গল্পেরঝুড়ির এ্যাপ ডাউনলোড করুন - get google app
গল্পেরঝুড়ি ফানবক্স ! এখন গল্পের সাথেও মজাও হবে! কুইজ খেলুন , অংক কষুন , বাড়িয়ে নিন আপনার দক্ষতা জিতে নিন রেওয়ার্ড !

সুপ্রিয় পাঠকগন আপনাদের অনেকে বিভিন্ন কিছু জানতে চেয়ে ম্যাসেজ দিয়েছেন কিন্তু আমরা আপনাদের ম্যাসেজের রিপ্লাই দিতে পারিনাই তার কারন আপনারা নিবন্ধন না করে ম্যাসেজ দিয়েছেন ... তাই আপনাদের কাছে অনুরোধ কিছু বলার থাকলে প্রথমে নিবন্ধন করুন তারপর লগইন করে ম্যাসেজ দিন যাতে রিপ্লাই দেওয়া সম্ভব হয় ...

সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান... জিজেতে আজে বাজে কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন ... অন্যথায় আপনার আইডি বা কমেন্ট ব্লক করা হবে... আর গল্প দেওয়ার ক্ষেত্রে গল্প দেওয়ার নিয়ম মেনে চলুন ... সার্বিকভাবে জিজের নীতিমালা মেনে চলার চেস্টা করুন ...

সাতরং হাহাকার (১ম খন্ড) - সাদ আহাম্মেদ

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)



সাবেরার সাথে আমার পরিচিত হওয়ার কোন ইচ্ছা ছিলোনা। কিন্তু টিউশনী ছেড়ে দেয়ার পর ছাত্রের মা নতুন একটা টিচার এনে দেয়ার জন্য এমন অনুরোধ করলো যে আমার কিছু করার ছিলোনা। এমআইএসটি এর একটি ফেসবুক পেজে আমি তাই পড়াইতে আগ্রহী টাইপ পোস্ট দেয়ার এক ঘন্টা পর সাবেরা আমার মোবাইলে কল করে বলে, তুমি কি আবীর না আমাদের ক্লাসের। আমার টিউশনীটা খুব দরকার। এটা কি এখনো আছে? এই মেয়ের সাথে আমার মনে হয়না কেউ কোনদিন প্রয়োজন ছাড়া একটা কথাও বলেছে। ওকে দেখলেই মনে হয় এই মনে হয় একটা আজেবাজে ঝাড়ি দিলো। আমি ওকে ছাত্রের বাসা চিনিয়ে দেয়ার জন্য আজকে ইউনির ক্যান্টিনে দাঁড়িয়ে আছি এটা জানলে পরের দিন থেকে ক্লাসে সবাই আমাকে ক্লাস থেকে ব্যান করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।এই মেয়ে গত এক সেমিস্টারে তিনটা ছেলেকে ক্লাসে যাচ্ছেতাই বলে অপমান করেছে। আমি একবার ক্লাসে যেয়ে ওর সাথে চোখাচোখি হওয়ায় ভদ্রভাবে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ভালো আছো? ও আমার দিকে না তাকিয়ে খাতা বের করতে করতে স্যারের দিকে তাকিয়ে একটা ইশারা করলো যার অর্থ দাঁড়ায়, তোর ভদ্রতার খ্যাতা পুড়ি। যাই হোক, সাবেরার সাথে দেখা হলে আমি ওকে বললাম ধানমন্ডী ২৭ নং বিকল্প বাসে চড়ে যেতে হবে। তারপর পাঁচ মিনিট হাটা পথ। যেতে পারবে? সাবেরা আমার দিকে না তাকিয়ে একটু হাসার ব্যর্থ চেষ্টা করে বললো, ধন্যবাদ। সমস্যা নেই। আমি আশেপাশে তাকিয়ে দেখি আফসার আমার দিকে তাকিয়ে আছে ফ্যাকাল্টি বিল্ডিং এর একটু সামনে দাঁড়িয়ে। খেয়াল করলাম ও সাথে সাথে মোবাইল বের করে কাকে যেন ফোন করলো। আমি ইয়াল্লাহ ইয়াল্লাহ বলতে বলতে সেখান থেকে দ্রুত পলায়ন করার চেষ্টা করলাম। সামনে একটা রিকশা দেখে ঝুপ করে উঠে সাবেরাকে মিউমিউ করে ডাক দিলাম, ইয়ে এক রিকশায় যাবা? সাবেরা রিকশায় উঠে আমার পাশে বসে বললো, অন্য রিকশা নিবো কেন? আমি মাথা নেড়ে নিজের কলঙ্কিত মুখ যতদূর সম্ভব নিচু করে ভার্সিটি থেকে মিরপুর ১২ নম্বর ক্রস করলাম। আমার মেজাজ বেসম্ভব খারাপ। সেইদিন সাবেরাকে যদি আউলায় ভুলায় বলতে পারতাম যে ছাত্রের টিচার ঠিক হয়ে গেছে তাহলে আজকে আর এই অবস্থা হতোনা। সাবেরাকে আমি সারাটা পথ আর একটা কিছু বললাম না। বাস থেকে নেমে যখন রাপা প্লাজা ক্রস করবো তখন ও আমাকে বললো, আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো? আমি মাথা নেড়ে বললাম, ইয়ে এই গলি দিয়ে দুই মিনিট হাটলেই হবে। ও মাথা নেড়ে বললো, নাহ এই কথা না। আমি জিজ্ঞাসা করতে চাইছিলাম তুমি এমন মন খারাপ করে আছো কেন? আমি তোমার সাথে আসলাম ব্যাপারটা কি