মিলিত হই তাহলে আমরা হয়তো একধাপ এগিয়ে যাব সংসার পাতার পথে। আমি আপনার অখণ্ড ভালোবাসা চাই । কারোর সঙ্গে ভাগাভাগি করতে চাই না । আমি চাই না হঠাৎ কোনো শিশু এসে আমাকে আপনার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিক । মায়া বলেছিল, পিরিয়ডের প্রথম সাতদিন ও শেষ সাতদিন সেফ হয় । আপনি আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার শরীরের তাপ অনুভব করুন আর তা স্মৃতিতে ধরে রাখুন । আপনি তো গণিত বিশেষজ্ঞ ; প্রকৃতি দেহের জন্যে গণিতের ছক তৈরি করে দিয়েছে । আমি আমার দেহের রসায়নের গণিত ও মিউকাস তৈরির কথা জানি , কী ভাবে তা ক্যালকুলেট করতে হয় জানি, কিন্তু নিজের দেহের তাপ তো নিজে অনুভব করতে পারব না । আপনি এই সময়ে প্রতিদিন আমাকে জড়িয়ে ধরবেন, যেদিন আমার শরীরের তাপ যৎসামান্য উনিশ-বিশ মনে হবে সেদিন জানাবেন । আমিও আপনার দেহের রসায়ন যাচাই করব । প্রকৃতি মনের তাপ আর দেহের তাপে পার্থক্য তৈরি করে রেখেছে । মনের তাপে আমরা কাছে আসব, আর দেহের তাপে যৌনক্রিয়া করব না । আমিও আপনার দেহের তাপ নজরে রাখব যাতে টের পাই যা আপনার দেহ অসুখের দিকে যাচ্ছে না । স্বাস্হ্য দেখে তো মনে হয় আপনার ইমিউন সিসটেম পর্যাপ্ত । জড়িয়ে ধরতে যাব, হাওয়ায় কেমন যেন বাঁশিতে তোলা উদারার আওয়াজ পেলুম , সম্ভবত ঝড়ের পূর্বাভাস , অদৃশ্য এক ধ্বনিকুহক ঝড়কে ডাকছে । সকালে কার্তিকা বলেছিল বৃষ্টি হবে, একজন বৃদ্ধও স্নান করতে যাবার পথে বলেছিল, আমরা যেন তাড়াতাড়ি ফিরে আসি, কেননা আজকে ঝড় উঠতে পারে । দুজনে বাইরে উঁকি দিলুম । দেখলুম আকাশ অমাবস্যার রাতের মতন অন্ধকার কিন্তু গোলাপি আভায় ছেয়ে গেছে । বালু ওর মায়ের হাত ধরে দৌড়ে-দৌড়ে এদিকে আসছে দেখে আমরা দ্রুত কাপড় পরে নিলুম । বালুর মা হাত নেড়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে তুরপু তেলেগুতে যা বলল তা আমরা বুঝতে না পারলেও, এটুকু বুঝলুম যে আমাদের মতো ওরাও ভয়ঙ্কর ঝড়ের আশঙ্কা করছে । বালুর কথায় স্পষ্ট হল যে এখানে থাকতে নিষেধ করছে ওর মা, ঝড় আমাদের উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে । মায়া বলল, নিয়ে যাক না উড়িয়ে, হারিয়ে যাবার জন্যেই তো এসেছি । —পাগলামি করবেন না , এখনও সম্পূর্ণ ভালোবাসা পাইনি আপনার । মায়ার হাত ধরে টানতে-টানতে দৌড়োলুম বালুর মায়ের পেছনে, ঝর্ণার দিকে । প্রশ্ন করার সময় ছিল না । কিছুদূর গিয়ে মায়াকে কাঁধের ওপর তুলে নিলুম, কারণ ও খালি পায়ে