গল্পেরঝুড়ির এ্যাপ ডাউনলোড করুন - get google app
গল্পেরঝুড়ি ফানবক্স ! এখন গল্পের সাথেও মজাও হবে! কুইজ খেলুন , অংক কষুন , বাড়িয়ে নিন আপনার দক্ষতা জিতে নিন রেওয়ার্ড !

যাদের গল্পের ঝুরিতে লগিন করতে সমস্যা হচ্ছে তারা মেগাবাইট দিয়ে তারপর লগিন করুন.. ফ্রিবেসিক থেকে এই সমস্যা করছে.. ফ্রিবেসিক এ্যাপ দিয়ে এবং মেগাবাইট দিয়ে একবার লগিন করলে পরবর্তিতে মেগাবাইট ছাড়াও ব্যাবহার করতে পারবেন.. তাই প্রথমে মেগাবাইট দিয়ে আগে লগিন করে নিন..

সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান... জিজেতে আজে বাজে কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন ... অন্যথায় আপনার আইডি বা কমেন্ট ব্লক করা হবে... আর গল্প দেওয়ার ক্ষেত্রে গল্প দেওয়ার নিয়ম মেনে চলুন ... সার্বিকভাবে জিজের নীতিমালা মেনে চলার চেস্টা করুন ...

পলাতকার উড়াল-(01)

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মরীচিকা (১০৯ পয়েন্ট)



তারিখটা আজও মনে আছে : পয়লা সেপ্টেম্বর । মেট্রো রেল স্টেশানের চত্বরে দাঁড়িয়ে, মোবাইলটা পকেটে আছে কিনা চেক করছি, একজন তরুণী খপ করে বাঁ হাত ধরে বলে উঠল, ‘চলুন পালাই’ । খপ, এই শব্দটাই মাথায় এলো , অব্যর্থ শব্দ । ডেস্কটপের কি-বোর্ড পর্যন্ত শব্দটাকে নতুন মানে দিয়ে ফেলছে , স্পষ্ট অনুভব করছি । মুখে বললে অশ্লীল শোনাবে এই খপ শব্দটা ; কিন্তু হাত ধরার প্রক্রিয়ায় তো ওই আধ্যাত্মিক ইন্দ্রজাল লুকিয়ে ছিল । ইঁটের তলাকার ঘাসের মতন, রহস্যময় । ‘চলুন পালাই’ কথাটার জন্যে নয় , বা, ডান হাতের কব্জিতে শক্ত মুঠোয় ধরার, ধরে থাকার কারণে , আমার মুখমন্ডলে যে ভাব ছড়িয়ে পড়েছিল, তা ভয়, ভীতি, অতিপরিচিত ভীতি, রক্তশূন্যতা, অথচ অজানা আশঙ্কা, বিপদের পূর্বাভাস না অন্য কিছু , তা স্মৃতিতে আর ফিরিয়ে আনতে পারছি না যদিও । ব্রহ্মাণ্ড নিশ্চই ভয় থেকে সৃষ্টি হয়েছিল । শব্দহীন, বর্ণহীন, গন্ধহীন, বাতাসের স্পর্শহীন, স্বাদবস্তুহীন পূঞ্জীভূত ভয় , সীমাহীন অন্ধকারে শূন্যবিন্দুতে ঘন হয়ে ওঠার ভয় । স্টেশানের বাইরে দাঁড়িয়ে আমি নিজেকে আবিষ্কার করলুম সেই শূন্যবিন্দুতে । হঠাৎ । আচমকা, এক নিঃশব্দ হিমশীতল বিস্ফোরণ । পয়লা সেপ্টেম্বর । তরুণী ফোটোক্রোমেটিক চশমায় , কাচের নিচের দিকটা ফিকে বলে গভীর চোখ দুটোয় প্রশ্নময়তার ঝিলিক । মাথাভরা কোঁকড়ানো চুল । আমার চেয়ে চার-পাঁচ ইঞ্চ ছোট ; দামি ব্র্যান্ডেড ফেডেড জিনসের ওপর সিল্কের ঢিলেঢালা টপ । আমার চেয়ে এক পোঁচ কম ফর্সা , কানে ছোট-ছোট হীরের তারা, ডান হাতে পুরুষালি ঘড়ি, বিদেশি দামি ঘড়ি — ওই হাতেই লুকিয়ে ছিল খপ শব্দটা । পাতলা ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপ্সটিক ছাপিয়ে শ্লেষের মৃদু হাসি, বলল, কী হল ? লেট আস রান অ্যাওয়ে, চলুন পালাই । বিন্যস্ত, মনস্হিতিকে শান্ত করতে , স্বাভাবিকভাবে, সময় লাগছিল । আমার প্রতিক্রিয়া উপভোগ করছিল স্মার্ট তরুণী । স্পষ্ট করে বলল, দেখুন, কত কাওয়ার্ড আপনি । নিজের কাওয়ার্ডাইসের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না বুঝি ? প্রতিদিন তো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেন আমায় । সারাদিনে বেশ কয়েকবার কাছাকাছি ঘোরাফেরা করেন , বুঝতে পারি কথা বলার সুযোগ খুঁজছেন ; এখন কী হল ! সম্বিত ফিরে পেতে যতক্ষণ । আমাদের ডিপার্টমেন্টের মায়া পাল । কয়েক মাস হল এই বিভাগে জয়েন