খুব আপত্তিকর ছিলো তোমার জন্য? আমি ভয় পাইলাম। কি বলবো না বুঝে ডানে বামে আকাশে বাতাসে তাকিয়ে গাধার মত বললাম, আজকে খুব গরম পড়ছে তাই না? এই কথাটা স্কুল জীবনে ইংরেজীর মহাশিক্ষক জাহাঙ্গীর স্যার বলতেন। আমরা সবাই উত্তরে স্যারকে সুর করে বলতাম, জ্বী স্যার। স্যার খুশি হয়ে বলতেন, এই গরমে তোদের আমার গ্রামের বাড়ির আম কাঠালের গল্প বলি। আমরাও খুশি হয়ে যেতাম যে আজকে বাড়ির কাজ করিনাই বলে বেতের বাড়ি খেতে হবেনা। স্যারের মাইরের স্টাইল খুব ইউনিক ছিলো। স্যার প্রথমে মাথায় হাত দিয়ে বলতেন, বাবারে মারতে ভালো লাগেনা। কিন্তু কি করবো, তোমরা হলো শাখামৃগ। তোমাদের একটু ডলা দিলে মনে হয় জগতে একটা ভালো কাজ করলাম। দেখি তোমার পিছনটা উচু কর। এইখানে বাড়ি দিলে ব্যাথা লাগে কিন্তু শরীরে ক্ষতি হয়না। মাইর দেয়ার পর স্যার মন খারাপ করে আবার বলতেন, শিক্ষক যেখানে মারেন সেই জায়গায় জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করেনা। আমি আহলাদে গদগদ হয়ে ভাবতাম, যাক বাবা আমার পিছনটা স্যারের হাতেই এতো নির্যাতিত হয়েছে যে জাহান্নাম কেন জান্নাতে প্রবেশ একবারে শিউর। বাকি শরীরের কি হবে জানিনা। আমার ঘরজামাই মামা মাঝে মাঝে মামীকে খুশি করতে বলতো, বউ যেখানে যেখানে রাগ করে আঘাত করে সেখানে জান্নাতের আতরের সুবাস আসবে মৃত্যুর পর। আমি তাই এখন বউয়ের হাতে বাকিটা ছেড়ে দিছি আর কি। মূলকথায় ফিরে আসি। আপাতত আমি সাবেরা নামক এই দজ্জাল মহিলার সামনে মূলার মত দাঁড়িয়ে আছি। সাবেরা আমাকে বললো, আবীর চলো যাই। ঐটাই তার সাথে আমার শেষ কথা। আমি এরপর নীরবে ওকে ছাত্রের বাসায় বুঝিয়ে দিয়ে পরেরদিন ক্লাসে কি কি অপমান হতে হবে সেগুলো ভাবতে ভাবতে বাসায় চলে গেলাম। এরপর দেড় মাস তার সাথে ক্লাসে, হাটে ঘাটে মাঠে, ল্যাবে, সাগরে সমুদ্রে নদীতে যেখানেই আমার দেখা হয়েছে আমি তাকে মুখ নিচু করে মনে মনে সালাম দিয়ে চলে আসছি। সাবেরাকে কি আমি খানিকটা ভয় পাই? পাঠক স্বীকার করতে লজ্জা নাই, ছোট্ট খাট্ট এই কাঠখোট্টা মেয়েটাকে আমি সিরিয়াস ডর খাই। মাস খানেক আগে এক ছেলে ওর মোবাইল ধরেছিলো বলে সে ওই ছেলেকে পুরা ক্লাসের সামনে চিৎকার করে যেভাবে বেইজ্জত করছে আমরা সবাই তারে ভয় খাই। ওর মাঝে এমন কিছু একটা আছে যার জন্য ওর সাথে কথা বলতেও অস্বস্তি বোধ হয়। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় ওর হয়তো কিছু একটা সমস্যা আছে। আমার সিক্রেট ক্রাস প্রিয়াংকা যাকে আমি ঢং করে প্রিয়া ডাকি ওকে একদিন জিজ্ঞাসা করছিলাম সাবেরাকে নিয়ে। প্রিয়া আমাকে বললো, ওরা মেয়ে পার্টিও ওর সাথে খুব একটা মেশেনা। তবে মেয়েটার অর্থনৈতিক সমস্যা আছে এবং হয়তো পারিবারিক সমস্যা আছে। এইজন্য হয়তো এরকম করে। প্রিয়ার ব্যাপারে কিছু বলার নাই। ও খুব চিকন স্বরে এমন মিষ্টি করে কথা বলে যে আমি ও যতবার আমার দিকে তাকায় কথা বলে আমি গলিত বিগলিত হয়ে বাষ্প হয়ে উঠি।তাকে পছন্দ করি এই কথাটা আমি কখনোও বলিনি।বলাটা এই জীবনে সম্ভবও না।ওকে আমি কোনভাবে আমার দুর্বলতাটাও বুঝাতে পারিনা। খুব বেশি হলে আমি গদগদ হয়ে জিজ্ঞাসা করি, কোণ আইস্ক্রিম খাবা? আল্লার দুনিয়ায় এত্ত কিছু থাকতে আমি কেন ওরে এই কথাটাই শুধু বলি আমি জানিনা। ও আমাকে একদিন হেসে জিজ্ঞাসা করে, আবীর তোমার আব্বুর কি কোণ আইসক্রিমের ফ্যাক্টরী আছে? আমি প্রিয়াকে নিয়ে মহা বিপদে আছি। সিনিয়র, ক্লাস মেট এমনকি কতিপয় অতি সাহসী জুনিয়রও ওকে দেখলে এমন একটা ভাব নিয়ে কথা বলে যে চাহিবা মাত্র এই হৃদয় তোমারে দিতে বাধ্য থাকিবে। সব লুচ্চাগুলা ওর আশেপাশে ঘুরে।মাঝে মাঝে মেজাজ খারাপ হয়ে আমি বাসায় যেয়ে ফুল সাউন্ডে প্রাচীন কালের রক বাংলা শুনতাম , এই জ্বালা জ্বালা জ্বালা এই অন্তরে।