দ্রুত দৌড়োতে পারছিল না । দৌড়োবার সময়ে দেখতে পেলুম, অন্ধকারে বহু ছায়া দৌড়োচ্ছে আমাদের সঙ্গে, পেছনে, সামনে, বাঁদিকে, ডানদিকে । কোথাব ছিল এত মানুষ, আগে তো এতজনকে একত্রে দেখিনি । ঝড় সবাইকে আতঙ্ক দিয়ে বেঁধে ফেলেছে । ঝর্ণার স্রোতকে পাশ কাটিয়ে সবাই উঠলুম পাহাড়ের ওপর । ছায়াদলের নেতা ঢুকে গেল পাহাড়ের কন্দরে । তাকে একে-একে অনুসরণ করল সবাই, আমরাও । অন্ধকার গুহা । কে কোথায় কিচ্ছু টের পাওয়া যাচ্ছিল না । কেবল চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছিল । মহিলারা স্বামীকে, ছেলেদের ডেকে একত্রিত করছেন হয়তো । ভেতরে ঢুকে, মায়াকে নামিয়ে, টের পেলুম আগে থাকতে অনেকে এসে বসে আছে । আমি মায়ার হাত শক্ত করে ধরে রইলুম । বাইরে তখন প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে , শোনা যাচ্ছে মেঘের আনন্দ-চিৎকার , আর থেকে-থেকে ভেতরে ছিটকে আসছে তার চিৎকারের আলো । এই প্রথম দেখলুম আলোও প্রতিধ্বনিত হয় । সবাই গুহার উবড়ো-খাবড়া দেয়ালে পিঠ দিয়ে বসে রইলুম সারা রাত । মায়া আমার কোলে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেও আমি ঘুমোইনি । জেগে বসেছিলুম সারারাত । ঘুমোলে যদি জেগে উঠে হঠাৎ নিজেকে দেখি দাদুর বাঙলোবাড়িতে আমার বিছানায় একা শুয়ে আছি ! অতীতকে মনে হচ্ছিল অবিশ্বাস্য । ভাবছিলুম সত্যিই কি পরিচিত প্রথিবীতে আছি না কি স্বপ্নের দুনিয়ায় । সকালে একে-একে বাইরে বেরিয়ে দেখলুম যে ঝড় বয়ে চলে গেছে অঞ্চলের ওপর দিয়ে । পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে অন্যদিকটায় দেখতে পাচ্ছিলুম অজস্র কলা আর পেঁপেগাছ ফলসুদ্ধ ভেঙে পড়ে আছে । এত দূর থেকেও দেখতে পাচ্ছিলুম কাঁচা আর আধপাকা পেঁপে আর কলার কাঁদি কাৎ হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে চারিধারে । ক্ষুধার্ত ঝড় কলা আর পেঁপে খেতে-খেতে এসেছে , আমাদের ভয় দেখিয়ে, আরও ভেতরে ঢুকে গেছে ঝড়টা, ব্যারাইটের খনির দিকে । বোধহয় এটা ছিল বঙ্গোপসাগরে ওঠা এক সামুদ্রিক ঘূর্ণির ল্যাজের ঝাপটা । পাহায থেকে নামবার সময়ে চোখে পড়ল ঝর্ণার স্বাস্হ্যবতী হয়ে ওঠা কলকল নৃত্য । মায়া বলল, আমার হাত ধরে, আপনি ওভাবে হঠাৎ কাঁধে তুলে নিলেন আমায় ? ইন্সটিংক্টিভলি ? কাঁধে তুলে দৌড়োচ্ছিলেন যখন, আমি আপনার গলা জড়িয়ে শুনতে পাচ্ছিলাম আপনার হৃৎপিণ্ড কত দ্রুত কাজ করে চলেছে. আমারই জন্যে , কী আশ্চর্য , তাই না ? বলেছিলুম, কোনো চিন্তা মাথায় আসেনি তখন ; জাস্ট পৌঁছে যেতে চেয়েছিলুম পাহাড়ের ওপরে যত তাড়াতাড়ি পারা যায় ; আপনি যে আমার কাঁধে, আপনি যে আমার গলা জড়িয়ে ঝুলছেন, তা লক্ষ করার সম্বিত ছিল না তখন । যে যার চালার দিকে হাটতে লাগলুম । জঙ্গল পেরিয়ে আমাদের এলাকায় পৌঁছে স্পষ্ট হয়ে উঠল যে প্রায় সবায়ের চালা , সম্পূর্ণ পড়ে না গিয়ে থাকলেও , ভেঙেচুরে হেলে আছে । জঙ্গলের সুউচ্চ গাছগুলো চালাগুলোকে গুটিয়ে নিয়ে যেতে দেয়নি । আমাদের চালাটা কোনোমতে টিকে আছে । তবে ক্লাস নেবার দেয়ালকে খেয়ে ফেলেছে ঝড়ে , আর বেরিয়ে পড়েছে দেয়ালের পাঁজরা, শুকনো পেঁপে গাছের ও অন্যান্য গাছের ডালপালা, যার ওপর মাটি-গোবর লেপে গড়ে উঠেছিল দেয়ালের আস্তরণ বা ব্ল্যাকবোর্ড । গোরুছাগল কোথায় থাকে আমি খোঁজ নিইনি কখনও ; মায়া জানে । পরে ও বলেছিল, জন্তুগুলোর জন্যে পাথরে ঘেরা দেয়াল আছে , সেখানে ঢুকিয়ে গাঁছের গুঁড়ির গেট বন্ধ করে দেয়া হয় রাতের বেলায় । ফলে ঝড়ে জন্তুগুলো ডাকাডাকি করলেও বহাল তবিয়তে আছে । আমাদের ঘরের ভেতরেও জল ঢুকে গিয়েছিল । মশারি ভিজে চুপচুপে । ক্যারিব্যাগ দুটো চলে গিয়েছিল চালার বাইরে, বেশ দূরে । খুঁজে আনতে হল । মায়া বলেছিল , দেখেছেন তো ? প্রকৃতিও আমাদের দুজনার সঙ্গে রয়েছে । আধুনিকতার বিষ থেকে আমাদের ধুয়ে দিয়ে গেল । আমাদের ঘর এবার আমরা নিজেরাই মাটি লেপে নতুন করে তুলব । মেঝেটাও মসৃণ করে নেব যাতে আপনার পিঠে না ফোটে । আমি মনে-মনে ভেবেছিলুম, আধুনিকতার বিষ কি এড়ানো যায় ? যায় না, তার কারণ আমাদের নেশা ধরিয়ে দিয়েছে আধুনিকতা , মাদকের চেয়েও মহা আকর্ষক সেই নেশা । চলুন পালাই ডাকে সাড়া দিয়ে চলে তো এসেছি, তা কি মুক্ত করেছে আমাদের , আমাকে ? সদাসর্বদা আধুনিক বস্তুর অভাব বোধ করতে থাকি । মায়া না থাকলে এখানে এক ঘন্টাও টিকতে পারব না । মায়াই আমার জীবনদায়ী ওষুধ । পুরো প্রিন্টআউট পড়া শেষ হলে ইন্সপেক্টর রিমা খান সংশ্লিষ্ট সিডিটায় লিখে রাখল ‘পঠিত’ । এবার খুঁজে বের করতে হবে মায়া পালকে । মায়া পালই কি প্রেমিককে খুন করে উধাও হয়ে গেছে । ইনি কি সত্যিই কেউ , নাকি বানানো গল্প । কোথায় থাকেন ? বোঝা যাচ্ছে বেশ ধনী পরিবারের মেয়ে । উচ্চ-মধ্যবিত্ত বাঙালি এলাকায় নিবাস, নিঃসন্দেহে । বাবার নাম জানা গেলে সুবিধা হতো । কিন্তু পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে লালিত একজন তরুণীর ওইভাবে জোতদার-জমিদার পরিবারের যুবককে প্রেমিক হিসাবে বেছে নেয়াটা কিরকম যেন বিসদৃশ ঠেকল