করেছে । অফিসে তো ইংরেজিতে ছাড়া কথা বলে না , কনভেন্ট স্কুলের ইংরেজি । ওদের সেকশানে গেলে ফিরে-ফিরে চোখ চলে যেত তরুণীটির দিকে । চার্মিং । সুন্দরী না হয়েও আকর্ষণীয়া । হাঁটার, কথা কইবার ঢঙে গর্ব ছলকায় , সম্ভবত উচ্চশিক্ষায় ভালো ফলাফল করার, অঢেল মাইনে পাবার, গোমর , তখন ভাবতুম । মানুষের ভেতরের আলোর খবর সেসময়ে আমার জানা ছিল না । শুনেছিলুম, নানা চাকরি বদল করার অভ্যাস আছে তরুণীটির , একটি থেকে আরেকটিতে লাফিয়ে-লাফিয়ে বর্তমানে বছরখানেক আমাদের অফিসে । প্রতিষ্ঠান হিসাবে অফিস জিনিসটার আর গুরুত্ব নেই । চাকুরিজীবি নিজেই নিজের ব্র্যান্ড । তা সে যে সংস্হায় কাজ করছে সেটি যতই বিখ্যাত হোক । আমি জীবনে ওই একটি চাকরিই করেছি , এ ছাড়া কী করব জানি না বলে চাকরি করা শুরু করেছিলুম । বাপ-ঠাকুর্দা যা ছেড়ে গেছে তা যথেষ্ট । বিয়ে-করা, সংসার পাতা ইত্যাদি সম্পর্কে আমার কমিটমেন্ট ভীতি ছিল । আমি জানতুম যে আমি পলিগ্যামাস । একজন নারীর বাঁধনে নিজেকে আটকে ফেলার আশঙ্কায় প্রেমে পড়ার ব্যাপারটা চিরকাল এড়িয়ে গেছি । আকর্ষিত হয়েছি, কিন্তু গড়াতে দিইনি বেশিদিন । কলগার্লদের তাই আমার ভালো লাগত ; কল গার্ল বলতে আমি আমাদের দেশের বেশ্যালয়ের বেশ্যাদের কথা বলছি না । আমাদের দেশের কথাটা এইজন্যে মনে এলো যে পৃথিবীতে আমাদের দেশের বেশ্যালয়গুলোর মতন ্রকম নংরা পরিবেশ বোধহয় আর কোনো দেশে নেই । শহরের সবচেয়ে উপেক্ষিত পাড়াটি তাদের জন্য বরাদ্দ ; ভারতবর্ষে । আমি নিজেকে বলতে শুনলুম, আপনি ঠিক কী বলতে চাইছেন, মানে আপনার কথার আড়ালে কী লুকিয়ে রেখেছেন, ডেসিফার করতে পারছি না । এমনিতেই আমার গলা শুকিয়ে জল বা কোল্ড ড্রিংক্সের চাহিদায় তখন । তার ওপর যারা আসপাশ দিয়ে যাতায়াত করছে তারা যাতে কথপোকথন শুনতে না পায় তাই স্তিমিত কন্ঠস্বরে উচ্চারিত হয়েছিল আমার বোকামি । কোনোই হেঁয়ালি করিনি আমি ; জাস্ট লেট আস গেট লস্ট । এবার বুঝতে পেরেছেন ? আমি বলছি, চলুন পালাই, আমাদের এই চেনাজানা ম্যাডনেসের বাইরে পালাই, এমন পরিবেশে যেখানে আধুনিক জগত অনুপস্হিত, যেখানে ভিড় একদম নেই, মানুষ দেখতে পাওয়া যায় না সচরাচর, চেঁচামেচি নেই , আওয়াজ নেই, মানুষের গ্ল্যান্ডের দুর্গন্ধ নেই । অ্যাম আই ক্লিয়ার নাও ? আমার হাতের কব্জি ধরে রেখেই বলছিল মায়া । মনে হয়নি কখনও, ও এরকম চিন্তাকে প্রশ্রয় দিতে পারে, ওকে দেখে কখনও মনে হয়নি যে ও মহানগরীর বিতৃষ্ণায় আক্রান্ত । আজ বুঝতে পারি, মহানগরীয় বিতৃষ্ণা নয়, অন্য এক অজানার সন্ধান করেছিল মায়া পাল, যা জানতে পারা আমার ক্ষমতা ওজ্ঞানের বাইরে । আজও জানি না তা কী । একজন তরুণী তার সঙ্গে কোথাও উধাও হয়ে যেতে বলছে । কলকাতা শহরে, সকাল নটায়, অফিস যাত্রার দৈনিক ব্যস্ততার মাঝে এরকম একটা অ্যাবসার্ড প্রস্তাব দিয়ে বসল । ঠাট্টা-ইয়ার্কি নাকি হিউমিলিয়েট করার উদ্দেশ্যে, তা স্পষ্ট করার জন্যে বললুম, অকারণে অপমান করবেন না প্লিজ, তরুণীরাই আমার দিকে তাকান, তাকিয়ে থাকেন, কেউ-কেউ কথা বলতে চান, কিন্তু আমি কখনই কাউকে ডিমিন করি না, আমি প্রেমে পড়া ব্যাপারটাও ঠিক অনুমোদন করি না , তা ঘটে বলে তো মনে হয় না । হাত ধরে রেখেই মায়া বলেছিল, স্ট্রেঞ্জ, গলার টোন থেকে ধরতে পারছেন না যে আমি সিরিয়াস ? আমি বলছি, চলুন, সব কিছু পেছনে ফেলে চলে যাই কোথাও ; আমরা পরস্পরের সঙ্গে সেরকম পরিচিত নই, সেটা একটা প্লাস পয়েন্ট । কিছুটা তো চিনি একজন আরেকজনকে । বিকেল পর্যন্ত আমরা পরস্পরের পরিচিত হয়ে উঠব । পালাতে হলে এভাবেই পালাতে হয় , হঠাৎ । হঠাৎ একদিন কাউকে না জানিয়ে , এক পোশাকে, পরিচিত জগত থেকে ফ্রিক-আউট করে যাওয়া , বিকামিঙ আননোন, অ্যাননিমাস, ফরগটন । প্রেমে পড়ার কথা তো আসছে না । কী ? ভাবছেন, আমার মাথা খারাপ ? মেন্টাল কেস ? তাহলে এরকম চাকরি পেতাম নাকি ? কত স্মার্ট ক্যান্ডিডেট তো ছিল , তা থেকে মাত্র আমি সেলেক্ট হয়েছিলাম , আপনি তা জানেন নিশ্চই ? এই ধরণের চাকরি আমি চাইলেই পেতে পারি । ভাববার সময় নেবেন না । আমিও ঠিক এক্ষুনি ভাবলাম , পালানো যাক । কাউকে বলি, চলুন পালাই , আপনাকেই সামনে পেলুম । ভাবতে চেষ্টা করবেন না । অত্যধিন চিন্তা মানুষকে দুশ্চরিত্র করে । ও , আমার মুখ দেখতে পাচ্ছেন না ? চশমা খুলে মায়া বলল, নিন, চলুন পালাই, আই অ্যাম ডেড সিরিয়াস । আমার মুখ দিয়ে আমতা-আমতা কন্ঠস্বরে বেরিয়েছিল, আমি কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি বক্তা হিসাবে গণিত সম্পর্কে বক্তৃতা দিতে যাচ্ছি । ফরগেট ইট, বলেছিল মায়া, জানি আপনি গণিত বিশেষজ্ঞ । ওসব ভুলে যান । গণিত কাজে লাগে না , ইংরেজিরও প্রয়োজন নেই , এরকম জনহীন অঞ্চলে চলে যেতে চাই । তাড়াতাড়ি করুন । আমার কাছে এটিএম কার্ড, ক্রেডিট কার্ড আছে ; আপনার কাছেও আছে নিশ্চই । চলুন, যতটা পারা যায় তুলে নিই , তারপর নিরুদ্দেশের পথে ওগুলোর আর প্রয়োজন হবে না । মায়ার পরিবারে কে-কে আছে জানি না , কখনও জানিনি, জানতে চাইনি । আমার তো মা-বাবা মারা যাবার পর কেউ নেই , কেউই নেই । বিশাল বাঙলোবাড়িতে আমি একা । দাদুর বাবার ঘর, দাদুর ঘর, বাবার ঘর, বাবা-মা মারা যাবার পর আর খুলিনি । মায়ের চব্বিশ ঘন্টা কাজের বই সেলিমা বেওয়াকেও ছাড়িয়ে দিয়েছি , কেননা একা একজন যুবতীর সঙ্গে, সে কাজের মেয়ে হলেও, একই বাড়িতে থাকা যায় না । বস্তুত কেউ নেই বলেই চাকরি করি । নয়তো চাকরি করার দরকার ছিল না । মায়া পালকে বললুম, আমি অসৎ, জোচ্চোর, বিশ্বাসঘাতক, দুশ্চরিত্র, ফেরেববাজ, বেপাড়ার যাত্রী কিনা তা তো আপনি জানেন না । তরুণী হাসির মৃদু ঝিলিক খেলালেন, ঠোঁট সামান্য খুলে, বললেন, অ্যাডাম আর ইভের গল্প জানেন ? তাদের নাভি ছিল না । আমাদেরও অতীত ঠিক এই মুহূর্ত থেকে আর নেই । আমরা এক্ষুনি স্বর্গোদ্যানে নেমেছি । আপনি অ্যাডাম, আপনি নিষ্পাপ । আমরা তাদের মতনই শাকাহারী । এসব কথা বলার জন্যে তো সারাজীবন পড়ে রইলো । এখন চলুন, যেদিকে পথ নিয়ে যায়, সেইদিকে । জানি না কে কাকে সন্মোহিত করেছিল । আমরা নিজেদের অ্যাকাউন্ট থেকে যত বেশি সম্ভব টাকা তুলে, দমদম বিমান বন্দরে পৌঁছে, প্রথম ফ্লাইটের খোঁজ করে, চেন্নাইয়ের বিমানে দুটো সিট পেলুম । টিকিট মায়াই কেটেছিল, মিসেস মায়া পাল আর নিরঞ্জন পালের নামে । বিমানে বসে, মায়া চুপচাপ, হয়তো নিজের ফেলে আসা অতীতকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলার চেষ্টায় একাগ্র । মেয়েদের অতীত পুরুষদের চেয়ে ভিন্ন হয় বলে আমার অনুমান । আমি অপেক্ষা করছিলুম ওর কথার, কথা বলার, কেননা নুরুদ্দেশে যাবার আকস্মিক পরিকল্পনাটা ওরই , আমি তো তাতে সঙ্গদান করছি মাত্র । আমার দিকে না তাকিয়েই মায়া বলেছিল, আমরা সারা জীবন নিজেদের সম্পর্ক আপনি-আজ্ঞের পবিত্র গভীরতায় রাখব । তুমি-তুমি ওগো-হ্যাঁগোর ছেঁদো নোংরা রুটিনে বাঁধা পড়ব না বলেছিলুম, পবিত্র ? এই ধরণের অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করবেন