নাহ মনের জ্বালা মিটতোনা। আমি ওর আশেপাশে প্রেম প্রেম ভাবওয়ালা কাউকেই সহ্য করতে পারতাম না। আমার ভালো লাগতো ওর সাথে একা একা বসে একটু কথা বলতে, সময় কাটাতে। সে বিশেষ একজন ছিলো।এই কথাটা তাকে বলা দরকার ছিলো, খুব দরকার। যাই হোক অনেকদিন পর সাবেরার সাথে আমার আবার কথা হলো। সে ক্লাস গ্যাপে আমি যখন ক্যান্টিনে বসে প্রিয়ার জন্য এক চেয়ার ছেড়ে অপেক্ষা করছিলাম তখন হঠাৎ কোথা থেকে যেন এসে সেই চেয়ারে বসে পড়লো। আমি ওকে দেখামাত্র উঠে দাঁড়ায় সালাম দেবার জন্য তৈরী হচ্ছিলাম। এরপর “আরেহ এইটা তো সাবেরা” একথা ভেবে নিজেকে সামলিয়ে ওকে মলিন মুখে জিজ্ঞাসা করলাম, আজকে ক্লাসে খুব গরম লাগছে তাই না? সাবেরা আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে একটা হাসি দিলো। আমি অভিভূত হয়ে গেলাম। এই মেয়ে হাসতে জানে, ও খোদা মোরে ধর।সে আমাকে বললো, তুমি টিউশনীটা ম্যানেজ করে দিলে, আমি তোমাকে ঠিকমত ধন্যবাদটাও দিতে পারিনি। যদি কিছু মনে না করো, আজকে কি আমি তোমাকে খাওয়াতে পারি ক্যান্টিনে। কালকে আমি বেতন পেলাম তো, তাই ভাবলাম তোমাকে একটা ছোট্ট ট্রিট দেই। আমি ঢোক গিলে বললাম, কোন সমস্যা নাই। ট্রিট না দিলেও চলতো। সে আবার হাসলো। বললো, না চলতো না। আবীর আমি বাঘ ভাল্লুক টাইপ কিছু না। তুমি এমন করে আমার সাথে কথা বলছো কেন? আমি বললাম, না আসলে তোমাকে একটু ডর লাগে। ও আমার দিকে সিরিয়াস দৃষ্টিতে তাকিয়ে এরপর হো হো করে হেসে বললো, তোমরা পোলাপাইন সব একেবারে ফার্মের মুরগী টাইপ হয়েছো। আমি যে গ্রাম থেকে আসছি ওখানে তোমাকে নিয়ে গেলে ভালো একটা ছেলে দেখে বিয়ে করায় দিতো। আমি এবার সত্যিই হাসলাম এবং বুঝলাম সাবেরা আমার বন্ধু হতেই পারে। অদ্ভূত হলেও সত্য এর কিছুদিন পর আমি আর ও দুইজন দুইজনকে তুই সম্বোধনে কথা বলা শুরু করলাম। অনেকটা গলায় গলায় বন্ধুত্ব টাইপ। আমার সৌজন্যে আমার অন্য বন্ধুদের সাথেও সাবেরার খানিকটা বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। সাবেরার একটাই সমস্যা ছিলো। সে মাঝে মাঝে খুব সিরিয়াস ভঙ্গীতে মানুষকে পচায় দিতো। যেমন কয়েকদিন আগে বন্ধু শান্ত ইএমই বিল্ডিং এর চিপায় যেয়ে সিগারেট খাচ্ছিলো। সাবেরা সেখানে যেয়ে বন্ধুকে বললো, শান্ত আমাকে তোমার বিড়িটা একটা টান দিতে দিবে। সাবেরাকে দেখে মনে হচ্ছিলো সে সত্যিই তাই চাচ্ছে। শান্ত খুব কুল ভাব নিয়ে ওকে সিগারেট বুঝায় দিলো। আমি পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সাবেরা বিড়ি নিয়ে সত্যি সত্যিই একটা টান দিলো এবং এরপর শান্তকে বললো, খুব বিচ্ছিরি। আমাদের গ্রামে একটা পেট খারাপ কুত্তা ছিলো। ওটা মাঝে মাঝে বিভিন্ন খারাপ লোকের বাসায় যেয়ে হাগু দিয়ে আসতো রাতের আধারে। একদম ওইরকম গন্ধ। বিশ্বাস করো। শান্ত এরপর চাইলেও সাবেরা আশেপাশে থাকলে সিগারেট ধরাতে পারতোনা। এমনকি আমাদের পাশেও ও যখন সিগারেট ধরাতে চাইলে আমরা ওকে মশকরা করে বলতাম, দোস্ত একটা হাগুটাইপ গন্ধ পাইতাছোস তোর মুখে? আমি সাবেরাকে কখনো ওর পরিবার নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করিনি। একদিন ও ইউনির একটা প্রোগ্রাম শেষে যখন বেশ রাত করে বাসায় যাচ্ছিলো আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, তোর বাসায় কেউ কিছু বলবেনা? ও একটু গম্ভীর হয়ে বললো, আমার বাসায় কেউ নাইরে চিন্তা করার মত? আমি ইতস্ততবোধ বোধ নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ও আচ্ছা। সবাই কি গ্রামে? ও মাথা নিচু করে কি যেন ভাবলো। তারপর বললো, আমার কেউ নেই আসলে। আমি একপ্রকার এতিম। আমি শহরে থাকি একটা মহিলা হোস্টেলে। আমার সাথে থাকে বিভিন্ন গার্মেন্টসে কাজ করা সহজ সরল মেয়েরা। যেখানে থাকি ওখানে আমি একমাত্র ছাত্রী। খুব ইচ্ছা করে ভালো একটা বাসায় থাকতে, অথবা হোস্টেল। কিন্তু উপায় নেই। টাকা শর্ট। সাবেরার দিকে তাকিয়ে খেয়াল করলাম, ওর চেহারার মধ্যে খুব দুঃখী দুঃখী একটা ভাব। আমি সেদিন ওর সাথে আর কোনকিছু নিয়েই কথা বলিনি। কিছুদিন আগে আমি সাহস করে আমার জন্মদিন উপলক্ষ্যে প্রিয়াকে দাওয়াত দিলাম ধানমন্ডির আমেরিকান বার্গারে।