ইন্সপেক্টর রিমা খানের । ইংরেজি ভাষার সঙ্গে গণিত কি মেলে ? মেট্রো রেলস্টেশান মানে এখানে দমদমই বুঝতে হবে, কেননা প্রেমিক মশায়ের সিদিগুলো পাওয়া গেছে ওনার বাড়িতে, যার সবচেয়ে কাছের মেট্রো রেলস্টেশান আপাতত দমদম । মায়া পালকে কিন্তু দমদমের মিলিউয়ের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো যাচ্ছে না । রাজারহাটের নিউটাউনও তখনও পর্যন্ত জমে ওঠেনি । মায়া পাল ওই স্টেশানে কি ওনার প্রেমিককে ধরার জন্যেই গিয়েছিলেন ? এই প্রেমের গল্পটাও তো অবিশ্বাস্য । কোনো ভালবাসাবাসি নেই, তার ব্যাকগ্রাউন্ড গড়ে ওঠেনি, ব্যাস, তরুণি বলল, চলুন পালাই, আর তরুণ তার সঙ্গে পালালো ! সিডিটায় , চিন্তা করছিল রিমা, ক্রিয়াপদের কালসঙ্গতি নেই ; কখনও লেখা হয়েছে অতীতকাল প্রয়োগ করে, আবার কখনও বর্তমানকাল । কংকালটা নিশ্চই বাংলায় ভালো মার্কস পেতো না । কিংবা হয়তো ক্যারিড অ্যাওয়ে হয়ে লিখে গেছে । প্রিন্টআউটের মার্জিনে এই প্রশ্নগুলো, যেগুলো ওর মগজে উদয় হচ্ছে, লিখে রাখছে ইন্সপেক্টর রিমা খান । বাঁ আঙুলে ধরা সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে নেভাল রিমা খান । ঠোঁটের ওপর জিভ বুলিয়ে নিল । টেবিলের ওপর ঠ্যাং তুলে চোখ বুজল । কঠিন প্রেম, জটিল প্রেমিক, রহস্যময়ী প্রেমিকা —নিজেকে নিঃশব্দে শুনিয়ে বলল রিমা । মনের ভেতরে ‘আধুনিকতার বিষ’ কথাটা ভাসতে দিল কিছিক্ষণ । আধুনিকতা কী, সেটাই তো জানি না । কোলকাতার কোন লোকটা আধুনিক ? কোন পাড়াটা আধুনিক ? আধুনিকতা ছাড়াই তো বিষে-বিষে ছয়লাপ । এককালে ছিল ঠগিরা । আর এখন ? ঠগ বাছতে ভারত উজাড় । দিল্লিতে যে আন্তর্জাতিক ডিটেকটিভ সেমিনারে গিয়েছিল রিমা , তাতে যোগ দিতে লন্ডন থেকে শার্লক হোমসও এসেছিলেন । উনি বলেছিলেন, তোমাদের দেশ থেকে স্বাধীনতার পর চারশো বিলিয়ান ডলার চলে গেছে সুইস ব্যাঙ্কে , আমার কাছে প্রতিটি লোকের নাম, অ্যাকাউন্ট নম্বর আর ডলারের অ্যামাউন্ট আছে ; আমি তালিকাটা দিতে চেয়েছিলুম , কিন্তু তোমাদের দেশের সরকার নিতে রাজি হল না । আসলে কেই বা রাজি হবে ? যার হাতে দেবো , তারই তো লুকোনো টাকার পাহাড় রয়েছে সেখানে । মডার্ন ইন্ডিয়া ! নিজেকে নিজে বলেছিল ইন্সপেক্টার রিমা খান


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৪৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ পলাতকার উড়াল-(01)
→ ভূতের গপ্পো—পর্ব ৬*পলাতকার উড়াল*

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...