না প্লিজ । মায়া বলেছিল, ঠিক বলেছেন, এবার থেকে করব না ; এই রকম শব্দও তো অতীতকে ধরে রাখার ষড়যন্ত্র । মায়ার পাশে বসে একই ভাবনা ঘুরছিল আমার মগজে, যা বহুকাল থেকে বাসা বেঁধে আছে । তা এই যে, আমি একজন কুকুর । যে মালকিনির হাতে পড়েছি, সে যেরকম চেয়েছে, যেরকম গড়েছে, তা-ই হয়েছি : প্রেমের কুকুর, কাজের কুকুর, সেবার কুকুর, গুপ্তচর কুকুর, ধাঙড় কুকুর, কুরিয়ার কুকুর, প্রেডাটার কুকুর , পাহারাদার কুকুর, মানসিক থেরাপির কুকুর, অনধের কুকুর, শোনার কুকুর, শোঁকার কুকুর, চাটার কুকুর, রক্ষক কুকুর, গাড়িটানার কুকুর, আদরের কুকুর, এই কুকুর, ওই কুকুর ইত্যাদি । কিন্তু আমার লেজটা জন্মের সময়ে যেমন আকাশমুখো ছিল, আজও তেমনই আছে । থাকবে । এখন টাইপ করতে বসেও জানি, লেজটা অমনই রয়েছে । কুকুরের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আমার । টাকা ফুরোলে তো ফিরতেই হবে আরামের শহুরে জীবনে । না ফেরা পর্যন্ত নিরঞ্জন পাল হয়েই থাকা যাক । মায়া হয়তো সংসারের বেড়ি-শেকল থেকে কিছুদিনের জন্যে মুক্তি চাইছে । চেন্নাইতে নেমে, আমার প্রস্তাবমত, দুটো সস্তা ক্যারিব্যাগ, মোটা চাদর, ফোলাবার দুটো বালিশ, মশারি, দক্ষিণ ভারতীয় সস্তা শাড়ি, স্হানীয়দের মতৌ শাদা আর চাককাটা লুঙ্গি কিনে, স্টেশানের কাছে হোটেলে উঠলুম । মিসেস মায়া বণিক আর নিরঞ্জন বণিক নামে । মায়া কারণ বলেনি এই নতুন পদবির । আমি অনুমান করলুম, পেছনের যাবতীয় ছাপ মুছে ফেলতে চাইছে, প্রতিটি পদক্ষেপের, যাতে কেউ খুঁজে না পায় আমাদের । দক্ষিণ ভারতীয় সাপড়া, মানে ভাত সাম্বর রসম পাঁপড় পাতলা দই খেয়ে মায়া দিব্বি ঘুমোলো সারারাত । কোনো তরুণির পাশে শুয়ে ঘুমোনো , আমার মতন জার্মান শেপার্ড বা কুন হাউন্ডের পক্ষে অসম্ভব ছিল । জেগে রইলুম সারারাত । লক্ষ করলুম, মায়ার কানের হীরের টপ, আর হাতের মোটা চুড়িটা নেই । মায়ার পারফিউমের মায়াবিনী সুগন্ধের স্বপ্নিল পরিমণ্ডলে শুয়ে-শুয়ে সেদিন ভেবেছিলুম, এ কিরকম সম্পর্ক ! এ তো প্রেম নয়, কয়েক ঘন্টার জন্যে কেনা মেয়েমানুষের সঙ্গে শোয়া নয় ল সম্পূর্ণ অচেনা একজন মহিলার পাশে শুয়ে আছি , কেন তার কারণ নিজেই জানি না । মগজে ঘুরঘুর করছে ভাবনার ধোঁয়া । কে এই মহিলা ? কী চায় ? ধর্মের ঘেরাটোপে পাগল রমণী ? পাল যখন তখন বৈষ্ণব নয় বলেই তো মনে হচ্ছে যে গোপন বৈরাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ? ফেডেড জিন্স পরে ! একজন প্রায় অচেনা পুরুষের পাশে শুয়ে নিশ্চিন্তে কী করে ঘুমোতে পারে একজন যুবতী , যে দেখতেও ভাল, এমনকি আকর্ষক ? জীবন থেকে কিছু চাই ? চাইলে আমার তো তাতে কোনো ভূমিকা থাকার কথা নয় ? হয়তো আমার ভূমিকা ছকে রাখা আছে, ক্রমশ প্রকাশ্য । দেখাই যাক । একটা উদ্দেশ্য তো হল । বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য ! আমি একজন যধবতীর পাশে শুয়ে আছি , অথচ আমার শরীরে কোনো যৌন প্রতিক্রিয়া ঘটছে না । এর আগে কোনো যুবতীর সঙ্গে শোবার প্রস্তুতির পর্ব থেকেই আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে আনন্দনৃত্য শুরু হয়েছে । উদ্দেশ্যহীন শুয়ে থাকার অভিজ্ঞতা হয়নি আগে । চেন্নাই স্টাশানে পোঁছে, প্রথম ট্রেন পাওয়া গেল নেল্লোরের, তার দ্বিতীয় শ্রেণির টিকিট কেটে উঠলুম । হোটেল মালিকও বলেছিল, হনিমুনের জন্য নেল্লোর হয়ে কডপ্পা জেলার ম্যাগনামপেট অঞ্চলে ব্যারাইট ব্যবারিটাস খনি-অঞ্চল