এই কাজটা করার জন্য আমি দীর্ঘ সময় প্রস্তুতি নিয়েছি। বহু নির্ঘুম রাত আমার কেটেছে তাকে প্রস্তাব দেয়ার জন্য। তো আমি যেদিন মিনমিন করে ক্লাসের ফাকে তাকে বললাম, পরদিন বিকেলে সে ফ্রি আছে কিনা ও হেসে বললো, কেন কোণ আইসক্রিম খাওয়াবা?আমার তো ঠান্ডা লেগেছে। আমি বললাম, ইয়ে না। নতুন একটা ফ্র্যাঞ্চাইজ খুলেছে আমেরিকান বার্গারের, ধানমন্ডিতে। তাই ভাবলাম বন্ধুদেরকে বলি একসাথে একদিন ওখানে বসা যায় কিনা? ও আমাকে বললো, আচ্ছা ঠিক আছে। কাল তাহলে দেখা হবে। আমি মনে মনে খুশিতে গদ্গদ হয়ে ওকে বললাম, ওইখানে কোণ আইস্ক্রিম নাই। আমি বাহিরে থেকে নিয়ে আসবোনে। ও কিছু না বলে হেসে চলে গেলো।আর আমি মনে মনে প্রস্তুতি নিতে থাকলাম ওকে কিভাবে আমার ভেতর টগবগ করে ফুটতে থাকে ফুটন্ত ভালোবাসার কথা বলা যায়।পরদিন বিকেলে আমি যখন আমেরিকান বার্গারে বসে ওর জন্য অপেক্ষা করছিলাম তখন ও আমাকে মেসেজ পাঠিয়ে বললো, ওর গলায় কফ হইছে। ও আসতে পারবেনা। আমার মন অনেক খারাপ হইলো। অনেক বেশি। নিজেকে কেমন যেন ছাগল মনে হচ্ছিলো। এইসেই ভাবতে ভাবতে ধানমন্ডি লেকে চলে গেলাম। রবীন্দ্র সরোবরে চুপ করে বসে আমার নিজের উপর খুব রাগ হচ্ছিলো। আমি কেন ওকে আসতে বললাম আজকে। কেন ভাবলাম যে সে আমার কথায় টুকটুক করে হেটে চলে আসবে। ও আমাকে পছন্দ করেনা। এই ব্যাপারটা আমি এত্তদিনেও ধরতে পারিনি। সে হয়তো আমাকে এখন ব্যাক্কল ভেবে ফাজলামী করতেছে। এসব যখন চিন্তা করে আমার সাদা কালো জার্সিটার কোণায় সেলাই ছিড়ছিলাম তখন সাবেরা পিছন থেকে এসে খানিকটা চিৎকার করে বললো, কিরে তুই ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদতেছিস কেন? আমার চোখে তখন আসলেও পানি ছিলো। কিন্তু আমি ফিচফিচায় কাঁদতেছিলাম না। কিন্তু তখন মনটা এতোটাই খারাপ ছিলো যে রাগ করার মত পরিস্থিতি ছিলোনা। আমি ওকে গম্ভীর হয়ে বললাম, সাবেরা এইখানে কি করতাছিস এখন? ও হাতে বাদামের প্যাকেট নিয়ে আমার পাশে বসলো। তারপর হাতে একটা বাদাম নিয়ে খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে বললো, আরেকটু সামনেই তো ছাত্র পড়াই। পড়ানো শেষ হলে প্রতিদিন এখানে চলে আসি। আমার এই জায়গাটা খুব প্রিয়। আগেও আসতাম।একদম ছোট্টকালে বাবা নিয়ে আসতো। আমি ওর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বললাম, তুই না গ্রামে থাকতি। ও মাথা নেড়ে বললো, হ্যা থাকতাম। ৬ বছর বয়সে গ্রামে থাকতে গিয়েছিলাম। এর আগে ঢাকাতে থাকতাম এই ধানমন্ডিতেই। আমি ও করে একটা শব্দ করলাম। ওর সাথে আর এইসব নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছা হচ্ছিলোনা। ভাবছিলাম উঠে চলে যাই। প্রিয়াকে একটা তুখোড় মেসেজ পাঠাতে হবে। এমন একটা মেসেজ যাতে সে বুঝতে পারে আমি অনেক কষ্ট পাইছি। তার এমন করাটা উচিত হয়নাই। আবার কেন যেন কিছুই করতে ইচ্ছা হচ্ছিলোনা। মনে হচ্ছিলো কারো সাথে এই ব্যাপারে একটু আজেবাজে প্যাচাল পাড়ি। সাবেরা ভালো অপশন না। ওর সাথে পড়াশোনা ছাড়া খুব কম বিষয়ে খোলাখুলি কথা হয়। সাবেরা অবশ্য একটুপর নিজ থেকেই জিজ্ঞাসা করলো, তোকে দেখে মনে হচ্ছে মন খারাপ। আমাকে বলে বিরক্ত করার দরকার নাই অবশ্য। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, সবার থেকে সব কিছু প্রত্যাশা করা উচিত না তাই না? সাবেরা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো, এত্ত বড় দীর্ঘশ্বাস এই সত্যি উপলব্ধির জন্য। আমি জানিনা তোর এমন কি প্রত্যাশা ভেঙ্গেছে। কিন্তু সত্যি কথা বলি, তোর এইসব প্রেমপিরিতী টাইপ দুঃখ দেখলে হাসি পায়। আমি মেজাজ খারাপ করে বললাম, তোকে কে বলছে এইটা প্রেমজনিত কোন কিছু। সাবেরা বললো, কুল সাজার চেষ্টা করোনা। এইভাবে এমন একটা রোমান্টিক জায়গায় এসে তুমি ঘাসের ডগা ছিড়তে ছিড়তে বুক চাপড়ায় হাহাকার করবা কি ডায়রিয়া হওয়ার শোকে। জীবন কি এইটাই এখনো তোরা জানিস না, বুঝিস না। আমি ওকে থামিয়ে বললাম, সাবের ভাই তোমার এইসব সিরিয়াস কাবজাব শুনতে ভালো লাগতেছে না। তুমি তার থেকে পাঁচ টাকার ঝালমুড়ি খাও। আমি যাই। সাবেরা আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বললো, একটা গল্প শুনবি। পাঁচ মিনিট নিবো। এরপর তুই তোর রাস্তায় চলে যাস। হবে? আমি উঠে যাচ্ছিলাম। আবার বসলাম। গল্প শুনি। নিশ্চয়ই কোন ইন্সপায়ারিং গল্প বলবে।আমার এইমুহূর্তে এইসব শোনার মুড না থাকলেও কেন যেন চুপ করে বসে বললাম, বলে ফেল। সাবেরা বাদাম ফেলে হাত ঝেড়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, একটু ভাব নিয়ে বলি হা। আমি মাথা নেড়ে সম্মতি দিলে বললো, একটা ছোট্ট মেয়ের গল্প বলবো। ওর বাবা ওকে মাঝে মাঝে গভীর রাতে চারদিক অন্ধকার থাকলেও জেগে জেগে দেখতো। একদিন মেয়েটা ঘুম ভেঙ্গে বাবাকে তার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললো, বাবা কি দেখো? বাবাটা বললো, মা আমি একটা পরী দেখি। আল্লাহ আমার গরীব খানায় একটা চাঁদের আলো দিয়ে বানানো পরী দিছে। ওইটাকে প্রাণ ভরে দেখি। সেই বাবাটা মাঝে মাঝে তার মেয়েটার অসুখ করলে রাত জেগে ওর পাশে শুয়ে ওকে দোয়া কালাম পড়ে ফু দিতো। মেয়ের মা মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বলতো, এরকম অতিরিক্ত করো কেন? বাবাটা বোকাবোকা হাসি দিয়ে বললো, আমার ছোট্ট মা তো তাই। বাবাটা প্রায় দিন ঘুমিয়ে থাকলে শুয়ে শুয়ে অপেক্ষা করতো কখন মেয়েটা জেগে উঠে তাকে দেখে একটা সুন্দর হাসি উপহার দেবে। মেয়েটাকে বুকের মধ্যে নিয়ে যখন ঘুম পাড়াতো এঘর ওঘর ঘুরে তখন মেয়েটা একদম ঘুমাতে চাইতোনা। কারণ মেয়েটা চাইতো বাবা যেন তাকে আরো গান শোনায়, আরো চুমু খায়। সাবেরা এটুকু বলে থেমে গেলো। আমি খেয়াল করলাম ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে টুপটুপ করে। ও হাত দিয়ে জল মুছে বললো, বুঝছিস আমি ছিলাম আমার বাবার সবকিছু।তারপর কি হলো হঠাৎ করে বাবাটা অসুস্থ হয়ে কেমন যেন হয়ে গেলো। কিছু তার মনে থাকেনা। কেমন যেন পাগল পাগল হয়ে থাকে। মাসখানেকের মধ্যে এমন অবস্থা দাড়ালো বাবাকে বেধে রাখতে হতো। ব্যবসায় কিছু একটা সমস্যা হয়েছিলো। আমি ছোট্ট ছিলাম একদম, কিচ্ছু বুঝতাম না। বাবা খুব চিৎকার করতো মাঝে মাঝে। মাথা ধরে বলতো, যন্ত্রণা, ব্যাথা। আমি সামনে গিয়ে দাড়ালে শুধু একটু চুপ হয়ে থাকতো। আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতো। আমি মাঝে মাঝে লুকিয়ে লুকিয়ে বাবার কাছে চলে যেতাম। বাবা কাউকে না চিনলেও আমাকে চিনতো, আমাকে আঙ্গুল দিয়ে ছুয়ে দিতো। এর মাস ছয়েক পরে একদিন মামারা এসে মাকে বাসা থেকে নিয়ে গেলো। আমিও মায়ের সাথে চলে গেলাম ওই বাসায় আমার পাগল বাবাটাকে ফেলে রেখে। মাকে মামারা আরেকটা বিয়ে দিয়ে দিলো। কিন্তু মায়ের নতুন সংসারে আমার কোন স্থান ছিলোনা। আমার এক মামা গ্রামে জমি দেখা শোনা করতো। সবাই আমাকে তার কাছে পাঠিয়ে দিলো।