ছাড়িয়ে কিছুটা দক্ষিণপূর্বে গেলে খুবই ভাল সময় কাটবে ; সেখান থেকে আরও দক্ষিণে ভেতরদিকে গেলে , কর্ণটক সীমান্তের কাছাকাছি, একেবারে আধুনিকতা-বর্জিত গ্রামসমাজে যাওয়া যায় , উপজাতিরা থাকে, এমন জনসমাজ যেখানে অভাব আছে কিন্তু সেখানের লোকেরা তাকেই জীবন মনে করে , দারিদ্র্যই তাদের বেঁধে রেখেছে পরস্পরের সঙ্গে । তবে যেতে-আসতে অনেক হ্যাপা । আমার দশ কিলোমিটার মর্নিংওয়াকের অভ্যাস আছে । মায়াকে জিগ্যেস করেছিলুম, যাবেন কি ওই অঞ্চলে ? মায়া বলেছিল, ওরকম অঞ্চলই তো চাইছি । দেখছেন তো ক্রমশ আমরা ইশারায় কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি , কেননা সকলে আমার-আপনার ভাষা কাজ চালাবার মতন জানে । আমরাও এনাদের ভাষা একবর্ণ বুঝি না, তবুও বাংলা ভাষা দিয়ে কাজ তো চলে যাচ্ছে , কোনোই অসুবিধা হচ্ছে না । মায়া পালের কথা শুনছিলুম । যত শুনছিলুম, তত ওকে স্ট্রেঞ্জ মনে হচ্ছিল । ও তো, বুঝতে পারলুম, ব্যারাইট জিনিসটার নামই শোনেনি । বললুম, ব্যারাইট অনেকটা আপনার মতন, ঝিকমিক-ঝিকমিক ক্রিস্টাল দিয়ে গঠিত খনিজ, অনেক রকমের কাজে লাগে । শুনে, আমার মনে হল, ভালো লাগল মায়ার । ওর পাতলা ঠোঁটে হাসি খেলল । ওর বিভিন্ন মৃদু হাসিগুলোর মানে আমি বুঝতে আরম্ভ করেছি । নারীর স্টকে কত রকমের হাসি থাকে তার ইয়ত্তা নেই । নেল্লোরে নেমে ট্রেন পালটিয়ে কোদরু । নেল্লোরে যাবার পথে আমার মোবাইল, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড নিয়ে নিজের পার্সে ঢুকিয়ে ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল মায়া । শখের কালো চশমাটা দিয়ে দিল আমাদের সামনে বসে-থাকা ছেলেটিকে, যে মায়ার পার্স ছুঁড়ে ফেলা দেখে তখনও পর্যন্ত সম্বিত ফিরে পায়নি । নিজের কার্ডগুলোও এক-এক করে জানলা দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল । আম কলা পাতিলেবু পেঁপের চাষের এলাকা আর ব্যারিটাইসের খনি অঞ্চল শুনে এই এলাকা চিহ্ণিত করেছিল মায়া । কোদরু থেকে ভাড়ার জিপগাড়িতে আধকাঁচা রাস্তার ধুলোর কুয়াশা ওড়াতে-ওড়াতে খনি অঞ্চল । প্যাংলা শ্রমিকদের আনাগোনা দেখে টের পাওয়া যাচ্ছিল যে খনি অঞ্চল এসে পড়ল । খনি ম্যানেজারকে আমাদের উদ্ভট হনিমুন পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করতে, মিস্টার কৃষ্ণাইয়া ওনাদের রেস্ট হাউসে রাতটা কাটাতে দিলেন । এখানেও দুজনে পাশাপাশি শুলুম । তবে বিছানাটা বিশাল বলে আর ঘরে এসি থাকায় অসুবিধা হল না । রাজ্যের কেষ্টবিষ্টুরা এসে থাকেন বোধহয় , তাই বেশ সাজানো-গোছানো । আমি অতিপ্রয়োজনীয় ঘুমটা দিয়ে নিলুম । সকালে রেস্ট হাউসের দেয়া ব্রেকফাস্ট খেয়ে অজানা সাংসারিক জীবনের পথে রওনা দিলুম । ব্রেকফাস্টে যাতে ডিম আর দুধ দেয়া না হয় তা ওখানের খানসামাকে বলে দিয়েছিল মায়া । চা কেবল লিকার । ভাবলুম, বোধহয় শনি-মঙ্গলবার ধরণের কোনো স্ত্রী আচার । আমি তো নিজেই যা হোক ব্রেকফাস্ট খাই , ওটস, পরিজ, ব্রেড-স্যান্ড উইচ বা অফিসে পৌঁছে অর্ডার করি । এই অঞ্চলে রেস্টহাউসেই আমরা শাওয়ার বাথ করেছিলুম, একসঙ্গে নয়, প্রথমা মায়া তারপর আমি । যদিও আমার আশঙ্কা ছিল হয়তো মায়া সেরকম কোনো প্রস্তাব দিয়ে বসবে । রহস্যময়ী, অতএব কখন কোন রহস্যের ঘুর্ণিতে গিয়ে পড়ি , তার জন্যে নিজেকে সবকিছুর মুখোমুখি হবার জন্যে প্রস্তুত করে নিয়েছিলুম । মায়ার কার্যকলাপ দেখতে-দেখতে আমি ওর দায়িত্ব নিয়ে ফেলছিলুম । খনি ম্যানেজার একজন