আমি অনেক কাদতাম বাবাকে দেখার জন্য। মা মাঝে মাঝে আমাকে ফোন করে কথা বলতো। আমি মা কে জিজ্ঞাসা করতাম, আমার বাবা কই? বাবার কাছে আমাকে একবার নিয়ে যাও। জানিস আবীর, আমার বাবার কান্নার শব্দ প্রতিদিন আমি শুনতে পেতাম। দেখা যেত, গভীর রাতে আমি ঘুমের মধ্যে হাসফাস করে কাঁদছি বাবার জন্য।আমি স্বপ্নে দেখতাম বাবাকে কেউ ধরে নিয়ে খুব মারছে আর আমি সামনে দাঁড়িয়ে দেখছি। বাবাকে বারবার ধরতে চাচ্ছি কিন্তু কে যেন আটকে রেখেছে। এর থেকে খারাপ স্বপ্ন আর হয়না। তারপর সেই মামার বাসায় খুব মারধোর খেয়ে বড় হলাম। আমার মামী ছিলো ইয়া মোটা একটা মহিলা। উনার কোনকিছুতে রাগ হলেই আমাকে ধমাধম মারতো। আমার কষ্ট লাগতোনা খুব একটা। আমি ছাত্রী খুব ভালো ছিলাম। মার অনুরোধে তাই আমার পড়াশোনাটা ঠিকই চলতো। এসএসসির পর মামা আমার একটা বিয়ে ঠিক করলেন। আমার রেজাল্ট অনেক ভালো ছিলো, ইচ্ছা ছিলো ঢাকায় এসে একটা ভালো কলেজে ভর্তি হবো। কিন্তু মামা একদিন থাপ্পড় দিয়ে বললো, পাগল ছাগলের মাইয়ার আবার ঘোড়ারোগ হইছে। আমি বাসা থেকে দুই তিনবার পালিয়ে গিয়েছিলাম। প্রতিবার আমাকে ধরে আনা হতো আর প্রচুর মারা হতো। আমি খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে ঘরের দরজা আটকে বসে থাকতাম। একদিন রাতে যেই ছেলের সাথে আমার বিয়ে ঠিক হলো সে দরজা দিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকে আমাকে শেষ করে দিলো। জানিস আমার বেশি কষ্ট কেন হয়েছিলো সেদিন?আমার বেশি কষ্ট হয়েছিলো আমার বাবাটার জন্য, নিজের জন্য না। আমার মনে হচ্ছিলো বাবা সব দেখছে, সব জানছে। আমাকে কেমন দুধে ভাতে মানুষ করেছিলো। বাবা কিভাবে সহ্য করবে তার আদরের মেয়ে যার গায়ে কখনও একটা আচড় লাগতে দেয়নি সে আজকে এভাবে... সাবেরা ফুপিয়ে কাঁদছিল, আমি হতভম্ব হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ওর কান্না দেখে আমারও খুব কান্না পাচ্ছিলো। সাবেরা হাত দিয়ে ওর মুখ ঢেকে বললো, এরপর প্রতিরাতে আসতো মদ খেয়ে, মাতাল হয়ে। আমাকে নির্যাতন করার আগে কানের কাছে মুখ লাগিয়ে ওই শূয়োরের বাচ্চা বলতো, বিয়া করবিনা ঠিক আছে।মজাটা লইয়া ল... আমি সাবেরাকে মাটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, তোর মামা মামীকে বলিসনাই? সাবেরা পাগলের মত জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলতো, ওরা সব জানতো রে। আমি প্রতিদিন মারা যেতাম ওরা জানতো। কিন্তু কিছু বলতোনা, বাধা দিতোনা। ওদেরকে টাকা দিতো।জানিস আমার সারা শরীরে এখনও ওদের মারের দাগ আছে। কিন্তু আমার ভেতরটা এতবার রক্তাক্ত হয়েছে, কখনও মনে হয় আর ঠিক হবেনা। সেইসময় নিজেকে আমার খুব ক্ষুদ্র মনে হতো। এত্ত তুচ্ছ একটা অস্তিত্ব মনে হতো, আমি আত্নহত্যা করতে চাইতাম।অনেকবার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু পারিনি। সাহস হয়নি। তবে ঠিক ঠিক একদিন পালিয়ে গেলাম। বেশ কিছু টাকা চুরি করেছিলাম। আমার এক স্কুল বান্ধবী ঢাকায় ওর চাচার বাসায় আমাকে থাকতে দিয়ে সাহায্য করেছিলো। ওরা আমাকে একটা মানসিক হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করিয়েছিলো। জানিনা কিভাবে সুস্থ হয়েছিলাম। পড়াশোনা আবার শুরু করলাম। একা একা এই ধূলোর শহরে বাচার জন্য লড়াই করছি। আমি সাবেরার হাত ধরে বললাম, আমি খুব স্যরি। তোকে কি বলবো বুঝতে পারছিনা আসলে। তুই এত যুদ্ধ করে এই জায়গায় আসছিস, আমি হলে পারতামনা। তুই কতটা গ্রেট তুই জানিস না। তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আকাশে তারা দেখা যাচ্ছে। সাবেরা আকাশের দিকে সেই তারা খুজতে খুজতে বললো, এত্ত কিছু হয়ে গেলো আমার। সব কষ্ট ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু একটা কষ্ট ভুলতে পারিনা জানিস। সাবেরা কথা বলতে পারছিলোনা। ও ধরা গলায় বললো, বাবার স্পর্শটা মনে করতে পারিনা। মাত্র পাঁচ বছর বয়স ছিলো তো। একটা ছবি আছে আমার কাছে, মার থেকে নিয়েছি। জানিস আমার কিন্তু ঠিকই মনে আছে বাবা পিঠে আদর করে যে গানগুলো শোনাতো সেই গানের সুর। বাবা অসহায় দৃষ্টিতে যখন ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো সেই অসহায় চোখগুলো। আমি এই কষ্ট নিয়ে বাঁচতে পারিনা। আমার বাবাটা এই দুনিয়ার সব থেকে ভালো বাবা ছিলো। ঢাকায় এসে আমি মার থেকে ঠিকানা নিয়ে বাবাকে খুজতে গিয়েছিলাম। জানতে পারলাম বাবা পাগল হওয়ার পর তার ভাই বোনরা তাকে ঠিকমত দেখে রাখতে পারতোনা। একদিন নাকি বাবা ওই বাসা থেকে পালিয়ে চলে গিয়েছিলো। এরপর আর কেউ জানেনা বাবা কোথায়। সাবেরাকে আমি কৌতুহলো হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, তোর সাথে এত কিছু হলো। তোর মা তো বেঁচে ছিলো। উনি কিছু করলেন না কেন? সাবেরা চোখ মুছে বললো, মা নতুন সংসার সেখানে তার দুই বাচ্চা নিয়ে খুব ব্যস্ত।আমার তার সাথে আমার ব্যাপারে কিছু বলতেও ইচ্ছা করতোনা। আমি বোধহয় মাকে খুব অপরাধী ভাবতাম। এইতো কয়েকদিন আগে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। কিভাবে যেন জানতে পেরেছিলেন গ্রামে আমার সাথে কি নির্যাতন হয়েছিলো। আমার থাকার জায়গায় এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করলো খুব। আমি কিছু বলিনি। আমি কারো কাছ থেকে কিছু প্রত্যাশা করিনা। মার কাছেও না।আমি বুঝি মায়ের এখন নতুন একটা জীবন আছে। সে ভালো থাকুক তার নতুন সংসার নিয়ে। আমাকে টাকা পয়সা দিতে চেয়েছিলো। আমি না করে দিয়েছি। জীবন আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা শিখিয়েছে তা হলো, নিজেরটা নিজে করে নাও। আমি সাবেরাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তোর বাবাকে এখনো খুজিস? সাবেরা উঠে দাড়ালো। আমাকে চোখ মুছে বললো, এইজন্যইতো এখানে প্রায় দিন আসি।বাবা আমাকে প্রায়ই এখানে নিয়ে আসতো। কোলে নিয়ে ঘুরতো। জাহাজ বাড়িটার কাছে একটা লোক ঝালমুড়ি বিক্রি করে। বাবা তিনটাকার ঝালমুড়ি কিনে আনতো। তারপর আমরা দুইজন মজা করে খেতাম। আমি ওকে আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করলাম, কেউ তাহলে জানেনা তোর বাবা কোথায়? তুই হাসপাতাল, থানায় খোজ করে দেখতে পারিস। আমি সাহায্য করবো? সাবেরা হেসে বললো, নাহ তোর কিছু করতে হবেনা। শুধু যা বললাম এগুলো নিয়ে কারো সাথে কোন কথা বলিসনা। অবশ্য বললেও আমার আর যায় আসেনা। এক শহর অবজ্ঞা নিয়ে বাস করতে করতে আমার এখন বেশ সয়ে গেছে। এখন যাইরে। আমি মাটি থেকে উঠে দাড়িয়ে ওকে বললাম, শোন কিছু মনে করিসনা। আমি কি তোর বাবার ছবিটা একবার দেখতে পারি? সাবেরা ব্যাগ থেকে লেমিনেটিং করা একটা ছবি বের করে দিলো। আমি মোবাইলে ওটার একটা ছবি তুলে বললাম, আমিও এখন থেকে খুজবো। সাবেরা আমার অবাক করে দিয়ে আমার হাত ধরে বললো, তুই অনেক ভালো রে দোস্ত। আমি যাই। হোস্টেলে যেয়ে আজকে রান্না করে খাওয়াতে হবে অনেককে। সেইদিনের পরের এক সন্ধ্যায় আমি রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছিলাম। পথে এক পরিচিত বৃদ্ধ ফকিরকে দেখে তার পাশে বসে পড়লাম। ফকির আঙ্কেলকে আমি অনেকদিন ধরে চিনি। আমাদের বাসায় যেকোন মিলাদ মাহফিলে উনাকে জানালেই হয়। উনি উনার দল নিয়ে হাজির হয়ে যেতেন। আমাকে দেখলেই একটা ফোকলা হাসি দিয়ে বলতেন, কি বাজান ভালা আছো? আজকে যখন উনার পাশে রাস্তায় বসলাম তখনোও উনি আমার দিকে তাকিয়ে সেই পরিচিত হাসিটা দিয়ে বললো, বাজান শরীর ভালা? আমি হাসি দিয়ে ব্যাগ থেকে একটা পলিথিনে মোড়ানো পিঠা বের করে বললাম, চাচা আম্মা আপনার জন্য দিছে। দুপুরে খাইছেন নাকি হোটেলে খাওয়াইতে নিয়ে যাবো? চাচা