শ্রমিককে দিলেন গাইড হিসাবে । প্রথমে খনির ম্যাটাডর গাড়িতে, ড্রাইভারের পাশে গাইড, আমরা ক্যারিয়ারে হেলান দিয়ে । গাইড প্রস্তাব দিয়েছিল যে আমরা দুজনে ড্রাইভারের পেছনের সিটে বসি । মায়াই ক্যারিয়ারে বসার আইডিয়া দিয়েছিল, চারিদিকের দৃশ্য দেখতে-দেখতে যাবে বলে । সূর্যের অবস্হান দেখে বুঝতে পারছিলুম যে আমরা দক্ষিণের দিকে কোথাও যাচ্ছি । ম্যাটাডর আমাদের যে জায়গায় নামাল, গাঈদের পরামর্শে সেখানকার রাস্তার ধারের এক নোংরা ঢাবায় বিরাট-বিরাট জংলি পাতায় মোটা চালের ভাত আর ভিষণ ঝাল সাম্বর খেলুম । মায়াকে বলেছিলুম, যে কোনো জায়গায় জল খাবার অভ্যাস আছে তো , নয়তো পেট খারাপ হতে পারে । জবাবে মায়া বলেছিল, হলে হবে, ইমিউন হতে হবে তো, নয়তো থাকব কী করে সারাজীবন ! ঘাইড কোথা থেকে একটা গোরুর গাড়ি ডেকে এনেছিল, যতক্ষণ আমরা খাচ্ছিলুম সেই ফাঁকে । দক্ষিণ ভারতীয় বলদ । ওপর দিকে শিঙ উঠে ভেতরে বেঁকে এসেছে , গায়ে-গতরে পশ্চিমবঙ্গের বলদগুলোর চেয়ে স্বাস্হ্যবান । অদ্ভুত লাগল । লোকগুলো প্যাংলাটে আর বলদগুলো ভারিভরকম । মায়া দুহাত এগিয়ে দিয়ে বলল আমাকে গাড়িটায় তুলে দিন । দিলুম । অচেনা একধরণের ঠান্ডা ওর দেহকে ঘিরে রেখেছে মনে হল । এরকম ঠান্ডা দেহের নারী শরীরের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না । পারফিউমের গন্ধ ছিল তখনও পর্যন্ত , নিশ্চই কোনো বিদেশি দামি পারফিউম লাগিয়েছিল বাড়ি থেকে বেরোবার সময়ে । গায়ে পারফিউম মেখে কেউ বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশে যায় ? গাড়িতে উঠে মায়া বলেছিল, যাক, বলদগুলোকে অত্যধিক খাটায় না , ওদের স্বাস্হ্য ভালো । গাড়ির ওপর শুকনো পেঁপেপাতার গদিতে বসলুম আমরা , আর হেলতে-দুলতে চললুম, মায়ার অদেখা স্বপ্নভূমিতে । এখানকার সূর্য কলকাতার সেপ্টেম্বরের সূর্য নয় । মায়ার মুখে ঘামের ফোঁটা ফুটে উঠছিল । মনে পড়ছিল না যে এত কাছ থেকে কোনো যুবতীকে এভাবে ঘামতে দেখেছি কিনা । আম কাঁঠাল লেবু পেঁপে আতা সজনেডাঁটা ইত্যাদি বাগানের পাশ দিয়ে সারারাত গোরুর গাড়ি করে অত্যন্ত ক্লান্ত দেহে ভোরবেলা পৌঁছোলুম এক গ্রামে , যেখানে শ্রমিকটি আমাদের আরেকজনের জিম্মায় দিয়ে চলে গেল । তাকে খি বুঝিয়েছিল জানি না, কেননা ভাষাটা ঠিকমতন ডেসিফার করতে পারছিলুম না । সে আমাদের ক্যারিব্যাগ দুটো মাথায় চাপিয়ে হাঁটতে আরম্ভ করল , আমরা পেছন-পেছন । ঘন্টাখানেক হেঁটে, একটা সরু ঝর্ণার পাশ দিয়ে , যে গ্রামে পোঁছোলুম, তার নাম লোকটি আকারে-ইঙ্গিতে জানিয়েছিল, অগ্রমগাগি, কর্ণাটকের সীমান্তের কাছাকাছি । মজুরি হিসাবে তাকে কিছু টাকা দিতে চাইলে সে নিতে অস্বীকার করল । মায়ার নির্দেশমত আমরা হাত-ঘড়ি দুটো দিয়ে দিলুম , যদিও কী কাজে যা লাগাবে লোকটা কে জানে । হয়তো বেচে কিছু রোজগারপাতি হবে । লোকজন দেখতে পাচ্ছিলুম না । চারিদিকে গাছপালা, বনাঞ্চল বলা যায় । গ্রাম বলে তো মনে হল না । জঙ্গলে এনে ছেড়ে দিল নাকি, যখন ভাবছি, একজন চাষিমতন লোক একটা বছর তেরো-চোদ্দর ছেলেকে গাছের ডাল দিয়ে পেটাতে-পেটাতে এদিকেই আসছিল । দৌড়ে গিয়ে ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরল মায়া , আর লোকটাকে বাংলাতেই যেভাবে বকুনি দেয়া শুরু করল তা বুঝতে কোনো ভাষাভাষিরই অসুবিধার কথা নয় । লোকটা তেলেগু ধরণের ভাষায় ছেলেটির অপরাধ, মনে হয়, ব্যাখ্যা করল, আর একেবারে অপরিচিত শহুরে দম্পতি দেখে অবাক প্রশ্ন তুলল ; অন্তত সেরকমটাই মনে হল । আমি ভাঙা-ভাঙা হিন্দিতে বোঝাবার চেষ্টা করলুম যে আমরা এখানে থাকতে এসেছি । নিজামদের প্রভাব কিনা কে জানে, লোকটা বিস্মিত কন্ঠে যা বলল, হায়দ্রাবাদি হিন্দি মেশানো তেলেগুতে, যা পরে জেনেছি আঞ্চলিক ভাষা তুরপু, তা হল যে এই অঞ্চল আপনাদের মতো মানুষের বসবাসের অযোগ্য , এটা ঠিক গ্রাম নয়, এটা আউটার এরিয়া, আমরা অনেক দূরে-দূরে থাকি , কেউই এক জায়গায় থাকি না । এই জঙ্গলটা গড়ে ওঠার আগে আমরা এই জঙ্গলের জমিতেই থাকতুম , আম লেবু পেঁপে কলার খেতে কাজ করতে যেতুম , এখনও প্রায় সকলেই ফলের বাগানে কাজ করতে যায় , তার জন্যে দুবেলা অনেকটা হাঁটতে হয় । এখানে আলো নেই , জল ভরতে অনেকটা হাঁটতে হয় , স্কুল নেই, পঞ্চায়েত দপতর এতো দূরে যে নেই বললেই চলে , কোনো সরকারি লোক আসে না এখানে , লোকে দুবেলা খেতে পায় না , পায়খানা নেই, মাঠে যেতে হয়… লোকটি বলতে প্রচুর সময় নিয়েছিল , প্রায় আধ ঘন্টা, আমি তার কথার একটা নির্যাস লিখলুম । যাহোক, মায়া তাকে থামিয়ে সর্বভারতীয় খিচুড়ি ভাষায় বলল যে আমরা এখানেই থাকব , তোমাদের সঙ্গে, তোমাদের মতনকরে থাকব । মায়ার কথাগুলো আমি আরেকটু বোধগম্য হিন্দি করে বললুম লোকটাকে । সঙ্গের ছেলেটি একবার আমাদের আর একবার ওর বাবার মুখ দেখছিল । আঁচ করলুম যে ছেলেটি বোধহয় তার বাবার চেয়ে ভালো হিন্দি বলতে পারত, যেভাবে সে মৃদু হাসছিল আর কিছুটা অবাক হচ্ছিল আমাদের কথোপকথন শুনে । আমরা ওদের পাশাপাশি হাঁটতে লাগলুম । লোকটা বলতে-বলতে যাচ্ছিল, আমি আগে ব্যারাইট খনিতে কাজ করতুম, কিন্তু আমার স্ত্রীর ওই কাজ পছন্দ হচ্ছিল না বলে চলে এলুম, কেননা ওখানকার জল নষ্ট হয়ে গেছে খনির কারণে , শ্রমিকদের নানারকম রোগ হচ্ছে , আমার ছেলেটাও ওখানে কুসঙ্গে পড়ে খারাপ হয়ে যাচ্ছিল, শহরের ছেলেরা আজকাল যেমন হয় ; এখানে ফলমূল খেয়ে চলে যায় । পরে জেনেছি এখানকার তুরপুরা উপজাতি, তাই কারোর নজরে পড়ে না ; এরা ভোটাভুটি সম্পর্কেও আগ্রহী নয় । আরও পরে জেনেছিলুম যে এই অঞ্চলে মাটির তলায় আছে লোহা আর ম্যাঙ্গানিজ । আমরা লোকটির পেছন-পেছন তালপাতা পেঁপেপাতা আর গাছের ডালপালা ছাওয়া দরজাহীন একটা ঘরের কাছে পৌঁছোলে, আমাদের পথপ্রদর্শক তিন-চার বার হাঁক পেড়ে ডাকল কাউকে । কিছুক্ষণ পর যে লোকটি উদয় হল , তাকে দুর্বোধ্য বুলিতে বোঝাল আমাদের বক্তব্য । সেই লোকটা আরও রোগা, মাথায় ঝাঁকড়া চুল, কতকাল স্নান করেনি কে জানে । তার কথা আমাদের দোভাষী, বাধ্য হয়ে দোভাষী বলতে হচ্ছে আমাদের পথপ্রদর্শককে, অনুবাদ করে বলল যে একটা ঝুপড়ি আছে , যার ছিল সে বহুকাল আগে হায়দ্রাবাদ কিংবা ব্যাগালুরু চলে গেছে বোউ-বাচ্চা নিয়ে, আমরা চাইলে সেখানে গিয়ে থাকতে পারি ল শুনে, মায়ার মুখ আলোকিত হল । আমার বিমূঢ় মুখ দেখে মায়া বলেছিল, আমি তো আছি, আশঙ্কা কিসের । উত্তরে বলেছিলুম, আমার এতক্ষণ ভুল ধারণা ছিল যে আমি আছি বলে আপনার কোনো আশঙ্কা নেই । প্রতিক্রিয়ায় মায়া মৃদু হাসি খেলিয়েছিল ঠোঁটে । চোখ বুজলেই আমি মায়ার এই বিশেষ হাসি-মাখানো মুখ দেখতে পাই । কতদিন কতবার যে দেখেছি ওর এই অনুমোদনমূলক হাসি , আমার স্মৃতিতে খোদাই হয়ে গেছে ছবিটা । আশ্চর্য ! জায়গাটায়, চালাঘরটায় থেকে গেলুম আমরা ! ক্রমশ রপ্ত হতে থাকল মূল ভারতবর্ষের জীবনযাত্রা । কাঁচকলা পোড়া, কাঁঠালবিচি সিদ্ধ-চটকানো , আর কখনো=সখনো আম বা পাকা পেঁপে খেয়ে, কেবল দিনের বেলায় , কেটে গেল বেশ কয়েকটা দিন । অবশ্য যে ছেলেটিকে মায়া মার খাওয়া থেকে বাঁচিয়েছিল , সে আমাদের ভারতীয় জীবনে সেটল হতে সাহায্য করেছিল । সে তালপাতার একটা চাটাই দিয়ে গেছে, যদিও তা অতিব্যবহারে চলনসই গোছের । সে আর তার বয়সী কয়েকটি ছেলে লেগেই থাকত আমাদের সঙ্গে । আমাদের সম্পর্কে তাদের কৌতূহল ; এত কাছ থেকে শহরের মানুষদের জীবনযাত্রা দেখেনি তারা । বহুবার প্রশ্ন করে তার নাম জেনেছে মায়া, সম্পূর্ণ নাম আমাদের পক্ষে উচ্চারখ করা কঠিন বলে মায়া ওকে বালু নাম দিয়েছে । সম্ভবত বালাজীর কোনো একটা নামের স্হানীয় রূপ । বালু কালো রঙের প্লাসটিকের ঘড়া আর প্লাসটিকেরই গেলাস দিয়ে গেছে জল ভরে রাখার আর খাবার জন্যে । ঘড়াটায় পুরো জল ভরা যায় না ; ওপর দিকটা সামান্য ফাটা । গেলাস চাপা দিয়েও কোনো লাভ নেই । প্রতিদিন জল না বদলালে মশা ব্রিড করবে , মায়াকে বলতে ও বলেছিল, এর সবাই তো খাচ্ছে, মশার ডিমসুদ্ধই খাচ্ছে হয়তো , আমরাও না হয় খাবো, ক্ষতি কী । কিছু দূরের বিশাল গভীর কুয়ো থেকে গ্রামের মহিলারা জল ভরে আনে দেখে মায়া নিজেই ঘড়া কাঁখে নিয়ে জল ভরে আনে । যতটুকু জল ও বইতে পারে ততটুকু, আমাদের তেষ্টা তাতেই মেটে । ব্লাউজহীন শাড়ি পরা আরম্ভ করেছে স্হানীয় মহিলাদের অনুকরণে । ব্লাউজহীন মায়াকে দেখে প্রথম-প্রথম আমার অস্বস্তি হতো ; তাকাতে লজ্জা করত । মায়াই একদিন সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, সারা জীবন একসঙ্গে থাকতে হয়ে , ভুলে যাচ্ছেন কেন, তাকান তাকান তাকান তাকান, তাকিয়ে থাকুন । আমিও খালি গায়ে কেবল লুঙ্গি পরে থাকি । প্রথম দিন বিব্রত বোধ করেছিলুম , লুঙ্গি পরা আর খালি গায়ে থাকা, এই দুটিরই অভ্যাস ছিল না । মায়াকে দেখি আর নিজেকে কেমন দেখতে হয়েছে হয়ে যাচ্ছে অনুমান করি । গোঁফদাড়ি না কামিয়ে কেমন দেখাচ্ছে তা কালো ঘড়ার জলেতেও দেখার উপায় নেই । কোথাও প্রতিফলনের সুযোগ নেই । সত্যিই , নার্সিসিজম ঘটার কোনো সুযোগ নেই । তার মানে বহু মানুষ জীবনে মাত্র কয়েকবার আয়না দ্যাখে ; দ্যাখার প্রয়োজন বোধ করে না । মায়া কী করে চালাচ্ছে বিনা আয়নায় ? আজকালকার যুবতীরা নিজের প্রতিফলন দিনে বহুবার দেখেন । মায়া সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে সেই মায়ার সঙ্গে যে অফিসে আসার আগে নিজেকে সুশ্রী করে তুলে আনতো । অফিসেও টয়লেটে গিয়ে চুলের বিন্যাস গুছিয়ে ঠোঁটে লিপ্সটিকের নবীকরণ করে নিতো । বাড়ি যাবার সময়ে আবার একবার রূপটান দিয়ে নিত ! নারীর অন্তরজগতে পরিবর্তনের দ্রুতি কি পুরুষদের থেকে ভিন্ন ? বা, হয়তো, মায়া পাল নিজেকে নিয়ে চলেছেন এমনই এক জগতে যার সঙ্গে তাঁর নিজেরই পরিচয় হয়নি ? ভাবতুম । এখানে রাতের বেলায় না খেলেও চলে, এই প্রথম জানলুম । অন্ধকারেও থাকা যায়, এই প্রথম জানলুম । প্রতিদিন স্নান না করেও থাকা যায়, এই প্রথম জানলুম । ঘরের দরজা বন্ধ না করেও ঘুমোনো যায়, এই প্রথম জানলুম । লুঙ্গি পরে, গায়ে জামা না পরে থাকা যায়, এই প্রথম জানলুম । দাড়িগোঁফ না কামিয়ে থাকা যায়, এই প্রথম জানলুম । মাঠে বসে হাগা যায়, এই প্রথম জানলুম । অচেনা গাছের ডালে দাঁত ব্রাশ করা যায়, এই প্রথম জানলুম ।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৮০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ পলাতকার উড়াল-(02)
→ ভূতের গপ্পো—পর্ব ৬*পলাতকার উড়াল*

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...