হাসিমুখে বললো, আজকে একটা আজিব কিছ্যা হইছে। রাস্তার ওইপারের একটা হোটেল আছেনা, অইহানের পাশ দিয়া যাইতাছিলাম। ক্যাশে যেই বেডা বসে অয় আমারে দেখলেই হুরহুর করে। আইজকা আমারে নিজে থেকে ডাইক্যা কইলো, চাচা শরীর ভালা? আমি হাইসা কই, খারাপ নাই। তুমি ভালা আছো? বেডায় আমারে কয়, চক্ষে তো কিছু দেখেন না। এইহান লইয়া প্রতিদিন হাইট্যা যান দুপুরে, কষ্ট হয়না? আমি কই, আমার খুব খুদা লাগে তাই তোমার হোটেলের পাশ দিয়া হাইট্যা যাই। তোমার পাক করা খিচুড়ির গন্ধ পাইলে মনে হয় আমার মায়ে রানছে ৭০ বছর আগে যেমনে রানতো। খুব ভালা লাগে, তাই দাওয়াত না থাকলে তোমার হোটেলের পাশ দিয়া একটু হাইট্যা যাই। এই কথা শুইন্যা বেটায় আমারে ধইর‍্যা ভিতরে বসায় খাওয়াইছে। কইছে প্রত্যেকদিন দুপুর হইলে যেন ওর লগে বইসা খাই। দুইটাকা কইর‍্যা দিতে হইবো। আইজকা বাজান বুঝলা অনেকদিন পর পেট পুইর‍্যা খাইছি। আইজকা রাতে উপাস দিমু। বেশি খাইয়্যা ফেলাইসি। আমি আবীর প্রায়দিন কত খাবার নষ্ট করি, মায়ের যত্ন করে বানানো রান্না ভালো না লাগলে ওয়াক ওয়াক করে ফেলে দেই।আর এই লোকটা একবেলা রাস্তার পাশের ময়লা ছনের হোটেলে খেয়ে কি শান্তিতে পেটে হাত দিয়ে আছে। অবাক হয়ে ভাবি, আমিই তো আসল ফকির।এতো প্রাচুর্য্য, আভিজাত্যে থাকি। প্রায় দিন পাঁচ পদের খাবার দিয়ে ভাত খাই, কিন্তু কখনো এত আরাম করে এই চাচার মত হাসতে তো পারিনা। চাচার হাতে একটা চকোলেট দিয়ে বললাম, খাবার পর ডেজার্ট লাগে। এই হাতে দিলাম একটা ডেজার্ট। আমার মাথায় চাচা হাত বুলিয়ে বললেন, বাজান আমি এইটা আমার নাতির জন্য লয়া যাই? ও তিনদিন ধইরা খুব একটা ভালো চকোলেট খাইতে চাইতেছিলো। আমি হাসিমুখে আরেকটা চকোলেট ধরায় দিলাম। জানি এটাও উনি উনার নাতির জন্যই নিয়ে যাবেন। রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া দুই বছরের মেয়েটাকে উনি কিভাবে এতো ভালোবাসেন জানিনা। যার কিছু নেই, টাকা পয়সার মোহ যাকে ধরতে পারেনি সেই হয়তো জানে একটা ছোট্ট বাচ্চাও তার জীবনে কতটা প্রয়োজন হয়ে উঠতে পারে। তাইতো সে ভালোবাসতে পারে। মন থেকে পারে। আমরা পারিনা হয়তো। চাচাকে একটু পর বললাম, চাচা আমি আসলে একটা উপকার চাইতে আসছিলাম। আপনি বলেছিলেন আপনাদের একটা সংঘটন আছে যেখানে ঢাকা শহরের লাখো ফকির সদস্য হয়ে আছে। আমি একজনকে খুজছি। সে আজ থেকে প্রায় ১৫/১৬ বছর আগে পাগল অবস্থায় বাসা থেকে হারিয়ে গিয়েছিলো। আমার মনে হয় উনি এখন ভিক্ষা করেন। চাচা চিন্তিত চোখে বললো, কাইলকা তোমারে নিয়া যামু আমাগোর অফিসে। একটা ছবি নিয়া আইসো। হয়তো খুইজ্যা পাওন যাইবো। সন্ধ্যার দিক কইরা আইসো। আমি পরের দিন ঠিকসময়ে চাচার কাছে চলে যাই। উনি আমাকে উনার অফিসে নিয়ে যান। আমি মোবাইলে তোলা ছবিটা উনাদের সংগঠনের আরেক চাচাকে দিলাম। উনি চাইলে ছবিটা কয়েকটা প্রিন্ট করেও উনার হাতে বুঝিয়ে দিলাম। সাথে আমার ফোন নম্বরটাও দিলাম। উনি আশ্বাস দিলেন যদি খোজ মিলে আমাকে জানাবেন। আপাতত উনি ঢাকা ও আশেপাশের শহরগুলোতে ছবিটা ছড়িয়ে দেবেন এবং এরপর খুজে দেখবেন


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ১২৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ☁ সাদা মেঘের ভেলা ☁
→ ~দ্য আলকেমিস্ট-পাওলো কোয়েলহো(বুক রিভিউ)।
→ জিজের পরিচিতরা যে কারণে প্রিয় (পর্ব-২)
→ কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের কথা। পর্ব-1
→ জিজের পরিচিতরা যে কারণে প্রিয় (পর্ব-১)
→ অবনীল(পর্ব-৮)
→ অভিশপ্ত আয়না পর্র৬(শেষ পর্ব):-
→ "এখনও আমি অপেখা করছি তোমার জন্য!!!!" পর্ব-২
→ অভিশপ্ত আয়না পর্ব৫:-
→ ~সান্তনা_দে-২।

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...